Monthly Archives: মে 2011

বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বাংলাদেশের রয়েছে রাজনৈতিক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৭৫৭ তে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য্য অস্তমিত হয়েছিল। তারপর বাংলার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী শাসন, শোষণ, নির্যাতন আর বঞ্চনার যাতাকলে ছিল অতিষ্ঠ। ২১৪ বছর পরে আবার অস্তমিত সূর্য্য তার আলো মেলে ধরে বাংলার আকাশে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার চার দশকপূর্তি পালন করবে। বহু লড়াই-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় পৃথিবীর মানচিত্রে। বাঙালি জাতি হিসেবে রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের উত্তরাধিকারি আমরা। এজন্য আমাদের গর্ব আর অহংকারের শেষ নেই। বাঙালি সংস্কৃতির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। অর্থাৎ জনগণ দ্বারা শাসিত বা জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। অন্ত:ত সংবিধানে এমনটাই উল্লেখ আছে। দেশে-বিদেশে স্বীকৃতিও আছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। এখানে গণতন্ত্রের নিয়ম-পদ্ধতি অনুসারে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত হয়। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রের চর্চার অভাব পরতে পরতে দেখা যায়। গণতন্ত্রের জন্য যে নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন দরকার, তার বড়ই অভাব আজকের বাংলাদেশে। দুর্নীতি, অনৈতিকতা, লুটপাট, দলীয়করণ ও পরিবারতন্ত্র সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। দুর্নীতি এখন সংস্কৃতির অংশ। আর যার কুফল ভোগ করেন দেশের নাগরিক সমাজ। সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র চর্চার অভাবেই ভূমি বা কৃষিনির্ভর বাংলার মানুষ আজও সংগ্রাম করে চলেছেন দারিদ্র্যতার সঙ্গে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুর্নগঠন করার প্রক্রিয়া তখনও শেষ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ক্ষমতা চলে যায় সেনাশাসকদের হাতে। স্বাধীনতা অর্জনের ৩৯ বছরের মধ্যে দীর্ঘ ১৭ বছরই বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে সামরিক শাসক দ্বারা। তাইতো গণতান্ত্রিক ভিত্তি এখনও সুদৃঢ় নয়। অসহিষ্ণু ও সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি বাধাগ্রস্ত করছে দেশের অগ্রযাত্রাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিকরণ, সন্ত্রাসীকরণ, সামরিকীকরণ ও ইসলামিকরণ করা হয়েছে। বিকৃত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। আইনের শাসনের অভাব, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চার ঘাটতি, দলনিরপেক্ষ শক্তিশালী নাগরিক সমাজের অনুপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দিন দিন নাজুক করে তুলছে। বাস্তবিক অর্থে একটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটায় আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র গরীব, অপরিণত, শিশু, ভঙ্গুর বা প্রতিবন্ধী গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে কার্যকরী সংসদ এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছে আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি। বেড়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার। রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি অপরাধ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারি দল ও বিরোধীদলের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণে সংসদ কার্যকর হয়নি আজও। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহিতার বড়ই অভাব। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্যই ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আজও পায়নি। স্বাধীনতার বহু বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা যায়নি। যদিও বর্তমান হাসিনা সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি সন্ত্রাস ও কালো টাকার কাছে জিম্মি এটা বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি গোটা সমাজ ব্যবস্থায় এক ক্যান্সার হয়ে দেখা দিয়েছে। সৎ মানুষরা রাজনীতি থেকে ক্রমশ:দূরে সরে যাচ্ছে। রাজনীতি কোটিপতি ব্যবসায়িদের হাতে চলে যাচ্ছে ক্রমশ:। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে। আমরা জানি ক্যান্সার মানে মৃত্যু নিশ্চিত। বাংলাদেশের ক্যান্সারটা অসহিষ্ণুতা, নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্ত রাজনীতির। তাহলে কী বাংলাদেশেরও মৃত্যু অনিবার্য? আমরা বিশ্বাস করি দেশের মানুষ নিশ্চয়ই একদিন জেগে উঠবে সকল দুর্বৃত্তপনা, অনৈতিকতা, দুর্নীতি আর অরাজকতার বিরুদ্ধে। ঠিক যেমনটি মানুষ দেখেছে ১৯৫২, ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১ ও ১৯৯০ সালে। সমাজ তার নিজ প্রয়োজনে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সমাজের ভেতর থেকেই তাগিদ অনুভূত হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সব ধর্ম তথা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসি সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। তবে সবচেয়ে বেশি হত্যা-নির্যাতনের শিকার হন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পরও আদিবাসি ও ধর্মীয় অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা মাইনরিটি ক্লিনিসিং প্রত্রিয়ার সাথে যুক্ত। সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশটাকে একটি ইসলামি শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে নিতে চায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোাচনা করার আগে তার ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। নানান উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম আর ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের পথপরিক্রমায় বাঙ্গালা থেকে বাংলা এবং আজকের বাংলাদেশ। বৈদিক সাহিত্যে বাংলার পরিচয় পাওয়া যায়। খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পরবর্তী দেড় হাজার বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল নানা নামে পরিচিত ছিল। যেমন-অঙ্গ, বঙ্গ, পুন্ড্রবর্ধণ, কামরুপ, হরিকেল, সমতট প্রভৃতি। মুসলিম শাসকগণ আরবি ও ফার্সীতে উচ্চারণ করতে গিয়ে বঙ্গাল নামেও ডাকতো এই অঞ্চলকে। অনেকের মতে এই বঙ্গাল থেকেই বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি। বিদেহ, কিরাত, পুন্ড্র, প্রাচ্য ইত্যাদি প্রাক-আর্য যুগেও বিদ্যমান ছিল। গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল পুন্ড্র ও বঙ্গ। বঙ্গ এলাকার বেশিরভাগজুড়ে ছিল গভীর অরণ্য। প্রটো অষ্টালয়েড আদিবাসিরা বসবাস করতো বঙ্গে। গভীর জঙ্গলবেষ্টিত ও নদীমাতৃক হওয়ায় বঙ্গসহ তার আশপাশের এলাকাগুলি আর্যদের রাজ্যসীমার মধ্যে ছিল না। প্রকৃতঅর্থে দেড় হাজার বছর আগে এই বাংলায় রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। ছোট ছোট রাজ্য, রাজা, জমিদার ও মহারাজার সৃষ্টি হয়। সামন্ত রাজা বন্যগুপ্ত ৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। আদি বাঙালিরা সমুদ্র তীরবর্তী। বাঙালিরা অত্যন্ত সাহসী। বাঙালি সমাজ ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির অধিকারিও বটে। বাঙালি সভ্যতা একান্তই তাদের নিজস্ব। বাইরের জগতের প্রভাবমুক্ত এক সংস্কৃতির অধিকারি বাঙালিরা। বাঙালি সংস্কৃতি উন্নত এক সংস্কৃতি। আর্যদের আগমনের ফলে বাইরের জগতের সাথে বাংলার প্রথম সংঘাত ঘটে। সেটাও চার হাজার বছর আগেকার কথা। তরপর থেকেই বাংলার মানুষের জীবনধারা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মৌর্যযুগ তথা খ্রীষ্টপূর্ব ৩২১-১৮১ অব্দে গাঙ্গেয় নিম্নাঞ্চলের বিস্তৃত নদীপথ ব্যবহৃত হতো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। ফলে পুন্ড্র, প্রাগজ্যোতিষ এবং অঙ্গ রাজ্যের তুলনায় বঙ্গ বেশ গুরুত্ব লাভ করে। সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪ অব্দ থেকেই বাঙ্গালার লিপিবদ্ধ ইতিহাসের শুরু। হর্ষ-শশাঙ্ক রাজত্বকালে বাঙ্গালায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটতে থাকে। এসময় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। পালযুগ তথা ৭০০-৯২৫ সালে বাঙ্গালা এবং গোটা এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই যুগের শেষ ভাগে আরব মুসলিমরা পশ্চিম ভারত জয় করে। পূর্বদিকে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। পাল রাজত্বের শেষ দিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কলহ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব-বিবাদ শুরু হয়। চরম এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে কঠোর ব্রাহ্মণবাদী হিন্দু সেন রাজারা আধিপত্য বিস্তার করে বঙ্গ, পুন্ড্র, সমতট ও মগধ রাজ্যে। ১০০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করে সেন রাজারা। সনে রাজাদের নিগ্রহ আর নির্যাতনে বাঙ্গালা তথা বাংলায় বিকাশমান বৌদ্ধ ধর্ম বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ে। পারস্য ও আরব থেকে নদীপথে আরাকান ও সমতটে আসতে থাকে মুসলিম বণিকরা। মুসলিম বণিকদের সাথে ইসলাম ধর্ম প্রচারকারিরাও আসতে থাকে। হিন্দু ব্রাহ্মণদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ বৌদ্ধ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গ্রহণ করতে থাকে ইসলাম ধর্ম। ১২০৪ সালে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী সেনদের পরাজিত করেন। ১২৮৯ সাল পর্যন্ত সেন রাজারা বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে শাসনকার্য চালায়। ১৩৪২-১৩৫৭ সালের মধ্যে মুসলিম সুলতানদের আমলে বাংলার মানচিত্রে পরিবর্তন সূচিত হয়। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর বাংলায় মোঘলদের যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে বাংলার সীমানা বাড়তে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলাকে বলা হতো বেঙ্গল। মোগল সাম্রাজ্যের পতনকালে ব্রিটিশরা ব্যবসা ও বসবাস করতো বর্ধমানে। আর এরই সুযোগে ব্রিটিশরা স্থানীয়দের সাথে হাত মিলিয়ে নানান ষড়যন্ত্র করতো। ফলে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন ১৭৫৭ সালে। সেই বছরের পলাশীর আম্রকাননের কলংকিত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য্য অস্ত গিয়েছিল একবার। সেই ২৩ জুন আজ পলাশী দিবস হিসেবে পরিচিত। বাংলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। এসময় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার এক শাসকের অধীনেই ছিল। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ, তীতুমীরের বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ হয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি সেইসব বিদ্রোহ-আন্দোলন। সিপাহী বিদ্রোহের বিদ্রোহীদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ব্রিটিশরা ভারতের সমগ্র এলাকায় প্রশাসনকে একক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসে। সেইসময় প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক কারণে বহু আঞ্চলিক ও সীমানাগত পরিবর্তন করা হয়। এসবের মধ্যে ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সংস্কারের নামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বঙ্গভঙ্গ। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী করা হয় কোলকাতাকে। বুদ্ধিজীবী মহলের প্রবল প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশরা। শোষণ, শাসন ও বিভাজন এই তিন নীতিতে বিশ্বাসী ছিল ব্রিটিশরা। কৌশলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাধিয়ে রাখতো এবং সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত করে রাখতো বাংলার হিন্দু-মুসলমানকে। ব্রিটিশদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ নানাভাবে সংঘটিত হতে থাকে। ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানবাগের হত্যাকান্ডের পর তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। ১৯২০ সালের শেষ দিকে মাহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশবিরোধী অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি জনতার সহিংস আন্দোলন ব্রিটিশদের মসনদ কাপিয়ে তোলে। বাঙালি বিপ্লবীরা মাস্টারদা সূর্য্যসেনের নেতৃত্বে চট্রগ্রামে দুর্বার আন্দোলন শুরু করে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সেখানে ব্রিটিশদের দু’টি অস্ত্রাগার লুট করে বিপ্লবীরা। বিপ্লবীরা কয়েকদিনের জন্য চট্রগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৩৪ সালে মাস্টারদা সূর্য্যসেনকে প্রাণদন্ড দেয় ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ সংসদে ১৯৩৫ সালে পাস করা হয় ভারতীয় স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত সরকার আইন (Indian local self government act) এরপর কয়েকটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। শের-ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কৃষক প্রজা পার্টি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শায়ত্ত্বশাসনের দায়িত্বভার নেন এ কে ফজলুল হক। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহের অধিবেশনে ভারতবর্ষের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার শায়ত্ত্বশাসন দাবি উত্থাপন করা হয়। একই সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গান্ধীজী শুরু করেন ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতবর্ষে। পরিস্থিতি নিজেদের অনুকুলে থাকছে না- এমনটা অনুমান করতে পেরে ব্রিটিশরা আবারও গ্রহণ করে বিভাজনের নীতি। যা দ্বি-জাতিতত্ত্ব নামে বহুল পরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান (আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ভারত হবে একটি পৃথক রাষ্ট্র। এই কৌশলী সাম্প্রদায়িকভাবে দেশ ভাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ চাতুরি আর সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতাদের ষড়যন্ত্রের কাছে সেই প্রতিবাদ ঢোপে টেকেনি। ফলে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের অবসান ঘটলেও ভারতবর্ষ ভেঙ্গে যায়। হিন্দু ও মুসলিম এই দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দুই আলাদা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ নামক ওই বিভাজন সম্প্রদায়গত আবাসভিত্তিক। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে কতটা বিপদজনক ও ক্ষতিকর ছিল তা এখন খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষ। সেই ভুলের জন্যই আজ এই অঞ্চল তথা তৎকালিন ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ অন্যান্য অনেক সমস্যায় ভুগছে। পাকিস্তানভুক্ত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। এই দুই অংশের মধ্যে কেবলমাত্র ধর্মীয় বন্ধন ছিল। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল না কোন মিল। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক ফারাক। এককথায় আলাদা সমাজ, আলাদা কৃষ্টি এমনকি পৃথক ভাষা। শুধু কি তাই? খাবার-দাবারের আচার-ক্রিয়াও ছিল আলাদা। ফলে শুরু হলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বাঙালি-অবাঙালির দ্বন্দ্ব। পূর্ব পাকিস্তানীরা বাঙালি আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা অবাঙালি। এই দ্বন্দ্বের ফলেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানীদের ওপর শুরু করে নির্যাতন। পশ্চিম পাকিস্তানীরা প্রথমে আঘাত করে ভাষার ওপর। বহুমুখী বৈষম্য সৃষ্টি করা হতো পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে। শোষণ-বঞ্চনার এখানেই শেষ নয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানীরা সেই মায়ের ভাষায় কথা বলাটাকেও কেড়ে নিতে চেয়েছিল। সৃষ্টি করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক বৈষম্যও। প্রচেষ্টা চালানো হয় বাংলালিপি পরিবর্তনের। তৎকালিন পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করাচি ছিল তৎকালিন পাকিস্তানের রাজধানী (বর্তমানেও পাকিস্তানের রাজধানী করাচিই)। ফলে করাচিই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সকল কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চিম পাকিস্তানীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতো। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) ৩১২ কোটি টাকা আয় করেছিল বিদেশ থেকে। আর ২৯৪ কোটি টাকা আয় করেছিল পশ্চিম পাকিস্তান। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৪৬৮ কোটি টাকা। আর পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১১৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এই দুই অংশের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য পাকিস্তানকে বিভক্ত করে ফেলে। পশ্চিম পাকিস্তান তাদের উপনিবেশ এর মতো আচরণ করতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে। বাঙালির প্রাণের সঙ্গীত রবীন্দ্র সঙ্গীতকে বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। মায়ের ভাষাকে রক্ষার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আন্দোলন মুখর হয়ে ওঠেন। আর এই ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ প্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। সব বৈষম্য আর শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা বড় হয়ে দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের সেই ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল প্রবলভাবে। অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধই বাংলার মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। আজকের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্টন মাঠে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি মুসলিম লীগের এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় খাজা নাজিমউদ্দিন দম্ভের সঙ্গে গোষণা করে বলেছিলেন, ‘উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এই ঘোষণায় তৎকালিন পূর্ববাংলার মানুষ ফুসে ওঠে। বিশেষ করে ছাত্ররা পশ্চিম পাকিস্তানীদের এই অযৌক্তিক ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ডাকা হয় সাধারণ ধর্মঘট। পরিস্থিতিভালো হচ্ছে না এটা বুঝতে পেরে পাক সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ছাত্ররা নেমে আসে রাস্তায়। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে নিহত হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। বাঙালিরা বীরের জাতি। ভাষার জন্য জীবনদান বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মায়ের ভাষা রক্ষার অধিকার আদায়ে বাঙালি জাতির যে আত্মত্যাগ তা আর বিশ্বের কোন দেশের নেই। তাইতো আজ ২১ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। ১৯৫৪ সালে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই ফ্রন্টে ছিল আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক প্রজা পার্টি এবং নেজামে ইসলামী পার্টি। ওই সালের মার্চে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় লাভ করে। সেই নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে মুসলিম লীগের। নৌকা প্রতিক নিয়ে ৯৭ ভাগেরও বেশি ভোট পেয়ে যুক্তফ্রন্ট নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। শের-ই বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় পাক সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে। ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়। ওই অধিবেশনে স্পীকার আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় এবং স্পীকারের দায়িত্ব দেয়া হয় ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে। ২৩ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশন চলাকালে কতিপয় সংসদ সদস্য ডেপুটি স্পীকারের ওপর হামলা চালান। এতে ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী নিহত হন। যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের কোন্দল, দলাদলি আর ডেপুটি স্পীকারের নিহতের ঘটনার সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জারি করা হয় সামরিক শাসন। জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা। ইস্কান্দার মির্জার দুর্ভাগ্য যে যাকে প্রধানমন্ত্রী বানালেন সেই ইয়াহিয়াই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা তুলে নেন নিজের হাতে। ষাটের দশকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর আক্রমণ আসতে থাকে পাকিস্তানপন্থি সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর কাছ থেকে। ১৯৬২ সালে পাক সরকার এক বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি চালুর উদ্যোগ নেয়। হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট এর মূল কথা ছিল, যাদের টাকা আছে তারাই শিক্ষার অধিকার পাবে। ছাত্র-ছাত্রীরা ফেটে পড়ে এই অগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামে ছাত্র সমাজ। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সামরিক শাসনবিরোধী জনআকাঙ্খার স্পষ্ট রুপ দেখা যায়। এই আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরানোর লক্ষ্যে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। এরই অংশ হিসেবে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া পরিকল্পিতভাবে পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে। বাংলার জনগণ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ছাত্র সমাজ এই দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এমনই সময় ১৯৬৫ সালে শুরু হয় পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ছাত্র ও জন আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এলো ঐতিহাসিক ৬ দফার আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে দাবি ঘোষণা করেন। ১৯৬৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু এই ৬ দফার ঘোষণা দেন। স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে পেশ করা এই ৬ দফাই বাঙালির মুক্তি সনদ হিসেবে কাজ করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এই সনদ তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসি বাঙালি সমাজকে এক কাতারে এনেছিল। এক অভুতপূর্ব জাদুকরী রাজনৈতিক শক্তি নিহিত ছিল এই ৬ দফাতে। ৬ দফার পতাকাতলে বাঙালি রাজপথের আন্দোলনে উত্তাল। পাক সরকার ৬ দফাতো মানতে রাজি হয়ইনি বরং বঙ্গবন্ধুসহ অনেকের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুধু ফাকাতেই ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা বাংলায় সেই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে আন্দোলনের অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ঊনসত্তরের সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনত বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের তৎকালিন শিক্ষক ডক্টর শামসুজ্জোহা নিহত হন। ১৯৬৯ এর ১৮ ফেব্রুয়ারি পাক বাহিনীর গুলি ও বেয়নেট চার্জে ড. জোহা মারা যান। ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের মাইলফলক জোহার এই আত্মদান। বাঙালি জাতির গৌরব-অহংকার-প্রতিরোধ-প্রতিবাদের শ্রেয়তর অর্জনের মাস হল ফেব্রুয়ারি। আইয়ুব সরকার বুঝতে পারে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাদের হাতে কোন তথ্য প্রমাণ নেই। কাজেই কোন অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর অনুসারিদের বিচারে আটকানো যাবে না। তাই তখন জেলখানার বন্দিদের হত্যার নীল-নকশা প্রণয়ন করে আইয়ুব সরকার। সেই নীল-নকশার অংশ হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট জেলখানায় সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকান্ডের খবরে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। শায়ত্বশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা ও পরবর্তীতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার আন্দোলন সম্মিলিতভাবে তীব্র গতি লাভ করে আন্দোলন। ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাক সরকারের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। সরকার বাধ্য হয়ে মুজিব, কমরেড মণি সিংহসহ অন্যান্য রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রমনা রেসকোর্স মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সমাবেশ। ওই সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দেন। বলা যায় তিনি বাধ্য হয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যান। প্রেসিডেন্ট হলেন ইয়াহিয়া খান। পরের বছর ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব লন্ডভন্ড করে দেয় উপকূলীয় অঞ্চল। ওই প্রলয়ংকরী ঘটনায় কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। এতবড় একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অমানবিক আচরণ বাংলার (পর্ব পাকিস্তান) মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও প্রাকৃতিক ধবংসলীলা পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলার জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানীদের দাতভাঙ্গা জবাব দেন ব্যালটের মাধ্যমে। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। সাতটি নারী আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের মোট সংখ্যা দাড়ায় ১৬৭টি আসন। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৮টি আসন পায় ভুট্রোর পিপলস পার্টি। এরমধ্যে ৫টি নারী আসন ছিল। জনগণের রায় নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। ফলে ক্ষমত্ াহস্তান্তর নিয়ে তারা শুরু করে নানান টালবাহানা। পাশাপাশি করতে থাকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। সেই অধিবেশনও মুলতবি করা হয় কোন কারণ ছাড়াই। এই অবস্থায় পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হন। ফুসে ওঠেন তারা স্বাধীন দেশ মাতৃকার জন্য। বাংলার মানুষ আর দাবায়ে রাখা যাবে না এটা বুঝতে পেরেছিল পশ্চিম পাকিস্তানীরা। গোটা পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাক সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনী আনতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানে। পাক ষড়যন্ত্র পরিস্কার হয়ে যায় বাংলার জনগণের কাছে। বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু মানুষের মুক্তির আকাঙ্খাকে বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন অসহযোগ আন্দোলন। বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্র, বৈষম্য থেকে মুক্তির কোন বিকল্প নেই। গণআকাঙ্খাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে দল লক্ষাধিক মানুষের সমাগম। জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু মুক্তি সংগ্রামের ডাক দেবেন। মানুষ অধীর অপেক্ষায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য। জনতার স্রোত সাতরে বঙ্গবন্ধু উঠে এলেন বক্তৃতামঞ্চে। স্বাধীনতা ঘোষণার সেই মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণায় বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।“ বঙ্গবন্ধু সেদিন তার ভাষণে আরও বলেছিলেন, ‘…ভাইয়েরা আমার। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে। ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। আমি পরিস্কার বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে (তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে) কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আমি যদি হুকুম দেবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তার স্বাধীনতার ঘোষণা শেষ করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে এই স্লোগান বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে। পাক বাহিনীকে পরাভূত করতে এই স্লোগান এক জাদুমন্ত্রের মত কাজ করেছে। জয় বাংলা বাঙালি জাতির জাতীয় স্লোগান। যদিও আজকের বাংলাদেশে এই স্লোগানটি আওয়ামী লীগের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এটি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা, ঐক্য, সংহতি ও শত্রুকে পরাভূত করার স্লোগান।

১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলো। কিন্তু কোন সমাধান এলো না। ২৫ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা করেও কোন সিদ্ধান্তে পৌছানো যায়নি। ২৫ মার্চ বিকেলে ইয়াহিয়া গোপনে চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার পর শুরু হয় তীব্র অসহযোগ আন্দোলন। পাক সরকারের ভীত কেপে ওঠে। গোটা জাতি স্বাধীনতা, মুক্তির আকাঙ্খায় বিভোর। ১৯৭১ সালের পাক সরকারও তা বুঝতে পেরে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নিরীহ জনতার ওপর আক্রমণ চালায়। পাক বর্বরতা-নৃশংসতায় আক্রান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা। মধ্যরাতে পাক বাহিনী হামলা চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করে। এই মিলিটারি ক্র্যাক ডাউনের আগে ও কিছু পরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে দেন সারা পূর্ব বাংলায়।

বঙ্গবন্ধু দু’টি ঘোষণা দিয়েছিলেন। যেগুলি বিভিন্ন মাধ্যমে সারা পূর্ব বাংলায় পরিবেশিত হয়। বিশেষ করে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর টিএন্ডটির কর্মীবাহিনী ওয়ারলেসের মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। মৃত্যুঝুকির মুখেও সেদিন তারা এই ভাষণ প্রচার করেন দেশপ্রেমের জায়গা থেকে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম ঘোষণাটি ছিল এরকম-“Maybe this is my last message. From today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. You must fight be go until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla -Sheikh Mujibur Rahman.” ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতরে পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। এখবর পেয়েই বঙ্গবন্ধু সেন্ট্রাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ডিকটেট করেন তার দ্বিতীয় ঘোষণাটি। টিএন্ডটির ওয়ালেসে সেই ঘোষণাও পাঠানো হয় সমগ্র পূর্ব বাংলায়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার হতে থাকে। এসময় চট্রগ্রামের উপকূলে নোঙর করা ছিল একটি বিদেশী জাহাজ। ওই জাহাজে অবস্থানরত এক ক্যাপ্টেন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি শুনতে পান। তিনি তা টেলিফোনে চট্রগ্রামের তৎকালিন আওয়ামী লীগ নেতা জগুর আহমেদ চৌধুরীকে জানান। জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি রাতেই হ্যান্ডবিল আকারে ছাপার ব্যবস্থা করেন। শেখ মুজিবের দ্বিতীয় ঘোষণায় বলা হয়েছিল, “To the people of Bangladesh and also of the World- Pakistan armed forces suddenly attacked the EPR base at Pilkhana and police line at Rajarbag at OCO Hrs. Of 26 March 1971, killing lots and lots of people. Still battle is going on with the police and EPR forces in the street of Dhaka. People are fighting gallantly with the enemy forces for the cause of freedom of Bangladesh. Every sector of Bangladesh is asked to resist the enemy forces at any cost in every corner of Bangladesh. May Allah (creator) bless you and help you in your struggle for freedom. Joy Bangla-Sheikh Mujibur Rahman.” এরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাক বাহিনী। প্রথমে তাকে নেয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা চট্রগাম থেকে প্রচারিত হতে থাকে। চট্রগ্রামে গভীর রাত থেকে এই ঘোষণা প্রচার করা হয় মাইকযোগে। ২৬ মার্চ দুপুরে চট্রগাম বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করেন। দেশপ্রেমিক পুলিশ, ইপিআর সদস্য, টিএন্ডটির কর্মী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশময়। শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে থাকে দেশপ্রেমিক জনতা। এরই মধ্যে চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটির নামও পরিবর্তন করেন দেশপ্রেমিকরা। এখান থেকেই তৎকালিন মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ এই ঘোষণা পাঠ করা হয়। পরবর্তীকালে স্বাধীনতাকামী জনতার উৎসাহ ও প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। মেজর জিয়া যে ঘোষণা পাঠ করেন সেটি হলো “This is Sadhin Bangla Betar Kendro. I Major Zia, on behalf of our great national leader the Supreme Commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman do hereby declare that the Independent people’s Republic of Bangladesh has been established. I have taken command as the temproary head of the Republic. I call upon all Bengalies to rise against the attack by the west Pakistani army. We shall fight to the last to free our Motherland. By the grace of Allah (creator), victory is ours…” এই ঘোষণায় দেশের মানুষ আলোড়িত হন। মহান মুক্তি সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন শত্রুকে মোকাবেলা করতে। একইদিনে জয়দেবপুরে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাশাপাশি বেসামরিক বাহিনীও গড়ে ওঠে সারাদেশেই। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১০ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা গোষণা করে। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। পাক সরকারের হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রি হন তাজউদ্দীন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে গোটা বাংলাদেশকে (তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান) চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এসব অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন মেজর শফিউল্যাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তীতে এই চারটি অঞ্চলকে আবার ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিক নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধান সেনাপতি ছিলেন জেনারেল ওসমানী। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ছিল মুজিবনগর। মেহেরপুরের বদ্যিনাথতলায় গঠিত মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুদূর আমেরিকায় ‘বাংলাদেশ কনসার্ট’ এর আয়োজন করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন, আদ্রে মালরো, জন লেনন, ওস্তাদ আল্লা রাখা এবং পন্ডিত রবি শংকর। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন ভারতের তৎকালিন ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয় বাঙালিকে। এক কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকবাহিনী তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় হত্যা করে ৩০ লাখ বাঙালিকে। দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করে পাক দুর্বৃত্তরা। তবে শেষ পর্যন্ত পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ডিসেম্বরে তাদের আত্মসমর্পণের ঠিক আগমুহুর্তে তারা বাঙালিকে মেধাশূণ্য করতে চেয়েছিল। তাইতো তারা বাসা-বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ধরে এনে হত্যা করে বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি : বাঙালি জাতির পিতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ বা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসনভার নেয়। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। একই দিনে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৩ জানুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা অনুষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত হলো সংবিধান। এই সংবিধান পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম সংবিধানগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৭২ এর সংবিধানে আদিবাসিদের স্বীকৃতি নেই। দেশে কমপক্ষে ৪৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আদিবাসির বসবাস। স্বাধীনতার ৩৯ বছরেও আদিবাসির স্বীকৃতি মেলেনি। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রায় সবক’টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে বিজয়ী হয় ২৯১টি আসনেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী বাংলার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নতুন দেশে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কল-কারখানা পুনর্গঠন করতে হয় বঙ্গবন্ধু সরকারকে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থাকে পুনর্গঠিত করার লক্ষ্যে নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি জাতি পুনর্গঠনে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম দরকার। দেশ পরিচালনায় প্রয়োজন অগাধ দেশপ্রমে। সেটা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু অনুভব করেছিলেন। সেইজন্য তিনি সমাজতন্ত্রের পথেই এগুতে থাকেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাস ঘাতকতার কাছে তিনি পরাজিত হন। ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু কোন অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তবে তার দলের ও পরিবারের অনেকেই জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতি আর অনিয়মের সঙ্গে। তাইতো বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। আর আট কোটি কম্বল। কিন্তু আমার কম্বল গেল কই?’ বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়ই দুর্নীতি, সন্ত্রাস সমাজ জীবনকে বিষিয়ে তুলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর আমলে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার হত্যা-নির্যাতন বঙ্গবন্ধুর ইমেজের ওপর আঘাত হানে। ধারণা করা হয় রক্ষীবাহিনীর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এই দুই শক্তি বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দেয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রথমে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সরিয়ে দেয় তার কাছের মানুষজনদেরকে। ষড়যন্ত্রকারি দল তাজউদ্দিনের মত দেশপ্রেমিক ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিককে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সরিয়ে দিতে সমর্থ হয়। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রিয়জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন খোন্দকার মোশতাকের মত সুবিধাবাদি ও বিশ্বাসঘাতকরা। সা¤্রাজ্যবাদি শক্তি কৌশলে বাংলাদেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরির সব ব্যবস্থা করে। ফলে বঙ্গবন্ধু সরকার দুর্ভিক্ষের মত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানে জাসদের গণবাহিনীর তৎপরতা রক্ষীবাহিনী, বিপ্লবীদের পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র সবার কর্মকান্ডই মূলত: ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে। একদিকে শ্রেণী-শত্রু খতমের নামে সর্বহারা নামধারী সন্ত্রাসীদের হত্যা-নির্যাতন। আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর নিজের দল ও পরিবারের কতিপয় সদস্যের অন্যায় কর্মকান্ড, রক্ষীবাহিনীর উৎপাত। সবমিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি বঙ্গবন্ধু সরকারের ইমেজ ক্রমশ: নিম্নগামী হতে থাকে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলায় শত্রু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীরা। আর সদ্য স্বাধীন একটি দেশে কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা বিপ্লব? সবকিছুর মূলে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে এক নারকীয় নৃশংস হত্যাকান্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের ৭ জন ছাত্রকে চোখ বেধে একসঙ্গে হত্যা করা হয়। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রেফতার করা হয় জাসদ নেতা সিরাজ শিকদারকে। এরপর তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ডের পর স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সিরাজ শিকদার আজ কোথায়? এভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধান একটি হত্যাকান্ডের পক্ষ নেয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতেই সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাশ হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ সংসদীয় অবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় চলে যায়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘৭৫ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। গঠন করা হলো ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ যা সংক্ষেপে বাকশাল। সরকার চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে। বাকশালের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কায়দায় দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হবার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতালোভী সামরিক দুর্বৃত্তরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান হবার কথা। সেই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান যাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সেই আনন্দঘন মুহুর্তটির জন্য অধির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু কে জানতো যে বঙ্গবন্ধুর জীবনে আর ১৫ আগস্টের সকাল আসবে না। সেই ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে নিহত হলেন একদল সেনা সদস্যের হাতে। খুনির দল বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলকেও সেদিন হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পরপরই শাসন ক্ষমতা নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। জিয়া পচাত্তরের ২৫ আগস্ট আর্মির চিফ অফ স্টাফ নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রথম সুফলভোগী সামরিক অফিসার হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই বর্বর হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই জীবন রক্ষায় পালিয়ে যান। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ এই এম কামারুজ্জামানসহ ২৬ জন আওয়ামী লীগ নেতাকে। ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিযুক্ত হন সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে। ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্ণেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ভেতরে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। এই অভ্যুত্থানে বন্দি করা হয় সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াকে। সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাবার সময় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের কয়েকজন যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারাগারের মতো অত্যন্ত নিরাপদ একটি স্থানে খুনিরা ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় ঘোর অন্ধকার। বাংলাদেশে ফিরে আসে আবার সেই সামরিক শাসন। এরপর টানা ১৫ বছর সামরিক শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে দেশের মানুষ। আওয়ামী লীগকে টানা ২১ বছর থাকতে হয় ক্ষমতার বাইরে। এই দীর্ঘ সময়ে মহান মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়। ক্ষমতা দখলকারি সামরিক নেতারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার কাজটিও সুচারুরুপে করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ করা হয়। ইনডেমনিটির মাধ্যমে খুনির দলকে দেয়া হয় দায়মুক্তি। ১৯৭৫ এর ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরদিন ৭ নভেম্বর আরেক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। সেই সময় খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হয়। কর্ণেল তাহের জিয়ার প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেই পঙ্গু হয়ে গেলেন। জিয়া পুনরায় সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নেন। অকৃতজ্ঞ জিয়াউর রহমান বিপ্লবের নেতৃত্বদানের অভিযোগে কর্ণেল তাহের এর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করান। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদের বিচার করতে চেয়েছিলেন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধানের পদে আসীন হয়েই দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। বিচারপতি আবু সায়েমকে প্রেসিডেন্ট করা হয়। কিন্তু ডেপুটি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন জিয়া নিজেই। দেশের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে। সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন আরেক জেনারেল এইচ এম এরশাদ। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি সায়েম ও জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার দালাল আইনটি বাতিল করেন। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় বিচারে দন্ড পাওয়া অভিযুক্তরাও জেল থেকে বেরিয়ে আসে। ১৯৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর জিয়া বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে দেখা করলেন তার সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে। সেদিন জিয়ার সাথে আরও ছিলেন এরশাদ, জিসি এস জেনারেল মনজুর, নবম ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মীর শওকত আলী, রাষ্ট্রপতি সায়েমের বিশেষ সহকারি বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং দু’জন উপ-মুখ্য সামরিক আইন প্রশাসক। ক্ষমতালোভী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সাফ জানিয়ে দিলেন যে, ‘সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি আমার চাই।’ ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম এক অর্ডিন্যান্স জারি করে রাষ্টপতির পদটি জিয়ার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এভাবে একজন ক্ষমতাপিপাসু সামরিক অফিসার দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বনে যান। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি এবং সামরিক শাসক এই দুই পদে বসেই সংবিধানের বারোটা বাজিয়ে দিলেন তিনি। ১৯৭২ এর অসাম্প্রদায়িক সংবিধানকে খন্ড বিখন্ড করে দিলেন এক চরম সাম্প্রদায়িক রুপ। সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলোৎপাটন করা হয়। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলেই ধর্মনিরপেক্ষ রাজষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ‘ বা ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। তার আমলেই গঠন করা হয় মাদ্রাসা বোর্ড ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বঙ্গবন্ধু সরকারের এসব উদ্যোগ অসাম্প্রদায়িকতার মূলে কুঠারাঘাত। রাষ্ট্রপতি হবার পর জিয়াউর রহমান সামরিক আইনের আচরণের অধীনে রাজনৈতিক দল গঠনের আদেশ দেন। সামরিক ছাউনির মধ্যে থেকে নিজেও ‘জাতীয়তাবাদি গণতান্ত্রিক দল’ বা জাগদল নামে একটি দলের আকস্মিক জন্ম দিলেন। সামরিক জেনারেল জিয়ার পেছনে জনগণের সমর্থন আছে এটা বোঝানোর জন্য তিনি আয়োজন করলেন গণভোটের। সামরিক শাসনের অধীনে পরিচালিত সেই গণভোটে দেশের তিন কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮৯ ভাগ ভোট পড়ে বলে জানানো হয়। যার প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোটই পড়েছে জেনারেল জিয়ার পক্ষে। যা অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে জিয়া নিজের সৃষ্ট জাগদলের চেয়ারম্যান বা সভাপতি পদে আসীন হন। জেনারেল জিয়া বিশ্ব পরিসরে নিজেকে গণতান্ত্রি হিসেবে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে নানান প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের জুনে তিনি আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের। জিয়া একটি ফ্রন্ট গঠন করেন। যে ফ্রন্টের নাম ছিল জাতীয়তাবাদি ফ্রন্ট। এই ফ্রন্টে ছিল জিয়ার জাগদল ছাড়াও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, পিকিংপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ, ইফনাইটেড পিপলস পার্টি, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, সিড্যুল্ট কাষ্ট ফেডারেশন, সাম্যবাদি দল, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ইষ্ট বেঙ্গল কমিউনিষ্ট পার্টি, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ। আওয়ামী লীগ কোন প্রার্থী দেয়নি ওই নির্বাচনে। তবে তৎকালিন মস্কোপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল তারা। জাতীয়তাবাদি ফ্রন্টের বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল জনতা দল। জনতা দলের প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে আওয়ামী লীগ ও মস্তোপন্থি ন্যাপ সমর্থন জানায়। যে নির্বাচনে তিনি নিজের পক্ষে ৭৭ শতাংশ ভোট পাওয়ার ব্যবস্থা করান। তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। সামরিক আইন জারির অধীনেই পেসিডেন্ট জিয়া একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেন। নির্বাচনের আগে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়া জাগদলের খোলস ছেড়ে “বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি”র জন্ম দিলেন। পরের বছর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন দিলেন জেনারেল জিয়া। কিন্তু সামরিক আইন জারি করাই থাকলো। এর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হলো সেই নির্বাচন। নির্বাচনে জিয়ার গড়া নতুন দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি বা আজকের বিএনপি পেলো ২০৭টি আসন। ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩৯টি আসন দেয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার স্থাপন করেন। এছাড়াও জিয়া সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটান। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়া তার এসব অবৈধ ও অসাংবিধানিক কর্মকান্ডের আইনী রুপ দিতে বাধ্য করেন। জিয়া তার আমলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের হাতে বিশেষ এক ক্ষমতা তুলে নেন। সেই ক্ষমতাবলে তিনি জাতীয় আইনসভার বাইরে থেকে মন্ত্রিসভার এক পঞ্চমাংশ সদস্যকে নিযুক্ত করতে পারতেন। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে তিনি যাকে তাকে প্রধানমন্ত্রি এমনকি মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের নির্বাচনও করতে পারতেন নিজেই। দেশে শুরু হলো ফের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন ব্যবস্থা। জিয়া বলেছিলেন তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবেন। সেই কথা তিনি রেখেছিলেন। আবারও শুরু হলো দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, আর অরাজকতা। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেও জেনারেল জিয়াই তার শাসনামলে কুখ্যাত রাজাকারদের ক্ষমতার অংশীদার করেছিলেন। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন শাহ আজিজুর রহমান। এই আজিজুর রহমান এশাত্তরে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। শাহ আজিজ বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমণ অন্যায় কিছু নয়। মুক্তিসংগ্রামের নামে পূর্ব বাংলায় যা হচ্ছে তা ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিৎ সেটাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া বিষয় হিসেবে দেখা।” সেই স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকেই জেনারেল জিয়া বানিয়েছিলেন স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রি। জিয়ার মন্ত্রিসভায় আরও অনেক স্বাধীনতাবিরোধী ঠাই পেয়েছিলেন। এরা হলেন আবদুল আলিম, মির্জা গোলাম হাফিজ, মশিউর রহমান, সফিউল আরম, শামসুল হুদা চৌধুরী। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দেশে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার ও বাঙালি জাতীয়তাবাদি নেতাদের হত্যাকান্ডের ঘটনায় সন্দেহের তীর জিয়ার দিকে উঠতে থাকে। এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডেও জিয়ার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন জেনারেল জিয়া ও তার সৃষ্ট রাজনৈতিক দলটি। পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী নেতা জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক গুরু গোলাম আজম। ১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই এই কুখ্যাত রাজাকারকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন জেনারেল জিয়াই। মাত্র তিন মাসের ভিসা নিয়ে এসেছিলেন গোলাম আজম। পরবর্তীতে যার নাগরিকত্ব জিয়াই ফিরিয়ে দেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এই সামরিক রাজনীতিবিদকে দিয়েছিল বীর উত্তম উপাধি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া এক সামরিক হামলায় নিহত হন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার হত্যাকান্ডের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। জিয়া হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পরেই ক্ষমতা দখলের জন্য ওৎপেতে থাকা আরেক জেনারেল প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভেতরে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে থাকে। প্রবাসে নির্বাসিত জীবনকালে ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এরপর তিনি একই বছরের ১৭ মে দেশে ফেরেন। জিয়ার পদাংক অনুসরণকারি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারের হাত থেকে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা নিয়েই দেশে শামরিক শাসন জারি করেন। বাঙালি জাতির ওপর চেপে বসলো আরেক জগদ্দল পাথর। এরশাদ ক্ষমতা দখলের পরপরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। অথচ নিজেই তিনি দুর্নীতির শিরোমণি হয়েছিলেন পরবর্তীতে। এরশাদের শাসনামল ছিল সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় ছিল ভরা। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে স্বৈরাচারি এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ১৯টি রাজনৈতিক দল বিবৃতি দেয়। বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন জিয়ার স্ত্রী গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হয় এরশাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। জেনারেল জিয়া সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূচনা করেছিলেন। আর অপর জেনারেল এরশাদ সংবিধানে ইসলামকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতায় পরিপূর্ণতা আনেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ৮ দল। আর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭ দলীয় জোট। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মূখ্যভূমিকা পালন করেন ছাত্রসমাজ। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসিনাসহ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে এরশাদ সরকার। পরের বছর তাকে দুই দফায় গৃহবন্দি করা হয়। এরশাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমানোর জন্য হত্যা-নির্যাতনের পথ বেছে নেন। ছাত্র-শ্রমিক, যুবক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে আছে নিপীড়ন। এর ভেতর দিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানা বাধে। শত শত মানুষকে এরশাদ আমলে জীবন দিতে হয় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে গিয়ে। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ জাতীয় পার্টি নাম দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গান করেন। যেভাবে তার পূর্বসূরী জিয়া বিএনপি গঠন করেছিলেন। একই বছরে এরশাদ জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করেন। আন্দোলনরত ৮ দল ও ৭ দলীয় জোট সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠ্যেয় নির্বাচনে তারা অংশ নেবে। কিন্তু হঠাৎ করে বেগম জিয়ার ৭ দলীয় জোট নির্বাচন থেকে সরে দাড়ায়। এরশাদের ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণার সময় দেখা যায় ক্ষমতাসীন দল জাতীয় পার্টির তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে আছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ধূর্ত এরশাদ বেতার-টিভিতে নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে এরশাদের দলকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয় তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অন্যান্য দলগুলি অংশ নেয়নি। ফলে এরশাদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত দেখান। একই বছরে নূর হোসেন তার বুকে পিঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক” এই স্লোগান লিখে রাজপথে নেমেছিল। এরশাদ বাহিনী নূর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করলে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি আসে। এই অবস্থায় এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন। ১৯৮৮ সালের এরশাদের পাতানো নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সবক’টি রাজনৈতিক দল। ১৯৯০ সালের শুরু থেকেই এরশাদবিরোধী আন্দোলন জঙ্গি রুপ ধারণ করে। ‘এরশাদ হঠাও’ এই এক দফার আন্দোলনে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সকল পেশাজীবীরা রাজপথের আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করে। এরশাদশাহী তার গদি রক্ষায় আবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেন সাংবাদিক ও সংবাদপত্র মালিকরা। ১৯৯০ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ ছিল। সরকারবিরোধী গণআন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে এরশাদ পরিকল্পিতভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা শুরু করেন। গণআন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার জন্য ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে মন্দির ভাঙা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। বিশেষ করে রাজধানীর পুরনো ঢাকায় এ তান্ডব চালানো হয় সবচেয়ে বেশি। সারাদেশে কয়েক হাজার মন্দির ভাঙা হয়, নির্যাতন করা হয় শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে। সুবিধাবাদি-চাটুকার বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কবিদের অনেকেই এই দুই সামরিক শাসকের (জিয়া ও এরশাদ) ছায়াতলে সমবেত হয়েছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ জনতার আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর এরশাদ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচন করে। ওই নির্বাচনে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ ৭ শতাংশের অধিক ভোট পায়। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সমর্থনে বেগম জিয়ার বিএনপি সরকার গান করে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রি নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্রহীনতার গণতন্ত্রের নবযাত্রা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য দিকগুলি হলো কারণে অকারণে সংসদ বর্জন, নাম বদল, অসহিষ্ণুতা, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, হত্যা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, পরাজয় মেনে নিতে না পারা, ইতিহাস নিয়ে টানাটানি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দীর্ঘ দেড় দশক বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল সামরিক শাসনের যাতাকলে বন্দি। দুই সামরিক শাসক দেশের রাজনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বহু সংগ্রাম ও জীবনের বিনিময়ে স্বৈরশাসনের অবসান হলো। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা করেছিল এখন বুঝি দেশে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু শান্তিতো যেন এক সোনার হরিণ হয়ে গেছে। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতিয়ে নিয়েছিল সামরিক শাসকরা সেই ক্ষমতা আবার ফিরে এলো রাজনীতিকদের হাতে। কিন্তু জনগণের ভাগ্যেরতো কোন পরিবর্তন হলো না। সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করলো বিএনপি। কিন্তু পরাজয় মানতে রাজি নয় বড় রাজনৈতিক দলগুলি। ফলে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা নির্বাচনি ফলাফলের উপর কালিমা লেপন করলেন। তিনি বললেন, সূক্ষ্ম কাচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। যাহোক বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রি এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনে বসলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। সংসদ নেত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ই নারীÑএমন নজির বাংলার রাজনীতিতে বিরল। দেশের মানুষ এই ভেবে খুশি হলেন যে, হয়ত সংঘাত, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, হানাহানি, হত্যার রাজনীতির অবসান হলো। কিন্তু না দ্রুতই মানুষের আশা ভাঙতে শুরু করে। সাধারণ কৃষক-শ্রমিকদের ওপর সরকারের জুলুম নেমে আসলো। সরকার কৃষকদের ন্যূনতম-যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়ার বদলে তাদের গুলি করে মারতে থাকে। উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধায় কৃষক সারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন। এসময় পুলিশ গুলি চালিয়ে কৃষককে হত্যা করে। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শষে হয়ে আসতে থাকে। রাজনীতিবিদরা নিজেদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। দাবি উঠে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলা দিল। ক্ষমতাসীন বিএনপি এই দাবিকে উড়িয়ে দেয়। শুরু হয় সরকারবিরোধী আন্দোলন। ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ‘ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দেয় চরম অচলাবস্থা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকালে প্রায় ১৪৫ জন রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক নিহত হন। দেশ সম্পূর্ণরুপে অচল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ১৯৯৬ সালে সংসদ, সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিএনপি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ওই নির্বাচন ছিল একটা প্রহসনের নির্বাচন। যে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম করা হয়। ভোট পড়ে মাত্র ১০ শতাংশ। প্রধান বিরোধীদলগুলি এই নির্বাচন বয়কট করে। ফলে রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হয়। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন। আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে খালেদা জিয়ার সরকার বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল সংসদে পাশ করে বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। বিএনপি সরকারের আমলেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এক দুর্বার গণ আন্দোলন। দেশ পরিচালনায় বিএনপির ব্যর্থতা আর যুুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে এবং বিএনপি ১১৩টি আসনে জয়লাভ করে। দেশে ও বিদেশে সর্বত্রই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মনে হলেও পরাজিত বিএনপি এই নির্বাচনি ফলাফলে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। রাজনীতিতে পরাজয় না মানার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় বিএনপিও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে। দীর্ঘ ২১ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পার্বত্য চ্রটগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। যদিও সেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। তারপরও সেই চুক্তি পার্বত্য চট্রগ্রামে সাময়িক শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। অবশ্য বর্তমানে পার্বত্য চট্রগ্রামে আবার অশান্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে। সেখানে আদিবাসি হত্যা-নির্যাতন, সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে। যাহোক, হাসিনা সরকারের আরও একটি সাফল্যের ঘটনা আছে। তা হলো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। মায়ের ভাষার জন্যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার মতো আত্মত্যাগের ইতিহাস বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে। আন্দোলন করে বিএনপির সরকারের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সংসদ বর্জন শুরু করে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় পার্টি সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংসদ বর্জন করতে থাকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। বিএনপি লাগাতার সংসদ বর্জন করতে থাকে। এরমধ্যেই আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের জুলাই মাসে তাদের সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হস্তান্তর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপির জামায়াতে ইসলামসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। নির্বাচনের রাত থেকেই বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট শুরু করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ আনে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ৫ বছরের শাসনামলে মানুষ অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণের যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকেন। দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বি উর্দ্ধগতিতে মানুষের দুর্গতি চরমে পৌছে। রাজনৈতিক হত্যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু-আদিবাসি হত্যা নির্যাতন বেড়ে যায়। ঘটতে থাকে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা। খুন হতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। কিন্তু খুনি, দুর্বৃত্ত, অপরাধী চক্রকে বিচারের আওতায় না আনার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। হত্যা করা হয় বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে। সংসদ বর্জনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগও সংসদ বর্জন কর্মসূচী শুরু করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের লাগাতার আন্দোলন এবং আন্দোলন দমনে সরকারের নিপীড়ন প্রচেষ্টায় চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট বিরোধীদলের দাবির প্রতি তোয়াক্কা না করে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেস্টা করে তাির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। এরপর দেশ নির্বাচনের দিকে এগুতে থাকে। কিন্তু বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ হয়ে উঠেন রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রধান নিয়ামক। এরশাদ যখন বিএনপির দিকে তখন বিএনপি খুশি। আবার এরশাদ যখন আওয়ামী লীগের দিকে তখন আওয়ামী লীগ খুশি। যাহোক রাজনৈতিক এক দুর্বিষহ এবং অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে বড় দুইটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে শুরু হয় হানাহানি। প্রকাশে মানুষ হত্যার দৃশ্য গোটা জাতিকে স্তম্ভিত ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দেয়। এই অবস্থায় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করে। নেপথ্যে থেকে মূলত: সেনাবাহিনীই ক্ষমতা দখল করে। সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন উ আহমদ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্ণর ডক্টর ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেস্টা করে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এরপর শুরু হয় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। দেশের মানুষ প্রথম পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে সমর্থন জানান। কিন্তু এক পর্যায়ে সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর বর্বর নির্যাতন। একইসাথে সরকার শুরু করে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত। এরই অংশ হিসেবে খালেদা-হাসিনা দু’জনই গ্রেফতার হন দুর্নীতির অভিযোগে। জনগণের কাছে পরিস্কার হতে থাকে যে, তারা (সরকার) মাইনাস টু ফরমুলা অনুযায়ী হাসিনা-খালেদাকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ঘটে একটি ঘটনা। যে ঘটনায় সেনা সদস্যরা ছাদ্রদের ওপর নির্যাতন চালায়। এরপরই শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ। সাধারণ জনগণ ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ফুসে উঠে। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন জনআন্দোলনে রুপ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার নির্যাতন করে সরকার। এসব ঘটনায় সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। কঠিন অত্যাচার-নির্যাতন ও স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খায় দেশের মানুষও ক্রমশ: ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন। বাংলাদেশের নব্য সেনা সরকার শেষ পর্যন্ত হাসিনা ও খালেদাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই অন্তবর্তীকালিন সরকার প্রায় দুই বছর দেশ শাসন করে। অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিান করে এই সরকার। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ব্রুট মেজরিটি পেয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট অভিযোগ করে যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সাথে আতাত করে ক্ষমতায় এসেছে। আবার সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার স্রষ্টা। রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়ায় রাজনীতিবিদরাও রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। যেকারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সৃষ্টি হয়েছিল। দেশবাসি মনে করেছিলেন যে, দীর্ঘ প্রায় দুই বছরে প্রধান দুই নেত্রীর বোধদয় ঘটেছে। কিন্তু না তাদের মানসিক ও বাস্তবিক কোন পরিবর্তন হয়নি। যার নমুনা এখন দেশবাসি প্রত্যক্ষ করছেন প্রতিনিয়ত। একবিংশ শতাব্দির বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি ও বাস্তবতা: সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মস্তানী, দখল, লুটতরাজ, হত্যা-নির্যাতনের ধারবাহিতা বজায় আছে। সংঘাত-সংঘর্ষ বন্ধ হচ্ছে না কেন? কেন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা নেই রাজনৈতিক দলড়গুলির ভেতরে বাইরে? বিশেষ করে সরকারি দল ও বিরোধীদল কেন মারমুখী সারাক্ষণ? হানাহানি, সন্ত্রাস, হামলা, পাল্টা হামলা, হত্যা-নির্যাতন, অসহিষ্ণুতাই রাজনীতির মুখ্য উপাদান। নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক তথা পেশাজীবীরাও দলীয় রাজনীতির মধ্যে নিমজ্জিত। রাজনৈতিক কারণে গোটা সমাজ ব্যবস্থা আজ বিভক্ত। বিভক্ত এই সমাজের মধ্যে বাড়ছে সুবিধাবাদিতা, চাটুকারিতা, ক্ষমতাবানদের খুশি করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। চলছে সহিংসতা, ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি, ক্যাডারনির্ভর দলীয় রাজনীতির সংস্কৃতি। মেধা ও যোগ্যতার কোন মূল্য নেই এই সমাজে। তদবির, তোষামদী, চাটুকারিতা, আত্মীয়করণ, পারিবারিকীকরণ ও দলীয়করণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা আর যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাবার তাড়না সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। রাজনীতিতে বিরোধী বা প্রতিপক্ষের মতের প্রতি নেই কোন শ্রদ্ধা। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মৌলিক মানবাধিকার। রাজনীতির নামে বা গণতন্ত্রের নামে চলছে জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, সন্ত্রাস-বোমা কিংবা গ্রেনেডবাজি। হরতালের নামে মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করাই মুখ্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। অথচ দেশের বহু মানুষ না খেয়ে থাকছে। অন্যায়-অবিচার, জলুম, নিপীড়ন আর প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকছে সাধারণ মানুষ। দেশের ৪০ ভাগেরও অধিক মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। ৮৫ হাজার গ্রামের মধ্যে অর্ধেক গ্রামে এখনও যায়নি বিদ্যুত সেবা। বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। দেশে জবাবদিহিতার কোন সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি আজও। দেশের প্রধান বিচারপতিও নিয়োগ পাচ্ছেন দলীয় বিবেচনায়। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লংঘণ করা হচ্ছে। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে করা হয়েছে। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলেও একই কাজ করা হয়। বর্তমান সরকার বিদ্যুত উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্প নিয়ে কেউ কোন আইনগত প্রশ্ন তুলতে পারবে না। এমন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর অর্থ হলো জবাবদিহিতাহীনতা। গণতন্ত্রের জন্য এধরণের কর্মকান্ড কোনমতেই সুখকর হতে পারে না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই আকা্খংা অপূর্ণই রয়ে গেছে আজও। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রি, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি, পররাষ্ট্রমন্ত্রি পদে আসীন নারীরাই। তাহলেতো বলতে হয় সেখানে নারীরা সুখেই আছেন? না, বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। নারীরা বাংলাদেশে মোটেও ভালো নেই। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপসহ নানান কায়দা ও কৌশলে নারীর প্রতি সহিংসতা চলছে। বিশ্বের মধ্যে নারীর প্রতি সহিসংসতার হার অনুপাতে বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে। পারিবারিক কলহ-দ্বন্দ্ব, অউন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষায় অনগ্রসরতা, দারিদ্র্যতার কারণে নারীর ওপর সহিংসতা বাড়ছে। এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক, ইভটিজিং, ধর্ষণ, হত্যার মতো বর্বরতার ঘটনাগুলি ঘটছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশর তৈরী পোশাকশিল্পে কয়েক লক্ষ নারী শ্রমিক কাজ করেন। তারা প্রত্যেহ ১০-১২ ঘন্টা শ্রম দেন। কিন্তু মাসিক বেতন মাত্র তিন হাজার টাকা। তাও আবার এখনও এই বেতন কার্যকর হয়নি সর্বত্র। ন্যুনতম বেতন ৫ হাজার টাকা নির্ধারনের দাবিতে আন্দোলন করায় শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের ওপর সরকারি/রাষ্ট্রীয় খড়ক নতুন কোন খবর নয়। বাংলাদেশের একটি কালো আইনের নাম হলো শত্রু সম্পত্তি আইন। এই আইনটি পাকিস্তান আমলে প্রণীত পরবর্তীতে যার নাম পাল্টে করা হয় অর্পিত সম্পত্তি আইন। তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুইটি রাষ্ট্র হলো। নির্বাহী আদেশে পাক সরকার ১৯৬৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শত্রু সম্পত্তি আইন করে। যেসমস্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ জীবনের ভয়ে ভারতে চলে গেলেন তাদরেক চিহ্নিত করা হলো শত্রু হিসেবে। এই কালো আইন অনুযায়ী তথাকথিত শত্রুদের যত সম্পত্তি তার সবই হবে শত্রু সম্পত্তি। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে এই শত্রু সম্পত্তি আইনের নাম বদল করা হয়। তখন এর নামকরণ হলো অর্পিত সম্পত্তি আইন। শত্রু বা অর্পিত যে নামেই ডাকিনা কেন এটা একটা অমানবিক এবং কালো আইন। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন পাশ করে। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এই আইন সংশোধন করতে উদ্যোগী হয়েছে। আমরা মনে করি এই সাম্প্রদায়িক কালো আইনটির সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এই আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা জরুরি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্যাতন অন্যতম একটি উপসর্গ। সাধারণত: ক্ষমতায় যে দল থাকে সেই দল নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নির্যাতনকে উৎসাহিত করে এমন অনেকগুলো কালো আইন কার্যকর আছে। এরমধ্যে ১৮৯৮ সালের ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড, ১৯৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পরও ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারার অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। জনসংখ্যানুপাতে পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ১৩০০ মানুষের জন্য একজন পুলিশ আছে বাংলাদেশে। আবার বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় পুলিশের বেতন-ভাতাও অতি সামান্য। আধুনিক অস্ত্র-সরঞ্জাম ছাড়াও উপর্যুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবতো আছেই। পুলিশকে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। এসব কারণে পুলিশ ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশে বাড়ছে কাস্টডিয়াল নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশ কাস্টডিয়াল ডেথ বা হেফাজতে মৃত্যুর বহু নজির আছে। রুবেল ও ইয়াসমিন হত্যাকান্ড হতে পারে বড় নজির। আবার সেনা হেফাজতেও নির্যাতন ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সেনা হেফাজতে আদিবাসি নেতা চলেশ রিচিলের হত্যাকান্ডের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। পার্বত্য চট্রগ্রামে ১৪ বছর আগে আদিবাসি নেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে সেনাবাহিনী। সেই কল্পনা চাকমা আজও উদ্ধার হয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেশে দেশে হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেক বছর পরেও যুদ্ধারাধীদের বিচার হওয়ার নজির রয়েছ বিশ্বে। বাংলাদেশও আছে যুদ্ধাপরাধী। তবে রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার অবশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। হাসিনা সরকার যুদ্ধারপধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে বিগত স্বাধীনতা দিবসের মাসে। সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। যুদ্ধারাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে। বাঙালি চরিত্রে তোষামদি বা চাটুকারিতা অনুপ্রবেশ করে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সুবিধাবাদি-স্বার্থান্বেষী মতলববাজ গোষ্ঠী এই তোষামদির সাথে জড়িত। মূলত: এই তোষামদকারি গোষ্ঠী শিক্ষিত শ্রেণীভুক্ত। ইংরেজ শাসকরা বাঙালিকে এই কু-শিক্ষাটি ভালোভাবেই গলাধ:করণ করিয়েছে। পাকিস্তান আমলেও জনগণ তোষামদকারি শ্রেণীর তৎপরতা ছিল লক্ষ্য করার মতো। আর স্বাধীন বাংলাদেশেও তার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্যই ছিল দেশে গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আজ বাংলায় নেই ব্রিটিশ বা পাকিস্তানী শাসন ও শোষণ কিংবা নিপীড়ন। তদুপরি তোষামোদী স্বভাবে আজও পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। দেশের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশই অশিক্ষিত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। সহজ-সরল এসব সাধারণ মানুষগুলি দিন আনে দিন খায়। উপার্জনের যেটুকু অর্থ পায় তা দিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতেই শেষ হয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাজ করে চলেছেন। রাজনীতি, জনপ্রশাসনে এই তোষামদি বা চাটুকারিতার বেশ প্রচলন ঘটেছে। অবৈধভাবে অর্থ আয়, পদ, পদবি, ক্ষমতার লোভে এই বদ সংস্কৃতিকে জিইয়ে রেখেছে তষাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী। বিবেক, ন্যায়বোধ, সততা, মর্যাদার জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজের প্রায় সকল পেশার মধ্যেই তৎপর এই গোষ্ঠী। ফলে মেধা, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ণ হচ্ছে না। সৎ মানুষ, ব্যবসায়ি ও অন্যান্য পেশাজীবী এমনকি রাজনীতিবিদরা পিছিয়ে পড়ছেন। আর তাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে সুবিধাবাদি, চাটুকার গোষ্ঠী। সমাজে যারা চাটুকারিতা করতে পারেন না বা এই অপযোগ্যতাটি যাদের নেই তারা নিগৃহিত হচ্ছেন নানাভাবে। কারণ সৎ ও বিবেকবানরা সততার সঙ্গে মর্যাদার সাথে বাঁচতে চান। কিন্তু তারাই আবার গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক শাসন-শোষণে নিষ্পেশিত,অবহেলিত এবং নিপীড়িত। কালো টাকা, সন্ত্রাস, পেশীশক্তি আর পরিবারতন্ত্রের কাছে পরাজিত হচ্ছে স্বচ্ছ ও নীতিবানদের রাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রবণতা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সৎ ও দুর্নীতি বা অনিয়মের সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তিরা রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। কালো টাকার মালিক, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্র গ্রাস করে ফেলছে স্বচ্ছ রাজনীতিকে। আর এর ফল ভোগ করছে দেশের দরিদ্র সাধারণ মানুষ। গুটিকতক রাজনৈতিক নেতা এবং পরিবারের কাছে জিম্মি হয়ে আছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ। দুবৃর্ত্তায়নের রাজনীতি গণতন্ত্র চর্চার পথকে দিন দিন রুদ্ধ করে ফেলছে। বারবার ঘুরে ফিরে ক্ষমতা যাচ্ছে যেসব দলের কাছে তাদের কেথাও গণতন্ত্রের ন্যূনতম চর্চা নেই। টাকাই মুখ্য হয়ে উঠছে রাজনীতির জন্য। সম্প্রতি সাবেক প্রধান উপদেস্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের নামে দেশ বাজিকরদের হাতে জিম্মি।’ প্রাক্তন এই প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকেই দেশের রাজনীতির স্বরুপটা বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অবস্থা বড়ই নড়েবড়ে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় অংশেরই জীবন কাটে মানবেতদর অবস্থায়। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সীমাহীন সম্পদ অপরিসীম চাহিদা, বেকারত্ব, দূর্বল জনপ্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বাধাগ্রস্ত করছে দেশের অগ্রগতিকে। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইনের শাসনহীনতা, জবাবদিহিমূলক সরকার ও দায়িত্বশীল বিরোধীদলের অনুপস্থিতি দুর্বল ও শিশু গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তুলছে প্রতিনিয়ত। এর প্রমাণ পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষাসমূহে। পৃথিবীর প্রধান ৬০টি ব্যর্থ রাষ্ট্র্রের তালিকায় বাংলাদেশ ২৪তম অবস্থানে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’ গত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ষষ্ঠবারের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর এ সূচক প্রকাশ করে। মুক্তি সংগ্রামের সফলতার পরপরই ১৯৭২ সালে দীর্ঘ কাঙ্খিত সংসদীয় সরকার পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে চালু করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সর্বোচ্চ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি করা হয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই সংসদীয় পদ্ধতির পতন ঘটানো হয়েছিল। পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতি শুধু সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানই হলেন না। বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ রাখা হলো সরকার প্রধানের হাতে। সংসদে প্রণীত আইন বাতিল, জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতাও অর্পিত হলো সরকার প্রধানের হাতে। সবক’টি রাজনৈতিক দল বাতিল করে গঠন করা হলো একটি দল। যার নাম দেয়া হলো বাকশাল। চারটি সংবাদপত্র বাদে অন্য সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিল করা হলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার কার্যত একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। যদিও কোন কোন তরফে জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়। ১৯৯০ সালে এসে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু হলো নব উদ্যমে। ১৯৯১ থেকে অদ্যাবধি চারটি নির্বাচিত সরকার পেলো বাংলাদেশ। কিন্তু সংসদ ও সরকার প্রকৃত অর্থে কার্যকর তথা জনকল্যাণমূলক হলো না। মূলত ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়লো সরকার-সংসদ। কখনও ম্যাডাম হাসিনা বা ‘জননেত্রী’ হাসিনা আবার কখনও ম্যাডাম খালেদা বা ‘দেশনেত্রী’ খালেদা ইত্যাদি নামে সবকিছুই চলতে আছে। দেশের মানুষ বারংবার হাসিনা বা খালেদা নির্ভর সংসদ ও সরকার দেখছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কখনও জনকল্যাণমূলক সরকার বা দায়িত্বশীল বিরোধীদলের মুখ দেখতে পারছে না জনগণ। জনগণের প্রত্যাশা ছিল মহাজোট সরকার ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাবে, সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ তুলে নিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাবে। নিষিদ্ধ করবে সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। কিন্তু হাসিনা সরকার সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করবে না তারা, বিসমিল্লাহকেও রাখবে তার জায়গাতেই। নগ্ন দলীয়করণের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থায় নগ্ন দলীয়করণ সংস্কৃতি বেশ পুরনো। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বাংলার রাজনীতি। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার প্রশাসনে নজিরবিহীন দলীয়করণ করেছিল। মেধা ও যোগ্যতার বদলে দলীয় সম্পৃক্তি বা পরিচিতিই হয়ে উঠেছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারিদের যোগ্যতার মাপকাঠি। বিএনপির পথ অনুসরণ করে বর্তমান আওয়ামী লীগও প্রশাসনকে পিরামিড কায়দায় দলীয়করণ করতে চাইছে। এমন খবর ইতোমধ্যে সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা, সচিবালয়ের কর্মকর্তাসহ জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে খোজা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের। পছন্দের কর্মকর্তাদের অন্ত:ত চারটি স্তরে সাজানো হবে। দলীয় পছন্দসই কর্মকর্তাদেরই পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। লক্ষ্য আগামি নির্বাচন। নির্বাচনের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও যাতে দফায় দফায় বদলির মুখে পড়লেও পছন্দের কর্মকর্তারাই থাকবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। যেমনটি করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এমন দলীয়করণের ফলে জনপ্রশাসন জনগণের কল্যাণে তেমন কাজে আসে না। অথচ বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে দলীয়করণ না করার অঙ্গীকার করেছিল। বিরোধী দলে থাকলে বা ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলি বিশেষ করে ক্ষমতাবান দুইটি রাজনৈতিক শক্তি জনকল্যাণমূখী পরিকল্পনা ও সুন্দর সুন্দর বক্তব্য প্রদান করে থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তাদের আচরণ ও কর্মকান্ড বদলে যায়। ভুলে যায় তারা তাদের অঙ্গিকারের কথা। এই বিপরীতমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কোন দলই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ ৫ বছর পরপর এই দু’টি রাজনৈতিক দলের হাতেই ঘুরে-ফিরে ক্ষমতার হাত বদল ঘটছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজিয়েছিল। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা বা আমলারা দলীয় রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার বাইরে বেরুতে পারছে না। এসব আমলা বা কর্মকর্তার কাছে দেশের চেয়ে দলের স্বার্থটাই বড়। বরং দলীয় নয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ জনগণের সেব জনপ্রশাসনই যে কোন সরকারের কাম্য হওয়া উচিত। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে এটা কখনও গড়ে তোলা র চেষ্টা করা হয়নি। সুবিধাবাদি, চাটুকার দলবাজদের আমলাদের নিয়ে দক্ষ ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয় কখনও। এই মহাসত্যটি কোন ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলই কখনও বুঝতে চায়নি। আজও বুঝতে চাইছে না ক্ষমতাসীন দল। মেধা, যোগ্যতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পদোন্নতি, নিয়োগ বা বদলির সাংবিধানিক নিয়ম অনুসৃত হয় না বাংলার রাজনীতিতে। ফলে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনকল্যাণ এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা জোটটিও। কিন্তু ক্ষমতার মোহে বা লালসায় বুদ ক্ষমতাসীন দল এই সত্যটি অনুধাবন করার শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। বোধদয় ঘটে তখন যখন পরিস্থিতি আর তাদের আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকে না। প্রশাসনে দলীয়করণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-জাতীয় কোন ইস্যুতেও সরকারি দল ও বিরোধী দল এশমতে আসতে পারে না। সরকারি দল বামে গেলে বিরোধী দল ডান দিকে যাবে এটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যেসব কর্মসূচী বা প্রকল্প হাতে নেয় আওয়ামীলীগ বা মহাজোট ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে। আবার আওয়ামী লীগের নেয়া কর্মসূচী বাতিল করে বিএনপি। দলীয়করণের নির্লজ্জ প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. মোদাচ্ছের আলী। তিনি গত ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১০ গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে অ্যানথ্রাক্স নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভায় বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত কর্মীদের মধ্য থেকে সাড়ে ১৩ হাজার জনকে কমিউনিটি হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। মোদাচ্ছের আলী বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের বাইরে কেউ যাতে সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘দলের পরীক্ষিত কর্মীরাই যাতে চাকরি পায়, সে জন্য আমি মোটামুটি একটা সিস্টেম করেছি। আমি তো আমার অফিসারকে বলে দেব, আমার লোককে চাকরি দিতে হবে।’ টাকা থাকলেই নমিনেশনপ্রাপ্তি এবং এমপি-মেয়র হওয়া যায়: বাংলাদেশের রাজনীতিতে টাকার কদর বাড়ছে ক্রমশ:। দলীয় ফান্ডে কোটি টাকা দিলে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান বা মেয়র পদে মনোনয়ন/নমিনেশন পাওয়া খুব সহজ ব্যাপার। কালো টাকার কাছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সততা তুচ্ছ হয়ে যায়। ফলে রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও ব্যবসায়িদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। বিগত নির্বাচনে এই সত্যটা আরও পরিস্কার হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ৩০০ জনকে সংসদ সদস্য পদে নমিনেশন দিয়েছিল তার মধ্যে প্রায় ১৪৬ জনের নমিনেশন পরিবর্তন করা হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল টাকার খেলা। নতুন করে নমিনেশন পাওয়া প্রার্থীদের কেউ কেউ এক কোটি থেকে ৫ কোটি এমনকি ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত দলীয় ফান্ডে জমা দেয়ার খবর শোনা যায়। টাকার বিনিময়ে নমিনেশন পাওয়াদের অধিকাংশই ব্যবসায়ি বা কালো টাকার মালিক। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমন অনেক নজির আছে। আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা আর বিএনপিতে খালেদা জিয়া এই দুই নেত্রী যা বলেন বা যা চান তাই বাস্তবে রুপ নেয়। নেত্রীর বাইরে কেউ কোন কথা বলার সাহস করেন না। আবার সাহস করে কেউ সত্যটি বললেও তাকে পদ-পদবি হারাতে হয়। এক কথায় ক্ষমতার স্বাদ গস্খহণকারি বড় দুই রাজনৈতিক দলে বাস্তবিক অর্থে গণতন্ত্রের কোন বালাই নেই। জাতীয় সংসদ কোটিপতি ব্যবসায়িদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলে থাকলে শীর্ষ নেত্রীর সংসদে উপস্থিতি কম: বর্তমান নবম সংসদে ১৫৮ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিন উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ১১৭ দিন। এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে ওই সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা ৭২ দিন উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকলে দুই নেত্রীরই সংসদে উপস্থিতি কমে যায়। ১৫৮ দিনের মধ্যে বিএনপির সদস্যরা গড়ে ১০ থেকে ৪৪ দিন উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ দিন। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিব রহমানের উপস্থিতি ১১ দিন। সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সবচেয়ে কম সময় ৪৭ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির বেগম রওশন এরশাদ উপস্থিত হয়েছেন মাত্র ২২ দিন। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। সংসদকে কার্যকর রাখা যে কোন গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্যের অন্যতম একটি মাপকাঠি। সেদিক থেকে এ সরকার সাফল্য দেখাতে পারেনি। সংসদকে কার্যকর করতে না পারার ব্যর্থতা অবশ্যই বর্তমান মহাজোট সরকারের জন্য কোন সুখকর বার্তা বয়ে আনতে পারবে না। কেবলমাত্র প্রতিপক্ষকে গালমন্দ করে বা তাদেরকে প্রতিরোধের হুমকি দিয়ে কিংবা প্রতিপক্ষের ত্রুটি সমূহ তুলে ধরলেই সংসদ কার্যকর করা যায় না। জাতীয় রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদকে কার্যকর করতে চাইলে সহনশীল মানসিকতা চাই। সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সরকারি দল কতটুকু ছাড় দিতে পারছে বা বিরোধী দলকে কতটুকু ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছে তার উপরও নির্ভর করে সংসদ কার্যকর হওয়া। দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রাণভিক্ষার রাজনীতি: বিএনপি করেছে তাই আওয়ামী লীগও করছে। খারাপ দৃষ্টান্ত অনুসরণে বাংলাদেশের রাজনীতির এই সংস্কৃতি ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের পথে অন্যতম বাধা। যুবদল নেতা গামা হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত ২০ আসামিকে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অথচ উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে এই মামলাটি। ক্ষমাপ্রাপ্তরা সকলেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এ ধরনের ক্ষমা প্রদর্শন করতেই পারেন। এই সাজা মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় অভিযুক্তদের ক্ষমা প্রদর্শন নৈতিকতাবিরোধী। আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি আমলেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিদেশে থাকা একজন দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে এক হাজারের বেশি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মানুষ আছেন। এরমধ্যে মাত্র ২০ জনকে ক্ষমা করলেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত বাকি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের জন্য অবিচার এবং বৈষম্যমূলক। দখলদারিত্ব ও ভর্তি-নিয়োগ বাণিজ্যের রাজনীতি: যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কোমরবেধে নেমে পড়ে অবৈধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও বিভিন্ন দফতরে নিয়োগ বাণিজ্য আর দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য। বিএনপি-জামায়াত আমলে ইসলামি ছাত্রশিবির আর ছাত্রদলের উৎপাতে অতিষ্ঠ ছিল দেশের মানুষ। আর এখন আওয়ামী লীগের দুই সহযোগি সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বেপরোয়া। কোন বাধাই মানছে না এই সোনার ছেলেরা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে ছাত্রদল, যুবদল এবং ইসলামি ছাত্রশিবির অবৈধ ভর্তি বাণিজ্যে মেতে থাকতো। আর এখন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সেই জায়গাটার দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করেছে। আওয়ামী লীগের দিন বদলের এই ডিজিটাল সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জলকারি ছাত্রলীগ-যুবলীগ একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন। দেশজুড়ে এদের টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি, দখলদারি আর ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। কিন্তু সরকারি দল এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। যেভাবে ছাত্রদল ও শিবিরকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দখলদারি আর নিযোগ বাণিজ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি দেশে। ছাত্রদল-যুবদল ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের জায়গাটা দখল করেছে যুবলীগ-ছাত্রলীগ। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগ মেধার দৌড়ে টিকতে না পেরে নিয়োগ বঞ্চিত যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা জেলায় জেলায় তান্ডব চালাচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ে সিভিল সার্জনের কার্যালয় ভাংচুর করেছে যুবলীগ-ছাত্রলীগ। পাবনায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গণনির্যাতন ও ব্যাপক ভাংচুর করে তারা। এই ঘটনায় পাবনার জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। গণমাাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের কান্নার ছবি প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রির আরেক উপদেস্টা এইচ টি ইমাম সন্ত্রাসী দলীয় কর্মীদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়ে বলেছেন, ‘পাবনায় প্রশাসনের কেউ কাদেনি। এই কান্না মিডিয়ার সৃষ্টি।’ বিএনপি-জামায়াত আমলে প্রধানমন্ত্রি খালেদা, যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, তৎকালিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি লুৎফুজ্জামান বাবরও ঠিক এক।ভিাবে বলেছিলেন যে, ‘বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃস্টি।’ অথচ তখন আল-কায়দার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষাকারি ইসলামি জঙ্গি নেতা বাংলা ভাই প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে লাশ গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখছিল। সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য ও তার অনুগত যুবলীগ-ছাত্রলীগ বাহিনীর তান্ডবে পাবনার অসহায় জেলা প্রশাসন সরকারের কাছে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার চাইলো। আওয়ামী লীগ সরকার তাদেরকে ন্যায়বিচার না দিয়ে শাস্তি দিলো। পাবনা প্রশাসনের প্রায় সব শীর্ষ কর্মকর্তাকে হয় বদলি না হয় ওমসডি করে শাস্তি দেয়। শুধু পঞ্চগড় বা পাবনাতেই নয় যশোর ও পটুয়াখালীসহ আরও অনেক স্থানে এমন জহন্য ঘটনা ঘটিয়েছে সরকারদলীয় ক্যাডাররা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপালও একইভাবে চাকরিপ্রার্থী সরকার সমর্থকদের হাতে লাঞ্ছিত হন। এই হলো বাংলাদেশের রাজনীতির দখলদারিত্বমূলক অপসংস্কৃতি। নাম বদলের রাজনীতি: আজ এই সরকার যে প্রতিষ্ঠান ভবন বা উন্নয়ন প্রকল্পের নামকরণ করলো কাল অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে তা বাতিল করা হবে। নামকরণ হবে নতুন নামে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় যমুনা নেতুর নামকরণ করেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসেই বঙ্গবন্ধুর নামে করা যমুনা সেতুর নামকরণ বাতিল করে। আবার ২০০৯ সালে ক্ষমতা নেয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের নামে করা ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ এর নাম মুছে ফেলে। বিশ্বজুড়ে পরিচিত ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এখন শাহজালাল বিমান বন্দর। জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সব জায়গা থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলতে চায়। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে সব জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা উপড়ে দেয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই চাটুকার-দালাল চক্র হয় বঙ্গবন্ধু নয়তো জিয়ার নামে নামকরণ করানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। হাসিনা এবং খালেদা এই সুবিধাবাদি শ্রেণীর বিপক্ষে কখনও সাহস করে দাড়ায়নি। ফলে নামবদলের হীনমন্য রাজনীতির পরিসর বাড়ছে নিরন্তর। রাজনীতিতে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্র : দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধ:পতনের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকাশমান ধারা হচ্ছে ব্যাহত। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, চলমান পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাই বাংলাদেশের সর্বগ্রাসী অচলায়তনের জন্য অনেকাংশেই দায়ি। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, রাজতন্ত্র প্রর্ভতির সঙ্গে আমাদের নানাভাবে পরিচয় ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিবারতন্ত্র নামের কোন ধারণা পাওয়া যায় না। পরিবারতন্ত্রের নয়া ধারণা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবারতন্ত্র জনজীবনে নানান সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। গণতন্ত্রের নামে এখানকার সমাজ, নাগরিক জীবন কার্যত: পরিবারতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিবারতন্ত্রের নতুন এই ধারণাকে আমরা রাজতন্ত্রের সঙ্গে কেবল তুলনা করতে পারি। কিন্তু পরিবারতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রি রাজতন্ত্রের একজন চরম রাজার চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালি। বাংলাদেশে বিগত দুই দশক ধরে পরিবারতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে আসছে। এখানে রাজনীতিকে এখন আর কোন জনসেবা বা দেশসেবার সংজ্ঞায় ফেলা যাবে না। বরং রাজনীতি হয়ে উঠেছে ব্যক্তি, পরিবার বা দলের উন্নয়নের সেবক বা মানদন্ড হিসেবে। ফলে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে দেখা যাচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা। দেশ মূলত: দুই পরিবার তথা হাসিনা ও খালেদা পরিবারের কাছে জিম্মি। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগে এবং জিয়ার হত্যাকান্ডের পর বিএনপিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই অবস্থায় হাসিনা ও খালেদাকে যখাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মনে করে দলের প্রধান করা হয়। হাসিনা আওয়ামী লীগের এবং খালেদা বিএনপির হাল ধরলে দলে ঐক্য ও সংহতি ফিরে আসে। খালেদা স্বামীর এবং হাসিনা বাবার উত্তরাধিকারি হিসেবে রাজনীতিতে আবির্ভূত হলেন। এতে ক্ষতির কিছু ছিল না। উভয়ই ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি মেনে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন দেশের মানুষ। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাও তাদের প্রাণভরা নি:স্বার্থ সমর্থন আস্থা প্রদর্শন করলেন দুই নেত্রীর প্রতি। কিন্তু তারা ধীরে ধীরে আদর্শচ্যুত হতে থাকলেন। এক পর্যায়ে সরকার ও দল উভয় জায়গায় হাসিনা এবং খালেদা গড়ে তুললেন পরিবারের একাধিপত্য। পরিকবারতন্ত্রের পাশাপাশি চলে আসলো দুর্নীতি। দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের যাতাকলে দেশের মানুষ পদদলিত হতে থাকলো। রাজনীতির মাধ্যমে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির হোমরা-চোমরারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলতে লাগলেন। গণতন্ত্র আর অর্থনীতিতে গড়ে তোলা হলো দুর্নীতি-লুটপাটতন্ত্র। জনগণের অসচেতনতা, অশিক্ষা, সহজ-সরলতা আর দারিদ্র্যতাকে পুজি করে লুটেরা শ্রেণী রাজনীতির নিয়ন্ত্রণকর্তায় আবির্ভূত হতে থাকে। রাজনীতিতে সন্ত্রাস, অর্থ ও পেশিশক্তির দাম বাড়তে থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো, রাজনীতিতে সন্ত্রাস-অর্থ ও পেশিশক্তির আমদানির জন্য সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ও এরশাদই মূলত: দায়ি। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও পরিবারতন্ত্রের সূচনা ঘটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আমলেই। জাসদ নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যা, রক্ষী বাহিনীর সন্ত্রাস, গণবাহিনীর হত্যা-নির্যাতন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কতিপয় সদস্যের অপকর্ম সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতি প্রত্যক্ষ করেছে সূচনাতেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনামলে সমাজে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা পেতে থাকে। জিয়া কর্ণেল তাহেরসহ বহু মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে হত্যা করান। বঙ্গবন্ধু ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নানামুখী ইসলামি কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন বটে। কিন্তু তিনি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে ব্যবহার করেননি। তবে জিয়া ও এরশাদ রাষ্ট্র ও সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়েছেন। যাহোক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির প্রবণতা হলো মেধা, সততা, স্বচ্ছতা, শিক্ষা নয় টাকা, অস্ত্র ও পেশিশক্তিই রাজনীতির মূল নিয়ামক উপাদান। বিশেষ করে বড় দুইটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই প্রাকটিসটাই করে চলেছে। বিএনপিতে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান বিএনপির মূল নিয়ন্ত্রণকর্তা। বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন সরকার ও দল মূলত: তারেক রহমানকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। অতি সম্প্রতি তারেক রহমানকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। খালেদাপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে টাকার পাগাড় গড়ে তুলেছেন। হাসিনাপুত্র সজিব ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই রিপোর্ট প্রকাশ করার জের ধরেই মূলত: বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ইতোমধ্যে বিরোধীমতের পত্রিকা হিসেবে পরিচিত দৈনিক আমার দেশের প্রকাশনা বাতিল করেছে। পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে এখনও কারাবন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহেনা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শক্ত প্রভাব লক্ষ্যণীয়। হাল আমলে আমেরিকাপ্রবাসী সজীব ওয়াজেদকে রংপুর আওয়ামী লীগের সদস্যপদ প্রদান করেছে সেখানকার অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগ। আগামি দিনে জয় ও রেহেনাকে আওয়ামী লীগের বড় পদ পদবিতে অলংকৃত করা হবে-এতে কোন সংশয় নেই। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই বড় দুই দলে ব্যক্তি কেন্দ্রিক ইচ্ছা-অনিচ্ছায়ই সবকিছু পরিচালিত হয়। আওয়ামী লীগে হাসিনা আর বিএনপিতে খালেদা যা বলেন বা যা চাইবেন তাই-ই হবে এবং হতেই হবে। ইহাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা। এই বড় দুই দলের বাইরে জাতীয় পার্টিতেও পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এরশাদপতœী বেগম রওশন এরশাদ ও এরশাদের ভাই জিএম কাদের জাতীয় পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা। জাতীয় পার্টিতেও এরশাদ যা বলেন বা যা চান তাই হয়। বাংলাদেশে ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যা। দেশের মানুষের নিরাপত্তা মুহুর্তে মুহুর্তে বিঘিœত হচ্ছে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হয় না। রাজনীতি হয় ব্যক্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন পাশ করে। অন্যদিকে দেশের বহু মানুষের দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাবার জোটে না। লাখ লাখ মানুষ থাকেন খোলা আকাশের নিচে। তাদের খাবার বা থাকার ব্যবস্থার দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন কর্মসূচী নেয়া হয়নি কখনও। কিন্তু বহু টাকা ও সম্পদ এবং বাড়ির মালিক রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের বাড়ি রক্ষায় রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হ§য়। এতেই বোঝা যায় তাদের রাজনীতি ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা করা। দেশের মানুষ বা দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশে বড় দুইটি দল রাজনীতি করছে না। দেশের হাইকোর্ট সম্প্রতি বেগম জিয়ার সেনানিবাসের বাড়িটি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এরই বিরুদ্ধে বিএনপি রাজপথে নামার হুংকার দেয়। বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা কুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংবিধান না হয় বাদ দিলাম, বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের যে গানতন্ত্র আছে সেই গানতন্ত্রের লিখিত রীতি-নিয়মগুলিও খালেদা-হাসিনা মেনে চলেন না। গঠনতন্ত্র মেনে দল পরিচালিত হলেও গণতন্ত্র চর্চার পথ কিছুটা হলেও অগ্রগামী হতো। বর্তমান আওয়ামী লীগ দেশের মানুষে দিন বদলের রাজনীতি ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখালো। সেই স্বপ্নে বিভোর জাতি আওয়ামী লীগকে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা দিয়ে ক্ষমতায় বসালো। সেই আওয়ামী লীগ পরিবার-পরিজন ও জ্বি-হুজুরমার্কাদের পদ-পদবিতে পুরস্কৃত করলো। আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কান্ডারি আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল জলিলকে হাসিনা দূরে সরিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধুও একজন ত্যাগি ও পরীক্ষীত নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন সুবিধাবাদি খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্রে। কোটিপতি ব্যবসায়ি প্রায় ১৫০ জনকে হাসিনা সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচিত করে আনলেন সংসদে। ফলে সংসদ আজ ব্যবসায়ি-আনাড়িদের আসরে পরিণত হলো। দলে ত্যাগি, নীতিবান এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষীত নেতাদের সরকার ও দলের বাইরে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। বিএনপিতেও একই অবস্থা। দলে গণতন্ত্রহীনতা ও পরিবারতন্ত্রের বিপক্ষে কথা বলেছিলেন বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়া। ফল হিসেবে তার মৃত্যুর পরও বেগম জিয়ার সহানুভূতি পর্যন্ত পাননি মান্নান ভূইয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকালীন মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। পরিবারতন্ত্রের গ্যাড়াকলে পড়ে অপমানজনক পরিস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়েছিল। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতা-নেত্রী কিংবা মন্ত্রি-এমপিদের আত্মীয়-স্বজনদের দুর্নীতি ও উৎপাত বেড়ে যায়। আজকের বাংলাদেশে এমপিতন্ত্র (সংসদ সদস্যতন্ত্র)) রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নয়া উপসর্গ। এমপিদের বাইরে বিশেষ করে সরকারদলীয় এমপিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্ব-স্ব এলাকার স্থানীয়, জেলা বা উপজেলা প্রশাসন। এমপিরা তাদের নিজের, পরিবারের স্বার্থে বিভিন্ন গ্রুপ মেইনটেইন করছেন। আর এটা করতে গিয়ে বাড়ছে চাদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। ছাত্রলীগ-যুবলীগের হুমকি ও নির্যাতনে প্রশাসন কার্যত: অবরুদ্ধ ও অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করছে। এমপিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র বাংলাদেশের রাজনীতিকে অক্টোপাসের ন্যায় গ্রাস করে ফেলেছে। রাজনৈতিক এই অসুস্থ্য অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আগে মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মানসের আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে জাতিকে শিক্ষিত করা চাই। আর একটি শিক্ষিত জাতির ভেতর থেকেই গণজাগরণ জনবিপ্লব সৃষ্টি হতে পারে। তবে দেশের বিদ্যমান পরিবারতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক রাজনীতির অবসান ছাড়া দেশের মানুষের গণমুক্তি সম্ভব নয়। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আর লাশের রাজনীতি: ১৯৭১ সাল থেকে ২০১০ স্বাধীনতার ৩৯ বছর চলছে। একটা দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক উন্নয়নে এই সময় কম নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির তেমন কোন উন্নয়ন ঘটেনি আজও। এখনও রাজপথে প্রকাশে মানুষ হত্যা, অস্ত্রবাজি, রাজনৈতিক হানাহানির ঘটনা দেখতে হচ্ছে দেশবাসিকে। জনপ্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে জনগণের কাজে না লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। যে দল যখন ক্ষমতায় সেই দল তখন প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে থাকে। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দলীয়করণমুক্ত গণমুখী প্রশাসন গড়ে উঠতে পারে না। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রদান এবং অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের ঘটনায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সহিংস, সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আবার সরকারি দল আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ করছে। গত ৮ অক্টোবর, ২০১০ নাটোরের বড়াইগ্রামে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর বিএনপির সভাপতি সানাউল্যাহ নূর বাবুকে সরকার দলীয় ক্যাডাররা প্রকাশে কুপিয়ে হত্যা করে। বিএনপি অভিযোগ করে, আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রি ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, বড়াইগ্রামের হত্যাকান্ড বিএনপির দলীয় কোন্দলের ফল। চলতি ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সমাবেশস্থলে ট্রেনে কাটা পড়ে ৭ জন নিহত হন। বেগম জিয়া অভিযোগ করেন, ‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে সেলিম ও দেলোয়ারকে হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে ‘স্বৈরাচারী’ শেখ হাসিনার সরকার ট্রেন তুলে দিয়ে জনসভায় আগত নেতাকর্মীদের হত্যা করে এক ঘৃণ্য নজির স্থাপন করল।’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরদিন ১২ অক্টোবর পাল্টা অভিযোগ করেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে মিটিংয়ের আগে খালেদা জিয়া যমুনা রিসোর্টে লাশের অপেক্ষায় বসে ছিলেন। ইস্যু তৈরির জন্য তার এখন লাশের প্রয়োজন। এজন্য তিনি খুন-খারাবি শুরু করেছেন।’ নাটোরে বিএনপি নেতা বাবু হত্যাকান্ডের ব্যাপারেও তিনি দলীয় ক্যাডারদের পক্ষে সাফাই গান। তিনি বলেন, নাটোরে নিজেরা খুন করে বিএনপি আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি অসহিষ্ণু অগণতান্ত্রিক আচরণ, সংঘাত, সংঘর্ষ, মারামারি, অবিশ্বাস, সন্দেহ, পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। প্রতিফল হিসেবে জনগণ দুর্ভোগ, অশান্তি, অনিরাপত্তার মধ্যে দিন যাপন করতে বাধ্য হন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাঙালি জাতির দীর্ঘ আকাঙ্খিত স্বপ্ন। যারা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির সাথে জড়িত। এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে বড় দলগুলি ঐক্যমতে আসতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় নানান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামি। এই দলটির শীর্ষ নেতাদের ইতোমধ্যে গ্রেফতার করে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান মহাজোট সরকার। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামের অন্যতম রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল বিএনপির অভিযোগ, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চায়। ইতিহাস নিয়ে টানাটানি: বিশ্বের কোন দেশেই তার নিজ দেশের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তি দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একেবারেই ভিন্ন অবস্থানে। স্বাধীনতার ৩৯ বছর অতিক্রান্ত হতে চললো। কিন্তু এখনও দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল বিপরীতমুখী অস্থানে। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে আজও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। বিএনপি মনে করে, স্বাধীনতার ঘোষক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলে, জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠকারি মাত্র। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে জাতি পুরোপুরি দুইভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপ দাবি করে, জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক। অন্য গ্রুপ বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতা ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মানবাধিকার লংঘণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানবাধিকার লংঘণের সংস্কৃতি অতি পুরনো। সরকারি দলে থাকলে যে ঘটনা মানবাধিকার লংঘণের মধ্যে পড়ে না একই দল যখন বিরোধী দলে থাকে সেই একই ঘঁনাকে তারা মানবাধিকারের চরম লংঘণ বলে চিৎকার করে থাকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক্ষেতে বিন্দুমাত্র তফাৎ করা যায় না। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা শুরু হয়েছিল। বিচার বহির্ভূত এসব হত্যাকান্ডকে মানবাধিকারের চরম লংঘণ বলে আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। আওয়ামী লীগ বলেছিল তারা ক্ষমতায় এলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করবে। অথচ সেই আওয়ামী লীগই এখন বলছে ঠিক উল্টো কথা যেটা সরকারে থেকে বলেছিল বিএনপি-জামায়াত। বিএনপি-জামায়াতের আমলেও রাজপথে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও জনগণের ওপর নির্যাতন করেছে। এখন আওয়ামী লীগের আমলেও সেই অবস্থার কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। মানবাধিকার লংঘণের ঘটনাগুলি ঠিক আগের মতোই ঘটে চলেছে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ উদ্বিঘœ ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের আমলে এখনও ঘটছে সংবাদপত্র-গণমাধ্যম দমন-পীড়ন এবং সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখন নিশ্চুপ। আর বিরোধী দল বিএনপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ সোচ্চার। কারণ একটাই তারা এখন বিরোধী দলে। বিরোধী দলে থাকলে যে কোন কারণে হোক না সে কারণ ব্যক্তি বা দলস্বার্থে সরকারের বিরোধিতা করা চাই চাই-ই। এটা বিএনপি আওয়ামী লীগ উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে নিতে পারেনি বিএনপি। আওয়ামী লীগ একই পথে হাটছে এখন। দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি করবে বলে ক্ষমতায় আসে দলগুলি। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পরই তারা ভুলে যায় তাদের অঙ্গিকার-প্রতিশ্রুতি। ভয়-ভীতি ও শংকামুক্ত হয়ে প্রশাসনকে কাজ করতে দেয়া হয় না। উপরন্তু প্রশাসনই সরকারদলীয় ক্যাডারদের হামলা-তান্ডবে আতংকিত-অসহায়। আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে উঠে না দলবাজির কারণে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র ভাবা যায় না। গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের সমালোচনা কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘণের ঘটনাসমূহের সমালোচনা করলেই গণমাধ্যমের ওপর নেমে আসে চরম আঘাত। সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের বাইরে আসতে পারে না বড় রাজনৈতিক দলগুলি। দেশের সর্বস্তরে চলছে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাদাবাজি, অপব্যবস্থা, অপশাসন। বিএনপির আমলেও মানুষ একই সমস্যার মোকাবেলা করেছেন প্রতি মুহুর্তে। দীর্ঘকালের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন দেশের সাংবিধানিক সুশাসনের সবগুলো ভিত ধ্বংস করে ফেলেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পান রাজনৈতিক বিবেচনায়। এটা বিএনপির আমলেও ঘটেছে। আওয়ামী লীগের আমলেও জেষ্ঠ্যতা লংঘণ করে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় লোক ািহসেবে পরিচিত বিচারপতিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা লোভ সংবরণ করতে পারেন না। ক্ষমতা আর টাকার নেশায় বুদ হয়ে থাকা রাজনীতিকদের পক্ষে জনকল্যাণ ভাবার সময় নেই। জনগণকে দেয়ার মানসিকতা নেই তাদের। রাজনীতিকরা ব্যক্তি, পরিবার ও দলকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলবো না। কিন্তু যেসমস্ত রাজনৈতিক দল জনগণের কল্যাণ করতে জনগণকে কিছু দিতে চায় তারা জনগণের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ বোধহয় অশিক্ষা, সুশাসনের অভাব আর দারিদ্রতা। বাঙালি সংস্কৃতি ঃ বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশ। বাঙালি মূলতঃ একটি শংকর জাতি। যুগে যুগে বাঙালিকে শাসন ও শোষণ করেছে বিভিন্ন দেশ ও জাতি। আর এরমধ্য দিয়েই বাঙালি একটি মিশ্র জাতিতে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি হলো মানুষের দৈনন্দির জীবন-যাপন প্রণালী। মানুষ সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরে বিছানায় শুতে যাওয়া অব্দি যা কিছু করে তাই তার সংস্কৃতি। জীবন-যাপন প্রণালী, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-আচরণ, বিশ্বাস, চিত্তবিনোদনের মাধ্যম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিই একটা জাতির আসল পরিচয় বহন করে থাকে। প্রতিটি সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা বা শ্রেণী থাকে। তেমনি বাঙালি সংস্কৃতিরও আছে তিনটি ধারা। এগুলি হলো আদিবাসি সংস্কৃতির ধারা, শহর বা নগর সংস্কৃতির ধারা এবং পল্লী বা গ্রাম সংস্কৃতির ধারা। বাংলাদেশ মূলতঃ একটি গ্রাম প্রধান দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে কৃষির উপর ভিত্তি করে। নগর সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও বিকশিত হচ্ছে। বাঙালির ঐতিহ্যপূর্ণ যে সংস্কৃতি তা গ্রাম সংস্কৃতিতেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। গ্রামের মানুষ পরিপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ মানুষ বংশ পরম্পরায় পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা লাভ করে পোশাক-পরিচ্ছদ, উৎপাদন, খাদ্যদ্রব্য, বিনোদন, যানবাহন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সম্পর্কে। নগর সংস্কৃতিতে ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে বেশি। তবে প্রযুক্তি বিপ্লবের ঢেউয়ে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও বিদেশি সংস্কৃতির কিছুটা ছোয়া লেগেছে। রুপ ও প্রকৃতির বিচারে বাংালি সংস্কৃতিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এগুলি হলো বস্তুগত, মানসগত, প্রদর্শনমূলক এবং অনুষ্ঠানমূলক। বাংলার লোকসাহিত্য অতি পুরনো বা প্রাচীন। বিশ্বের প্রায় সবক’টি ধারার লোকসাহিত্যের উপাদান বাংলা ভাষায় বিদ্যমান। বাঙালি গ্রামীণ সংস্কৃতি ঐক্য ও সাম্যের পরিচয় বহন করে। আর এতেই নিহিত বাঙালির জাতিগত পরিচয়। বাংলাদেশে চারটি ধর্মাবলম্বির বসবাস। এরমধ্যে মুসলিম ধর্মাবলম্বি জনগোষ্ঠী প্রায় ৯০ ভাগ। অবশিষ্টদের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বি এবং এক শতাংশ খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ ও আদিবাসি জনগোষ্ঠী। বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল তবে রিজিট নয়। সম্প্রীতি, সৌহাদ্যের মধ্য দিয়ে হিন্দু, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। কিন্তু মাঝে-মধ্যে এই সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ারও নজির আছে। বিবাহ-পরিবার ও সমাজ-ব্যবস্থা : বাঙালি সমাজ মূলত: একটি পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা। পুরুষই হলেন পরিবারের কর্তা বা প্রধান। পরিবার স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের নিয়ে গঠিত। পুত্র সন্তান বিবাহের পরও পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস করেন। কিন্তু কন্যা সন্তান বিবাহের পর স্বামীর বাড়িতে চলে যায়। যৌথ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনি একত্রে বসবাস করে। বিয়ে-সাদির পাত্র-পাত্রী সাধারণত পরিবারের পিতা-মাতার পছন্দানুযায়ী নির্বাচন করা হয়। পাত্রের বয়স পাত্রীর চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে সমাজ-সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের ধারায় ছেলে-মেয়েরা এখন অনেকেই তাদের জীবনসঙ্গী নিজেরাই বেছে নেয়। আবার হিন্দুদের বেলায় পাত্র-পাত্রী নির্বাচন তুলনামূলক জটিল। বাঙালি হিন্দু সমাজে বর্ণ-গোত্র প্রথা বিদ্যমান। একই জাতের পাত্র-পাত্রী ছাড়া সাধারণত বিবাহ সম্পন্ন হয় না। বাঙালি সমাজে যৌতুক বা পণ প্রথা বিদ্যমান। কনেপক্ষ বরপক্ষকে মোটা অংকের অর্থ, সম্পদ দিয়ে থাকে। অবশ্য এই অর্থ প্রদান স্চ্ছোয় হয় না মূলত: বরপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী এই অর্থ প্রদান করে থাকে কনেপক্ষ। আইনত এমন যৌতুক দন্ডনীয় অপরাধ হলেও এর প্রচলন এখনও আছে বাঙালি সমাজে। মুসলিম বাঙালি সমাজে বহু বিবাহের প্রচলন আছে। শরিয়া আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষ চারটি বিবাহ পর্যন্ত করতে পারে। আবার আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও প্রচলন আছে বাল্যবিবাহের। কিন্তু সামাজিক বন্ধন বিবাহ ছাড়া কোন নারী বা পুরুষ একত্রে বসবাস করতে পারে না। ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে একজন পুরুষ স্ত্রীর লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। তবে সবসময় এই আইন মানা হয় না। বাঙালি নারীরা সবসময় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। বিশেষ করে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সন্ধ্যার পর নারীরা বাড়ির বাইরে বের হন না। নারীরা বাড়ির গৃহস্থালি ও রান্না-বান্নার সকল কাজ ছাড়াও সন্তান লালন পালন করে থাকেন। পুরুষরা হাল-কৃষি বা চাকরি করে সংসারের উপার্জন করে। তবে নারীরাও এখন চাকরি-বাকরি করে অর্থ উপার্জন করছে। বাঙালি সমাজে বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলিম সমাজে বিয়ে বা বিবাহের প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি। এগুলি হলো প্রথমত: বরপক্ষ বা ছেলেপক্ষ বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করবে, দ্বিতীয়ত: বিবাহ মূলত: কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হবে এবং তৃতীয়ত: পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন বা বর-কনের পরিচিতজনের বিবাহের আয়োজন করবে। মুসলিম ও হিন্দু বিবাহের মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। মুসলমান বিবাহের বেলায় বর বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কনেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়। যা মোহরানা হিসেবে পরিচিতি। এই মোহরানার টাকার অংক কাবিননামায় উল্লেখ খাকে। এই অর্থ দুইভাবে পরিশোধ করা হয়। বিবাহের দিনে নগদ পরিশোধকৃত অর্থ হিসেবে ধরা হয় বরের পক্ষ থেকে কনেকে দেয়া উপহার স্বর্ণালংকারের মূল্যকে। অবশিষ্ট মোহরানার অর্থ পরবর্তীতে অথবা স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলে স্বামী তা পরিশোধ করে। তবে হিন্দু বিবাহে এমন রীতি নেই। মুসলিম সমাজে ঘরজামাই প্রচলন আছে। এক্ষেত্রে বিবাহের পর বর বা পুরুষটি কনের বাড়িতে এসে বসবাস করতে থাকে। হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের কোন আইনগত সুযোগ নেই। তবে মুসলিমদের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন চালু আছে তালাকের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স্ক যে কেউ বিবাহ বন্ধ আবদ্ধ হতে পারে। বাঙালি খাবার: বাঙালির প্রধান খাবার মাছ ও ভাত। প্রবাদ আছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সাদা ভাতের সাথে গরুর মাংশ, মুরগির মাংশ, ছাগলের মাংশ, মুরগি ও হাসের ডিম, বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি, আলু, বেগুন, ফুল কপি, বাধা কপি, মূলা, বিভিন্ন প্রকারের ডাল, নানা প্রজাতির মাছ তরকারি বানিয়ে খান বাঙালি। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া, কদু, লাউও তরকারির তালিকায় আছে। তরকারিতে অনেক প্রকারের মশলা এবং খুব বেশি ঝাল ব্যবহার করা হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সকালে নাস্তা হিসেবে পানি দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া হয় কাচা মরিচ, পিয়াজ ও সরিষাল তেল মাখিয়ে। তবে এই পান্তা খাওয়ার প্রচলন এখন বিলপ্তির পথে। সকালের নাস্তায় গমের আটার রুটি খাওয়া হয় সবজি ভাজি, গুড় বা ডিম ভাজি। শহর সংস্কৃতিতে সকালের নাস্তা হিসেবে পরোটা খাওয়া হয়। পরোটা বা রুটির সাথে কখনও কখনও মিষ্টি খান বাঙালি। বাঙালি দু’বেলা ভাত খান। বিকেলের নাস্তায় নাড়–-মুড়ি, বিভিন্ন ধরণের বিস্কুট থাকে। চিড়া দই বা পাকা আম দিয়ে খাওয়ার প্রচলন বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন ধরণের স্বুস্বাদু পিঠা বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। পিঠা খুবই উপাদেয় একটি খাবার। অধিকাংশ পিঠাই মিষ্টি জাতীয়। তবে টক ও ঝাল জাতীয় পিঠাও বানানো হয়। প্রায় সারা বছরজুড়েই পিঠা বানায় বাঙালি নারীরা। তবে শীতকালের পিঠাই সবচেয়ে বেশি স্বুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। দুধচিতই, ভাপা, কুশলী, পাটিসাপটা, পাকান, চুটকি, গোকুল, মুঠি, নকশি, তেজপাতা, ঝুরি, পাতা, বিবিয়ানা, ফুলঝুরি, আন্দশা, ছিট পিঠা উল্লেখ্য। বাঙালি ফলমূলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আম, কাঠাল, লিচু, কলা, আনারস, পেপে, তরমুজ, বরই, জলপাই, নারিকেল, জাম প্রভৃতি। মিষ্টান্ন জাতীয় খাবারের মধ্যে রসগোল্লা ও চমচম জনপ্রিয়। বর্তমানে নগর সংস্কৃতিতে কেক, পেষ্ট্রি ও বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত ফাস্টফুড জাতীয় নানান খাবারের প্রচলন বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও পিঠা তার স্বকীয়তা জনপ্রিয়তা হারায়নি আজও। বাংলাদেশে মদ বা এলকোহল জাতীয় পানীয় প্রকাশ্যে পান করা নিষেধ। তবে পাচ তারকা বিশিষ্ট হোটেলগুলিতে এজাতীয় পানীয় সহজলভ্য। এছাড়া রেজিষ্ট্রাড কিছু মদের দোকান আছে। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে লোক প্রযুক্তিতে তৈরী নেশাজাতীয় কিছু পানীয় পাওয়া যায়। গ্রামের স্বল্প সংখ্যক মানুষ এগুলি পান করে। আবার আদিবাসি সংস্কৃতিতে লোকপ্রযুক্তিতে তৈরী মদ পানের প্রচলন আছে। আদিবাসি সম্প্রদায়ের লোকেদের প্রায় সকলেই এসব পান করে। পোশাক-পরিচ্ছদ: বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক হচ্ছে শাড়ী, ব্লাউজ, পেটিকোট। তরুণীরা সালোয়ার-কামিজ পরিধান করে। ১০-১২ বছর পর্যন্ত বালিকারা ফ্রক বা স্কাট পরে। শহরে ও গ্রামে প্রায় একই ধরণেরই পোশাক পরে। পুরুষদের পোশাক হচ্ছে লুঙ্গি। তবে বিশেষ অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবি, পায়জামা পরে থাকে পুরুষরা। তবে শার্ট, প্যান্ট এর প্রচলনও ঘটেছে বাংলায়। গ্রামের সাধারণ মানুষরা লুঙ্গি ও ফতুয়া পরিধান করে। এছাড়া আদিবাসি নারী-পুরুষরা পরিধান করে তাদের নিজস্ব তৈরী করা পোশাক। আচার-আচরণ: বাঙালি অতিথিপরায়ণ জাতি। বাড়িতে অতিথি আগমণকে শুভ বা কল্যাণকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই অতিথিকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করে বাঙালি জনগোষ্ঠী। বাঙালিরা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলে-মিশে থাকতে পছন্দ করে। শিল্প ও সাহিত্য : সাহিত্য সংস্কৃতির একটি জীবন্ত ধারা। এরমধ্য দিয়ে একটি জাতির আত্মার স্পন্দন শোনা যায়। চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। বাংলা সাহিত্য হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত দিক হলো লোকসাহিত্য। তাই রবীন্দ্রনাথ লোকসাহিত্যকে ‘জনপদের হৃদয় কলরব’ বলে আথ্যায়িত করেন। লোকসাহিত্যকে প্রধানত লোকসঙ্গীত, গীতিকা, লোককাহিনী, লোকনাট্য, ছড়া, মন্ত্র, ধাধা ও প্রবাদ এই ৮টি শাখায় ভাগ করা হয়। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ওই সময়ের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে চন্ডি দাশ, দৌলত কাজী এবং আলাওল উল্লেখযোগ্য। ঊনিশ শতকের শেষে বাংলা আধুনিক সাহিত্যের সূচনা হয়। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকরা হলেন বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, আবদুল ওদুদ। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। বাংলার লোকসাহিত্যও সমৃদ্ধ। ময়মনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দিতে বাংলা কাব্য ও গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। নাটক-যাত্রা এবং চলচ্চিত্র: বাংলাদেশের নাটক পুরনো, ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয়। বাংলাদেশের শহরে রয়েছে বহু থিয়েটার বা নাট্যগ্রুপ। এই গ্রুপগুলি স্থানীয়ভাবে লেখা নাটক এবং ইউরোপিয়ান বিখ্যাত লেখকদের লেখা নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ করছে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে নাট্যপাড়ায়। পাবলিক লাইব্রেরী, জাদুঘর মিলনায়তন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকার বাইরেও অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলিতেও নিয়মিত আয়োজন করা হয় নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাঙালি সংস্কৃতির এক বড় অংশ জৃুড়েই আছে যাত্রাপালা। পৌরাণিক প্রেম কাহিনী, , ট্রাজেডি, ঐতিহাসিক কিংবা বীরত্বপূর্ণ কাহিনী অবলম্বনে যাত্রাপালার উপস্থাপন করা হয়। সাধারণত যাত্রাপালা গ্রামাঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়। এটি গ্রাম সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম। তবে দিনে দিনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা। যাত্রাপালা ছাড়াও গ্রামে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাহিনী পুতুল নাচের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য লোকনাট্য গম্ভীরা, আলকাফ প্রভৃতি। ঢাকাকেন্দ্রীক চলচ্চিত্র শিল্প হতে প্রতিবছর ৮০ থেকে ১০০টি বাংলা চলচ্ছিত্র তৈরী করা হয়। সঙ্গীত : মার্গ সঙ্গীত ও দেশি সঙ্গীত নামে বহু প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে সঙ্গীতের দু’টি ধারা বহমান। বর্তমানে প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বা রাগ সঙ্গীত মার্গসঙ্গীতের অন্তর্গত। মার্গসঙ্গীতে কথার আবেদন গৌন। কিন্তু রাগ রুপায়ন ও সুরের ভূমিকাই প্রধান। কথা ও সুর উভয়কেই গুরুত্ব দেয় দেশিসঙ্গীত। যা একরৈখিক পথে বিকশিত ও বিবর্তিত হয়েছে। বাংলা সঙ্গীত মূলত: দেশিসঙ্গীতের আদর্শেই বিকশিত ও রচিত। বাংলা সঙ্গীত জগতে সুর ও বাণীমাধুর্যে পঞ্চ গীতিকবির গান আজও সমৃদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠ। এই পঞ্চ গীতিকবি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বীজেন্দ্রনাথ লাল, রজনীকান্ত, কাজী নজরল ইসলাম এবং অতুল প্রসাদ। সুরের আবেদন সার্বজনীন হলেন বাংলা গানে কথার গুরুত্বও অপরিসীম। উল্লিখিত পঞ্চকবির গানে কথা ও সুরের সার্থক সম্মিলন ঘটেছে। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই সুরকার ও গীতিকার। তাই রবীন্দ্রনাথের কথা ও গানে পেয়েছে এক সুসংহত রুপ। এই পঞ্চ গীতিকার বাংলা সঙ্গীতে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত ও পাশ্চাত্যসঙ্গীতের মিলন ঘটিয়েছেন। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি…’ এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত। বিশশতকের শেষ দিকে বাংলায় ব্যান্ডসঙ্গীতও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত বৈচিত্র্যময়। জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাউল গান, ভাওয়াইয়া গান, জারি-সারি গান, মুর্শিদী গান, কবি গান, গম্ভীরা-আলকাফের গান। বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বা আদিবাসিদের রয়েছে নিজস্ব সঙ্গীত। যার কথা ও সুর সম্পূর্ণ আদিবাসিদের রচিত। বাদ্যযন্ত্র: বাংলাদেশের বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। এগুলি কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। গায়ক ও বাদকের তাল ও ছন্দ ঠিক রাখাই কাজ। হারমোনিয়াম, তবলা-বায়া, পাখোয়াজ, খোল, খব্ধনী, স্ট্রাইকার, সনতুর, সুরমন্ডল, বো, ভায়লিন, রবার, সেতার, তানপুরা, সরোদ, বাঁশি, সানাই, বীণা, সুরবাহার, এসরাজ, সারেঙ্গী, সুরশৃঙ্গার, একতারা, দোতারা, খোল, করতাল , মন্দিরা উল্লেখযোগ্য। কতকগুলি পেশায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাপুড়েরা তুবড়ি বাজিয়ে সাপের খেলা এবং বাজিকররা ডুগডুগি বাজিয়ে বানর-ভল্লুকের খেলা দেখায়। জুড়ি ও খঞ্জনি বাজিয়ে বৈষ্ণব-বৈরাগী ও ভিখারিরা ভিক্ষা করে। বাতদ্যযন্ত্রকে কেন্দ্র করে বাংলায় নানা আচার-সংস্কার প্রচলিত। শঙ্খ ও সানাই মাঙ্গলিক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বিবেচিত। আবার রাতে বাশি বাজানো অমঙ্গলজনক বলে মনে করা হয়। নৃত্য-চারু ও কারুশিল্প : নৃত্যশিল্পের নানাধরণ বাংলাদেশে প্রচলিত। এরমধ্যে রয়েছে আদিবাসি নৃত্য, লোকজ নৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ইত্যাদি। চারু ও কারু দু’টি ভিন্ন প্রকৃতির শিল্প। রং ও তুলির সাহায্যে নির্মিত চিত্রকলা ও সুই-সুতার সাহায্যে নির্মিত সূচিশিল্প চারুশিল্পের অন্তর্গত। আর মৃৎশিল্প-দারুশিল্প, বস্ত্রশিল্প, বাশ-বেতশোলা-শঙ্খ-দন্ত নির্মিত বিবিধ হস্তশিল্প এবং সোনা-রুপা-পিতল নির্মিত ধাতবশিল্প কারুশিল্পের অন্তর্ভূক্ত। আবার কতকগুলি লোকশিল্প আছে-যেমন সখের হাড়ি, মনসাঘট, লক্ষ্মীর সরা এগুলি চারু ও কারুশিল্পের নিদর্শন বহন করে। নকশিকাথা তার সৌন্দয্য দিয়ে সমাদৃত হয়েছে বহির্বিশ্বেও। স্যার চার্লস ডয়লী প্রথম শিল্পী হিসেবে প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রাহকের দৃষ্টি নিয়ে ঢাকাকে প্রত্যক্ষ করেন। একজন অপেশাদার শিল্পী ডয়লীর স্কেচ বই ‘ঢাকার প্রাচীনকালের নিদর্শন’ এ বিভিন্ন কেল্লা, মসজিদ, তোরণ এবং উনবিংশ শতাব্দির ঢাকার পরিবেশ ও দালান-কোঠার চিত্রিত বিবরণ দেখা যায়। উৎসব : বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। বারো মাসে তেরো পার্বনের দেশ বলা হয় বাংলাদেশকে। বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় এবং সর্বজনীন উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ। শহর, নগর, গ্রাম-বাংলা সবখানেই এই উৎসব উদযাপিত হয়। বের করা হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। নতুন জীবন আর কল্যাণের প্রতিক হলো নববর্ষ। বাংলা সনের প্রথম দিন এটি। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যাপার। শহর, গ্রাম-গঞ্জ নতুন বছরের প্রারম্ভে পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য নতুন-পুরনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতো। যা আজও পালিত হয়। নববর্ষকে আনন্দমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত: লোকজ মেলা। দেশের সর্বত্রই এই বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাস, নাগরদোলা, লোকনাট্য, লোকসঙ্গীতের। শস্যভিত্তিক লোক উৎসব হলো নবান্ন উৎসব। বাংলাদেশে প্রধানত হিন্দু সমাজ নবান্ন উৎসব পালন করতো। হেমন্তে আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ কিংবা মাঘ মাসে গৃহস্থরা নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে। নবান্ন উৎসব উপলক্ষে গ্রাম-বাংলায় বাড়ি বাড়ি আঙিনায় নানা রংয়ের আলপনা আকা হতো। পিঠা-পায়েসের আয়োজন ও আত্মীয়-স্বজনের আগমনে পল্লী গায়ের প্রতিটি গৃহে দেখা দিতো এক মধুময় পরিস্থিতি। কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করে নয়া পোশাক-পরিচ্ছদ কিনতো। এছাড়া ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে আছে মুসলমানদের মুহররম, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা। হিন্দুদের শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন জন্মাষ্টমী, সহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে প্রধান উৎসব হলো দূর্গোৎসব। বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা আর খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো যীশুখৃষ্টের জন্মদিন। যা বড়দিন হিসেবে পালিত হয়। কারাম উৎসব ছাড়াও আদিবাসিদের জীবনের পরতে পরতে আছে নানান উৎসব। খেলাধূলা: পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফুটবল ও ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হলো কাবাডি। এছাড়া বাংলাদেশের লোকক্রীড়ার মধ্যে রয়েছে নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উড়ানো, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, লাঠিখেলা, বলিখেলা, কানামাছি উল্লেখযোগ্য। একনজরে বাংলাদেশ : ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামের এই দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন প্রতি ৫ বছর পর পর। রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল ক্ষমতার অধিকারি হলেন প্রধানমন্ত্রি। জনসংখ্যা ১৬১.৩ মিলিয়ন। সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রি অন্যান্য মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি ও উপমন্ত্রিদের নির্বাচন করেন এবং তাদের চূড়ান্ত নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ সচিবালয় হলো রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি ও উপমন্ত্রিরা বিভিন্ন মন্ত্রনালয় পরিচালনা করেন। আর প্রতিটি মন্ত্রনালয়ের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন একজন করে স্থায়ি সচিব। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রির জনছ আলাদা সচিবালয় আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পচলতি আইন-কানুনের অনেকটা বৃটিশ আদলের। তবে উল্টরাধিকার ও বিবাহ সংস্ক্রান্ত আইনগুলি ধর্মভিত্তিক। ২০০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে প্রশান থেকে আলাদা করে। কিন্তু বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে এখনও কাজ করতে পারে না। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সরকার পদ্ধতি প্রচলিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি প্রধান শাখা হলো সংসদ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ। দেশে ৬টি সিটি করপোরেশন ও ২২৩টি পৌরসভায় সরাসরি জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়ে থাকে। জাতীয় সংসদের মোট ৩০০টি আসন। এছাড়া ৩০টি আছে সংরক্ষিত নারী আসন। ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন্রে মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারের নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদ শেষে নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপর প্রধান উপদেস্টা নিযুক্ত হন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। প্রধান উপদেস্টা অন্য আরও ১০ জন উপদেস্টাকে নিয়োগ করে গঠন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকারের দায়িত্ব হলো পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। বাংলাদেশের নাগরিকরা দ্বৈ নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণকারিরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশের নাগরিক ইসরায়েল ছাড়া পৃথিবীর যে কোন দেশ ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করতে পারেন বাংলাদেশ পাসপোর্ট। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে একটি। বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৯৯ জন মানুষের বসবাস। বাংলাদেশের ৬টি প্রশাসনিক বিভাগ যথাক্রমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং রাজশাহী। বর্তমানে মোট ৫০৭টি উপজেলা আছে। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশে ৮৭ হাজারের অধিক গ্রাম রয়েছে। দেশটির উত্তর, পূর্ব আর পশ্চিম সীমান্তজুড়ে আছে প্রধান প্রতিবেশি ভারত। বাংলাদেশের শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি (বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফল কাঠাল, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পাখি দোয়েল। আবার জাতীয় মাছ হলো ইলিশ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জাতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। বেসরকারি টেলিভিশন আছে বেশ কয়েকটি। দুই শতাধিক দৈনিক সংবাদপত্র, প্রায় ২০০০ সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও অন্যান্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করেন মোট জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশ মানুষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত: কৃষিনির্ভর। দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষিজীবী। উৎপাদিত প্রধান কৃষি ফসলের মধ্যে আছে ধান, পাট ও চা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশই আসে রফতানিকৃত তৈরী পোশাক খাত থেকে। দেশের তৈরী পোশাক শিল্পে বা গার্মেন্টস খাতে ৩০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। যাদের ৯০ ভাগই নারী শ্রমিক। বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি বড় অংশ পাওয়া যায় প্রবাসী বাংলাদেশী বা বাঙালিদের পাঠানো অর্থ থেকে। দেশের ৯৮ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা এবং বাংলা দেশের রাষ্ট্র ভাষা বা অফিসিয়াল ভাষা। বাংলাদেশের মুদ্রা হলো টাকা যা বিডিটি হিসেবে পরিচিত। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২২ শতাংশ বাস করেন শহরে। অবশিষ্ট ৭৮ শতাংশ মানুষের বসবাস গ্রামে। বাংলাদেশে মাথাপিছু গড় আয় ১,৪৭০.৩৮ মার্কিন ডলার। দক্ষণি এশিয়ার র্দীঘতম দুটি নদী – গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্র যা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদশেরে অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও মায়ানমারের মাঝখানে। পশ্চিমে রয়েছে ভারতরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য। পূবে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম। তবে পূবে ভারত ছাড়াও মায়ানমারের (র্বামা) সাথে সীমান্ত রয়েছে। দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৬ কিলোমিটার যার ৯৪ শতাংশ (৯৪%) ভারতরে সাথে এবং বাকি ৬ শতাংশ মায়ানমারের। বাংলাদশেরে তটরেখার দর্ঘ্যৈ ৫৮০ কিলোমটিার। বাংলাদশেরে দক্ষিণ-র্পূবাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর র্দীঘতম সমূদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম। বাংলাদশেরে উচ্চতম স্থান দশেরে দক্ষিণ-র্পূবাঞ্চলে র্পাবত্য চট্টগ্রাম এর মোডক র্পবত, যার উচ্চতা ১,০৫২ মটিার (৩,৪৫১ ফুট)। বঙ্গোপসাগর উপকূলে অনিকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এখানে আছে রয়েল, বেঙ্গল বাঘ, চিত্রল হরিণসহ নানান প্রাণীর বাস। বছরে বৃষ্টপিাতরে মাত্রা ১৫০০-২৫০০মি.মি./৬০-১০০ইঞ্চি; র্পূব সীমান্তে এই মাত্রা ৩৭৫০মি.মি./১৫০ইঞ্চির বেশি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে র্ককটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষীয় প্রভাব দেখা যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাচীনতম যাতায়াত পথ হিসেবে গণ্য করা হয় জলপথ বা নদীপথকে। বাংলাদেশের প্রধান দুইটি সমুদ্র বন্দর চট্রগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হয়। স্থল যোগাযোগের মধ্যে সড়কপথ উল্লেখযোগ্য। দেশের জাতীয় মহাসড়ক পথ হলো ৩৪৭৮ কিলোমিটার। এছাড়া ৪২২২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক, ১৩২৪৮ কিলোমিটার পথ আছে ফিডার বা জেলা রোড হিসেবে। রেলপথ আছে ২৮৩৫ কিলোমিটার। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গমনাগমনের জন্য বাংলাদেশ বিমানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি বিমান বন্দর আছে। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে ষড় (৬) ঋতুর দেশ বলা হয়। এই ছয় ঋতু হলো গ্রীস্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয় এখানে। মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীস্মকাল ধরা হয়। জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষাকাল। এসময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বন্যা, জলোচ্ছাস, টর্ণেডো, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে লন্ডভন্ড করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। উপসংহার: পরিশেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন প্রত্যাশা করি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাস-দুর্নীতির কালো ছায়ামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই আমরা। যেখানে থাকবে না কোন ধর্মীয় উগ্রতা, সংঘাত-অস্থিরতা, বৈষম্য-দারিদ্র্যতা। আমাদের স্বপ্ন একটি সাম্য, সম্প্রীতির সোনার বাংলাদেশ। যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। তথ্য সহায়িকা: দৈনিক সংবাদ, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ত্রৈমাসিক পত্রিকা বিচয়ন, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। লেখক: জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, সম্পাদক ইউরো বাংলা ( http://www.eurobangla.org/), (https://penakash.wordpress.com/)।

জাতিকে অসভ্যতা ও বর্বরতার হাত থেকে মুক্তি দিন


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ লিমন শুধু একজন নয়। এমন হাজারো লিমন পঙ্গু হয়েছে। যাদের অধিকাংশই নিরীহ এবং নিরপরাধ। শত শত নিহত হয়েছেন। যাদেরকে বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক কেউই বাদ যায়নি ওদের নির্যাতনের হাত থেকে। সাধারণ মানুষ যাদের কণ্ঠস্বর চার দেয়ালের বাইরে পৌছোয় না তারাতো হরহামেশাই বর্বরতার শিকার হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষ্ঠুরতায়। বেচারা লিমন কিভাবে যে জীবনে বেচে গেলো? যার কারণে কালো বাহিনী আজ গোটা জাতির প্রশ্নের সম্মুখিন।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেই রাষ্ট্রীয় এই বর্বর বাহিনী কত অমানবিকতা দেখিয়েছে। তার একটা ছোট পরিসংখ্যান তুলে দেয়া যায়। এখানে জামায়াত সমর্থক এক মেজর বর্তমানে লে.কর্ণেল রাশীদুজ্জামান রাশীদ বহু বিচার বহির্ভূত হত্যা-নির্যাতনের সাথে জড়িত। এই স্বাধীনতাবিরোধী রাষ্ট্রীয় কর্মচারিটি তার অপকর্মের শাস্তিতো পায়নি, বরং পুরস্কৃত হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে।
মেজর রাশীদ জল্লাদ বাহিনীর রাজশাহী অঞ্চলের তথাকথিত ক্রাইম প্রিভেনশন শাখার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তথাকথিত ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে এই বর্বর মানুষটি শুধু হত্যা-নির্যাতনের সাথেই নয়, আর্থিকভাবেও লাভবান হয়েছেন। অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও শোনা যায় তার বিরুদ্ধে। রাজশাহীর কোটিপতি ব্যবসায়ী আলী জাফর বাবু যিনি ল্যাংড়া বাবু বলেই সমধিক পরিচিত।
অভিযোগ আছে, সেই ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারে হত্যার নাটকের সফল প্রযোজনার পুরস্কার হিসেবে মেজর রাশীদ নাকি কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আলী জাফরের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। এই ভাগ অবশ্য মেজর রাশীদের ইমিডিয়েট বস এক লে. কর্ণেলও পেয়েছেন। রাজশাহীতেই আরও অনেক ঘটনার নায়ক এই মেজর রাশীদ। বাগমারার ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবীব বাবুকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করেন এই মেজরই। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক আবদুর রাজ্জাককে হত্যার ঘটনায়ও জড়িত তিনি। স্ত্রী ও শিশুকন্যার সম্মুখে বেনজিরকে গুলি করে পঙ্গু করার নায়কও এই রাশীদই।
সাংবাদিক নির্যাতনে পটু এই মেজর রাজশাহীর পরিচিত এক সাংবাদিক আনু মোস্তফাকে রাজশাহী ছাড়া করার জন্য দায়ী। আনু মোস্তফা দৈনিক প্রথম আলোর রাজশাহীস্থ নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন। বর্তমানে দৈনিক কালের কণ্ঠে কর্মরত। মেজর রাশীদ এবং তার বস সাহসী সাংবাদিক আনু মোস্তফাকে সাইজ করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জনাব আনুকে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে হয়। মেজর রাশীদই সাংবাদিক শফিককে নির্যাতন করেছিলেন। আমার কথাতো মিডিয়া জগতের প্রায় সকলেরই জানা।
অথচ মানবাধিকার লংঘনকারি মেজর রাশীদ এখনো চাকরিতে বহাল। তাকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইভরিকোষ্ট পাঠানো হয়েছিল। জাতিসংঘ একজন মানবাধিকারলংঘনকারি আর্মি অফিসারকে কী করে শান্তিরক্ষা মিশনে অন্তর্ভূক্ত করলো তা একটা বড় প্রশ্ন বটে!
মানবাধিকার লংঘনকারি এই অভিজাত বাহিনীর নির্যাতনের আরও অনেক কাহিনী আছে। চট্রগ্রামে আরেক সাংবাদিক আহমেদ নূর বর্বর নির্যাতেনর শিকার হন। ইংরেজী দৈনিক নিজউ এজ এর রিপোর্টার এফ এম মাসুমের ওপর বর্বরতার কথা গোটা দেশের মানুষই জানেন। কিন্তু কই এই ভন্ড, বিষধর সর্পবাহিনীরতো কোন কিছুই হয়না। একের এক অসহায় লিমনদের পা কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। জনগণের দেয়া ট্যাক্সের টাকায় যাদের পোশাক, খাদ্য, পানি, বেতন হয় সেই রাষ্ট্রীয় বাহিনী জনগণের ওপর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যেন অন্ধ হয়ে গেছেন। তাঁরা যেন এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন এর কিছুই অবলোকন করেন না! হয় তারা সরাসির বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও নির্যাতনকে সমর্থন করেন নতুবা তারা জেগে থেকেই ঘুমানোর ভান করছেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনতো একজন বাচাল মানুষ হিসেবেই দেশের মানুষের কাছে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়ে গেছেন। জংলি শাসন, অসভ্য রাষ্ট্র আর বর্বর রাষ্ট্র নায়ক ছাড়া আইন রক্ষাকারিদের হাতে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা-নির্যাতন চলতে পারে-এমনটা বিশ্বাস করা যায় না, যদি না বাংলাদেশকে দেখতাম।
দুর্দান্ত ক্ষমতাশালী যে বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় বিশ্বের মোড়ল আমেরিকা কিংবা ব্রিটেন। সেই বাহিনীর কী আর কাউকে পরোয়া করার কিছু আছে? হাসিনা-খালেদা অথবা চারদলীয় জোট সরকার কিংবা বর্তমান ব্রুট মেজরিটির মহাজোট সরকার কার সে ক্ষমতা আছে এদের রোখে? সরকারি হিসাবেই প্রায় হোজার মানুষ নিহত এই বাহিনীর হাতে। অন্ধ মিডিয়া দু’একজন লিমনের পক্ষে দাঁড়িয়ে জাতিকে বোঝাতে চায়, তারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিপক্ষে! হিসাবটা বেশ গোলমেলে। মিডিয়া তার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে কি? আর দাঁড়াবেই বা কী করে? মিডিয়ারতো কত রং, কত রকমের ব্যবসা। এই রং ও ব্যবসাকে ছাপিয়ে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোটাতো আর অত সহজ নয়। যেন ভাবটা এমন, সন্ত্রাসী কিংবা অভিযুক্ত খুনি হলেই যে কাউকে খুন করা জায়েজ বা বৈধ?
আইন-কানুন, কোট-কাছারি, সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন এসবের অস্তিত্ব থেকেই বা লাভ কী? ওরাতো আর ভালো মানুষকে মারছে না! সন্ত্রাসী, খুনি মরলেই যেন দেশ সন্ত্রাস-দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত হয়ে যাবে? মানুষকে ধর আর হত্যা কর! জ্ঞানপাপী, তথাকথিত শিক্ষিত (মুর্খ) সমাজের জন্যই রাষ্ট্রীয় এই শয়তান বাহিনী যা খুশি তাই করার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করেই ক্ষান্ত নয় তারা। হত্যা-নির্যাতনের পর মিডিয়ায় মিথ্যা গল্প-কল্পকাহিনী পাঠিয়ে দেয়। আর সেই সাজানো কাহিনী মিডিয়ায় তোতাপাখির ন্যায় ছাপিয়ে বা প্রচার করে তারা দেশবাসির তথ্য জানার অধিকার সুরক্ষা করে চলেছে।
প্রিয় পাঠক, ব্লগার, সুহৃদ, শুভানুধ্যায়ী, সমালোচক আমিও একটি অভিযোগ পাঠালাম জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর। নিচে অভিযোগটির সারমর্ম আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি।
“মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এখনই RAB কে ভেঙ্গে দিন। নির্যাতনকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও বিচার করুন।” RAB’র বর্বর নির্যাতনের শিকার একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এই দাবি জানিয়েছি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে লেখা ওই আবেদনে বলা হয়, বর্তমানে আমি মানবাধিকার বিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক। অষ্ট্রিয়া থেকে গত ১৩ মে, ২০১১ রেজিষ্ট্রি ডাকযোগে একটি লিখিত অভিযোগটি পাঠানো হয়। অভিযোগের কপি পাঠিয়েছি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, আইন মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, তথ্য মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মহাসচিবকে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সকল সংবাদমাধ্যমে ই-মেইল করেছি।
অভিযোগে আমি জানিয়েছি, দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ’র রিপোর্টার এবং রেডিও জার্মানের ফ্রি-ল্যান্স সংবাদদাতা হিসেবে আমি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেছি। বিশেষত: বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, সংখ্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, জঙ্গিবাদ, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হই। আর এর পেছনের অন্যতম পরিকল্পনাকারি ছিলেন রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব ও রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমি। আমার উপর নির্যানকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছি অভিযোগে। অভিযোগে লিখেছি যে, আমাকে নির্যাতনের জন্য প্রধানত: RAB-৫ রাজশাহীর তৎকালিন কমান্ডার লে. কর্ণেল শামসুজ্জামান খান, মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ, মেজর হুমায়ূন কবির সরাসরি দায়ি। অভিযোগে আমি আরও জানিয়েছি, ২০০৭ সালের অক্টোবরে RAB আমার ভাড়া বাসায় আক্রমণ করে। এসময় আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী এবং বাড়িওয়ালার সম্মুখে আমাকে নির্যাতন করা হয়। এরপর আমাকে RAB-৫ এর সদর দপ্তরের নির্যাতন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার চোখ কালো কাপড়ের টুপিতে ঢেকে দিয়ে আমাকে উপরে লটকিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমনকি আমাকে ইলেকট্রিক শকও দেয়া হয়েছিল। এই বর্বর নির্যাতনের ঘটনার যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছি লিখিত অভিযোগে। নির্যাতন ও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারি সকলের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবি করে আমি অভিযোগে বলেছি যে, “আমি বিচার চাই”।

আমি আশাবাদী মানুষ। আমার প্রত্যাশা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আমার অভিযোগের একটি যথাযথ তদন্তের উদ্যোগ নেবেন। আমি আরও প্রত্যাশা করি তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে তুলে ধরবেন। এলিটফোর্স নামধারী রাষ্ট্রীয় খুনি-নির্যাতক বাহিনীকে যত দ্রুত সম্ভব ভেঙ্গে দিয়ে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশ ও মিযিয়ার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় সরকার উদ্যোগী হবে বলে আমাদের আকাঙ্খা। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ছাড়া কোন রাষ্ট্রকে সভ্য বা গণতান্ত্রিক বলা যায় না। আমার, আমাদের সোনার বাংলাকে আমরা বর্বরতা-অসভ্যতার অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখতে চাই। সকলপ্রকারের অসভ্যতা-বর্বরতা-দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অবিচারের হাত থেকে জাতি মুক্তি চায়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন। প্লিজ কথা নয় কাজে প্রমাণ করুন যে, মানবাধিকার কমিশন ঠুটো জগন্নাথ নয়। মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলির তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে হাজির করুন। তারপরো যদি রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র পরিচালকদের ঘুম না ভাঙে তখন জনগণই তার সমুচিত জবাব দেবেন। আর এটাও যদি আপনি করতে ব্যর্থ হন তাহলে উনাদেরকে বলুন, আমাকেও যেন তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। যেটা ওরা করতে চেয়েছিল ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে।

বিচারপতি কে এম সোবহান ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বিচারপতি কাজী মেহবুব সোবহান। যিনি কে এম সোবহান নামে সমধিক পরিচিত। স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধ ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের এক মহান নেতা। সংগ্রামী, আপোষহীন, স্বাধীন এক মানুষ ছিলেন তিনি। সৎ, সাহসী মহান মানবতাবাদী নেতার নাম বিচারপতি কে এম সোবহান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি। সততা ও নীতির কাছে তিনি ছিলেন সর্বদাই বিজয়ী। তাইতো দুর্নীতির শিরোমণি, স্বৈরাচার এরশাদ আমলে তিনি বিচারপতির পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। কিন্তু সমাজে, রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে তিনি পিছপা হননি কখনও।
২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই মানুষটি চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস বা বিআরসিটিতে আমি তখন চিকিৎসারত। র‌্যাবের নির্যাতনের ফলে আমার যে শারীরীরক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছিল তা পুলিয়ে নিতেই এই চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। বিআরসিটি কার্যালয়ে সন্ধ্যায় খবর এলো বিচারপতি সেবহান মারা গেছেন। প্রত্যেহ বিকেলে তিনি রমনা পার্কে হাঁটতে যেতেন। সেদিনও তিনি প্রতিদিনের ন্যায় রমনা পার্কে গিয়েছিলেন হাঁটতে। হঠাৎ তিনি অসুস্থ্যবোধ করেন। এরপরই তাঁকে বারডেম হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সংবাদ সম্পাদক বজলুর রহমান, কলামিষ্ট মোনায়েম সরকার, প্রাক্তন স্পীকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দীন সরকারসহ আরও অনেকে বিকেলে হ্টাতেন একইসাথে। হা্টাঁ শেষে সবাই মিলে জমাতেন মজার আড্ডা। প্রিয় বজলুর রহমানও আজ আর বেঁচে নেই। শ্রদ্ধেয় বজলু ভাইও বিচারপতি সেবহানের পথ ধরে দু’মাস পর ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চলে গেছেন অনন্তকালের জন্য। হয়ত রমনা পার্কের সেই হাঁটা আর আড্ডাও জমে না আগের মতো। বিচারপতি সোবহানের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী ৩১ ডিসেম্বর। বিচারপতি সোবহানের মৃত্যুর তিনটি বছর চলে গেছে। তিনি জীবনভর জনগণের পক্ষে, দেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ এক অবদান রেখেছেন। স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও যুদ্ধাপরাধীবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম সাহসী সংগঠক ছিলেন তিনি।
বিচারপতি সোবহানের মৃত্যুর পর সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এই মহৎপ্রাণ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫২ সালে ব্যারিস্টার এট ‘ল’ ডিগ্রিপ্র্প্তা হন লিনকনস ইন থেকে। ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন ১৯৫৬ সালে। একই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন ১৯৭১ সালে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নিরাপদ কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহযোগি জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনায় তৎকালিন বিচারপতি সায়েম-জেনারেল জিয়া সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই কমিশনের প্রধান করা হয়েছিল বিচারপতি সোবহানকে। যদিও সেই সরকার তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দেয়নি। কারণ সরকার ভালো করেই জানতো যে, বিচারপতি সোনবহানের মতো দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ এবং সৎ মানুষ ঠিকই চার নেতা খুনের আসল রহস্য বের করে আনতেন। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কলামিষ্ট মোনায়েম সরকার লিখেছেন, সরকার জানত, তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দিলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে। বিচারপতি কে এম সোবহান এমন ধাতুতে গড়া যে, সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুও তাকে সত্যের পথ থেকে একচুল নড়াতে পারবে না। কাজেই আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন বাতিল না করে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য এর কার্যকারিতা বাধাগ্রন্ত করে রাখা হয়েছিল। জনাব সোবহান এমন একটি দায়িত্ব পেয়েও সরকারের অসহযোগিতায় কাজ করতে না পারায় সারাজীবন মনোবেদনায় ভুগেছেন এবং এই কষ্টের কথা বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী মহলে বারবার প্রকাশ করে গেছেন।“
বিচারপতি সোবহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা সিটি ল কলেজের খন্ডকালিন শিক্ষক ছিলেন ১৯৫৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত। তিনি সিটি ল কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন একজন। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাগ ও বার্লিনে ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। ১৯৮২ সালের ১ জুনে তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের দ্বিতীয় জনক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জরুরিভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনেন। এবং একই বছরের ১৫ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯০ সালে ইতালীর রোমে স্থায়ী পিপলস ট্রাইব্যুনালের অন্যতম সদস্য হিসেবে ভূপাল গ্যাস মামলার রায় প্রদান করেন। একই ট্রাইব্যুনালের সদস্য হয়ে তিনি বিচার করেন ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে এজেন্ট এবং গ্যাস প্রয়োগের।
বিশিষ্ট মানবাধিকার নেতা অজয় রায় লিখেছেন, ৃবঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতাসীন হন তখন অনেকেই এরশাদ আমলে তাঁর (বিচারপতি সোবহান) ওপর যে অবিচার করা হয়েছে তা তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো এবং তাঁকে পুনর্বহাল করা। কিন্তু বিচারপতি সোবহান সুহৃদদের সেই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।“ বিচারপতি সোবহান জীবনে কোন অন্যায়ের কাছে মাথানত কিংবা ব্যক্তিগত কোন আবদার নিয়ে কারও কাছে নিজের আত্মমর্যাদা বিলীন হতে দেননি। শ্রদ্ধেয় অজয় রায়ের লেখা তারই প্রমাণ দেয়। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ভুটান রিফিউজি সংকট তদন্তে গঠিত আন্তর্জাতিক পিপলস তদন্ত কমিশনের সদস্য, কম্বোডিয়া ও নেপালের সংবিধান প্রণয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিটিসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য ছিলেন। শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষক ছিলেন বিচারপতি সোবহান। কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অধীনে আইন ও বিচার বিষয়ক কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৫-১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। তিনি ১৯৯৭ সালে ভিয়েতনাম আইন ও বিচার বিভাগের স্বল্পকালীন পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন প্রকল্পের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেছিলেন। বিচারপতি সোবহান ছিলেন মৌলবাদবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনী পরিষদের সহ-সভাপতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণ আদালতের অন্যতম একজন বিচারক ছিলেন তিনি। সেই আদালত গোলাম আজমসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারের আদেশ দিয়েছিল। এজন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বরেণ্য ব্যক্তিদের নামে তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছিল। বিচারপতি সোবহান ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস বা বিআইএইচআর’র চেয়ারম্যান। বিআইএইচআরের আঞ্চলিক সমন্বয়কারি হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০১ সালে। ২০০১ এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট গোটা দেশজুড়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সারাদেশের ন্যায় রাজশাহীতেও সেই হত্যা-নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে থাকে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দলীয় ক্যডারদের হাতে কিশোরী মহিমা গণধর্ষণের কারণে আত্মহননের ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমি তখন দৈনিক সংবাদ এর রাজশাহীস্থ স্টাফ রিপোর্টার। ঢাকা থেকে সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা ছুটে গিয়েছিলেন মহিমাদের বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়ায়। সেই দলের অন্যতম ছিলেন বিচারপতি সোবহান। বিচারপতি কে এম সোবহান শুধু একজন মানবতাবাদী মানুষই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী। যেখানেই নারী নির্যাতন সেখানেই বিচারপতি সোবহান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মশাল জ্বালিয়ে দিতেন। সিরাগঞ্জের পূর্ণিমা শীল, রাজশাহীর মহিমা কিংবা শিউলী, রজুফার ওপর নির্যাতনকারি দুর্বৃত্তদের বিপক্ষে তার দীপ্ত ও দৃঢ় অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে। বাংলাদেশের নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রধান সংগঠন মহিলা পরিষদের আন্দোলন-সংগ্রামের সাহসী সংগ্রামী যোদ্ধা ছিলেন বিচারপতি সোবহান। বয়স তাঁকে কখনও দাবায়ে রাখতে পারেনি। বয়সে স্পষ্ট প্রৌঢ়ত্বের ছাপ পড়েছিল বটে কিন্তু মন-মানসিকতায় তিনি ছিলেন চির সবুজ, চির নবীন। আর এই তারণ্যকে আমৃত্যু কাজে লাগিয়েছেন নারী নির্যাতনবিরোধী কর্মকান্ডে সোচ্চার থেকে। রোদ, বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে পথ থেকে পথে ছুটি বেড়িয়েছেন নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন রাখার লক্ষ্যে।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহীর পুঠিয়ায় কিশোরী মহিমাকে গণধর্ষণ করে তৎকালীন জোট সরকারের ক্যাডারবাহিনী। এতে লজ্জা-অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মহিমা। এরপর ঢাকা থেকে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ছুটে যায় রাজশাহীর প্রত্যন্ত অঞ্চল পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামে। সেই কমিটির অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি সোবহান। রাজশাহীর পুঠিয়াতেই শিউলী নামে আরেক কিশোরী ছাত্রদল ক্যডার হারুনের লালসার শিকার হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস (বিআইএইচআর) এর চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি কে এম সোবহান শিউলিদের বাড়িতে ছুটে যান তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন জানান। এটি ২০০২র অক্টোবর মাসের ঘটনা। একই দিনে শিউলিদের বাড়ি থেকে রাজশাহী শহরে ফেরার পথে সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম আকাশ বিএনপি সমর্থকদের হামলার শিকার হন। সাংবাদিক আকাশই বিচারপতি সোবহান ও বিআইএইচআরের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব আকরাম হোসেন চৌধুরীকে শিউলিদের বাড়িতে যেতে সহায়তা করেছিলেন।
বিচারপতি সোবহান ছোট-বড় সকলকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন। মানবাধিকারের জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করায় অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতন করায় বিআইএইচআরের পক্ষ থেকে আমাকে সংর্বধনা প্রদান করা হয় ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বর। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিচারপতি কে এম সোবহান। সেদিন তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানবাধিকার ব্যক্তিত্বদের ইংরেজীতে বলেছিলেন যে, “অ্যারেস্ট অর বিটেন বাই দ্য RAB মিনস ইনড অব দ্য হোল থিংকস ইনড অব হোল লাইফ। বিকজ দে আর নট সাবজেক্ট টু দ্য ল ইন দ্য কান্ট্রি উই হোপ হি উনল কনটিনিউ টু ওয়ার্কৃ। এরপর তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, ‘আপনি একা নন, আমরা আছি আপনার সাথে। আপনার কোন ভয় নাই।’ এর ঠিক এক মাস পরেই বিচারপতি সোবহান এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। মাত্র তিন বছরেই আমরা কি বিচারপতি কে এম সোবহানকে ভুলতে বসেছি?
মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিচারপতি সোবহান দেশের মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য লড়ে গেছেন। বাংলাদেশে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে। বিচারপতি সোবহানের জীবনদর্শন আমাদের প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় আদর্শ। বিচারপতি সোবহানের আত্মার প্রতি শান্তি প্রত্যাশা এবং শ্রদ্ধা জানাই।

র‍্যাবকে এখনই ভেঙ্গে দেয়া জরুরি!

“মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এখনই RAB কে ভেঙ্গে দিন। নির্যাতনকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও বিচার করুন।” RAB’র বর্বর নির্যাতনের শিকার সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম আকাশ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এই দাবি জানিয়েছেন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে লেখা এক আবেদনে তিনি এ দাবি জানান।
মানবাধিকার বিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক আকাশ অষ্ট্রিয়া থেকে গত ১৩ মে, ২০১১ রেজিষ্ট্রি ডাকযোগে একটি লিখিত অভিযোগ পাঠান মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর। অভিযোগের কপি পাঠানো হয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, আইন মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, তথ্য মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মহাসচিবকে।
অভিযোগে বলা হয়, দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ’র রিপোর্টার এবং রেডিও জার্মানের ফ্রি-ল্যান্স সংবাদদাতা হিসেবে আকাশ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন। বিশেষত: বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, সংখ্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, জঙ্গিবাদ, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আকাশ রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হন। আর এর পেছনের অন্যতম পরিকল্পনাকারি ছিলেন রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকাশ তার উপর নির্যানকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগে। অভিযোগে বলা হয়, আকাশকে নির্যাতনের জন্য প্রধানত: RAB-৫ রাজশাহীর তৎকালিন কমান্ডার লে. কর্ণেল শামসুজ্জামান খান, মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ, মেজর হুমায়ূন কবির সরাসরি দায়ি। অভিযোগে আকাশ আরও জানান, ২০০৭ সালের অক্টোবরে RAB তার ভাড়া বাসায় আক্রমণ করে। এসময় তার শিশুপুত্র, স্ত্রী এবং বাড়িওয়ালার সম্মুখে তাকে নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে RAB-৫ এর সদর দপ্তরের নির্যাতন সেলে নিয়ে যায়। তার চোখ কালো কাপড়ের টুপিতে ঢেকে দিয়ে তাকে উপরে লটকিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমনকি তাকে ইলেকট্রিক শকও দেয়া হয়েছিল।


এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত দাবি করা হয় লিখিত অভিযোগে। নির্যাতন ও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারি সকলের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবি করে আকাশ অভিযোগে বলেন, “আমি বিচার চাই”।

কোনটা বেশি শক্তিশালী-দেশপ্রেম নাকি সুবিধাবাদ?


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ “দেশপ্রেমিকরা কখনও দেশ ছেড়ে পালায়না। দেশে থেকেই তারা অন্যায়-অবিচার আর অনিয়মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।” এক গণমাধ্যম সহকর্মী আমাকে উদ্দেশ্য করে এই মন্তব্য করেছিলেন। সেটা বছরখানেক আগেকার কথা। সুবিধাবাদী রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শক্ত ষড়যন্ত্র। তাদের বিরামহীন অত্যাচার আর নির্যাতনের যাতাকলে আমি পর্যুদস্ত। গাঢ় অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছিলাম। এমন অবস্থায় আমার জীবন রক্ষায় বিদেশী মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থা-সংগঠনগুলি সোচ্চার। দু:সময়ের ওই দিনগুলিতে আমার ওই বন্ধুকে কিন্তু কাছে পাইনি কখনও। চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের কাছে শেষ পর্যন্ত আমি টিকতে পারিনি। আমাকে মাতৃভূমি ছাড়তেই হলো। যা আমি কখনও ভাবিনি, কল্পনাতেও ছিল না। চলে এলাম জার্মানিতে। সুন্দর ইউরোপে পরিবার নিয়ে নিরাপদেই আছি। কেবলমাত্র শারীরীক ও আর্থিক নিরাপত্তা কি মাতৃভূমির সুখ এনে দিতে পারে? যাহোক, আজকের প্রসঙ্গ সেটা নয়। জীবনের স্বপ্ন এবং লক্ষ্য অনুযায়ী নিরন্ন, নীরিহ, অসহায়, বঞ্চিত, শোষিত-নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। ব্যক্তিগতভাবে দাবি করিনা যে, আমি একজন দেশপ্রেমিক। তবে দেশপ্রেমিকরা যে বাংলাদেশে অসহায়। এটা হলফ করেই বলা যায়।

বাংলাদেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ নিদারুণ কষ্ট, সংগ্রাম চালিয়ে উপরতলার মানুষদের অন্ন-আহার যোগান দেয়। আর সেই সুবিধাবাদী স্তরের মানুষগুলির ষড়যন্ত্রের জালে জড়িয়ে দেশপ্রেমিকরা ক্রমশ: অসহায় থেকে অসহায়তর অবস্থায় গিয়ে ঠেকছেন। অন্যায়-অবিচার আর অনিয়ম ঠেকানোর উদ্যোগ নিতে গিয়ে সংগ্রামী মানুষ অসহায়ভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ন্যায় ও ন্যায্যতার পরাজয় ঘটছে অন্যায়-অবিচারের কাছে। তথাকথিত প্রগতিশীল শ্রেণীও সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী শ্রেণীর হাতে নিজেদেরকে জিম্মি করে রাখছে। দেশপ্রেমিকদের রক্ষায় রাষ্ট্র-সমাজ, সুশিল সমাজ কেউই এগিয়ে আসছে না। “বিচার অবিচারের হাতে বন্দি। ন্যায় আর ন্যায্যতা অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুবিধাবাদীদের হাতে জিম্মি।”

বাংলাদেশের সবকিছুই যেন নষ্ট, ভন্ড, প্রতারক, বেঈমান, সুবিধাবাদী, দালালদের হাতে চলে গেছে। প্রিয় লেখক হুমায়ূন আজাদ অনেক আগেই এসব কথা লিখে গেছেন। জঙ্গি, মোল্লা ও ধর্মব্যবসায়ীদের সশস্ত্র হামলায় এই প্রধাবিরোধী লেখককে জীবন দিতে হয়েছে। কোন বিচার পাননি এই গুণি শিক্ষকের পরিবার। দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহা, শামসুর রহমান কেবল, দীপংকর চক্রবর্ত্তী, গৌতম সাহা, হুমায়ূন কবির বালু হত্যার বিচার হয়নি আজও। জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে র‌্যাব-ডিজিএফআইয়ের নির্যাতনের নির্মম কাহিনী তুলে ধরেছেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আবদুল জলিলসহ অনেকে। সরকার এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত একটি তদন্ত কমিটিও গান করেনি।

ধর্ম ব্যবসায়ী আমিনীর দল অবুঝ ছেলেদের হাতে কোরান তুলে দিয়েছেন মানুষ মারার জিহাদে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য। জঙ্গিগোষ্ঠী আবারও দেশে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে গোয়েন্দাসূত্র রিপোর্ট দিয়েছে। বাংলা ভাই, শায়খ রহমান কিংবা জামায়াত-শিবিরের সমর্থকরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চাকরি পায়। আর সুবিধাবাদী-ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর অবিচারের শিকার মানুষগুলি বিচার পাবার আশায় দিন গুনে। বাংলা ভাইকে সমর্থনকারী এক সাংবাদিক এখন জার্মানির একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সম্পাদক। যিনি সম্প্রতি তার এক আত্মীয় মুক্তিযোদ্ধার কাহিনীর প্রতিবেদন করে প্রগতিশীলদের বাহবা কড়াতে চাইছে।

তথাকথিত এলিটফোর্স র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাব দরিদ্র বাবা-মায়ের কলেজপড়–য়া সন্তান লিমনকে পঙ্গু করে দিল। বিনা কারণে তাকে গুলি করার পর র‌্যাব কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলন করে আনন্দ প্রকাশ করেছে। অমানুষ ওই কর্মকর্তারা বলেছে, ‘ছেলেটি মারা যায়নি তাতেই আমরা খুশি। অতবড় একটা বন্দুকযুদ্ধে যে কেউ মারা যেতে পারতো।’ এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত আট হাজারের অধিক মানুষ মারা গেছে (গুপ্ত হত্যা, অপহরণসহ)। আহত ও পঙ্গু হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। কাপুরুষ বেকুবের দল, গোটা দেশের জন্য এক বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে। অথচ সরকার যেন ঠুঁটো জগন্নাথ। তাদের যেন কিছুই করার নেই এই মানবাধিকার লংঘণকারিদের দমন করার বিষয়ে। হায় আমার সোনার বাংলা!

নারী নির্যাতন, যৌন হয়রাণি বা ইভটিজিং এক সামাজিক সংকট তৈরী করেছে সেখানে। আর্মির মেজর আখতার শিপলু ও তার স্ত্রী নিপার নিষ্ঠুরতার শিকার শিশু হাসিনা এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ১১ বছরের এই শিশুর পিঠে গরম খন্তির ছ্যাকায় দগদগে ঘার সৃষ্টি করেছে। এই বর্বরতা-নৃশংসতা ক্ষমতাধর ওই স্বামী-স্ত্রীর মনে কি এতটুকুও সহানুভূতি জাগায়নি। একই অবস্থা যদি তাদের শিশুর ওপর কেউ ঘটাতো? কোন পশুর পক্ষেও হয়ত এভাবে কাউকে আক্রমণ করা সম্ভব নয়। যেটা করেছে এই দম্পতি নরপশু। কে করবে তাদের বিচার? আমাদের অথর্ব এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছে, ‘ঘটনাটি অমানবিক। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবো।’ সূত্র-দৈনিক আমার দেশ, ১০ এপ্রিল, ২০১১। এতবড় একটা নিষ্ঠুর ঘটনার পর পুলিশেরই উচিত স্বতপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেয়া। কিন্তু সেটাতো আর সম্ভব নয় অবিচারের এই দেশে।

একটা পুরো রাষ্ট্র, সমাজ যখন অবিচারে ভরে যায় তখন সেই রাষ্ট্র বা সমাজে মানুষ কতটুকু নিরাপদ? এই প্রশ্নের কি জবাব দেবেন আমার ওই বিখ্যাত সাংবাদিক বন্ধু, আমি জানি না। একটা হ-য-ব-র-ল সমাজে দেশপ্রেমের তাড়নায় উদ্বুদ্ধ কিছু মানুষ ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করে। এই মানুষগুলি তখন সুবিধাবাদী-নষ্টদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এমনই একটি ঘটনার কাহিনী তুলে ধরতে চাই। ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রিয় মাতৃভূমিতে দেশপ্রেমিক বা সংগ্রামী মানুষেরা দুর্বিষহ অসহায় অবস্থায় আছে। তারই একটি জলন্ত প্রমাণ হতে পারে রাজশাহীর ওই ঘটনা। একটি সংঘবদ্ধ সুবিধাবাদী চক্রের রোষানলে পড়ে কিভাবে একজন দেশপ্রেমিক শিক্ষককে একটি বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে সরে দাড়াতে হলো? আপনাদের সেই গল্প শোনাই এবার।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের সদ্য পদত্যাগী সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক মলয় ভৌমিক। যিনি প্রায় তিন দশক ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত। দীর্ঘ ২২ বছর দেশের প্রগতিশীল বাংলা জাতীয় দৈনিক ‘সংবাদ’ এ সাংবাদিকতা করেছেনে। প্রায় চার দশক যাবত যিনি দেশের নাট্যচর্চা তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। জীবনভর সংগ্রামী এই মানুষটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বহু নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। কিন্তু কখনও অন্যায়-অবিচারের কাছে মাথানত বা আপোষ করেননি। প্রগতিশীল নামধারী শিক্ষক সমাজ, প্রশাসন ও সরকার যখন ক্ষমতাসীন তখন এই মহান শিক্ষককে নষ্টদের কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে হলো। মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে কেন এই আন্দোলন তার নেপথ্যের কথাগুলো সচেতন-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সম্মুখে তুলে ধরা কর্তব্য মনে করি।

মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে শিক্ষক-ছাত্রদের আন্দোলন চলছে। এ বিষয়ে একটি নোট পড়ি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে। যা লিখেছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের একজন তরুণ শিক্ষিকা। এরপর থেকেই অনুসন্ধান করতে থাকি বিষয়টি নিয়ে। যদিও নোটের লেখিকা নিজেই শিক্ষার্থীদের ক্লাশে ফাঁকি দেন নিয়মিত। না, এটা আমার কথা নয়। ফোকলোর বিভাগের দু’একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেই জানতে পারলাম ওই শিক্ষকের অনৈতিক এই কাহিনী। এই শিক্ষিকার অভিযোগ মলয় ভৌমিক নাকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন। স্বাধীনতা মানে নীতিহীনতা নয়। স্বাধীনতা মানে নয় ছাত্র-ছাত্রীদের ফাঁকি দেয়া। এই কথাগুলি বুললে চলবে না ম্যাডাম। যাহোক, মলয় ভৌমিকবিরোধী আন্দোলনের নেপথ্যের কাহিনী তুলে ধরলেই এক বিরাট ষড়যন্ত্র ও সুবিধাবাদী চিত্র ফুটে উঠবে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোটা দেশে জুড়েই এই ষড়যন্ত্র, সুবিধাবাদী, অনৈতিক কর্মকান্ডের জাল।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগ খোলার দাবি দীর্র্ঘদিনের। সাংস্কৃতিক জোট ও প্রগতিমনা শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলশ্রুতিতেই এই বিভাগটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভাগের শিক্ষকদের পারস্পরিক অভিযোগের প্রেক্ষিতে পরপর দু’টি কমিটি গঠন করে কর্তৃপক্ষ। যে কমিটি বিভাগে নানা অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত কর্মকান্ড শনাক্ত করে। বিভাগের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও অনিয়ম দূর করার লক্ষ্যে কমিটি একটি সুপারিশমালা দেয়। সেই সুপারিশে বলা হয়, অন্য বিভাগ থেকে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এনে এই বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা। সুপারিশের আলোকে ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মলয় ভৌমিককে প্রেষণে নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিযোগ দেয় সিন্ডিকেট।

এরই প্রেক্ষিতে মলয় ভৌমিক ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর প্রথমে শিক্ষক হিসেবে এবং ৮ নভেম্বর সবঅপতি হিসেবে যোগ দেন। এই বিভাগে প্রেষণে যোগদানের আগে সরকারের তরফ থেকে তিনি আরও বড় পদ ও পদবীর অফার পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা গস্খহণ করেননি। তবে সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার প্রতি বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে তাঁর। আর সেই কারণেই মলয় ভৌমিক নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের ভেতরকার সমস্যা সমাধানের মানস আকাঙ্খা নিয়েই সেখানে যোগদান করেন।

সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভাগের একাডেমিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম দূর করার ক্ষেত্রে এবং বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন তিনি। বিভাগে শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলছিল। এমনই অবস্থায় আকস্মিকভাবে বিভাগের কতিপয় শিক্ষক তথা দুর্নীতিবাজচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারই অংশ হিসেবে গত ৩১ মার্চ ২০১১ তারিখে বিভাগের অফিস থেকে কর্মচারীদের বের করে দিয়ে ঐ বিভাগে তালা ঝুলিয়ে দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শিক্ষকদের দ্বারা আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ছিল নজিরবিহীন। যা সম্পূর্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিধির পরিপন্থি। হঠাৎ করে শিক্ষকদের এ ক্ষোভের কারণ কি? আইন হাতে তুলে নেবার পর তাঁরা সভাপতির বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করলেন। মলয় ভৌমিক এই বিভাগে যোগদানের কয়েকদিন আগে বিভাগের ছাত্ররা নাট্যকলার শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি বহির্ভূতভাবে পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ এনেছিল। ওই অভিযোগে তারা সভাপতির কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। তখন বিভাগের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও তৎকালীন কলা অনুষদের ডীন প্রফেসর মোঃ শাফী। তিনি একাডেমিক কমিটির সভায় এই ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্যগণ তদন্ত রিপোর্টে ছাত্রদের আইন হাতে তুলে নিয়ে বিভাগে তালা লাগানোর ঘটনাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেন। ওই একই শিক্ষকরা মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগে স্বাক্ষরকারিও বটে। ৩১ মার্চ তদন্ত কমিটির ওই সদস্যগণই আইন হাতে তুলে নিয়ে বিভাগের কক্ষে তালা ঝুলালেন। তারা অবশ্য ছাত্র নন। তদন্ত কমিটির ওই শিক্ষকগণ এখন নিজেদের বিরুদ্ধে কি শাস্তির সুপারিশ করবেন? আমরা এটা দেখার অপেক্ষায় আছি।

খ্যতিমান কলামিষ্ট, নাট্যকার মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলির কোনটাই সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল নয়। আবার অনেকগুলিই স্ববিরোধী এবং সর্বোপরি এসব অভিযোগের ব্যাপারে শিক্ষকগণ কোন প্রকার তদন্ত দাবি করেন নি। হয়ত এটা ভেবে যে, তদন্ত হলে তাদেরই সমস্যা হতে পারে? অর্থাৎ অভিযোগগুলি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রসূত।

এখন বিভাগের অভ্যন্তরীণ কিছু অনিয়ম ও বিধিবহির্ভূত কর্মকান্ডের কেচ্ছা তুলে ধরতে চাই। ২০০৮ সালের এম.এ. (নাট্যকলা) পরীক্ষায় অনিয়মের কথা স্বীকার করে অভিযোগ পত্রে পরীক্ষা কমিটির সভাপতিসহ অন্যান্য সদস্যগণ স্বাক্ষর করেছেন। ওই পরীক্ষা কমিটির সভাপতি ছিলেন কাজী শুসমিন আফসানা। কমিটির সদস্যগণ হলেন ড. শাহরিয়ার হোসেন, ড. ফারুক হোসাইন ও আবদুল হালিম প্রামানিক। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ওই কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরেই। গোপনীয়তার স্বার্থেই পরীক্ষা কমিটির সাথে বিধি অনুযায়ী একাডেমিক কমিটি বা অন্য কোন শিক্ষকের কোন ধরনের সংশ্রব থাকার কথা নয়। সুতরাং এর দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ পরীক্ষা কমিটির। পরীক্ষা কমিটির সদস্যগণ নিজেরা প্রকাশ্যে তাঁদের অনিয়মের দায় স্বীকার করে নিজেদের প্রতি এখন কি শাস্তির বিধান দেবেন? সেটাও দেখার অপেক্ষা করছি আমরা। উল্লেখ্য যে, মলয় ভৌমিক এই পরীক্ষা কমিটির সদস্য নন। এমনকি ওই বর্ষের ছাত্রদের কোন কোর্সও তিনি পড়াননি। বিভাগের নথিপত্র দেখলেই যার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

২০০৯ সালের এম.এ. পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে আনার ক্ষেত্রেও মলয় ভৌমিকের ভূমিকার অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়েছে একজন সদস্যকে পরীক্ষা কমিটির সভার কথা অবহিতই করা হয়নি। অথচ উক্ত সদস্য ছুটি নিয়ে বিধিবহির্ভূতভাবে দীর্ঘ সময় পরে বিভাগে ফিরে আসেন। যা তিনি হর হামেশাই করে থাকেন। শিক্ষার্থদের স্বার্থে ওই একজন শিক্ষকের জন্য বসে থাকার কোন উপায় আছে কি? অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা কমিটির সদস্য চারজন। কোরাম হয় দুই জনে। উক্ত কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন তিনজন সদস্য। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল পরীক্ষা এগিয়ে আনার। গ্রীস্মকালীন ছুটি শুরু হতে দেরী নেই। এ অবস্থায় পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে আনাটাই ছিল যুক্তিযুক্ত। পরীক্ষা কমিটির সভায় উপস্থিত তিনজনের মধ্যে দুইজনই পরীক্ষার তারিখ এগিয়ে আনার পক্ষে মত দেন, যা গণতান্ত্রিক রীতি এবং আইনসিদ্ধ। এছাড়া পরীক্ষার তারিখ চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় একাডেমিক কমিটির সভায়। ৩ এপ্রিল, ২০১১ আহুত একাডেমিক কমিটির সভায় বিষয়টি আলোচ্যসূচীভূক্ত করা হয়েছিল। এখানেও পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ ছিল। কিন্তু এ সুযোগ গ্রহণ না করে উপস্থিত তিনজনের মধ্যে একজন সদস্য এই অভিযোগ কেন তুললেন? এ ব্যপারে পরিস্কার করে আর কিছু বলার দরকার আছে কি?

নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের পাঁচজন শিক্ষকের “অধিকারভূক্ত” শিক্ষাছুটি মলয় ভৌমিকের দ্বারা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এটা বলে নেয়া ভালো যে, শিক্ষাছুটি ঢালাওভাবে কোন শিক্ষকের অধিকার নয়। শিক্ষাছুটি কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্তভাবে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হয়। এই ধাপের প্রথম প্রক্রিয়া শুরু হয় বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির মাধ্যমে। নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের পরিকল্পনা কমিটির সদস্য সংখ্যা সাতজন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মোট শিক্ষকের এক তৃতীয়াংশ। শিক্ষাছুটির বিষয়টি পরিকল্পনা কমিটিতে এসেছিল। এই কমিটির সাতজন সদস্যের মধ্যে পাচজন অর্থ্যাৎ ড. অসিত রায়, ড. শাহরিয়ার হোসেন, ড. মাফরুহা হোসেন, শায়লা তাসমীন ও মুহাম্মদ আলমগীর সভায় উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেখানে তারা শিক্ষাছুটির সুপারিশ করেননি। এটা সভার সিদ্ধান্ত দেখলেই জানা যাবে। উল্টো হাস্যকর ভাবে তারা সভাপতি বা মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। নিজেদের এই মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে নিজেদের জন্য তারা কি শাস্তির বিধান করবেন? সেটাও দেখার ইচ্ছে করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী বিভাগগুলোর সভাপতিগণ অতীতের মত বিভাগের প্রধান নন। কাজেই সভাপতি ইচ্ছে করলেই যা কিছু তাই করতে পারেননা। একজন সভাপতিকে সব কিছুই করতে হয় বিভিন্ন কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। একজন মুর্খও এই বিষয়টি বোঝেন। সুতরাং এখানে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবার কোনই সুযোগ নেই। এছাড়া মলয় ভৌমিকের ব্যক্তিগত আচরণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অন্ত: কারও অজানা নয়। তিনি অমায়িক, ভদ্র এবং মার্জিত স্বভাবের। তবে অন্যায় বা অবিযারের সাথে যিনি কখনও আপোষ করেননা।

মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ এসেছে। তিনি নাকি একাডেমিক কার্যক্রমকে স্থবির করে দিয়ে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে বিভাগকে ব্যস্ত রাখেন। ইতিপূর্বে তিনি (মলয় ভৌমিক) ব্যবস্থাপনা বিভাগের সভাপতি ছিলেন। একাডেমিক কার্যক্রমে গতিশীলতা এনে সেশনজট দূর করায় তিনি কি ভূমিকা রেখেছেন তা ওই বিভাগের সকলেরই জানা। নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের অনেক শিক্ষকই নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না। বিধি সম্মত অথবা বিধিবহির্ভূত নানা ছুটি ভোগ করেন। অনেকের বিরুদ্ধেই ক্লাশ না নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যেও মলয় ভৌমিক যাওয়ার পর বিভাগে একাডেমিক কার্যক্রমে গতি এসেছিল।

বিভাগীয় একাডেমিক কমিটির প্রায় প্রতি সভায় পাঠ দানের অগ্রগতি পর্যালোচনার রেওয়াজ তিনিই প্রথম চালু করেন। যা নথিতে সংরক্ষিত একাডেমিক কমিটির আলোচ্যসূচী দেখলে সহজেই জানা যাবে। অভিযোগের অন্য অংশটি হচ্ছে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম। মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারী শিক্ষকগণ জানেন না যে, আইন অনুযায়ী শিক্ষকদের কর্তব্য কি? শিক্ষকদের ছয়টি কর্তব্য ও দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম হল শিক্ষা- আনুষঙ্গিক কার্যক্রম। এবারে দেখা যাক, মলয় ভৌমিক কি কি আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে বিভাগকে ব্যস্ত রাখতেন। আনুষঙ্গিক কার্যক্রমগুলি হল মহান স্বাধীনতা দিবস, মহান বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, পহেলা বৈশাখ ও বিশ্বনাট্য দিবস উদ্যাপন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এসব দিবস উদযাপন নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের মত একটি বিভাগের কাছ থেকে সকলেই প্রত্যাশা করে।

নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগে মলয় ভৌমিক যাওয়ার আগে এসব গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপনের উদ্দ্যোগ ছিল না। তিনি এই বিভাগে যোগদানের পর একাডেমিক কমিটি ও সংশ্লিষ্ট সাব কমিটির মতামতের প্রেক্ষিতেই এই দিবসগুলি উদযাপনের উদ্দ্যোগ গৃহীত হয়। তবে এটা সত্য যে, তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে স্বাক্ষরকারীদের অনেকেই এ ধরণের উদ্দোগকে ভালো চোখে দেখেননি। যে কারণে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রায় কখনোই অংশ নেননি তারা। এমনকি তাদের কেউ কেউ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিরুর রহমান, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সম্পর্কে কটুক্তিও করে থাকেন। এককথায় এরা স্বাধীনতাবিরোধী।

অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রগতিশীল শিক্ষকদের দল রয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বিভাগের মাত্র দুইজন শিক্ষক ঐ দলের সদস্য ছিলেন। সম্প্রতি আরও কয়েকজন শিক্ষক ভোল পাল্টে এই দলে যোগ দেয়। যা সুবিধাবাদিতার এক চরম নজির। মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি আনুষঙ্গিক কাজ করার অভিযোগ যারা তোলেন তারা বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আন্দোলনে নামিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের ছয়দিন ধরে নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগে কি ধরনের আনুষঙ্গিক কাজে যুক্ত রেখেছিলেন ওই সুবিধাবাদীচক্র? তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

একজন শিক্ষকের প্রথম কাজ হলো শিক্ষাদান করা তিনি সভাপতিই হোন আর উপাচার্যই হোন। প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাইরে শিক্ষক হিসেবে মলয় ভৌমিক কেন কোর্স পড়াবেন- মুর্খের ন্যায় এমন প্রশ্নও তারা তুলেছেন। অথচ তাদের জানা নেই একজন শিক্ষকের কোর্স পড়ানোর চেয়ে প্রশাসনিক কাজ কখনই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সব বিভাগের সভাপতি এমনকি উপাচার্য পর্যন্ত বিভাগের ক্লাশ নিয়ে থাকেন। এই জ্ঞানটুকুও যাদের নেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন কোন যোগ্যতায়? এছাড়া সিলেবাসে কোর্স রাখা না রাখা বিভাগীয় সভাপতির উপর নির্ভর করেনা। বিভাগের একাডেমিক কমিটি ও কমিটি অব কোর্সেস এন্ড স্টাডিজ-এর সভায় সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। মলয় ভৌমিকের বিরুদ্ধে স্বাক্ষরকারী সকল শিক্ষকই ঐ দুটি কমিটির সদস্য। সুতরাং তারা যেভাবে চান বিভাগের সিলেবাস সেভাবেই প্রণীত হয়।

নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের তবলা শিক্ষকের শূণ্যতা বিষয়ে মলয় ভৌমিক উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেননি বলেও অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। উপাচার্য বরাবর প্রদত্ত স্মারকলিপিতে প্রথম স্বাক্ষরকারী ড. অসিত রায়ের নেতত্বে সঙ্গীত শাখার শিক্ষকদের নিয়ে উপাচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মলয় ভৌমিকই। প্রধান স্বাক্ষরকারী ড. অসিত রায় একজন শিক্ষক হয়েও এ ধরনের মিথ্যাচার কি করে করেন তা ভাবতে লজ্জা হয় আমাদের। তাছাড়া এ বিষয়ে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটি থেকেও বারবার তাগাদা দিয়ে তবলা শিক্ষকের শূণ্যতা পূরণের সুপারিশ করা হয়েছে এ বিষয়টিও বিভাগের নথি দেখলেই জানা যাবে।

বিভিন্ন সময়ে এই বিভাগের নানা অনিয়ম নিয়ে অনেক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। সেসব তদন্তে বহু গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেছে। যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো- বিধি বহির্ভূতভাবে টাকা নিয়ে পরীক্ষার ফরম পূরণ করা। পরবর্তীতে তদন্তে এ অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ড. অসিত রায় বিগত জোট সরকারের আমলে ঐ বিভাগে তার স্ত্রী’র চাকুরীর ব্যাপারে নৈতিক স্খলনজনিত অন্যায়ের সাথে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়টিও তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তিনি তার একাডেমিক ডিগ্রীর ক্ষেত্রে এবং ভারত গমনের ক্ষেত্রে তথ্য গোপন করেছেন। কোন ধরণের ছাড়পত্র বা এনওসি নেননি। বিধি বহির্ভূতভাবে ছাত্রদের নিয়ে উপদল পাকিয়ে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করেছেন। বাসায় ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে কিভাবে কাজ করিয়ে নিয়েছেন? এসবেরও বিষদ বর্ণনা আছে তদন্ত রিপোর্টে।

বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ড. মাফরুহা বেগম। ২০০৩ সালে বিভাগের কাজে যোগদান না করে রেজিস্ট্রার দপ্তরে কাজে যোগদান করেছিলেন। এরপর থেকে দেড়মাস বিভাগেই যাননি তিনি। নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের তৎকালীন সভাপতি ড. সফিকুন্নবি সামাদি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রার বরাবর যে পত্র দিয়েছিলেন তা থেকে বিষয়টি জানা যাবে। এছাড়া তিনি বিভাগের নথি থেকে গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক তথ্য সরিয়ে ফেলেছেন। তাও জানা যাবে রেজিস্ট্রার বরাবর প্রদত্ত বিভাগের সভাপতির ওই চিঠি থেকে। বিভাগীয় আরেক শিক্ষক মীর মেহবুব আলম। তিনি চাকরীতে যোগদানের পরপরই এক বছরের শিক্ষাছুটি নেন।বিভাগের কোন কাজ না করে এবং কোন প্রকার গবেষণা না করেই জনগণের করের অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা অপচয় করেছেন। সবই জানা যাবে তার নথি খুঁজলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাংবাদিক (টেলিফোনে) নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানবিরোধী শিক্ষকদের একটি গ্রুপ (উপাচার্য হতে চান এমন একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে) ও ক্ষমতাসীন দলের রাজশাহীর একজন প্রভাবশালী নেতা মলয় ভৌমিকবিরোধী আন্দোলনে সুবিধাবাদী চক্রটিকে ইন্ধন দিয়েছেন।

নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল যে স্বপ্ন নিয়ে তা আজ ভঙ্গ হতে চলেছে। এটা বলা ভালো যে, কেবল সনদপত্র দেওয়ার জন্য এই বিভাগ খোলা হয়নি। এই বিভাগের শিক্ষা দেশ ও সমাজের কাজে লাগবে এমনটাই ছিল প্রত্যাশা। অথচ এই বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষকেরই বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের সাংস্কৃতিক জগতে কোন অবদান নেই। দুর্নীতি ও সুবিধাবাজ চক্রের ষড়যন্ত্রের মুখে মলয় ভৌমিক শেষ পর্যন্ত ৬ এপ্রিল, ২০১১ সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। বিশবিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর তিনি যে পত্র দিয়েছেন তা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।

বিশিষ্ট নাট্যকার মলয় ভৌমিক একজন পরীক্ষীত দেশপ্রেমিক শিক্ষক যিনি মুক্তি সংগ্রামের সময় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। ফখরুদ্দীন-মঈন উ আহমেদের সেনা শাসনামলে মলয় ভৌমিকের ওপর বর্বর নির্যাতনের কাহিনী নিচের লিংকগুলিতে পাবেন।

উপাচার্য বরাবর পদত্যাগপত্রেও মলয় ভৌমিকের দেশপ্রেম ফুটে উঠেছে। মলয় ভৌমিক লিখেছেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আপনি প্রগতিধারার কয়েকজন শিক্ষক নেতৃত্বকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। আমি তাঁদের আহবানে সাড়া দিয়ে বলেছি, আলোচনার আগে বিভাগের তালা খুলে দেয়া ও শিক্ষকদের বিধিবর্হিভূত কর্মকান্ড বন্ধ করা জরুরি, না হলে আইনের শাসন ভূলুষ্ঠিত হবে, এই প্রক্রিয়া রেওয়াজে পরিণত হবে এবং সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি এই বিধিবর্হিভূত কর্মকান্ডের অংশীদার হতে পারিনা। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত ‘সুপারিশ প্রদান কমিটি’ -এর সম্মানিত সদস্যবৃন্দকে আমি একই কথা বলেছি। এখন পর্যন্ত নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের তালা খোলার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বিধি অনুযায়ী এ ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। আমি আশা করি বিলম্বে হলেও কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করবেন। এ অবস্থায় নানা মহলের উস্কানিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে বলে আমি আশংকা করছি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থিতিশীল রাখার বৃহত্তর স্বার্থে নিজের বিবেকের তাড়নায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বিবেকবান সদস্যদের সাথে নিয়ে নিম্নলিখিত শর্তে আমি নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছি এবং সেই সাথে আমার প্রেষণে নিয়োগ বাতিলের অনুরোধ জানাচ্ছি। শর্তসমূহঃ বিধি বর্হিভূতভাবে যেসব শিক্ষক আইন হাতে তুলে নিয়ে বিভাগে তালা লাগিয়ে অচলাব¯হার সৃষ্টি করেছে তাঁদের বিরুদ্ধে এবং নেপথ্যে কোনো ইন্ধনদাতা থেকে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।ইতিপূর্বে সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি বিভাগের শিক্ষক ড. অসিত রায়সহ যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করেছে তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসহ বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ঐ বিভাগে যেসব অনিয়ম হয়েছে তার তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিভাগের সকল দালিলিক নথিপত্রের সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।”
দেশ যে সুবিধাবাদীদের দখলে চলে যাচ্ছে তার আরও একটি বাস্তব উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় র্নিবাচনে র্বতমান ক্ষমতাসীন দল যে নমিনেশন দিয়েছে, সে বিষয়টার দিকে দৃষ্টি আর্কষণ করাতে চাই আপনাদের। তাহলে খুব সহজেই বোঝা যাবে সং, যোগ্য ত্যাগি রাজনীতিবিদদের অনেকেই নমিনেশন পাননি। শোনা যায়, অন্ত:ত ২০০ আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর সকলেই কোন না কোন ব্যবসার সাথে জড়িত। যাদের অনেকেই আবার কখনো আওয়ামী লীগ করেননি। তাদের বড় যোগ্যতা হলো টাকা। এক কোটি টাকা থেকে ৫-১০ কোটি টাকার বিনিময়ে যাদের অনেকেই নমিনেশন কিনে নিয়েছেন শেখ হাসিনার কাছ থেকে। সুবিধাবাদী-তোষামদকারীরাই লাভবান হয়েছেন শেখ হাসিনার কাছ থেকে। কিন্তু ৪০ থেকে ৪৪ বছর ধরে যারা বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে গেছেন তাদের অনেকেই মনোনয়ন পাননি শুধুমাত্র টাকা ও তোষামদের অভাবে। ফলে আজ সংসদ ব্যবসায়ীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে বলে অনেকেই অভিযোগ তূলছেন। যা বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলিতেই প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ দলগতভাবে আজ চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে সরকারের কাছ থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না। চারিদিকেই সুবিধাবাদ, চাটুকারিতা, তোষামদকারীদের ভিড়ে সং, যোগ্য, ত্যাগী ও দেশপ্রেমিকরা আজ গুটিয়ে নিচ্ছেন নিজেদেরকে। অথবা তাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে অন্যায়কারীদের ষড়যন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করতে।
কোন সমাজ বা রাষ্ট্রের সবকিছু যখন নষ্টদের-ভন্ডদের কিংবা অন্যায়কারিদের বা সুবিধাবাদিদের দখলে চলে যায়; বিচার যখন অবিচারের হাতে বন্দি হয়ে পড়ে তখন সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের পতন অবশ্যম্ভাবী। আশাবাদি হয়েও, প্রিয় মাতৃভূমির চেহারায় মনে কোন আশার আলো জাগেনা। সৎ, সংগ্রামী ও দেশপ্রেমিকরা কি করে এই দেশে বসবাস করবেন? আমার ওই অগ্রজ সহকর্মী বন্ধুটির কাছে কি এর উত্তর আছে? আপনারাই বলুন। কোনটা বেশি শক্তিশালী-দেশপ্রেম নাকি সুবিধাবাদ? editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/

লাদেনের বিচার হয়নি, রাজশাহীর মে. লিটন ও মেজর রাশীদেরও হবে না!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ : আমেরিকা নিজেই বললো, “ওটা লাদেনকে ক্যাপ্চার করার অভিযান ছিলনা, তাকে হত্যা করার মিশনই ছিল”। তাকে ধরে তার বিচার করা উচিত ছিল। কারণ বিন লাদেন দেশে দেশে মানুষ মেরে সাম্প্রদায়িকতার বিশবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছিল। টুইন টাওয়ারে গণহত্যা চালিয়েছিল। তার বিচার হলে তার কাছ থেকে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তার সহযোগি সন্ত্রাসীদের সম্পর্কেও বহু তথ্য পাওয়া যেতো। যা থেকে বিশ্ববাসি বঞ্চিত হলো। লাদেনের বিচার হলো না!
কোন হত্যাকান্ডকেই আইন ও নীতিগতভাবে সর্মথন করা যায় না। নিজেকে মানুষ ছাড়া কিছুই ভাবি না, র্ধমীয় কোন প্রাকটিসও করিনা ব্যক্তিগতভাবে। যারা বিন লাদেনের মতো শয়তানকে সর্মথন করেন তারাই কেবল সুবিধাবাদি এবং বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডকে সর্মথন করতে পারেন। আইন, মানবাধিকার, আর্ন্তজাতিক আইন, মানবিকতায় বিশ্বাসীরা সবরকম হত্যাকান্ডকে হত্যাকান্ড হিসেবেই দেখেন। আল কায়দা প্রধান মোস্ট ওয়ানটেড জঙ্গি নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। এই কর্মটি আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন করে কিনা সে বিষয়ে মত দেবেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এটা বলা খুব কঠিন নয় যে, নিরস্ত্র কোন মানুষকে হত্যা কোনমতেই জায়েজ নয়। নীতিগতভাবে কোন হত্যাই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। আমেরিকা থেকে পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে ভারত, লিবিয়া থেকে টিউনিশিয়া কোথাও শান্তি নেই? গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রশ্নের সম্মুখিন। ন্যায়বিচারতো সুদূর পরাহত ব্যাপার।

যাক, আজকের প্রসঙ্গ আমার সেটা নয়। কথা বলতে চাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে। সংবিধানের ঘোষণা অনুযায়ী দেশের মালিক জনগণ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এর অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বৈষম্য-শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বা মূল উদ্দেশ্য। স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধস্ত এই দেশের অর্থনীতিকে সবল করতে এবং রাষ্ট্রের অবকাঠামো বিনির্মাণ ও প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে নানান পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এমনই সময় একাত্তরের পরাজিত শত্রু স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক চক্র দেশী-বিদেশী চক্রান্ত এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানবাধিকার লংঘন ও নির্যাতনের ঘটনা বোধহয় আর কোথাও ঘটেনি। মূলত: এ ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়।

রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত চক্র, মানবাধিকার ল্ঘংনকারি সেনা কর্মকর্তা এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীর যৌথ প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রের শিকার আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। কেন কি কারণে এবং কিভাবে কাদের মাধ্যমে আমি বর্বর নির্যাতন ও চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হলাম তার ওপর কোন গবেষণা করা গেলে হয়ত বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা, মানবাধিকার লংঘন, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, দুর্নীতি, দায়মুক্তি ও দুর্বৃত্তায়নের একটা পরিস্কার চিত্র পাওয়া যেতো। নিশ্চিত ক্রসফায়ারের হাত থেকে বেঁচে আসার এক বাস্তব করুণ কাহিনী নিজের জীবনটাকে কিভাবে বদলে দিলো?

মাতৃভূমির মাটি, পানি, হাওয়া, প্রকৃতি এবং পরিবার-বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এক হতভাগ্য সংবাদকর্মী আমি। ফি বছর দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ লড়াই করেন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, মঙ্গাসহ নানান দুর্যোগের সাথে। দেশের গরীব, নিরন্ন খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য আমার মন কেঁদে ওঠে। প্রিয় পাঠক, দেশবাসি দূর প্রবাস ইউরোপ থেকে বলছি। আজ আপনাদের এক গল্প শোনাতে চাই। না, এ কোন কল্পকাহিনী নয়। আমার জীবনের এক কঠিন বাস্তব সত্য ঘটনা। এক করুণ বেদনাজাগানো এই গল্প আমার জীবনের অন্ধকার সময়। যা আমার প্রতিটি মুহুর্তকে পীড়িত করে। শুধু আমি এই যন্ত্রণার শিকার তা নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান চোখের জল মুছেই মানবাধিকার রক্ষার কাজ সম্পন্ন করছেন! লিমন আজ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। এমন শত শত লিমন আছেন যাদের অনেকেই নিহত আবার অনেকে পঙ্গু জীবন নিয়ে এখনো সংগ্রাম করছেন।

রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড কিংবা নির্যাতন একের পর এক ঘটে চলেছে। এর পেছনে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। নিজস্ব ব্যবসা ও রাজনৈতিক পছন্দ থাকার কারণে মিডিয়া সত্যিকারের ভূমিকা নিয়ে সংগ্রাম করতে পারছেনা। বরং মিডিয়া বন্দুকযুদ্ধের নামে তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যা নির্যাতনের সহযোগি বলা যায়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দেয়া সর্ম্পূণ মিথ্যা স্টেটমেন্ট হুবহু মিডিয়ায় তুলে ধরে মিডিয়া পুরো রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-হত্যাকে বৈধতা দিয়ে আসছে শুরু থেকেই।

দুর্নীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কাছে মানবিকতা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার কিংবা নৈতিকতা খুব একটা বড় বিষয় নয়। ক্ষমতা এবং লুটপাট ও পরিবার-দলতন্ত্রই প্রধান। জনগণ, মানবসেবা, জনগণের অধিকার কোন বিষয় নয়। তাইতো ক্ষমতায় থাকলে একরকম আবার ক্ষমতার বাইরে থাকলে অন্যরতম চেহারা দেখা যায় একইভাবে।

বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্রীয় হত্যা-নির্যাতন সূচনা করেছিল একটি কালো বাহিনী তৈরী করার মধ্য দিয়ে। তারাই এখন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে দারুণ বিচলিত। অন্যপক্ষে আজকের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীগ বিরোধীদলে থাকার সময় বলেছিল এক আর এখন করছে অন্যটা। বিচার বিহর্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের প্রতিজ্ঞা তারা এখন ভুলে গেছে। ফলে জনগণই অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের শিকার হচ্ছেন। সেটা বিএনপি হোক আর আওয়ামী লীগ হোক সবসময়ই মানুষের অধিকার পদদলিত।

২০০৯ সালে দেশ ত্যাগের পর সাংবাদিক বন্ধু এফ এম মাসুম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। নির্যাতনকারিরা বরাবরের মতোই দায়মুক্তি বা ইমপিউনিটি পেয়েছে। কেউ কেউ শুধু দায়মুক্তিই নয় পুরস্কারও পায়। খুলনার পাইকগাছায় আমার আরেক সাংবাদিক বন্ধু এফ এম আবদুর রাজ্জাকের চোখ তুলে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। এরও আগে দরিদ্র কলেজ ছাত্র ঝালকাঠির লিমন হোসেনের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। দেশটিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হিয়াস আহমদ নির্যাতিতত হয়েছেন। এমন শত ঘটনা ঘটছে অহরহ। দেশের আর একটি মানুষও যেন এমন যন্ত্রণাকাতর না হন। সেরকম প্রত্যাশা নিয়েই আমার এই লেখা।

‘লুব্ধক’ একটি বাসার নাম। রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৫৫ নম্বর বাড়ি এটি। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাস। আমি, আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী ফারহানা শারমিন এবং আমাদের চার মাস বয়সী সন্তান (বর্তমানে ৪ বছর) ফিমান ফারনাদ এই তিনজন বসবাস করতাম এই বাসার নিচতলার বাম অংশে। ড. ফখরুদ্দীন-মঈন উ আহমদের নেতৃত্বাধীন জরুরি সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের তুচ্ছ একটি ঘটনার জের ধরে শিক্ষার্থী বনাম সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ বাধে। এই সঘর্ষে শিক্ষার্থীদের পক্ষ নেন সাধারণ জনতা। জরুরি সরকারের নির্যাতনে অতিষ্ঠ দেশের মানুষ রাজপথে নেমে আসতে থাকেন শিক্ষার্থীদের সাথে। এরই জের ধরে সরকার দেশের প্রথম ২৪ ঘন্টার নিজ চ্যানেল সিএসবি নিউজ এর প্রচারণা বন্ধ করে দেয়। সিএসবির রাজশাহী ব্যুরো প্রধান দায়িত্বে ছিলাম। সিএসবি বন্ধ। তাই সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো অফিস (মহানগরীর কাদিরগঞ্জে) খোলা হয় না আগের মত। ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে কাজ করতে গিয়ে পরিবার এবং সহকর্মী কাউকেই তেমন সময় দিতে পারতাম না। সিএসবির স¤প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়ে সময় কাটানোর মত কোন কাজ ছিল না হাতে। তাই প্রেসক্লাবে মাঝে-মধ্যে আড্ডা দিতাম অনেক রাত পর্যন্ত। তবে রাত ১০টার আগেই বাড়িতে আসতে হবে। ফারহানা শারমিন এটা চাইতো। কিন্তু তারপরও অনেক সময় যথাসময়ে বাড়ি ফেরা হতো না। বাসায় ফিরতে একটু দেরী হলে (রাত ১০টা অতিক্রম হলে) মোবাইলে রিং আসতো ফারহানার কাছ থেকে। এরপর ফারহানা আমাদের একমাত্র ফিমানের কণ্ঠ শুনাতো আমাকে। আমিও দ্রুত ফিরতাম বাসায়।

২০০৭ সালের গত ২৩ অক্টোবর রাত ১১টা পর্যন্ত ছিলাম রাজশাহী প্রেসক্লাবে। এরই মধ্যে অন্তত: দুইবার ফোন পেয়েছি ফারহানার। রাত তখন ১১টা কি সাড়ে ১১টা ক্লাব থেকে চলে আসি বাসায়। ফিমান সেদিন ঘুমাতে বেশ বিলম্ব করছিল। তাই তার সাথে আমরা খেলছিলাম দুজনে (স্বামী-স্ত্রী)। তখন পর্যন্ত আমরা রাতের খাওয়া সম্পন্ন করিনি। টিভিটা আপনমনে চলছিল। ফিমানকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছি উভয়ে। এক পর্যায়ে ফিমান ঘুমিয়ে পড়ে। আমরাও খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। রাত অনুমান দেড়টা আকস্মিক বিকট শব্দে বেজে ওঠে আমাদের বাসার কলিংবেল।

বিরামহীনভাবে কলিংবেল বাজতে থাকে। ফলশ্রুতিতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরের দরজা খুলে বেলকুনীতে বেরিয়ে আসি। এসময় আমার কোলেই ছিল আমাদের ফিমান ফারনাদ। বুঝতে পারলাম একদল সশস্ত্র মানুষ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। অপরিচিত লোকদের সবার হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু কেন? পরক্ষণেই মনে হলো আমার নামে যে মামলা রয়েছে তারজন্য হয়ত ধরতে এসেছে। ওই মামলায়তো হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছি আমি। আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমার মত একজন নগন্য সাংবাদিককে ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরতে হবে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত নাকি দাগী অপরাধী? আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেতো পোশাক পরা থাকবে। সিভিল পোশাকে সবার হাতে অস্ত্র। এরা কি তবে সন্ত্রাসী নাকি ডাকাত দল? তাহলে কি ওরা ডাকাতি করতে এসেছে এই বাড়িতে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন বাজতে থাকে নিজের মনের মধ্যে।

অপরিচিত লোকেরা ইতোমধ্যে গোটা বাড়ির সবক’টি কলিংবেল বাজিয়েছে। শুধু এই বাড়িরই নয় আশপাশের বাড়ির সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির একেবারে তিনতলা থেকে বাড়ির মালিক জনাব আবুল কাশেম ও তার পুত্র লিখন নিচে নেমে আসেন। সিভিল পোশাকধারী ১০/১২ জন সশস্ত্র লোক বাড়ির যে অংশে আমরা থাকি সেই অংশের বেলকুনীর দরজার কাছে আসেন। তারা নিজেদেরকে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে আমার বাসা তল্লাশি করবেন বলে দরজা খুলতে বলেন। এসময় আমি এবং আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করি যে, আপনারা কারা? আমি উনাদের উদ্দেশে বলি, আপনাদের পরিচয় নিশ্চিত না হলে আমি দরজা খুলবো না। তখন তারা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি দরজা খুল, নইলে তোর খুব অসুবিধা হবে।’ আমি বলি কি ধরনের অসুবিধা হবে, এতো রাতে একজন নাগরিকের বাড়িতে এসে আপনারা ডিসটার্ব করছেন কেন, কিসের কি অসুবিধা হবে? তারা আমাকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বলে গালমন্দ করতে থাকেন।

সত্যি সত্যি প্রশাসনের লোক নাকি সন্ত্রাসী-ডাকাতদল হানা দিয়েছে আমার বাসায় তা জানার জন্য আমি বোয়ালিয়া মডেল থানায় মোবাইল করি। থানার ডিউটি অফিসার আমাকে জানান, ‘থানা থেকে আমাদের কোন লোক যায়নি আপনার বাসায়। কে বা কোন বাহিনী গেছে তা আমাদের জানা নেই।’ এক পর্যায়ে সশস্ত্র লোকেরা বেলকুনীর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। তখন স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে এরা তাহলে ডাকাতদল! কিছুক্ষণ পর তারা (সশস্ত্র লোকেরা) নিজেদেরকে র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের লোক বলে পরিচয় দেন।

আমি বলি যে, আপনারা র‌্যাবের লোক কিন্তু দেখেতো মনে হচ্ছে না। তাছাড়া আমার বাসা সার্চ করবেন আপনাদের হাতে কি সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আমি এবং আমার পতœী সমস্বরে একথা বলি। এ পর্যায়ে তারা রেগে যায়। এসময় বাড়ির মালিকের ছেলে লিখন সশস্ত্র লোকদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা তাকে প্রহার করতে থাকেন। আমি মনে মনে ভাবি যে, সত্যিই যদি র‌্যাবের লোক হয় তাহলে কেন তারা মারধোর করছে বাড়ির মালিকের ছেলেকে। তখন আমি তাদের কাছে হাতজোড় করে অনুনয় করে বলতে থাকি, আপনারা উনাকে মারছেন কেন ? আপনারা কোন অন্যায় আচরণ করবেন না। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আপনারা বাসা তল্লাশি করুন। কিন্তু আমার প্রতি কোন অবিচার করবেন না। আমার ঘরে আপনাদের হাতের অস্ত্র রেখে আমাকে অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যাবেন না, প্লিজ। এটা বলার কারণ আছে। আর তা হলো র‌্যাবের এটা পুরনো অভ্যাস। নিজেদের অস্ত্র যে কারও হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে আটক করে নিয়ে যাবার পর র‌্যাব বিবৃতি দেয় ‘ও বড় সন্ত্রাসী’।

যাহোক, আমার শিশুপুত্র ফিমানকে তার মায়ের কোলে দেই। আমি বেলকুনীর গ্রিলের দরজা খুলি। দরজা খোলামাত্র র‌্যাব সদস্যরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে দরজার বাইরে নেন। তারা আমার দু’ হাতে হ্যান্ডকাপ পরান। আমার দু’ চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। শুধু তাই নয়, আমার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হয়। শুনেছি এধরনের টুপি এশমাত্র ফাঁসির আসামিদের ফাঁসি মঞ্চে নেয়ার সময় পরানো হয়। আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী ও বাড়িওয়ালার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ী কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকেন। একটি সভ্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একজন সাংবাদিকের সঙ্গে এমন অসভ্য-বর্বর আচরণ করতে পারে, তা আমার জানা ছিল না।

সন্ত্রাসী কায়দায় র‌্যাবের লোকেরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোর মধ্যে আমার সামনে দুজন, আমার পেছনে দুজন, আমার ডানে দুজন এবং আমার বাম পাশে দুজন সশস্ত্র লোক বসে শক্তভাবে ধরে থাকলো আমাকে। এদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে বললো যে, ‘এই ব্যাটা এবার বল তোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি’? আমি বলি তা কি করে আমি জানবো। তখন ওরা বলে আমরা র‌্যাব তুই জানিস না র‌্যাব কোথায় নিয়ে যায় মানুষকে। তখন আমি বলি তাহলে কি আমাকে আপনারা ক্রসফায়ারে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? এসময় তারা আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এ অবস্থায় মাইক্রো চলতে শুরু করলো। রাস্তার বাঁক আর রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার অনুমান করে বুঝতে পারি যে, গাড়ি যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট ক্রস করার পর স্পিড ব্রেকার ও তারপর মাইক্রোটি ডানে মোড় নিলে নিশ্চিত হই যে, আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পথিমধ্যে গাড়ির ভেতরে আমাকে মারধোর করা হয়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে তারা। তারা আমাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া ও ‘ক্রসফায়ার’ করার হুমকি দেয়। গাড়ির ভেতওে একজন বলে যে, ‘আল্লাহর নাম ডাক, দোয়া-কালাম পড়, তোকে ক্রসফায়ার করা হবে’। তখন মনে মনে ভাবছি যে, আমিতো কোন অপরাধ করিনি, আমি খুনি নই। তারপরও আমাকে ক্রসফায়ার দেয়া হবে। এটা কি হয়? পরক্ষণেই আবার ভাবি সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নতুন কিছু নয়। এখানে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনদের মত মানবতাবাদী মানুষদেরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সইতে হয়। কিন্তু খুনি, যুদ্ধাপরাধী নিজামীরা গাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় নিশ্চিত হলাম যে, সত্যি সত্যি আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়ার পর আমার দু’হাত বেঁধে আমাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে টাঙ্গিয়ে রাখা হলো। এর আগে আমাকে এই ঘর ও ঘর সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো নামানো করা হলো বেশ কিছু সময় ধরে। রাতে আমার আশপাশে বুটের খট খট শব্দ করে ৪/৫ জন লোক আসতো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার একই শব্দ করে হেঁটে চলে যেতো তারা। চোখ বাঁধা ও কালো টুপি পরিয়ে এবং আমাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় সারারাত। এভাবে রাতভর আমার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সকাল আনুমানিক আটটার দিকে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাকে নিচে নামানো হলো। একটি ছোট রুটি পাতলা ডাল দিয়ে খেতে দেয় তারা। রুটির সাইজ আর পানির ন্যায় ডাল অনুভব করে আবার ভাবি, তাহলে কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবেক ভিসি সাইদুর রহমান খান, আবদুস সোবহান ও মলয় ভৌমিক এর ওপরও এমন আচরণ করেছে র‌্যাব সদস্যরা। এই তিন গুণি শিক্ষককেও র‌্যাব-৫ এর সদস্যরাই গ্রেফতার করেছিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের ওপর কি অমানবিক-বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে ‘পশুর দল’। জেলে গিয়ে জানতে পাই, বিশিষ্ট নাট্যকার মলয় ভৌমিকের দু’ পায়ে ব্যাপক টর্চার করে এই জানোয়ারের দল। সাইদুর রহমানের মতো শিক্ষককে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে সজোরে ঘুরিয়েছে।

রাতভর উপরে ঝুলে থাকার সময় মনে হচ্ছিল আমার শরীর থেকে বোধহয় হাত দু’টো আলাদা হয়ে গেছে। একটি গামছা দিয়ে আমার চোখ দু’টি শক্ত করে বেঁধে দেয়ার পর আবার মোটা কালো কাপড়ের একটি টুপি পরিয়ে দেয়ায় আমার যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু টুপি খুলে দেয়নি অমানবিক ওই ‘নির্যাতনকারি খুনির দল’। সকালে নাস্তা হিসেবে যে পাতলা রুটি আমাকে খেতে দেয়া হয় তা থেকে সামান্য একটু ছিঁড়ে মুখে দিয়েছি। পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাই। এরপর আমাকে আবারও উপরে লটকানো হয় একইভাবে। আমাকে খেতে দেয়ার সময়ও টুপিটি খোলা হয়নি। শুধুমাত্র গোঁফ পর্যন্ত টুপিটি উঠিয়ে দেয়া হয়। আমার কাছে এসে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে র‌্যাব সদস্যরা।

সকাল অনুমান ১০টার দিকে দুই ব্যক্তি এসে আমার নাম জানতে চান। ওই দুইজনের কথোপকোথনেই বুঝতে পারি এরা আমার পরিচিত। গ্রেফতার হওয়ার আগে আগে পেশাগত কারণে এই দু’জনের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং উনাদের সঙ্গে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। এরা হলেন র‌্যাব-৫ এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী (সিপিসি) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে পদোন্নতিপ্রাপ্ত লে. কর্ণেল) ও রাব-৫ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হুমায়ুন কবির। এরা এখন রাজশাহীতে নেই। মেজর রাশীদকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একজন সদস্য করে পাঠানো হয়েছিল আইভরিকোষ্টে। মেজর কবিরকে বান্দরবানে বদলি করা হয়েছে বলে শুনেছি। কথিত অপহরণের অভিযোগে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৭ সালের ১৮ মে এ ঘটনা ঘটে। তখন পরিচয় হয়েছিল মেজর কবির এর সঙ্গে। আর সিএসবি নিউজ বন্ধ হবার এক সপ্তাহ আগেও মেজর রাশীদের সাথে তারই কার্যালয়ে কথা বলি পেশাগত কারণে। আমারসঙ্গে সিএসবি নিউজের ক্যামেরাম্যান মাসুদও ছিলেন।

পূর্ব পরিচিতি এই দু’জনের মধ্যে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ এক পর্যায়ে নির্যাতন শুরু করলেন। নির্যাতনের শুরুতেই মেজর রাশীদ আমাকে বলেন, “এই ফকিরনির বাচ্চা, তোর এতো প্রেসটিজ কিসের? শালা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী। তোর ‘পাছার ভেতর’ ঢুকিয়ে দেবো সাংবাদিকতা। এই শুয়োরের বাচ্চা তুই আর রিপোর্ট করবি না সিএসবি নিউজ-এ। লিচু বাগানের রিপোর্ট, বেনজিরের বউয়ের কথা, খায়রুজ্জামান লিটন সাহেবের (জনাব লিটন বর্তমানে রাজশাহীর মেয়র, আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলার বাদি জনাব লোটনের ভাইপো) পারিবারিক ওয়াকফ্ এস্টেট নিয়ে রিপোর্ট করবি না ? হারামজাদা তুই র‌্যাব দেখেছিস, কিন্তু র‌্যাবের কাম দেখিসনি। তোকে ক্রসফায়ারে মারবো শালা।”

আবার ভাবতে থাকি যে, র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আমাদের জাতীয় নেতার সন্তান লিটন সাহেবের নাম বলছেন কেন? তাহলে কি র‌্যাব সদস্যরা জনাব লিটনের প্ররোচণাতে আমাকে ধরে এনে আমার ওপর নির্যাতন করছে? কিন্তু আমিতো লিটন সাহেবের কোন ক্ষতি করিনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। এই রিপোর্ট করতে গিয়ে যদি লিটন সাহেব আহত-মর্মাহতও হয়ে থাকেন তাহলেওতো তিনি আমার ওপর এমন প্রতিহিংসা পরায়ন হতে পারেন না। তবে কি র‌্যাবের এই মেজর লিটন সাহেবের নাম ব্যবহার করে পুরো দোষটি তার (মেয়র সাহেবের) ঘাড়ে ফেলতে চাইছেন? পরবর্তীতে জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যৌথ ষড়যন্ত্রের অন্যতম রুপকার মাননীয় মেয়র মহোদয় নিজেও। মেয়র লিটন, র‌্যাবের মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ, মেয়রের চাচা মাহফুজুল আলম লোটন, রাজশাহীর একজন নৃত্যশিল্পী যৌথভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। বলে রাখা ভালো, মেয়র লিটন, জামায়াত সমর্থক মেজর রাশীদ এবং গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের জামায়াতী কতিপয় সদস্যরা আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করতে চেয়েছিল।

নির্যাতনকালে আমি মেজর রাশীদকে বলি, আপনি রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী। আপনি আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে যাচ্ছেন? আপনি কিভাবে একজন নাগরিকের সাথে এমন অসভ্য আচরণ করছেন? রাষ্ট্র, সংবিধানতো আপনাকে কোন ব্যক্তিকে নির্যাতন করার অধিকার দেয়নি। এক পর্যায়ে তিনি (মেজর রাশীদ) আমার বাম গালে থাপ্পড় মারলে আমার ঠোট ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার বাম হিপে একটি গোল বলের ন্যায় বস্তু দ্বারা কঠিন জোরে এশাধিকবার আঘাত করেন। ওটা যে ইলেকট্রিক শক তা আমার জানা ছিল না। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে এই ইলেকট্রিক শক বিষয়ে জানতে পারি। এই শক যখন দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন আমার গোটা শরীরে আগুন ধরেছে। ইলেকট্রিক শক দেয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তখন অনুমান সকাল সাড়ে ১০টা। এসময় আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। আমাকে বসানো হয় ইলেকট্রিক চেয়ারে। এর প্রায় আধাঘন্টা পর টর্চার সেলের ফ্লোরে শুইয়ে দেয়া হয়। এরপর দুই মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও হুমায়ুন কবির একযোগে আমার ওপর হামলে পড়েন। এসময় আমার মনে হচ্ছিল, যেন এই দুই সেনা কর্মকর্তা তাদের ব্যক্তিগত জিঘাংসা মিটাতেই আমাকে নির্যাতন করছেন। আমার শরীরে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন মেজর রাশীদ ও হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে বুটের লাথি ও কিল-ঘুসি চলে সমানতালে।

প্রায় এক ঘন্টা ধরে সেনাবাহিনীর ওই দুই সদস্য আমার ওপর নির্যাতন চালান। তারা উভয়ে একটা মোটা বাঁশের লাঠি (গোলাকৃতির) দিয়ে আমার দুই পায়ের তালুতে বেধড়ক পিটিয়েছেন। নির্যাতন চালানোর সময় সেনা কর্মকর্তাদের উভয়ই ছিলেন উল্লসিত। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার জ্ঞান ফিরলে আমি বুঝতে পারি যে, একটি পরিত্যক্ত রান্না ঘরে আমি খড়ের ওপর পড়ে আছি। যেখানে পোকা-মাকড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে ওরা গরু-ছাগলের ন্যায় আমার চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ফেলে রাখে সেই ঘরের মধ্যে। দুপুর অনুমান দেড়টার দিকে আমাকে উঠে দাঁড়াতে বললো র‌্যাবের দুই সদস্য। কিন্তু নির্যাতনের ফলে আমি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এসময় ‘অভিনয় করছে শালা’ এই মন্তব্য করে মেজর রাশীদ আমার দু’পায়ের উপরে তার পায়ের বুট দিয়ে খিচতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটার মার হয়নি। শালা অভিনয় করছে। কুত্তার বাচ্চা উঠে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে হাঁট। নইলে আরও মারবো। শালা তোকে ক্রসফায়ার দিলে ঠিক হবি।’ আমি বলি যে, আমি কোন অভিনয় করছি না প্রকৃতপক্ষে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারছি না। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে নারাজ মেজর রাশীদ। মেজর রাশীদ বলছেন যে, তুই যতক্ষণ হাঁটতে পারবি না ততক্ষণ মারতে থাকবো। নির্যাতন থেকে সাময়িক রেহাই পাবার জন্য আমি কষ্ট করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর ও হাঁটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

মেজর রাশীদ তার বুট পরা পা দিয়ে আমার দু’পায়ে পায়ে খিচতে খিচতে আমাকে একটি রুমে নিয়ে যান। বেলা অনুমান দু’টায় আমার মাথা থেকে কালো কাপড়ের টুপি সরিয়ে চোখ থেকে গামছা খুলে দেয়া হয়। মনে হলো আমি যেন কবরের অন্ধকার থেকে আলোতে এলাম। শান্তিমত শ্বাস-প্রশ্বাস নিলাম। র‌্যাব সদস্যরা একটি ফরমে আমার দুই হাত ও দুই হাতের সব আঙুলের ছাপ নিল। আমার বুকে আমার নাম লিখে তা সেঁটে দেয়া হলো। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার মহড়া শেষে পুনরায় গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে আমার মাথায় কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হলো।

আমাকে উঠানো হলো একটি মাইক্রোতে। এসময় RAB’র কেউ আমাকে কানে কানে বললেন, ‘ব্যাটা আল্লাহ আল্লাহ কর তোকে বাগমারায় ক্রসফায়ার দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’ বেলা আনুমানিক তিনটায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালিয়া মডেল থানায়। র‌্যাব, আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দিতে চেয়েছিল বোয়ারিযা মডেল থানার মাধ্যমে। কিন্তু বোয়ালিয়া থানার পুলিশ র‌্যাবকে জানায় যে, এই মামলা সে (আকাশ) জামিনে আছে তাকে গ্রহণ করা যাবে না। থানায় নেয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে সোজা হয়ে হাঁটবি। নইলে তোকে আবার ফিরিয়ে আনবো এবং ক্রসফায়ার-এ মারবো। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবি আমাকে মারধোর করা হয়নি।’ মনে মনে ভাবি আমাকে মেরে ফেললেও কখনও আমি মিথ্যার আশ্রয় নেবো না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আমাদের সন্তান ফিমান ফারনাদের মুখখানি। মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে সন্তানের কথা ভেবে। দুই চোখ গড়িয়ে ঝরতে লাগলো পানি। চোখের জলে ভিজে গেল সেই ফাঁসির আসামিকে পরানোর কালো টুপির অংশ বিশেষ। আওয়ামী লীগ নেতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে থাকার কারণে থানার পুলিশ আমাকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালে থানা থেকে র‌্যাব কার্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায় র‌্যাব। এরপর র‌্যাব সদস্যরা বলাবলি করছে যে, আমাকে বাগমারায় নেয়া হবে সেখানে আমাকে একটি অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হবে। আরও শুনি যে, আমার নামে পুঠিয়াতে আরও একটি চাঁদাবাজির মামলা করানো হয়েছে, সেখানেও নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিকেল অনুমান পাঁচটার দিকে র‌্যাব আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানায় ৫৪ ধারায় হস্তান্তর করে। এরপর আমার মাথার টুপি সরিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়।

আমাকে থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব সদস্যরা থানা কম্পাউন্ড অতিক্রম করার পরপরই আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানা হাজতে নেয়া হলো। হাজতখানার ভেতরে বিড়ি-সিগারেটের মোথা, থু-থু, কফ, কলার ছালসহ নানান অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশে আমার বমি বমি ভাব হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার এসআই নূরুজ্জ্মান আসলেন আমার পাশে। তিনি রাজশাহীর বর্তমান মেয়র জনাব লিটনের চাচা ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের এই সদস্য আমার পূর্ব পরিচিত। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র এবং জিয়াউর রহমান হলে থাকি তখন তিনিও (নূরুজ্জামান) রাবিতে পড়ালেখা করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্রদলের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তা হলো এই নূরুজ্জামান রাজশাহীর সাবেক ছাত্রদল নেতা শাহীন শওকত এর ভাইপো। আমার ধারণা করতে আর বাকি রইল না যে, তিনি পুলিশের চাকরীতে কিভাবে এসেছেন। সে যাহোক, এসআই নরুজ্জামান আমাকে অশোভন ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘শালা তুই আওয়ামী-ঘাদানিক, হাসিনা লীগ করিস। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তুই ছাত্রদল আর শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর লিখেছিস। এইবার আমি তোকে রিমান্ডে নিয়ে আবার মারবো।’

বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ এর সন্ধ্যায় আমাকে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ২০০৭ এর ১৬ (২) ধারায় রাজশাহীর মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চালান দেয়। এসআই নূরুজ্জামান পুলিশ পিকআপ এর সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাকে আদালত চত্বরে নিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য বোধহয় এই যে ‘এতবড় এবকজন দাগী অপরাধী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ কে গোটা রাজশাহী শহরের মানুষ (বোয়ালিয়া থানা হতে কোর্ট যাবার পথে) কে দেখানো! আমাকে যখন আদালতে নেয়া হয় তখন আদালতে কোন ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন না। আমাকে পুলিশ ভ্যান থেকে দুইজন পুলিশ ধরে নামালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ড-৪ এ ভর্তি করে। পরদিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর, ২০০৭ খুব সকালে আমাকে দুইজন বন্দী দুই পাশে ধরে নিয়ে এলেন কেস টেবিলের (কারা বিচারাচালয়) সামনে। সেখানে আমার শরীরের বস্থা অবলোকন এবং আমার কাছ থেকে নির্যাতনের কাহিনী শোনার পরও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আমাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশ দিলেন। আমাকে নেয়া হলো আমদানি ওয়ার্ডে (একজন মানুষ প্রথম জেলে আসার পর এই ওয়ার্ডেই তাকে নেয়া হয়)।

আমদানি ওয়ার্ডের বন্দিরা আমার শারীরীক অবস্থা দেখে আমাকে কারা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য কারা সুবেদারকে অনুরোধ করেন। এরপর কারা সুবেদার আমাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্ত করে দেন। কারা হাসপাতালে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত আমি চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে সুস্থ্য হয়ে ওঠার আগেই কারা হাসপাতালের সার্জনকে ঘুষ না দেযার কারণে আমার ফাইল (সুস্থ্য বলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া) কেটে দেন। এরপর আমাকে সিভিল ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২৮ দিনের অন্ধকার কারা জীবনের বাকি দিনগুলো কেটেছে আমার।

পুলিশ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৮ নভেম্বর আমি জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার ১৬ (২) ধারা হতে অব্যাহতি পাই। ওইদিনই আমাকে (গ্রেফতারের মাত্র চার ঘন্টা আগে দায়ের করা) দ্বিতীয় চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিসকেস দায়ের করার মধ্য দিয়ে আমি ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর এই মামলা থেকে জামিন লাভ করি। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ থেকে ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ রাত আটটায় কারাগার থেকে মুক্তি পাই। মুক্তি পাবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমার কাছে খবর আসে যে, আমাকে র‌্যাব আবার গ্রেফতার করবে এবং এবার ‘ক্রসফায়ার’ এ হত্যা করবে। এমন এক চরম হুমকির মুখে পরিবারের সদস্যদেরকে উদ্বিগ-উৎকণ্ঠা আর আতংকের মধ্যে রেখে আমি রাজশাহী ছেড়ে পালিয়ে আসি ঢাকায়। এরপর আমি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস এ ভর্তি হয়ে আমি মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার গ্রহণ করি। আমার জীবনের এই অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, বোমা-গ্রেনেড হামলা নিয়ে চারটি বই লিখেছি। এগুলো হলো অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা, জঙ্গি গডফাদার এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ এবং উদীচী থেকে পিলখানা। রাজনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ক ইংরেজী ভাষায় তিনটি বই প্রকাশ হয়েছে। এগুলো হলো স্ট্রাগল ফর পিচ, এওয়ে ফ্রম হোম এবং পেইন। এরমধ্যে পেইন বা ব্যথা নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকা থেকে। এই বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যাচ্ছে (http://www.amazon.com/Pain-Jahangir-Alam-Akash/dp/1456858025)।

কেন এই রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-ষড়যন্ত্র?

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পট পরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে মূলত: সেনাবাহিনী দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। তাই সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘সেনা নিয়ন্ত্রিত’ সরকার বলেই বেশি পরিচিতি পায়। দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। জরুরি অবস্থার মধ্যেই রাজশাহীতে র‌্যাব-৫ এর একাধিক অপারেশন জনমনে নানান প্রশ্ন সৃষ্টি করে। ২ মে (২০০৭) রাজশাহীর এক সময়ের টপ সন্ত্রাসী বেনজিরকে তার নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে স্ত্রী ও শিশু কন্যার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা গুলি করে এবং তার হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে চালান দেয় আদালতে। একই মাসের ১৬ মে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালকের (তৎকালীন) কক্ষে র‌্যাব সদস্যদের পিটুনিতে হা-পা ভেঙ্গে যায় কারারক্ষী সাহেবুল ইসলামের। এর দু’দিন পর ১৮ মে মহানগরীর ছোট বনগ্রামের লিচু বাগান পাহারা দেবার সময় কথিত অপহরন নাটকের জের ধরে র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে ওয়ার্কাস পার্টির ওয়ার্ড সভাপতি কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে। এই মজনু হত্যাকান্ডের ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে রাজশাহীর মানুষ। জরুরি অবস্থা ভেঙ্গে হাজারো সাধারণ নারী-পুরুষ ও জনতা রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে থাকে। জনতার বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে জরুরি অবস্থা ভেসে যায়। পুলিশ, র‌্যাব জনতাকে দমাতে পারেনি সেদিন।

দেশের একমাত্র ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেল সিএসবি নিউজে জনআন্দোলনের এই চিত্র তুলে ধরা হয়। যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ আগষ্টের ঘটনার জের ধরে ছাত্র আন্দোলন থেকে জনআন্দোলনে রুপ নেয়া জনতার ক্ষোভের বহি:প্রকাশ। আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো আমার জীবনে। সিএসবি নিউজ চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যাবার পর প্রশাসন যেন সিএসবির ওপরের পুরো রাগ-আক্রোশ আমার ওপর দিয়ে পুষিয়ে নিলো। প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজ-স্বার্থান্বেষী চক্রও যোগসাজশে মেতে উঠলো। দুর্নীতির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় সিএসবি নিউজ বন্ধ হয়ে যাবার আগেই ২০০৭ সালের ২০ জুন বোয়ালিয়া মডেল থানায় আমার নামে একটি কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে এজাহার দাখিল করেন নব্য আওয়ামী লীগার বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার মাহফুজুল আলম লোটন। সেই অভিযোগটি পুলিশ জিডি আকারে রেকর্ড করে (জিডি নং-১১৬০, তারিখ-২০/৬/২০০৭)। এই জিডির বিষয়টি আমি বুঝতে পারি একই বছরের আগষ্টের শেষ দিকে। শুনেছি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা অভিযোগটি ডাহা মিথ্যা বলে মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি। সেই জিডি তদন্ত করে পুলিশ কি পেয়েছিল তার রিপোর্ট আজও জানতে পারিনি। কিন্তু পরবর্তীতে র‌্যাবের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে রাজশাহীতে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও তাঁর চাচা মাহফুজুল আলম লোটন পরিকল্পনামাফিক পুনরায় অভিযোগটি এজাহার হিসেবে বোয়ালিয়া মডেল থানায় জমা দেয়ার ব্যবস্থা করেন সিএসবি বন্ধ হয়ে যাবার দিনই অর্থাৎ ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭। এরপর র‌্যাবের রাজশাহী-৫ এর তৎকালিন কমান্ডার লে.কর্ণেল শামসুজ্জামান খান, মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও মেজর হুমায়ুন কবিরের চাপ ও হুমকিতে পুলিশ এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে বাধ্য হয়।

হয়রানিমূলক পরিকল্পিত মামলা ও আমার গ্রেফতার, নির্যাতনের সাথে কাকতালীয়ভাবে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায় ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবরের পূর্বে। ২০০৭ সালের ২১ আগষ্ট রাবি ক্যাম্পাসে একদল দেশপ্রেমিক শিক্ষক ঢাবির ঘটনার প্রতিবাদে মৌন র‌্যালী বের করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় একটি শায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয়। ঢাবির ঘটনার প্রেক্ষিতে মৌন প্রতিবাদ করা কোন দোষের কিংবা অন্যায়ের ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর সেনা সদস্যদের নির্যাতনের ঘটনার জের ধরে ২২ আগষ্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-বিক্ষোভকালে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ছাত্রশিবির ক্যাডার ও ৫৪৪ খ্যাত কর্মচারীদের একটি অংশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাংচুর, ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। সংঘর্ষকালে ক্যাম্পাসে রিকশাচালক আফজাল হোসেন নিহত হন পুলিশের গুলিতে। ক্যাম্পাসের ভেতরে যখন ধ্বংসলীলা চলছিল ঠিক তখন রাজশাহী ডিজিএফআইয়ের একটি গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করছিল। ভেতরে বিক্ষুব্ধ অবস্থা বিবেচনা করে এখন ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না বলে ডিজিএফআইয়ের সহকারী পরিচালককে বহনকারী গাড়িটিকে ভেতরে যেতে নিষেধ করেছিল সেখানে কর্মরত পুলিশ। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের ওই কর্মকর্তা সেদিন পুলিশের অনুরোধের কর্ণপাত করেননি। ক্যাম্পাসের ভেতরে উপাচার্য ভবনে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা উপাচার্য মহোদয়ের সাথে কথাবার্তা বলে গাড়িতে ওঠে ফিরে যাচ্ছিলেন শহরে। এমন সময় উল্টো দিকে থেকে প্যারিস রোড দিয়ে নিহত রিকশা চালকের লাশ নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা উপাচার্য ভবনের দিকে আসতেছিল। উপাচার্য ভবনের মূল ফটক অতিক্রম করামাত্র ডিজিএফআইয়ের গাড়িটির স্টার্ট রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ওইসময়ই লাশ বহনকারী বিক্ষুব্ধরা ডিজিএফআইয়ের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পায় ডিজিএফআই তথা সেনাবাহিনী। জামায়াত নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজে খুঁজে প্রগতিশীল শিক্ষকদের শায়েস্তা করতে ছাত্র-বিক্ষোভের ঘটনায় শিক্ষকদের বিরাট ষড়যন্ত্র আবিস্কার করতে সমর্থ হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নির্বাচিত উপাচার্য অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল দলের তৎকালীন আহবায়ক অধ্যাপক আবদুস সোবহান ও প্রথাবিরোধী খ্যাতিমান নাট্যকার প্রগতিশীল শিক্ষকদলের অন্যতম নেতা মলয় ভৌমিককে তাঁদের নিজ নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৫ এর সদস্যরা। এই গুণি শিক্ষকদের সেদিন কালো পোশাক পরা মানুষগুলো চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ধরে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে (র‌্যাবের টর্চার কেন্দ্র)। এরপর শিক্ষকদের সাথে সামান্য লে.কর্ণেল, মেজর ও ক্যাপ্টেন পদর্যাদার র‌্যাব সদস্যরা যে অসভ্য-অশোভন আচরণ করেছে তা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। শুধু কি তাই? একাত্তরের সেই কঠিন দিনগুলোতেও পাক সেনারা যা করতে পারেনি তাই করেছে স্বাধীন দেশের র‌্যাব নামক এক দানব বাহিনী। যে বাহিনীর কর্মকান্ড মূলত: সরাসরি সংবিধান পরিপন্থি। গ্রেফতারকৃত তিন শিক্ষকের মধ্যে মলয় ভৌমিককে চরম অমানবিকভাবে নির্যাতন করে র‌্যাব সদস্যরা। তারা মলয় ভৌমিকের দু’পায়ের হাঁড় ফাটিয়ে দেয় লাঠি দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নম্র-ভদ্র সবার প্রিয় অধ্যাপক সাইদুর রহমান খানকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে ঘুরানো হয়েছে। এরপর তিনি যখন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন তখন তিনি গল গল করে বমি করেন। কিন্তু তবুও হায়েনাদের মনে এতটুকুও ভালবাসার প্রকাশ ঘটেনি এই গুণি শিক্ষকের ওপর নির্যাতন চালাতে। মিষ্টভাষী অধ্যাপক আবদুস সোবহানকেও নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে র‌্যাবের নির্যাতন ক্যাম্পে। অথচ জনগণের টাকায় যাদের খাওয়া ও পোশাক পরা হয় সেই র‌্যাব সদস্যদের মধ্যে এমনকি সেনাবাহিনীতেও অনেক বড় বড় পদমর্যাদার কর্তাব্যক্তি আছেন যারা এই তিন শিক্ষকের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ৮ জন শিক্ষককে জেলে যেতে হয়। ক্যাম্পাসে চলমান আন্দোলনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনানুযায়ী রাবির জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা জনাব সাদেকুল ইসলাম সেদিন ভিডিও চিত্র ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু তার নামেও গোয়েন্দারা সেদিন ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছিল। সাদেকুল ইসলামকেও গ্রেফতার করে ডিজিএফআইয়ের গাড়ি পোড়ানো মামলায কারাগারে বন্দী জীবন কাটাতে হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অপর দুই শিক্ষক চৌধুরী সারোয়ার জাহান সজল ও গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু যাঁরা ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক তাহের হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী। ধারণা করা হচ্ছে, এই একটিমাত্র কারণে এই দুই শিক্ষককে ডিজিএফআই সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় গাড়ি পোড়ানো মামলায় জেলে ঢুকিয়েছিল। সবমিলিয়ে যে মনে হচ্ছে যে, সেই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক জামায়াত-শিবির চক্রকে খুশি করতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের নামে মামলা চাপানো ও গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক হারুন-অর রশিদ, অধ্যাপক সাদরুল আমিন, অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক প্রমূখের ক্ষেত্রেও। ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক কর্ণেল আবু তাহেরের সহোদর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিক্ষকদের বিরুদ্ধে করা চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তথাকথিত প্রহসনের বিচার শুরু হয়েছে। আদালতে উৎসুক মানুষের ভীড়। পেশাগত কারণেই মামলার বিচার কার্য চলাকালে অনেকের মত আমিও প্রতিদিনই আদালতে গিয়েছি। সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার বিষয়গুলোর পুংখানুপুংখ নোট নিয়েছি। সম্ভবত এই ঘটনার রেশ ধরেই আমার গ্রেফতারের আগে আরও একটি ঘটনা ঘটে রাজশাহীর আদালতে। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আমি সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে মতিহার থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার ফেরদৌস আহম্মেদের করা বহুল আলোচিত মামলার জেরার শুনানি ছলছিল। আমি শুনানিকালে নোট নিচ্ছিলাম। আদালতের ভেতরে ছিলেন রাবির শিক্ষক ও মহিলা পরিষদ রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবা কানিজ কেয়া, শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ নাসের, রাবির দর্শন বিভাগের শিক্ষক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এস এম আবু বকরসহ রাবির বেশকিছু শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী এবং সাধারণ জনতা। বেলা সোয়া দু’টায় রাজশাহী মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আদালতে প্রকাশ্য বিচার কার্যক্রম চলাকালে আমাকে পুলিশ লাঞ্ছিত করলো। আদালত মূলতবি অবস্থায় আমাকে টেনে-হিঁচড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে আদালতের কক্ষ থেকে বের করে দিল পুলিশ। ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) মো. আফজাল হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলাম।

রাবির ঘটনায় ডিজিএফআই কর্মকর্তা শওকত আলী ও মতিহার থানার ওসি খোন্দকার ফেরদৌস আহম্মেদের করা মামলার চার্জ গঠনের দিন থেকেই আমি পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিনই আদালতে যাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলার সাক্ষী, জেরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদালতের ভেতরেই থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকালে আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আদালতের বিচারক মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট এস এম ফজলুল করিম চৌধুরীর আদালতে গেলাম। সকাল থেকেই সাক্ষী তথা বাদী ওসি ফেরদৌসের জেরা চলছিল। এ অবস্থায় বেলা দু’টায় ম্যাজিষ্ট্রেট কুড়ি মিনিটের জন্য আদালত মূলতবি করেন। এসময় আমি আদালতেই বসেছিলাম। এক পর্যায়ে সিএসআই কামালউদ্দিনসহ চার/পাঁচজন পুলিশ সদস্য এসে আমাকে আদালত থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখালাম। কিন্তু তারপরও পুলিশ সদস্যরা আমি টেনে-হিঁচড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে আদালতের ভেতর থেকে বাইরে বের করে দেন। (সূত্র: দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৭, “রাজশাহীর আদালতে পুলিশের হাতে সাংবাদিক লাঞ্ছিত”)।

২০০৭ সালের ২ অক্টোবর বোয়ালিয়া মডেল থানায় আমার বিরুদ্ধে জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলা রেকর্ড হয়। আদালতে পুলিশ কর্তৃক লাঞ্ছনার ঘটনায় আমার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে একই দিনে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মো. আফজাল হোসেন (স্মারক নং-সিএমএম/রাজ/গো/১-১/৯৭-১১০৯, তারিখ-০২/১০/২০০৭) আমাকে নোটিশ করেন। নোটিশে বলা হয়, ‘২৬ সেপ্টেম্বর জনাব এস এম ফজলুল করিম চৌধুরীর আদালতে দায়িত্বরত পুলিশ কর্তৃক আদালত থেকে বের করে দেয়ার ঘটনার শুনানী ৪ অক্টোবর, ২০০৭ সকাল সাড়ে ৯টায় সিএমএম এর খাস কামরায় অনুষ্ঠিত হবে। আপনি আপনার সাক্ষীসহ উপস্থিত থাকবেন।’ ৪ অক্টোবর, ২০০৭ তারিখে আমি যথারীতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ নাসের, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহবুবা কানিজ কেয়াসহ আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ যথাসময়ে সিএমএম আদালতে হাজির হলাম। কিন্তু আদালতে পৌঁছেই খবর এলো যে, আমার নামে বোয়ালিয়া থানায় চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে, পুলিশ এখান থেকে (সিএমএম আদালত হতে) আমাকে গ্রেফতার করবে। এই পরিস্থিতিতে সিএমএম মহোদয়ের কাছে পরবর্তীতে সাক্ষী প্রদান করার জন্য সময়ের আবেদন জানিয়ে আমি দ্রুত আদালতস্থল ত্যাগ করি। ওইদিনই চলে আসি ঢাকায়। উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়া। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টে চলছে অবকাশকালীন ছুটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এবং আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই সৈয়দ মামুন মাহবুব এর শরণাপন্ন হই। উনাকে ফোন করলে তিনি আমাকে তাঁর বাসায় যেতে বললেন। কথানুযায়ী উনার বাসায় গিয়ে মামলার সমস্ত কাগজপত্র দিয়ে আসলাম। উনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমার জামিনের জন্য হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে ক্রিমিনাল মিসিলেনিয়াস কেস (নং-১৪৪৫৪/২০০৭) করেন। হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ (এ এফ এম আবদুর রহমান) এ এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ১৬ অক্টোবর, ২০০৭। শুনানি শেষে বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান আমার অন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করলেন। অবশ্য তিনি শুনানিকালে প্রকাশ্য আদালতে বললেন যে, ‘তিনি (আমি) যে চাঁদাবাজি করেননি তার কি প্রমাণ আছে, আর সাংবাদিকরা কি সাধু চাঁদাবাজি করে না, সাংবাদিকদের উল্টাপাল্টা রিপোর্টের কারণেইতো দেশের আজ এই অবস্থা।’ মহামান্য বিচারপতি যখন উপরিল্লিখিত মন্তব্য করছিলেন তখন আমার ভীষণ লজ্জা পায়। ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ হচ্ছিল আমার। আমিতো চাঁদাবাজি করিনি, তাহলে উনি এসব কথা কেন বলবেন? মনে মনে বলি, বিচারপতি মহোদয় কিভাবে বললে আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আমি চাঁদাবাজ নই, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট। হয়ত বিচারপতি মহোদয়ের কথা ঠিক, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কি এই মন্তব্যকে মেনে নেয়া যায়? তবে এটাতো ঠিক যে, আমাদের সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িতরা আমরা বুকে হাত দিয়ে ক’জনইবা বলতে পারি যে, আমি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, নীতিনিষ্ঠ, সত্যের পূজারী। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদের পেছন পাতায় ‘রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ’ শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় আমার নামে। এই রিপোর্ট করায় রাজশাহীর সব সাংবাদিক আমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হয়েছিল। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার চার বছরের মাথায় নিজেই চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগের শিকার হলাম। তাই বিচারক মহোদয়ের কথায় শেষ পর্যন্ত আমার কোন রাগ হয়নি। কিন্তু গুটিকতক দুবৃত্তের জন্যতো আর গোটা পেশার মানুষদের অভিযুক্ত করা অনৈতিক। এই জবাবটা বিচার সাহেবকে দেয়ার সুযোগ ছিল না আমার।

হাইকোর্টে কেন আমার জন্য জামিনের আবেদন জানালেন তারজন্য শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মামুন মাহবুবকে রাজশাহীর কৃতি সন্তান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন নাকি মোবাইল করে বলেছেন যে, ‘ওতো (আমি) আমাদের পক্ষের লোক নয়। তুমি কেন ওর জন্য জামিন চাইলে?’ সত্যিই দারুণ লজ্জা, কষ্ট আর বেদনার। একজন জনপ্রতিনিধি, জাতীয় নেতার সন্তান এত ছোট মনের হবেন কেন? এটা ভাবতেই আমার কষ্ট, ঘৃণার সৃষ্টি হচ্ছে। হাইকোর্টের আদেশে জামিনে থাকার পরও আমাকে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে গ্রেফতার করে র‌্যাব সদস্যরা। আমাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হয় বাসা থেকে, সেই দিনে রাজশাহীর সার্কিট হাউসে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বিষয়ক জরুরী এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করি আমি নিজেও।

দৈনিক সংবাদ এ ২০০০ সালের ৪ মার্চ ঘটনাস্থল রাজশাহী সন্ত্রাসীদের ভয়ে দুটি পরিবার ঘর থেকে বেরুতে পারছে না মামলা হয়েছে পুলিশ চুপচাপ শীর্ষক শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় আমার নামে। এরই প্রেক্ষিতে ঠিকাদার মাহফুজুল আলম লোটন তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমাকে হত্যা প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ভুলবশত অন্য একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ করে। এ ঘটনায় আমি রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করি। বোয়ালিয়া থানার জিডি নম্বর ৩১০, তারিখ- ০৭/০৩/২০০০। এই ঘঁনাই মেয়র লিটন ও উনার চাচা লোটনের সঙ্গে আমার শত্রতার সূত্রপাত। ২০০২ সালের ৯ এপ্রিল একই পত্রিকায় ’দুর্নীতির অভিযোগে রাজশাহীর দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী পরিবর্তন’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্ট। এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি মেয়র লিটনদের পারিবারিক। এবং এই দুর্নীতির সঙ্গে মেয়র লিটনপক্ষই জড়িত। ২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হলো ’দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেটের নয়া মোতাওয়াল্লীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ’ শীর্ষক শিরোনামে আরেক রিপোর্ট।

বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহিমা গণধর্ষণ ও আত্মহনন ঘটনা কারও অজানা নয়। সেই পুঠিয়ায় আবারও ধর্ষণ। ধর্ষণের ঘটনায় জনতার হাতে ধৃত ছাত্রদল ক্যাডার এই শিরোনামে ২০০২ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত হলো আরেক রিপোর্ট। রাজশাহীতে ধর্ষিতার পিতাকে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের শিরোনামে আরেক রিপোর্ট প্রকাশিত হলো ২০০৫ সালের ৭ মে। রাজশাহীর পুঠিয়ার চাঞ্চল্যকর কিশোরী ধর্ষণ মামলার বাদী আওয়ামী লীগ কর্মী আবদুল হালিমকে জিলাপির মধ্যে বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহত হালিমের ভাই হইদর আলী। ম্যাজিষ্ট্রেট পুঠিয়া থানার ওসিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় মোট ৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এরা হলো অভিযুক্ত ধর্ষক হারুনের পিতা আবদুল জলিল, তার চার ভাই জামাল, জহুরুল, জাফর ও জাহাঙ্গীর, নিহত হালিমের আত্মীয় জহিরউদ্দিন এবং আবদুল হামেদ, তাজুল ইসলাম ও মহাবুল ওরফে মোবুল। আবদুল হামেদ, মোবুল ও তাজুল সরাসরি হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। এই হারুনের পিতাকে দিয়েই র‌্যাব আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করিয়েছিল। দৈনিক সংবাদেই বিভিন্ন সময়ে আমার পরিবেশিত একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দলাদলির ওপর। ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের রিপোর্ট ’অভ্যন্তরীণ কোন্দল : দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা; সম্মেলন স্থগিত’ শীর্ষক শিরোনামে। ওইদিন তাজুল ফারুক হত্যাপ্রচেষ্টার জন্য মেয়র লিটনকেই দায়ি করা হয়েছিল। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগে পারিবারিকীকরণের প্রক্রিয়া শিরোনামে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালের ১৯ মে। ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর বাজারে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব বাবুকে। এখানেও ঘটনার নায়ক র‌্যাপিড একশান ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব। এই ঘটনায়ও সাধারণ মানুষ র‌্যাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। বাবু হত্যার ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি তথাকথিত জুডিশিয়াল তদন্তে জায়েজ করা হয়। অর্থাৎ র‌্যাবকে বাঁচিয়ে দেয় বিচার বিভাগ। আর মজনু হত্যা মামলাটি এখনও থানায় ফাইল বন্দি। ঘটনার চার বছর অতিক্রম হচেলও মামলায় পুলিশ চার্জশিট দেয়নি। অথচ অসহায় দরিদ্র নিরপরাধ লিমন হোসেনের নামে করা র‌্যাবের মিথ্যা মামলায় চটজলদি চার্জশিট দিলো পুলিশ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ এর ৫ অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে নির্যাতনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেখানে বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না। কিংবা কাহারো সহিত অনুরুপ ব্যবহার করা যাইবে না।’ আন্তর্জাতিকভাবেও নির্যাতন সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না।’ শুধু যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে নির্যাতন নিষিদ্ধ তাই নয় পৃথিবীর সকল ধর্মেই নির্যাতন নিষিদ্ধ। নির্যাতন নিষিদ্ধ পবিত্র কোরআন, বাইবেল, ত্রিপিটকেও। নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ‘কনভেনশন এগেইনেস্ট টর্চার-ক্যাট’ এ বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর অনুমোদন করে ১৪ নম্বর ধারাটি ছাড়া। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রিজার্ভ করা ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দৈহিক নির্যাতনের শিকার কোন বন্দি যাতে আইনগত প্রতিকার এবং যতটা সম্ভব পরিপূর্ণ পুনর্বাসনের বন্দোবস্তসহ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের সুযোগ পান, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। দৈহিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার পোষ্যবৃন্দ উক্ত ক্ষতিপূরণের অধিকারী হইবে। জাতীয় আইনের আওতায় নির্যাতিত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের কোন অধিকার এই ধারার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত হবে না।’

নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সংসদে একটি প্রাইভেট বিল উত্থাপন করেন ২০০৯ সালে। সেটিকে আজও আইনে পরিণত করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বর্ষীয়ান নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিল বারবার সংসদে ডিজিএফআইয়ের নির্যাতনের কাহিনী তুলে ধরেছেন। তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সংসদ তাঁর কথার কোন মূল্য দেয়নি আজও। এই হলো বাংলাদেশ!

আমার কী দুর্ভাগ্য দেখুন, শুধু আমার কর্মকান্ডের (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী খবর পরিবেশন) কারণে আমার শ্বশুরকে বিগত ২৯ ডিসেম্বরের (২০০৮) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেন না। শুধু কী তাই, তিনি যাতে স্বতস্ত্রভাবে নির্বাচন করতে না পারেন তার পথটিও বন্ধ করা হয়েছিল। একজন কোটিপতি ব্যবসায়িকে নমিনেশন দিলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে নামেন এবং আন্দোলনের মুখে তাঁকে নমিনেশন দেয়া হয়। কিন্তু ওটা যে ছিল একটা কৌশল তা বোঝা যায় তাঁকে চূড়ান্ত নমিনেশন না দেবার মধ্য দিয়ে। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে রাজশাহী জেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক বিগত ৪৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রগণ করে আসছেন। তিনি তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক এবং খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশিদ বহুল আলোচিত মাগুড়ার উপনির্বাচনে কারচুপি জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং একারণে রাজনৈতিক মামলায় হয়রাণির শিকার হন। আমার শ্বশুরই রাজশাহীতে প্রথম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। একারণে তাঁকে এবং তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ রাজশাহীর চারজন সাংবাদিককে বাংলা ভাই ও তার বাহিনী প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু লোভনীয় অফার পেলেও কখনও আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি অন্য কোন দলে। যদিও যারা ফেরদৌস আহম্মেদ কোরেশীর সঙ্গে এবং ডিজিফআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংস্কারপন্থি হয়েছিলেন নিজের ব্যবসা রক্ষায়। তারাও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেয়েছেন এমন নজির আছে। শোনা যাচ্ছে, র‌্যাব, ডিজিএফআই, আর্মি এবং রাজশাহীর মাননীয় মেয়র মহোদয়ের চাপেই নাকি আমার শ্বশুরকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। আমরা জানি না এটা সত্য কিনা। কিন্তু যদি সত্য হয় তবে এটা রাজনীতির জন্য শুভ নয়। যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেকেই বলছেন, সংসদ নাকি ব্যবসায়িদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

এইতো গত ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস চলে গেলো। আজ থেকে চার বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে (৩ মে) আমাকে র‌্যাবের মেজর রাশীদ হত্যার হুমকি দিয়েছিল। বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। রাজশাহীর এক সময়ের টপ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ বেনজিরকে র‌্যাব সদস্যরা ২০০৭ সালের ২ মে বিকেলে তার বাড়ির শোবার ঘরের বিছানায় গুলি করে। আর র‌্যাব সদস্যরা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার শিশুকন্যা ও স্ত্রীর সামনে। এতে তার দুই পা গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর তার বিছানায় পিস্তল রেখে তাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হয়। এই মামলায় বেনজির এর দশ বছরের জেল হয়েছে। তিনি এখন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। বেনজিরের স্ত্রী মিনা জামান (২৬) বলেন, ‘গত ২ মে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সাদা পোশাকে RAB’র ৬ সদস্য আমাদের বাড়িতে আসে। তারা ড্রয়িং রুমে আধা ঘন্টা গল্প করে বেনজিরের সঙ্গে। আমাকে ডাইনিং টেবিলে আটকে রাখে তারা। তারা রান্নাঘর তল্লাশি করে। কিছুক্ষণ পর আরও ৮/৯ জন পোশাক পরা র‌্যাব সদস্য আসে। তারা আসার পরই বেনজিরকে শোবার ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে বিছানায় বসিয়ে RAB সদস্যরা বেনজিরের দু’পায়ে গুলি করে। বেনজিরের ডান পায়ের হাটুতে একটি গোঁড়ালিতে একটি এবং বাম পায়ের হাটুতে একটি গুলি করা হয়। আর ঘরের মেঝেতে তিনটি গুলি করে তারা। এসময় বেনজিরের শিশু কন্যা প্রিয়াংকা (১০) দৌঁড়ে তার বাবার কাছে যেতে চাইলে র‌্যাব সদস্যরা তার গলা টিপে ধরে। আর আমার দুই হাত ধরে আটকে রাখে র‌্যাব সদস্যরা। স্ত্রী ও কন্যার সামনেই র‌্যাব তাদের পকেট থেকে পিস্তল ও গুলি বের করে বিছানায় বেনজিরের হাতের কাছে রেখে দেয়। এরপর কয়েকজন সাংবাদিককে দিয়ে সেই ছবি তোলানো হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেনজির আধাঘন্টা অচেতন ছিলেন। অন্যায় না করেও আমার স্বামীর ওপর এতবড় অত্যাচার করা হলো। আমি সহ্য করছি কিন্তু আল্লাহ সইবে না। র‌্যাবের বিরুদ্ধে কিছু করতে চাই না। কারণ ওরা অনেক ক্ষমতার অধিকারী।’

বেনজিরকে ২০০২ সালে গ্রেফতার করে অপারেশন ক্লিনহার্ট এর সময় যৌথ বাহিনী। বেশ কিছুদিন জেল খাটার পর বেনজির জামিনে বেরিয়ে আসেন। প্রায় সবক’টি মামলায় তিনি খালাস পান। মূলত: তখন থেকেই বেনজির তার অতীত কর্মকান্ড ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরে আসন বলে বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যায়। এই সমাজ, রাষ্ট্র কাউকে ভাল হবার সুযোগও দেয় না। তার বড় প্রমাণ রাজশাহীর বেনজির। বেনজিরের গুলিবিদ্ধ হবার ঘটনাটি সিএসবি নিউজ এ প্রচারিত হলে ২০০৭ সালের ৩ মে রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো প্রধান তথা আমাকে মোবাইলে হুমকি দেন। সিএসবির রিপোর্টার ও ক্যামেরাকে RAB-৫ এর অপারেশনসহ সবধরনের কর্মকান্ডের আশেপাশে নিষিদ্ধ করা হলো বলে ঘোষণা দেয় ওই কর্মকর্তা। এই হুমকির বিষয়ে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন একটি আর্জেন্ট অ্যাপিল করে। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্তের জন্য রাজশাহী মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়।

রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আমাকে একটি চিঠি দেন (স্মারক নং-আরএমপি/মডেল থানা বোয়ালিয়া/২১২ (২)/১ তারিখ-২/৭/২০০৭) হুমকির বিষয়ে লিখিত বক্তব্য প্রদান করার জন্য। এরপর ২০০৭ সালের ৩ জুলাই বোয়ালিয়া মডেল থানায় সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত জবানবন্দিতে বলি-“গত ২ মে (২০০৭) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমাদের কাছে খবর আসে যে নগরীর হোসেনীগঞ্জ বেতপট্রিতে মোহাম্মদ বেনজিরের বাসায় একটি ক্রসফায়ার এর ঘটনা ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি, আমার সহকর্মী তোফায়েল আহাম্মাদ এবং ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ মাসুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও ফুটেজ সংগহ করি। র‌্যাব সদস্যরা সেখানে বেনজিরের বাড়ির শোবার ঘরে তার স্ত্রী ও শিশু কন্যার সামনে তার পায়ে গুলি করে এমন তথ্য পাই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। ঘটনাস্থলে অপারেশন পরিচালনাকারী র‌্যাবের কোন সদস্য ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে গিয়ে রিপোর্ট পাঠাই। যা রাত একটা থেকে প্রচারিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৩ মে, ২০০৭ দিবাগত রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে আমার ০১৭২০০৮৪৯৪৪ মোবাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা (তৎকালীন) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ তার ০১৭১৪০৪৯৪৩১ মোবাইল নম্বর থেকে আমাকে ফোন করেন। ফোন রিসিফ করে সালাম দেয়া মাত্র তিনি জানতে চান যে, গতকাল রাতে দুবার রিপোর্টটি প্রচার হয়ে বন্ধ হয়ে গেল কেন? জবাবে আমি বলি সেটা হেড অফিসের ব্যাপার। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিপোর্টটি প্রচার করেছেন। আমি বলি, এটা আমার পেশাগত দায়িত্ব, অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেন, আপনি বেনজিরের স্ত্রীর বক্তব্য এবং তার শিশুকন্যার ক্রন্দনরত ছবি প্রচার করেছেন কেন? জবাবে আমি জানতে চাই, আপনি কি অফিসিয়ালী জানতে চাচ্ছেন? এ পর্যায়ে মেজর রাশীদ রুঢ় এবং মুখে উচ্চারণ করা যায় না এমন ভাষায়প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলেন, আপনি রিপোর্টটি কেন প্রচার করেছেন তার সঠিক জবাব দিতে না পারলে আপনার বিরুদ্ধে আমরাই ব্যবস্থা নেবো। আমি তাকে জনাই, আমি কোন অপরাধ করিনি।

মেজর রাশীদ আবারও জানতে চান এই বলে যে, অন্য কোন চ্যানেল এই রিপোর্ট প্রচার করেনি আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই প্রচার করেছেন এবং আপনার এই কাজটি এন্টি ইস্টেট একটিভিটির পর্যায়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, আপনি এবং আপনার কোন সহকর্মী ও সিএসবির ক্যামেরা যেন র‌্যাব ও র‌্যাবের কোন কর্মকান্ড তথা চৌহদ্দীর মধ্যে না আসে। এরপরও যদি র‌্যাবের কোন কর্মকান্ডের কাছে আপনাকে এবং সিএসবির ক্যামেরা দেখা যায় তাহলে র‌্যাব আপনার বিরুদ্ধে একশান এ যাবে। এরপর তিনি ফোনের (মোবাইল) সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে জানতি পারি যে, এই রিপোর্টটি সিএসবি নিউজ এ প্রচারিত হবার পর র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা সিএসবি নিউজ এর প্রধান বার্তা সম্পাদক জনাব আহমেদ জোবায়েরসহ কয়েকজন সাংবাদিককে মোবাইল করে হুমকি প্রদর্শন করেন। আমি ওইসময়ই পুলিশের কাছে আশংকা করেছিলাম যে, আমাকে হয়ত ক্রসফায়ার নাটকের শিকার হতে হবে র‌্যাবের দ্বারা! তার পাঁচ মাস পরেই র‌্যাব আমার ওপর প্রতিশোধের আগুন জ্বালায় সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনিভাবে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা মেজর রাশীদ শুধু শুধু হুমকিই দেননি তিনি যথাযথভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছেন আমার ওপর। আমাকে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে গ্রেফতার করে আমার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ সহসাই দেখে না। ঠিক একইভাবে আমাকে মেজর রাশীদের হুমকি প্রদানের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত রিপোর্টটিও আজও প্রকাশ্যে আসেনি। আমাকে হুমকি দেয়ার বিষয়ে তদন্তে কি পাওয়া গেছে, কি সুপারিশ দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রের সামান্য একজন কর্মচারী হয়ে কেন বেআইনীভাবে একজন সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীর ওপর বর্বর নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে তার নামে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগের মামলা চাপিয়ে সমাজে হেয় করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর কি কখনও দেবে এই রাষ্ট্র, সমাজ।

মানবিকতা, নীতিবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ সবকিছুকে গিলে খাচ্ছে অসুস্থ্য রাজনীতি, অনৈতিকতা, সুবিধাবাদিতা ও তোষামদী সংস্কৃতি। এজন্য গুমাধ্যমও তার দায় এড়াতে পারেনা। গণমাধ্যম আছে তার নিজস্ব ব্যবসা ও রাজনৈতিক পছন্দ নিয়ে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। সব অন্যায়, অরাজকতা আর অনৈতিকতা হামলে পড়ছে জনগণ তথা সাধারণ মানুষের ওপর। জনগণের করের টাকায় লালিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী হত্যা-নির্যাতন চালাচ্ছে জনগণকেই।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অবিচার-বর্বরতা ও অমানবিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন কলেজ ছাত্র লিমন এবং সাংবাদিক-মানবাধিকাররকর্মী এফএম আবদুর রাজ্জাক। এখনও আমি কালোপোশাকধারী কোন কিছু দেখলেই আঁতকে উঠি। দুঃসহ যন্ত্রণা আর কষ্টের স্মৃতিগুলো এখনও আমাকে তাড়া করে ফেরে। অব্যাহত হুমকি ও আতংকের মুখে ২০০৯ সালে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। আমার এই অবস্থার জন্য রাষ্ট্রই দায়ি। নির্যাতনকারিদের শাস্তি চাই। আমি বিচার চাই, ন্যায় বিচার। কিন্তু এটা আমি জানি যে, বিচার আমি পাবো না কোনদিনও। কারণ সেখানে বিচারতো অবিচারের হাতে বন্দি। আমার সোনার বাংলায় আইনের কোন শাসন নেই। আছে বিচার বহির্ভূত রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও হত্যার রাষ্ট্রীয় বৈধতা। সেখানে ন্যায় বিচার আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। বলতে গেলে ধর্মের নামে দুনিয়াজুড়েই সন্ত্রাস পরিচালনা করে বিন লাদেন। দুঃখজনক হলেও সত‍্য এই সন্ত্রাসী আমেরিকার হাতেই জন্ম নিয়েছিল তৎকালিন কমিউনিষ্টশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের হাত থেকে আফগানিস্তানকে রক্ষার নামে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন অভিযোগ এনে মাঝেমধ‍্যেই কলাম চালিয়ে থাকেন। যাহোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে বহু আগেই। কিন্তু আফগানিস্তানের জনগণ আজও মুক্ত পায়নি। সেখানে মানুষকে পশুপাখির ন‍্যায় মারা হচ্ছে। আজকের বিশ্বে আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিহীন, তারা যেন প্রভূর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নানান ছলছুতোয় অভিযোগ এনে তারা দুনিয়াজুড়ে মানবতার বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই। সন্ত্রাসের রাজা যার হাতে সন্ত্রাসের রসদ ও শিক্ষা পেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে শায়েস্তা করার তার হাতেই লাদেন নিহত হলো। এ যেন এক নিয়তির নির্মম পরিহাস! লাদেনের বিচার কিংবা শাস্তি হয়নি, বাংলাদেশে রাজশাহীর মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন ও মেজর রাশীদ (বর্তমানে লে.কর্ণেল) এর বিচার হবে এমনটা ভাবার কোন কারণই নেই। কারণ সেখানে কাগজে কলমে গণতন্ত্র বিরাজমান থাকলেও বাস্তবে গণতন্ত্র মৃত! সেখানে নেই কোন আইনের শাসন, সুশাসন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা। জোর যার মুল্লুক তার এই অবস্থা বিরাজমান সমাজের সবর্স্তরেই।
লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de)