লাদেনের বিচার হয়নি, রাজশাহীর মে. লিটন ও মেজর রাশীদেরও হবে না!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ : আমেরিকা নিজেই বললো, “ওটা লাদেনকে ক্যাপ্চার করার অভিযান ছিলনা, তাকে হত্যা করার মিশনই ছিল”। তাকে ধরে তার বিচার করা উচিত ছিল। কারণ বিন লাদেন দেশে দেশে মানুষ মেরে সাম্প্রদায়িকতার বিশবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছিল। টুইন টাওয়ারে গণহত্যা চালিয়েছিল। তার বিচার হলে তার কাছ থেকে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং তার সহযোগি সন্ত্রাসীদের সম্পর্কেও বহু তথ্য পাওয়া যেতো। যা থেকে বিশ্ববাসি বঞ্চিত হলো। লাদেনের বিচার হলো না!
কোন হত্যাকান্ডকেই আইন ও নীতিগতভাবে সর্মথন করা যায় না। নিজেকে মানুষ ছাড়া কিছুই ভাবি না, র্ধমীয় কোন প্রাকটিসও করিনা ব্যক্তিগতভাবে। যারা বিন লাদেনের মতো শয়তানকে সর্মথন করেন তারাই কেবল সুবিধাবাদি এবং বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডকে সর্মথন করতে পারেন। আইন, মানবাধিকার, আর্ন্তজাতিক আইন, মানবিকতায় বিশ্বাসীরা সবরকম হত্যাকান্ডকে হত্যাকান্ড হিসেবেই দেখেন। আল কায়দা প্রধান মোস্ট ওয়ানটেড জঙ্গি নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। এই কর্মটি আন্তর্জাতিক আইন সমর্থন করে কিনা সে বিষয়ে মত দেবেন বিশেষজ্ঞরা। তবে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে এটা বলা খুব কঠিন নয় যে, নিরস্ত্র কোন মানুষকে হত্যা কোনমতেই জায়েজ নয়। নীতিগতভাবে কোন হত্যাই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। আমেরিকা থেকে পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে ভারত, লিবিয়া থেকে টিউনিশিয়া কোথাও শান্তি নেই? গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রশ্নের সম্মুখিন। ন্যায়বিচারতো সুদূর পরাহত ব্যাপার।

যাক, আজকের প্রসঙ্গ আমার সেটা নয়। কথা বলতে চাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে। সংবিধানের ঘোষণা অনুযায়ী দেশের মালিক জনগণ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এর অভ্যুদয় ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বৈষম্য-শোষণ, বঞ্চনা ও নির্যাতনমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার বা মূল উদ্দেশ্য। স্বাধীনতা অর্জনের পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধবিধস্ত এই দেশের অর্থনীতিকে সবল করতে এবং রাষ্ট্রের অবকাঠামো বিনির্মাণ ও প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্যে নানান পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এমনই সময় একাত্তরের পরাজিত শত্রু স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক চক্র দেশী-বিদেশী চক্রান্ত এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহায়তায় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন মানবাধিকার লংঘন ও নির্যাতনের ঘটনা বোধহয় আর কোথাও ঘটেনি। মূলত: এ ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়।

রাষ্ট্র, সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত চক্র, মানবাধিকার ল্ঘংনকারি সেনা কর্মকর্তা এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীর যৌথ প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রের শিকার আমি একজন পেশাদার সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। কেন কি কারণে এবং কিভাবে কাদের মাধ্যমে আমি বর্বর নির্যাতন ও চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের শিকার হলাম তার ওপর কোন গবেষণা করা গেলে হয়ত বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতন্ত্র, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা, মানবাধিকার লংঘন, রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, দুর্নীতি, দায়মুক্তি ও দুর্বৃত্তায়নের একটা পরিস্কার চিত্র পাওয়া যেতো। নিশ্চিত ক্রসফায়ারের হাত থেকে বেঁচে আসার এক বাস্তব করুণ কাহিনী নিজের জীবনটাকে কিভাবে বদলে দিলো?

মাতৃভূমির মাটি, পানি, হাওয়া, প্রকৃতি এবং পরিবার-বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এক হতভাগ্য সংবাদকর্মী আমি। ফি বছর দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ লড়াই করেন প্রাকৃতিক বিপর্যয় বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, মঙ্গাসহ নানান দুর্যোগের সাথে। দেশের গরীব, নিরন্ন খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য আমার মন কেঁদে ওঠে। প্রিয় পাঠক, দেশবাসি দূর প্রবাস ইউরোপ থেকে বলছি। আজ আপনাদের এক গল্প শোনাতে চাই। না, এ কোন কল্পকাহিনী নয়। আমার জীবনের এক কঠিন বাস্তব সত্য ঘটনা। এক করুণ বেদনাজাগানো এই গল্প আমার জীবনের অন্ধকার সময়। যা আমার প্রতিটি মুহুর্তকে পীড়িত করে। শুধু আমি এই যন্ত্রণার শিকার তা নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান চোখের জল মুছেই মানবাধিকার রক্ষার কাজ সম্পন্ন করছেন! লিমন আজ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। এমন শত শত লিমন আছেন যাদের অনেকেই নিহত আবার অনেকে পঙ্গু জীবন নিয়ে এখনো সংগ্রাম করছেন।

রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড কিংবা নির্যাতন একের পর এক ঘটে চলেছে। এর পেছনে মিডিয়ার ভূমিকাও কম নয়। নিজস্ব ব্যবসা ও রাজনৈতিক পছন্দ থাকার কারণে মিডিয়া সত্যিকারের ভূমিকা নিয়ে সংগ্রাম করতে পারছেনা। বরং মিডিয়া বন্দুকযুদ্ধের নামে তথাকথিত ক্রসফায়ারে হত্যা নির্যাতনের সহযোগি বলা যায়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দেয়া সর্ম্পূণ মিথ্যা স্টেটমেন্ট হুবহু মিডিয়ায় তুলে ধরে মিডিয়া পুরো রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-হত্যাকে বৈধতা দিয়ে আসছে শুরু থেকেই।

দুর্নীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির কাছে মানবিকতা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার কিংবা নৈতিকতা খুব একটা বড় বিষয় নয়। ক্ষমতা এবং লুটপাট ও পরিবার-দলতন্ত্রই প্রধান। জনগণ, মানবসেবা, জনগণের অধিকার কোন বিষয় নয়। তাইতো ক্ষমতায় থাকলে একরকম আবার ক্ষমতার বাইরে থাকলে অন্যরতম চেহারা দেখা যায় একইভাবে।

বিএনপি-জামাত জোট রাষ্ট্রীয় হত্যা-নির্যাতন সূচনা করেছিল একটি কালো বাহিনী তৈরী করার মধ্য দিয়ে। তারাই এখন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে দারুণ বিচলিত। অন্যপক্ষে আজকের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীগ বিরোধীদলে থাকার সময় বলেছিল এক আর এখন করছে অন্যটা। বিচার বিহর্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধের প্রতিজ্ঞা তারা এখন ভুলে গেছে। ফলে জনগণই অন্যায়-অত্যাচার-অবিচারের শিকার হচ্ছেন। সেটা বিএনপি হোক আর আওয়ামী লীগ হোক সবসময়ই মানুষের অধিকার পদদলিত।

২০০৯ সালে দেশ ত্যাগের পর সাংবাদিক বন্ধু এফ এম মাসুম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। নির্যাতনকারিরা বরাবরের মতোই দায়মুক্তি বা ইমপিউনিটি পেয়েছে। কেউ কেউ শুধু দায়মুক্তিই নয় পুরস্কারও পায়। খুলনার পাইকগাছায় আমার আরেক সাংবাদিক বন্ধু এফ এম আবদুর রাজ্জাকের চোখ তুলে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। এরও আগে দরিদ্র কলেজ ছাত্র ঝালকাঠির লিমন হোসেনের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। দেশটিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হিয়াস আহমদ নির্যাতিতত হয়েছেন। এমন শত ঘটনা ঘটছে অহরহ। দেশের আর একটি মানুষও যেন এমন যন্ত্রণাকাতর না হন। সেরকম প্রত্যাশা নিয়েই আমার এই লেখা।

‘লুব্ধক’ একটি বাসার নাম। রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৫৫ নম্বর বাড়ি এটি। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাস। আমি, আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী ফারহানা শারমিন এবং আমাদের চার মাস বয়সী সন্তান (বর্তমানে ৪ বছর) ফিমান ফারনাদ এই তিনজন বসবাস করতাম এই বাসার নিচতলার বাম অংশে। ড. ফখরুদ্দীন-মঈন উ আহমদের নেতৃত্বাধীন জরুরি সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের তুচ্ছ একটি ঘটনার জের ধরে শিক্ষার্থী বনাম সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ বাধে। এই সঘর্ষে শিক্ষার্থীদের পক্ষ নেন সাধারণ জনতা। জরুরি সরকারের নির্যাতনে অতিষ্ঠ দেশের মানুষ রাজপথে নেমে আসতে থাকেন শিক্ষার্থীদের সাথে। এরই জের ধরে সরকার দেশের প্রথম ২৪ ঘন্টার নিজ চ্যানেল সিএসবি নিউজ এর প্রচারণা বন্ধ করে দেয়। সিএসবির রাজশাহী ব্যুরো প্রধান দায়িত্বে ছিলাম। সিএসবি বন্ধ। তাই সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো অফিস (মহানগরীর কাদিরগঞ্জে) খোলা হয় না আগের মত। ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে কাজ করতে গিয়ে পরিবার এবং সহকর্মী কাউকেই তেমন সময় দিতে পারতাম না। সিএসবির স¤প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়ে সময় কাটানোর মত কোন কাজ ছিল না হাতে। তাই প্রেসক্লাবে মাঝে-মধ্যে আড্ডা দিতাম অনেক রাত পর্যন্ত। তবে রাত ১০টার আগেই বাড়িতে আসতে হবে। ফারহানা শারমিন এটা চাইতো। কিন্তু তারপরও অনেক সময় যথাসময়ে বাড়ি ফেরা হতো না। বাসায় ফিরতে একটু দেরী হলে (রাত ১০টা অতিক্রম হলে) মোবাইলে রিং আসতো ফারহানার কাছ থেকে। এরপর ফারহানা আমাদের একমাত্র ফিমানের কণ্ঠ শুনাতো আমাকে। আমিও দ্রুত ফিরতাম বাসায়।

২০০৭ সালের গত ২৩ অক্টোবর রাত ১১টা পর্যন্ত ছিলাম রাজশাহী প্রেসক্লাবে। এরই মধ্যে অন্তত: দুইবার ফোন পেয়েছি ফারহানার। রাত তখন ১১টা কি সাড়ে ১১টা ক্লাব থেকে চলে আসি বাসায়। ফিমান সেদিন ঘুমাতে বেশ বিলম্ব করছিল। তাই তার সাথে আমরা খেলছিলাম দুজনে (স্বামী-স্ত্রী)। তখন পর্যন্ত আমরা রাতের খাওয়া সম্পন্ন করিনি। টিভিটা আপনমনে চলছিল। ফিমানকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছি উভয়ে। এক পর্যায়ে ফিমান ঘুমিয়ে পড়ে। আমরাও খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। রাত অনুমান দেড়টা আকস্মিক বিকট শব্দে বেজে ওঠে আমাদের বাসার কলিংবেল।

বিরামহীনভাবে কলিংবেল বাজতে থাকে। ফলশ্রুতিতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরের দরজা খুলে বেলকুনীতে বেরিয়ে আসি। এসময় আমার কোলেই ছিল আমাদের ফিমান ফারনাদ। বুঝতে পারলাম একদল সশস্ত্র মানুষ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। অপরিচিত লোকদের সবার হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু কেন? পরক্ষণেই মনে হলো আমার নামে যে মামলা রয়েছে তারজন্য হয়ত ধরতে এসেছে। ওই মামলায়তো হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছি আমি। আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমার মত একজন নগন্য সাংবাদিককে ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরতে হবে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত নাকি দাগী অপরাধী? আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেতো পোশাক পরা থাকবে। সিভিল পোশাকে সবার হাতে অস্ত্র। এরা কি তবে সন্ত্রাসী নাকি ডাকাত দল? তাহলে কি ওরা ডাকাতি করতে এসেছে এই বাড়িতে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন বাজতে থাকে নিজের মনের মধ্যে।

অপরিচিত লোকেরা ইতোমধ্যে গোটা বাড়ির সবক’টি কলিংবেল বাজিয়েছে। শুধু এই বাড়িরই নয় আশপাশের বাড়ির সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির একেবারে তিনতলা থেকে বাড়ির মালিক জনাব আবুল কাশেম ও তার পুত্র লিখন নিচে নেমে আসেন। সিভিল পোশাকধারী ১০/১২ জন সশস্ত্র লোক বাড়ির যে অংশে আমরা থাকি সেই অংশের বেলকুনীর দরজার কাছে আসেন। তারা নিজেদেরকে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে আমার বাসা তল্লাশি করবেন বলে দরজা খুলতে বলেন। এসময় আমি এবং আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করি যে, আপনারা কারা? আমি উনাদের উদ্দেশে বলি, আপনাদের পরিচয় নিশ্চিত না হলে আমি দরজা খুলবো না। তখন তারা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি দরজা খুল, নইলে তোর খুব অসুবিধা হবে।’ আমি বলি কি ধরনের অসুবিধা হবে, এতো রাতে একজন নাগরিকের বাড়িতে এসে আপনারা ডিসটার্ব করছেন কেন, কিসের কি অসুবিধা হবে? তারা আমাকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বলে গালমন্দ করতে থাকেন।

সত্যি সত্যি প্রশাসনের লোক নাকি সন্ত্রাসী-ডাকাতদল হানা দিয়েছে আমার বাসায় তা জানার জন্য আমি বোয়ালিয়া মডেল থানায় মোবাইল করি। থানার ডিউটি অফিসার আমাকে জানান, ‘থানা থেকে আমাদের কোন লোক যায়নি আপনার বাসায়। কে বা কোন বাহিনী গেছে তা আমাদের জানা নেই।’ এক পর্যায়ে সশস্ত্র লোকেরা বেলকুনীর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। তখন স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে এরা তাহলে ডাকাতদল! কিছুক্ষণ পর তারা (সশস্ত্র লোকেরা) নিজেদেরকে র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের লোক বলে পরিচয় দেন।

আমি বলি যে, আপনারা র‌্যাবের লোক কিন্তু দেখেতো মনে হচ্ছে না। তাছাড়া আমার বাসা সার্চ করবেন আপনাদের হাতে কি সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আমি এবং আমার পতœী সমস্বরে একথা বলি। এ পর্যায়ে তারা রেগে যায়। এসময় বাড়ির মালিকের ছেলে লিখন সশস্ত্র লোকদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা তাকে প্রহার করতে থাকেন। আমি মনে মনে ভাবি যে, সত্যিই যদি র‌্যাবের লোক হয় তাহলে কেন তারা মারধোর করছে বাড়ির মালিকের ছেলেকে। তখন আমি তাদের কাছে হাতজোড় করে অনুনয় করে বলতে থাকি, আপনারা উনাকে মারছেন কেন ? আপনারা কোন অন্যায় আচরণ করবেন না। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আপনারা বাসা তল্লাশি করুন। কিন্তু আমার প্রতি কোন অবিচার করবেন না। আমার ঘরে আপনাদের হাতের অস্ত্র রেখে আমাকে অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যাবেন না, প্লিজ। এটা বলার কারণ আছে। আর তা হলো র‌্যাবের এটা পুরনো অভ্যাস। নিজেদের অস্ত্র যে কারও হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে আটক করে নিয়ে যাবার পর র‌্যাব বিবৃতি দেয় ‘ও বড় সন্ত্রাসী’।

যাহোক, আমার শিশুপুত্র ফিমানকে তার মায়ের কোলে দেই। আমি বেলকুনীর গ্রিলের দরজা খুলি। দরজা খোলামাত্র র‌্যাব সদস্যরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে দরজার বাইরে নেন। তারা আমার দু’ হাতে হ্যান্ডকাপ পরান। আমার দু’ চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। শুধু তাই নয়, আমার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হয়। শুনেছি এধরনের টুপি এশমাত্র ফাঁসির আসামিদের ফাঁসি মঞ্চে নেয়ার সময় পরানো হয়। আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী ও বাড়িওয়ালার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ী কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকেন। একটি সভ্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একজন সাংবাদিকের সঙ্গে এমন অসভ্য-বর্বর আচরণ করতে পারে, তা আমার জানা ছিল না।

সন্ত্রাসী কায়দায় র‌্যাবের লোকেরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোর মধ্যে আমার সামনে দুজন, আমার পেছনে দুজন, আমার ডানে দুজন এবং আমার বাম পাশে দুজন সশস্ত্র লোক বসে শক্তভাবে ধরে থাকলো আমাকে। এদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে বললো যে, ‘এই ব্যাটা এবার বল তোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি’? আমি বলি তা কি করে আমি জানবো। তখন ওরা বলে আমরা র‌্যাব তুই জানিস না র‌্যাব কোথায় নিয়ে যায় মানুষকে। তখন আমি বলি তাহলে কি আমাকে আপনারা ক্রসফায়ারে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? এসময় তারা আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। এ অবস্থায় মাইক্রো চলতে শুরু করলো। রাস্তার বাঁক আর রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার অনুমান করে বুঝতে পারি যে, গাড়ি যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট ক্রস করার পর স্পিড ব্রেকার ও তারপর মাইক্রোটি ডানে মোড় নিলে নিশ্চিত হই যে, আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পথিমধ্যে গাড়ির ভেতরে আমাকে মারধোর করা হয়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে তারা। তারা আমাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া ও ‘ক্রসফায়ার’ করার হুমকি দেয়। গাড়ির ভেতওে একজন বলে যে, ‘আল্লাহর নাম ডাক, দোয়া-কালাম পড়, তোকে ক্রসফায়ার করা হবে’। তখন মনে মনে ভাবছি যে, আমিতো কোন অপরাধ করিনি, আমি খুনি নই। তারপরও আমাকে ক্রসফায়ার দেয়া হবে। এটা কি হয়? পরক্ষণেই আবার ভাবি সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নতুন কিছু নয়। এখানে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনদের মত মানবতাবাদী মানুষদেরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সইতে হয়। কিন্তু খুনি, যুদ্ধাপরাধী নিজামীরা গাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় নিশ্চিত হলাম যে, সত্যি সত্যি আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়ার পর আমার দু’হাত বেঁধে আমাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে টাঙ্গিয়ে রাখা হলো। এর আগে আমাকে এই ঘর ও ঘর সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো নামানো করা হলো বেশ কিছু সময় ধরে। রাতে আমার আশপাশে বুটের খট খট শব্দ করে ৪/৫ জন লোক আসতো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার একই শব্দ করে হেঁটে চলে যেতো তারা। চোখ বাঁধা ও কালো টুপি পরিয়ে এবং আমাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় সারারাত। এভাবে রাতভর আমার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সকাল আনুমানিক আটটার দিকে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাকে নিচে নামানো হলো। একটি ছোট রুটি পাতলা ডাল দিয়ে খেতে দেয় তারা। রুটির সাইজ আর পানির ন্যায় ডাল অনুভব করে আবার ভাবি, তাহলে কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবেক ভিসি সাইদুর রহমান খান, আবদুস সোবহান ও মলয় ভৌমিক এর ওপরও এমন আচরণ করেছে র‌্যাব সদস্যরা। এই তিন গুণি শিক্ষককেও র‌্যাব-৫ এর সদস্যরাই গ্রেফতার করেছিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের ওপর কি অমানবিক-বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে ‘পশুর দল’। জেলে গিয়ে জানতে পাই, বিশিষ্ট নাট্যকার মলয় ভৌমিকের দু’ পায়ে ব্যাপক টর্চার করে এই জানোয়ারের দল। সাইদুর রহমানের মতো শিক্ষককে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে সজোরে ঘুরিয়েছে।

রাতভর উপরে ঝুলে থাকার সময় মনে হচ্ছিল আমার শরীর থেকে বোধহয় হাত দু’টো আলাদা হয়ে গেছে। একটি গামছা দিয়ে আমার চোখ দু’টি শক্ত করে বেঁধে দেয়ার পর আবার মোটা কালো কাপড়ের একটি টুপি পরিয়ে দেয়ায় আমার যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু টুপি খুলে দেয়নি অমানবিক ওই ‘নির্যাতনকারি খুনির দল’। সকালে নাস্তা হিসেবে যে পাতলা রুটি আমাকে খেতে দেয়া হয় তা থেকে সামান্য একটু ছিঁড়ে মুখে দিয়েছি। পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাই। এরপর আমাকে আবারও উপরে লটকানো হয় একইভাবে। আমাকে খেতে দেয়ার সময়ও টুপিটি খোলা হয়নি। শুধুমাত্র গোঁফ পর্যন্ত টুপিটি উঠিয়ে দেয়া হয়। আমার কাছে এসে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে র‌্যাব সদস্যরা।

সকাল অনুমান ১০টার দিকে দুই ব্যক্তি এসে আমার নাম জানতে চান। ওই দুইজনের কথোপকোথনেই বুঝতে পারি এরা আমার পরিচিত। গ্রেফতার হওয়ার আগে আগে পেশাগত কারণে এই দু’জনের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং উনাদের সঙ্গে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। এরা হলেন র‌্যাব-৫ এর ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী (সিপিসি) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে পদোন্নতিপ্রাপ্ত লে. কর্ণেল) ও রাব-৫ এর সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হুমায়ুন কবির। এরা এখন রাজশাহীতে নেই। মেজর রাশীদকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একজন সদস্য করে পাঠানো হয়েছিল আইভরিকোষ্টে। মেজর কবিরকে বান্দরবানে বদলি করা হয়েছে বলে শুনেছি। কথিত অপহরণের অভিযোগে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে। ২০০৭ সালের ১৮ মে এ ঘটনা ঘটে। তখন পরিচয় হয়েছিল মেজর কবির এর সঙ্গে। আর সিএসবি নিউজ বন্ধ হবার এক সপ্তাহ আগেও মেজর রাশীদের সাথে তারই কার্যালয়ে কথা বলি পেশাগত কারণে। আমারসঙ্গে সিএসবি নিউজের ক্যামেরাম্যান মাসুদও ছিলেন।

পূর্ব পরিচিতি এই দু’জনের মধ্যে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ এক পর্যায়ে নির্যাতন শুরু করলেন। নির্যাতনের শুরুতেই মেজর রাশীদ আমাকে বলেন, “এই ফকিরনির বাচ্চা, তোর এতো প্রেসটিজ কিসের? শালা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী। তোর ‘পাছার ভেতর’ ঢুকিয়ে দেবো সাংবাদিকতা। এই শুয়োরের বাচ্চা তুই আর রিপোর্ট করবি না সিএসবি নিউজ-এ। লিচু বাগানের রিপোর্ট, বেনজিরের বউয়ের কথা, খায়রুজ্জামান লিটন সাহেবের (জনাব লিটন বর্তমানে রাজশাহীর মেয়র, আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলার বাদি জনাব লোটনের ভাইপো) পারিবারিক ওয়াকফ্ এস্টেট নিয়ে রিপোর্ট করবি না ? হারামজাদা তুই র‌্যাব দেখেছিস, কিন্তু র‌্যাবের কাম দেখিসনি। তোকে ক্রসফায়ারে মারবো শালা।”

আবার ভাবতে থাকি যে, র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আমাদের জাতীয় নেতার সন্তান লিটন সাহেবের নাম বলছেন কেন? তাহলে কি র‌্যাব সদস্যরা জনাব লিটনের প্ররোচণাতে আমাকে ধরে এনে আমার ওপর নির্যাতন করছে? কিন্তু আমিতো লিটন সাহেবের কোন ক্ষতি করিনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। এই রিপোর্ট করতে গিয়ে যদি লিটন সাহেব আহত-মর্মাহতও হয়ে থাকেন তাহলেওতো তিনি আমার ওপর এমন প্রতিহিংসা পরায়ন হতে পারেন না। তবে কি র‌্যাবের এই মেজর লিটন সাহেবের নাম ব্যবহার করে পুরো দোষটি তার (মেয়র সাহেবের) ঘাড়ে ফেলতে চাইছেন? পরবর্তীতে জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যৌথ ষড়যন্ত্রের অন্যতম রুপকার মাননীয় মেয়র মহোদয় নিজেও। মেয়র লিটন, র‌্যাবের মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ, মেয়রের চাচা মাহফুজুল আলম লোটন, রাজশাহীর একজন নৃত্যশিল্পী যৌথভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। বলে রাখা ভালো, মেয়র লিটন, জামায়াত সমর্থক মেজর রাশীদ এবং গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের জামায়াতী কতিপয় সদস্যরা আমাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করতে চেয়েছিল।

নির্যাতনকালে আমি মেজর রাশীদকে বলি, আপনি রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী। আপনি আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে যাচ্ছেন? আপনি কিভাবে একজন নাগরিকের সাথে এমন অসভ্য আচরণ করছেন? রাষ্ট্র, সংবিধানতো আপনাকে কোন ব্যক্তিকে নির্যাতন করার অধিকার দেয়নি। এক পর্যায়ে তিনি (মেজর রাশীদ) আমার বাম গালে থাপ্পড় মারলে আমার ঠোট ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার বাম হিপে একটি গোল বলের ন্যায় বস্তু দ্বারা কঠিন জোরে এশাধিকবার আঘাত করেন। ওটা যে ইলেকট্রিক শক তা আমার জানা ছিল না। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে এই ইলেকট্রিক শক বিষয়ে জানতে পারি। এই শক যখন দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন আমার গোটা শরীরে আগুন ধরেছে। ইলেকট্রিক শক দেয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তখন অনুমান সকাল সাড়ে ১০টা। এসময় আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। আমাকে বসানো হয় ইলেকট্রিক চেয়ারে। এর প্রায় আধাঘন্টা পর টর্চার সেলের ফ্লোরে শুইয়ে দেয়া হয়। এরপর দুই মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও হুমায়ুন কবির একযোগে আমার ওপর হামলে পড়েন। এসময় আমার মনে হচ্ছিল, যেন এই দুই সেনা কর্মকর্তা তাদের ব্যক্তিগত জিঘাংসা মিটাতেই আমাকে নির্যাতন করছেন। আমার শরীরে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন মেজর রাশীদ ও হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে বুটের লাথি ও কিল-ঘুসি চলে সমানতালে।

প্রায় এক ঘন্টা ধরে সেনাবাহিনীর ওই দুই সদস্য আমার ওপর নির্যাতন চালান। তারা উভয়ে একটা মোটা বাঁশের লাঠি (গোলাকৃতির) দিয়ে আমার দুই পায়ের তালুতে বেধড়ক পিটিয়েছেন। নির্যাতন চালানোর সময় সেনা কর্মকর্তাদের উভয়ই ছিলেন উল্লসিত। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার জ্ঞান ফিরলে আমি বুঝতে পারি যে, একটি পরিত্যক্ত রান্না ঘরে আমি খড়ের ওপর পড়ে আছি। যেখানে পোকা-মাকড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে ওরা গরু-ছাগলের ন্যায় আমার চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ফেলে রাখে সেই ঘরের মধ্যে। দুপুর অনুমান দেড়টার দিকে আমাকে উঠে দাঁড়াতে বললো র‌্যাবের দুই সদস্য। কিন্তু নির্যাতনের ফলে আমি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এসময় ‘অভিনয় করছে শালা’ এই মন্তব্য করে মেজর রাশীদ আমার দু’পায়ের উপরে তার পায়ের বুট দিয়ে খিচতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটার মার হয়নি। শালা অভিনয় করছে। কুত্তার বাচ্চা উঠে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে হাঁট। নইলে আরও মারবো। শালা তোকে ক্রসফায়ার দিলে ঠিক হবি।’ আমি বলি যে, আমি কোন অভিনয় করছি না প্রকৃতপক্ষে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারছি না। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে নারাজ মেজর রাশীদ। মেজর রাশীদ বলছেন যে, তুই যতক্ষণ হাঁটতে পারবি না ততক্ষণ মারতে থাকবো। নির্যাতন থেকে সাময়িক রেহাই পাবার জন্য আমি কষ্ট করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর ও হাঁটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

মেজর রাশীদ তার বুট পরা পা দিয়ে আমার দু’পায়ে পায়ে খিচতে খিচতে আমাকে একটি রুমে নিয়ে যান। বেলা অনুমান দু’টায় আমার মাথা থেকে কালো কাপড়ের টুপি সরিয়ে চোখ থেকে গামছা খুলে দেয়া হয়। মনে হলো আমি যেন কবরের অন্ধকার থেকে আলোতে এলাম। শান্তিমত শ্বাস-প্রশ্বাস নিলাম। র‌্যাব সদস্যরা একটি ফরমে আমার দুই হাত ও দুই হাতের সব আঙুলের ছাপ নিল। আমার বুকে আমার নাম লিখে তা সেঁটে দেয়া হলো। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার মহড়া শেষে পুনরায় গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে আমার মাথায় কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হলো।

আমাকে উঠানো হলো একটি মাইক্রোতে। এসময় RAB’র কেউ আমাকে কানে কানে বললেন, ‘ব্যাটা আল্লাহ আল্লাহ কর তোকে বাগমারায় ক্রসফায়ার দেয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছি।’ বেলা আনুমানিক তিনটায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালিয়া মডেল থানায়। র‌্যাব, আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দিতে চেয়েছিল বোয়ারিযা মডেল থানার মাধ্যমে। কিন্তু বোয়ালিয়া থানার পুলিশ র‌্যাবকে জানায় যে, এই মামলা সে (আকাশ) জামিনে আছে তাকে গ্রহণ করা যাবে না। থানায় নেয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে সোজা হয়ে হাঁটবি। নইলে তোকে আবার ফিরিয়ে আনবো এবং ক্রসফায়ার-এ মারবো। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবি আমাকে মারধোর করা হয়নি।’ মনে মনে ভাবি আমাকে মেরে ফেললেও কখনও আমি মিথ্যার আশ্রয় নেবো না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আমাদের সন্তান ফিমান ফারনাদের মুখখানি। মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে সন্তানের কথা ভেবে। দুই চোখ গড়িয়ে ঝরতে লাগলো পানি। চোখের জলে ভিজে গেল সেই ফাঁসির আসামিকে পরানোর কালো টুপির অংশ বিশেষ। আওয়ামী লীগ নেতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে থাকার কারণে থানার পুলিশ আমাকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালে থানা থেকে র‌্যাব কার্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায় র‌্যাব। এরপর র‌্যাব সদস্যরা বলাবলি করছে যে, আমাকে বাগমারায় নেয়া হবে সেখানে আমাকে একটি অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হবে। আরও শুনি যে, আমার নামে পুঠিয়াতে আরও একটি চাঁদাবাজির মামলা করানো হয়েছে, সেখানেও নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিকেল অনুমান পাঁচটার দিকে র‌্যাব আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানায় ৫৪ ধারায় হস্তান্তর করে। এরপর আমার মাথার টুপি সরিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়।

আমাকে থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব সদস্যরা থানা কম্পাউন্ড অতিক্রম করার পরপরই আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানা হাজতে নেয়া হলো। হাজতখানার ভেতরে বিড়ি-সিগারেটের মোথা, থু-থু, কফ, কলার ছালসহ নানান অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশে আমার বমি বমি ভাব হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার এসআই নূরুজ্জ্মান আসলেন আমার পাশে। তিনি রাজশাহীর বর্তমান মেয়র জনাব লিটনের চাচা ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের এই সদস্য আমার পূর্ব পরিচিত। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র এবং জিয়াউর রহমান হলে থাকি তখন তিনিও (নূরুজ্জামান) রাবিতে পড়ালেখা করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্রদলের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তা হলো এই নূরুজ্জামান রাজশাহীর সাবেক ছাত্রদল নেতা শাহীন শওকত এর ভাইপো। আমার ধারণা করতে আর বাকি রইল না যে, তিনি পুলিশের চাকরীতে কিভাবে এসেছেন। সে যাহোক, এসআই নরুজ্জামান আমাকে অশোভন ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘শালা তুই আওয়ামী-ঘাদানিক, হাসিনা লীগ করিস। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তুই ছাত্রদল আর শিবিরের বিরুদ্ধে মিথ্যা খবর লিখেছিস। এইবার আমি তোকে রিমান্ডে নিয়ে আবার মারবো।’

বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ এর সন্ধ্যায় আমাকে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ২০০৭ এর ১৬ (২) ধারায় রাজশাহীর মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চালান দেয়। এসআই নূরুজ্জামান পুলিশ পিকআপ এর সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাকে আদালত চত্বরে নিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য বোধহয় এই যে ‘এতবড় এবকজন দাগী অপরাধী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ কে গোটা রাজশাহী শহরের মানুষ (বোয়ালিয়া থানা হতে কোর্ট যাবার পথে) কে দেখানো! আমাকে যখন আদালতে নেয়া হয় তখন আদালতে কোন ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন না। আমাকে পুলিশ ভ্যান থেকে দুইজন পুলিশ ধরে নামালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ড-৪ এ ভর্তি করে। পরদিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর, ২০০৭ খুব সকালে আমাকে দুইজন বন্দী দুই পাশে ধরে নিয়ে এলেন কেস টেবিলের (কারা বিচারাচালয়) সামনে। সেখানে আমার শরীরের বস্থা অবলোকন এবং আমার কাছ থেকে নির্যাতনের কাহিনী শোনার পরও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আমাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশ দিলেন। আমাকে নেয়া হলো আমদানি ওয়ার্ডে (একজন মানুষ প্রথম জেলে আসার পর এই ওয়ার্ডেই তাকে নেয়া হয়)।

আমদানি ওয়ার্ডের বন্দিরা আমার শারীরীক অবস্থা দেখে আমাকে কারা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য কারা সুবেদারকে অনুরোধ করেন। এরপর কারা সুবেদার আমাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্ত করে দেন। কারা হাসপাতালে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত আমি চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে সুস্থ্য হয়ে ওঠার আগেই কারা হাসপাতালের সার্জনকে ঘুষ না দেযার কারণে আমার ফাইল (সুস্থ্য বলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া) কেটে দেন। এরপর আমাকে সিভিল ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২৮ দিনের অন্ধকার কারা জীবনের বাকি দিনগুলো কেটেছে আমার।

পুলিশ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৮ নভেম্বর আমি জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার ১৬ (২) ধারা হতে অব্যাহতি পাই। ওইদিনই আমাকে (গ্রেফতারের মাত্র চার ঘন্টা আগে দায়ের করা) দ্বিতীয় চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিসকেস দায়ের করার মধ্য দিয়ে আমি ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর এই মামলা থেকে জামিন লাভ করি। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ থেকে ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ রাত আটটায় কারাগার থেকে মুক্তি পাই। মুক্তি পাবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমার কাছে খবর আসে যে, আমাকে র‌্যাব আবার গ্রেফতার করবে এবং এবার ‘ক্রসফায়ার’ এ হত্যা করবে। এমন এক চরম হুমকির মুখে পরিবারের সদস্যদেরকে উদ্বিগ-উৎকণ্ঠা আর আতংকের মধ্যে রেখে আমি রাজশাহী ছেড়ে পালিয়ে আসি ঢাকায়। এরপর আমি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস এ ভর্তি হয়ে আমি মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার গ্রহণ করি। আমার জীবনের এই অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ, বোমা-গ্রেনেড হামলা নিয়ে চারটি বই লিখেছি। এগুলো হলো অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা, জঙ্গি গডফাদার এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ এবং উদীচী থেকে পিলখানা। রাজনীতি ও মানবাধিকার বিষয়ক ইংরেজী ভাষায় তিনটি বই প্রকাশ হয়েছে। এগুলো হলো স্ট্রাগল ফর পিচ, এওয়ে ফ্রম হোম এবং পেইন। এরমধ্যে পেইন বা ব্যথা নামের বইটি প্রকাশিত হয়েছে আমেরিকা থেকে। এই বইটি অ্যামাজনে পাওয়া যাচ্ছে (http://www.amazon.com/Pain-Jahangir-Alam-Akash/dp/1456858025)।

কেন এই রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-ষড়যন্ত্র?

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পট পরিবর্তনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে মূলত: সেনাবাহিনী দেশের শাসনভার গ্রহণ করে। তাই সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘সেনা নিয়ন্ত্রিত’ সরকার বলেই বেশি পরিচিতি পায়। দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। জরুরি অবস্থার মধ্যেই রাজশাহীতে র‌্যাব-৫ এর একাধিক অপারেশন জনমনে নানান প্রশ্ন সৃষ্টি করে। ২ মে (২০০৭) রাজশাহীর এক সময়ের টপ সন্ত্রাসী বেনজিরকে তার নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে স্ত্রী ও শিশু কন্যার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা গুলি করে এবং তার হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে চালান দেয় আদালতে। একই মাসের ১৬ মে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালকের (তৎকালীন) কক্ষে র‌্যাব সদস্যদের পিটুনিতে হা-পা ভেঙ্গে যায় কারারক্ষী সাহেবুল ইসলামের। এর দু’দিন পর ১৮ মে মহানগরীর ছোট বনগ্রামের লিচু বাগান পাহারা দেবার সময় কথিত অপহরন নাটকের জের ধরে র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে ওয়ার্কাস পার্টির ওয়ার্ড সভাপতি কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে। এই মজনু হত্যাকান্ডের ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে রাজশাহীর মানুষ। জরুরি অবস্থা ভেঙ্গে হাজারো সাধারণ নারী-পুরুষ ও জনতা রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে থাকে। জনতার বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে জরুরি অবস্থা ভেসে যায়। পুলিশ, র‌্যাব জনতাকে দমাতে পারেনি সেদিন।

দেশের একমাত্র ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেল সিএসবি নিউজে জনআন্দোলনের এই চিত্র তুলে ধরা হয়। যেভাবে তুলে ধরা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ আগষ্টের ঘটনার জের ধরে ছাত্র আন্দোলন থেকে জনআন্দোলনে রুপ নেয়া জনতার ক্ষোভের বহি:প্রকাশ। আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো আমার জীবনে। সিএসবি নিউজ চ্যানেলটি বন্ধ হয়ে যাবার পর প্রশাসন যেন সিএসবির ওপরের পুরো রাগ-আক্রোশ আমার ওপর দিয়ে পুষিয়ে নিলো। প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক দুর্নীতিবাজ-স্বার্থান্বেষী চক্রও যোগসাজশে মেতে উঠলো। দুর্নীতির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করায় সিএসবি নিউজ বন্ধ হয়ে যাবার আগেই ২০০৭ সালের ২০ জুন বোয়ালিয়া মডেল থানায় আমার নামে একটি কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে এজাহার দাখিল করেন নব্য আওয়ামী লীগার বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার মাহফুজুল আলম লোটন। সেই অভিযোগটি পুলিশ জিডি আকারে রেকর্ড করে (জিডি নং-১১৬০, তারিখ-২০/৬/২০০৭)। এই জিডির বিষয়টি আমি বুঝতে পারি একই বছরের আগষ্টের শেষ দিকে। শুনেছি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা অভিযোগটি ডাহা মিথ্যা বলে মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি। সেই জিডি তদন্ত করে পুলিশ কি পেয়েছিল তার রিপোর্ট আজও জানতে পারিনি। কিন্তু পরবর্তীতে র‌্যাবের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে রাজশাহীতে বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও তাঁর চাচা মাহফুজুল আলম লোটন পরিকল্পনামাফিক পুনরায় অভিযোগটি এজাহার হিসেবে বোয়ালিয়া মডেল থানায় জমা দেয়ার ব্যবস্থা করেন সিএসবি বন্ধ হয়ে যাবার দিনই অর্থাৎ ৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭। এরপর র‌্যাবের রাজশাহী-৫ এর তৎকালিন কমান্ডার লে.কর্ণেল শামসুজ্জামান খান, মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও মেজর হুমায়ুন কবিরের চাপ ও হুমকিতে পুলিশ এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে বাধ্য হয়।

হয়রানিমূলক পরিকল্পিত মামলা ও আমার গ্রেফতার, নির্যাতনের সাথে কাকতালীয়ভাবে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায় ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবরের পূর্বে। ২০০৭ সালের ২১ আগষ্ট রাবি ক্যাম্পাসে একদল দেশপ্রেমিক শিক্ষক ঢাবির ঘটনার প্রতিবাদে মৌন র‌্যালী বের করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় একটি শায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয়। ঢাবির ঘটনার প্রেক্ষিতে মৌন প্রতিবাদ করা কোন দোষের কিংবা অন্যায়ের ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর সেনা সদস্যদের নির্যাতনের ঘটনার জের ধরে ২২ আগষ্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-বিক্ষোভকালে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ছাত্রশিবির ক্যাডার ও ৫৪৪ খ্যাত কর্মচারীদের একটি অংশ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাপক ভাংচুর, ধ্বংসযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। সংঘর্ষকালে ক্যাম্পাসে রিকশাচালক আফজাল হোসেন নিহত হন পুলিশের গুলিতে। ক্যাম্পাসের ভেতরে যখন ধ্বংসলীলা চলছিল ঠিক তখন রাজশাহী ডিজিএফআইয়ের একটি গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করছিল। ভেতরে বিক্ষুব্ধ অবস্থা বিবেচনা করে এখন ভেতরে যাওয়া ঠিক হবে না বলে ডিজিএফআইয়ের সহকারী পরিচালককে বহনকারী গাড়িটিকে ভেতরে যেতে নিষেধ করেছিল সেখানে কর্মরত পুলিশ। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের ওই কর্মকর্তা সেদিন পুলিশের অনুরোধের কর্ণপাত করেননি। ক্যাম্পাসের ভেতরে উপাচার্য ভবনে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা উপাচার্য মহোদয়ের সাথে কথাবার্তা বলে গাড়িতে ওঠে ফিরে যাচ্ছিলেন শহরে। এমন সময় উল্টো দিকে থেকে প্যারিস রোড দিয়ে নিহত রিকশা চালকের লাশ নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা উপাচার্য ভবনের দিকে আসতেছিল। উপাচার্য ভবনের মূল ফটক অতিক্রম করামাত্র ডিজিএফআইয়ের গাড়িটির স্টার্ট রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ওইসময়ই লাশ বহনকারী বিক্ষুব্ধরা ডিজিএফআইয়ের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন পরিস্থিতিতে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পায় ডিজিএফআই তথা সেনাবাহিনী। জামায়াত নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজে খুঁজে প্রগতিশীল শিক্ষকদের শায়েস্তা করতে ছাত্র-বিক্ষোভের ঘটনায় শিক্ষকদের বিরাট ষড়যন্ত্র আবিস্কার করতে সমর্থ হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নির্বাচিত উপাচার্য অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল দলের তৎকালীন আহবায়ক অধ্যাপক আবদুস সোবহান ও প্রথাবিরোধী খ্যাতিমান নাট্যকার প্রগতিশীল শিক্ষকদলের অন্যতম নেতা মলয় ভৌমিককে তাঁদের নিজ নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৫ এর সদস্যরা। এই গুণি শিক্ষকদের সেদিন কালো পোশাক পরা মানুষগুলো চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ধরে নিয়ে যায় সেনা ক্যাম্পে (র‌্যাবের টর্চার কেন্দ্র)। এরপর শিক্ষকদের সাথে সামান্য লে.কর্ণেল, মেজর ও ক্যাপ্টেন পদর্যাদার র‌্যাব সদস্যরা যে অসভ্য-অশোভন আচরণ করেছে তা ভাষায় বর্ণনা করার মত নয়। শুধু কি তাই? একাত্তরের সেই কঠিন দিনগুলোতেও পাক সেনারা যা করতে পারেনি তাই করেছে স্বাধীন দেশের র‌্যাব নামক এক দানব বাহিনী। যে বাহিনীর কর্মকান্ড মূলত: সরাসরি সংবিধান পরিপন্থি। গ্রেফতারকৃত তিন শিক্ষকের মধ্যে মলয় ভৌমিককে চরম অমানবিকভাবে নির্যাতন করে র‌্যাব সদস্যরা। তারা মলয় ভৌমিকের দু’পায়ের হাঁড় ফাটিয়ে দেয় লাঠি দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের নম্র-ভদ্র সবার প্রিয় অধ্যাপক সাইদুর রহমান খানকে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে ঘুরানো হয়েছে। এরপর তিনি যখন চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়েছিলেন তখন তিনি গল গল করে বমি করেন। কিন্তু তবুও হায়েনাদের মনে এতটুকুও ভালবাসার প্রকাশ ঘটেনি এই গুণি শিক্ষকের ওপর নির্যাতন চালাতে। মিষ্টভাষী অধ্যাপক আবদুস সোবহানকেও নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে র‌্যাবের নির্যাতন ক্যাম্পে। অথচ জনগণের টাকায় যাদের খাওয়া ও পোশাক পরা হয় সেই র‌্যাব সদস্যদের মধ্যে এমনকি সেনাবাহিনীতেও অনেক বড় বড় পদমর্যাদার কর্তাব্যক্তি আছেন যারা এই তিন শিক্ষকের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও ৮ জন শিক্ষককে জেলে যেতে হয়। ক্যাম্পাসে চলমান আন্দোলনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নির্দেশনানুযায়ী রাবির জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা জনাব সাদেকুল ইসলাম সেদিন ভিডিও চিত্র ধারণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু তার নামেও গোয়েন্দারা সেদিন ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছিল। সাদেকুল ইসলামকেও গ্রেফতার করে ডিজিএফআইয়ের গাড়ি পোড়ানো মামলায কারাগারে বন্দী জীবন কাটাতে হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অপর দুই শিক্ষক চৌধুরী সারোয়ার জাহান সজল ও গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু যাঁরা ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক তাহের হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী। ধারণা করা হচ্ছে, এই একটিমাত্র কারণে এই দুই শিক্ষককে ডিজিএফআই সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় গাড়ি পোড়ানো মামলায় জেলে ঢুকিয়েছিল। সবমিলিয়ে যে মনে হচ্ছে যে, সেই স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক জামায়াত-শিবির চক্রকে খুশি করতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের নামে মামলা চাপানো ও গ্রেফতার করা হয়েছিল। একই ঘটনা ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক হারুন-অর রশিদ, অধ্যাপক সাদরুল আমিন, অধ্যাপক নিম চন্দ্র ভৌমিক প্রমূখের ক্ষেত্রেও। ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সেই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক কর্ণেল আবু তাহেরের সহোদর।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিক্ষকদের বিরুদ্ধে করা চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর তথাকথিত প্রহসনের বিচার শুরু হয়েছে। আদালতে উৎসুক মানুষের ভীড়। পেশাগত কারণেই মামলার বিচার কার্য চলাকালে অনেকের মত আমিও প্রতিদিনই আদালতে গিয়েছি। সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার বিষয়গুলোর পুংখানুপুংখ নোট নিয়েছি। সম্ভবত এই ঘটনার রেশ ধরেই আমার গ্রেফতারের আগে আরও একটি ঘটনা ঘটে রাজশাহীর আদালতে। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আমি সকাল থেকেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগে মতিহার থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোন্দকার ফেরদৌস আহম্মেদের করা বহুল আলোচিত মামলার জেরার শুনানি ছলছিল। আমি শুনানিকালে নোট নিচ্ছিলাম। আদালতের ভেতরে ছিলেন রাবির শিক্ষক ও মহিলা পরিষদ রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবা কানিজ কেয়া, শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ নাসের, রাবির দর্শন বিভাগের শিক্ষক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এস এম আবু বকরসহ রাবির বেশকিছু শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী এবং সাধারণ জনতা। বেলা সোয়া দু’টায় রাজশাহী মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আদালতে প্রকাশ্য বিচার কার্যক্রম চলাকালে আমাকে পুলিশ লাঞ্ছিত করলো। আদালত মূলতবি অবস্থায় আমাকে টেনে-হিঁচড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে আদালতের কক্ষ থেকে বের করে দিল পুলিশ। ঘটনার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তৎকালীন মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) মো. আফজাল হোসেনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলাম।

রাবির ঘটনায় ডিজিএফআই কর্মকর্তা শওকত আলী ও মতিহার থানার ওসি খোন্দকার ফেরদৌস আহম্মেদের করা মামলার চার্জ গঠনের দিন থেকেই আমি পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিনই আদালতে যাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলার সাক্ষী, জেরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদালতের ভেতরেই থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকালে আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আদালতের বিচারক মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট এস এম ফজলুল করিম চৌধুরীর আদালতে গেলাম। সকাল থেকেই সাক্ষী তথা বাদী ওসি ফেরদৌসের জেরা চলছিল। এ অবস্থায় বেলা দু’টায় ম্যাজিষ্ট্রেট কুড়ি মিনিটের জন্য আদালত মূলতবি করেন। এসময় আমি আদালতেই বসেছিলাম। এক পর্যায়ে সিএসআই কামালউদ্দিনসহ চার/পাঁচজন পুলিশ সদস্য এসে আমাকে আদালত থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখালাম। কিন্তু তারপরও পুলিশ সদস্যরা আমি টেনে-হিঁচড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে আদালতের ভেতর থেকে বাইরে বের করে দেন। (সূত্র: দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৭, “রাজশাহীর আদালতে পুলিশের হাতে সাংবাদিক লাঞ্ছিত”)।

২০০৭ সালের ২ অক্টোবর বোয়ালিয়া মডেল থানায় আমার বিরুদ্ধে জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলা রেকর্ড হয়। আদালতে পুলিশ কর্তৃক লাঞ্ছনার ঘটনায় আমার লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে একই দিনে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট মো. আফজাল হোসেন (স্মারক নং-সিএমএম/রাজ/গো/১-১/৯৭-১১০৯, তারিখ-০২/১০/২০০৭) আমাকে নোটিশ করেন। নোটিশে বলা হয়, ‘২৬ সেপ্টেম্বর জনাব এস এম ফজলুল করিম চৌধুরীর আদালতে দায়িত্বরত পুলিশ কর্তৃক আদালত থেকে বের করে দেয়ার ঘটনার শুনানী ৪ অক্টোবর, ২০০৭ সকাল সাড়ে ৯টায় সিএমএম এর খাস কামরায় অনুষ্ঠিত হবে। আপনি আপনার সাক্ষীসহ উপস্থিত থাকবেন।’ ৪ অক্টোবর, ২০০৭ তারিখে আমি যথারীতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ নাসের, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহবুবা কানিজ কেয়াসহ আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীসহ যথাসময়ে সিএমএম আদালতে হাজির হলাম। কিন্তু আদালতে পৌঁছেই খবর এলো যে, আমার নামে বোয়ালিয়া থানায় চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে, পুলিশ এখান থেকে (সিএমএম আদালত হতে) আমাকে গ্রেফতার করবে। এই পরিস্থিতিতে সিএমএম মহোদয়ের কাছে পরবর্তীতে সাক্ষী প্রদান করার জন্য সময়ের আবেদন জানিয়ে আমি দ্রুত আদালতস্থল ত্যাগ করি। ওইদিনই চলে আসি ঢাকায়। উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়া। কিন্তু সুপ্রিমকোর্টে চলছে অবকাশকালীন ছুটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা এবং আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই সৈয়দ মামুন মাহবুব এর শরণাপন্ন হই। উনাকে ফোন করলে তিনি আমাকে তাঁর বাসায় যেতে বললেন। কথানুযায়ী উনার বাসায় গিয়ে মামলার সমস্ত কাগজপত্র দিয়ে আসলাম। উনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমার জামিনের জন্য হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চে ক্রিমিনাল মিসিলেনিয়াস কেস (নং-১৪৪৫৪/২০০৭) করেন। হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ (এ এফ এম আবদুর রহমান) এ এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ১৬ অক্টোবর, ২০০৭। শুনানি শেষে বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান আমার অন্তবর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করলেন। অবশ্য তিনি শুনানিকালে প্রকাশ্য আদালতে বললেন যে, ‘তিনি (আমি) যে চাঁদাবাজি করেননি তার কি প্রমাণ আছে, আর সাংবাদিকরা কি সাধু চাঁদাবাজি করে না, সাংবাদিকদের উল্টাপাল্টা রিপোর্টের কারণেইতো দেশের আজ এই অবস্থা।’ মহামান্য বিচারপতি যখন উপরিল্লিখিত মন্তব্য করছিলেন তখন আমার ভীষণ লজ্জা পায়। ভেতরে ভেতরে ভীষণ রাগ হচ্ছিল আমার। আমিতো চাঁদাবাজি করিনি, তাহলে উনি এসব কথা কেন বলবেন? মনে মনে বলি, বিচারপতি মহোদয় কিভাবে বললে আপনি বিশ্বাস করবেন যে, আমি চাঁদাবাজ নই, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট। হয়ত বিচারপতি মহোদয়ের কথা ঠিক, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কি এই মন্তব্যকে মেনে নেয়া যায়? তবে এটাতো ঠিক যে, আমাদের সাংবাদিকতা পেশার সাথে জড়িতরা আমরা বুকে হাত দিয়ে ক’জনইবা বলতে পারি যে, আমি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, নীতিনিষ্ঠ, সত্যের পূজারী। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদের পেছন পাতায় ‘রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ’ শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় আমার নামে। এই রিপোর্ট করায় রাজশাহীর সব সাংবাদিক আমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন। আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হয়েছিল। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রিপোর্ট করার চার বছরের মাথায় নিজেই চাঁদাবাজির মিথ্যা অভিযোগের শিকার হলাম। তাই বিচারক মহোদয়ের কথায় শেষ পর্যন্ত আমার কোন রাগ হয়নি। কিন্তু গুটিকতক দুবৃত্তের জন্যতো আর গোটা পেশার মানুষদের অভিযুক্ত করা অনৈতিক। এই জবাবটা বিচার সাহেবকে দেয়ার সুযোগ ছিল না আমার।

হাইকোর্টে কেন আমার জন্য জামিনের আবেদন জানালেন তারজন্য শ্রদ্ধেয় সৈয়দ মামুন মাহবুবকে রাজশাহীর কৃতি সন্তান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন নাকি মোবাইল করে বলেছেন যে, ‘ওতো (আমি) আমাদের পক্ষের লোক নয়। তুমি কেন ওর জন্য জামিন চাইলে?’ সত্যিই দারুণ লজ্জা, কষ্ট আর বেদনার। একজন জনপ্রতিনিধি, জাতীয় নেতার সন্তান এত ছোট মনের হবেন কেন? এটা ভাবতেই আমার কষ্ট, ঘৃণার সৃষ্টি হচ্ছে। হাইকোর্টের আদেশে জামিনে থাকার পরও আমাকে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে গ্রেফতার করে র‌্যাব সদস্যরা। আমাকে যে রাতে গ্রেফতার করা হয় বাসা থেকে, সেই দিনে রাজশাহীর সার্কিট হাউসে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ বিষয়ক জরুরী এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করি আমি নিজেও।

দৈনিক সংবাদ এ ২০০০ সালের ৪ মার্চ ঘটনাস্থল রাজশাহী সন্ত্রাসীদের ভয়ে দুটি পরিবার ঘর থেকে বেরুতে পারছে না মামলা হয়েছে পুলিশ চুপচাপ শীর্ষক শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় আমার নামে। এরই প্রেক্ষিতে ঠিকাদার মাহফুজুল আলম লোটন তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমাকে হত্যা প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ভুলবশত অন্য একজন সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ করে। এ ঘটনায় আমি রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করি। বোয়ালিয়া থানার জিডি নম্বর ৩১০, তারিখ- ০৭/০৩/২০০০। এই ঘঁনাই মেয়র লিটন ও উনার চাচা লোটনের সঙ্গে আমার শত্রতার সূত্রপাত। ২০০২ সালের ৯ এপ্রিল একই পত্রিকায় ’দুর্নীতির অভিযোগে রাজশাহীর দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী পরিবর্তন’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্ট। এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটি মেয়র লিটনদের পারিবারিক। এবং এই দুর্নীতির সঙ্গে মেয়র লিটনপক্ষই জড়িত। ২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হলো ’দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেটের নয়া মোতাওয়াল্লীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ’ শীর্ষক শিরোনামে আরেক রিপোর্ট।

বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহিমা গণধর্ষণ ও আত্মহনন ঘটনা কারও অজানা নয়। সেই পুঠিয়ায় আবারও ধর্ষণ। ধর্ষণের ঘটনায় জনতার হাতে ধৃত ছাত্রদল ক্যাডার এই শিরোনামে ২০০২ সালের ২০ এপ্রিল প্রকাশিত হলো আরেক রিপোর্ট। রাজশাহীতে ধর্ষিতার পিতাকে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের শিরোনামে আরেক রিপোর্ট প্রকাশিত হলো ২০০৫ সালের ৭ মে। রাজশাহীর পুঠিয়ার চাঞ্চল্যকর কিশোরী ধর্ষণ মামলার বাদী আওয়ামী লীগ কর্মী আবদুল হালিমকে জিলাপির মধ্যে বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহত হালিমের ভাই হইদর আলী। ম্যাজিষ্ট্রেট পুঠিয়া থানার ওসিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলায় মোট ৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এরা হলো অভিযুক্ত ধর্ষক হারুনের পিতা আবদুল জলিল, তার চার ভাই জামাল, জহুরুল, জাফর ও জাহাঙ্গীর, নিহত হালিমের আত্মীয় জহিরউদ্দিন এবং আবদুল হামেদ, তাজুল ইসলাম ও মহাবুল ওরফে মোবুল। আবদুল হামেদ, মোবুল ও তাজুল সরাসরি হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত। এই হারুনের পিতাকে দিয়েই র‌্যাব আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করিয়েছিল। দৈনিক সংবাদেই বিভিন্ন সময়ে আমার পরিবেশিত একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয় রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দলাদলির ওপর। ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের রিপোর্ট ’অভ্যন্তরীণ কোন্দল : দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা; সম্মেলন স্থগিত’ শীর্ষক শিরোনামে। ওইদিন তাজুল ফারুক হত্যাপ্রচেষ্টার জন্য মেয়র লিটনকেই দায়ি করা হয়েছিল। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগে পারিবারিকীকরণের প্রক্রিয়া শিরোনামে রিপোর্টটি প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালের ১৯ মে। ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর বাজারে প্রকাশ্যে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব বাবুকে। এখানেও ঘটনার নায়ক র‌্যাপিড একশান ব্যাটালিয়ান-র‌্যাব। এই ঘটনায়ও সাধারণ মানুষ র‌্যাবের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। বাবু হত্যার ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি তথাকথিত জুডিশিয়াল তদন্তে জায়েজ করা হয়। অর্থাৎ র‌্যাবকে বাঁচিয়ে দেয় বিচার বিভাগ। আর মজনু হত্যা মামলাটি এখনও থানায় ফাইল বন্দি। ঘটনার চার বছর অতিক্রম হচেলও মামলায় পুলিশ চার্জশিট দেয়নি। অথচ অসহায় দরিদ্র নিরপরাধ লিমন হোসেনের নামে করা র‌্যাবের মিথ্যা মামলায় চটজলদি চার্জশিট দিলো পুলিশ।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫ এর ৫ অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে নির্যাতনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যেখানে বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর দন্ড দেওয়া যাইবে না। কিংবা কাহারো সহিত অনুরুপ ব্যবহার করা যাইবে না।’ আন্তর্জাতিকভাবেও নির্যাতন সম্পূর্ণরুপে নিষিদ্ধ। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কাউকে নির্যাতন অথবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক অথবা অবমাননাকর আচরণ অথবা শাস্তি ভোগে বাধ্য করা চলবে না।’ শুধু যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে নির্যাতন নিষিদ্ধ তাই নয় পৃথিবীর সকল ধর্মেই নির্যাতন নিষিদ্ধ। নির্যাতন নিষিদ্ধ পবিত্র কোরআন, বাইবেল, ত্রিপিটকেও। নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ‘কনভেনশন এগেইনেস্ট টর্চার-ক্যাট’ এ বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর অনুমোদন করে ১৪ নম্বর ধারাটি ছাড়া। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রিজার্ভ করা ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দৈহিক নির্যাতনের শিকার কোন বন্দি যাতে আইনগত প্রতিকার এবং যতটা সম্ভব পরিপূর্ণ পুনর্বাসনের বন্দোবস্তসহ পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের সুযোগ পান, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। দৈহিক নির্যাতনে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে তার পোষ্যবৃন্দ উক্ত ক্ষতিপূরণের অধিকারী হইবে। জাতীয় আইনের আওতায় নির্যাতিত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের কোন অধিকার এই ধারার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত হবে না।’

নির্যাতনের বিরুদ্ধে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সংসদে একটি প্রাইভেট বিল উত্থাপন করেন ২০০৯ সালে। সেটিকে আজও আইনে পরিণত করা হয়নি। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বর্ষীয়ান নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিল বারবার সংসদে ডিজিএফআইয়ের নির্যাতনের কাহিনী তুলে ধরেছেন। তদন্ত করার দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু সংসদ তাঁর কথার কোন মূল্য দেয়নি আজও। এই হলো বাংলাদেশ!

আমার কী দুর্ভাগ্য দেখুন, শুধু আমার কর্মকান্ডের (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী খবর পরিবেশন) কারণে আমার শ্বশুরকে বিগত ২৯ ডিসেম্বরের (২০০৮) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেন না। শুধু কী তাই, তিনি যাতে স্বতস্ত্রভাবে নির্বাচন করতে না পারেন তার পথটিও বন্ধ করা হয়েছিল। একজন কোটিপতি ব্যবসায়িকে নমিনেশন দিলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে নামেন এবং আন্দোলনের মুখে তাঁকে নমিনেশন দেয়া হয়। কিন্তু ওটা যে ছিল একটা কৌশল তা বোঝা যায় তাঁকে চূড়ান্ত নমিনেশন না দেবার মধ্য দিয়ে। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এবং বর্তমানে রাজশাহী জেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক বিগত ৪৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রগণ করে আসছেন। তিনি তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক এবং খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা হারুন অর রশিদ বহুল আলোচিত মাগুড়ার উপনির্বাচনে কারচুপি জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং একারণে রাজনৈতিক মামলায় হয়রাণির শিকার হন। আমার শ্বশুরই রাজশাহীতে প্রথম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। একারণে তাঁকে এবং তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ রাজশাহীর চারজন সাংবাদিককে বাংলা ভাই ও তার বাহিনী প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু লোভনীয় অফার পেলেও কখনও আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি অন্য কোন দলে। যদিও যারা ফেরদৌস আহম্মেদ কোরেশীর সঙ্গে এবং ডিজিফআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংস্কারপন্থি হয়েছিলেন নিজের ব্যবসা রক্ষায়। তারাও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেয়েছেন এমন নজির আছে। শোনা যাচ্ছে, র‌্যাব, ডিজিএফআই, আর্মি এবং রাজশাহীর মাননীয় মেয়র মহোদয়ের চাপেই নাকি আমার শ্বশুরকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। আমরা জানি না এটা সত্য কিনা। কিন্তু যদি সত্য হয় তবে এটা রাজনীতির জন্য শুভ নয়। যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের অনেকেই বলছেন, সংসদ নাকি ব্যবসায়িদের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

এইতো গত ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস চলে গেলো। আজ থেকে চার বছর আগে ২০০৭ সালের এই দিনে (৩ মে) আমাকে র‌্যাবের মেজর রাশীদ হত্যার হুমকি দিয়েছিল। বিষয়টি তুলে ধরতে চাই। রাজশাহীর এক সময়ের টপ সন্ত্রাসী মোহাম্মদ বেনজিরকে র‌্যাব সদস্যরা ২০০৭ সালের ২ মে বিকেলে তার বাড়ির শোবার ঘরের বিছানায় গুলি করে। আর র‌্যাব সদস্যরা এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে তার শিশুকন্যা ও স্ত্রীর সামনে। এতে তার দুই পা গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর তার বিছানায় পিস্তল রেখে তাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হয়। এই মামলায় বেনজির এর দশ বছরের জেল হয়েছে। তিনি এখন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে। বেনজিরের স্ত্রী মিনা জামান (২৬) বলেন, ‘গত ২ মে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় সাদা পোশাকে RAB’র ৬ সদস্য আমাদের বাড়িতে আসে। তারা ড্রয়িং রুমে আধা ঘন্টা গল্প করে বেনজিরের সঙ্গে। আমাকে ডাইনিং টেবিলে আটকে রাখে তারা। তারা রান্নাঘর তল্লাশি করে। কিছুক্ষণ পর আরও ৮/৯ জন পোশাক পরা র‌্যাব সদস্য আসে। তারা আসার পরই বেনজিরকে শোবার ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে বিছানায় বসিয়ে RAB সদস্যরা বেনজিরের দু’পায়ে গুলি করে। বেনজিরের ডান পায়ের হাটুতে একটি গোঁড়ালিতে একটি এবং বাম পায়ের হাটুতে একটি গুলি করা হয়। আর ঘরের মেঝেতে তিনটি গুলি করে তারা। এসময় বেনজিরের শিশু কন্যা প্রিয়াংকা (১০) দৌঁড়ে তার বাবার কাছে যেতে চাইলে র‌্যাব সদস্যরা তার গলা টিপে ধরে। আর আমার দুই হাত ধরে আটকে রাখে র‌্যাব সদস্যরা। স্ত্রী ও কন্যার সামনেই র‌্যাব তাদের পকেট থেকে পিস্তল ও গুলি বের করে বিছানায় বেনজিরের হাতের কাছে রেখে দেয়। এরপর কয়েকজন সাংবাদিককে দিয়ে সেই ছবি তোলানো হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেনজির আধাঘন্টা অচেতন ছিলেন। অন্যায় না করেও আমার স্বামীর ওপর এতবড় অত্যাচার করা হলো। আমি সহ্য করছি কিন্তু আল্লাহ সইবে না। র‌্যাবের বিরুদ্ধে কিছু করতে চাই না। কারণ ওরা অনেক ক্ষমতার অধিকারী।’

বেনজিরকে ২০০২ সালে গ্রেফতার করে অপারেশন ক্লিনহার্ট এর সময় যৌথ বাহিনী। বেশ কিছুদিন জেল খাটার পর বেনজির জামিনে বেরিয়ে আসেন। প্রায় সবক’টি মামলায় তিনি খালাস পান। মূলত: তখন থেকেই বেনজির তার অতীত কর্মকান্ড ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরে আসন বলে বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যায়। এই সমাজ, রাষ্ট্র কাউকে ভাল হবার সুযোগও দেয় না। তার বড় প্রমাণ রাজশাহীর বেনজির। বেনজিরের গুলিবিদ্ধ হবার ঘটনাটি সিএসবি নিউজ এ প্রচারিত হলে ২০০৭ সালের ৩ মে রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো প্রধান তথা আমাকে মোবাইলে হুমকি দেন। সিএসবির রিপোর্টার ও ক্যামেরাকে RAB-৫ এর অপারেশনসহ সবধরনের কর্মকান্ডের আশেপাশে নিষিদ্ধ করা হলো বলে ঘোষণা দেয় ওই কর্মকর্তা। এই হুমকির বিষয়ে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন একটি আর্জেন্ট অ্যাপিল করে। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্তের জন্য রাজশাহী মহানগর পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়।

রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানার তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আমাকে একটি চিঠি দেন (স্মারক নং-আরএমপি/মডেল থানা বোয়ালিয়া/২১২ (২)/১ তারিখ-২/৭/২০০৭) হুমকির বিষয়ে লিখিত বক্তব্য প্রদান করার জন্য। এরপর ২০০৭ সালের ৩ জুলাই বোয়ালিয়া মডেল থানায় সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত জবানবন্দিতে বলি-“গত ২ মে (২০০৭) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে আমাদের কাছে খবর আসে যে নগরীর হোসেনীগঞ্জ বেতপট্রিতে মোহাম্মদ বেনজিরের বাসায় একটি ক্রসফায়ার এর ঘটনা ঘটেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি, আমার সহকর্মী তোফায়েল আহাম্মাদ এবং ক্যামেরাম্যান মোহাম্মদ মাসুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিডিও ফুটেজ সংগহ করি। র‌্যাব সদস্যরা সেখানে বেনজিরের বাড়ির শোবার ঘরে তার স্ত্রী ও শিশু কন্যার সামনে তার পায়ে গুলি করে এমন তথ্য পাই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। ঘটনাস্থলে অপারেশন পরিচালনাকারী র‌্যাবের কোন সদস্য ক্যামেরার সামনে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। সন্ধ্যায় অফিসে ফিরে গিয়ে রিপোর্ট পাঠাই। যা রাত একটা থেকে প্রচারিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৩ মে, ২০০৭ দিবাগত রাত ৯টা ৩৩ মিনিটে আমার ০১৭২০০৮৪৯৪৪ মোবাইলে র‌্যাব কর্মকর্তা (তৎকালীন) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ তার ০১৭১৪০৪৯৪৩১ মোবাইল নম্বর থেকে আমাকে ফোন করেন। ফোন রিসিফ করে সালাম দেয়া মাত্র তিনি জানতে চান যে, গতকাল রাতে দুবার রিপোর্টটি প্রচার হয়ে বন্ধ হয়ে গেল কেন? জবাবে আমি বলি সেটা হেড অফিসের ব্যাপার। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিপোর্টটি প্রচার করেছেন। আমি বলি, এটা আমার পেশাগত দায়িত্ব, অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেন, আপনি বেনজিরের স্ত্রীর বক্তব্য এবং তার শিশুকন্যার ক্রন্দনরত ছবি প্রচার করেছেন কেন? জবাবে আমি জানতে চাই, আপনি কি অফিসিয়ালী জানতে চাচ্ছেন? এ পর্যায়ে মেজর রাশীদ রুঢ় এবং মুখে উচ্চারণ করা যায় না এমন ভাষায়প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলেন, আপনি রিপোর্টটি কেন প্রচার করেছেন তার সঠিক জবাব দিতে না পারলে আপনার বিরুদ্ধে আমরাই ব্যবস্থা নেবো। আমি তাকে জনাই, আমি কোন অপরাধ করিনি।

মেজর রাশীদ আবারও জানতে চান এই বলে যে, অন্য কোন চ্যানেল এই রিপোর্ট প্রচার করেনি আপনি উদ্দেশ্যমূলকভাবেই প্রচার করেছেন এবং আপনার এই কাজটি এন্টি ইস্টেট একটিভিটির পর্যায়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, আপনি এবং আপনার কোন সহকর্মী ও সিএসবির ক্যামেরা যেন র‌্যাব ও র‌্যাবের কোন কর্মকান্ড তথা চৌহদ্দীর মধ্যে না আসে। এরপরও যদি র‌্যাবের কোন কর্মকান্ডের কাছে আপনাকে এবং সিএসবির ক্যামেরা দেখা যায় তাহলে র‌্যাব আপনার বিরুদ্ধে একশান এ যাবে। এরপর তিনি ফোনের (মোবাইল) সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে জানতি পারি যে, এই রিপোর্টটি সিএসবি নিউজ এ প্রচারিত হবার পর র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা সিএসবি নিউজ এর প্রধান বার্তা সম্পাদক জনাব আহমেদ জোবায়েরসহ কয়েকজন সাংবাদিককে মোবাইল করে হুমকি প্রদর্শন করেন। আমি ওইসময়ই পুলিশের কাছে আশংকা করেছিলাম যে, আমাকে হয়ত ক্রসফায়ার নাটকের শিকার হতে হবে র‌্যাবের দ্বারা! তার পাঁচ মাস পরেই র‌্যাব আমার ওপর প্রতিশোধের আগুন জ্বালায় সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনিভাবে।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা মেজর রাশীদ শুধু শুধু হুমকিই দেননি তিনি যথাযথভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছেন আমার ওপর। আমাকে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে গ্রেফতার করে আমার ওপর বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়। চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ সহসাই দেখে না। ঠিক একইভাবে আমাকে মেজর রাশীদের হুমকি প্রদানের ঘটনায় পুলিশ তদন্ত রিপোর্টটিও আজও প্রকাশ্যে আসেনি। আমাকে হুমকি দেয়ার বিষয়ে তদন্তে কি পাওয়া গেছে, কি সুপারিশ দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রের সামান্য একজন কর্মচারী হয়ে কেন বেআইনীভাবে একজন সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার কর্মীর ওপর বর্বর নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে তার নামে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগের মামলা চাপিয়ে সমাজে হেয় করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর কি কখনও দেবে এই রাষ্ট্র, সমাজ।

মানবিকতা, নীতিবোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ সবকিছুকে গিলে খাচ্ছে অসুস্থ্য রাজনীতি, অনৈতিকতা, সুবিধাবাদিতা ও তোষামদী সংস্কৃতি। এজন্য গুমাধ্যমও তার দায় এড়াতে পারেনা। গণমাধ্যম আছে তার নিজস্ব ব্যবসা ও রাজনৈতিক পছন্দ নিয়ে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। সব অন্যায়, অরাজকতা আর অনৈতিকতা হামলে পড়ছে জনগণ তথা সাধারণ মানুষের ওপর। জনগণের করের টাকায় লালিত রাষ্ট্রীয় বাহিনী হত্যা-নির্যাতন চালাচ্ছে জনগণকেই।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অবিচার-বর্বরতা ও অমানবিকতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন কলেজ ছাত্র লিমন এবং সাংবাদিক-মানবাধিকাররকর্মী এফএম আবদুর রাজ্জাক। এখনও আমি কালোপোশাকধারী কোন কিছু দেখলেই আঁতকে উঠি। দুঃসহ যন্ত্রণা আর কষ্টের স্মৃতিগুলো এখনও আমাকে তাড়া করে ফেরে। অব্যাহত হুমকি ও আতংকের মুখে ২০০৯ সালে আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি। আমার এই অবস্থার জন্য রাষ্ট্রই দায়ি। নির্যাতনকারিদের শাস্তি চাই। আমি বিচার চাই, ন্যায় বিচার। কিন্তু এটা আমি জানি যে, বিচার আমি পাবো না কোনদিনও। কারণ সেখানে বিচারতো অবিচারের হাতে বন্দি। আমার সোনার বাংলায় আইনের কোন শাসন নেই। আছে বিচার বহির্ভূত রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও হত্যার রাষ্ট্রীয় বৈধতা। সেখানে ন্যায় বিচার আশা করা বাতুলতা ছাড়া আর কিছু নয়। বলতে গেলে ধর্মের নামে দুনিয়াজুড়েই সন্ত্রাস পরিচালনা করে বিন লাদেন। দুঃখজনক হলেও সত‍্য এই সন্ত্রাসী আমেরিকার হাতেই জন্ম নিয়েছিল তৎকালিন কমিউনিষ্টশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের হাত থেকে আফগানিস্তানকে রক্ষার নামে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এমন অভিযোগ এনে মাঝেমধ‍্যেই কলাম চালিয়ে থাকেন। যাহোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে বহু আগেই। কিন্তু আফগানিস্তানের জনগণ আজও মুক্ত পায়নি। সেখানে মানুষকে পশুপাখির ন‍্যায় মারা হচ্ছে। আজকের বিশ্বে আমেরিকা প্রতিদ্বন্দ্বিহীন, তারা যেন প্রভূর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নানান ছলছুতোয় অভিযোগ এনে তারা দুনিয়াজুড়ে মানবতার বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই। সন্ত্রাসের রাজা যার হাতে সন্ত্রাসের রসদ ও শিক্ষা পেয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে শায়েস্তা করার তার হাতেই লাদেন নিহত হলো। এ যেন এক নিয়তির নির্মম পরিহাস! লাদেনের বিচার কিংবা শাস্তি হয়নি, বাংলাদেশে রাজশাহীর মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন ও মেজর রাশীদ (বর্তমানে লে.কর্ণেল) এর বিচার হবে এমনটা ভাবার কোন কারণই নেই। কারণ সেখানে কাগজে কলমে গণতন্ত্র বিরাজমান থাকলেও বাস্তবে গণতন্ত্র মৃত! সেখানে নেই কোন আইনের শাসন, সুশাসন কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চা। জোর যার মুল্লুক তার এই অবস্থা বিরাজমান সমাজের সবর্স্তরেই।
লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s