জাতিকে অসভ্যতা ও বর্বরতার হাত থেকে মুক্তি দিন


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ লিমন শুধু একজন নয়। এমন হাজারো লিমন পঙ্গু হয়েছে। যাদের অধিকাংশই নিরীহ এবং নিরপরাধ। শত শত নিহত হয়েছেন। যাদেরকে বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষার্থী, রাজনীতিক কেউই বাদ যায়নি ওদের নির্যাতনের হাত থেকে। সাধারণ মানুষ যাদের কণ্ঠস্বর চার দেয়ালের বাইরে পৌছোয় না তারাতো হরহামেশাই বর্বরতার শিকার হচ্ছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষ্ঠুরতায়। বেচারা লিমন কিভাবে যে জীবনে বেচে গেলো? যার কারণে কালো বাহিনী আজ গোটা জাতির প্রশ্নের সম্মুখিন।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেই রাষ্ট্রীয় এই বর্বর বাহিনী কত অমানবিকতা দেখিয়েছে। তার একটা ছোট পরিসংখ্যান তুলে দেয়া যায়। এখানে জামায়াত সমর্থক এক মেজর বর্তমানে লে.কর্ণেল রাশীদুজ্জামান রাশীদ বহু বিচার বহির্ভূত হত্যা-নির্যাতনের সাথে জড়িত। এই স্বাধীনতাবিরোধী রাষ্ট্রীয় কর্মচারিটি তার অপকর্মের শাস্তিতো পায়নি, বরং পুরস্কৃত হয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে।
মেজর রাশীদ জল্লাদ বাহিনীর রাজশাহী অঞ্চলের তথাকথিত ক্রাইম প্রিভেনশন শাখার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তথাকথিত ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে এই বর্বর মানুষটি শুধু হত্যা-নির্যাতনের সাথেই নয়, আর্থিকভাবেও লাভবান হয়েছেন। অনেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও শোনা যায় তার বিরুদ্ধে। রাজশাহীর কোটিপতি ব্যবসায়ী আলী জাফর বাবু যিনি ল্যাংড়া বাবু বলেই সমধিক পরিচিত।
অভিযোগ আছে, সেই ব্যবসায়ীকে ক্রসফায়ারে হত্যার নাটকের সফল প্রযোজনার পুরস্কার হিসেবে মেজর রাশীদ নাকি কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আলী জাফরের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। এই ভাগ অবশ্য মেজর রাশীদের ইমিডিয়েট বস এক লে. কর্ণেলও পেয়েছেন। রাজশাহীতেই আরও অনেক ঘটনার নায়ক এই মেজর রাশীদ। বাগমারার ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবীব বাবুকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করেন এই মেজরই। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক আবদুর রাজ্জাককে হত্যার ঘটনায়ও জড়িত তিনি। স্ত্রী ও শিশুকন্যার সম্মুখে বেনজিরকে গুলি করে পঙ্গু করার নায়কও এই রাশীদই।
সাংবাদিক নির্যাতনে পটু এই মেজর রাজশাহীর পরিচিত এক সাংবাদিক আনু মোস্তফাকে রাজশাহী ছাড়া করার জন্য দায়ী। আনু মোস্তফা দৈনিক প্রথম আলোর রাজশাহীস্থ নিজস্ব প্রতিবেদক ছিলেন। বর্তমানে দৈনিক কালের কণ্ঠে কর্মরত। মেজর রাশীদ এবং তার বস সাহসী সাংবাদিক আনু মোস্তফাকে সাইজ করার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জনাব আনুকে শেষ পর্যন্ত রাজশাহী ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে হয়। মেজর রাশীদই সাংবাদিক শফিককে নির্যাতন করেছিলেন। আমার কথাতো মিডিয়া জগতের প্রায় সকলেরই জানা।
অথচ মানবাধিকার লংঘনকারি মেজর রাশীদ এখনো চাকরিতে বহাল। তাকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আইভরিকোষ্ট পাঠানো হয়েছিল। জাতিসংঘ একজন মানবাধিকারলংঘনকারি আর্মি অফিসারকে কী করে শান্তিরক্ষা মিশনে অন্তর্ভূক্ত করলো তা একটা বড় প্রশ্ন বটে!
মানবাধিকার লংঘনকারি এই অভিজাত বাহিনীর নির্যাতনের আরও অনেক কাহিনী আছে। চট্রগ্রামে আরেক সাংবাদিক আহমেদ নূর বর্বর নির্যাতেনর শিকার হন। ইংরেজী দৈনিক নিজউ এজ এর রিপোর্টার এফ এম মাসুমের ওপর বর্বরতার কথা গোটা দেশের মানুষই জানেন। কিন্তু কই এই ভন্ড, বিষধর সর্পবাহিনীরতো কোন কিছুই হয়না। একের এক অসহায় লিমনদের পা কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। জনগণের দেয়া ট্যাক্সের টাকায় যাদের পোশাক, খাদ্য, পানি, বেতন হয় সেই রাষ্ট্রীয় বাহিনী জনগণের ওপর বর্বরতা চালিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যেন অন্ধ হয়ে গেছেন। তাঁরা যেন এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন এর কিছুই অবলোকন করেন না! হয় তারা সরাসির বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও নির্যাতনকে সমর্থন করেন নতুবা তারা জেগে থেকেই ঘুমানোর ভান করছেন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনতো একজন বাচাল মানুষ হিসেবেই দেশের মানুষের কাছে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়ে গেছেন। জংলি শাসন, অসভ্য রাষ্ট্র আর বর্বর রাষ্ট্র নায়ক ছাড়া আইন রক্ষাকারিদের হাতে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা-নির্যাতন চলতে পারে-এমনটা বিশ্বাস করা যায় না, যদি না বাংলাদেশকে দেখতাম।
দুর্দান্ত ক্ষমতাশালী যে বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় বিশ্বের মোড়ল আমেরিকা কিংবা ব্রিটেন। সেই বাহিনীর কী আর কাউকে পরোয়া করার কিছু আছে? হাসিনা-খালেদা অথবা চারদলীয় জোট সরকার কিংবা বর্তমান ব্রুট মেজরিটির মহাজোট সরকার কার সে ক্ষমতা আছে এদের রোখে? সরকারি হিসাবেই প্রায় হোজার মানুষ নিহত এই বাহিনীর হাতে। অন্ধ মিডিয়া দু’একজন লিমনের পক্ষে দাঁড়িয়ে জাতিকে বোঝাতে চায়, তারা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিপক্ষে! হিসাবটা বেশ গোলমেলে। মিডিয়া তার সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ও শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে পেরেছে কি? আর দাঁড়াবেই বা কী করে? মিডিয়ারতো কত রং, কত রকমের ব্যবসা। এই রং ও ব্যবসাকে ছাপিয়ে মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়ানোটাতো আর অত সহজ নয়। যেন ভাবটা এমন, সন্ত্রাসী কিংবা অভিযুক্ত খুনি হলেই যে কাউকে খুন করা জায়েজ বা বৈধ?
আইন-কানুন, কোট-কাছারি, সংবিধান, আন্তর্জাতিক আইন এসবের অস্তিত্ব থেকেই বা লাভ কী? ওরাতো আর ভালো মানুষকে মারছে না! সন্ত্রাসী, খুনি মরলেই যেন দেশ সন্ত্রাস-দুর্নীতি ও অপরাধমুক্ত হয়ে যাবে? মানুষকে ধর আর হত্যা কর! জ্ঞানপাপী, তথাকথিত শিক্ষিত (মুর্খ) সমাজের জন্যই রাষ্ট্রীয় এই শয়তান বাহিনী যা খুশি তাই করার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করেই ক্ষান্ত নয় তারা। হত্যা-নির্যাতনের পর মিডিয়ায় মিথ্যা গল্প-কল্পকাহিনী পাঠিয়ে দেয়। আর সেই সাজানো কাহিনী মিডিয়ায় তোতাপাখির ন্যায় ছাপিয়ে বা প্রচার করে তারা দেশবাসির তথ্য জানার অধিকার সুরক্ষা করে চলেছে।
প্রিয় পাঠক, ব্লগার, সুহৃদ, শুভানুধ্যায়ী, সমালোচক আমিও একটি অভিযোগ পাঠালাম জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর। নিচে অভিযোগটির সারমর্ম আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি।
“মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে এখনই RAB কে ভেঙ্গে দিন। নির্যাতনকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও বিচার করুন।” RAB’র বর্বর নির্যাতনের শিকার একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি এই দাবি জানিয়েছি। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে লেখা ওই আবেদনে বলা হয়, বর্তমানে আমি মানবাধিকার বিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক। অষ্ট্রিয়া থেকে গত ১৩ মে, ২০১১ রেজিষ্ট্রি ডাকযোগে একটি লিখিত অভিযোগটি পাঠানো হয়। অভিযোগের কপি পাঠিয়েছি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, আইন মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, তথ্য মন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মহাসচিবকে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সকল সংবাদমাধ্যমে ই-মেইল করেছি।
অভিযোগে আমি জানিয়েছি, দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ’র রিপোর্টার এবং রেডিও জার্মানের ফ্রি-ল্যান্স সংবাদদাতা হিসেবে আমি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেছি। বিশেষত: বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, সংখ্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, জঙ্গিবাদ, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হই। আর এর পেছনের অন্যতম পরিকল্পনাকারি ছিলেন রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব ও রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আমি। আমার উপর নির্যানকারি RAB কর্মকর্তাদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছি অভিযোগে। অভিযোগে লিখেছি যে, আমাকে নির্যাতনের জন্য প্রধানত: RAB-৫ রাজশাহীর তৎকালিন কমান্ডার লে. কর্ণেল শামসুজ্জামান খান, মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ, মেজর হুমায়ূন কবির সরাসরি দায়ি। অভিযোগে আমি আরও জানিয়েছি, ২০০৭ সালের অক্টোবরে RAB আমার ভাড়া বাসায় আক্রমণ করে। এসময় আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী এবং বাড়িওয়ালার সম্মুখে আমাকে নির্যাতন করা হয়। এরপর আমাকে RAB-৫ এর সদর দপ্তরের নির্যাতন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমার চোখ কালো কাপড়ের টুপিতে ঢেকে দিয়ে আমাকে উপরে লটকিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমনকি আমাকে ইলেকট্রিক শকও দেয়া হয়েছিল। এই বর্বর নির্যাতনের ঘটনার যথাযথ তদন্তের দাবি জানিয়েছি লিখিত অভিযোগে। নির্যাতন ও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারি সকলের গ্রেফতার এবং শাস্তির দাবি করে আমি অভিযোগে বলেছি যে, “আমি বিচার চাই”।

আমি আশাবাদী মানুষ। আমার প্রত্যাশা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আমার অভিযোগের একটি যথাযথ তদন্তের উদ্যোগ নেবেন। আমি আরও প্রত্যাশা করি তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে তুলে ধরবেন। এলিটফোর্স নামধারী রাষ্ট্রীয় খুনি-নির্যাতক বাহিনীকে যত দ্রুত সম্ভব ভেঙ্গে দিয়ে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মতপ্রকাশ ও মিযিয়ার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় সরকার উদ্যোগী হবে বলে আমাদের আকাঙ্খা। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন ছাড়া কোন রাষ্ট্রকে সভ্য বা গণতান্ত্রিক বলা যায় না। আমার, আমাদের সোনার বাংলাকে আমরা বর্বরতা-অসভ্যতার অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখতে চাই। সকলপ্রকারের অসভ্যতা-বর্বরতা-দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, অবিচারের হাত থেকে জাতি মুক্তি চায়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন। প্লিজ কথা নয় কাজে প্রমাণ করুন যে, মানবাধিকার কমিশন ঠুটো জগন্নাথ নয়। মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলির তদন্ত প্রতিবেদন জাতির সামনে হাজির করুন। তারপরো যদি রাষ্ট্রের, রাষ্ট্র পরিচালকদের ঘুম না ভাঙে তখন জনগণই তার সমুচিত জবাব দেবেন। আর এটাও যদি আপনি করতে ব্যর্থ হন তাহলে উনাদেরকে বলুন, আমাকেও যেন তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ কিংবা ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। যেটা ওরা করতে চেয়েছিল ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s