বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বাংলাদেশের রয়েছে রাজনৈতিক সুদীর্ঘ ইতিহাস। ১৭৫৭ তে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য্য অস্তমিত হয়েছিল। তারপর বাংলার মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী শাসন, শোষণ, নির্যাতন আর বঞ্চনার যাতাকলে ছিল অতিষ্ঠ। ২১৪ বছর পরে আবার অস্তমিত সূর্য্য তার আলো মেলে ধরে বাংলার আকাশে। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার চার দশকপূর্তি পালন করবে। বহু লড়াই-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় পৃথিবীর মানচিত্রে। বাঙালি জাতি হিসেবে রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের উত্তরাধিকারি আমরা। এজন্য আমাদের গর্ব আর অহংকারের শেষ নেই। বাঙালি সংস্কৃতির রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। অর্থাৎ জনগণ দ্বারা শাসিত বা জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। অন্ত:ত সংবিধানে এমনটাই উল্লেখ আছে। দেশে-বিদেশে স্বীকৃতিও আছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। এখানে গণতন্ত্রের নিয়ম-পদ্ধতি অনুসারে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত হয়। কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রের চর্চার অভাব পরতে পরতে দেখা যায়। গণতন্ত্রের জন্য যে নিরবিচ্ছিন্ন অনুশীলন দরকার, তার বড়ই অভাব আজকের বাংলাদেশে। দুর্নীতি, অনৈতিকতা, লুটপাট, দলীয়করণ ও পরিবারতন্ত্র সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। দুর্নীতি এখন সংস্কৃতির অংশ। আর যার কুফল ভোগ করেন দেশের নাগরিক সমাজ। সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণতন্ত্র চর্চার অভাবেই ভূমি বা কৃষিনির্ভর বাংলার মানুষ আজও সংগ্রাম করে চলেছেন দারিদ্র্যতার সঙ্গে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে বাংলাদেশ। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুর্নগঠন করার প্রক্রিয়া তখনও শেষ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর ক্ষমতা চলে যায় সেনাশাসকদের হাতে। স্বাধীনতা অর্জনের ৩৯ বছরের মধ্যে দীর্ঘ ১৭ বছরই বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে সামরিক শাসক দ্বারা। তাইতো গণতান্ত্রিক ভিত্তি এখনও সুদৃঢ় নয়। অসহিষ্ণু ও সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি বাধাগ্রস্ত করছে দেশের অগ্রযাত্রাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিকল্পিতভাবে দুর্নীতিকরণ, সন্ত্রাসীকরণ, সামরিকীকরণ ও ইসলামিকরণ করা হয়েছে। বিকৃত করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। আইনের শাসনের অভাব, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চার ঘাটতি, দলনিরপেক্ষ শক্তিশালী নাগরিক সমাজের অনুপস্থিতি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দিন দিন নাজুক করে তুলছে। বাস্তবিক অর্থে একটা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ না ঘটায় আজ বাংলাদেশের গণতন্ত্র গরীব, অপরিণত, শিশু, ভঙ্গুর বা প্রতিবন্ধী গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে কার্যকরী সংসদ এর কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশে স্বৈরশাসনের পতন ঘটেছে আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে। কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়নি। বেড়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার। রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি অপরাধ প্রবণতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারি দল ও বিরোধীদলের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণে সংসদ কার্যকর হয়নি আজও। সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র জবাবদিহিতার বড়ই অভাব। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্যই ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বাঙালি রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আজও পায়নি। স্বাধীনতার বহু বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা যায়নি। যদিও বর্তমান হাসিনা সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি সন্ত্রাস ও কালো টাকার কাছে জিম্মি এটা বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি গোটা সমাজ ব্যবস্থায় এক ক্যান্সার হয়ে দেখা দিয়েছে। সৎ মানুষরা রাজনীতি থেকে ক্রমশ:দূরে সরে যাচ্ছে। রাজনীতি কোটিপতি ব্যবসায়িদের হাতে চলে যাচ্ছে ক্রমশ:। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার দিন দিন বেড়েছে। আমরা জানি ক্যান্সার মানে মৃত্যু নিশ্চিত। বাংলাদেশের ক্যান্সারটা অসহিষ্ণুতা, নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্ত রাজনীতির। তাহলে কী বাংলাদেশেরও মৃত্যু অনিবার্য? আমরা বিশ্বাস করি দেশের মানুষ নিশ্চয়ই একদিন জেগে উঠবে সকল দুর্বৃত্তপনা, অনৈতিকতা, দুর্নীতি আর অরাজকতার বিরুদ্ধে। ঠিক যেমনটি মানুষ দেখেছে ১৯৫২, ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১ ও ১৯৯০ সালে। সমাজ তার নিজ প্রয়োজনে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সমাজের ভেতর থেকেই তাগিদ অনুভূত হতে বাধ্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সব ধর্ম তথা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসি সম্প্রদায়ের মানুষ অংশ নেন। তবে সবচেয়ে বেশি হত্যা-নির্যাতনের শিকার হন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পরও আদিবাসি ও ধর্মীয় অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা মাইনরিটি ক্লিনিসিং প্রত্রিয়ার সাথে যুক্ত। সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী দেশটাকে একটি ইসলামি শাসনতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে নিতে চায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোাচনা করার আগে তার ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। নানান উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রাম আর ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের পথপরিক্রমায় বাঙ্গালা থেকে বাংলা এবং আজকের বাংলাদেশ। বৈদিক সাহিত্যে বাংলার পরিচয় পাওয়া যায়। খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে পরবর্তী দেড় হাজার বছর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল নানা নামে পরিচিত ছিল। যেমন-অঙ্গ, বঙ্গ, পুন্ড্রবর্ধণ, কামরুপ, হরিকেল, সমতট প্রভৃতি। মুসলিম শাসকগণ আরবি ও ফার্সীতে উচ্চারণ করতে গিয়ে বঙ্গাল নামেও ডাকতো এই অঞ্চলকে। অনেকের মতে এই বঙ্গাল থেকেই বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি। বিদেহ, কিরাত, পুন্ড্র, প্রাচ্য ইত্যাদি প্রাক-আর্য যুগেও বিদ্যমান ছিল। গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল পুন্ড্র ও বঙ্গ। বঙ্গ এলাকার বেশিরভাগজুড়ে ছিল গভীর অরণ্য। প্রটো অষ্টালয়েড আদিবাসিরা বসবাস করতো বঙ্গে। গভীর জঙ্গলবেষ্টিত ও নদীমাতৃক হওয়ায় বঙ্গসহ তার আশপাশের এলাকাগুলি আর্যদের রাজ্যসীমার মধ্যে ছিল না। প্রকৃতঅর্থে দেড় হাজার বছর আগে এই বাংলায় রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। ছোট ছোট রাজ্য, রাজা, জমিদার ও মহারাজার সৃষ্টি হয়। সামন্ত রাজা বন্যগুপ্ত ৫০৭ খ্রীষ্টাব্দে বাংলায় প্রতিষ্ঠা করেন প্রথম স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। আদি বাঙালিরা সমুদ্র তীরবর্তী। বাঙালিরা অত্যন্ত সাহসী। বাঙালি সমাজ ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির অধিকারিও বটে। বাঙালি সভ্যতা একান্তই তাদের নিজস্ব। বাইরের জগতের প্রভাবমুক্ত এক সংস্কৃতির অধিকারি বাঙালিরা। বাঙালি সংস্কৃতি উন্নত এক সংস্কৃতি। আর্যদের আগমনের ফলে বাইরের জগতের সাথে বাংলার প্রথম সংঘাত ঘটে। সেটাও চার হাজার বছর আগেকার কথা। তরপর থেকেই বাংলার মানুষের জীবনধারা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রাজনীতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মৌর্যযুগ তথা খ্রীষ্টপূর্ব ৩২১-১৮১ অব্দে গাঙ্গেয় নিম্নাঞ্চলের বিস্তৃত নদীপথ ব্যবহৃত হতো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। ফলে পুন্ড্র, প্রাগজ্যোতিষ এবং অঙ্গ রাজ্যের তুলনায় বঙ্গ বেশ গুরুত্ব লাভ করে। সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪ অব্দ থেকেই বাঙ্গালার লিপিবদ্ধ ইতিহাসের শুরু। হর্ষ-শশাঙ্ক রাজত্বকালে বাঙ্গালায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটতে থাকে। এসময় সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন সূচিত হয়। পালযুগ তথা ৭০০-৯২৫ সালে বাঙ্গালা এবং গোটা এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই যুগের শেষ ভাগে আরব মুসলিমরা পশ্চিম ভারত জয় করে। পূর্বদিকে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। পাল রাজত্বের শেষ দিকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কলহ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব-বিবাদ শুরু হয়। চরম এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে কঠোর ব্রাহ্মণবাদী হিন্দু সেন রাজারা আধিপত্য বিস্তার করে বঙ্গ, পুন্ড্র, সমতট ও মগধ রাজ্যে। ১০০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করে সেন রাজারা। সনে রাজাদের নিগ্রহ আর নির্যাতনে বাঙ্গালা তথা বাংলায় বিকাশমান বৌদ্ধ ধর্ম বিপর্যয়কর অবস্থায় পড়ে। পারস্য ও আরব থেকে নদীপথে আরাকান ও সমতটে আসতে থাকে মুসলিম বণিকরা। মুসলিম বণিকদের সাথে ইসলাম ধর্ম প্রচারকারিরাও আসতে থাকে। হিন্দু ব্রাহ্মণদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ বৌদ্ধ এবং নিম্নবর্ণের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গ্রহণ করতে থাকে ইসলাম ধর্ম। ১২০৪ সালে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী সেনদের পরাজিত করেন। ১২৮৯ সাল পর্যন্ত সেন রাজারা বঙ্গের বিভিন্ন স্থানে শাসনকার্য চালায়। ১৩৪২-১৩৫৭ সালের মধ্যে মুসলিম সুলতানদের আমলে বাংলার মানচিত্রে পরিবর্তন সূচিত হয়। সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর বাংলায় মোঘলদের যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে বাংলার সীমানা বাড়তে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসন আমলে বাংলাকে বলা হতো বেঙ্গল। মোগল সাম্রাজ্যের পতনকালে ব্রিটিশরা ব্যবসা ও বসবাস করতো বর্ধমানে। আর এরই সুযোগে ব্রিটিশরা স্থানীয়দের সাথে হাত মিলিয়ে নানান ষড়যন্ত্র করতো। ফলে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন ১৭৫৭ সালে। সেই বছরের পলাশীর আম্রকাননের কলংকিত অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার সূর্য্য অস্ত গিয়েছিল একবার। সেই ২৩ জুন আজ পলাশী দিবস হিসেবে পরিচিত। বাংলার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। এসময় বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার এক শাসকের অধীনেই ছিল। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ, তীতুমীরের বিদ্রোহ, সন্যাস বিদ্রোহ হয়েছে। কিন্তু সফল হয়নি সেইসব বিদ্রোহ-আন্দোলন। সিপাহী বিদ্রোহের বিদ্রোহীদের মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। ব্রিটিশরা ভারতের সমগ্র এলাকায় প্রশাসনকে একক কাঠামোর অধীনে নিয়ে আসে। সেইসময় প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক কারণে বহু আঞ্চলিক ও সীমানাগত পরিবর্তন করা হয়। এসবের মধ্যে ১৯০৫ সালে প্রশাসনিক সংস্কারের নামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বঙ্গভঙ্গ। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির রাজধানী করা হয় কোলকাতাকে। বুদ্ধিজীবী মহলের প্রবল প্রতিবাদ ও আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত ১৯১২ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশরা। শোষণ, শাসন ও বিভাজন এই তিন নীতিতে বিশ্বাসী ছিল ব্রিটিশরা। কৌশলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাধিয়ে রাখতো এবং সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত করে রাখতো বাংলার হিন্দু-মুসলমানকে। ব্রিটিশদের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ নানাভাবে সংঘটিত হতে থাকে। ফলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরালো হয়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানবাগের হত্যাকান্ডের পর তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে। ১৯২০ সালের শেষ দিকে মাহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশবিরোধী অহিংস আন্দোলনের ডাক দেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। গান্ধীজীর অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি জনতার সহিংস আন্দোলন ব্রিটিশদের মসনদ কাপিয়ে তোলে। বাঙালি বিপ্লবীরা মাস্টারদা সূর্য্যসেনের নেতৃত্বে চট্রগ্রামে দুর্বার আন্দোলন শুরু করে। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সেখানে ব্রিটিশদের দু’টি অস্ত্রাগার লুট করে বিপ্লবীরা। বিপ্লবীরা কয়েকদিনের জন্য চট্রগ্রামকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ১৯৩৪ সালে মাস্টারদা সূর্য্যসেনকে প্রাণদন্ড দেয় ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ সংসদে ১৯৩৫ সালে পাস করা হয় ভারতীয় স্থানীয় স্বায়ত্ত্বশাসিত সরকার আইন (Indian local self government act) এরপর কয়েকটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। শের-ই বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা কৃষক প্রজা পার্টি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। প্রথম প্রাদেশিক নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টি জয়লাভ করে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শায়ত্ত্বশাসনের দায়িত্বভার নেন এ কে ফজলুল হক। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহের অধিবেশনে ভারতবর্ষের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার শায়ত্ত্বশাসন দাবি উত্থাপন করা হয়। একই সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গান্ধীজী শুরু করেন ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভারতবর্ষে। পরিস্থিতি নিজেদের অনুকুলে থাকছে না- এমনটা অনুমান করতে পেরে ব্রিটিশরা আবারও গ্রহণ করে বিভাজনের নীতি। যা দ্বি-জাতিতত্ত্ব নামে বহুল পরিচিত। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তান (আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান এবং হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ভারত হবে একটি পৃথক রাষ্ট্র। এই কৌশলী সাম্প্রদায়িকভাবে দেশ ভাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ চাতুরি আর সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক নেতাদের ষড়যন্ত্রের কাছে সেই প্রতিবাদ ঢোপে টেকেনি। ফলে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের অবসান ঘটলেও ভারতবর্ষ ভেঙ্গে যায়। হিন্দু ও মুসলিম এই দুই ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর জন্য দুই আলাদা রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ নামক ওই বিভাজন সম্প্রদায়গত আবাসভিত্তিক। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজন যে কতটা বিপদজনক ও ক্ষতিকর ছিল তা এখন খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন এই অঞ্চলের মানুষ। সেই ভুলের জন্যই আজ এই অঞ্চল তথা তৎকালিন ভারতবর্ষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ অন্যান্য অনেক সমস্যায় ভুগছে। পাকিস্তানভুক্ত পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার। এই দুই অংশের মধ্যে কেবলমাত্র ধর্মীয় বন্ধন ছিল। সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল না কোন মিল। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক ফারাক। এককথায় আলাদা সমাজ, আলাদা কৃষ্টি এমনকি পৃথক ভাষা। শুধু কি তাই? খাবার-দাবারের আচার-ক্রিয়াও ছিল আলাদা। ফলে শুরু হলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত। বাঙালি-অবাঙালির দ্বন্দ্ব। পূর্ব পাকিস্তানীরা বাঙালি আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা অবাঙালি। এই দ্বন্দ্বের ফলেই পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানীদের ওপর শুরু করে নির্যাতন। পশ্চিম পাকিস্তানীরা প্রথমে আঘাত করে ভাষার ওপর। বহুমুখী বৈষম্য সৃষ্টি করা হতো পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে। শোষণ-বঞ্চনার এখানেই শেষ নয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানীরা সেই মায়ের ভাষায় কথা বলাটাকেও কেড়ে নিতে চেয়েছিল। সৃষ্টি করা হয়েছিল সাংস্কৃতিক বৈষম্যও। প্রচেষ্টা চালানো হয় বাংলালিপি পরিবর্তনের। তৎকালিন পাকিস্তানের প্রথম গভর্ণর ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। পশ্চিম পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত করাচি ছিল তৎকালিন পাকিস্তানের রাজধানী (বর্তমানেও পাকিস্তানের রাজধানী করাচিই)। ফলে করাচিই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সকল কেন্দ্রবিন্দু। পশ্চিম পাকিস্তানীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করতো। ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ (পূর্ব পাকিস্তান) ৩১২ কোটি টাকা আয় করেছিল বিদেশ থেকে। আর ২৯৪ কোটি টাকা আয় করেছিল পশ্চিম পাকিস্তান। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় করা হয় ৪৬৮ কোটি টাকা। আর পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র ১১৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এই দুই অংশের মধ্যেকার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য পাকিস্তানকে বিভক্ত করে ফেলে। পশ্চিম পাকিস্তান তাদের উপনিবেশ এর মতো আচরণ করতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে। বাঙালির প্রাণের সঙ্গীত রবীন্দ্র সঙ্গীতকে বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনই পরিস্থিতিতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকে। মায়ের ভাষাকে রক্ষার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আন্দোলন মুখর হয়ে ওঠেন। আর এই ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ প্রদর্শক হয়ে উঠেছিল। সব বৈষম্য আর শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা বড় হয়ে দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানুষের সেই ইচ্ছাশক্তিকে জাগিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ছাত্রদের ১১ দফা বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছিল প্রবলভাবে। অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধই বাংলার মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায় স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। আজকের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্টন মাঠে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি মুসলিম লীগের এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই জনসভায় খাজা নাজিমউদ্দিন দম্ভের সঙ্গে গোষণা করে বলেছিলেন, ‘উর্দূই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। এই ঘোষণায় তৎকালিন পূর্ববাংলার মানুষ ফুসে ওঠে। বিশেষ করে ছাত্ররা পশ্চিম পাকিস্তানীদের এই অযৌক্তিক ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ডাকা হয় সাধারণ ধর্মঘট। পরিস্থিতিভালো হচ্ছে না এটা বুঝতে পেরে পাক সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে ছাত্ররা নেমে আসে রাস্তায়। পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে নিহত হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। বাঙালিরা বীরের জাতি। ভাষার জন্য জীবনদান বিশ্বের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। মায়ের ভাষা রক্ষার অধিকার আদায়ে বাঙালি জাতির যে আত্মত্যাগ তা আর বিশ্বের কোন দেশের নেই। তাইতো আজ ২১ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি বাঙালি জাতির জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। ১৯৫৪ সালে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। এই ফ্রন্টে ছিল আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক প্রজা পার্টি এবং নেজামে ইসলামী পার্টি। ওই সালের মার্চে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় লাভ করে। সেই নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে মুসলিম লীগের। নৌকা প্রতিক নিয়ে ৯৭ ভাগেরও বেশি ভোট পেয়ে যুক্তফ্রন্ট নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। শের-ই বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু মাত্র দুই মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীয় পাক সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করে। ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়। ওই অধিবেশনে স্পীকার আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয় এবং স্পীকারের দায়িত্ব দেয়া হয় ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলীকে। ২৩ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশন চলাকালে কতিপয় সংসদ সদস্য ডেপুটি স্পীকারের ওপর হামলা চালান। এতে ডেপুটি স্পীকার শাহেদ আলী নিহত হন। যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের কোন্দল, দলাদলি আর ডেপুটি স্পীকারের নিহতের ঘটনার সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর জারি করা হয় সামরিক শাসন। জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা। ইস্কান্দার মির্জার দুর্ভাগ্য যে যাকে প্রধানমন্ত্রী বানালেন সেই ইয়াহিয়াই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা তুলে নেন নিজের হাতে। ষাটের দশকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর আক্রমণ আসতে থাকে পাকিস্তানপন্থি সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর কাছ থেকে। ১৯৬২ সালে পাক সরকার এক বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি চালুর উদ্যোগ নেয়। হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট এর মূল কথা ছিল, যাদের টাকা আছে তারাই শিক্ষার অধিকার পাবে। ছাত্র-ছাত্রীরা ফেটে পড়ে এই অগণতান্ত্রিক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে। আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে মাঠে নামে ছাত্র সমাজ। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে সামরিক শাসনবিরোধী জনআকাঙ্খার স্পষ্ট রুপ দেখা যায়। এই আন্দোলন থেকে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে সরানোর লক্ষ্যে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। এরই অংশ হিসেবে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া পরিকল্পিতভাবে পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে। বাংলার জনগণ, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ছাত্র সমাজ এই দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এমনই সময় ১৯৬৫ সালে শুরু হয় পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ছাত্র ও জন আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় এলো ঐতিহাসিক ৬ দফার আন্দোলন। পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে দাবি ঘোষণা করেন। ১৯৬৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু এই ৬ দফার ঘোষণা দেন। স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে পেশ করা এই ৬ দফাই বাঙালির মুক্তি সনদ হিসেবে কাজ করেছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এই সনদ তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসি বাঙালি সমাজকে এক কাতারে এনেছিল। এক অভুতপূর্ব জাদুকরী রাজনৈতিক শক্তি নিহিত ছিল এই ৬ দফাতে। ৬ দফার পতাকাতলে বাঙালি রাজপথের আন্দোলনে উত্তাল। পাক সরকার ৬ দফাতো মানতে রাজি হয়ইনি বরং বঙ্গবন্ধুসহ অনেকের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুধু ফাকাতেই ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা বাংলায় সেই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে আন্দোলনের অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ঊনসত্তরের সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনত বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের তৎকালিন শিক্ষক ডক্টর শামসুজ্জোহা নিহত হন। ১৯৬৯ এর ১৮ ফেব্রুয়ারি পাক বাহিনীর গুলি ও বেয়নেট চার্জে ড. জোহা মারা যান। ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের মাইলফলক জোহার এই আত্মদান। বাঙালি জাতির গৌরব-অহংকার-প্রতিরোধ-প্রতিবাদের শ্রেয়তর অর্জনের মাস হল ফেব্রুয়ারি। আইয়ুব সরকার বুঝতে পারে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাদের হাতে কোন তথ্য প্রমাণ নেই। কাজেই কোন অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর অনুসারিদের বিচারে আটকানো যাবে না। তাই তখন জেলখানার বন্দিদের হত্যার নীল-নকশা প্রণয়ন করে আইয়ুব সরকার। সেই নীল-নকশার অংশ হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট জেলখানায় সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকান্ডের খবরে সারা দেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। শায়ত্বশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬ দফা ও পরবর্তীতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার আন্দোলন সম্মিলিতভাবে তীব্র গতি লাভ করে আন্দোলন। ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাক সরকারের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। সরকার বাধ্য হয়ে মুজিব, কমরেড মণি সিংহসহ অন্যান্য রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রমনা রেসকোর্স মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এক বিশাল সমাবেশ। ওই সমাবেশে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান ক্ষমতা ছেড়ে দেন। বলা যায় তিনি বাধ্য হয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যান। প্রেসিডেন্ট হলেন ইয়াহিয়া খান। পরের বছর ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ এক ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব লন্ডভন্ড করে দেয় উপকূলীয় অঞ্চল। ওই প্রলয়ংকরী ঘটনায় কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। এতবড় একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অমানবিক আচরণ বাংলার (পর্ব পাকিস্তান) মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও প্রাকৃতিক ধবংসলীলা পরবর্তীকালে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরে সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনে বাংলার জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানীদের দাতভাঙ্গা জবাব দেন ব্যালটের মাধ্যমে। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। সাতটি নারী আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের মোট সংখ্যা দাড়ায় ১৬৭টি আসন। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৮টি আসন পায় ভুট্রোর পিপলস পার্টি। এরমধ্যে ৫টি নারী আসন ছিল। জনগণের রায় নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চায়নি। ফলে ক্ষমত্ াহস্তান্তর নিয়ে তারা শুরু করে নানান টালবাহানা। পাশাপাশি করতে থাকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। সেই অধিবেশনও মুলতবি করা হয় কোন কারণ ছাড়াই। এই অবস্থায় পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হন। ফুসে ওঠেন তারা স্বাধীন দেশ মাতৃকার জন্য। বাংলার মানুষ আর দাবায়ে রাখা যাবে না এটা বুঝতে পেরেছিল পশ্চিম পাকিস্তানীরা। গোটা পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাক সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনী আনতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানে। পাক ষড়যন্ত্র পরিস্কার হয়ে যায় বাংলার জনগণের কাছে। বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু মানুষের মুক্তির আকাঙ্খাকে বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন অসহযোগ আন্দোলন। বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্র, বৈষম্য থেকে মুক্তির কোন বিকল্প নেই। গণআকাঙ্খাকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে দল লক্ষাধিক মানুষের সমাগম। জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধু মুক্তি সংগ্রামের ডাক দেবেন। মানুষ অধীর অপেক্ষায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সেই স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার জন্য। জনতার স্রোত সাতরে বঙ্গবন্ধু উঠে এলেন বক্তৃতামঞ্চে। স্বাধীনতা ঘোষণার সেই মহাসমাবেশে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণায় বললেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।“ বঙ্গবন্ধু সেদিন তার ভাষণে আরও বলেছিলেন, ‘…ভাইয়েরা আমার। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছে। ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস। আমি পরিস্কার বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে (তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে) কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়-তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। আমি যদি হুকুম দেবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। প্রত্যেক গ্রামে প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তার স্বাধীনতার ঘোষণা শেষ করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে এই স্লোগান বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করে। পাক বাহিনীকে পরাভূত করতে এই স্লোগান এক জাদুমন্ত্রের মত কাজ করেছে। জয় বাংলা বাঙালি জাতির জাতীয় স্লোগান। যদিও আজকের বাংলাদেশে এই স্লোগানটি আওয়ামী লীগের স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এটি বাঙালি জাতির স্বাধীনতা, ঐক্য, সংহতি ও শত্রুকে পরাভূত করার স্লোগান।

১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়ার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হলো। কিন্তু কোন সমাধান এলো না। ২৫ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা করেও কোন সিদ্ধান্তে পৌছানো যায়নি। ২৫ মার্চ বিকেলে ইয়াহিয়া গোপনে চলে গেলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার পর শুরু হয় তীব্র অসহযোগ আন্দোলন। পাক সরকারের ভীত কেপে ওঠে। গোটা জাতি স্বাধীনতা, মুক্তির আকাঙ্খায় বিভোর। ১৯৭১ সালের পাক সরকারও তা বুঝতে পেরে ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ নিরীহ জনতার ওপর আক্রমণ চালায়। পাক বর্বরতা-নৃশংসতায় আক্রান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো ঢাকা। মধ্যরাতে পাক বাহিনী হামলা চালিয়ে শত শত মানুষকে হত্যা করে। এই মিলিটারি ক্র্যাক ডাউনের আগে ও কিছু পরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়ে দেন সারা পূর্ব বাংলায়।

বঙ্গবন্ধু দু’টি ঘোষণা দিয়েছিলেন। যেগুলি বিভিন্ন মাধ্যমে সারা পূর্ব বাংলায় পরিবেশিত হয়। বিশেষ করে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর টিএন্ডটির কর্মীবাহিনী ওয়ারলেসের মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। মৃত্যুঝুকির মুখেও সেদিন তারা এই ভাষণ প্রচার করেন দেশপ্রেমের জায়গা থেকে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম ঘোষণাটি ছিল এরকম-“Maybe this is my last message. From today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have to resist the army of occupation to the last. You must fight be go until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla -Sheikh Mujibur Rahman.” ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দফতরে পাকবাহিনী আক্রমণ চালায়। এখবর পেয়েই বঙ্গবন্ধু সেন্ট্রাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জে ডিকটেট করেন তার দ্বিতীয় ঘোষণাটি। টিএন্ডটির ওয়ালেসে সেই ঘোষণাও পাঠানো হয় সমগ্র পূর্ব বাংলায়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা প্রচার হতে থাকে। এসময় চট্রগ্রামের উপকূলে নোঙর করা ছিল একটি বিদেশী জাহাজ। ওই জাহাজে অবস্থানরত এক ক্যাপ্টেন বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি শুনতে পান। তিনি তা টেলিফোনে চট্রগ্রামের তৎকালিন আওয়ামী লীগ নেতা জগুর আহমেদ চৌধুরীকে জানান। জহুর আহমেদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি রাতেই হ্যান্ডবিল আকারে ছাপার ব্যবস্থা করেন। শেখ মুজিবের দ্বিতীয় ঘোষণায় বলা হয়েছিল, “To the people of Bangladesh and also of the World- Pakistan armed forces suddenly attacked the EPR base at Pilkhana and police line at Rajarbag at OCO Hrs. Of 26 March 1971, killing lots and lots of people. Still battle is going on with the police and EPR forces in the street of Dhaka. People are fighting gallantly with the enemy forces for the cause of freedom of Bangladesh. Every sector of Bangladesh is asked to resist the enemy forces at any cost in every corner of Bangladesh. May Allah (creator) bless you and help you in your struggle for freedom. Joy Bangla-Sheikh Mujibur Rahman.” এরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাক বাহিনী। প্রথমে তাকে নেয়া হয় ঢাকা সেনানিবাসে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা চট্রগাম থেকে প্রচারিত হতে থাকে। চট্রগ্রামে গভীর রাত থেকে এই ঘোষণা প্রচার করা হয় মাইকযোগে। ২৬ মার্চ দুপুরে চট্রগাম বেতার কেন্দ্র থেকে আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি পাঠ করেন। দেশপ্রেমিক পুলিশ, ইপিআর সদস্য, টিএন্ডটির কর্মী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশময়। শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে থাকে দেশপ্রেমিক জনতা। এরই মধ্যে চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটির নামও পরিবর্তন করেন দেশপ্রেমিকরা। এখান থেকেই তৎকালিন মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ এই ঘোষণা পাঠ করা হয়। পরবর্তীকালে স্বাধীনতাকামী জনতার উৎসাহ ও প্রেরণার উৎসস্থল হয়ে উঠেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। মেজর জিয়া যে ঘোষণা পাঠ করেন সেটি হলো “This is Sadhin Bangla Betar Kendro. I Major Zia, on behalf of our great national leader the Supreme Commander of Bangladesh, Sheikh Mujibur Rahman do hereby declare that the Independent people’s Republic of Bangladesh has been established. I have taken command as the temproary head of the Republic. I call upon all Bengalies to rise against the attack by the west Pakistani army. We shall fight to the last to free our Motherland. By the grace of Allah (creator), victory is ours…” এই ঘোষণায় দেশের মানুষ আলোড়িত হন। মহান মুক্তি সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়েন শত্রুকে মোকাবেলা করতে। একইদিনে জয়দেবপুরে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ ঘোষণা করে। পাশাপাশি বেসামরিক বাহিনীও গড়ে ওঠে সারাদেশেই। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১০ এপ্রিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সেই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা গোষণা করে। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। পাক সরকারের হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রধানমন্ত্রি হন তাজউদ্দীন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময়ে গোটা বাংলাদেশকে (তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান) চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়। এসব অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন মেজর শফিউল্যাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ এবং মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। পরবর্তীতে এই চারটি অঞ্চলকে আবার ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিক নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান। প্রধান সেনাপতি ছিলেন জেনারেল ওসমানী। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ছিল মুজিবনগর। মেহেরপুরের বদ্যিনাথতলায় গঠিত মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত তৈরীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুদূর আমেরিকায় ‘বাংলাদেশ কনসার্ট’ এর আয়োজন করেছিলেন জর্জ হ্যারিসন, আদ্রে মালরো, জন লেনন, ওস্তাদ আল্লা রাখা এবং পন্ডিত রবি শংকর। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেন ভারতের তৎকালিন ইন্দিরা গান্ধী সরকার। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর মাস নয় মাসের মুক্তি সংগ্রামে বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয় বাঙালিকে। এক কোটি মানুষকে উদ্বাস্তু হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। পাকবাহিনী তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সহায়তায় হত্যা করে ৩০ লাখ বাঙালিকে। দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করে পাক দুর্বৃত্তরা। তবে শেষ পর্যন্ত পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ডিসেম্বরে তাদের আত্মসমর্পণের ঠিক আগমুহুর্তে তারা বাঙালিকে মেধাশূণ্য করতে চেয়েছিল। তাইতো তারা বাসা-বাড়ি ও কর্মস্থল থেকে ধরে এনে হত্যা করে বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, সাংবাদিক, চিকিৎসকদের। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতি : বাঙালি জাতির পিতা মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ বা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসনভার নেয়। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। একই দিনে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৩ জানুয়ারি প্রথম মন্ত্রিসভা অনুষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে রচিত হলো সংবিধান। এই সংবিধান পৃথিবীর উৎকৃষ্টতম সংবিধানগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৭২ এর সংবিধানে আদিবাসিদের স্বীকৃতি নেই। দেশে কমপক্ষে ৪৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আদিবাসির বসবাস। স্বাধীনতার ৩৯ বছরেও আদিবাসির স্বীকৃতি মেলেনি। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রায় সবক’টি আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে বিজয়ী হয় ২৯১টি আসনেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী বাংলার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নতুন দেশে রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্প কল-কারখানা পুনর্গঠন করতে হয় বঙ্গবন্ধু সরকারকে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থাকে পুনর্গঠিত করার লক্ষ্যে নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি জাতি পুনর্গঠনে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম দরকার। দেশ পরিচালনায় প্রয়োজন অগাধ দেশপ্রমে। সেটা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু অনুভব করেছিলেন। সেইজন্য তিনি সমাজতন্ত্রের পথেই এগুতে থাকেন। কিন্তু দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাস ঘাতকতার কাছে তিনি পরাজিত হন। ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু কোন অনিয়ম-দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। তবে তার দলের ও পরিবারের অনেকেই জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতি আর অনিয়মের সঙ্গে। তাইতো বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। আর আট কোটি কম্বল। কিন্তু আমার কম্বল গেল কই?’ বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়ই দুর্নীতি, সন্ত্রাস সমাজ জীবনকে বিষিয়ে তুলতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর আমলে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার হত্যা-নির্যাতন বঙ্গবন্ধুর ইমেজের ওপর আঘাত হানে। ধারণা করা হয় রক্ষীবাহিনীর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল স্বাধীনতাবিরোধীরা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। এই দুই শক্তি বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে দেয়। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রথমে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সরিয়ে দেয় তার কাছের মানুষজনদেরকে। ষড়যন্ত্রকারি দল তাজউদ্দিনের মত দেশপ্রেমিক ও প্রজ্ঞাবান রাজনীতিককে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে সরিয়ে দিতে সমর্থ হয়। বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রিয়জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন খোন্দকার মোশতাকের মত সুবিধাবাদি ও বিশ্বাসঘাতকরা। সা¤্রাজ্যবাদি শক্তি কৌশলে বাংলাদেশে কৃত্রিম খাদ্য সংকট তৈরির সব ব্যবস্থা করে। ফলে বঙ্গবন্ধু সরকার দুর্ভিক্ষের মত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানে জাসদের গণবাহিনীর তৎপরতা রক্ষীবাহিনী, বিপ্লবীদের পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র সবার কর্মকান্ডই মূলত: ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে। একদিকে শ্রেণী-শত্রু খতমের নামে সর্বহারা নামধারী সন্ত্রাসীদের হত্যা-নির্যাতন। আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর নিজের দল ও পরিবারের কতিপয় সদস্যের অন্যায় কর্মকান্ড, রক্ষীবাহিনীর উৎপাত। সবমিলিয়ে আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতি বঙ্গবন্ধু সরকারের ইমেজ ক্রমশ: নিম্নগামী হতে থাকে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলায় শত্রু ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীরা। আর সদ্য স্বাধীন একটি দেশে কার বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা বিপ্লব? সবকিছুর মূলে ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র। ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে এক নারকীয় নৃশংস হত্যাকান্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের ৭ জন ছাত্রকে চোখ বেধে একসঙ্গে হত্যা করা হয়। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রেফতার করা হয় জাসদ নেতা সিরাজ শিকদারকে। এরপর তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ডের পর স্বয়ং বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, সিরাজ শিকদার আজ কোথায়? এভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধান একটি হত্যাকান্ডের পক্ষ নেয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতেই সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাশ হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ সংসদীয় অবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থায় চলে যায়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ‘৭৫ এর ২৪ ফেব্রুয়ারি দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। গঠন করা হলো ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ যা সংক্ষেপে বাকশাল। সরকার চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে। বাকশালের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কায়দায় দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা নেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হবার আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতালোভী সামরিক দুর্বৃত্তরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠান হবার কথা। সেই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান যাবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সেই আনন্দঘন মুহুর্তটির জন্য অধির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু কে জানতো যে বঙ্গবন্ধুর জীবনে আর ১৫ আগস্টের সকাল আসবে না। সেই ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে নিহত হলেন একদল সেনা সদস্যের হাতে। খুনির দল বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলকেও সেদিন হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পরপরই শাসন ক্ষমতা নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। জিয়া পচাত্তরের ২৫ আগস্ট আর্মির চিফ অফ স্টাফ নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রথম সুফলভোগী সামরিক অফিসার হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। এই বর্বর হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই জীবন রক্ষায় পালিয়ে যান। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৩ আগস্ট গ্রেফতার করা হয় জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এ এই এম কামারুজ্জামানসহ ২৬ জন আওয়ামী লীগ নেতাকে। ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিযুক্ত হন সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে। ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও কর্ণেল শাফায়াত জামিলের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ভেতরে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়। এই অভ্যুত্থানে বন্দি করা হয় সেনাবাহিনী প্রধান জিয়াকে। সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাবার সময় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের কয়েকজন যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। কারাগারের মতো অত্যন্ত নিরাপদ একটি স্থানে খুনিরা ঢুকে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকান্ডের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় ঘোর অন্ধকার। বাংলাদেশে ফিরে আসে আবার সেই সামরিক শাসন। এরপর টানা ১৫ বছর সামরিক শাসনের যাতাকলে পিষ্ট হয়েছে দেশের মানুষ। আওয়ামী লীগকে টানা ২১ বছর থাকতে হয় ক্ষমতার বাইরে। এই দীর্ঘ সময়ে মহান মুক্তি সংগ্রামের গৌরবোজ্জল ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়। ক্ষমতা দখলকারি সামরিক নেতারা স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার কাজটিও সুচারুরুপে করে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে ইসলামীকরণ করা হয়। ইনডেমনিটির মাধ্যমে খুনির দলকে দেয়া হয় দায়মুক্তি। ১৯৭৫ এর ৬ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরদিন ৭ নভেম্বর আরেক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। সেই সময় খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হয়। কর্ণেল তাহের জিয়ার প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিজেই পঙ্গু হয়ে গেলেন। জিয়া পুনরায় সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নেন। অকৃতজ্ঞ জিয়াউর রহমান বিপ্লবের নেতৃত্বদানের অভিযোগে কর্ণেল তাহের এর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করান। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারিদের বিচার করতে চেয়েছিলেন। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনী প্রধানের পদে আসীন হয়েই দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। বিচারপতি আবু সায়েমকে প্রেসিডেন্ট করা হয়। কিন্তু ডেপুটি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন জিয়া নিজেই। দেশের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতেই রাখলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে। সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ছিলেন আরেক জেনারেল এইচ এম এরশাদ। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি সায়েম ও জেনারেল জিয়ার সামরিক সরকার দালাল আইনটি বাতিল করেন। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় বিচারে দন্ড পাওয়া অভিযুক্তরাও জেল থেকে বেরিয়ে আসে। ১৯৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর জিয়া বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে দেখা করলেন তার সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে। সেদিন জিয়ার সাথে আরও ছিলেন এরশাদ, জিসি এস জেনারেল মনজুর, নবম ডিভিশনের কমান্ডিং অফিসার মীর শওকত আলী, রাষ্ট্রপতি সায়েমের বিশেষ সহকারি বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং দু’জন উপ-মুখ্য সামরিক আইন প্রশাসক। ক্ষমতালোভী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি সায়েমকে সাফ জানিয়ে দিলেন যে, ‘সামরিক আইন প্রশাসকের পদটি আমার চাই।’ ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম এক অর্ডিন্যান্স জারি করে রাষ্টপতির পদটি জিয়ার হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এভাবে একজন ক্ষমতাপিপাসু সামরিক অফিসার দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বনে যান। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতি এবং সামরিক শাসক এই দুই পদে বসেই সংবিধানের বারোটা বাজিয়ে দিলেন তিনি। ১৯৭২ এর অসাম্প্রদায়িক সংবিধানকে খন্ড বিখন্ড করে দিলেন এক চরম সাম্প্রদায়িক রুপ। সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার মূলোৎপাটন করা হয়। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলেই ধর্মনিরপেক্ষ রাজষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ‘ বা ওআইসির সদস্যপদ লাভ করে। তার আমলেই গঠন করা হয় মাদ্রাসা বোর্ড ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন। বঙ্গবন্ধু সরকারের এসব উদ্যোগ অসাম্প্রদায়িকতার মূলে কুঠারাঘাত। রাষ্ট্রপতি হবার পর জিয়াউর রহমান সামরিক আইনের আচরণের অধীনে রাজনৈতিক দল গঠনের আদেশ দেন। সামরিক ছাউনির মধ্যে থেকে নিজেও ‘জাতীয়তাবাদি গণতান্ত্রিক দল’ বা জাগদল নামে একটি দলের আকস্মিক জন্ম দিলেন। সামরিক জেনারেল জিয়ার পেছনে জনগণের সমর্থন আছে এটা বোঝানোর জন্য তিনি আয়োজন করলেন গণভোটের। সামরিক শাসনের অধীনে পরিচালিত সেই গণভোটে দেশের তিন কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৮৯ ভাগ ভোট পড়ে বলে জানানো হয়। যার প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোটই পড়েছে জেনারেল জিয়ার পক্ষে। যা অবিশ্বাস্য এবং অকল্পনীয়। ১৯৭৮ সালের এপ্রিল মাসে জিয়া নিজের সৃষ্ট জাগদলের চেয়ারম্যান বা সভাপতি পদে আসীন হন। জেনারেল জিয়া বিশ্ব পরিসরে নিজেকে গণতান্ত্রি হিসেবে পরিচিত করানোর লক্ষ্যে নানান প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৭৮ সালের জুনে তিনি আয়োজন করেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের। জিয়া একটি ফ্রন্ট গঠন করেন। যে ফ্রন্টের নাম ছিল জাতীয়তাবাদি ফ্রন্ট। এই ফ্রন্টে ছিল জিয়ার জাগদল ছাড়াও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, পিকিংপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপ, ইফনাইটেড পিপলস পার্টি, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ, সিড্যুল্ট কাষ্ট ফেডারেশন, সাম্যবাদি দল, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ইষ্ট বেঙ্গল কমিউনিষ্ট পার্টি, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ। আওয়ামী লীগ কোন প্রার্থী দেয়নি ওই নির্বাচনে। তবে তৎকালিন মস্কোপন্থি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল তারা। জাতীয়তাবাদি ফ্রন্টের বিপরীতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল জনতা দল। জনতা দলের প্রধান জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে আওয়ামী লীগ ও মস্তোপন্থি ন্যাপ সমর্থন জানায়। যে নির্বাচনে তিনি নিজের পক্ষে ৭৭ শতাংশ ভোট পাওয়ার ব্যবস্থা করান। তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। সামরিক আইন জারির অধীনেই পেসিডেন্ট জিয়া একটি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করেন। নির্বাচনের আগে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর জিয়া জাগদলের খোলস ছেড়ে “বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি”র জন্ম দিলেন। পরের বছর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন দিলেন জেনারেল জিয়া। কিন্তু সামরিক আইন জারি করাই থাকলো। এর মধ্যেই অনুষ্ঠিত হলো সেই নির্বাচন। নির্বাচনে জিয়ার গড়া নতুন দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিষ্ট পার্টি বা আজকের বিএনপি পেলো ২০৭টি আসন। ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩৯টি আসন দেয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্রের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার স্থাপন করেন। এছাড়াও জিয়া সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ইত্যাদির আবির্ভাব ঘটান। ১৯৭৯ সালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়া তার এসব অবৈধ ও অসাংবিধানিক কর্মকান্ডের আইনী রুপ দিতে বাধ্য করেন। জিয়া তার আমলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজের হাতে বিশেষ এক ক্ষমতা তুলে নেন। সেই ক্ষমতাবলে তিনি জাতীয় আইনসভার বাইরে থেকে মন্ত্রিসভার এক পঞ্চমাংশ সদস্যকে নিযুক্ত করতে পারতেন। সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে তিনি যাকে তাকে প্রধানমন্ত্রি এমনকি মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যদের নির্বাচনও করতে পারতেন নিজেই। দেশে শুরু হলো ফের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন ব্যবস্থা। জিয়া বলেছিলেন তিনি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবেন। সেই কথা তিনি রেখেছিলেন। আবারও শুরু হলো দুর্নীতি, দুঃশাসন, সন্ত্রাস, আর অরাজকতা। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হলেও জেনারেল জিয়াই তার শাসনামলে কুখ্যাত রাজাকারদের ক্ষমতার অংশীদার করেছিলেন। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন শাহ আজিজুর রহমান। এই আজিজুর রহমান এশাত্তরে বাংলার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘে গিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। শাহ আজিজ বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আক্রমণ অন্যায় কিছু নয়। মুক্তিসংগ্রামের নামে পূর্ব বাংলায় যা হচ্ছে তা ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিৎ সেটাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া বিষয় হিসেবে দেখা।” সেই স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকেই জেনারেল জিয়া বানিয়েছিলেন স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রি। জিয়ার মন্ত্রিসভায় আরও অনেক স্বাধীনতাবিরোধী ঠাই পেয়েছিলেন। এরা হলেন আবদুল আলিম, মির্জা গোলাম হাফিজ, মশিউর রহমান, সফিউল আরম, শামসুল হুদা চৌধুরী। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দেশে মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার ও বাঙালি জাতীয়তাবাদি নেতাদের হত্যাকান্ডের ঘটনায় সন্দেহের তীর জিয়ার দিকে উঠতে থাকে। এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডেও জিয়ার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে। অন্যদিকে স্বাধীনতাবিরোধীদের আশ্রয় কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন জেনারেল জিয়া ও তার সৃষ্ট রাজনৈতিক দলটি। পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী নেতা জামায়াতে ইসলামের রাজনৈতিক গুরু গোলাম আজম। ১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই এই কুখ্যাত রাজাকারকে বাংলাদেশে আসার ব্যবস্থা করেছিলেন জেনারেল জিয়াই। মাত্র তিন মাসের ভিসা নিয়ে এসেছিলেন গোলাম আজম। পরবর্তীতে যার নাগরিকত্ব জিয়াই ফিরিয়ে দেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার এই সামরিক রাজনীতিবিদকে দিয়েছিল বীর উত্তম উপাধি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়া এক সামরিক হামলায় নিহত হন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার হত্যাকান্ডের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবেও অধিষ্ঠিত হন। জিয়া হত্যাকান্ডের অব্যবহিত পরেই ক্ষমতা দখলের জন্য ওৎপেতে থাকা আরেক জেনারেল প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। জিয়ার অনুপস্থিতিতে বিএনপির ভেতরে শুরু হয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল। দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটতে থাকে। প্রবাসে নির্বাসিত জীবনকালে ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। এরপর তিনি একই বছরের ১৭ মে দেশে ফেরেন। জিয়ার পদাংক অনুসরণকারি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতি সাত্তারের হাত থেকে শাসনক্ষমতা কেড়ে নেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতা নিয়েই দেশে শামরিক শাসন জারি করেন। বাঙালি জাতির ওপর চেপে বসলো আরেক জগদ্দল পাথর। এরশাদ ক্ষমতা দখলের পরপরই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। অথচ নিজেই তিনি দুর্নীতির শিরোমণি হয়েছিলেন পরবর্তীতে। এরশাদের শাসনামল ছিল সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় ছিল ভরা। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে স্বৈরাচারি এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে ১৯টি রাজনৈতিক দল বিবৃতি দেয়। বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন জিয়ার স্ত্রী গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শুরু হয় এরশাদবিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। জেনারেল জিয়া সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সূচনা করেছিলেন। আর অপর জেনারেল এরশাদ সংবিধানে ইসলামকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতায় পরিপূর্ণতা আনেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ৮ দল। আর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হয় ৭ দলীয় জোট। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মূখ্যভূমিকা পালন করেন ছাত্রসমাজ। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাসিনাসহ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করে এরশাদ সরকার। পরের বছর তাকে দুই দফায় গৃহবন্দি করা হয়। এরশাদ তার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমানোর জন্য হত্যা-নির্যাতনের পথ বেছে নেন। ছাত্র-শ্রমিক, যুবক ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে আছে নিপীড়ন। এর ভেতর দিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলন দানা বাধে। শত শত মানুষকে এরশাদ আমলে জীবন দিতে হয় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে গিয়ে। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ জাতীয় পার্টি নাম দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল গান করেন। যেভাবে তার পূর্বসূরী জিয়া বিএনপি গঠন করেছিলেন। একই বছরে এরশাদ জাতীয় নির্বাচন ঘোষণা করেন। আন্দোলনরত ৮ দল ও ৭ দলীয় জোট সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠ্যেয় নির্বাচনে তারা অংশ নেবে। কিন্তু হঠাৎ করে বেগম জিয়ার ৭ দলীয় জোট নির্বাচন থেকে সরে দাড়ায়। এরশাদের ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণার সময় দেখা যায় ক্ষমতাসীন দল জাতীয় পার্টির তুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা অনেক এগিয়ে আছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ধূর্ত এরশাদ বেতার-টিভিতে নির্বাচনি ফলাফল ঘোষণা বন্ধ করে দেন। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলে এরশাদের দলকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয় তথাকথিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে অন্যান্য দলগুলি অংশ নেয়নি। ফলে এরশাদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত দেখান। একই বছরে নূর হোসেন তার বুকে পিঠে “স্বৈরাচার নিপাত যাক গণতন্ত্র মুক্তি পাক” এই স্লোগান লিখে রাজপথে নেমেছিল। এরশাদ বাহিনী নূর হোসেনকে গুলি করে হত্যা করলে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি আসে। এই অবস্থায় এরশাদ তৃতীয় জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন। ১৯৮৮ সালের এরশাদের পাতানো নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ সবক’টি রাজনৈতিক দল। ১৯৯০ সালের শুরু থেকেই এরশাদবিরোধী আন্দোলন জঙ্গি রুপ ধারণ করে। ‘এরশাদ হঠাও’ এই এক দফার আন্দোলনে ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সকল পেশাজীবীরা রাজপথের আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন সর্বগ্রাসী আকার ধারণ করে। এরশাদশাহী তার গদি রক্ষায় আবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করে দেন সাংবাদিক ও সংবাদপত্র মালিকরা। ১৯৯০ সালের ২৭ ডিসেম্বর থেকে এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ ছিল। সরকারবিরোধী গণআন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে এরশাদ পরিকল্পিতভাবে দেশে সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা শুরু করেন। গণআন্দোলনকে ভিন্নখাতে নেয়ার জন্য ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে মন্দির ভাঙা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। বিশেষ করে রাজধানীর পুরনো ঢাকায় এ তান্ডব চালানো হয় সবচেয়ে বেশি। সারাদেশে কয়েক হাজার মন্দির ভাঙা হয়, নির্যাতন করা হয় শত শত হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে। সুবিধাবাদি-চাটুকার বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কবিদের অনেকেই এই দুই সামরিক শাসকের (জিয়া ও এরশাদ) ছায়াতলে সমবেত হয়েছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ জনতার আন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। ১৯৯০ সালের ৫ ডিসেম্বর এরশাদ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকার ১৯৯১ সালে সাধারণ নির্বাচন করে। ওই নির্বাচনে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগ ৭ শতাংশের অধিক ভোট পায়। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সমর্থনে বেগম জিয়ার বিএনপি সরকার গান করে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রি নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্রহীনতার গণতন্ত্রের নবযাত্রা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য দিকগুলি হলো কারণে অকারণে সংসদ বর্জন, নাম বদল, অসহিষ্ণুতা, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, হত্যা, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, পরাজয় মেনে নিতে না পারা, ইতিহাস নিয়ে টানাটানি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দীর্ঘ দেড় দশক বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল সামরিক শাসনের যাতাকলে বন্দি। দুই সামরিক শাসক দেশের রাজনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বহু সংগ্রাম ও জীবনের বিনিময়ে স্বৈরশাসনের অবসান হলো। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা করেছিল এখন বুঝি দেশে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু শান্তিতো যেন এক সোনার হরিণ হয়ে গেছে। জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতিয়ে নিয়েছিল সামরিক শাসকরা সেই ক্ষমতা আবার ফিরে এলো রাজনীতিকদের হাতে। কিন্তু জনগণের ভাগ্যেরতো কোন পরিবর্তন হলো না। সামরিক শাসক এরশাদের পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করলো বিএনপি। কিন্তু পরাজয় মানতে রাজি নয় বড় রাজনৈতিক দলগুলি। ফলে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা নির্বাচনি ফলাফলের উপর কালিমা লেপন করলেন। তিনি বললেন, সূক্ষ্ম কাচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। যাহোক বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রি এবং বিরোধীদলীয় নেত্রীর আসনে বসলেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। সংসদ নেত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী উভয়ই নারীÑএমন নজির বাংলার রাজনীতিতে বিরল। দেশের মানুষ এই ভেবে খুশি হলেন যে, হয়ত সংঘাত, ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, হানাহানি, হত্যার রাজনীতির অবসান হলো। কিন্তু না দ্রুতই মানুষের আশা ভাঙতে শুরু করে। সাধারণ কৃষক-শ্রমিকদের ওপর সরকারের জুলুম নেমে আসলো। সরকার কৃষকদের ন্যূনতম-যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়ার বদলে তাদের গুলি করে মারতে থাকে। উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধায় কৃষক সারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন। এসময় পুলিশ গুলি চালিয়ে কৃষককে হত্যা করে। বিএনপি সরকারের মেয়াদ শষে হয়ে আসতে থাকে। রাজনীতিবিদরা নিজেদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। দাবি উঠে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মূলা দিল। ক্ষমতাসীন বিএনপি এই দাবিকে উড়িয়ে দেয়। শুরু হয় সরকারবিরোধী আন্দোলন। ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ‘ থেকে পদত্যাগ করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দেয় চরম অচলাবস্থা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকালে প্রায় ১৪৫ জন রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক নিহত হন। দেশ সম্পূর্ণরুপে অচল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় ১৯৯৬ সালে সংসদ, সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এমনই এক পরিস্থিতিতে বিএনপি সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ওই নির্বাচন ছিল একটা প্রহসনের নির্বাচন। যে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়ম করা হয়। ভোট পড়ে মাত্র ১০ শতাংশ। প্রধান বিরোধীদলগুলি এই নির্বাচন বয়কট করে। ফলে রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল হয়। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ শুরু করে অসহযোগ আন্দোলন। আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে খালেদা জিয়ার সরকার বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল সংসদে পাশ করে বিএনপি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। বিএনপি সরকারের আমলেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে উঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে এক দুর্বার গণ আন্দোলন। দেশ পরিচালনায় বিএনপির ব্যর্থতা আর যুুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে এবং বিএনপি ১১৩টি আসনে জয়লাভ করে। দেশে ও বিদেশে সর্বত্রই নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মনে হলেও পরাজিত বিএনপি এই নির্বাচনি ফলাফলে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। রাজনীতিতে পরাজয় না মানার সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় বিএনপিও নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে। দীর্ঘ ২১ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই পার্বত্য চ্রটগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। যদিও সেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন আজও হয়নি। তারপরও সেই চুক্তি পার্বত্য চট্রগ্রামে সাময়িক শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। অবশ্য বর্তমানে পার্বত্য চট্রগ্রামে আবার অশান্তি ফিরে আসতে শুরু করেছে। সেখানে আদিবাসি হত্যা-নির্যাতন, সংঘাত-সংঘর্ষ চলছে। যাহোক, হাসিনা সরকারের আরও একটি সাফল্যের ঘটনা আছে। তা হলো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। মায়ের ভাষার জন্যে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার মতো আত্মত্যাগের ইতিহাস বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগ সংসদ বর্জন করে। আন্দোলন করে বিএনপির সরকারের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সংসদ বর্জন শুরু করে। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামি ও জাতীয় পার্টি সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সংসদ বর্জন করতে থাকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। বিএনপি লাগাতার সংসদ বর্জন করতে থাকে। এরমধ্যেই আওয়ামী লীগ ২০০১ সালের জুলাই মাসে তাদের সরকারের ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হস্তান্তর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপির জামায়াতে ইসলামসহ চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। নির্বাচনের রাত থেকেই বিএনপি-জামায়াত চার দলীয় জোট শুরু করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগ আনে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ৫ বছরের শাসনামলে মানুষ অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণের যাতাকলে পিষ্ট হতে থাকেন। দ্রব্যমূল্যের আকাশচুম্বি উর্দ্ধগতিতে মানুষের দুর্গতি চরমে পৌছে। রাজনৈতিক হত্যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু-আদিবাসি হত্যা নির্যাতন বেড়ে যায়। ঘটতে থাকে একের পর এক সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা। খুন হতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। কিন্তু খুনি, দুর্বৃত্ত, অপরাধী চক্রকে বিচারের আওতায় না আনার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয়। হত্যা করা হয় বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে। সংসদ বর্জনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগও সংসদ বর্জন কর্মসূচী শুরু করে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের লাগাতার আন্দোলন এবং আন্দোলন দমনে সরকারের নিপীড়ন প্রচেষ্টায় চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট বিরোধীদলের দাবির প্রতি তোয়াক্কা না করে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেস্টা করে তাির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। এরপর দেশ নির্বাচনের দিকে এগুতে থাকে। কিন্তু বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জন করে। সাবেক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদ হয়ে উঠেন রাজনৈতিক জোট গঠনের প্রধান নিয়ামক। এরশাদ যখন বিএনপির দিকে তখন বিএনপি খুশি। আবার এরশাদ যখন আওয়ামী লীগের দিকে তখন আওয়ামী লীগ খুশি। যাহোক রাজনৈতিক এক দুর্বিষহ এবং অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে বড় দুইটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে শুরু হয় হানাহানি। প্রকাশে মানুষ হত্যার দৃশ্য গোটা জাতিকে স্তম্ভিত ও উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দেয়। এই অবস্থায় সেনাবাহিনী রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদকে জরুরি অবস্থা জারি করতে বাধ্য করে। নেপথ্যে থেকে মূলত: সেনাবাহিনীই ক্ষমতা দখল করে। সেনাবাহিনী প্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন উ আহমদ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্ণর ডক্টর ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেস্টা করে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার হিসেবে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এরপর শুরু হয় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। দেশের মানুষ প্রথম পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে সমর্থন জানান। কিন্তু এক পর্যায়ে সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে রাজনীতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। শুরু করে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর বর্বর নির্যাতন। একইসাথে সরকার শুরু করে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত। এরই অংশ হিসেবে খালেদা-হাসিনা দু’জনই গ্রেফতার হন দুর্নীতির অভিযোগে। জনগণের কাছে পরিস্কার হতে থাকে যে, তারা (সরকার) মাইনাস টু ফরমুলা অনুযায়ী হাসিনা-খালেদাকে রাজনীতি থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। ২০০৭ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ঘটে একটি ঘটনা। যে ঘটনায় সেনা সদস্যরা ছাদ্রদের ওপর নির্যাতন চালায়। এরপরই শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেনাবাহিনীর সাথে ছাত্রদের সংঘর্ষ। সাধারণ জনগণ ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ফুসে উঠে। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলন শুরু হয়। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন জনআন্দোলনে রুপ নিতে থাকে। এক পর্যায়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয়। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার নির্যাতন করে সরকার। এসব ঘটনায় সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। কঠিন অত্যাচার-নির্যাতন ও স্বৈরশাসনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্খায় দেশের মানুষও ক্রমশ: ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন। বাংলাদেশের নব্য সেনা সরকার শেষ পর্যন্ত হাসিনা ও খালেদাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এই অন্তবর্তীকালিন সরকার প্রায় দুই বছর দেশ শাসন করে। অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিান করে এই সরকার। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ব্রুট মেজরিটি পেয়ে সরকার গঠন করে। এই নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট অভিযোগ করে যে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সাথে আতাত করে ক্ষমতায় এসেছে। আবার সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অথচ তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ধারণার স্রষ্টা। রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়ায় রাজনীতিবিদরাও রাজনীতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। যেকারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সৃষ্টি হয়েছিল। দেশবাসি মনে করেছিলেন যে, দীর্ঘ প্রায় দুই বছরে প্রধান দুই নেত্রীর বোধদয় ঘটেছে। কিন্তু না তাদের মানসিক ও বাস্তবিক কোন পরিবর্তন হয়নি। যার নমুনা এখন দেশবাসি প্রত্যক্ষ করছেন প্রতিনিয়ত। একবিংশ শতাব্দির বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতি ও বাস্তবতা: সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মস্তানী, দখল, লুটতরাজ, হত্যা-নির্যাতনের ধারবাহিতা বজায় আছে। সংঘাত-সংঘর্ষ বন্ধ হচ্ছে না কেন? কেন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা নেই রাজনৈতিক দলড়গুলির ভেতরে বাইরে? বিশেষ করে সরকারি দল ও বিরোধীদল কেন মারমুখী সারাক্ষণ? হানাহানি, সন্ত্রাস, হামলা, পাল্টা হামলা, হত্যা-নির্যাতন, অসহিষ্ণুতাই রাজনীতির মুখ্য উপাদান। নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক তথা পেশাজীবীরাও দলীয় রাজনীতির মধ্যে নিমজ্জিত। রাজনৈতিক কারণে গোটা সমাজ ব্যবস্থা আজ বিভক্ত। বিভক্ত এই সমাজের মধ্যে বাড়ছে সুবিধাবাদিতা, চাটুকারিতা, ক্ষমতাবানদের খুশি করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। চলছে সহিংসতা, ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি, ক্যাডারনির্ভর দলীয় রাজনীতির সংস্কৃতি। মেধা ও যোগ্যতার কোন মূল্য নেই এই সমাজে। তদবির, তোষামদী, চাটুকারিতা, আত্মীয়করণ, পারিবারিকীকরণ ও দলীয়করণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা আর যেনতেন প্রকারে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাবার তাড়না সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারের দিকে। রাজনীতিতে বিরোধী বা প্রতিপক্ষের মতের প্রতি নেই কোন শ্রদ্ধা। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে ন্যায়বিচার, সুশাসন ও মৌলিক মানবাধিকার। রাজনীতির নামে বা গণতন্ত্রের নামে চলছে জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর, সন্ত্রাস-বোমা কিংবা গ্রেনেডবাজি। হরতালের নামে মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করাই মুখ্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। অথচ দেশের বহু মানুষ না খেয়ে থাকছে। অন্যায়-অবিচার, জলুম, নিপীড়ন আর প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকছে সাধারণ মানুষ। দেশের ৪০ ভাগেরও অধিক মানুষ বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। ৮৫ হাজার গ্রামের মধ্যে অর্ধেক গ্রামে এখনও যায়নি বিদ্যুত সেবা। বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করা হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়া হচ্ছে না। দেশে জবাবদিহিতার কোন সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি আজও। দেশের প্রধান বিচারপতিও নিয়োগ পাচ্ছেন দলীয় বিবেচনায়। সেক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লংঘণ করা হচ্ছে। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে করা হয়েছে। অতীতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলেও একই কাজ করা হয়। বর্তমান সরকার বিদ্যুত উৎপাদন বাড়ানোর প্রকল্প নিয়েছে। কিন্তু সেই প্রকল্প নিয়ে কেউ কোন আইনগত প্রশ্ন তুলতে পারবে না। এমন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর অর্থ হলো জবাবদিহিতাহীনতা। গণতন্ত্রের জন্য এধরণের কর্মকান্ড কোনমতেই সুখকর হতে পারে না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে সেই আকা্খংা অপূর্ণই রয়ে গেছে আজও। বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রি, বিরোধীদলীয় নেত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি, পররাষ্ট্রমন্ত্রি পদে আসীন নারীরাই। তাহলেতো বলতে হয় সেখানে নারীরা সুখেই আছেন? না, বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। নারীরা বাংলাদেশে মোটেও ভালো নেই। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপসহ নানান কায়দা ও কৌশলে নারীর প্রতি সহিংসতা চলছে। বিশ্বের মধ্যে নারীর প্রতি সহিসংসতার হার অনুপাতে বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে। পারিবারিক কলহ-দ্বন্দ্ব, অউন্মুক্ত সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষায় অনগ্রসরতা, দারিদ্র্যতার কারণে নারীর ওপর সহিংসতা বাড়ছে। এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক, ইভটিজিং, ধর্ষণ, হত্যার মতো বর্বরতার ঘটনাগুলি ঘটছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশর তৈরী পোশাকশিল্পে কয়েক লক্ষ নারী শ্রমিক কাজ করেন। তারা প্রত্যেহ ১০-১২ ঘন্টা শ্রম দেন। কিন্তু মাসিক বেতন মাত্র তিন হাজার টাকা। তাও আবার এখনও এই বেতন কার্যকর হয়নি সর্বত্র। ন্যুনতম বেতন ৫ হাজার টাকা নির্ধারনের দাবিতে আন্দোলন করায় শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের ওপর সরকারি/রাষ্ট্রীয় খড়ক নতুন কোন খবর নয়। বাংলাদেশের একটি কালো আইনের নাম হলো শত্রু সম্পত্তি আইন। এই আইনটি পাকিস্তান আমলে প্রণীত পরবর্তীতে যার নাম পাল্টে করা হয় অর্পিত সম্পত্তি আইন। তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুইটি রাষ্ট্র হলো। নির্বাহী আদেশে পাক সরকার ১৯৬৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শত্রু সম্পত্তি আইন করে। যেসমস্ত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ জীবনের ভয়ে ভারতে চলে গেলেন তাদরেক চিহ্নিত করা হলো শত্রু হিসেবে। এই কালো আইন অনুযায়ী তথাকথিত শত্রুদের যত সম্পত্তি তার সবই হবে শত্রু সম্পত্তি। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে এই শত্রু সম্পত্তি আইনের নাম বদল করা হয়। তখন এর নামকরণ হলো অর্পিত সম্পত্তি আইন। শত্রু বা অর্পিত যে নামেই ডাকিনা কেন এটা একটা অমানবিক এবং কালো আইন। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকার অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন পাশ করে। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এই আইন সংশোধন করতে উদ্যোগী হয়েছে। আমরা মনে করি এই সাম্প্রদায়িক কালো আইনটির সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এই আইনটি পুরোপুরি বাতিল করা জরুরি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্যাতন অন্যতম একটি উপসর্গ। সাধারণত: ক্ষমতায় যে দল থাকে সেই দল নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নির্যাতনকে উৎসাহিত করে এমন অনেকগুলো কালো আইন কার্যকর আছে। এরমধ্যে ১৮৯৮ সালের ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড, ১৯৭৪ এর বিশেষ ক্ষমতা আইন উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার ৩৯ বছর পরও ৫৪ ধারা ও ১৬৭ ধারার অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। জনসংখ্যানুপাতে পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। প্রায় ১৩০০ মানুষের জন্য একজন পুলিশ আছে বাংলাদেশে। আবার বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় পুলিশের বেতন-ভাতাও অতি সামান্য। আধুনিক অস্ত্র-সরঞ্জাম ছাড়াও উপর্যুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাবতো আছেই। পুলিশকে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে। এসব কারণে পুলিশ ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশে বাড়ছে কাস্টডিয়াল নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা। পুলিশ কাস্টডিয়াল ডেথ বা হেফাজতে মৃত্যুর বহু নজির আছে। রুবেল ও ইয়াসমিন হত্যাকান্ড হতে পারে বড় নজির। আবার সেনা হেফাজতেও নির্যাতন ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সেনা হেফাজতে আদিবাসি নেতা চলেশ রিচিলের হত্যাকান্ডের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। পার্বত্য চট্রগ্রামে ১৪ বছর আগে আদিবাসি নেত্রী কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করে সেনাবাহিনী। সেই কল্পনা চাকমা আজও উদ্ধার হয়নি। মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেশে দেশে হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেক বছর পরেও যুদ্ধারাধীদের বিচার হওয়ার নজির রয়েছ বিশ্বে। বাংলাদেশও আছে যুদ্ধাপরাধী। তবে রাজনৈতিক কারণে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার অবশ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে। হাসিনা সরকার যুদ্ধারপধীদের বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে বিগত স্বাধীনতা দিবসের মাসে। সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। যুদ্ধারাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে অভিযুক্ত বেশ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে। বাঙালি চরিত্রে তোষামদি বা চাটুকারিতা অনুপ্রবেশ করে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সুবিধাবাদি-স্বার্থান্বেষী মতলববাজ গোষ্ঠী এই তোষামদির সাথে জড়িত। মূলত: এই তোষামদকারি গোষ্ঠী শিক্ষিত শ্রেণীভুক্ত। ইংরেজ শাসকরা বাঙালিকে এই কু-শিক্ষাটি ভালোভাবেই গলাধ:করণ করিয়েছে। পাকিস্তান আমলেও জনগণ তোষামদকারি শ্রেণীর তৎপরতা ছিল লক্ষ্য করার মতো। আর স্বাধীন বাংলাদেশেও তার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার অন্যতম লক্ষ্যই ছিল দেশে গণতান্ত্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু আজ বাংলায় নেই ব্রিটিশ বা পাকিস্তানী শাসন ও শোষণ কিংবা নিপীড়ন। তদুপরি তোষামোদী স্বভাবে আজও পরিবর্তনের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। দেশের মোট জনসংখ্যার অধিকাংশই অশিক্ষিত খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। সহজ-সরল এসব সাধারণ মানুষগুলি দিন আনে দিন খায়। উপার্জনের যেটুকু অর্থ পায় তা দিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেতেই শেষ হয়ে যায়। রোদ-বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যেও দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাজ করে চলেছেন। রাজনীতি, জনপ্রশাসনে এই তোষামদি বা চাটুকারিতার বেশ প্রচলন ঘটেছে। অবৈধভাবে অর্থ আয়, পদ, পদবি, ক্ষমতার লোভে এই বদ সংস্কৃতিকে জিইয়ে রেখেছে তষাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী। বিবেক, ন্যায়বোধ, সততা, মর্যাদার জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজের প্রায় সকল পেশার মধ্যেই তৎপর এই গোষ্ঠী। ফলে মেধা, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ণ হচ্ছে না। সৎ মানুষ, ব্যবসায়ি ও অন্যান্য পেশাজীবী এমনকি রাজনীতিবিদরা পিছিয়ে পড়ছেন। আর তাদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে সুবিধাবাদি, চাটুকার গোষ্ঠী। সমাজে যারা চাটুকারিতা করতে পারেন না বা এই অপযোগ্যতাটি যাদের নেই তারা নিগৃহিত হচ্ছেন নানাভাবে। কারণ সৎ ও বিবেকবানরা সততার সঙ্গে মর্যাদার সাথে বাঁচতে চান। কিন্তু তারাই আবার গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক শাসন-শোষণে নিষ্পেশিত,অবহেলিত এবং নিপীড়িত। কালো টাকা, সন্ত্রাস, পেশীশক্তি আর পরিবারতন্ত্রের কাছে পরাজিত হচ্ছে স্বচ্ছ ও নীতিবানদের রাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রবণতা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সৎ ও দুর্নীতি বা অনিয়মের সাথে জড়িত নন এমন ব্যক্তিরা রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন। কালো টাকার মালিক, দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতন্ত্র গ্রাস করে ফেলছে স্বচ্ছ রাজনীতিকে। আর এর ফল ভোগ করছে দেশের দরিদ্র সাধারণ মানুষ। গুটিকতক রাজনৈতিক নেতা এবং পরিবারের কাছে জিম্মি হয়ে আছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ। দুবৃর্ত্তায়নের রাজনীতি গণতন্ত্র চর্চার পথকে দিন দিন রুদ্ধ করে ফেলছে। বারবার ঘুরে ফিরে ক্ষমতা যাচ্ছে যেসব দলের কাছে তাদের কেথাও গণতন্ত্রের ন্যূনতম চর্চা নেই। টাকাই মুখ্য হয়ে উঠছে রাজনীতির জন্য। সম্প্রতি সাবেক প্রধান উপদেস্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের নামে দেশ বাজিকরদের হাতে জিম্মি।’ প্রাক্তন এই প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকেই দেশের রাজনীতির স্বরুপটা বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অবস্থা বড়ই নড়েবড়ে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় অংশেরই জীবন কাটে মানবেতদর অবস্থায়। অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সীমাহীন সম্পদ অপরিসীম চাহিদা, বেকারত্ব, দূর্বল জনপ্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা বাধাগ্রস্ত করছে দেশের অগ্রগতিকে। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আইনের শাসনহীনতা, জবাবদিহিমূলক সরকার ও দায়িত্বশীল বিরোধীদলের অনুপস্থিতি দুর্বল ও শিশু গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তুলছে প্রতিনিয়ত। এর প্রমাণ পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সমীক্ষাসমূহে। পৃথিবীর প্রধান ৬০টি ব্যর্থ রাষ্ট্র্রের তালিকায় বাংলাদেশ ২৪তম অবস্থানে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’ গত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ষষ্ঠবারের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর এ সূচক প্রকাশ করে। মুক্তি সংগ্রামের সফলতার পরপরই ১৯৭২ সালে দীর্ঘ কাঙ্খিত সংসদীয় সরকার পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে চালু করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে সর্বোচ্চ ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি করা হয়। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই সংসদীয় পদ্ধতির পতন ঘটানো হয়েছিল। পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রপতি শুধু সরকার প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানই হলেন না। বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণ রাখা হলো সরকার প্রধানের হাতে। সংসদে প্রণীত আইন বাতিল, জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতাও অর্পিত হলো সরকার প্রধানের হাতে। সবক’টি রাজনৈতিক দল বাতিল করে গঠন করা হলো একটি দল। যার নাম দেয়া হলো বাকশাল। চারটি সংবাদপত্র বাদে অন্য সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিল করা হলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর দুই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার কার্যত একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। যদিও কোন কোন তরফে জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়। ১৯৯০ সালে এসে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু হলো নব উদ্যমে। ১৯৯১ থেকে অদ্যাবধি চারটি নির্বাচিত সরকার পেলো বাংলাদেশ। কিন্তু সংসদ ও সরকার প্রকৃত অর্থে কার্যকর তথা জনকল্যাণমূলক হলো না। মূলত ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়লো সরকার-সংসদ। কখনও ম্যাডাম হাসিনা বা ‘জননেত্রী’ হাসিনা আবার কখনও ম্যাডাম খালেদা বা ‘দেশনেত্রী’ খালেদা ইত্যাদি নামে সবকিছুই চলতে আছে। দেশের মানুষ বারংবার হাসিনা বা খালেদা নির্ভর সংসদ ও সরকার দেখছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে কখনও জনকল্যাণমূলক সরকার বা দায়িত্বশীল বিরোধীদলের মুখ দেখতে পারছে না জনগণ। জনগণের প্রত্যাশা ছিল মহাজোট সরকার ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যাবে, সংবিধান থেকে বিসমিল্লাহ তুলে নিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাবে। নিষিদ্ধ করবে সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। কিন্তু হাসিনা সরকার সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করবে না তারা, বিসমিল্লাহকেও রাখবে তার জায়গাতেই। নগ্ন দলীয়করণের সংস্কৃতি: বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থায় নগ্ন দলীয়করণ সংস্কৃতি বেশ পুরনো। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বাংলার রাজনীতি। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার প্রশাসনে নজিরবিহীন দলীয়করণ করেছিল। মেধা ও যোগ্যতার বদলে দলীয় সম্পৃক্তি বা পরিচিতিই হয়ে উঠেছিল প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারিদের যোগ্যতার মাপকাঠি। বিএনপির পথ অনুসরণ করে বর্তমান আওয়ামী লীগও প্রশাসনকে পিরামিড কায়দায় দলীয়করণ করতে চাইছে। এমন খবর ইতোমধ্যে সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা, সচিবালয়ের কর্মকর্তাসহ জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে খোজা হচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের। পছন্দের কর্মকর্তাদের অন্ত:ত চারটি স্তরে সাজানো হবে। দলীয় পছন্দসই কর্মকর্তাদেরই পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। লক্ষ্য আগামি নির্বাচন। নির্বাচনের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের পরও যাতে দফায় দফায় বদলির মুখে পড়লেও পছন্দের কর্মকর্তারাই থাকবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। যেমনটি করেছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এমন দলীয়করণের ফলে জনপ্রশাসন জনগণের কল্যাণে তেমন কাজে আসে না। অথচ বিগত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ প্রশাসনকে দলীয়করণ না করার অঙ্গীকার করেছিল। বিরোধী দলে থাকলে বা ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজনৈতিক দলগুলি বিশেষ করে ক্ষমতাবান দুইটি রাজনৈতিক শক্তি জনকল্যাণমূখী পরিকল্পনা ও সুন্দর সুন্দর বক্তব্য প্রদান করে থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় গেলে তাদের আচরণ ও কর্মকান্ড বদলে যায়। ভুলে যায় তারা তাদের অঙ্গিকারের কথা। এই বিপরীতমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কোন দলই বেরিয়ে আসতে পারছে না। অথচ ৫ বছর পরপর এই দু’টি রাজনৈতিক দলের হাতেই ঘুরে-ফিরে ক্ষমতার হাত বদল ঘটছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকতে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজিয়েছিল। জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা বা আমলারা দলীয় রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার বাইরে বেরুতে পারছে না। এসব আমলা বা কর্মকর্তার কাছে দেশের চেয়ে দলের স্বার্থটাই বড়। বরং দলীয় নয় নির্দলীয় নিরপেক্ষ জনগণের সেব জনপ্রশাসনই যে কোন সরকারের কাম্য হওয়া উচিত। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে এটা কখনও গড়ে তোলা র চেষ্টা করা হয়নি। সুবিধাবাদি, চাটুকার দলবাজদের আমলাদের নিয়ে দক্ষ ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব নয় কখনও। এই মহাসত্যটি কোন ক্ষমতাবান রাজনৈতিক দলই কখনও বুঝতে চায়নি। আজও বুঝতে চাইছে না ক্ষমতাসীন দল। মেধা, যোগ্যতা বা দক্ষতার ভিত্তিতে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের পদোন্নতি, নিয়োগ বা বদলির সাংবিধানিক নিয়ম অনুসৃত হয় না বাংলার রাজনীতিতে। ফলে জনপ্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনকল্যাণ এমনকি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বা জোটটিও। কিন্তু ক্ষমতার মোহে বা লালসায় বুদ ক্ষমতাসীন দল এই সত্যটি অনুধাবন করার শক্তি সঞ্চয় করতে পারে না। বোধদয় ঘটে তখন যখন পরিস্থিতি আর তাদের আয়ত্ত্বের মধ্যে থাকে না। প্রশাসনে দলীয়করণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-জাতীয় কোন ইস্যুতেও সরকারি দল ও বিরোধী দল এশমতে আসতে পারে না। সরকারি দল বামে গেলে বিরোধী দল ডান দিকে যাবে এটাই রাজনৈতিক সংস্কৃতি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যেসব কর্মসূচী বা প্রকল্প হাতে নেয় আওয়ামীলীগ বা মহাজোট ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে। আবার আওয়ামী লীগের নেয়া কর্মসূচী বাতিল করে বিএনপি। দলীয়করণের নির্লজ্জ প্রকাশ্য ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. মোদাচ্ছের আলী। তিনি গত ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১০ গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালের সম্মেলনকক্ষে অ্যানথ্রাক্স নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভায় বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত কর্মীদের মধ্য থেকে সাড়ে ১৩ হাজার জনকে কমিউনিটি হেলথ সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। মোদাচ্ছের আলী বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের বাইরে কেউ যাতে সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি বলেন, ‘দলের পরীক্ষিত কর্মীরাই যাতে চাকরি পায়, সে জন্য আমি মোটামুটি একটা সিস্টেম করেছি। আমি তো আমার অফিসারকে বলে দেব, আমার লোককে চাকরি দিতে হবে।’ টাকা থাকলেই নমিনেশনপ্রাপ্তি এবং এমপি-মেয়র হওয়া যায়: বাংলাদেশের রাজনীতিতে টাকার কদর বাড়ছে ক্রমশ:। দলীয় ফান্ডে কোটি টাকা দিলে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান বা মেয়র পদে মনোনয়ন/নমিনেশন পাওয়া খুব সহজ ব্যাপার। কালো টাকার কাছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সততা তুচ্ছ হয়ে যায়। ফলে রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও ব্যবসায়িদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। বিগত নির্বাচনে এই সত্যটা আরও পরিস্কার হয়েছে। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ৩০০ জনকে সংসদ সদস্য পদে নমিনেশন দিয়েছিল তার মধ্যে প্রায় ১৪৬ জনের নমিনেশন পরিবর্তন করা হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে। এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল টাকার খেলা। নতুন করে নমিনেশন পাওয়া প্রার্থীদের কেউ কেউ এক কোটি থেকে ৫ কোটি এমনকি ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত দলীয় ফান্ডে জমা দেয়ার খবর শোনা যায়। টাকার বিনিময়ে নমিনেশন পাওয়াদের অধিকাংশই ব্যবসায়ি বা কালো টাকার মালিক। বিএনপির ক্ষেত্রেও এমন অনেক নজির আছে। আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা আর বিএনপিতে খালেদা জিয়া এই দুই নেত্রী যা বলেন বা যা চান তাই বাস্তবে রুপ নেয়। নেত্রীর বাইরে কেউ কোন কথা বলার সাহস করেন না। আবার সাহস করে কেউ সত্যটি বললেও তাকে পদ-পদবি হারাতে হয়। এক কথায় ক্ষমতার স্বাদ গস্খহণকারি বড় দুই রাজনৈতিক দলে বাস্তবিক অর্থে গণতন্ত্রের কোন বালাই নেই। জাতীয় সংসদ কোটিপতি ব্যবসায়িদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। বিরোধী দলে থাকলে শীর্ষ নেত্রীর সংসদে উপস্থিতি কম: বর্তমান নবম সংসদে ১৫৮ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিন উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ১১৭ দিন। এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে ওই সময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা ৭২ দিন উপস্থিত ছিলেন। অর্থাৎ বিরোধী দলে থাকলে দুই নেত্রীরই সংসদে উপস্থিতি কমে যায়। ১৫৮ দিনের মধ্যে বিএনপির সদস্যরা গড়ে ১০ থেকে ৪৪ দিন উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ দিন। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিব রহমানের উপস্থিতি ১১ দিন। সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সবচেয়ে কম সময় ৪৭ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টির বেগম রওশন এরশাদ উপস্থিত হয়েছেন মাত্র ২২ দিন। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। সংসদকে কার্যকর রাখা যে কোন গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্যের অন্যতম একটি মাপকাঠি। সেদিক থেকে এ সরকার সাফল্য দেখাতে পারেনি। সংসদকে কার্যকর করতে না পারার ব্যর্থতা অবশ্যই বর্তমান মহাজোট সরকারের জন্য কোন সুখকর বার্তা বয়ে আনতে পারবে না। কেবলমাত্র প্রতিপক্ষকে গালমন্দ করে বা তাদেরকে প্রতিরোধের হুমকি দিয়ে কিংবা প্রতিপক্ষের ত্রুটি সমূহ তুলে ধরলেই সংসদ কার্যকর করা যায় না। জাতীয় রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদকে কার্যকর করতে চাইলে সহনশীল মানসিকতা চাই। সংসদীয় গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সরকারি দল কতটুকু ছাড় দিতে পারছে বা বিরোধী দলকে কতটুকু ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারছে তার উপরও নির্ভর করে সংসদ কার্যকর হওয়া। দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রাণভিক্ষার রাজনীতি: বিএনপি করেছে তাই আওয়ামী লীগও করছে। খারাপ দৃষ্টান্ত অনুসরণে বাংলাদেশের রাজনীতির এই সংস্কৃতি ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের পথে অন্যতম বাধা। যুবদল নেতা গামা হত্যা মামলায় ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত ২০ আসামিকে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০ ক্ষমা করে দিয়েছেন। অথচ উচ্চ আদালতে আপিল শুনানির অপেক্ষায় আছে এই মামলাটি। ক্ষমাপ্রাপ্তরা সকলেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে এ ধরনের ক্ষমা প্রদর্শন করতেই পারেন। এই সাজা মওকুফের জন্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। কিন্তু আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় অভিযুক্তদের ক্ষমা প্রদর্শন নৈতিকতাবিরোধী। আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, বিএনপি আমলেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিদেশে থাকা একজন দন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা করেছিলেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে এক হাজারের বেশি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মানুষ আছেন। এরমধ্যে মাত্র ২০ জনকে ক্ষমা করলেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্ত বাকি মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের জন্য অবিচার এবং বৈষম্যমূলক। দখলদারিত্ব ও ভর্তি-নিয়োগ বাণিজ্যের রাজনীতি: যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কোমরবেধে নেমে পড়ে অবৈধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও বিভিন্ন দফতরে নিয়োগ বাণিজ্য আর দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য। বিএনপি-জামায়াত আমলে ইসলামি ছাত্রশিবির আর ছাত্রদলের উৎপাতে অতিষ্ঠ ছিল দেশের মানুষ। আর এখন আওয়ামী লীগের দুই সহযোগি সংগঠন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ বেপরোয়া। কোন বাধাই মানছে না এই সোনার ছেলেরা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে ছাত্রদল, যুবদল এবং ইসলামি ছাত্রশিবির অবৈধ ভর্তি বাণিজ্যে মেতে থাকতো। আর এখন ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সেই জায়গাটার দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করেছে। আওয়ামী লীগের দিন বদলের এই ডিজিটাল সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জলকারি ছাত্রলীগ-যুবলীগ একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন। দেশজুড়ে এদের টেন্ডারবাজি, চাদাবাজি, দখলদারি আর ভর্তি ও নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। কিন্তু সরকারি দল এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। যেভাবে ছাত্রদল ও শিবিরকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দখলদারি আর নিযোগ বাণিজ্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি দেশে। ছাত্রদল-যুবদল ও ইসলামি ছাত্রশিবিরের জায়গাটা দখল করেছে যুবলীগ-ছাত্রলীগ। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন পদে নিয়োগ মেধার দৌড়ে টিকতে না পেরে নিয়োগ বঞ্চিত যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা জেলায় জেলায় তান্ডব চালাচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়ে সিভিল সার্জনের কার্যালয় ভাংচুর করেছে যুবলীগ-ছাত্রলীগ। পাবনায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের গণনির্যাতন ও ব্যাপক ভাংচুর করে তারা। এই ঘটনায় পাবনার জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। গণমাাধ্যমে জেলা প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের কান্নার ছবি প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে। এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রির আরেক উপদেস্টা এইচ টি ইমাম সন্ত্রাসী দলীয় কর্মীদের পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়ে বলেছেন, ‘পাবনায় প্রশাসনের কেউ কাদেনি। এই কান্না মিডিয়ার সৃষ্টি।’ বিএনপি-জামায়াত আমলে প্রধানমন্ত্রি খালেদা, যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, তৎকালিন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি লুৎফুজ্জামান বাবরও ঠিক এক।ভিাবে বলেছিলেন যে, ‘বাংলা ভাই মিডিয়ার সৃস্টি।’ অথচ তখন আল-কায়দার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষাকারি ইসলামি জঙ্গি নেতা বাংলা ভাই প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে লাশ গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখছিল। সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য ও তার অনুগত যুবলীগ-ছাত্রলীগ বাহিনীর তান্ডবে পাবনার অসহায় জেলা প্রশাসন সরকারের কাছে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বিচার চাইলো। আওয়ামী লীগ সরকার তাদেরকে ন্যায়বিচার না দিয়ে শাস্তি দিলো। পাবনা প্রশাসনের প্রায় সব শীর্ষ কর্মকর্তাকে হয় বদলি না হয় ওমসডি করে শাস্তি দেয়। শুধু পঞ্চগড় বা পাবনাতেই নয় যশোর ও পটুয়াখালীসহ আরও অনেক স্থানে এমন জহন্য ঘটনা ঘটিয়েছে সরকারদলীয় ক্যাডাররা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক প্রাণ গোপালও একইভাবে চাকরিপ্রার্থী সরকার সমর্থকদের হাতে লাঞ্ছিত হন। এই হলো বাংলাদেশের রাজনীতির দখলদারিত্বমূলক অপসংস্কৃতি। নাম বদলের রাজনীতি: আজ এই সরকার যে প্রতিষ্ঠান ভবন বা উন্নয়ন প্রকল্পের নামকরণ করলো কাল অন্য সরকার ক্ষমতায় এলে তা বাতিল করা হবে। নামকরণ হবে নতুন নামে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় যমুনা নেতুর নামকরণ করেছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসেই বঙ্গবন্ধুর নামে করা যমুনা সেতুর নামকরণ বাতিল করে। আবার ২০০৯ সালে ক্ষমতা নেয়ার পরপরই আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের নামে করা ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ এর নাম মুছে ফেলে। বিশ্বজুড়ে পরিচিত ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এখন শাহজালাল বিমান বন্দর। জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সব জায়গা থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলতে চায়। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে সব জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা উপড়ে দেয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্রই চাটুকার-দালাল চক্র হয় বঙ্গবন্ধু নয়তো জিয়ার নামে নামকরণ করানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। হাসিনা এবং খালেদা এই সুবিধাবাদি শ্রেণীর বিপক্ষে কখনও সাহস করে দাড়ায়নি। ফলে নামবদলের হীনমন্য রাজনীতির পরিসর বাড়ছে নিরন্তর। রাজনীতিতে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্র : দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধ:পতনের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত গণতন্ত্রের বিকাশমান ধারা হচ্ছে ব্যাহত। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, চলমান পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাই বাংলাদেশের সর্বগ্রাসী অচলায়তনের জন্য অনেকাংশেই দায়ি। গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, রাজতন্ত্র প্রর্ভতির সঙ্গে আমাদের নানাভাবে পরিচয় ঘটেছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিবারতন্ত্র নামের কোন ধারণা পাওয়া যায় না। পরিবারতন্ত্রের নয়া ধারণা হয়ত অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবারতন্ত্র জনজীবনে নানান সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ। গণতন্ত্রের নামে এখানকার সমাজ, নাগরিক জীবন কার্যত: পরিবারতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পরিবারতন্ত্রের নতুন এই ধারণাকে আমরা রাজতন্ত্রের সঙ্গে কেবল তুলনা করতে পারি। কিন্তু পরিবারতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রধানমন্ত্রি রাজতন্ত্রের একজন চরম রাজার চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালি। বাংলাদেশে বিগত দুই দশক ধরে পরিবারতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চলে আসছে। এখানে রাজনীতিকে এখন আর কোন জনসেবা বা দেশসেবার সংজ্ঞায় ফেলা যাবে না। বরং রাজনীতি হয়ে উঠেছে ব্যক্তি, পরিবার বা দলের উন্নয়নের সেবক বা মানদন্ড হিসেবে। ফলে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে দেখা যাচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা। দেশ মূলত: দুই পরিবার তথা হাসিনা ও খালেদা পরিবারের কাছে জিম্মি। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর আওয়ামী লীগে এবং জিয়ার হত্যাকান্ডের পর বিএনপিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই অবস্থায় হাসিনা ও খালেদাকে যখাক্রমে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মনে করে দলের প্রধান করা হয়। হাসিনা আওয়ামী লীগের এবং খালেদা বিএনপির হাল ধরলে দলে ঐক্য ও সংহতি ফিরে আসে। খালেদা স্বামীর এবং হাসিনা বাবার উত্তরাধিকারি হিসেবে রাজনীতিতে আবির্ভূত হলেন। এতে ক্ষতির কিছু ছিল না। উভয়ই ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি মেনে সামনে এগিয়ে যাবেন। এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন দেশের মানুষ। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাও তাদের প্রাণভরা নি:স্বার্থ সমর্থন আস্থা প্রদর্শন করলেন দুই নেত্রীর প্রতি। কিন্তু তারা ধীরে ধীরে আদর্শচ্যুত হতে থাকলেন। এক পর্যায়ে সরকার ও দল উভয় জায়গায় হাসিনা এবং খালেদা গড়ে তুললেন পরিবারের একাধিপত্য। পরিকবারতন্ত্রের পাশাপাশি চলে আসলো দুর্নীতি। দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের যাতাকলে দেশের মানুষ পদদলিত হতে থাকলো। রাজনীতির মাধ্যমে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির হোমরা-চোমরারা কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলতে লাগলেন। গণতন্ত্র আর অর্থনীতিতে গড়ে তোলা হলো দুর্নীতি-লুটপাটতন্ত্র। জনগণের অসচেতনতা, অশিক্ষা, সহজ-সরলতা আর দারিদ্র্যতাকে পুজি করে লুটেরা শ্রেণী রাজনীতির নিয়ন্ত্রণকর্তায় আবির্ভূত হতে থাকে। রাজনীতিতে সন্ত্রাস, অর্থ ও পেশিশক্তির দাম বাড়তে থাকে। এখানে বলে রাখা ভালো, রাজনীতিতে সন্ত্রাস-অর্থ ও পেশিশক্তির আমদানির জন্য সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া ও এরশাদই মূলত: দায়ি। তবে স্বল্প পরিসরে হলেও রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও পরিবারতন্ত্রের সূচনা ঘটে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আমলেই। জাসদ নেতা সিরাজ শিকদারকে হত্যা, রক্ষী বাহিনীর সন্ত্রাস, গণবাহিনীর হত্যা-নির্যাতন, বঙ্গবন্ধু পরিবারের কতিপয় সদস্যের অপকর্ম সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত জাতি প্রত্যক্ষ করেছে সূচনাতেই। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে জিয়া ও এরশাদের সামরিক শাসনামলে সমাজে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকতা পেতে থাকে। জিয়া কর্ণেল তাহেরসহ বহু মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারকে হত্যা করান। বঙ্গবন্ধু ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নানামুখী ইসলামি কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন বটে। কিন্তু তিনি ধর্মকে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে ব্যবহার করেননি। তবে জিয়া ও এরশাদ রাষ্ট্র ও সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়েছেন। যাহোক, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির প্রবণতা হলো মেধা, সততা, স্বচ্ছতা, শিক্ষা নয় টাকা, অস্ত্র ও পেশিশক্তিই রাজনীতির মূল নিয়ামক উপাদান। বিশেষ করে বড় দুইটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই প্রাকটিসটাই করে চলেছে। বিএনপিতে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান বিএনপির মূল নিয়ন্ত্রণকর্তা। বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন সরকার ও দল মূলত: তারেক রহমানকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। অতি সম্প্রতি তারেক রহমানকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয়। খালেদাপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে-বিদেশে টাকার পাগাড় গড়ে তুলেছেন। হাসিনাপুত্র সজিব ওয়াজেদের বিরুদ্ধেও সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই রিপোর্ট প্রকাশ করার জের ধরেই মূলত: বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ইতোমধ্যে বিরোধীমতের পত্রিকা হিসেবে পরিচিত দৈনিক আমার দেশের প্রকাশনা বাতিল করেছে। পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদককে এখনও কারাবন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে। আবার আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহেনা ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের শক্ত প্রভাব লক্ষ্যণীয়। হাল আমলে আমেরিকাপ্রবাসী সজীব ওয়াজেদকে রংপুর আওয়ামী লীগের সদস্যপদ প্রদান করেছে সেখানকার অতি উৎসাহী আওয়ামী লীগ। আগামি দিনে জয় ও রেহেনাকে আওয়ামী লীগের বড় পদ পদবিতে অলংকৃত করা হবে-এতে কোন সংশয় নেই। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই বড় দুই দলে ব্যক্তি কেন্দ্রিক ইচ্ছা-অনিচ্ছায়ই সবকিছু পরিচালিত হয়। আওয়ামী লীগে হাসিনা আর বিএনপিতে খালেদা যা বলেন বা যা চাইবেন তাই-ই হবে এবং হতেই হবে। ইহাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা। এই বড় দুই দলের বাইরে জাতীয় পার্টিতেও পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এরশাদপতœী বেগম রওশন এরশাদ ও এরশাদের ভাই জিএম কাদের জাতীয় পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতা। জাতীয় পার্টিতেও এরশাদ যা বলেন বা যা চান তাই হয়। বাংলাদেশে ১৬ কোটির অধিক জনসংখ্যা। দেশের মানুষের নিরাপত্তা মুহুর্তে মুহুর্তে বিঘিœত হচ্ছে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হয় না। রাজনীতি হয় ব্যক্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন পাশ করে। অন্যদিকে দেশের বহু মানুষের দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাবার জোটে না। লাখ লাখ মানুষ থাকেন খোলা আকাশের নিচে। তাদের খাবার বা থাকার ব্যবস্থার দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন কর্মসূচী নেয়া হয়নি কখনও। কিন্তু বহু টাকা ও সম্পদ এবং বাড়ির মালিক রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের বাড়ি রক্ষায় রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মসূচী ঘোষণা করা হ§য়। এতেই বোঝা যায় তাদের রাজনীতি ব্যক্তি ও পরিবারকে রক্ষা করা। দেশের মানুষ বা দেশকে রক্ষা করার উদ্দেশে বড় দুইটি দল রাজনীতি করছে না। দেশের হাইকোর্ট সম্প্রতি বেগম জিয়ার সেনানিবাসের বাড়িটি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এরই বিরুদ্ধে বিএনপি রাজপথে নামার হুংকার দেয়। বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা কুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। সংবিধান না হয় বাদ দিলাম, বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের যে গানতন্ত্র আছে সেই গানতন্ত্রের লিখিত রীতি-নিয়মগুলিও খালেদা-হাসিনা মেনে চলেন না। গঠনতন্ত্র মেনে দল পরিচালিত হলেও গণতন্ত্র চর্চার পথ কিছুটা হলেও অগ্রগামী হতো। বর্তমান আওয়ামী লীগ দেশের মানুষে দিন বদলের রাজনীতি ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখালো। সেই স্বপ্নে বিভোর জাতি আওয়ামী লীগকে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্টতা দিয়ে ক্ষমতায় বসালো। সেই আওয়ামী লীগ পরিবার-পরিজন ও জ্বি-হুজুরমার্কাদের পদ-পদবিতে পুরস্কৃত করলো। আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কান্ডারি আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল জলিলকে হাসিনা দূরে সরিয়ে দিলেন। বঙ্গবন্ধুও একজন ত্যাগি ও পরীক্ষীত নেতা তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন সুবিধাবাদি খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্রে। কোটিপতি ব্যবসায়ি প্রায় ১৫০ জনকে হাসিনা সংসদ সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচিত করে আনলেন সংসদে। ফলে সংসদ আজ ব্যবসায়ি-আনাড়িদের আসরে পরিণত হলো। দলে ত্যাগি, নীতিবান এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষীত নেতাদের সরকার ও দলের বাইরে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। বিএনপিতেও একই অবস্থা। দলে গণতন্ত্রহীনতা ও পরিবারতন্ত্রের বিপক্ষে কথা বলেছিলেন বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়া। ফল হিসেবে তার মৃত্যুর পরও বেগম জিয়ার সহানুভূতি পর্যন্ত পাননি মান্নান ভূইয়া। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাকালীন মহাসচিব ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। পরিবারতন্ত্রের গ্যাড়াকলে পড়ে অপমানজনক পরিস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়েছিল। যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতা-নেত্রী কিংবা মন্ত্রি-এমপিদের আত্মীয়-স্বজনদের দুর্নীতি ও উৎপাত বেড়ে যায়। আজকের বাংলাদেশে এমপিতন্ত্র (সংসদ সদস্যতন্ত্র)) রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নয়া উপসর্গ। এমপিদের বাইরে বিশেষ করে সরকারদলীয় এমপিদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্ব-স্ব এলাকার স্থানীয়, জেলা বা উপজেলা প্রশাসন। এমপিরা তাদের নিজের, পরিবারের স্বার্থে বিভিন্ন গ্রুপ মেইনটেইন করছেন। আর এটা করতে গিয়ে বাড়ছে চাদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। ছাত্রলীগ-যুবলীগের হুমকি ও নির্যাতনে প্রশাসন কার্যত: অবরুদ্ধ ও অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করছে। এমপিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, দলতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র বাংলাদেশের রাজনীতিকে অক্টোপাসের ন্যায় গ্রাস করে ফেলেছে। রাজনৈতিক এই অসুস্থ্য অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আগে মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। সমাজ-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মানসের আমূল পরিবর্তন করতে চাইলে জাতিকে শিক্ষিত করা চাই। আর একটি শিক্ষিত জাতির ভেতর থেকেই গণজাগরণ জনবিপ্লব সৃষ্টি হতে পারে। তবে দেশের বিদ্যমান পরিবারতান্ত্রিক অগণতান্ত্রিক রাজনীতির অবসান ছাড়া দেশের মানুষের গণমুক্তি সম্ভব নয়। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ আর লাশের রাজনীতি: ১৯৭১ সাল থেকে ২০১০ স্বাধীনতার ৩৯ বছর চলছে। একটা দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন, অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক উন্নয়নে এই সময় কম নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির তেমন কোন উন্নয়ন ঘটেনি আজও। এখনও রাজপথে প্রকাশে মানুষ হত্যা, অস্ত্রবাজি, রাজনৈতিক হানাহানির ঘটনা দেখতে হচ্ছে দেশবাসিকে। জনপ্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে জনগণের কাজে না লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহক হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। যে দল যখন ক্ষমতায় সেই দল তখন প্রশাসন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করতে থাকে। ফলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দলীয়করণমুক্ত গণমুখী প্রশাসন গড়ে উঠতে পারে না। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রদান এবং অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের ঘটনায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সহিংস, সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি যেন পিছু ছাড়ছে না বাংলাদেশের। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আবার সরকারি দল আওয়ামী লীগ বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ করছে। গত ৮ অক্টোবর, ২০১০ নাটোরের বড়াইগ্রামে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর বিএনপির সভাপতি সানাউল্যাহ নূর বাবুকে সরকার দলীয় ক্যাডাররা প্রকাশে কুপিয়ে হত্যা করে। বিএনপি অভিযোগ করে, আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পরিকল্পিতভাবে হত্যা-নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রি ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, বড়াইগ্রামের হত্যাকান্ড বিএনপির দলীয় কোন্দলের ফল। চলতি ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সমাবেশস্থলে ট্রেনে কাটা পড়ে ৭ জন নিহত হন। বেগম জিয়া অভিযোগ করেন, ‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলে মিছিলে ট্রাক তুলে দিয়ে সেলিম ও দেলোয়ারকে হত্যা করা হয়েছিল। একইভাবে ‘স্বৈরাচারী’ শেখ হাসিনার সরকার ট্রেন তুলে দিয়ে জনসভায় আগত নেতাকর্মীদের হত্যা করে এক ঘৃণ্য নজির স্থাপন করল।’ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরদিন ১২ অক্টোবর পাল্টা অভিযোগ করেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘সিরাজগঞ্জে মিটিংয়ের আগে খালেদা জিয়া যমুনা রিসোর্টে লাশের অপেক্ষায় বসে ছিলেন। ইস্যু তৈরির জন্য তার এখন লাশের প্রয়োজন। এজন্য তিনি খুন-খারাবি শুরু করেছেন।’ নাটোরে বিএনপি নেতা বাবু হত্যাকান্ডের ব্যাপারেও তিনি দলীয় ক্যাডারদের পক্ষে সাফাই গান। তিনি বলেন, নাটোরে নিজেরা খুন করে বিএনপি আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতি অসহিষ্ণু অগণতান্ত্রিক আচরণ, সংঘাত, সংঘর্ষ, মারামারি, অবিশ্বাস, সন্দেহ, পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। প্রতিফল হিসেবে জনগণ দুর্ভোগ, অশান্তি, অনিরাপত্তার মধ্যে দিন যাপন করতে বাধ্য হন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাঙালি জাতির দীর্ঘ আকাঙ্খিত স্বপ্ন। যারা ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির সাথে জড়িত। এই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে বড় দলগুলি ঐক্যমতে আসতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় নানান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের স্বীকৃত যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতে ইসলামি। এই দলটির শীর্ষ নেতাদের ইতোমধ্যে গ্রেফতার করে তাদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান মহাজোট সরকার। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামের অন্যতম রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল বিএনপির অভিযোগ, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করতে চায়। ইতিহাস নিয়ে টানাটানি: বিশ্বের কোন দেশেই তার নিজ দেশের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক বিভক্তি দেখা যায় না। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একেবারেই ভিন্ন অবস্থানে। স্বাধীনতার ৩৯ বছর অতিক্রান্ত হতে চললো। কিন্তু এখনও দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল বিপরীতমুখী অস্থানে। স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে আজও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। বিএনপি মনে করে, স্বাধীনতার ঘোষক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান। কিন্তু আওয়ামী লীগ বলে, জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণার পাঠকারি মাত্র। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে জাতি পুরোপুরি দুইভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপ দাবি করে, জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক। অন্য গ্রুপ বঙ্গবন্ধুকেই স্বাধীনতা ঘোষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মানবাধিকার লংঘণের রাজনৈতিক সংস্কৃতি: বাংলাদেশের রাজনীতিতে মানবাধিকার লংঘণের সংস্কৃতি অতি পুরনো। সরকারি দলে থাকলে যে ঘটনা মানবাধিকার লংঘণের মধ্যে পড়ে না একই দল যখন বিরোধী দলে থাকে সেই একই ঘঁনাকে তারা মানবাধিকারের চরম লংঘণ বলে চিৎকার করে থাকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এক্ষেতে বিন্দুমাত্র তফাৎ করা যায় না। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা শুরু হয়েছিল। বিচার বহির্ভূত এসব হত্যাকান্ডকে মানবাধিকারের চরম লংঘণ বলে আওয়ামী লীগ দেশে-বিদেশে ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। আওয়ামী লীগ বলেছিল তারা ক্ষমতায় এলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করবে। অথচ সেই আওয়ামী লীগই এখন বলছে ঠিক উল্টো কথা যেটা সরকারে থেকে বলেছিল বিএনপি-জামায়াত। বিএনপি-জামায়াতের আমলেও রাজপথে পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও জনগণের ওপর নির্যাতন করেছে। এখন আওয়ামী লীগের আমলেও সেই অবস্থার কোনই পরিবর্তন ঘটেনি। মানবাধিকার লংঘণের ঘটনাগুলি ঠিক আগের মতোই ঘটে চলেছে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। তখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ উদ্বিঘœ ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের আমলে এখনও ঘটছে সংবাদপত্র-গণমাধ্যম দমন-পীড়ন এবং সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনা। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখন নিশ্চুপ। আর বিরোধী দল বিএনপি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বেশ সোচ্চার। কারণ একটাই তারা এখন বিরোধী দলে। বিরোধী দলে থাকলে যে কোন কারণে হোক না সে কারণ ব্যক্তি বা দলস্বার্থে সরকারের বিরোধিতা করা চাই চাই-ই। এটা বিএনপি আওয়ামী লীগ উভয় ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থের উর্দ্ধে নিতে পারেনি বিএনপি। আওয়ামী লীগ একই পথে হাটছে এখন। দেশে গণতন্ত্র, সুশাসন, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি করবে বলে ক্ষমতায় আসে দলগুলি। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পরই তারা ভুলে যায় তাদের অঙ্গিকার-প্রতিশ্রুতি। ভয়-ভীতি ও শংকামুক্ত হয়ে প্রশাসনকে কাজ করতে দেয়া হয় না। উপরন্তু প্রশাসনই সরকারদলীয় ক্যাডারদের হামলা-তান্ডবে আতংকিত-অসহায়। আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে উঠে না দলবাজির কারণে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র ভাবা যায় না। গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের সমালোচনা কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘণের ঘটনাসমূহের সমালোচনা করলেই গণমাধ্যমের ওপর নেমে আসে চরম আঘাত। সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয় স্বার্থের বাইরে আসতে পারে না বড় রাজনৈতিক দলগুলি। দেশের সর্বস্তরে চলছে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাদাবাজি, অপব্যবস্থা, অপশাসন। বিএনপির আমলেও মানুষ একই সমস্যার মোকাবেলা করেছেন প্রতি মুহুর্তে। দীর্ঘকালের সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন দেশের সাংবিধানিক সুশাসনের সবগুলো ভিত ধ্বংস করে ফেলেছে। দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পান রাজনৈতিক বিবেচনায়। এটা বিএনপির আমলেও ঘটেছে। আওয়ামী লীগের আমলেও জেষ্ঠ্যতা লংঘণ করে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় লোক ািহসেবে পরিচিত বিচারপতিকে। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা লোভ সংবরণ করতে পারেন না। ক্ষমতা আর টাকার নেশায় বুদ হয়ে থাকা রাজনীতিকদের পক্ষে জনকল্যাণ ভাবার সময় নেই। জনগণকে দেয়ার মানসিকতা নেই তাদের। রাজনীতিকরা ব্যক্তি, পরিবার ও দলকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলবো না। কিন্তু যেসমস্ত রাজনৈতিক দল জনগণের কল্যাণ করতে জনগণকে কিছু দিতে চায় তারা জনগণের সমর্থন লাভে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ বোধহয় অশিক্ষা, সুশাসনের অভাব আর দারিদ্রতা। বাঙালি সংস্কৃতি ঃ বাংলা ভাষা আর বাঙালি সংস্কৃতির দেশ বাংলাদেশ। বাঙালি মূলতঃ একটি শংকর জাতি। যুগে যুগে বাঙালিকে শাসন ও শোষণ করেছে বিভিন্ন দেশ ও জাতি। আর এরমধ্য দিয়েই বাঙালি একটি মিশ্র জাতিতে পরিণত হয়েছে। সংস্কৃতি হলো মানুষের দৈনন্দির জীবন-যাপন প্রণালী। মানুষ সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরে বিছানায় শুতে যাওয়া অব্দি যা কিছু করে তাই তার সংস্কৃতি। জীবন-যাপন প্রণালী, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-আচরণ, বিশ্বাস, চিত্তবিনোদনের মাধ্যম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সংস্কৃতি। সংস্কৃতিই একটা জাতির আসল পরিচয় বহন করে থাকে। প্রতিটি সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারা বা শ্রেণী থাকে। তেমনি বাঙালি সংস্কৃতিরও আছে তিনটি ধারা। এগুলি হলো আদিবাসি সংস্কৃতির ধারা, শহর বা নগর সংস্কৃতির ধারা এবং পল্লী বা গ্রাম সংস্কৃতির ধারা। বাংলাদেশ মূলতঃ একটি গ্রাম প্রধান দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে কৃষির উপর ভিত্তি করে। নগর সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও বিকশিত হচ্ছে। বাঙালির ঐতিহ্যপূর্ণ যে সংস্কৃতি তা গ্রাম সংস্কৃতিতেই বেশি পরিলক্ষিত হয়। গ্রামের মানুষ পরিপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। গ্রামীণ মানুষ বংশ পরম্পরায় পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা লাভ করে পোশাক-পরিচ্ছদ, উৎপাদন, খাদ্যদ্রব্য, বিনোদন, যানবাহন, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি সম্পর্কে। নগর সংস্কৃতিতে ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে বেশি। তবে প্রযুক্তি বিপ্লবের ঢেউয়ে গ্রামীণ সংস্কৃতিতেও বিদেশি সংস্কৃতির কিছুটা ছোয়া লেগেছে। রুপ ও প্রকৃতির বিচারে বাংালি সংস্কৃতিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এগুলি হলো বস্তুগত, মানসগত, প্রদর্শনমূলক এবং অনুষ্ঠানমূলক। বাংলার লোকসাহিত্য অতি পুরনো বা প্রাচীন। বিশ্বের প্রায় সবক’টি ধারার লোকসাহিত্যের উপাদান বাংলা ভাষায় বিদ্যমান। বাঙালি গ্রামীণ সংস্কৃতি ঐক্য ও সাম্যের পরিচয় বহন করে। আর এতেই নিহিত বাঙালির জাতিগত পরিচয়। বাংলাদেশে চারটি ধর্মাবলম্বির বসবাস। এরমধ্যে মুসলিম ধর্মাবলম্বি জনগোষ্ঠী প্রায় ৯০ ভাগ। অবশিষ্টদের মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বি এবং এক শতাংশ খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ ও আদিবাসি জনগোষ্ঠী। বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল তবে রিজিট নয়। সম্প্রীতি, সৌহাদ্যের মধ্য দিয়ে হিন্দু, মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। কিন্তু মাঝে-মধ্যে এই সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়ারও নজির আছে। বিবাহ-পরিবার ও সমাজ-ব্যবস্থা : বাঙালি সমাজ মূলত: একটি পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা। পুরুষই হলেন পরিবারের কর্তা বা প্রধান। পরিবার স্বামী-স্ত্রী ও অবিবাহিত সন্তানদের নিয়ে গঠিত। পুত্র সন্তান বিবাহের পরও পিতা-মাতার সঙ্গে বসবাস করেন। কিন্তু কন্যা সন্তান বিবাহের পর স্বামীর বাড়িতে চলে যায়। যৌথ পরিবারে স্বামী-স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনি একত্রে বসবাস করে। বিয়ে-সাদির পাত্র-পাত্রী সাধারণত পরিবারের পিতা-মাতার পছন্দানুযায়ী নির্বাচন করা হয়। পাত্রের বয়স পাত্রীর চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। তবে সমাজ-সংস্কৃতির ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের ধারায় ছেলে-মেয়েরা এখন অনেকেই তাদের জীবনসঙ্গী নিজেরাই বেছে নেয়। আবার হিন্দুদের বেলায় পাত্র-পাত্রী নির্বাচন তুলনামূলক জটিল। বাঙালি হিন্দু সমাজে বর্ণ-গোত্র প্রথা বিদ্যমান। একই জাতের পাত্র-পাত্রী ছাড়া সাধারণত বিবাহ সম্পন্ন হয় না। বাঙালি সমাজে যৌতুক বা পণ প্রথা বিদ্যমান। কনেপক্ষ বরপক্ষকে মোটা অংকের অর্থ, সম্পদ দিয়ে থাকে। অবশ্য এই অর্থ প্রদান স্চ্ছোয় হয় না মূলত: বরপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী এই অর্থ প্রদান করে থাকে কনেপক্ষ। আইনত এমন যৌতুক দন্ডনীয় অপরাধ হলেও এর প্রচলন এখনও আছে বাঙালি সমাজে। মুসলিম বাঙালি সমাজে বহু বিবাহের প্রচলন আছে। শরিয়া আইন অনুযায়ী একজন মুসলিম পুরুষ চারটি বিবাহ পর্যন্ত করতে পারে। আবার আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হলেও প্রচলন আছে বাল্যবিবাহের। কিন্তু সামাজিক বন্ধন বিবাহ ছাড়া কোন নারী বা পুরুষ একত্রে বসবাস করতে পারে না। ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুসারে একজন পুরুষ স্ত্রীর লিখিত অনুমতি সাপেক্ষে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে। তবে সবসময় এই আইন মানা হয় না। বাঙালি নারীরা সবসময় স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। বিশেষ করে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সন্ধ্যার পর নারীরা বাড়ির বাইরে বের হন না। নারীরা বাড়ির গৃহস্থালি ও রান্না-বান্নার সকল কাজ ছাড়াও সন্তান লালন পালন করে থাকেন। পুরুষরা হাল-কৃষি বা চাকরি করে সংসারের উপার্জন করে। তবে নারীরাও এখন চাকরি-বাকরি করে অর্থ উপার্জন করছে। বাঙালি সমাজে বিশেষ করে হিন্দু ও মুসলিম সমাজে বিয়ে বা বিবাহের প্রধান বৈশিষ্ট্য তিনটি। এগুলি হলো প্রথমত: বরপক্ষ বা ছেলেপক্ষ বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করবে, দ্বিতীয়ত: বিবাহ মূলত: কনের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হবে এবং তৃতীয়ত: পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন বা বর-কনের পরিচিতজনের বিবাহের আয়োজন করবে। মুসলিম ও হিন্দু বিবাহের মধ্যে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। মুসলমান বিবাহের বেলায় বর বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কনেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয়। যা মোহরানা হিসেবে পরিচিতি। এই মোহরানার টাকার অংক কাবিননামায় উল্লেখ খাকে। এই অর্থ দুইভাবে পরিশোধ করা হয়। বিবাহের দিনে নগদ পরিশোধকৃত অর্থ হিসেবে ধরা হয় বরের পক্ষ থেকে কনেকে দেয়া উপহার স্বর্ণালংকারের মূল্যকে। অবশিষ্ট মোহরানার অর্থ পরবর্তীতে অথবা স্বামীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলে স্বামী তা পরিশোধ করে। তবে হিন্দু বিবাহে এমন রীতি নেই। মুসলিম সমাজে ঘরজামাই প্রচলন আছে। এক্ষেত্রে বিবাহের পর বর বা পুরুষটি কনের বাড়িতে এসে বসবাস করতে থাকে। হিন্দু সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদের কোন আইনগত সুযোগ নেই। তবে মুসলিমদের ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রচলন চালু আছে তালাকের মাধ্যমে। বাংলাদেশে ১৮ বছর বয়স্ক যে কেউ বিবাহ বন্ধ আবদ্ধ হতে পারে। বাঙালি খাবার: বাঙালির প্রধান খাবার মাছ ও ভাত। প্রবাদ আছে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সাদা ভাতের সাথে গরুর মাংশ, মুরগির মাংশ, ছাগলের মাংশ, মুরগি ও হাসের ডিম, বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি, আলু, বেগুন, ফুল কপি, বাধা কপি, মূলা, বিভিন্ন প্রকারের ডাল, নানা প্রজাতির মাছ তরকারি বানিয়ে খান বাঙালি। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া, কদু, লাউও তরকারির তালিকায় আছে। তরকারিতে অনেক প্রকারের মশলা এবং খুব বেশি ঝাল ব্যবহার করা হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে সকালে নাস্তা হিসেবে পানি দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া হয় কাচা মরিচ, পিয়াজ ও সরিষাল তেল মাখিয়ে। তবে এই পান্তা খাওয়ার প্রচলন এখন বিলপ্তির পথে। সকালের নাস্তায় গমের আটার রুটি খাওয়া হয় সবজি ভাজি, গুড় বা ডিম ভাজি। শহর সংস্কৃতিতে সকালের নাস্তা হিসেবে পরোটা খাওয়া হয়। পরোটা বা রুটির সাথে কখনও কখনও মিষ্টি খান বাঙালি। বাঙালি দু’বেলা ভাত খান। বিকেলের নাস্তায় নাড়–-মুড়ি, বিভিন্ন ধরণের বিস্কুট থাকে। চিড়া দই বা পাকা আম দিয়ে খাওয়ার প্রচলন বেশ জনপ্রিয়। বিভিন্ন ধরণের স্বুস্বাদু পিঠা বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। পিঠা খুবই উপাদেয় একটি খাবার। অধিকাংশ পিঠাই মিষ্টি জাতীয়। তবে টক ও ঝাল জাতীয় পিঠাও বানানো হয়। প্রায় সারা বছরজুড়েই পিঠা বানায় বাঙালি নারীরা। তবে শীতকালের পিঠাই সবচেয়ে বেশি স্বুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। দুধচিতই, ভাপা, কুশলী, পাটিসাপটা, পাকান, চুটকি, গোকুল, মুঠি, নকশি, তেজপাতা, ঝুরি, পাতা, বিবিয়ানা, ফুলঝুরি, আন্দশা, ছিট পিঠা উল্লেখ্য। বাঙালি ফলমূলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আম, কাঠাল, লিচু, কলা, আনারস, পেপে, তরমুজ, বরই, জলপাই, নারিকেল, জাম প্রভৃতি। মিষ্টান্ন জাতীয় খাবারের মধ্যে রসগোল্লা ও চমচম জনপ্রিয়। বর্তমানে নগর সংস্কৃতিতে কেক, পেষ্ট্রি ও বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত ফাস্টফুড জাতীয় নানান খাবারের প্রচলন বেড়ে যাওয়া সত্ত্বেও পিঠা তার স্বকীয়তা জনপ্রিয়তা হারায়নি আজও। বাংলাদেশে মদ বা এলকোহল জাতীয় পানীয় প্রকাশ্যে পান করা নিষেধ। তবে পাচ তারকা বিশিষ্ট হোটেলগুলিতে এজাতীয় পানীয় সহজলভ্য। এছাড়া রেজিষ্ট্রাড কিছু মদের দোকান আছে। গ্রামীণ সংস্কৃতিতে লোক প্রযুক্তিতে তৈরী নেশাজাতীয় কিছু পানীয় পাওয়া যায়। গ্রামের স্বল্প সংখ্যক মানুষ এগুলি পান করে। আবার আদিবাসি সংস্কৃতিতে লোকপ্রযুক্তিতে তৈরী মদ পানের প্রচলন আছে। আদিবাসি সম্প্রদায়ের লোকেদের প্রায় সকলেই এসব পান করে। পোশাক-পরিচ্ছদ: বাঙালি নারীর প্রধান পোশাক হচ্ছে শাড়ী, ব্লাউজ, পেটিকোট। তরুণীরা সালোয়ার-কামিজ পরিধান করে। ১০-১২ বছর পর্যন্ত বালিকারা ফ্রক বা স্কাট পরে। শহরে ও গ্রামে প্রায় একই ধরণেরই পোশাক পরে। পুরুষদের পোশাক হচ্ছে লুঙ্গি। তবে বিশেষ অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবি, পায়জামা পরে থাকে পুরুষরা। তবে শার্ট, প্যান্ট এর প্রচলনও ঘটেছে বাংলায়। গ্রামের সাধারণ মানুষরা লুঙ্গি ও ফতুয়া পরিধান করে। এছাড়া আদিবাসি নারী-পুরুষরা পরিধান করে তাদের নিজস্ব তৈরী করা পোশাক। আচার-আচরণ: বাঙালি অতিথিপরায়ণ জাতি। বাড়িতে অতিথি আগমণকে শুভ বা কল্যাণকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই অতিথিকে ভালোভাবে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করে বাঙালি জনগোষ্ঠী। বাঙালিরা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলে-মিশে থাকতে পছন্দ করে। শিল্প ও সাহিত্য : সাহিত্য সংস্কৃতির একটি জীবন্ত ধারা। এরমধ্য দিয়ে একটি জাতির আত্মার স্পন্দন শোনা যায়। চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। বাংলা সাহিত্য হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি। বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত দিক হলো লোকসাহিত্য। তাই রবীন্দ্রনাথ লোকসাহিত্যকে ‘জনপদের হৃদয় কলরব’ বলে আথ্যায়িত করেন। লোকসাহিত্যকে প্রধানত লোকসঙ্গীত, গীতিকা, লোককাহিনী, লোকনাট্য, ছড়া, মন্ত্র, ধাধা ও প্রবাদ এই ৮টি শাখায় ভাগ করা হয়। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। ওই সময়ের বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে চন্ডি দাশ, দৌলত কাজী এবং আলাওল উল্লেখযোগ্য। ঊনিশ শতকের শেষে বাংলা আধুনিক সাহিত্যের সূচনা হয়। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকরা হলেন বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসুদন দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়, মীর মোশাররফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম, আবদুল ওদুদ। মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্য, লোকগীতি ও পালাগানের প্রচলন ঘটে। বাংলার লোকসাহিত্যও সমৃদ্ধ। ময়মনসিংহ গীতিকায় এর পরিচয় পাওয়া যায়। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দিতে বাংলা কাব্য ও গদ্য সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। নাটক-যাত্রা এবং চলচ্চিত্র: বাংলাদেশের নাটক পুরনো, ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয়। বাংলাদেশের শহরে রয়েছে বহু থিয়েটার বা নাট্যগ্রুপ। এই গ্রুপগুলি স্থানীয়ভাবে লেখা নাটক এবং ইউরোপিয়ান বিখ্যাত লেখকদের লেখা নাটক নিয়মিত মঞ্চস্থ করছে রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে নাট্যপাড়ায়। পাবলিক লাইব্রেরী, জাদুঘর মিলনায়তন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকার বাইরেও অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলিতেও নিয়মিত আয়োজন করা হয় নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাঙালি সংস্কৃতির এক বড় অংশ জৃুড়েই আছে যাত্রাপালা। পৌরাণিক প্রেম কাহিনী, , ট্রাজেডি, ঐতিহাসিক কিংবা বীরত্বপূর্ণ কাহিনী অবলম্বনে যাত্রাপালার উপস্থাপন করা হয়। সাধারণত যাত্রাপালা গ্রামাঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয়। এটি গ্রাম সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম। তবে দিনে দিনে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা। যাত্রাপালা ছাড়াও গ্রামে বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাহিনী পুতুল নাচের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়। একইভাবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী অন্যান্য লোকনাট্য গম্ভীরা, আলকাফ প্রভৃতি। ঢাকাকেন্দ্রীক চলচ্চিত্র শিল্প হতে প্রতিবছর ৮০ থেকে ১০০টি বাংলা চলচ্ছিত্র তৈরী করা হয়। সঙ্গীত : মার্গ সঙ্গীত ও দেশি সঙ্গীত নামে বহু প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে সঙ্গীতের দু’টি ধারা বহমান। বর্তমানে প্রচলিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত বা রাগ সঙ্গীত মার্গসঙ্গীতের অন্তর্গত। মার্গসঙ্গীতে কথার আবেদন গৌন। কিন্তু রাগ রুপায়ন ও সুরের ভূমিকাই প্রধান। কথা ও সুর উভয়কেই গুরুত্ব দেয় দেশিসঙ্গীত। যা একরৈখিক পথে বিকশিত ও বিবর্তিত হয়েছে। বাংলা সঙ্গীত মূলত: দেশিসঙ্গীতের আদর্শেই বিকশিত ও রচিত। বাংলা সঙ্গীত জগতে সুর ও বাণীমাধুর্যে পঞ্চ গীতিকবির গান আজও সমৃদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠ। এই পঞ্চ গীতিকবি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বীজেন্দ্রনাথ লাল, রজনীকান্ত, কাজী নজরল ইসলাম এবং অতুল প্রসাদ। সুরের আবেদন সার্বজনীন হলেন বাংলা গানে কথার গুরুত্বও অপরিসীম। উল্লিখিত পঞ্চকবির গানে কথা ও সুরের সার্থক সম্মিলন ঘটেছে। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই সুরকার ও গীতিকার। তাই রবীন্দ্রনাথের কথা ও গানে পেয়েছে এক সুসংহত রুপ। এই পঞ্চ গীতিকার বাংলা সঙ্গীতে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত ও পাশ্চাত্যসঙ্গীতের মিলন ঘটিয়েছেন। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি…’ এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত। বিশশতকের শেষ দিকে বাংলায় ব্যান্ডসঙ্গীতও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত বৈচিত্র্যময়। জনপ্রিয় লোকসঙ্গীতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাউল গান, ভাওয়াইয়া গান, জারি-সারি গান, মুর্শিদী গান, কবি গান, গম্ভীরা-আলকাফের গান। বাংলাদেশের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বা আদিবাসিদের রয়েছে নিজস্ব সঙ্গীত। যার কথা ও সুর সম্পূর্ণ আদিবাসিদের রচিত। বাদ্যযন্ত্র: বাংলাদেশের বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। এগুলি কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। গায়ক ও বাদকের তাল ও ছন্দ ঠিক রাখাই কাজ। হারমোনিয়াম, তবলা-বায়া, পাখোয়াজ, খোল, খব্ধনী, স্ট্রাইকার, সনতুর, সুরমন্ডল, বো, ভায়লিন, রবার, সেতার, তানপুরা, সরোদ, বাঁশি, সানাই, বীণা, সুরবাহার, এসরাজ, সারেঙ্গী, সুরশৃঙ্গার, একতারা, দোতারা, খোল, করতাল , মন্দিরা উল্লেখযোগ্য। কতকগুলি পেশায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাপুড়েরা তুবড়ি বাজিয়ে সাপের খেলা এবং বাজিকররা ডুগডুগি বাজিয়ে বানর-ভল্লুকের খেলা দেখায়। জুড়ি ও খঞ্জনি বাজিয়ে বৈষ্ণব-বৈরাগী ও ভিখারিরা ভিক্ষা করে। বাতদ্যযন্ত্রকে কেন্দ্র করে বাংলায় নানা আচার-সংস্কার প্রচলিত। শঙ্খ ও সানাই মাঙ্গলিক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে বিবেচিত। আবার রাতে বাশি বাজানো অমঙ্গলজনক বলে মনে করা হয়। নৃত্য-চারু ও কারুশিল্প : নৃত্যশিল্পের নানাধরণ বাংলাদেশে প্রচলিত। এরমধ্যে রয়েছে আদিবাসি নৃত্য, লোকজ নৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য ইত্যাদি। চারু ও কারু দু’টি ভিন্ন প্রকৃতির শিল্প। রং ও তুলির সাহায্যে নির্মিত চিত্রকলা ও সুই-সুতার সাহায্যে নির্মিত সূচিশিল্প চারুশিল্পের অন্তর্গত। আর মৃৎশিল্প-দারুশিল্প, বস্ত্রশিল্প, বাশ-বেতশোলা-শঙ্খ-দন্ত নির্মিত বিবিধ হস্তশিল্প এবং সোনা-রুপা-পিতল নির্মিত ধাতবশিল্প কারুশিল্পের অন্তর্ভূক্ত। আবার কতকগুলি লোকশিল্প আছে-যেমন সখের হাড়ি, মনসাঘট, লক্ষ্মীর সরা এগুলি চারু ও কারুশিল্পের নিদর্শন বহন করে। নকশিকাথা তার সৌন্দয্য দিয়ে সমাদৃত হয়েছে বহির্বিশ্বেও। স্যার চার্লস ডয়লী প্রথম শিল্পী হিসেবে প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রাহকের দৃষ্টি নিয়ে ঢাকাকে প্রত্যক্ষ করেন। একজন অপেশাদার শিল্পী ডয়লীর স্কেচ বই ‘ঢাকার প্রাচীনকালের নিদর্শন’ এ বিভিন্ন কেল্লা, মসজিদ, তোরণ এবং উনবিংশ শতাব্দির ঢাকার পরিবেশ ও দালান-কোঠার চিত্রিত বিবরণ দেখা যায়। উৎসব : বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতি। বারো মাসে তেরো পার্বনের দেশ বলা হয় বাংলাদেশকে। বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় এবং সর্বজনীন উৎসব হলো বাংলা নববর্ষ। শহর, নগর, গ্রাম-বাংলা সবখানেই এই উৎসব উদযাপিত হয়। বের করা হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। নতুন জীবন আর কল্যাণের প্রতিক হলো নববর্ষ। বাংলা সনের প্রথম দিন এটি। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যাপার। শহর, গ্রাম-গঞ্জ নতুন বছরের প্রারম্ভে পুরনো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন। এজন্য নতুন-পুরনো খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতো। যা আজও পালিত হয়। নববর্ষকে আনন্দমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত: লোকজ মেলা। দেশের সর্বত্রই এই বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় আয়োজন করা হয় পুতুল নাচ, সার্কাস, নাগরদোলা, লোকনাট্য, লোকসঙ্গীতের। শস্যভিত্তিক লোক উৎসব হলো নবান্ন উৎসব। বাংলাদেশে প্রধানত হিন্দু সমাজ নবান্ন উৎসব পালন করতো। হেমন্তে আমন ধান কাটার পর অগ্রহায়ণ কিংবা মাঘ মাসে গৃহস্থরা নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে। নবান্ন উৎসব উপলক্ষে গ্রাম-বাংলায় বাড়ি বাড়ি আঙিনায় নানা রংয়ের আলপনা আকা হতো। পিঠা-পায়েসের আয়োজন ও আত্মীয়-স্বজনের আগমনে পল্লী গায়ের প্রতিটি গৃহে দেখা দিতো এক মধুময় পরিস্থিতি। কৃষকরা নতুন ধান বিক্রি করে নয়া পোশাক-পরিচ্ছদ কিনতো। এছাড়া ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে আছে মুসলমানদের মুহররম, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা। হিন্দুদের শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন জন্মাষ্টমী, সহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে প্রধান উৎসব হলো দূর্গোৎসব। বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমা আর খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো যীশুখৃষ্টের জন্মদিন। যা বড়দিন হিসেবে পালিত হয়। কারাম উৎসব ছাড়াও আদিবাসিদের জীবনের পরতে পরতে আছে নানান উৎসব। খেলাধূলা: পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ফুটবল ও ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হলো কাবাডি। এছাড়া বাংলাদেশের লোকক্রীড়ার মধ্যে রয়েছে নৌকাবাইচ, ঘুড়ি উড়ানো, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, লাঠিখেলা, বলিখেলা, কানামাছি উল্লেখযোগ্য। একনজরে বাংলাদেশ : ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নামের এই দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান হলেন রাষ্ট্রপতি। তবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন প্রতি ৫ বছর পর পর। রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল ক্ষমতার অধিকারি হলেন প্রধানমন্ত্রি। জনসংখ্যা ১৬১.৩ মিলিয়ন। সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রি অন্যান্য মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি ও উপমন্ত্রিদের নির্বাচন করেন এবং তাদের চূড়ান্ত নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ সচিবালয় হলো রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। মন্ত্রি, প্রতিমন্ত্রি ও উপমন্ত্রিরা বিভিন্ন মন্ত্রনালয় পরিচালনা করেন। আর প্রতিটি মন্ত্রনালয়ের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন একজন করে স্থায়ি সচিব। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রির জনছ আলাদা সচিবালয় আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত হলো সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। পচলতি আইন-কানুনের অনেকটা বৃটিশ আদলের। তবে উল্টরাধিকার ও বিবাহ সংস্ক্রান্ত আইনগুলি ধর্মভিত্তিক। ২০০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে প্রশান থেকে আলাদা করে। কিন্তু বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীনভাবে এখনও কাজ করতে পারে না। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সরকার পদ্ধতি প্রচলিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের তিনটি প্রধান শাখা হলো সংসদ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ। দেশে ৬টি সিটি করপোরেশন ও ২২৩টি পৌরসভায় সরাসরি জনগণের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়ে থাকে। জাতীয় সংসদের মোট ৩০০টি আসন। এছাড়া ৩০টি আছে সংরক্ষিত নারী আসন। ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন্রে মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সরকারের নির্ধারিত ৫ বছর মেয়াদ শেষে নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপর প্রধান উপদেস্টা নিযুক্ত হন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। প্রধান উপদেস্টা অন্য আরও ১০ জন উপদেস্টাকে নিয়োগ করে গঠন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই সরকারের দায়িত্ব হলো পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। বাংলাদেশের নাগরিকরা দ্বৈ নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণকারিরা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশের নাগরিক ইসরায়েল ছাড়া পৃথিবীর যে কোন দেশ ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করতে পারেন বাংলাদেশ পাসপোর্ট। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলির মধ্যে একটি। বাংলাদেশের মোট আয়তন ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৯৯ জন মানুষের বসবাস। বাংলাদেশের ৬টি প্রশাসনিক বিভাগ যথাক্রমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল এবং রাজশাহী। বর্তমানে মোট ৫০৭টি উপজেলা আছে। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশে ৮৭ হাজারের অধিক গ্রাম রয়েছে। দেশটির উত্তর, পূর্ব আর পশ্চিম সীমান্তজুড়ে আছে প্রধান প্রতিবেশি ভারত। বাংলাদেশের শহীদ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি (বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ, বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জাতীয় ফল কাঠাল, জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পাখি দোয়েল। আবার জাতীয় মাছ হলো ইলিশ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। জাতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। বেসরকারি টেলিভিশন আছে বেশ কয়েকটি। দুই শতাধিক দৈনিক সংবাদপত্র, প্রায় ২০০০ সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও অন্যান্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নিয়মিত সংবাদপত্র পাঠ করেন মোট জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশ মানুষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত: কৃষিনির্ভর। দুই তৃতীয়াংশ মানুষ কৃষিজীবী। উৎপাদিত প্রধান কৃষি ফসলের মধ্যে আছে ধান, পাট ও চা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অধিকাংশই আসে রফতানিকৃত তৈরী পোশাক খাত থেকে। দেশের তৈরী পোশাক শিল্পে বা গার্মেন্টস খাতে ৩০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। যাদের ৯০ ভাগই নারী শ্রমিক। বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি বড় অংশ পাওয়া যায় প্রবাসী বাংলাদেশী বা বাঙালিদের পাঠানো অর্থ থেকে। দেশের ৯৮ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা এবং বাংলা দেশের রাষ্ট্র ভাষা বা অফিসিয়াল ভাষা। বাংলাদেশের মুদ্রা হলো টাকা যা বিডিটি হিসেবে পরিচিত। মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২২ শতাংশ বাস করেন শহরে। অবশিষ্ট ৭৮ শতাংশ মানুষের বসবাস গ্রামে। বাংলাদেশে মাথাপিছু গড় আয় ১,৪৭০.৩৮ মার্কিন ডলার। দক্ষণি এশিয়ার র্দীঘতম দুটি নদী – গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্র যা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদশেরে অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও মায়ানমারের মাঝখানে। পশ্চিমে রয়েছে ভারতরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। উত্তরে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় রাজ্য। পূবে আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম। তবে পূবে ভারত ছাড়াও মায়ানমারের (র্বামা) সাথে সীমান্ত রয়েছে। দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের স্থল সীমান্তরেখার দৈর্ঘ্য ৪,২৪৬ কিলোমিটার যার ৯৪ শতাংশ (৯৪%) ভারতরে সাথে এবং বাকি ৬ শতাংশ মায়ানমারের। বাংলাদশেরে তটরেখার দর্ঘ্যৈ ৫৮০ কিলোমটিার। বাংলাদশেরে দক্ষিণ-র্পূবাংশের কক্সবাজার পৃথিবীর র্দীঘতম সমূদ্র সৈকতগুলোর অন্যতম। বাংলাদশেরে উচ্চতম স্থান দশেরে দক্ষিণ-র্পূবাঞ্চলে র্পাবত্য চট্টগ্রাম এর মোডক র্পবত, যার উচ্চতা ১,০৫২ মটিার (৩,৪৫১ ফুট)। বঙ্গোপসাগর উপকূলে অনিকটা অংশ জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এখানে আছে রয়েল, বেঙ্গল বাঘ, চিত্রল হরিণসহ নানান প্রাণীর বাস। বছরে বৃষ্টপিাতরে মাত্রা ১৫০০-২৫০০মি.মি./৬০-১০০ইঞ্চি; র্পূব সীমান্তে এই মাত্রা ৩৭৫০মি.মি./১৫০ইঞ্চির বেশি। বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে র্ককটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। এখানকার আবহাওয়াতে নিরক্ষীয় প্রভাব দেখা যায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাচীনতম যাতায়াত পথ হিসেবে গণ্য করা হয় জলপথ বা নদীপথকে। বাংলাদেশের প্রধান দুইটি সমুদ্র বন্দর চট্রগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হয়। স্থল যোগাযোগের মধ্যে সড়কপথ উল্লেখযোগ্য। দেশের জাতীয় মহাসড়ক পথ হলো ৩৪৭৮ কিলোমিটার। এছাড়া ৪২২২ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক, ১৩২৪৮ কিলোমিটার পথ আছে ফিডার বা জেলা রোড হিসেবে। রেলপথ আছে ২৮৩৫ কিলোমিটার। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক গমনাগমনের জন্য বাংলাদেশ বিমানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি বিমান বন্দর আছে। দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’ ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত। বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশকে ষড় (৬) ঋতুর দেশ বলা হয়। এই ছয় ঋতু হলো গ্রীস্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। নভেম্বর হতে মার্চ পর্যন্ত হালকা শীত অনুভূত হয় এখানে। মার্চ হতে জুন মাস পর্যন্ত গ্রীস্মকাল ধরা হয়। জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত চলে বর্ষাকাল। এসময় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বন্যা, জলোচ্ছাস, টর্ণেডো, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায় প্রতিবছর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে লন্ডভন্ড করে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। উপসংহার: পরিশেষে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন প্রত্যাশা করি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক। জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাস-দুর্নীতির কালো ছায়ামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই আমরা। যেখানে থাকবে না কোন ধর্মীয় উগ্রতা, সংঘাত-অস্থিরতা, বৈষম্য-দারিদ্র্যতা। আমাদের স্বপ্ন একটি সাম্য, সম্প্রীতির সোনার বাংলাদেশ। যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। তথ্য সহায়িকা: দৈনিক সংবাদ, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ত্রৈমাসিক পত্রিকা বিচয়ন, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। লেখক: জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, সম্পাদক ইউরো বাংলা ( http://www.eurobangla.org/), (https://penakash.wordpress.com/)।

About these ads

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s