মেঘ-পর্বতমালার সংগম ও প্রকৃতি!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ অষ্ট্রিয়ার গ্রাজকে ২০০৩ সালে ইউরোপের কালচারাল রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করে ইউরোপীয় কমিউনিটি। রাজধানী ভিয়েনার পরে গ্রাজ অষ্ট্রিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। সবুজ বন, পাহাড়, প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের লীলাভূমি এই গ্রাজ। যা এখন ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এই শহরের আকর্ষণীয় স্থান হলো শ্লোসব্যার্গ। এটি একটি পাহাড়। এই পাহাড়ের উপরেই আছে গ্রাজের মূল আকর্ষণ “ক্লক টাওয়ার” বা উহরটুর্ম। ক্লক টাওয়ারের পাশে মনোরম ও সুন্দর নিরিবিলি পরিবেশে আছে অতি প্রাচীন একটি বাড়ি। চেররিনি শ্লোসেল নামের এই বাড়িটি ১৮২০ সালে নির্মিত। যেখানে এখন “ইন্টারন্যাশনাল হাউজ ডেয়ার আউটোরেন গ্রাজ” বা IHAG এর আমন্ত্রিত লেখকরা বসবাস করেন। যা কুলটুরফেরমিটলুং স্টায়ারমার্ক কর্তৃক পরিচালিত একটি কালচারাল সিটি নেটওয়ার্ক প্রকল্প।
‘রাইটার ইন এক্সজাইল’ কর্মসূচীর আওতায় আমাকে সপরিবারে এক বছরের জন্য জন্য থাকার সুযোগ করে দিয়েছিল IHAG । এর আগে রাজনৈতিক কারণে নির্যাতিত হিসেবে জার্মানিতে হামবুর্গ ফাউন্ডেশনের এক বছরের আতিথিয়েতা আমার শেষ হয় ২০১০ সালের মে মাসে। দেশে ফেরার মতো পরিস্থিতি না থাকায় জার্মান পর্ব শেষ করে আমরা চলে আসি অষ্ট্রিয়ার এই সুন্দর গ্রাজে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শহর ঐতিহাসিক গ্রাজ। বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস এখানে। গ্রাজ একটি মাল্টিকারচারাল সিটি এবং ইডুকেশন সিটি হিসেবেও পরিচিত।
হামবুর্গে থাকতাম বিশাল এক বাড়িতে। সে তুলনায় গ্রাজের বাসা অনেক ছোট্র। কিন্তু ছোট্র হলে কি হবে-অত্যন্ত সুন্দর এক পরিবেশে যার অবস্থান। অন্যদিক দিয়ে বাসাটি আবার ঐতিহাসিকও বটে। পাহাড়ের উপরে বসবাস করার মজাই আলাদা। নেই কোন যান্ত্রিক শব্দ, জনকোলাহল। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরপরই নেমে আসে নিস্তব্ধতা। মনে হয় যেন এক কবরের নিরবতা। কবি-সাহিত্যিক বা লেখকদের জন্য সত্যিই এক অপূর্ব সুন্দর পরিবেশ। একজন পেশাদার সাংবাদিক হলেও আমি কবি বা সাহিত্যিক নই। আমরা যেখানে বসবাস করি সেখান থেকে আমরা গোটা গ্রাজ দেখতে পারি। জানালার কাঁচ ভেদ করে অনায়াসে ঘরের ভেতরে আসে সূর্য্যের আলো। ভোরের মিষ্টি আলোয় ঘুম ভাঙে আমাদের। রাতে বিছানায় শুয়ে থেকে আরও দেখা যায় চাঁদের হাসি। সামান্য ঝড়ো বৃষ্টিতে খোলা জানালা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে বৃষ্টির ছটা। ঘর থেকে দেখা যায় মেঘের নানান খেলা। মাঝে-মধ্যে শোনা যায় মেঘের তর্জন-গর্জন। বাড়ির পাশে মনোমুগ্ধকর ফুলের বাগান। চেররিনি শ্লোসেলের প্রবেশমুখেই আছে সুন্দর আঙুর বাগান। হাত বাড়ালেই ধরা যায় সুমিষ্ট আঙুর। ঘরের পাশেই আছে ঘন বন। বনের ভেতরে গাছে গাছে খেলা করে কাঠবিড়ালীসহ নাম না জানা হরেক রকম পাখি। পর্যটন এলাকা হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষের সমাগম হয় এই পাহাড়ে। ক্লক টাওয়ার ও তার আশপাশ থেকে অবলোকন করা যায় শহরের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যাবলি। এসবকিছুই আমাদের মাতৃভূমি ছেড়ে থাকার মানসিক বেদনাকে ছাপিয়ে যায়, কিছুটা হলেও। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ মুগ্ধ করে সারাক্ষণ।
প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের দেশ অষ্ট্রিয়ার গ্রাজে ইতোমধ্যে কেটে গেছে প্রায় দুই মাস। ১৯ জুলাই, ২০১০ হঠাৎ একটা মেইল এলো লুইজে গ্রিনসগেলের কাছ থেকে। গ্রিনসগেল কুলটুরফেরমিটলুং স্টায়ারমার্ক এর একজন কর্মী। তিনি বললেন, একটা ‘মাউন্টেইন প্রোগ্রাম’ বা পর্বত প্রকল্প হাতে নিয়েছে একটি কালচারাল সংগঠন। তোমরা (আমি,ফারহানা ও ফিমান) সেই কর্মসূচীতে অংশ নিতে চাও কিনা? ভাবলাম আমরাতো পর্বতমালায় আরোহণ করিনি কখনও। পর্বতমালার সঙ্গে প্রকৃতির একটা দারুণ মিল আছে। প্রকৃতিপ্রেমিরাই এধরণের কর্মসূচী গ্রহণ করে। আমার জীবনে এমন কোন কর্মসূচীতে আগে কখনও অংশ নেয়া হয়ে ওঠেনি। যাহোক, এই অভিনব (অন্তত: আমার কাছে তাই মনে হয়) কর্মসূচীতে সপরিবারে অংশ নেবো বলে রাজি হয়ে গেলাম। লুইজেকে আমাদের পজিটিভ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিলাম ই-মেইলে। পুনরায় লুইজে জানালেন, এই কর্মসূচীর আয়োজক তোমাকে(আমাকে) কর্মসূচীর বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দেবেন।
পর্বত কর্মসূচীর আয়োজক Der grazer Kunstverein “next”. এই সংগঠনের পরিচালক লুইজে ক্লুস ফোন করলেন। তিনি জানালেন কর্মসূচী সম্পর্কে। বিভিনড়ব দেশ থেকে একদল শিল্পী এই কর্মসূচীতে অংশ নিচ্ছেন। সেই দলে লেখক হিসেবে আমাকে অংশ নিতে হবে। ২৬ জুলাই থেকে ২০১০ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত “Seetaler Alpen” এ অবস্থান করতে হবে। Next চারুকলা বিষয়ক একটি সংগঠন। পর্বত কর্মসূচীতে যোগ দেবার উদ্দেশে ২৬ জুলাই বিকেলে ফারহানা ও ফিমানসহ শ্লোসব্যার্গ এর চেররিনি শ্লোসেল থেকে রওনা হলাম। লুইজে ক্লুস (Luise Kloos), ট্রামষ্টেশন আনড্রিজ থেকে আমাদের মোটরকারে করে নিয়ে গেলেন তার বাসায়।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন ক্রোয়েশিয়া ও ব্রিটেন থেকে আগত ছয়জন চারুশিল্পী। এরা হলেন ব্রিটেনের ন্যানসি, টিম এবং রোলে, ক্রোয়েশিয়ার নিকা, জোসেফ, এবং মার্টিনা। সেখানে চা-পর্ব সেরে আমরা সন্ধ্যা সোয়া ছ’টার দিকে রওনা হলাম এর “Seetaler Alpen” উদ্দেশে। লুইজে ক্লুস এর নেতৃত্বে শিশু ফিমানসহ আমাদের দলের মোট সদস্য সংখ্যা দাঁড়ালো ১০ জনে। তিনটি মোটরকার ছুটে চললো দ্রুত গতিতে। লুইজে ক্লুসের গাড়িতে ফিমান, ফারহানা আর আমি। পরম মমতায় এবং সতর্কতায় গাড়ি চালাচ্ছিলেন লুইজে। আর তাকে অনুসরণ করছিলেন নিকা ও জোসেফ। রাস্তার দুই ধারে সবুজ বনায়ন। মাঝে মধ্যে চোখে পড়ছে বিভিনড়ব দূর্গ। দুই ঘন্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম হুট্রেতে (Huette)। সেখানে একটি ছোট্র কটেজে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো।
সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরী এই কটেজ। এধরণের কটেজ সাধারণত: গ্রীস্মকালের জন্য তৈরী করা হয়ে থাকে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছিল যে বোধহয় এই ছোট্র কটেজে ৯ জন এডাল্ট (প্রাপ্ত বয়স্ক) মানুষ থাকা সম্ভব হবে না। কিন্তু সেই ভুল ভাঙলো কটেজটির ভেতরে প্রবেশ করার পর। দ্বিতলবিশিষ্ট এই কটেজের নিচতলায় আছে একটি বড় শয়ন কক্ষ। এছাড়া, টয়লেট, বাথরুম, রানড়বাঘর ও ডাইনিং। আর উপরে আছে আরও কয়েকটি ছোট ছোট শোবার ঘর। কটেজটি পর্বতমালার ভেতরে হওয়ায় সেখানে প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া। তবে কটেজের ভেতরে সুন্দর হিটিংয়ের (গরম করার) ব্যবস্থা আছে। অষ্ট্রিয়া, ব্রিটেন, ক্রোয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ। ভিন্ন সংস্কৃতি, পরিবেশ, আবহাওয়ার সাথে পরিচিত মানুষগুলি আমরা একই আবহাওয়া, সংস্কৃতির ছায়াতলে সমবেত হয়েছি।
কটেজের নিচতলায় থাকার ব্যবস্থা হলো আমাদের। অন্য সবার থাকার জায়গা হয় উপরে। পরদিন ২৭ জুলাই সকালের নাস্তাপর্ব সেরে বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হলো আমাদের পর্বতারোহণের প্র ম দিনের যাত্রা। প্রিয় ফিমানকে আমার ঘাড়ে নিয়ে আমি হাটছি। সবুজ ঘন বন, জঙ্গল, নানাধরণের গাছপালা। সবুজ মাঠে চড়ে বেড়াচ্ছে গরুর পাল। ঘাস খাবার তালে তালে বেজেই চলছে গরুদের গলায় বাধা ঘন্টাগুলি। রাস্তায় রাস্তায় প্রকৃতিপ্রেমীদের ভীড়। মাঝে মাঝে ঝরণা ধারা, মাটি ও বড় পাথরের ঢিবি। ফারহানার হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তাকে মার্টিনা সঙ্গ দিয়ে উৎসাহিত করেন। এসব ভেদ করে দু’ঘন্টার পথ পাড়ি দিলাম। এরপর যাত্রাবিরতির পালা। ছোট্র একটি বার
“Hothaidenhuette”। সেখানে দুপুরের ভোজন সেরে নিলাম আমরা। এই বারের কর্মী ক্রিস্টিনার পরিবেশনায় আমরা পান পানীয় পান করলাম যার যা পছন্দ অনুযায়ী। দুপুরের আহারের পর শরীরে কিছুটা বল সঞ্চয় হলো। পুনরায় শুরু হলো পর্বতের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণের সংগ্রাম। উদ্দেশ্য “Zirbitzkogel” এর সর্বোচ্চ চূড়ায় উাা। হোথাইডেন হুটে থেকে কিছুদূর তথা আধাঘন্টার মতো হাটার পর লুইজে জানালেন সম্ভবত ফারহানা চূড়া পর্যন্ত যেতে পারবে না। ফারহানাও খুব কষ্ট করেই হাটতেছিল। এটা ফারহানাসহ আমরা সকলেই অনুভব করি। সিদ্ধান্ত হলো ফারহানা ফিরে যাবে কটেজে। এরপর ফারহানা, ফিমান, মার্টিনাসহ অন্যরা কটেজে ফিরে গেলেন। লুইজে, নিকা এবং আমি শুরু করি “Zirbitzkogel” এর চূড়ায় উঠার অভিযান। সমতল ভূমি থেকে এই চূড়ার উচ্চতা ২৩৯৪ মিটার। উচু-নিচু পথ বেয়ে হাটতে থাকি আমরা। এমনই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি দেখে আমি বিমুগ্ধ হই। ফলে মাঝে-মধ্যে ভিডিও করা আর ছবি তোলার নেশা পেয়ে বসে আমার। আর পর্বতে আরোহণের আমার অতীত কোন অভিজ্ঞতাও নেই। স্বাভাবিকভাবে আমি পেছনে পড়ে যাই। এক পর্যায়ে নিকা-লুইজে আমার চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। তখন আমি উদ্বিঘ্ন হয়ে পড়ি। ভাবি আর বোধহয় শেষ চূড়ায় উঠা হলো না আমার। কিন্তু “Zirbitzkogel” এর শীর্ষ চূড়াকে অনুসরণ করে আমিও হাটতে থাকি।
কখনও কখনও মনে হচ্ছিল যেন আমার পায়ের দুই হাটুর জয়েন্ট খুলে যাবে। আমার ঘাড় ও পায়ের সর্বত্র ব্যথায় ভরে উঠে। ঠান্ডার চোটে বাতাসে আমার ঠোট শুকিয়ে ফেটে যায়। প্রচন্ড পিপাসায় গলা শুকিয়ে যায়। কিন্তু তারপরও সাহস ও মনোবল হারাইনি। শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৪টায় (১৬.৩০ মিনিট) আমি পৌছে যাই “Zirbitzkogel” এর সর্বোচ্চ চূড়ায়। যেখান থেকে হাত দিয়ে মেঘ ছোয়া যায়। সেই চূড়া থেকে প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হলো আমার। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দয্য অবলোকন করে মন জুড়িয়ে যায়।
“Zirbitzkogel” এ আছে একটি ছোট্র বার। যে বারটি পরিচালনা করেন মধ্য বয়স্ক ফ্রানজ এবং মালিটা। সেখানে আমরা কিছু পান করলাম। আমি পান করি আমার প্রিয় বিয়ার। ফ্রানজ জানান, প্রতি সপ্তাহে এই বারে কমপক্ষে ২ হাজার মানুষ আসেন। আজকে (২৭ জুলাই, ২০১০) বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত প্রায় ৩০০ লোক এসেছেন এখানে। আর এই বার ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য তাদেরকে (ফ্রানজ ও মালিটা) বছরে অন্তত: ২০০ বার এই চূড়ায় উঠতে হয়। গ্রীস্মকালে পর্বতমালার সর্বত্রই সবুজ আর সবুজ। মেঘ আর পর্বতমালার সংগম, সে এক অন্যরকম দৃশ্য। আবার শীতকালে পর্বতমালার সবকিছুই সাদা হয়ে যায় তুষারপাত বা বরফ পড়ে। প্রকৃতিকে ভালোবাসেন যারা সেইসব পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে পর্বতমালার নিরাপদ প্রাকৃতিক ভূ-দৃশ্য বা ভূচিত্রাবলি।
“Zirbitzkogel” থেকে এবার ফেরার পালা। আমরা আমাদের পথ পরিবর্তন করলাম। কটেজে ফেরার জন্য লুইজে বেছে নিলেন আরও সুন্দর আকর্ষণীয় নৈসর্গিক দিকটিকে। সেই চূড়া থেকে একেবারে খাড়া নিচে একটি সুন্দর লেক ও ঝরণাধারা। কিন্তু আমার পা আর সরে না। লেকে নামার আগে দীর্ঘ সময় একটু বিশ্রাম নিলাম সবুজ বনের বুকে বসে থেকে। তারপর আবার পথ চলা। এ চলার যেন কোন শেষ নেই। চারিদিকে বন, জঙ্গল, ঘাস, লতা-পাতা, নানারকমের ফুল আর ঝরনাধারা। বিশাল ঘন বনের সুউচ্চ গাছে গাছে যখন বাতাস আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে এক ভিনড়ব রকমের তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। মাঝে মাঝে বিভিনড়ব পাখির গুঞ্জন। সূয্য ডোবার দৃশ্য। ছোট ছোট ঝরনাধারায় জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ। সবকিছুতেই এক দুর্ণিবার আকর্ষণ। অফুরন্ত প্রেম-ভালবাসায় প্রকৃতি ও প্রাণীকূল আপন করে নেয় আমাদের।
লুইজে ও নিকা অনেক আগেই আমার দৃষ্টির আড়াল হয়ে যান। পথে আমি একা। নেই কোন জনমানব। অন্ধকার নেমে আসছে। রাস্তার দু’ধারে বিশাল জঙ্গল। ভয়ে শরীরের লোমকূপ খাড়া হয়ে উঠছে। ভয়ে ভয়ে হেটেই চলেছি। কিন্তু পথ যেন দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে। কখনও কখনও পাখিরা গান গেয়ে উঠছে। তখন মনে সাহস আসছে। অবশেষে উকি মেরে দেখা দিল Huette। কেটে গেল সব ভয়-সংশয়। রাত পৌনে আটটায় এসে পৌছলাম কটেজে। আমার অন্ত:ত এক ঘন্টা আগে কটেজে আসেন লুইজে ও নিকা। কটেজে পৌছার পর গোটা শরীরের ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ি। জীবনে প্রথম এমন এক অভিজ্ঞতা আমার। মমতাময়ী মার্টিনা ব্যথার ট্যাবলেট দিলেন। গভীর ঘুমে কখন সকালের সূয্য উদিত হলো তা টের পাইনি। স্বাভাবিক কারণেই ২৮ জুলাই আমাদের বের হতে দেরি হয়। মোটামুটি সবাই ক্লান্ত। সকালের নাস্তা সেরে আজ দুই গ্রুপে বিভক্ত হলো আমাদের পুরো টিম। এক দলে থাকলেন জোসেফ, টিম ও নিকা। অন্যদলে আমি, লুইজে, মার্টিনা, ন্যানসি ও রোলে। তবে ফারহানা, ফিমান থেকে গেলেন কটেজে। কারণ ফিমানকে নিয়ে হাটাটা আসলেই কষ্টকর। তবে প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে ফারহানার পক্ষে পর্বতারোহন সম্ভব। কিন্তু আমাদের ছোট্র ফিমানের কারণে ফারহানার এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। এজন্য আমি ব্যথিত-দু:খিত।
যাহোক, আজকের লক্ষ্য ন্যাটুয়ার ফ্রয়েন্ডে হাউস (Naturfreundehaus)এর সংলগড়ব মনোরম লেক দেখা। যথারীতি “Hothaidenhuette” এ গিয়ে দুপুরের আহার সেরে নিলাম। সেখান থেকে দীর্ঘ বন-জঙ্গল পেরিয়ে আমরা বিকেল পৌনে ৫টা তথা ১৪.৪৫ মিনিটে পৌছলাম Naturfreundehaus এলাকায়। এই হাউসের সম্মুখে আছে একটি সুদৃশ্য লেক। এখানে পানীয় পান শেষে আবার দ্বিতীয় লেক দেখার জন্য যাত্রা করি। দ্বিতীয় লেকটি আরও সুন্দর। সেখানে আমরা সকলেই লেকের ঠান্ডা জলে গোসল করলাম। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পরে আমি কোন লেকে গোসল ও সাতার কাটলাম। এরপর ন্যাটুয়ার ফ্রয়েন্ডে হাউস থেকে আমরা কারে ফিরে এলাম কটেজে।
Benediktinerstift St. Lambrecht জাদুঘরটি দেখতে গেলাম ২৯ জুলাই। বৈরী আবহাওয়াকে মোকাবেলা করে অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়নি। জাদুঘরের কর্মকর্তা Mr. P. Gerwig Romirer আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন পুরো জাদুঘরটি। শিল্প-কলার বহু নিদর্শন আছে এই জাদুঘরে। জাদুঘরের পাশের পার্কে দুপুরের আহার সেরে নিলাম আমরা সবাই। মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। ফলে বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম হুটেতে। হুটে বারে বিয়ার পান করলাম আমরা। হুটে বারের কর্মী ক্লাউডিয়া জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ মানুষ আসে পানীয় পান ও খাবার খেতে। পর্যটকদের থাকার জন্য আছে ১৪টি কক্ষ। প্রতি ইউকেন্ডে সব ক’টি রুমই ভয়ে যায়। কোন কোন উইকেন্ডে অতিরিক্ত রুম এর প্রয়োজন পড়ে। লুইজে ক্লুস এক সপ্তাহের খাবার, পানীয় বেধে নিয়ে গিয়েছিলেন। কটেজের ভেতরে প্রতিদিন বসতো আড্ডা। বনভোজনের ন্যায় চলতো রাতের খাবারের রানড়বা-বানড়বার আয়োজন। একেক রাতে একেক রকমের সুস্বাদু খাবার তৈরী
করতেন লুইজে। আর লুইজেকে রানড়বা-বানড়বায় সহযোগিতা করতেন রোলে, টিম, মার্টিনা, ন্যানসি এবং ফারহানা। রাতের খাবারের পর আড্ডায় নানা বিষয়ে আলোচনা ও গল্প করতাম আমরা। এক রাতে ডিনার শেষে বসলো গানের আসর। ইংরেজী গান গেয়ে ন্যানসি আর বাংলা ফোক গান গেয়ে ফারহানা সেই আসরকে মাতিয়েছিল। বিশাল বনের ভেতরে গাছে গাছে চিহ্ন দিয়ে পথ দেখানো হয়েছে। যাতে কোন পর্যটক বা প্রকৃতিপ্রেমিক পথ হারিয়ে না ফেলেন।
পর্বতমালা আরোহনের শেষ দিন ৩০ জুলাই কটেজ ছেড়ে কারযোগে বেরিয়ে পড়লাম। এরপর চলে গেলাম Naturfreundehaus। ফারহানা ও ফিমান সেখানেই থেকে গেলো। কারণ ফিমান ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমরা অন্য সকলেই সেখান থেকে চলে গেলাম তৃতীয় লেক দর্শনের জন্য। পর্বতমালার চূড়ায় যতই উাছি ততই মেঘের গায়ে গায়ে আমাদের মিলন ঘটতে থাকে। সেই চূড়া থেকে আবার নিচে নেমে দেখা মিললো এক বিশাল লেকের। সত্যিই অনন্য সুন্দর এই লেক।
সুবিশাল ও নয়নাভিরাম ঝরনাধারা আর মেঘ ও পর্বতমালার মহামিলনের অপূর্ব দৃশ্য যে কোন মানুষকেই বিমোহিত করবে। পর্বতমালায় বন-জঙ্গলে প্রাণীকূলকে স্বাভাবিক অবস্থায় রাখার জন্য মানুষের উদ্দেশে গাছে গাছে লেখা আছে নির্দেশনা। উচ্চস্বরে শব্দ করা যাবে না। কারণ এতে প্রাণীরা ভয় পাবে। পরদিন ৩১ জুলাই কুনসট হাউস, মুয়ার ইনসেলসহ গ্রাজ শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো দেখার মধ্য দিয়ে পর্বত কর্মসূচীর সমাপ্তি ঘটে। এই পর্বত কর্মসূচী আমার
জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকলো। এজন্য ধন্যবাদ পেতে পারেন লুইজে গ্রিনসগেল এবং লুইজে ক্লুস। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ এমন একটি সুন্দর কর্মসূচীর মধ্যে আমাদেরকে অন্তর্ভূক্ত করার জন‌্য। লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র “ইউরো বাংলা”র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/), (https://penakash.wordpress.com/, (editor.eurobangla@yahoo.de)

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s