দায়বদ্ধতার আগুনে জ্বলছি আমি!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ: ২০০৯ সালে যখন দেশ ছাড়ি তখন আবদুল লতীফ সাপির ছিলেন জীবন সায়াহ্নের এক কবি। আমার প্রিয় শিক্ষকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আমাকে স্নেহ করতেন অসম্ভব রকমের! তিনি ছিলেন ভাগ্যবিড়ম্বিত এক পল্লী এলাকায় অনাদর আর অবহেলায় পড়ে থাকা অসাধারণ এক মানুষ। বহু ঘটনা, ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন এই ফোকলোরবিদ। অনেক ফোক সংগ্রহ ছিল যার জ্ঞানভান্ডারে। মায়ের ভাষায় কথা বলার মাসে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন বহু দূরে। যেখানে গেলে কেউ আর ফেরেন না। ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন।
২০০৩ সালের ১১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের পঞ্চগড় জেলার বোদা থানার মাঝগ্রামে ১৯৪৪ সালে তার জন্ম। ষাটের দশকের শুরু থেকেই সাহিত্য-সাংবাদিকতা এবং রাজনীতিতে ছিল তাঁর তুখোড় পদচারণা।
লতীফ সাপিরের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চর পথ প্রশস্ত করে দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক সংবাদ। জীবন প্রভাতেই সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তাঁকে কীর্তিমান করার পেছনেই ছিল তাঁর আপন ভূবন এ পত্রিকা দু’টো। মেহরাব আলী রচিত ‘দিনাজপুরের লেখক পরিচিতি’ এবং ‘দিনাজপুরে সাংবাদিকতার একশ বছর’ বই দুটিতে তিনি কীর্তিমান কর্মী হিসেবে স্থান লাভ করেন।
ছাত্রাবস্থায়ই লতীফ সাপির বাম রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ঠাকুরগাঁ কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বোদা থানা ন্যাপ (মো) এর সাধারণ সম্পাদক এবং পঞ্চগড় জেলা ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক হিসবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় পঞ্চগড় প্রেসক্লাব এবং পঞ্চগড় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন। ছিলেন তিনি বোদা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বহুব্রীহি থিয়েটার ও ভাষা শহীদ স্মৃতি পাঠাগারের আজীবন উপদেষ্টা। আবদুল লতীফ সাপির ষাটের দশক থেকেই পঞ্চগড়ের লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেন। এ কাজে আমৃত্যু তিনি ব্যাপৃত ছিলেন।
ষাটের দশক থেকে লোক সাহিত্যের উপর তার গবেষণামূলক অসংখ্য প্রবন্ধ আজাদ, কাঞ্চন, করতোয়া, শঙ্খপাণি, আজকের কাগজ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার লোক সাহিত্যের উপর লেখা ‘পঞ্চগড়ের ছড়া’, ‘পঞ্চগড়ের প্রবাদ-প্রবচন’, ‘পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ কোষ’ প্রকাশের অপেক্ষায়। ‘পঞ্চগড়ের প্রবাদ-প্রবচন’ বইটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ আবদুল জলিলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বলে শুনেছিলাম স্যারের মুখেই। কিন্তু সেটার কী অবস্থা তা আমার জানা নেই।
এতদ্ব্যতীত তাঁর রচিত ‘খান বাহাদুর একিনুদ্দিন’ এবং ‘বোদার ইতিহাস’ দুটি সমৃদ্ধ বই। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে রচিত তাঁর ‘এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে’ সনেট কাব্যটি এক দশক আগে প্রকাশিত হয়। এরপর বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল সেন ২০০১ সালেল ৭ মে দৈনিক জনকণ্ঠে ‘যখন যেখানে যাই’ এবং ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল ব্যক্তিগভাবে তাকে অভিনন্দিত করেন। তাঁর ষাটের দশকে রচিত পাঠক-নন্দিত দুটি সনেট কবিতা এখানে উপস্থাপন করছি-
এক.
এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে
তাই আমি ভালবাসি এই নারী আর এই দেশ
প্রচ্ছন্ন স্বপ্নের মত যে নারীর প্রথম উন্মেষ
আমাকে আকুল করে কোন এক শিল্পীর সন্দেহে।
দেশ সে তো মাতৃভূমি-গরীয়সী জননী আমার
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে ফসলের অফুরান দানে
আমাকে লালন করে কোলে রেখে মাতৃত্বের টানে
এমন কে আছে আর নি.শ্বেষে করে যে উজাড়!
ওমণী সে গৃহলক্ষ্মী-মন যার বাঁধা সারাক্ষণ-
আপন গৃহের মাঝে, স্বামী আর সন্তানের সুখে
নিজেকে উজাড় করে যে রমণী সয় সব দুখে
সে রমণী বড় ভালো-বড় ভালো তার ঋজু মন!
তাই এই দেশ আর এই নারী এত ভালবাসি
এ দু’য়ের ভালেঅবাসা পেতে আমি একান্ত প্রত্যাশী।
(জুলাই, ১৯৬২)
দুই.
নদী ও নারীর কাছে সে আমার অনন্ত প্রত্যাশা
যেই নদী নিরবধি সুচঞ্চলা রজত ধারায়
যে নদী নিঝুম রাতে তার সুরে গান গেয়ে যায়
সে নদীর কাছে আমি পেয়ে যাই কবিতার ভাষা।
সে নদীল কি গভীর বুকভরা ভালবাসা মেখে
মুগ্ধ চাদ সারারাত জেগে থাকে শান্তির শয়নে
উচ্ছলিত জলরাশি ঘিরে তাকে সাগ্রহ বেষ্টনে
দিতে চায় সব তার-অবশেষে হারাতে নিজেকে।
এমনই ভালবাসা ভরা কোন নারীর হৃদয়
যদি পাই কোনদিন-যদি পাইমনে লাগা মন
যদি বা হারাতে পারি তার মাঝে আত্মতৃপ্তি সুখে
আর সে-ও ভালবেসে হাত রাখে আমার চিবুকে
হয়ে যেতে পারি কবি, হতে পারে কবিতা লিখন
তাকে নিয়ে, সেই সাথে থাকে যদি সফল সময়।
(এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে-৪৭)

ষাটের দশকের যৌবনদীপ্ত কবি, আজাদ, সংবাদ, নতুন বাংলা, একতা, শক্তি, উত্তরকণ্ঠ পত্রিকার তিন দশকের নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিক উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সংগ্রামী পরিষদের সংগঠক আবদুল লতীফ সাপির রোগ-শোক-বার্ধক্যে হয়ে পড়েছিলেন জরাজীর্ণ। কিন্তু কেউ তাঁর খোজ রাখেননি। অনেকেই তার কাজকে নিজের কাজ বলে বাহবা পেয়েছে! সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু পর্যন্ত প্রদর্শন করেনি অনেকেই। তাঁরই একটি সনেটে তাঁর অন্তরের প্রতিধ্বনি শুনি-
আমার তো চাল-চুলো ঘর-দোর কিছুই এমন
হলেঅ না জীবনে-যার কথা গর্ব করে বলি
তুমি তার মাঝে এসে পেতে চাও সুখের অঞ্জলী
ভুল ভেঙ্গে গেলে কভু দখবে তা কি যে প্রহসন!
শব্দ ভেঙ্গে শব্দ গড়া এ রকম এক কারিগর
সারাক্ষণ নিয়ে থাকে উঁই-কাটা কেতাব কাগজ
তার মাঝে ঢেলে দিয়ে বিগলিত সমস্ত মগজ
কি করে রাখবে সে চাল-চুলো ঘরের খবর!
বরং কামার হলে সুঁই পিটে বানাতো সে ফাল
নগদ পয়সা পেয়ে শান্তি সুখে চালাতো সংসার
অথবা কৃষক হলে করি শাক-সব্জীর খামার
দু’মুঠো খেয়ে পরে পেতো সেই সুখের নাগাল।
এমন হলো না কিছু, কিছু মানে তুমি যাহা চাও
উপচে-পড়া সমৃদ্ধি এ সংসারে হয়েছে উধাও!
(এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে-৩৬)
আমরা আমাদের প্রাণোচ্ছল জগতে এই কবি-সাংবাদিক ও গবেষককে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হইনি। তাঁর অপ্রকাশিত পান্ডুললিপিগুলি বইয়ের রুপ দিয়ে সেই গুণির প্রতি আমরা আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে পারি কিনা তা ভেবে দেখতে বলি সবাইকে (বিশেষ করে এই কীর্ত্তিমানের ছাত্ররা)। স্যারের মৃত্যুর পর এই লেখাটি দৈনিক সংবাদ এ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ছাপা হয়নি। হয়ত লেখাটি ছাপার অযোগ্য, অন্ত:ত সংবাদ কর্তৃপক্ষ তাই মনে করে!
জীবীত থাকাকালে আমার এই স্যার একটি চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন, “আকাশ মৃত্যুর পরও তোমার প্রতি আমার দাবি থাকলো…”। সেই দায়বদ্ধতার আগুনে জ্বলছি আমি। একজন শিক্ষকের ঋণ কী কখনও শোধ করা যায়? লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র “ইউরো বাংলা”র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/), (https://penakash.wordpress.com/, (editor.eurobangla@yahoo.de)

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s