কল্পনা চাকমা জীবীত বা মৃত!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ কল্পনা চাকমা। সংগ্রামী নেত্রীর প্রতিকৃতি। একজন সফল মানবাধিকার নেত্রী। আদিবাসি অধিকার রক্ষা আন্দোলনের অগ্রনায়িকা। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে কল্পনা চাকমাকে অপহরণ করা হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাকে অপহরণ করে। যিনি আজও নিখোঁজ, অপহৃত। কল্পনা চাকমা অপহরণের ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু তার সন্ধান আজও মেলেনি। অপহরণকারিরা তাকে হত্যা করেছে, নাকি জীবিত রেখেছে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।
সেনাবাহিনীর ওই সময়ের লেফট্যানেন্ট ফেরদৌস কল্পনা অপহরণের মূল নায়ক বলে অভিযোগ আছে। কিন্তু তার কোন শাস্তি হয়েছে বলে জানা যায়নি। যদিও কল্পনা অপহরণ ঘটনায় সরকার তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। কিন্তু সেই কমিটির রিপোট আজও আলোর মুখ দেখেনি। আদৌ দেখবে কিনা তা নিয়েও আছে সন্দেহ। কারণ বিভিন্ন ঘটনায় বাংলাদেশে বহু তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে তা প্রকাশিত হয় না কখনও। এমনকি শত শতবিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের বেলায়ও একই অবস্থা লক্ষ্যণীয়।
মিস কল্পনা চাকমা ছিলেন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৯৯৬ সালের ১১ জুন দিবাগত মধ্যরাতে কল্পনা চাকমা অপহরণ হন। সপ্তম জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহুর্তে এই অপহরণ এর ঘটনা ঘটে। ওই রাতে লেফট্যানেন্ট ফেরদৌস এর নেতৃত্বে ১১ জনের একটি অপহরণকারি দল কল্পনাদের বাড়ি ঘেরাও করে। এদের মধ্যে গ্রাম রক্ষা পাটি বা ভিডিপি’র দুই সদস্য নূরুল হক ও সালেহ আহমেদও ছিল।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, ১৯৯৬ সালের ১৯ মার্চ লেফট্যানেন্ট ফেরদৌস এর নেতৃত্বে পরিচালিত হামলায় বেশ কিছু সংখ্যক জুম্মা জনগোষ্ঠী আহত হন। বহু বাড়ি-ঘরে আগুন লাগানো হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে কল্পনা চাকমা সেনাবাহিনী ও সরকারেরর কঠোর সমালোচনা করেন। এরপরই কল্পনা চাকমার বাড়ি আক্রমণ করে সেনাবাহিনী। তারা সেদিন কল্পনা চাকমার দুই সহোদর কালীচরণ চাকমা ও ক্ষুদিরাম চাকমাকেও অপহরণ করেছিল। কিন্তু তারা কোনরকমে সেনাবাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে যান। তবে কল্পনা অপহরণকারিদের জালে আটকা পড়েন। কল্পনার বৃদ্ধা মা বাধুনি চাকমা সেইসময় অপহরণ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন সাংবাদিকদের কাছে।
১৯৯৬ সালের ২৭ জুন পার্বত্য চট্রগ্রামের আদিবাসিরা রাজপথে নেমে আসেন। তাদের দাবি ছিল, “এই মুহুর্তে কল্পনা চাকমার মুক্তি দাও”। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী গুলি চালায় শান্তিপূর্ণ সামাবেশে। এতে নিহত হন স্কুল ছাত্র রুপম চাকমা (১৬)। বাঘাইছড়িতে সেই সমাবেশে যোগ দিতে যাবার পথে অপহৃত হয় স্কুল ছাত্র সুকেশ চাকমা, মনতোষ চাকমা এবং সমর চাকমা। সরকার তাদের পোষা মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে অপপ্রচারে নামে। এরই অংশ হিসেবে একই সালের ১৫ আগষ্ট (জাতীয় শোক দিবসে) একটি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করে যে, “কল্পনাকে দেখা গেছে ভারতের ত্রিপুরায়”। এরপর আগরতলাভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংগঠন এই প্রচারণাকে ডাহা মিথ্যা বলে অভিহিত করে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কল্পনা অপহরণের ঘটনায় একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। বিচারপতি আবদুল জলিলের নেতৃত্বে কমিটির সদস্যরা ছিলেন চট্রগ্রামের সেইসময়কার জেলা প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন এবং চট্রগ্রাম বিশ্ববিবদ্যালয়ের অধ্যাপক অনুপম সেন। ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কমিটি রিপোট পেশ করে সরকারের কাছে। যা আজও আলোর মুখ দেখেন! শুধু কল্পনাই নন, বহু আদিবাসি নারী-তরুণী ধষণের শিকার হন সেনাবাহিনীর দ্বারা। কোন ঘটনায়ই দোষীদের বিচার হয়নি।
গত বছর কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশসহ ৫ দফা দাবিতে রাজধানীতে মানববন্ধন করে হিল উইমেন্স ফেডারেশন। ১২ জুন, ২০১০ সকাল ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ মানববন্ধন হয়। হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভানেত্রী মিওসিং মারমার সভাপতিত্বে মানববন্ধন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নৃবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক জোবাইদা নাসরীন, পাহাড়ী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি বাবলু চাকমা, সাংগঠনিক সম্পাদক মং ওয়েং চিং প্রমুখ। তাদের ৫ দফা দাবি হচ্ছে কল্পনা চাকমা অপহরণ ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, অপহরণকারীদের বিচার ও ১৯৯৬ সালের ২৭ জুন কল্পনা চাকমা অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত চার আদিবাসীর হত্যাকারীদের শাস্তি প্রদান, চার আদিবাসীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের শ্বেতপত্র প্রকাশ ও অবিলম্বে পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে, রাঙামাটিতে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ডাকা সড়ক ও নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে ১২ জুন, ২০১০ বাঙালিদের হামলায় সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ১৮ জন আহত হন। সূত্র:-বিডিনিউজ২৪। সূত্র মতে, পুনর্বাসিত বাঙালিরা বিনা উস্কানিতে অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী নেতা-কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন এ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কণিকা দেওয়ান। কণিকা বলেন, মানিকছড়ির সাপছড়ি থেকে মিছিল করে রাঙামাটি- চট্টগ্রাম মহাসড়কে মানিকছড়ি পুলিশ চেকপোস্টের কাছে এসে রাস্তায় বসে পড়ে এবং সেখানেই অবস্থান নেয় সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে বিনা উস্কানিতে বাঙালিরা লাঠিসোটা নিয়ে তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এসময় সেখানে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা উপস্থিত ছিলো বলে তিনি দাবি করেন। তিনি জানান, হামলায় তিন সাংবাদিক ও অবরোধকারী ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সজীব চাকমা (২২), জীবন চাকমা (২৩) মিতা চাকমা (২৫), বাংলাভিশন টিভি চ্যানেলের রাঙামাটি প্রতিনিধি নন্দন দেবনাথ, নয়া দিগন্তের প্রতিনিধি মো. সোলায়মান এবং এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান মিল্টন বাহাদুর। এদের মধ্যে সোলায়মান ও নন্দন দেবনাথকে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সজীব, জীবন ও মিতা চাকমা স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
উল্লেখ্য, “জীবন মানেই সংগ্রাম”। কল্পনা চাকমা এই দশর্নেই বিশ্বাসী ছিলেন।
কল্পনা চাকমাই নন বহু আদিবাসি নেতা হত্যার বিচার হয়নি আজও। উত্তরাঞ্চলের নওগাঁর আদিবাসি নেতা আলফ্রেড সরেন হত্যারও ১৩ বছর অতিবাহিত হতে চলেছে, কিন্তু খুনিরা শাস্তি পায়নি। টাঙ্গাইলের মধুপুরের আদিবাসি নেতা চলেশ রিচিলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ক’বছর আগে। তারও কোন বিচার হয়নি। ধারাবাহিক বিচারহীনতা দেশে হত্যা-নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে প্রতিনিয়ত। আইনের শাসন বলবৎ না থাকলে বিচার আশা করাটাও একধরণের বাড়াবাড়ি কিনা তা আমাদের জানা নেই! অবিচার, অন্যায় আর দুর্নীতিগ্রস্ত একটা জাতি নিজেকে সভ্য বলে দাবি করে কী করে, তাও একটা আশ্বর্য্যের ব্যাপারই বটে! ছবি-ইন্টারনেট, লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র “ইউরো বাংলা”র সম্পাদক (https://penakash.wordpress.com/, (editor.eurobangla@yahoo.de)

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s