Monthly Archives: অগাষ্ট 2011

নির্বাসনে থেকে ॥ সুহৃদ শুভেচ্ছা এবং আমার স্বপ্নগুলি!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ প্রতি বছর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এলেই শুভেচ্ছা জানানোর হিড়িক পড়ে। বছর ঘুরে এবারো এলো মুসলমান সম্প্রদায়ের বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল ফিতর। এর বাইরেও হাল আমলে, অনেকের জন্মদিন উৎসব পালনের একটা সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। বিশেষত: সামাজিক বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা যায়, জন্মদিন পালন তথা শুভেচ্ছা জানানোর ঘোড়দৌড়। কেউ কেউ আবার দু’একদিন কোন সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সঙ্গে একবেলা খাবারের ছবি ধারণ করে তা ফেইসবুকে প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেন না। এমন ক্রিয়াকলাপে দোষের কিছু নেই। “তুমি যদি কাউকে ডান হাত দিয়ে কোন সহায়তা করো তা যেন তোমার বাম হাতটি জানতে না পারে।” শুনেছি এমন নাকি ধর্মীয় কথা আছে।
যাহোক, ক’দিন আগে আমার এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আমাকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে ই-মেইল করেছিলনে। তখন থেকেই এনিয়ে আমার ভেতরে এলোমেলো ভাবনাগুলি ঘুরপাক করতে থাকে। আজ আবার কয়েকজন বন্ধুর মেইল পেলাম। সবাই ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিদেশভূমে প্রবাস জীবনের নি:সঙ্গ সময়ে এমন ভালবাসা, শুভেচ্ছাপ্রাপ্তি অনেক আনন্দের। মনে একটা প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে শুভেচ্ছাপ্রদানকারির। শুধু তাই নয়, অনেক সুখানুভূতিমিশ্রিত নানান অতীত ঘটনার স্মৃতিতাড়িত করে মনকে। যেসব বন্ধু বা শুভাকাঙ্খী আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের সবার ভালবাসার মূল্য দেবার ক্ষমতা কী আমার আছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি তাদের কাছে ঋণী এবং কৃতজ্ঞ।
এই দূর প্রবাসে আমার মন প্রায় সারাক্ষণই কাঁদে। যতটুকু না নিজের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীর জন্য আমি কাঁদি তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাই আমার প্রিয় স্বদেশভূমির দরিদ্র, হতাশাগ্রস্ত, নির্যাতিত, নিরন্ন সহজ.সরল সাধারণ মানুষগুলির জন্য। সত্যিকার অর্থে যাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। সেইসব মানুষগুলিকে আমি বড্ড মিস করছি প্রতিক্ষণ-মুহুর্তে। যেসব বন্ধু মাতৃভূমির মাটি আঁকড়ে ধরে এইসব মানুষগুলির অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছেন তাদের সবাই একেকজন এই প্রজন্মের মুক্তযোদ্ধা। এরা সাধারণ নন, মহান মানুষেরই পর্যায়ে পড়েন।
নৃশংস-বর্বর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মানসিক ও শারীরীক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।সেই কালো অন্ধকার সময় রাতগুলি অতিক্রান্ত হবার চার বছর হতে চললো। জীবনের মায়ার বড়ত্বকে স্বীকার করে মায়ের ভূমি ছাড়ার দুই বছর পার হয়ে গেলো। জার্মানি, অষ্ট্রিয়া কিংবা নরওয়ের মতো দেশে নতুন ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়ার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার নবসংগ্রাম কবে শেষ হবে তাও জানা নেই। অর্থনৈতিক ও শারীরীক সুনিরাপত্তা পেয়েছি আমি। তবুও মানসিক শান্তি বাস্তবতা হতে বহু দূর, অনেক দূরে। আমি ভাবি সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল সোনার বাংলাদেশের কথা। প্রায় প্রতি রাতেই আমার নিস্তেজ-নিথর ঘুমন্ত দু’চোখের ওপর খেলা করে সুন্দর আকর্ষণীয় সব স্বপ্নগুলি। আমি স্বপ্ন দেখি জন্মভূমিতে ন্যায়বিচার, শান্তি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি স্বপ্ন দেখি যে, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তপনা, অনাচার, বৈষম্য, দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে আমার প্রিয় দেশ; নিহত-নির্যাতিত সাংবাদিক পরিবারগুলি বিচার পেয়েছে। সাংবাদিক বন্ধুরা মানুষের জয়গান রচনা করছেন প্রতিদিনকার কর্মকান্ডে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। আমি আরও স্বপ্ন দেখি,মানুষের মুখে হাসি, পেটে ভাত, পরনে কাপড়, মাথার ওপরে ছাদ। দুর্নীতি-দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবেইতো সার্বজনীনতা পাবে মানুষের সংহতি, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। একতা, সংহতি, মানবতা, শান্তি ও ভালোবাসার জয় হবেই হবে। ঈদ শুভেচ্ছার এই কার্ডটি দৈনিক জনকণ্ঠ’র যশোর ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক বন্ধু সাজেদ রহমান’র পাঠানো। লেখক: জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, শান্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/),(https://penakash.wordpress.com/), (editor.eurobangla@yahoo.de)।

“নির্বাসনে থেকে” ॥ মিথ্যা অপপ্রচার!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ অপপ্রচার। শুধু অপপ্রচাররই নয়। মিথ্যা প্রচারণা। কুৎসা রটানো। সমাজে একদল মানুষ আছে যারা গীবত গাইতে ভালোবাসে। কারও নামে মিথ্যা, বানোয়াট ও সাজানো কাহিনী নিশ্চয়ই কোন কল্যাণার্থে হয় না কখনও। নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে মানুষের চোখে, সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করাই মিথ্যা অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্য। একশ্রেণীর মানুষ যারা কারো উন্নতি কিংবা ভালো কিছু পছন্দ করে না। রাজনৈতিক অন্ধ বিশ্বাসে ডুবে থাকা এসব মানুষ অন্য কোন সমাজে আছে কিনা-সে অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে বাঙালি সমাজে যে এধরণের মানসিকতার মানুষ ভুরি ভুরি আছে তা বাঙালি কেউ অস্বীকার করবে কী? বাঙালি আমেরিকা বা ইউরোপে বসবাস করলেই কী তার স্বভাব বদলায়? উত্তর আমার জানা নেই। তবে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি এমন মানুষদের। যারা যুগের পর যুগ ইউরোপে বসবাস করছেন। এদের প্রায় সকলেই ইউরোপর কোন না কোন দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উচ্চশিক্ষিতও বটে। অনেকের বাড়ি-গাড়ি ও ব্যবসাপাতিও আছে এই ইউরোপে। অনেকের ছেলে-মেয়েরা এখানেই জন্ম নিয়েছে। ইউরোপীয় সমাজ-সংস্কৃতিতেই বেড়ে ওঠছে কিংবা ওঠেছে। কয়লা ধুলে নাকি ময়লা যায় না। সেই অবস্থা আর কী? স্বভাবতো পাল্টায় না।
জার্মানিতে আসার পর আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এক বাঙালির সঙ্গে। যিনি থাকেন স্কান্ডিনেভিয়ার একটি সুন্দর দেশে। বাংলাদেশের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পড়লেখা করেছি। তিনি আমার অনেক সিনিয়র। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যার পরিবার অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। উচ্চশিক্ষিত অমায়িক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সচেতন সেই ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০৯ সালে। তখন আমি জার্মানিতে। আকস্মিক সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই আমি তাকে ভিসিট করি আমার পরিবারসহ। এক সপ্তাহের সেই ট্যুরে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি যাকে। বন্ধুবৎসল এই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। এখনও আমি উনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। এ প্রসঙ্গে একটু পরে আসি।
জার্মানির পর অষ্ট্রিয়ার এক বছর বেশ দ্রুতই চলে যাচ্ছিল। তখনও স্থায়ী কোন থাকার ব্যবস্থা হয়নি আমার। ওদিকে দেশে ফেরারও পরিস্থিতি নেই। কী করবো, কোথায় থাকবো, কিভাবে? নানান চিন্তা ও টেনশন মাথার মধ্যে। ২০১০ সালের শেষ দিকের কথা। ব্যক্তিগভাবে আমি হতাশায় নিমজ্জিত। যে সময়টাতে মানুষের কাছ থেকে সৎ পরামর্শ উপদেশ ছিল জরুরি। সেই সহানুভূতির আশা করাটা কী খুব বেশি কিছু? কিন্তু পেলাম উল্টোটা। আমার ভাগ্যটাই কেন জানি এমন! যখন যেটা প্রয়োজন তখন সেটা মিলে না আমার কপালে। প্রসঙ্গ বোধহয় অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। থাক সেসব কথা।
এমন পরিস্থিতিতে সেই বাঙালি সুহৃদের ফোন পেলাম। মনটা ভরে উঠলো আনন্দে। ভাবলাম, একটা পরামর্শ করা যাবে তার সাথে। উনি নিশ্চয়ই কোন ভালো উপদেশ দেবেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে হতাশা আরও প্রকট হলো। উনি বললেন, “শেস পর্যন্ত তুমি যদি কোথাও জায়গা না পাও তবে আর কী করা। দেশে ফিরে যাও।” এই আলোচনার মাত্র কয়েক মাস আগে এই একই ব্যক্তিই আমাকে লিখেছিলেন যে, “আকাশ খবরদার দেশে ফিরোনা ভাই। দেশে ফিরলে তোমার বিপদ হবে।” ফোনালাপে তিনি আমাকে আরও বলেছিলেন যে,”তোমার নামে তো অনেক রকম কথাই শুনতে পারছি। বহুজনে বহু তথ্য জানাচ্ছে। তুমি নাকি এখন দু’হাতে কামাচ্ছো। তোমার নাকি এখন কোটি কোটি টাকা। ইত্যাদি…”।
আমি জানি না এই কথাগুলি কি অন্য কারও নাকি উনার নিজেরই? তবে আঁচ করতে পারি এসব কথা আসছে রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সেই ব্যক্তি আবার মহাজোটেরই সমর্থক। আর মহাজোট নেত্রীর খুব স্নেহভাজন এক নেতা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। যাদের কারণে আজ আমি প্রিয়দেশহারা। সম্ভবত সংঘবদ্ধ একই কারণে ঘোষিত পুরস্কার বিনা ঘোষণায় তামাদি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আর্টিকেলে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ইউরোপ শাখা। এই সংগঠনটি আমাকে এবং মানবাধিকারকর্মী রোজালিন কস্তাকে মানবাধিকার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছিল ২০০৯ সালে। পরে তারা কস্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করে। কিন্তু আমাকে দেয়নি, এব্যাপারে তারা কোন ঘোষণাও দেয়নি। যাহোক, পুরস্কার পাবার আশায় আমি কোন কাজ করি না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই মানুষের অধিকার রক্ষায় সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করি মাত্র। এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আর্টিকেলে।
যাহোক কোটি কোটি টাকা থাকলে কিংবা দু’হাতে ইনকাম করলে কী বাস্তব অবস্থাটা এতো খারাপ হতো! এখানে নেই নিজস্ব কোন গাড়ি কিংবা বাড়ি। নিজের কাজ নিজে করতে হয়। নেই কোন সহকারী কিংবা অফিসের পিয়ন। অনেক ভারি জিনিসও নিজের মাথায় করে বহন করতে হয়। নিজস্ব অফিস, বাসা-বাড়ি, পিয়ন-সহকারী কী ছিল না আমার? নিজের দেশের মাটিতে উৎপাদিত চালের ভাত,সবজিসহ বাহারিসব পিঠা ও তরিতরকারি খাবার-কোনটাই নেই এখানে। দেশে থাকতে কোনদিন নিজের হাতে বাজার করিনি। আর করলেও ছিল মোটরসাইকেল নইতো রিকশা কিংবা অফিসের সহকারীর হাত। কী রাজকীয় পরিবেশে ছিলাম আমি তাতো চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে কী? পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবইতো হারিয়েছি। ফেইসবুকে দেয়া নিজের ছবিটার দিকে তাকান প্লিজ। অথবা নিজে কি সংগ্রামই না চালাচ্ছেন! নিজের অবস্থানটা মাথায় নিন। তবে অন্যের অবস্থানটা বোঝা যাবে। একটা পরদেশী ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজে টিকে থাকার জন্য লড়ে যাচ্ছি। টাকা কামানোর চেষ্টা করি না আমি। সেই চিন্তা মাথায় থাকলে দেশে থেকেও কোটিপতি হওয়া কোন ব্যাপাররই নয়। আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু আছেন ঢাকায়। যারা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন পান। আর বাড়ি ভাড়া দেন প্রায় ১০ হাজার টাকা। তারা কী করে চলেন আর কী খান এবং কিভাবে, ভাবুন প্লিজ? সেই নয় ছয় করতে পারলে কি আর দেশ ছাড়তাম কিংবা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন নেমে আসতো আমার জীবনে?
জীবনের নিশ্চয়তা অন্যকথায় স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, অন্যায়-অবিচারের বিচার পাবার নিশ্চয়তা পেলে এখুনি দেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত আছি আমি। সেই নিশ্চয়তা-নির্ভরতার জায়গাটা কোথায় বলুন? কারণ আমার পেশা, নিরন্ন-নিরীহ, গরীব-দু:খী ও নির্যাতিত মানুষগুলিকে আমি বড্ড মিস করছি। তাদের পাশে থাকতে পারাটাই হতো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অন্যের গীবত গাওয়া, কারও সম্পর্কে মিথ্যা অপপ্রচারে কার লাভ হয় জানি না। কিন্তু যার সম্পর্কে এই অপকর্মটি করা হয় তার কিন্তু মর্যাদাহানি হয়। এতে কারও সন্দেহ আছে কী?

“নির্বাসনে থেকে” ॥ বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতেও একদিন সোনালী সূর্য্য উঠবে!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে দু’দল আইনজীবী রীতিমতো সন্ত্রাসী মহড়া দিলেন সম্প্রতি। যদিও এমন রিহার্সেল নতুন কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে এখন আর কোন খারাপ খবর ব্যতিক্রম কিছু মনে হয় না। ছোট বা বড় কোন ভালো কাজই এখন সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম ঘটনা সেখানে। সাংবাদিকতার পাঠ অনুযায়ী সেই ব্যতিক্রমগুলিই এখন আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিৎ বলে মনে করি। আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে ভালো মানুষের, ভালো কাজের আকাল, এটা বলবো না, বলা যায় না, যাবে না। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আশি শতাংশেরও বেশি মানুষ সৎ এবং পুরোপুরি ভালো। অশিক্ষা, দারিদ্রতা, অজ্ঞানতা আর সহজ-সরল এই সংখ্যাগরিষ্ট মানুষগুলি রাজনীতির মারপ্যাচে সেখানে এক বড্ড অসহায়! যারা দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতির কাছে জিম্মি। জীবন, পরিবার, সংসার চালাতে যারা হিমশিম খান প্রতিনিয়ত, তারা কী একটা শক্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারেন কোন সাহসী-অহিংস মাহাত্মা গান্ধীর ন্যায় নেতৃত্ব ছাড়া? সেরকম কোন ব্যক্তি ও নেতৃত্বে সেখানে নেই তাও বলা যাবে না, বলছি না। কিন্তু সিস্টেম তাদেরকে এগুতে দেয় না। হয়ত নিকট ভবিষ্যতে কোন বড় গণবিপ্লব অপেক্ষা করছে! যে সংগ্রামে সেই সুপ্ত মানুষ ও নেতৃত্ব জেগে উঠবে! কিন্তু অবশিষ্ট কুড়ি শতাংশ মানুষ যারা অন্ধ রাজনীতির সমর্থক এবং বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের সাথে কোন না কোনভাবে যুক্ত তারাই আছে সব সমস্যার মূলে। আর এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দ্বারাই মূলত: হাসিনা-খালেদা পরিচালিত হন তাদের স্তাবক, চাটুকার, দালাল নিয়ন্ত্রিত হয়ে। এসব চাটুকার-সুবিধাবাদীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠনের নেতা পর্যন্ত আছেন।
আইনজীবীদের সাম্প্রতিক এই কর্মকান্ডটি নিয়ে কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেইসবুকে একটি মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যটি হলো- “বাংলাদেশের আইনজীবীদের জন্যও একটা ‘আদব লেহাজের’ শিক্ষা দেওনের ইস্কুল খোলা দরকার!” সাগর ভাইয়ের এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানাতে চাইছি।
আমারতো মনে হয়, বাংলাদেশের সর্বনাশের মূলে কিন্তু প্রধানত: রাজনৈতিক অসুস্থ্যতাই দায়ী। সবকিছুর মূলে কিন্তু অসুস্থ্য রাজনৈতিক চর্চা আর অবিচার, অনিয়ম, দুর্নীতি। এসবকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের অসুস্থ্য রাজনৈতিক কালচার। আমরা কিন্তু সবাই কমবেশি দায়ী! পেশাদারিত্ব কী কোথাও আছে আমাদের সোনার বাংলাদেশে? শুধু কী আইনজীবীদের মাঝেই এটা লক্ষ্যণীয়, নাকি আমাদের সাংবাদিকতায়ও এটা দেখা যায়? যেমন ধরুন, বসুন্ধরা গ্রুপ অথবা ট্রান্সকম গ্রুপ অথবা এক্স ব্যবসায়ী গ্রুপ ওয়াই ব্যবসায়ী গ্রুপ সমর্থিত সংবাদপত্র/মিডিয়া সেই সন্ত্রাসী/বখাটেপনা আইনজীবীদের মতোই লেখালেখি করেন না কী? ক্ষমতা, অর্থ, স্বার্থ আর অন্যায্যতা-অবিচারের মধ্যে কী আমরা সবাই ডুবে নাই? এসবের অগ্রভাগে আছেন দুই রাজনীতিক। সরাসরিই বললে দোষের কিছু নেই। তারা হলেন হাসিনা আর খালেদা। মোটা দাগে এই দুই নেতার তলে কী সব প্রফেশনাল গ্রুপগুলি নেই? মোটা দাগেই বলি, দুই নেতা, দল ও ক্ষমতার কাছাকাছিতো সংসদ বিচারালয়, আইনজীবী, সাংবাদিক, সম্পাদক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, শিক্ষক, শ্রমিক নেতা, ব্যবসায়ী এককথায় সবাই! সমস্যাটাতো সেখানেই। সংসদ সদস্যদের কথা না হয় বাদই দিলাম। এমপিদের স্ব স্ব এলাকায় তাদের কথা ছাড়া নাকি গাছের পাতাগুলিও আর নড়ে না এখন। জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা কোথাও আছে কী? ব্যতিক্রমতো আছেই, কিন্তু সেটাতো উদাহরণ হয় না।
“শরীরের সর্ব অংশে ব্যথা ওষুধ দিবো কোথা” কিন্তু কেউ কেউ তার একটি ছোট অংশ নিয়েই ব্যস্ত আছি আমরা। নির্বিচারবাদিতা নয় কী? যেখানে দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয় রাজনৈতিক বিবেচনায় জ্যেষ্ঠতা লংঘণ করে!!! যে যত কথাই বলেন না কেন ভাই আসল সমস্যাটা রাজনীতির। মাথা পচলে কী শরীর চলে? রাজনীতি ঠিক হলে অন্য সব ঠিক হবে-ধীরে ধীরে। ভুল বললাম কিনা জানি না। এভাবেই ভাবছি আমি।
যাহোক, দেশটাতে যদি আইনের শাসন, নিয়মের শাসন, ন্যায়বিচারের শাসন থাকতো তাহলে কিন্তু ওই একই আইনজীবীর আচরণ অন্যরকম হতো। তাই নয় কী? ডানপন্থি তথা বিএনপি ও তাদের সমর্থিত জোটের সমর্থকদের মতে “বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য চাই সাবেক সেনা শাসক স্বাধীনতার ঘোষক জেনারেল জিয়াউর রহমান’র মতো রাজনীতিক”। আবার স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা সমর্থিতরা বলবে “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দলই পারে বাংলাদেশটাকে সোনার বাংলায় পরিণত করতে”।
দেশের মানুষ কী কখনও এই দুই পক্ষকে জাতীয় প্রয়োজনে এক কাতারে দাঁড়াতে দেখেছেন? ঠিক নরওয়ে যেভাবে ক’দিন আগে ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তির পক্ষে দাঁড়ালো। বাংলাদেশে শান্তি-গণতন্ত্র রক্ষায় দুই নেত্রী বা দুই গ্রুপ এক হতে পারে না কেন?
সমস্যার কথাতো বলাই যায়, অনেক বড় বড় বইও লিখা যায় কিন্তু সমাধানের পথটা কোথায়? বিচার-বুদ্ধি, বিশ্লেষণ ও বিবেচনা ছাড়াও অন্ধ সমর্থন কী আমাদের গোটা জাতিটাকেই অন্ধকারে নিয়ে যাচ্ছে না? সুতরাং, যে আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যে ডুব আছে আমার বাংলাদেশ সেখানে নতুন কোন স্কুল খুলে কী পার পাওয়া যাবে প্রিয় সাগর ভাই? বাংলাদেশে আলোর পথটি দেখাবে কে এবং কিভাবে? একদিন বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতেও সোনালী সূর্য্য উঠবে-সেই প্রত্যাশায় রইলাম আমরা সবাই। ছবি-ইন্টারনেট (গুগল) জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, শান্তি-মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র “ইউরো বাংলা”র সম্পাদক (http//www.eurobangla.org/),(https://penakash.wordpress.com/),(editor.eurobangla@yahoo.de)।