“নির্বাসনে থেকে” ॥ মিথ্যা অপপ্রচার!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ অপপ্রচার। শুধু অপপ্রচাররই নয়। মিথ্যা প্রচারণা। কুৎসা রটানো। সমাজে একদল মানুষ আছে যারা গীবত গাইতে ভালোবাসে। কারও নামে মিথ্যা, বানোয়াট ও সাজানো কাহিনী নিশ্চয়ই কোন কল্যাণার্থে হয় না কখনও। নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে মানুষের চোখে, সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করাই মিথ্যা অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্য। একশ্রেণীর মানুষ যারা কারো উন্নতি কিংবা ভালো কিছু পছন্দ করে না। রাজনৈতিক অন্ধ বিশ্বাসে ডুবে থাকা এসব মানুষ অন্য কোন সমাজে আছে কিনা-সে অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে বাঙালি সমাজে যে এধরণের মানসিকতার মানুষ ভুরি ভুরি আছে তা বাঙালি কেউ অস্বীকার করবে কী? বাঙালি আমেরিকা বা ইউরোপে বসবাস করলেই কী তার স্বভাব বদলায়? উত্তর আমার জানা নেই। তবে অভিজ্ঞতা লাভ করেছি এমন মানুষদের। যারা যুগের পর যুগ ইউরোপে বসবাস করছেন। এদের প্রায় সকলেই ইউরোপর কোন না কোন দেশের নাগরিকত্বও পেয়েছে। যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উচ্চশিক্ষিতও বটে। অনেকের বাড়ি-গাড়ি ও ব্যবসাপাতিও আছে এই ইউরোপে। অনেকের ছেলে-মেয়েরা এখানেই জন্ম নিয়েছে। ইউরোপীয় সমাজ-সংস্কৃতিতেই বেড়ে ওঠছে কিংবা ওঠেছে। কয়লা ধুলে নাকি ময়লা যায় না। সেই অবস্থা আর কী? স্বভাবতো পাল্টায় না।
জার্মানিতে আসার পর আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে এক বাঙালির সঙ্গে। যিনি থাকেন স্কান্ডিনেভিয়ার একটি সুন্দর দেশে। বাংলাদেশের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পড়লেখা করেছি। তিনি আমার অনেক সিনিয়র। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যার পরিবার অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। উচ্চশিক্ষিত অমায়িক অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সচেতন সেই ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০৯ সালে। তখন আমি জার্মানিতে। আকস্মিক সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই আমি তাকে ভিসিট করি আমার পরিবারসহ। এক সপ্তাহের সেই ট্যুরে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি যাকে। বন্ধুবৎসল এই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হয়। এখনও আমি উনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা করি। এ প্রসঙ্গে একটু পরে আসি।
জার্মানির পর অষ্ট্রিয়ার এক বছর বেশ দ্রুতই চলে যাচ্ছিল। তখনও স্থায়ী কোন থাকার ব্যবস্থা হয়নি আমার। ওদিকে দেশে ফেরারও পরিস্থিতি নেই। কী করবো, কোথায় থাকবো, কিভাবে? নানান চিন্তা ও টেনশন মাথার মধ্যে। ২০১০ সালের শেষ দিকের কথা। ব্যক্তিগভাবে আমি হতাশায় নিমজ্জিত। যে সময়টাতে মানুষের কাছ থেকে সৎ পরামর্শ উপদেশ ছিল জরুরি। সেই সহানুভূতির আশা করাটা কী খুব বেশি কিছু? কিন্তু পেলাম উল্টোটা। আমার ভাগ্যটাই কেন জানি এমন! যখন যেটা প্রয়োজন তখন সেটা মিলে না আমার কপালে। প্রসঙ্গ বোধহয় অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। থাক সেসব কথা।
এমন পরিস্থিতিতে সেই বাঙালি সুহৃদের ফোন পেলাম। মনটা ভরে উঠলো আনন্দে। ভাবলাম, একটা পরামর্শ করা যাবে তার সাথে। উনি নিশ্চয়ই কোন ভালো উপদেশ দেবেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে হতাশা আরও প্রকট হলো। উনি বললেন, “শেস পর্যন্ত তুমি যদি কোথাও জায়গা না পাও তবে আর কী করা। দেশে ফিরে যাও।” এই আলোচনার মাত্র কয়েক মাস আগে এই একই ব্যক্তিই আমাকে লিখেছিলেন যে, “আকাশ খবরদার দেশে ফিরোনা ভাই। দেশে ফিরলে তোমার বিপদ হবে।” ফোনালাপে তিনি আমাকে আরও বলেছিলেন যে,”তোমার নামে তো অনেক রকম কথাই শুনতে পারছি। বহুজনে বহু তথ্য জানাচ্ছে। তুমি নাকি এখন দু’হাতে কামাচ্ছো। তোমার নাকি এখন কোটি কোটি টাকা। ইত্যাদি…”।
আমি জানি না এই কথাগুলি কি অন্য কারও নাকি উনার নিজেরই? তবে আঁচ করতে পারি এসব কথা আসছে রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সেই ব্যক্তি আবার মহাজোটেরই সমর্থক। আর মহাজোট নেত্রীর খুব স্নেহভাজন এক নেতা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ষড়যন্ত্রের শিকার আমি। যাদের কারণে আজ আমি প্রিয়দেশহারা। সম্ভবত সংঘবদ্ধ একই কারণে ঘোষিত পুরস্কার বিনা ঘোষণায় তামাদি করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আর্টিকেলে। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ইউরোপ শাখা। এই সংগঠনটি আমাকে এবং মানবাধিকারকর্মী রোজালিন কস্তাকে মানবাধিকার পুরস্কার দেবে বলে ঘোষণা করেছিল ২০০৯ সালে। পরে তারা কস্তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার প্রদান করে। কিন্তু আমাকে দেয়নি, এব্যাপারে তারা কোন ঘোষণাও দেয়নি। যাহোক, পুরস্কার পাবার আশায় আমি কোন কাজ করি না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই মানুষের অধিকার রক্ষায় সাধ্যমতো কিছু করার চেষ্টা করি মাত্র। এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে লেখার ইচ্ছে রইলো পরবর্তী আর্টিকেলে।
যাহোক কোটি কোটি টাকা থাকলে কিংবা দু’হাতে ইনকাম করলে কী বাস্তব অবস্থাটা এতো খারাপ হতো! এখানে নেই নিজস্ব কোন গাড়ি কিংবা বাড়ি। নিজের কাজ নিজে করতে হয়। নেই কোন সহকারী কিংবা অফিসের পিয়ন। অনেক ভারি জিনিসও নিজের মাথায় করে বহন করতে হয়। নিজস্ব অফিস, বাসা-বাড়ি, পিয়ন-সহকারী কী ছিল না আমার? নিজের দেশের মাটিতে উৎপাদিত চালের ভাত,সবজিসহ বাহারিসব পিঠা ও তরিতরকারি খাবার-কোনটাই নেই এখানে। দেশে থাকতে কোনদিন নিজের হাতে বাজার করিনি। আর করলেও ছিল মোটরসাইকেল নইতো রিকশা কিংবা অফিসের সহকারীর হাত। কী রাজকীয় পরিবেশে ছিলাম আমি তাতো চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে কী? পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবইতো হারিয়েছি। ফেইসবুকে দেয়া নিজের ছবিটার দিকে তাকান প্লিজ। অথবা নিজে কি সংগ্রামই না চালাচ্ছেন! নিজের অবস্থানটা মাথায় নিন। তবে অন্যের অবস্থানটা বোঝা যাবে। একটা পরদেশী ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজে টিকে থাকার জন্য লড়ে যাচ্ছি। টাকা কামানোর চেষ্টা করি না আমি। সেই চিন্তা মাথায় থাকলে দেশে থেকেও কোটিপতি হওয়া কোন ব্যাপাররই নয়। আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু আছেন ঢাকায়। যারা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন পান। আর বাড়ি ভাড়া দেন প্রায় ১০ হাজার টাকা। তারা কী করে চলেন আর কী খান এবং কিভাবে, ভাবুন প্লিজ? সেই নয় ছয় করতে পারলে কি আর দেশ ছাড়তাম কিংবা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন নেমে আসতো আমার জীবনে?
জীবনের নিশ্চয়তা অন্যকথায় স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, অন্যায়-অবিচারের বিচার পাবার নিশ্চয়তা পেলে এখুনি দেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত আছি আমি। সেই নিশ্চয়তা-নির্ভরতার জায়গাটা কোথায় বলুন? কারণ আমার পেশা, নিরন্ন-নিরীহ, গরীব-দু:খী ও নির্যাতিত মানুষগুলিকে আমি বড্ড মিস করছি। তাদের পাশে থাকতে পারাটাই হতো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অন্যের গীবত গাওয়া, কারও সম্পর্কে মিথ্যা অপপ্রচারে কার লাভ হয় জানি না। কিন্তু যার সম্পর্কে এই অপকর্মটি করা হয় তার কিন্তু মর্যাদাহানি হয়। এতে কারও সন্দেহ আছে কী?

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s