নির্বাসনে থেকে ॥ সুহৃদ শুভেচ্ছা এবং আমার স্বপ্নগুলি!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ প্রতি বছর বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব এলেই শুভেচ্ছা জানানোর হিড়িক পড়ে। বছর ঘুরে এবারো এলো মুসলমান সম্প্রদায়ের বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল ফিতর। এর বাইরেও হাল আমলে, অনেকের জন্মদিন উৎসব পালনের একটা সংস্কৃতি লক্ষ্যণীয়। বিশেষত: সামাজিক বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা যায়, জন্মদিন পালন তথা শুভেচ্ছা জানানোর ঘোড়দৌড়। কেউ কেউ আবার দু’একদিন কোন সুবিধাবঞ্চিত শিশুর সঙ্গে একবেলা খাবারের ছবি ধারণ করে তা ফেইসবুকে প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেন না। এমন ক্রিয়াকলাপে দোষের কিছু নেই। “তুমি যদি কাউকে ডান হাত দিয়ে কোন সহায়তা করো তা যেন তোমার বাম হাতটি জানতে না পারে।” শুনেছি এমন নাকি ধর্মীয় কথা আছে।
যাহোক, ক’দিন আগে আমার এক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আমাকে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে ই-মেইল করেছিলনে। তখন থেকেই এনিয়ে আমার ভেতরে এলোমেলো ভাবনাগুলি ঘুরপাক করতে থাকে। আজ আবার কয়েকজন বন্ধুর মেইল পেলাম। সবাই ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। বিদেশভূমে প্রবাস জীবনের নি:সঙ্গ সময়ে এমন ভালবাসা, শুভেচ্ছাপ্রাপ্তি অনেক আনন্দের। মনে একটা প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে শুভেচ্ছাপ্রদানকারির। শুধু তাই নয়, অনেক সুখানুভূতিমিশ্রিত নানান অতীত ঘটনার স্মৃতিতাড়িত করে মনকে। যেসব বন্ধু বা শুভাকাঙ্খী আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তাদের সবার ভালবাসার মূল্য দেবার ক্ষমতা কী আমার আছে? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি তাদের কাছে ঋণী এবং কৃতজ্ঞ।
এই দূর প্রবাসে আমার মন প্রায় সারাক্ষণই কাঁদে। যতটুকু না নিজের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মীর জন্য আমি কাঁদি তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাই আমার প্রিয় স্বদেশভূমির দরিদ্র, হতাশাগ্রস্ত, নির্যাতিত, নিরন্ন সহজ.সরল সাধারণ মানুষগুলির জন্য। সত্যিকার অর্থে যাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। সেইসব মানুষগুলিকে আমি বড্ড মিস করছি প্রতিক্ষণ-মুহুর্তে। যেসব বন্ধু মাতৃভূমির মাটি আঁকড়ে ধরে এইসব মানুষগুলির অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছেন তাদের সবাই একেকজন এই প্রজন্মের মুক্তযোদ্ধা। এরা সাধারণ নন, মহান মানুষেরই পর্যায়ে পড়েন।
নৃশংস-বর্বর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মানসিক ও শারীরীক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি আমি।সেই কালো অন্ধকার সময় রাতগুলি অতিক্রান্ত হবার চার বছর হতে চললো। জীবনের মায়ার বড়ত্বকে স্বীকার করে মায়ের ভূমি ছাড়ার দুই বছর পার হয়ে গেলো। জার্মানি, অষ্ট্রিয়া কিংবা নরওয়ের মতো দেশে নতুন ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়ার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করার নবসংগ্রাম কবে শেষ হবে তাও জানা নেই। অর্থনৈতিক ও শারীরীক সুনিরাপত্তা পেয়েছি আমি। তবুও মানসিক শান্তি বাস্তবতা হতে বহু দূর, অনেক দূরে। আমি ভাবি সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল সোনার বাংলাদেশের কথা। প্রায় প্রতি রাতেই আমার নিস্তেজ-নিথর ঘুমন্ত দু’চোখের ওপর খেলা করে সুন্দর আকর্ষণীয় সব স্বপ্নগুলি। আমি স্বপ্ন দেখি জন্মভূমিতে ন্যায়বিচার, শান্তি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি স্বপ্ন দেখি যে, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তপনা, অনাচার, বৈষম্য, দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে আমার প্রিয় দেশ; নিহত-নির্যাতিত সাংবাদিক পরিবারগুলি বিচার পেয়েছে। সাংবাদিক বন্ধুরা মানুষের জয়গান রচনা করছেন প্রতিদিনকার কর্মকান্ডে। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। আমি আরও স্বপ্ন দেখি,মানুষের মুখে হাসি, পেটে ভাত, পরনে কাপড়, মাথার ওপরে ছাদ। দুর্নীতি-দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তবেইতো সার্বজনীনতা পাবে মানুষের সংহতি, শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। একতা, সংহতি, মানবতা, শান্তি ও ভালোবাসার জয় হবেই হবে। ঈদ শুভেচ্ছার এই কার্ডটি দৈনিক জনকণ্ঠ’র যশোর ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক বন্ধু সাজেদ রহমান’র পাঠানো। লেখক: জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, শান্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/),(https://penakash.wordpress.com/), (editor.eurobangla@yahoo.de)।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s