Monthly Archives: অক্টোবর 2011

হাসিনার মহাজোট সরকার রাষ্ট্রধর্ম প্রথা কী বাতিল করবে?


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। এরশাদ, যিনি স্বৈরাচারী, ডা. মিলনের হত্যাকারী, দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশে সেনা শাসন চালিয়েছেন। সেই নষ্ট-দুঃশ্চরিত্রবান স্বৈরশাসক জেনারেল এইচ এম এরশাদ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। অবশ্য আরেক জেনারেল জিয়াউর রহমান যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং পরবর্তীতে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসনকারি হিসেবে পরিচিত। তিনিই বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথম সাম্প্রদায়িকতার কালো টিপ পরিয়ে দিয়েছিলেন।
যাহোক, এরশাদ এখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অন্যতম শরিক। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আমি আমি আমার এক লেখায় প্রশ্ন রেখেছিলাম যে, “যদি এই মহাজোট ২৯ ডিসেম্বরের পর সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রধর্ম প্রথা কী বাতিল করে দেশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অসাম্প্রদায়িক করার উদ্যোগ নেবে?”
বিএনপি-জামায়াত জোটের অত্যাচার-নির্যাতন আর দুর্নীতির যাতাকলে পড়ে দেশবাসি হাসিনা-এরশাদের মহাজোটকে বেছে নেন নির্বাচনের মাধ্যমে। ব্রুট মেজরিটির মহাজোট সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু আজও রাষ্ট্রধর্ম প্রথা বাতিল করেনি। ক্ষমতার মসনদে বসার তিন বছর হতে চলেছে হাসিনার। কিন্তু “ইসলাম” সেখানে এখনও বহাল আছে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান আর আদিবাসি সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামে দেশের আপমর জনতা ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। একমাত্র স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও কতিপয় উগ্র বামপন্থি স্বাধীনতার বিরোধিতা করে। জামায়াত খুনি পাক বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলার ইনটেলেকচুয়ালগোষ্ঠীকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। তারা বেছে বেছে হত্যা করে মেধাবি সাংবাদিক, ডাক্তার ও অন্যান পেশাজীবীদের অনেকেকেই।
এরশাদ ঘাতক জামায়াতে ইসলামীর ন্যায় ব্লাশফেমী আইন প্রণয়ন ও দেশটাকে আটটি প্রদেশে বিভক্ত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন নির্বাচনী ইশতেহারে। সেই এরশাদ এখন হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্যৌবাধীন মহাজোট সরকারের পার্টনার।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭২ এর সংবিধানের পরিপূর্ণ পুন:প্রবর্তন করবেন কতদিনে, তা জানতে বড় ইচ্ছে করে!

গণমানুষের নেতার প্রতিকৃতি কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি। বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক স্বপ্নের রাজার নাম মোহাম্মদ ফরহাদ। কমরেড ফরহাদ নামেই যিনি পরিচিত। মেহনতি মানুষের নেতা। শ্রমজীবী-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের হ্রদয়ের রাজা। শোষণহীন একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল যার আজন্ম স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন। সমাজতন্ত্রই মানবমুক্তির একমাত্র পথ। এই রাজনৈতিক মতাদশর্ প্রতিষ্ঠায় জীবনভর লড়ে গেছেন তিনি। সমাজটাকে সবমানুষের জন্য সমান করা চাই। বাংলাদেশে সেই সমাজ বদলের রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ ফরহাদ। স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা ও শোষনমুক্ত রাজনীতির আদর্শ পুরুষ ফরহাদের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের সর্বউত্তরের ছোট্র জেলা শহর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। বিপ্লবী এক গণনায়ক, জননায়কের নাম কমরেড ফরহাদ। সমাজ বদলের সংগ্রাম করতে গিয়ে যিনি জীবনের একটা বড় সময় অতিক্রম করেছেন জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে। কিন্তু শত বঞ্চনা, নির্যাতন ও নিপীড়নেও যিনি সংগ্রামী জীবন ও আদর্শচ্যুত হননি। তিনি শুধু রাজনীতিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।
১৯৩৮ সালের ৫ জুলাই ফরহাদ জন্মেছিলেন। তাঁর পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আহমেদ সাদাকাতেল বারী। ফরহাদ ছিলেন একজন মেধাবি ছাত্র। দিনাজপুর জেলা স্কুলের ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন। এবং এরমধ্য দিয়েই তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল ততকালিন পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যা আজকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নামে পরিচিত। ১৯৫২ সালে সংগঠনটির জন্মকালে ফরহাদ দিনাজপুরে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করেছিলেন। ফরহাদের রাজনৈতিক জ্ঞান আর সাংগঠনিক দক্ষতা দারুণভাবে দৃষ্টি কাড়ে সিনিয়র নেতৃত্বের কাছে। ফলে নিজ যোগ্যতায় ১৯৫৩ সালে দিনাজপুর জেলা ছাত্র ইউনিয়ন সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি জেলা কমিটির সহকারি সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন একই সালে। খুব অল্প সময়েই ফরহাদ জনপ্রিয় ছাত্রনেতায় পরিণত হয়েছিলেন। পাশাপাশি ততকালিন কমিউনিষ্ট নেতাদের নজর কাড়েন কমরেড ফরহাদ। মোহাম্মদ ফরহাদ দিনাজপুর এসএন কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ততকালিন বৃহত্তর দিনাজপুরের কমিউনিষ্ট নেতারা ফরহাদের চৌকস রাজনৈতিক মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হন। এবং ধীরে ধীরে ফরহাদ তাদের সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।
গণমনুষের প্রাণপ্রিয় এই নেতা দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন শিশু সংগঠকও। মুকুল ফৌজ নামে একটি সংগঠনের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন আবৃতিকার এবং নাট্যাভিনেতা। ছাত্রাবস্থায় তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ততকালিন ছাত্রী আন্দোলনের নেত্রী রাশেদা খানম এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী রিনা খান নামেই সমধিক পরিচিত। ফরহাদ দুই সন্তানের জনক। কমরেড ফরহাদ বহঙ্গবন্ধুর বাকশালের কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন। এবং ওই দলের রাজনৈতক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান।
ছাত্র ও গণমানুষের কাছে কমরেড ফরহাদ যতই জনপ্রিয় হতে থাকেন নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্রও ক্রমশ: কমরেড ফরহাদকে শত্রু হিসেবে নেয়। ফলে ফরহাদের রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই নেমে আসে নিপীড়নের স্টিমরোলার। নিরাপত্তা আইনে ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৫৪ সালে। সেইসময় তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল বিনাবিচারে। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ১৯৫৫ সালে ফরহাদ কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ পান। পরের বছর ১৯৫৬ সালে তিনি দিনাজপুর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আর ১৯৫৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস‍্য পদ লাভ করেন। কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আইয়ুববিরোধী মিছিল বের করা হয়। ১৯৬২ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ এর সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক এবং প্রগতিশীল ধারার। ১৯৬২ সাল থেকে ফরহাদ হুলিয়া মাথায় নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির বিকাশ এবং ছাত্র গণআন্দোলন সংগঠনে অসামান‍্য ভূমিকা রাখেন। এরই মধ‍্যে দেশে মুক্ত সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়ন, ন‍্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন মোহাম্মদ ফরহাদই।
দেশ স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি-সিপিবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এবং কমরেড ফরহাদকে কারাবন্দি করে জিয়া সরকার। তবে ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। জিয়ার আমলেই ১৯৮০ সালে পুনরায় ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহের তথাকথিত অভিযোগে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পান। জিয়া সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। এরপর ক্ষমতা নেয় আরেক জেনারেল এরশাদ। ১৯৮২ সালে ফরহাদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ১৫ দল গঠনে। এরশাদ আমলে ১৯৮৩ সালে ফরহাদকে ফের গ্রেফতার করা হয়। কমরেড ফরহাদ তিন তিনবার সিপিবির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৫ দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি পঞ্চগড়-২ আসন তথা বোদা-দেবীগঞ্জ নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস‍্য। কমরেড ফরহাদ ছিলেন অনলবর্ষী তুখোড় বক্তা। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে তাঁর দেয়া ভাষণ আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
এই জনদরদী দেশপ্রেমক রাজনীতিক ১৯৮৭ সালের ১০ জানুয়ারি হ্রদরোগে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে চিকিতসার জন্য নেয়া হয় রাশিয়ার মস্কোতে। ৯ অক্টোবর এই প্রধাবিরোধী রাজনীতিকের জীবনাবসান ঘটে। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। হেলিকপ্টারযোগে মোহাম্মদ ফরহাদের লাশ আনা হয়েছিল বোদা পাইলট উচ্চ বিদ‍্যালয় মাঠে। লাখো জনতার ঢল নেমেছিল সেদিন প্রিয় এই মানুষটিকে এক নজর দেখার জন্য।
এদিকে পঞ্চগড়ে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে ৯ অক্টোবর, ২০১১ সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের ২৪ তম মৃত্যুবাষির্কী পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে সকালে বোদা উপজেলার বানিয়াপাড়ায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল চত্বরে স্মারক বৃক্ষরোপণ, দিনব্যাপী গাইনী, শিশু, দন্ত ও সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিছাড়াও হাসপাতাল প্রাঙ্গনে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। সকালে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহমেদ আল কবীর স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন। এ সময় অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ -উল -আলম লেনিন, কমরেড ফরহাদের স্ত্রী রাশেদা খানম, বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার, হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান মিটন, চন্দনবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, কমরেড ফরহাদের অনুসারী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। পরে অতিথিরা হাসপাতাল চত্বরে ও স্থানীয় একটি স্কুলে বিভিন্ন বৃক্ষের চারা রোপণ করেন। দিনব্যাপি স্বাস্থ ক্যাম্পে পাঁচ শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষসহ সাধারণ রোগীরা চিকিতসা সেবা গ্রহণ করেন। এই স্বাস্থ্য ক্যাম্পে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিতসক চিকিতসা সেবা দেন। কমরেড ফরহাদের জীবন ও সংগ্রামের ওপর একটি দেয়ালিকা প্রদর্শন করা হয়। বিকেলে হাসপাতাল চত্বরে “এক জননেতার গল্প শীর্ষক” এক আলোচনা সভায় কমরেড ফরহাদের স্ত্রী রাশেদা খানম সভাপতিত্ব করেন। সভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ -উল – আলম লেনিন, সাংবাদিক কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার, দিনাজপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহবায়ক মির্জা আনোয়ারুল ইসলাম তানু, দিনাজপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু, কুড়িগ্রামের সাবেক কমিউনিস্ট নেতা হারুন -অর রশীদ লাল, সাবেক ছাত্র নেতা অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন, চন্দনবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, সাবেক ইউপি চেয়াম্যান মো. ওয়ালিউল ইসলাম মন্টু ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান মিটন সহ স্থানীয় ব্যাক্তি বর্গ বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, মোহাম্মদ ফরহাদ তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের মধ্যে বেঁচে আছেন। আমরা তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামকে সফল করার মধ্য দিয়ে কমরেড ফরহাদকে চিরঞ্জীব করে রাখতে পারি। কমরেড ফরহাদ ছিলেন সাম্যবাদে বিশ্বাসী। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বিশ্ব মানবতার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। তাঁর মত সত ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিকের অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করছি।
আজকের বাংলাদেশে ত্যাগী, সত ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ক্রমশঃ প্রায় দুর্লভ হয়ে উঠছে। মোহাম্মদ ফরহাদ লড়াই করেছিলেন একটা ব‍্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ‍্যে। সেই কাঙ্খিত স্বপ্নের পরিবর্তন আজও হয়নি দেশে। দেশে বেড়েই চলেছে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান। বাড়ছে শোষণ-বঞ্চনা আর মানুষের মর্যাদাহানি। ফরহাদের মতো রাজনৈতিক নেতা তৈরীর পথ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলি ভোগবিলাসী ও ব্যবসাকেন্দ্রিক মানসিকতার রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতা তৈরির পথ প্রশস্ত করছে প্রতিনিয়ত। সত, নির্লোভ ও দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা আজকের রাজনীতিতে অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে সমাজে ভোগবাদী, স্বার্থপর মানসিকতার প্রসার ও বাণিজ্যিকায়ণ ঘটছে। যদিও ঘুনে ধরা পচা সমাজের মধ্য থেকেই আজও ফরহাদের স্বপ্নকে এগিয়ে নেয়ার জন্য একদল অনুসারি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক স্বার্থপর সুযোগ সন্ধানী শুধু আদর্শচ্যুতই হননি ফরহাদের গড়া পার্টির সম্পদকে দ্বিখন্ডিত করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। মাটি ও মানুষের নেতা “ফরহাদ ভাই” আজ বেঁচে থাকলে লজ্জা পেতেন এমন কীর্ত্তি দেখে।
অসাধারণ মেধা, বুদ্ধি আর প্রজ্ঞার অধিকারি কমরেড ফরহাদ অত্যন্ত সাধারণ ও সাদামাটা জীবন-যাপন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও তিনি কোন লোভনীয় চাকরির পেছনে ছুটে যাননি। অথচ তিনি চাইলে সেটা অনায়াসে পাইতেন। কিন্তু তা না করে মানব মুক্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন সারাটা জীবন। এমন বিরল ত্যাগ আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কেবল স্বপ্ন! চিরঞ্জীব কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ তোমায় লাল সালাম। আমরা তোমায় ভুলবো না। তোমার সততা, আদর্শ আর দেশপ্রেম আমাদের প্রেরণা। তোমার সংগ্রাম বৃথা যাবে না। হয়ত সেই স্বপ্নের কাঙ্খিত সফলতা আসতে সময় লাগবে। কিন্তু সংগ্রাম ও স্বপ্নকে সফল হতেই হবে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন একদিন আসবেই। যে পরবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন গণমানুষের বন্ধু মোহাম্মদ ফরহাদ। এই মহান মানবতাবাদী মানুষটি আমাদের মনে, মানুষের হ্রদয় মণিকোঠায় চির জাগরুক হয়ে থাকবেন অনন্তকাল ধরে। তঁর আদর্শ হোক আজকের প্রজন্মের প্রেরণা। জয় হোক কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের। লেখকঃ জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, শান্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক, editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/