Monthly Archives: ডিসেম্বর 2011

রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ॥ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি ও আমার বক্তব্য


রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ॥ মানবাধিকার কমিশনের চিঠি ও আমার বক্তব্য
রাষ্ট্রীয় বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষপর্যন্ত আমাকে স্বদেশ ছাড়তে হয়। কখনো দেশের বাইরে আসতে চাইনি। শুধু তাই নয় আমার কর্মস্থল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভাগীয় শহর রাজশাহী ছাড়তে চাইনি কোনদিনও। সাংবাদিকতাকে বড্ড ভালবাসি আমি। কিন্তু সেই ভালবাসার কাজকে এগিয়ে অগ্রগামী করতে পারিনি। কিন্তু কেন, কী আমার অপরাধ? বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমানকে লেখা আমার বক্তব্যে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আশা করি। শুভ বড়দিনে ই-মেইলে পাঠানো আমার বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরলাম।

বরাবর
অধ্যাপক মিজানুর রহমান
চেয়ারম্যান
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
ঢাকা, বাংলাদেশ।
বিষয়: অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য।
শ্রদ্ধেয় জনাব
আমি নিম্নসইকারি জাহাঙ্গীর আলম আকাশ। শান্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন প্রকাশনা ”ইউরো বাংলা”র (http://www.eurobangla.org/) সম্পাদনা করছি, বর্তমানে। ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত ছিলাম। দৈনিক সংবাদ, একুশে টেলিভিশন, সিএসবি নিউজ, দৈনিক বাংলা, বাংলার বাণী, আজকের কাগজসহ বিভিন্ন কাগজে কাজ করেছি। রেডিও জার্মান ডয়েচেভেলের ফ্রি-ল্যান্স কাজ করেছি রাজশাহী থেকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায় থেকে দর্শন বিষয়ে বি.এ (সম্মান), এম.এ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয় হতে পোষ্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন সিভিক জার্নালিজম ডিগ্রি অর্জন করি।

জঙ্গিবাদ, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড তথা রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী নির্যাতন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, নারী-শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং অধিকারহারা, ন্যায়বিচারবঞ্চিত সাধারণ মানুষের পক্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি সর্বদা। নিজের জীবনকে বাজি রেখে গণতন্ত্র, শান্তি, মানবাধিকার, সমতা, সমানাধিকার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে সামনে নেয়ার চেষ্টায় রত ছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাব এবং রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং দেশের সর্বোচ্চ সাংবাদিক সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য ছিলাম আমি। বাংলাদেশের সংস্কৃতি আন্দোলনের প্রধান সংগঠন বালাদেশে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী রাজশাহী জেলা সংসদেও প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বও দায়িত্ব পালন করি। যাহোক ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ আমি মাতৃভূমিহারা। বর্তমানে নরওয়েতে থাকি।

২০০৭ সালে আমাকে অন্যায় ও বেআইনিভাবে মিথ্যা-সাজানো অভিযোগে র‌্যাব (এলিট ফোর্স-Rapid Action Battalion) গ্রেফতার করে। আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী ও ভাড়া বাড়ির মালিক এবং মালিকের ছেলের সম্মুখে র‌্যাব আমাকে নির্যাতন করতে করতে বাড়ি থেকে রাত দেড়টার সময় গ্রেফতার করেছিল। কোন সভ্য সমাজের রাষ্ট্রীয় বাহিনী এমন কাজ করে না কখনও। ওরা আমাকে অমানবিকভাবে নির্যাতন চালায়। রাজশাহীর বর্তমান মেয়র জনাব লিটন ও র‌্যাবের তৎকালিন মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। তারা আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। যারা খুন-চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস্ও ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদেরকে দিয়ে আমার নামে মিথ্যা-কাল্পনিক অভিযোগে মামলা চাপানো হয়। ২৮ দিনের কারাবরণ শেষে আমি জেল থেকে মুক্ত হই। কারামুক্তির পর আমার জীবনের ওপর অব্যাহতভাবে হুমকি আসতে থাকে। ২০০৯ সালে আ্ওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে রাজশাহীর মেয়র লিটন এবং স্বাধীনতাবিরোধী মেজর রাশীদের দাপট আরও বেড়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ি, সপরিবারে চলে আসি জার্মানিতে।

অষ্ট্রিয়াতে থাকার সময় ২০১০ সালের ১৩ মে আপনার কাছে একটি অভিযোগ পাঠিয়েছিলাম। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৯ ডিসেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (তদন্ত ও অনুসন্ধান) জনাব শামীম আহম্মেদ একটি ই-মেইল বার্তা পাঠান আমার কাছে। আমাকে আগামি ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে কমিশন বেঞ্চ-২ এর সামনে হাজির হয়ে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলা হয়। ২০ ডিসেম্বর আমি জনাব শামীম আহম্মেদকে ই-মেইল পাঠিয়েছি। পাশাপাশি ই-মেইলে পাওয়া টেলিফোন নম্বরে (৮৩৩১৪৯২) ফোন করার চেষ্টা করছি। ওপারে রিং হয়, কিন্তু কেউ রিসিফ করছেন না। শেষ পর্যন্ত আপনার মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করি। আজ (২৫ ডিসেম্বর) নরওয়ের সময় সকাল ১০.১২ টায় আপনার সঙ্গে কথা বললাম। আপনার টেলিফোনিক নির্দেশনানুযায়ী আমার বক্তব্য কমিশনের কাছে উপস্থাপন করছি। আমার ওপরে বর্বরতা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা এবং অন্যান্য অন্যায্যতার পুংখানুপুংখ তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, আইন-আদালত তথা একটি সমাজের আসল চেহারা। গুটিকতক মানুষ যারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায় ক্ষমতাবান তারা কিভাবে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ মানুষের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আশা করি, আমি ন্যায় বিচার পাবো এবং নির্যাতনকারি ও পরিকল্পনাকারি সকলেই শাস্তি পাবে। কেন আমার ওপর এই বর্বরতা, কারা এর পেছনে ছিলেন এর সবকিছুই স্পষ্ট করে লেখা আছে আমার লেখা বই ”পেইন” এ, যেটি আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি অনলাইনেও পাওয়া যাচ্ছে। এখানে তার একটি লিংক দিলাম কমিশনের সুবিধার্থে (http://www.amazon.ca/Pain-Jahangir-Alam-Akash/dp/1456858025)।

অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা ঝুলে ছিলাম যেভাবে!
এবার আমি আমার সেই দু:সহ যন্ত্রণার কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি আমার মূল বক্তব্যে আসবো। ‘লুব্ধক’ এটি একটি বাসার নাম। রাজশাহী মহানগরীর উপশহরের ২ নম্বর সেক্টরের ৫৫ নম্বর বাড়ি এটি। আমি, আমার স্ত্রী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী (ঘটনার সময়ে) ফারহানা শারমিন এবং আমাদের চারমাস বয়সী (ঘটনার সময়) শিশুপুত্র ফিমান ফারনাদ এই তিনজন বসবাস করতাম, বাসার নিচতলার বাম অংশে। সিএসবি নিউজ এর সম্প্রচার বন্ধ। তাই সিএসবি নিউজ এর রাজশাহী ব্যুরো অফিস (মহানগরীর কাদিরগঞ্জে) খোলা হয় না আগের মত। ২৪ ঘন্টার নিউজ চ্যানেলে কাজ করতে গিয়ে পরিবার এবং সহকর্মী কাউকেই তেমন সময় দিতে পারতাম না। সিএসবির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গিয়ে সময় কাটানোর মত কোন কাজ ছিল না হাতে। তাই প্রেসক্লাবে মাঝে-মধ্যে আড্ডা দিতাম অনেক রাত পর্যন্ত। তবে রাত ১০টার আগেই বাড়িতে আসবে হবে এমন স্ট্যান্ডিং নির্দেশ ছিল স্ত্রী ফারহানা শারমিন এর। সেই নির্দেশ অনেক সময় লঙ্ঘিত হতো। বাসায় ফিরতে একটু দেরী হলে (রাত ১০টা অতিক্রম হলে) মোবাইলে রিং আসতো বাসা থেকে। এরপর ফারহানা আমাদের একমাত্র সন্তান ফিমানের কণ্ঠ শুনাতো আমাকে। আমিও দ্রুত চলে যেতাম বাসায়।

২০০৭ সালের গত ২৩ অক্টোবর রাত ১১টা পর্যন্ত ছিলাম রাজশাহী প্রেসক্লাবে। এরই মধ্যে অন্তত: দুইবার ফোন পেয়েছি ফারহানার। রাত তখন ১১টা কি সাড়ে ১১টা ক্লাব থেকে চলে আসি বাসায়। ফিমান সেদিন ঘুমাতে বেশ বিলম্ব করছিল। তাই তার সাথে আমরা খেলছিলাম দুজনে (স্বামী-স্ত্রী)। তখন পর্যন্ত আমরা রাতের খাওয়া সম্পন্ন করিনি। টিভিটা ছেড়ে দেয়া ছিল। বাবুকে (আমাদের সন্তান) ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছি উভয়ে। এক পর্যায়ে ফিমান ঘুমিয়ে পড়ে। আমরাও খাওয়া-দাওয়া সেরে নিই। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। রাত অনুমান দেড়টা আকস্মিক বিকট শব্দে বেজে ওঠে আমাদের বাসার কলিংবেল। বিরামহীনভাবে কলিংবেল বাজতে থাকে। ফলশ্রুতিতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি ও আমার স্ত্রী ঘরের দরজা খুলে বেলকুনীতে বেরিয়ে আসি। এসময় আমার কোলেই ছিল আমাদের সন্তান ফিমান ফারনাদ। বুঝতে পারলাম একদল সশস্ত্র মানুষ পুরো বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। অপরিচিত লোকদের সবার হাতে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র। কিন্তু কেন? পরক্ষণেই মনে হলো আমার নামে সন্ত্রাসী-খুনিরা যে মামলা রয়েছে তারজন্য হয়ত ধরতে এসেছে। কিন্তু ওই মামলায়তো হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছি আমি। আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমার মত একজন নগন্য সাংবাদিককে ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরতে হবে কেন? আমি কি চোর না ডাকাত নাকি দাগী অপরাধী? আর পুলিশ কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হলেতো পোশাক পরা থাকবে। সিভিল পোশাকে সবার হাতে অস্ত্র, নিশুতি রাত! এরা কি তবে সন্ত্রাসী নাকি ডাকাত দল? তাহলে কি ওরা ডাকাতি করতে এসেছে এই বাড়িতে ইত্যাদি নানা প্রশ্ন বাজতে থাকে নিজের মনের মধ্যে।

অপরিচিত লোকেরা ইতোমধ্যে গোটা বাড়ির সবক’টি কলিংবেল বাজিয়েছে। শুধু এই বাড়িরই নয় আশপাশের বাড়ির সব মানুষের ঘুম ভেঙ্গে গেছে। এরই মধ্যে তিনতলা বাড়ির একেবারে তিনতলা থেকে বাড়ির মালিক জনাব আবুল কাশেম ও তার পুত্র লিখন নিচে নেমে আসেন। সিভিল পোশাকধারী ১০/১২ জন সশস্ত্র লোক বাড়ির যে অংশে আমরা থাকি সেই অংশের বেলকুনীর দরজার কাছে আসেন। তারা নিজেদেরকে প্রশাসনের লোক পরিচয় দিয়ে আমার বাসা তল্লাশী করবেন বলে দরজা খুলতে বলেন। এসময় আমি এবং আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করি যে, আপনারা কারা? আমি উনাদের উদ্দেশে বলি, আপনাদের পরিচয় নিশ্চিত না হলে আমি দরজা খুলবো না। তখন তারা বলেন, ‘তাড়াতাড়ি দরজা খুল, নইলে তোর খুব অসুবিধা হবে।’ আমি বলি কি ধরনের অসুবিধা হবে, এতো রাতে একজন নাগরিকের বাড়িতে এসে আপনারা ডিসটার্ব করছেন কেন, কিসের কি অসুবিধা হবে? তারা আমাকে সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ বলে গালমন্দ করতে থাকেন। সত্যি সত্যি প্রশাসনের লোক নাকি সন্ত্রাসী-ডাকাতদল হানা দিয়েছে আমার বাসায় তা জানার জন্য আমি বোয়ালিয়া মডেল থানায় মোবাইল করি। থানার ডিউটি অফিসার আমাকে জানান, ‘থানা থেকে আমাদের কোন লোক যায়নি আপনার বাসায়। কে বা কোন বাহিনী গেছে তা আমাদের জানা নেই।’ এক পর্যায়ে সশস্ত্র লোকেরা বেলকুনীর গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি কেড়ে নেন। তখন স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে এরা তাহলে ডাকাত-সন্ত্রাসী! কিছুক্ষণ পর তারা (সশস্ত্র লোকেরা) নিজেদেরকে র‌্যাবের লোক বলে পরিচয় দেন। তখন বুঝতে আর অসুবিধা রইলো না। তাদের কর্মকান্ড আমরা সবাই জানি। ভালো মানুষকে মন্দ বানিয়ে মিথ্যা মামলা ও হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে গ্রেফতার দেখানোর বহু খবর পত্র-পত্রিকায় দেখেছি, আর মন্দরা তাদের বন্ধু।

আমি বলি যে, আপনারা র‌্যাবের লোক কিন্তু দেখেতো মনে হচ্ছে না। তাছাড়া আমার বাসা সার্চ করবেন আপনাদের হাতে কি সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। আমি এবং আমার পতœী সমস্বরে একথা বলি। এ পর্যায়ে তারা রেগে যায়। এক পর্যায়ে বাড়ির মালিকের ছেলে লিখন সশস্ত্র লোকদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা তাকে প্রহার করতে থাকেন। আমি মনে মনে ভাবি যে, সত্যিই যদি র‌্যাবের লোক হয় তাহলে কেন তারা মারধোর করছে বাড়ির মালিকের ছেলেকে। তখন আমি তাদের কাছে হাতজোড় করে অনুনয় করে বলতে থাকি, আপনারা উনাকে মারছেন কেন ? আপনারা কোন অন্যায় আচরণ করবেন না। আমি দরজা খুলে দিচ্ছি। আপনারা বাসা তল্লশী করুন। কিন্তু আমার প্রতি কোন অবিচার করবেন না। আমার ঘরে আপনাদের হাতের অস্ত্র রেখে আমাকে অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যাবেন না, প্লিজ। এরপর আমার শিশুপুত্র ফিমানকে তার মায়ের কোলে দেই। আমি বেলকুনীর গ্রিলের দরজা খুলি। দরজা খোলামাত্র র‌্যাব সদস্যরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে দরজার বাইরে নেন। তারা আমার দু’ হাতে হ্যান্ডকাপ পরান। আমার দু’ চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। শুধু তাই নয়, আমার মাথা থেকে গলা পর্যন্ত কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হয়। এই টুপি নাকি কেবলমাত্র ফাঁসির আসামিদের পরানো হয় যখন তাদেরকে ফাঁসির মঞ্চে নেয়া হয়। আমার শিশুপুত্র, স্ত্রী ও বাড়িওয়ালার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ী কিল-ঘুসি ও লাথি মারতে থাকেন। একটি সভ্য দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা একজন সাংবাদিক, সাংবাদিক নেতার সঙ্গে যে আচরণ করছে তাতে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এলিটফোর্স বলে খ্যাত এই বাহিনীর সদস্যরা এমন অসভ্য-বর্বর আচরণ করতে পারে তা কখনও ভাবিনি।

‘সন্ত্রাসী’র ন্যায় র‌্যাবের লোকেরা আমাকে টেনে-হিঁচড়ে একটি মাইক্রোবাসে ওঠায়। মাইক্রোর মধ্যে আমার সামনে দুজন, আমার পেছনে দুজন, আমার ডানে দুজন এবং আমার বাম পাশে দুজন সশস্ত্র লোক বসে শক্তভাবে ধরে থাকলো আমাকে। এদের একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করে বললো যে, ‘এই ব্যাটা এবার বল তোকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি’? আমি বলি তা কি করে আমি জানবো। তখন ওরা বলে, আমরা র‌্যাব তুই জানিস না র‌্যাব কোথায় নিয়ে যায় মানুষকে। তখন আমি বলি তাহলে কি আমাকে আপনারা ক্রসফায়ারে হত্যা করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন? এসময় তারা আমাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। মাইক্রো চলতে শুরু করলো। রাস্তার বাঁক আর মাঝে স্পিড ব্রেকার অনুমান করে বুঝতে পারি যে, গাড়ি যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট ক্রস করার পর স্পিড ব্রেকার ও তারপর মাইক্রোটি ডানে মোড় নিলে নিশ্চিত হই যে, আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পথিমধ্যে গাড়ির ভেতরে আমাকে মারধোর করা হয়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করে তারা। তারা আমাকে অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া ও ‘ক্রসফায়ার’ করার হুমকি দেয়। গাড়ির ভেতরেও একজন বলে যে, ‘আল্লাহর নাম, দোয়া-কালাম পড়, তোকে ক্রসফাার করা হবে’। তখন মনে মনে ভাবছি যে, আমিতো কোন অপরাধ করিনি, আমি খুনি নই। তারপরও আমাকে ক্রসফায়ার দেয়া হবে। এটা কি হয়? পরক্ষণেই আবার ভাবি সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা নতুন কিছু নয়। এখানে শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুনদের মত মানবতাবাদী মানুষদেরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতন সইতে হয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী নিজামীরা গাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। এসব ভাবতে ভাবতে একসময় নিশ্চিত হলাম যে, সত্যি সত্যি আমাকে র‌্যাব-৫ রাজশাহীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

র‌্যাব কার্যালয়ে নেয়ার পর আমার দু’হাত বেঁধে আমাকে উপরে সিলিংয়ের সাথে টাঙ্গিয়ে রাখা হলো। এর আগে আমাকে এ’ঘর ও ঘর সিঁড়ি দিয়ে ওঠানো নামানো করা হলো বেশ কিছু সময় ধরে। রাতে আমার আশপাশে বুটের খট খট শব্দ করে ৪/৫ জন লোক আসতো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আবার একই শব্দ করে হেঁটে চলে যেতো তারা। চোখ বাঁধা ও কালো টুপি পরিয়ে এবং আমাকে ঝুলিয়ে রাখা হয় সারারাত। এভাবে রাতভর আমার ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। সকাল আনুমানিক আটটার দিকে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাকে নিচে নামানো হলো। একটি ছোট রুটি পাতলা ডাল দিয়ে খেতে দেয় তারা। রুটির সাইজ আর পানির ন্যায় ডাল অনুভব করে আবার ভাবি, তাহলে কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাবেক উপাচায ও বর্তমানে লন্ডনস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইদুর রহমান খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য আবদুস সোবহান ও বিশিষ্ট নাট্যকার মলয় ভৌমিক এর ওপরও এমন আচরণ করেছে র‌্যাব সদস্যরা। এই তিন গুণি শিক্ষককেও র‌্যাব-৫ এর সদস্যরাই গ্রেফতার করেছিল। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকদের ওপর কি অমানবিক-বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে ‘পশুর দল’। যাহোক, রাতভর উপরে ঝুলে থাকার সময় মনে হচ্ছিল আমার শরীর থেকে বোধহয় হাত দু’টো আলাদা হয়ে গেছে। একটি গামছা দিয়ে আমার চোখ দু’টি শক্ত করে বেঁধে দেয়ার পর আবার মোটা কালো কাপড়ের একটি টুপি পরিয়ে দেয়ায় আমার যেন শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বারবার অনুরোধ করেছি কিন্তু টুপি খুলে দেয়নি অমানবিক ওই ‘জানোয়ারের দল’। সকালে নাস্তা হিসেবে যে পাতলা রুটি আমাকে খেতে দেয়া হয় তা থেকে সামান্য একটু ছিঁড়ে মুখে দিয়েছি। এরপর পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাই। আমাকে আবারও উপরে লটকানো হয় একইভাবে। ওই ছোট্র রুটিখানা খেতে দেয়ার সময়ও টুপিটি খোলা হয়নি। শুধুমাত্র গোঁফ পর্যন্ত টুপিটি উঠিয়ে দেয়া হয়। আমার কাছে এসে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ করে র‌্যাব সদস্যরা। সকাল অনুমান ১০টার দিকে দুই ব্যক্তি এসে আমার নাম জানতে চান। ওই দুইজনের কথোপকোথনেই বুঝতে পারি এরা আমার পরিচিত। গ্রেফতার হওয়ার আগে আগে পেশাগত কারণে এই দু’জনের সঙ্গে আমার পরিচয় এবং উনাদের সঙ্গে আমার একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। আরা এরা হলেন র‌্যাব-৫ এর তৎকালিন ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানী (সিপিসি) মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে ল্যাফটেনেন্ট কর্ণেল) ও রাব-৫ এর তৎকালিন সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর হুমায়ুন কবির। এরা এখন রাজশাহীতে নেই। ওই সময়ে র‌্যাব-৫ এর কমান্ডার ছিলেন লে. কর্ণেল শামসুজ্জামান খান। মানবাধিকার লংঘণকারি মেজর রাশীদকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের একজন সদস্য করে পাঠানো হয়েছিল আইভরিকোষ্টে। অপরজন মেজর কবিরকে বান্দরবানে বদলী করা হয়েছিল বলে শুনেছি।

কথিত অপহরণের অভিযোগে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে যখন র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে ২০০৭ সালের ১৮ মে তখন পরিচয় হয়েছিল মেজর কবির এর সঙ্গে। আর সিএসবি নিউজ বন্ধ হবার এক সপ্তাহ আগেও মেজর রাশীদের সাথে তারই কার্যালয়ে কথা বলি পেশাগত কারণে। পূর্ব পরিচিতি এই দু’জনের মধ্যে মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ এক পর্যায়ে নির্যাতন শুরু করলেন। নির্যাতনের শুরুতেই মেজর রাশীদ আমাকে বলেন, “এই ফকিরনির বাচ্চা, তোর এতো প্রেসটিজ কিসের? শালা চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী। তোর ‘পাছার ভেতর’ ঢুকিয়ে দেবো সাংবাদিকতা। এই শুয়োরের বাচ্চা তুই আর রিপোর্ট করবি না সিএসবি নিউজ-এ? লিচু বাগানের রিপোর্ট, বেনজিরের বউয়ের কথা, খায়রুজ্জামান লিটন সাহেবের (জনাব লিটন বর্তমানে রাজশাহীর মেয়র, আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা চাঁদাবাজি মামলার বাদী জনাব লোটনের ভাইপো) পারিবারিক ওয়াকফ্ এস্টেট নিয়ে রিপোর্ট করবি না? হারামজাদা তুই র‌্যাব দেখেছিস, কিন্তু র‌্যাবের কাম দেখিসনি।” আবার ভাবতে থাকি যে, র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আমাদের জাতীয় নেতার সন্তান জনাব লিটন সাহেবের নাম বলছেন কেন? তাহলে কি র‌্যাব সদস্যরা জনাব লিটনের প্ররোচনাতে আমাকে ধরে এনে আমার ওপর নির্যাতন করছে? কিন্তু আমিতো লিটন সাহেবের কোন ক্ষতি করিনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রিপোর্ট করেছি। এই রিপোর্ট করতে গিয়ে যদি লিটন সাহেব আহত-মর্মাহতও হয়ে থাকেন তাহলেওতো তিনি আমার ওপর এমন প্রতিহিংসা পরায়ন হতে পারেন না। তবে কি র‌্যাবের এই মেজর লিটন সাহেবের নাম ব্যবহার করে পুরো দোষটি তার (মেয়র সাহেবের) ঘাড়ে ফেলতে চাইছেন? পরবর্তীতে জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যৌথ ষড়যন্ত্রের অন্যতম রুপকার মাননীয় মেয়র মহোদয় নিজেও। নির্যাতনের প্রেক্ষিতে আমি মেজর রাশীদকে বলি, আপনি রাষ্ট্রের একজন কর্মচারী। আপনি আপনার দায়িত্ব-কর্তব্য ভুলে যাচ্ছেন। আপনি কিভাবে একজন নাগরিকের সাথে এমন অসভ্য আচরণ করছেন? রাষ্ট্র, সংবিধানতো আপনাকে কোন ব্যক্তিকে নির্যাতন করার অধিকার দেয়নি। এক পর্যায়ে তিনি (মেজর রাশীদ) আমার বাম গালে থাপ্পড় মারলে আমার ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার বাম হিপে ইলেকট্রিক শক দেন। ওটা যে ইলেকট্রিক শক তা আমার জানা ছিল না। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে এই ইলেকট্রিক শক বিষয়ে জানতে পারি। নির্যাতন চালানোর সময় এক পর্যায়ে মেজর রাশীদ আমার বাম হিপে একটা বলের ন্যায় বস্তু দিয়ে দ্রুতগতিতে একাধিকবার আঘাত করেন। এটাই ইলেকট্রিক শক। এই শক যখন দিচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন আমার গোটা শরীরে আগুন ধরেছে। ইলেকট্রিক শক দেয়ার পর আমার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। মনে মনে ভাবি এরা আমাকে এত কষ্ট-যন্ত্রণা না দিয়েতো একেবারে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলতে পারে। পরে তারা মিডিয়ার সামনে তাদের বানানো নাটক মঞ্চস্থ করে নিজেদের অপরাধ ঢেকে দিতে পারে। আমাদের সমাজের ভোতা বিবেক কিছুই বলতো না ওদেরকে! যাহোক, তখন অনুমান সকাল সাড়ে ১০টা। এসময় আমার হাতের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। আমাকে বসানো হয় ইলেকট্রিক চেয়ারে। এর প্রায় আধাঘন্টা পর টর্চার সেলের ফ্লোরে শুইয়ে দেয়া হয়। এরপর দুই মেজর রাশীদুল হাসান রাশীদ ও হুমায়ুন কবির একযোগে আমার ওপর হামলে পড়েন। এসময় আমার মনে হচ্ছিল, যেন এই দুই সেনা কর্মকর্তা তাদের ব্যক্তিগত জিঘাংসা মিটাতেই আমাকে নির্যাতন করছেন। আমার শরীরে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন মেজর রাশীদ ও হুমায়ুন কবির। একই সঙ্গে বুটের লাথি ও কিল-ঘুসি চলে সমানতালে। প্রায় এক ঘন্টা ধরে আমাদের ’অহংকার’ বলে পরিচিত সেনাবাহিনীর দুই সদস্য আমার ওপর নির্যাতন চালান। যদিও এরা অহংকার নয় বরং ঘৃণা ও লজ্জার কাজই করেছে বেশি। তারা উভয়ে একটা মোটা বাঁশের লাঠি (গোলাকৃতির) দিয়ে আমার দুই পায়ের তালুতে বেধড়ক পিটিয়েছেন। নির্যাতন চালানোর সময় সেনা কর্মকর্তাদের উভয়ই ছিলেন উল্লসিত। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার জ্ঞান ফিরলে আমি বুঝতে পারি যে, একটি পরিত্যক্ত রান্না ঘরে আমি খড়ের ওপর পড়ে আছি। যেখানে পোকা-মাকড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাকে ওরা মরা গরু-ছাগলের ন্যায় আমার চোখ-মুখ ও হাত বেঁধে ফেলে রাখে সেই ঘরের মধ্যে। দুপুর অনুমান দেড়টার দিকে আমাকে উঠে দাঁড়াতে বললো র‌্যাবের দুই সদস্য। কিন্তু নির্যাতনের ফলে আমি সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না। এসময় ‘অভিনয় করছে শালা’ এই মন্তব্য করে মেজর রাশীদ আমার দু’পায়ের উপরে তার পায়ের বুট দিয়ে খিচতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটার মার হয়নি। শালা অভিনয় করছে। কুত্তার বাচ্চা উঠে দাঁড়িয়ে নিজে নিজে হাঁট। নইলে আরও মারবো। শালা তোকে ক্রসফায়ার দিলে ঠিক হবি।’ আমি বলি যে, আমি কোন অভিনয় করছি না প্রকৃতপক্ষে আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং হাঁটতে পারছি না। কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস করতে নারাজ মেজর রাশীদ। মেজর রাশীদ বলেন যে, তুই যতক্ষণ হাঁটতে পারবি না ততক্ষণ মারতে থাকবো। এরপর আমি কষ্ট করে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ানোর ও হাঁটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

মেজর রাশীদ তার বুট পরা পা দিয়ে আমার দু’পায়ে পায়ে খিচতে খিচতে আমাকে একটি রুমে নিয়ে যান। বেলা অনুমান দু’টায় আমার মাথা থেকে কালো কাপড়ের টুপি সরিয়ে চোখ থেকে গামছা খুলে দেয়া হয়। মনে হলো আমি যেন কবরের অন্ধকার থেকে আলোতে এলাম। দীর্ঘ ১৫ ঘন্টার অন্ধকার কবরের জীবন থেকে ফিরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিলাম। র‌্যাব সদস্যরা একটি ফরমে আমার দুই হাত ও দুই হাতের সব আঙুলের ছাপ নিল। একটি সাদা কাগজে আমার নাম লিখে তা আমার বুকে সেঁটে দেয়া হলো। এরপর ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলা হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট ও ছবি তোলার মহড়া শেষে পুনরায় গামছা দিয়ে আমার চোখ বেঁধে আমার মাথায় কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে দেয়া হলো। আমাকে উঠানো হলো একটি মাইক্রোতে। বেলা আনুমানিক তিনটায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় বোয়ালিয়া মডেল থানায়। র‌্যাব আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা চাঁদাবাজি মামলায় আমাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দিতে চেয়েছিল বোয়ারিযা মডেল থানার মাধ্যমে। কিন্তু বোয়ালিয়া থানার পুলিশ র‌্যাবকে জানায় যে, এই মামলায় আকাশ জামিনে আছে তাকে গ্রহণ করা যাবে না। থানায় নেয়ার সময় র‌্যাব সদস্যরা আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘থানায় গিয়ে পুলিশের সামনে সোজা হয়ে হাঁটবি। নইলে তোকে আবার ফিরিয়ে আনবো এবং ক্রসফায়ার-এ মারবো। পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবি আমাকে মারধোর করা হয়নি।’ মনে মনে ভাবি আমাকে মেরে ফেললেও কখনও আমি মিথ্যার আশ্রয় নেবো না। কিন্তু পরক্ষণেই আমার মনের পর্দায় ভেসে ওঠে আমার সন্তান ফিমান ফারনাদের মুখখানি। মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠে সন্তানের কথা ভেবে। দুই চোখ গড়িয়ে ঝরতে লাগলো পানি। চোখের জলে ভিজে গেল সেই ফাঁসির আসামিকে পরানোর কালো টুপির অংশ বিশেষ। আওয়ামী লীগ নেতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে থাকার কারণে থানার পুলিশ আমাকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানালে থানা থেকে র‌্যাব কার্যালয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসে র‌্যাব। এরপর র‌্যাব সদস্যরা বলাবলি করছে যে, আমাকে বাগমারায় নেয়া হবে সেখানে আমাকে একটি অস্ত্র মামলায় চালান দেয়া হবে। আরও শুনি যে, আমার নামে পুঠিয়াতে আরও একটি চাঁদাবাজির মামলা করানো হয়েছে, সেখানেও নিতে পারে। আবার ক্রসফায়ারেও মারা হতে পারে! শেষ পর্যন্ত বিকেল অনুমান পাঁচটার দিকে র‌্যাব আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানায় ৫৪ ধারায় হস্তান্তর করে। এরপর আমার মাথার টুপি সরিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়।

আমাকে থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব সদস্যরা থানা কম্পাউন্ড অতিক্রম করার পরপরই আমাকে বোয়ালিয়া মডেল থানা হাজতে নেয়া হলো। হাজতখানার ভেতরে বিড়ি-সিগারেটের মোথা, থু-থু, কফ, কলার ছালসহ নানান অস্বাস্থ্যকর দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। এই পরিবেশে আমার বমি বমি ভাব হতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই থানার এসআই নূরুজ্জ্মাান আসলেন আমার পাশে। তিনি রাজশাহীর বর্তমান মেয়র জনাব লিটনের চাচা ও আওয়ামী লীগ নেতা জনাব লোটনের করা মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা। পুলিশের এই সদস্য আমার পূর্ব পরিচিত। আমি যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র এবং জিয়াউর রহমান হলে থাকি তখন তিনিও (নূরুজ্জামান) রাবিতে পড়ালেখা করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছাত্রদলের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তা হলো এই নূরুজ্জামান রাজশাহীর সাবেক ছাত্রদল নেতা শাহীন শওকত এর ভাইপো। এসআই নূরুজ্জামান আমাকে অশোভন ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘শালা তুই আওয়ামী-ঘাদানিক, হাসিনা লীগ করিস। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে তুই ছাত্রদল আর শিবিরের বিরুদ্ধে খবর লিখেছিস। এইবার আমি তোকে রিমান্ডে নিয়ে আবার মারবো।’ বোয়ালিয়া মডেল থানা পুলিশ ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ এর সন্ধ্যায় আমাকে জরুরি ক্ষমতা বিধিমালা ২০০৭ এর ১৬ (২) ধারায় রাজশাহীর মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে চালান দেয়। এসআই নূরুজ্জামান পুলিশ পিকআপ এর সাইরেন বাজাতে বাজাতে আমাকে আদালত চত্বরে নিয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য ছিল বোধহয় এই যে ‘ আমাকে একজন দাগী অপরাধী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ হিসেবে গোটা রাজশাহী শহরের মানুষ (বোয়ালিয়া থানা হতে কোর্ট যাবার পথে) কে দেখানো! যা আমার ব্যক্তিগত মর্যাদাহানির শামিল। আমাকে যখন আদালতে নেয়া হয় তখন আদালতে কোন ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন না। আমাকে পুলিশ ভ্যান থেকে দুইজন পুলিশ ধরে নামালেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার পুলিশ ভ্যানে উঠিয়ে আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ও সার্জিক্যাল ওয়ার্ড-৪ এ ভর্তি করে। পরদিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর, ২০০৭ খুব সকালে আমাকে দুইজন বন্দী দুই পাশে ধরে নিয়ে এলেন কেস টেবিলের (কারা বিচারাচালয়) সামনে। সেখানে আমার শরীরের বস্থা অবলোকন এবং আমার কাছ থেকে নির্যাতনের কাহিনী শোনার পরও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আমাকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখার নির্দেশ দিলেন। আমাকে নেয়া হলো আমদানি ওয়ার্ড (একজন মানুষ প্রথম জেলে আসার পর এই ওয়ার্ডেই তাকে নেয়া হয়) এ। আমদানি ওয়ার্ডের বন্দিরা আমার শারীরীক অবস্থা দেখে আমাকে কারা হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য কারা সুবেদারকে অনুরোধ করেন। এরপর কারা সুবেদার আমাকে কারা হাসপাতালে স্থানান্তর করে দেন। কারা হাসপাতালে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত আমি চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে সুস্থ্য হয়ে ওঠার আগেই কারা হাসপাতালের সার্জনকে ঘুষ না দেযার কারণে আমার ফাইল কেটে দেন (সুস্থ্য বলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া)। এরপর আমাকে সিভিল ৬ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই ২৮ দিনের অন্ধকার কারা জীবনের বাকি দিনগুলো কেটেছে আমার। পুলিশ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৮ নভেম্বর আমি জরুরি ক্ষমতা বিধিমালার ১৬ (২) ধারা হতে অব্যাহতি পাই। ওইদিনই আমাকে (গ্রেফতারের মাত্র চার ঘন্টা আগে দায়ের করা) দ্বিতীয় চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিসকেস দায়ের করার মধ্য দিয়ে আমি ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর এই মামলা থেকে জামিন লাভ করি। এরই প্রেক্ষিতে গত ২৪ অক্টোবর, ২০০৭ থেকে ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ পর্যন্ত রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর গত ১৯ নভেম্বর, ২০০৭ রাত আটটায় কারাগার থেকে মুক্তি পাই। মুক্তি পাবার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমার কাছে খবর আসে যে, আমাকে র‌্যাব আবার গ্রেফতার করবে এবং এবার ‘ক্রসফায়ার’ এ হত্যা করবে। এমন এক চরম হুমকির মুখে পরিবারের সদস্যদেরকে উদ্বিগ-উৎকণ্ঠা আর আতংকের মধ্যে রেখে আমি রাজশাহী ছেড়ে পালিয়ে আসি ঢাকায়। এরপর আমি বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস এ ভর্তি হয়ে আমি মানসিক ও শারীরিক চিকিৎসার গ্রহণ করি।

আমার কী দুর্ভাগ্য দেখুন, শুধু আমার পেশাগত কর্মকান্ডের (রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নির্যাতন, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ আর দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী খবর পরিবেশন) কারণে আমার শ্বশুরকে বিগত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেলেন না। শুধু কী তাই, তিনি যাতে স্বতস্ত্রভাবে নির্বাচন করতে না পারেন তার পথটাও বন্ধ করা হয়েছিল কৌশলে। একজন কোটিপতি ব্যবসায়িকে নমিনেশন দিলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনে নামেন এবং আন্দোলনের মুখে তাঁকে নমিনেশন দেয়া হয়। কিন্তু ওটা যে ছিল একটা কৌশল তা বোঝা যায় তাঁকে চূড়ান্ত নমিনেশন না দেবার মধ্য দিয়ে। অথচ ১৯৯১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য এবং রাজশাহী জেলা শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক বিগত ৪৪ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে আসছেন। জনাব তাজুল ইসলাম মোহাম্মদ ফারুক এবং খুলনা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা জনাব হারুন অর রশিদ বহুল আলোচিত মাগুড়ার উপনির্বাচনে কারচুপি জালিয়াতির প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং রাজনৈতিক মামলায় হয়রাণির শিকার হন। আমার শ্বশুরই রাজশাহীতে প্রথম জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। একারণে তাঁকে এবং তাঁরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওয়ার্কাস পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য বর্তমানে সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ রাজশাহীর চারজন সাংবাদিককে বাংলা ভাই ও তার বাহিনী প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহু লোভনীয় অফার পেলেও কখনও আওয়ামী লীগ ছেড়ে যাননি অন্য কোন দলে। যদিও যারা ফেরদৌস আহম্মেদ কোরেশীর সঙ্গে এবং ডিজিফআইয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংস্কারপন্থি হবার পরও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের নমিনেশন পেয়েছেন এমন নজির আছে। এমনকি জামাত নেত্রীর ছেলে এবং জামাত পরিবারের লোককেও আওয়ামী লীগ রাজশাহীতে গত নির্বাচনে দলীয় নমিনেশন দিয়েছিল। শোনা যাচ্ছে, র‌্যাব, ডিজিএফআই, আর্মি এবং রাজশাহীর মাননীয় মেয়র মহোদয়ের চাপেই নাকি আমার শ্বশুরকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। আমরা জানি না এটা সত্য কিনা। কিন্তু যদি সত্য হয়, তবে এটা রাজনীতির জন্য শুভ নয়। এইতো মাত্র কিছুদিন আগে জনাব ইসলামকে কোন কারণ ছাড়াই ন্যূনতম নিয়ম-নীতির প্রদর্শন ছাড়াই রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে বাদ দেয়া হলো। একজন নির্বাচিত সভাপতিকে এভাবে বাদ দেয়ার নজির বোধহয় একমাত্র ’ৎংলী” শাসনের অধীনের সম্ভব! প্রসঙ্গ এটা নয়।

কেন এই নির্যাতন আমার ওপরে?
সম্পূর্ণভাবে পেশাগত কারণেই আমার জীবনকে অন্ধকারের কালোছায়ায় ফেকে দেয়া হয়েছিল। কোন প্রেক্ষাপট আর কোন অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণে আমার ওপর নির্যাতন করা হয় এবং আমাকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে হত্যা করতে চাওয়া হয়েছিল তা এষন বর্ণনা করছি। ২০০৭ সালের ২ মে রাজশাহীর এক সময়ের টপ সন্ত্রাসী বেনজিরকে তার নিজ বাড়ির শয়নকক্ষে স্ত্রী ও শিশু কন্যার সম্মুখে র‌্যাব সদস্যরা গুলি করে এবং তাকে অস্ত্র দিয়ে চালান দেয় আদালতে। একই মাসের ১৬ মে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিচালকের (তৎকালীন) কক্ষে র‌্যাব সদস্যদের পিটুনিতে হা-পা ভেঙ্গে যায় কারারক্ষী সাহেবুল ইসলামের। এর দু’দিন পর ১৮ মে মহানগরীর ছোট বনগ্রামের লিচু বাগান পাহারা দেবার সময় কথিত অপহরণ নাটকের জের ধরে র‌্যাব সদস্যরা পিটিয়ে হত্যা করে ওয়ার্কাস পার্টির ওয়ার্ড সভাপতি কামরুল ইসলাম ওরফে মজনু শেখকে। জরুরি অবস্থার মধ্যেও এই মজনু হত্যাকান্ডের ঘটনায় র‌্যাবের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে রাজশাহীর মানুষ। জরুরি অবস্থা ভেঙ্গে হাজারো সাধারণ নারী-পুরুষ ও জনতা রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে থাকে। জনতার বাঁধভাঙ্গা জোয়ারে জরুরি অবস্থা ভেসে যায়। পুলিশ, র‌্যাব জনতাকে দমাতে পারেনি সেদিন রাজশাহীতে। সেই ঘটনাগুলির ওপর আমি রিপোর্ট করেছি। আমিই একমাত্র সাংবাদিক (বাংলাদেশে) যে র‌্যাবের বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের ঘটনার ওপর টিভি রিপোর্ট করেছি এবং প্রথম। ফলে র‌্যাব আমাকে তাদের শত্রুর তালিকায় যুক্ত করে। আমার নামে চাঁদাবাজির মামলায় যেখানে পুলিশ এক মাসের মধ্যেই চার্জশিট দেয় সেখানে র‌্যাবের বিরুদ্ধে মজনু হত্যা মামলাটির চার্জশিট দীর্ঘ চার বছরের অধিক সময় পরও দাখিল করেনি পুলিশ। বরং রাজশাহীর মেয়র ও র‌্যাব এখনও মজনু হত্যা মামলাটি আপোষ করে নেবার জন্য মজনুর পরিবারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন বলে খবর পাচ্ছি।

রাজশাহীর বহুল আলোচিত একটি এস্টেট ‘দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেট’। এই এস্টেট পরিচালনায় দুর্নীতির অভিযোগ রাজশাহীর কারও অজানা নয়। এই এষ্টেটটি জনাব লিটন সাহেবদের পারিবারিক। দৈনিক সংবাদ’ এ ২০০২ সালের ৯ এপ্রিল ‘রাজশাহীর দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেট ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়োগ করা হয়েছে নতুন মোতাওয়াল্লী’ ও ২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর ‘দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেট রাজশাহীতে নয়া মুতাওয়াল্লীকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ’ শীর্ষক দু’টি খবর প্রকাশিত হয়। যা ছিল আমার পরিবেশিত। সিএসবি নিউজ’ এ ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল উত্তরাঞ্চলে ওয়াকফ্ এস্টেটগুলো বেহাত হয়ে যাচ্ছে শিরোনামে আমার পরিবেশিত একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। যাতে ওঠে আসে রাজশাহীর দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেট পরিচালনায় দুর্নীতির অভিযোগ। এছাড়া সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ এ ২০০৩ সালের ৩০ জুন সংখ্যায় রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি গতি পাচ্ছে না শীর্ষক শিরোনামে, দৈনিক সংবাদ এ ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঘা উপজেলা আওয়ামী লীগ সম্মেলন স্থগিত বিএনপি-যুবদল ক্যাডারদের সহায়তায় দলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর এক গ্রুপের হামলা কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও জেলা সাধারণ সম্পাদকসহ ২০জন লাঞ্ছিত, একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর কোন্দলে বিপর্যস্ত রাজশাহী আওয়ামী লীগ, ২০০৫ সালের ১৯ মে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগকে পারিবারিকীকরণের প্রক্রিয়া চলছে শীর্ষক প্রতিবেদনগুলি আমার নামে প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে জনাব লিটন আমার ওপর ক্ষুব্ধ হন।

আলোচিত ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তনের পর দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। এই জরুরি অবস্থার সুযোগ নিয়ে দুই চাচা-ভাতিজা (আওয়ামী লীগ নেতা মেয়র লিটন ও আওয়ামী লীগ নেতা লোটন) এবং র‌্যাব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করেন। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দুর্নীতির দায়ে দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ্ এস্টেটের মোতাওয়াল্লী পদ থেকে অপসারিত আবদুস সামাদের পুত্র মাহফুজুল আলম লোটনকে বাদি করে পরিকল্পিতভাবে আমার নামে চাঁদাবাজির সাজানো অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। জনাব মাহফুজুল আলম লোটন ২০০১ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং পেশায় একজন ঠিকাদার। ২০০০ সালের ৪ মার্চ ‘দৈনিক সংবাদ’ এ ‘ঘটনাস্থল রাজশাহী সন্ত্রাসীদের ভয়ে দু’টি পরিবার ঘর থেকে বেরুতে পারছে না। মামলা হয়েছে পুলিশ চুপচাপ’ শীর্ষক শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। এই রিপোর্টটি ছিল আমার পরিবেশিত। এরই প্রেক্ষিতে জনাব লোটন আমাকে শায়েস্তা করতে আমার ওপর সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দেন। কিন্তু তার ক্যাডাররা ভুল করে আমার পরিবর্তে দৈনিক যুগান্তরের তৎকালীন প্রতিনিধি জনাব উত্তম কুমার দাসকে আহত করে। এ ঘটনার পর আমি বোয়ালিয়া থানায় জিডি করি (জিডি নং-৩১০, তারিখ-০৭/০৩/২০০০)। জনাব লোটন প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত। তিনি রাজপাড়া থানার মামলা নম্বর-১০, তারিখ-৭/১০/২০০৭, ধারা-৪৬৬/৪৬৮/৪৭১/৪০৬ দ.বি. এর চার নম্বর আসামি। রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় ২০০৭ ২০ জুন জনাব লোটনের দাখিল করা এজাহার পুলিশ জিডি হিসেবে রেকর্ড করে (জিডি নং-১১৬০, তারিখ-২০/৬/২০০৭)। এর দীর্ঘ প্রায় চার মাস পর ২ অক্টোবর, ২০০৭ একই থানায় জিডির হুবহু একটি কপি এজাহার হিসেবে দাখিল করা হয়। যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করে পুলিশ (মামলা নং-২, তারিখ-২/১০/২০০৭, ধারা-৩৮৫/৩৮৬ দ.বি.)। এই মামলায় ১৬ অক্টোবর, ২০০৭ আমি উচ্চতর আদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন আগাম জামিন লাভ করি। ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টার পর সিভিল পোশাকধারী র‌্যাব সদস্যরা আমাকে গ্রেফতার করে আমার উপশহরস্থ ভাড়া বাসা হতে। আমাকে গ্রেফতারের আগে আমার নামে পুঠিয়া থানায় দ্বিতীয় চাঁদাবাজির মামলা করানো হয়। মামলা নম্বর- ১৩, তারিখ-২৩/১০/২০০৭, ধারা-৩৮৫/৩৮৭/৫০৬ দ.বি.। এই মামলার বাদী স্থানীয় বিএনপি সমর্থক কোটিপতি আবদুল জলিল। ২০০২ সালের ১৯ এপ্রিল তার ছেলে ছাত্রদল ক্যাডার হারুন কিশোরী শিউলি ধর্ষণের ঘটনায় জনতার হাতে আটক হয়েছিলেন। এই ধর্ষণ মামলা আপোস করার জন্য বাদি আওয়ামী লীগ কর্মী আবদুল হালিমকে চাপ দেয়া হয়। কিন্তু মামলা আপোস করতে ব্যর্থ হয়ে জিলাপির ভেতরে বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হালিমকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এই চাঁদাবাজি মামলার বাদী জনাব জলিল পুঠিয়ার চাঞ্চল্যকর শিউলি ধর্ষণ মামলার বাদীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার অভিযোগে দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি (পুঠিয়া থানার মামলা নং-৭, তারিখ-৯/৫/২০০৫, জিআর নং-৯৯/২০০৫, অভিযোগপত্র নং-১৩৬, তারিখ-১২/৮/২০০৫, ধারা-৩০২/৩৪ দ.বি.)। ২০০২ সালের ১৯ এপ্রিল সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ধর্ষণের ঘটনা এবং আবদুল হালিম হত্যাকান্ড নিয়ে ‘দৈনিক সংবাদ’ এ বহু খবর পরিবেশন করেছি আমি। পুঠিয়া থানা বিএনপির সভাপতি ও পুঠিয়া পৌরসভার সাবেক প্রশাসক আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির তৃতীয় মামলাটি করেন গত ২৫ নভেম্বর। পুঠিয়া থানার মামলা নম্বর- ২৮, তারিখ-২৫/১১/২০০৭, ধারা-৩৮৫/৫০৬ দ.বি.। এই মামলার বাদী একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা প্রচেষ্টা, ভাংচুর ও চাঁদাবাজি মামলার অন্যতম প্রধান আসামি। জনাব লতিফের বিরুদ্ধে পুঠিয়া থানার মামলা নম্বর-৩, তারিখ- ২/৭/২০০৭ (জিআর-১৫২/২০০৭) ধারা-১৪৭/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩৮৫/৪২৭/১১৪ দ.বি.। পুঠিয়ায় তাড়ির ভাটি উদ্বোধনের অভিযোগে জনাব লতিফের বিরুদ্ধে আমার পরিবেশিত একটি রিপোর্ট ‘দৈনিক সংবাদ’ এ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৩ সালের ২৩ আগস্ট। এরই প্রেক্ষিতে জনাব লতিফের রাজনৈতিক সহচর মমতাজুল আলম আমার নামে ও ‘সংবাদ’ এর সম্মানিত সম্পাদক বিশিষ্ট সাংবাদিক জনাব বজলুর রহমান (প্রয়াত) এর নামে একটি মানহানি মামলা করেছিলেন। যে মামলায় আমরা আদালতের মাধ্যমে খালাস পেয়েছি। রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ শিরোনামে বহুল আলোচিত রিপোর্টটি ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ’ এ প্রকাশিত হয়েছিল।

র‌্যাব আমাকে গ্রেফতারের মাসখানেক আগে আরেকটি ঘটনা ঘটে রাজশাহীর আদালতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ডিজিএফআই তৎকালিন কর্মকর্তা শওকত আলী ও মতিহার থানার ওসি খোন্দকার ফেরদৌস আহম্মেদের করা মামলার চার্জ গঠনের দিন থেকেই আমি পেশাগত প্রয়োজনে প্রতিদিনই আদালতে যাই এবং সংশ্লিষ্ট মামলার সাক্ষী, জেরা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আদালতের ভেতরেই থাকতাম। তারই ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকালে আইন-শৃঙ্খলা বিঘœকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আদালতের তৎকালিন বিচারক মেট্রোপলিটন ম্যাজিষ্ট্রেট এস এম ফজলুল করিম চৌধুরীর আদালতে গিয়েছিলাম। সকাল থেকেই সাক্ষী তথা বাদী ওসি ফেরদৌসের জেরা চলছিল। এ অবস্থায় বেলা দু’টায় ম্যাজিষ্ট্রেট কুড়ি মিনিটের জন্য আদালত মূলতবি করেন। আমি আদালতেই বসেছিলাম। এক পর্যায়ে পুলিশের সিএসআই (তৎকালিন) কামালউদ্দিনসহ চার/পাঁচজন পুলিশ সদস্য এসে আমাকে আদালত থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখালাম। কিন্তু তারপরও পুলিশ সদস্যরা আমি টেনে-হিঁচড়ে গলা ধাক্কা দিয়ে আদালতের ভেতর থেকে বাইরে বের করে দেন। (সূত্র: দৈনিক ভোরের কাগজ, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৭, “রাজশাহীর আদালতে পুলিশের হাতে সাংবাদিক লাঞ্ছিত”)। রাজশাহীর মেয়র লিটনের চাচার করা হয়রাণিমূলক মামলায় হাইকোর্ট থেকে আমার পক্ষে জামিনের আবেদন মুভ করেন তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব। এঘটনায় জনাব লিটন ক্ষুব্ধ হয়ে মামুন সাহেবকে জবাবদিহি করে বলেছিলেন যে ’উনি কেন আমার পক্ষে আদালতে লড়েছেন’?

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আমাকে সমস্ত বন্দি দেখেছেন, তারাও সাক্ষ্য দিতে পারবেন আমার শারীরীক অবস্থা সম্পর্কে। একইসময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান (বর্তমানে লন্ডনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত), আবদুস সোহবান (রাবির বর্তমান ভিসি), মলয় ভৌমিক, গোলাম সাব্বির সাত্তার, চৌধুরী সারওয়ার জাহান, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস (বর্তমানে পিআইবির মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত), সেলিম রেজা নিউটন, আবদুল্লাহ আ-মামুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম মন্টু, রাজশাহীর তৎকালিন মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী শিল্প ও বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি লুৎফর রহমানও ছিলেন রাজশাহী জেলে। তাঁরা সবাই আমার অবস্থা সচোক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন। এছাড়া শত শত বন্দি এবং পুলিশ, র‌্যাব ও রাজশাহী কারাগারে ওই সময়ে কর্মরত বহু দেশপ্রেমিক সৎ কর্মকর্তা ছিলেন যাঁরাও সাক্ষ দিতে পারেন।

বাংলাদেশ পুলিশ-র‌্যাবেতো আর সবাই অমানবিক-হিং¯্র নন। বহু ভালো মানুষও আছেন সেখানে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির রিপোর্টেও আমার ওপরে যে বর্বরতা চালিয়েছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার প্রমাণ আছে। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে মুক্ত হবার পরপরই আমি পক্স এ আক্রান্ত হয়েছিলাম। যার চিহ্ন এখনও আমার শরীরে রয়েছে। আমি যখন র‌্যাব ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারিদের হাত থেকে জীবন বাঁচাতে ঢাকায় গিয়ে আত্মগোপন করেছিলাম। ঢাকা থেকেই আমাকে অসুস্থ্য শরীরে দেশ ছাড়তে হয়।

যাহোক অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল (ইউকে), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ(ইউএসএ), এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন(হংকং), গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেনস(নেদারল্যান্ডস), রিপোটার্স উইথআউট বর্ডারস(ফ্রান্স), কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিষ্টস(নিউইয়র্ক), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিষ্টস(বেলজিয়াম), ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনষ্টিটিউট(ভিয়েনা), আইন ও শালিশ কেন্দ্র(বাংলাদেশ), বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস(বাংলাদেশ), বাংলাদেশ ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিষ্টস (বাংলাদেশ), বাংলাদেশ সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট জার্নালিজম এন্ড কমিউনিকেশন(বাংলাদেশ) এবং ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টসহ বিশ্বের বহু সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টেও আমার ওপর নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যাবে।

পরিশেষে একটা বাক্য লিখে আমি আমার লিখিত বক্তব্যের উপসংহারে চলে যাবো। একদিন দৈনিক সংবাদ কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সম্পাদক বজলুর রহমান আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তুমি সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রু দেখেছো? তোমার অবস্থাটা ঠিক সেইরকমই। গণশত্রুদের বিরুদ্ধে লেখালেখি করলে তোমাকেই সমাজের শত্রুরা গণশত্রু আখ্যা দিয়ে তোমার নামে বদনাম ছড়াবে। এটা স্বাভাবিক, বিচলিত হয়ে না। অন্ধকার একসময় কেটে যাবে। আজ বজলু ভাইয়ের কথা খুব বেশি মনে পড়ছে। আসলেই আমি যেন সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রু! আমার নামে রাষ্ট্র জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়ে বলেছে আমি নাকি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ! এই রাষ্ট্রের জন্যই কী ৩০ লাখ মানুষের জীবন আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারিয়েছি আমরা বাঙালিরা।

হায়রে রাষ্ট্র! আমাকে যারা অন্যায়ভাবে মারলো, সমাজে আমার মর্যাদা ও সম্মানহানি ঘটালো, যাদের কারণে আমি স্বদেশভুমি ছাড়লাম, জাতিসংঘে যারা মিথ্যা বক্তব্য লিখে পাঠালো তাদের কী আমি বিচার চাইতে পারবো না? আমিতো কেবল বঞ্চিত, নিরন্ন-নির্যাতিত-নিষ্পেষিত মানুষ যাঁরা নানামুখী অন্যায় আর অন্যায্যতার বাতাবরণে আবদ্ধ যাঁদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে না আইন-বিচারালয় পর্যন্ত, তাদের পক্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি মাত্র। একজন সাংবাদিক, নাগরিক হিসেবে কী আমার সামাজিক কোন দায়বদ্ধতা থাকতে পারে না? সেই দায় থেকে কিছু একটা করার প্রচেষ্টার জন্যই কী রাষ্ট্র কাউকে নির্যাতন করতে পারে কিংবা কারো জীবন কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে কিংবা কারও নামে মিথ্যা অপবাদ-কলংকের বোঝা চাপাতে পারে? রাষ্ট্র নিজে কখনও কিংবা আইনের রক্ষ কখনও আইন, আদালত, সংবিধান, আন্তর্জাতিক বিধান, নিয়ম-নীতি লংঘণ করতে পারে কী? এমন হাজারো প্রশ্ন আমার যেমন আছে, তেমনি দেশের প্রতিটি নির্যাতিত মানুষেরও আছে, যাঁদের কথা বলার জায়গা নেই। বিনাবিচারে হত্যা-নির্যাতন সবকিছুই তাঁরা নিরবে সয়ে যাচ্ছেন এবং কষ্ট আর যন্ত্রণায় হৃদয়কে রক্তাক্ত করছেন প্রতিমুহুর্তে। আমাদের মানবাধিকার কমিশনের শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যানসহ দেশের কিছু মানুষ প্রতিদিন চিৎকার করছেন মানবাধিকার লংঘণ বন্ধ করার জন্য। কিন্তু সেই আওয়াজ কী রাষ্ট্রের কানে পৌঁছুতে পারছে?

আমি বিচার চাই, ন্যায়বিচার। সমাজে শান্তি, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, সাম্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব নির্যাতনকারিকে আইনের আওতায় আনা জরুরি। একইসঙ্গে আমার প্রত্যাশা দেশে বিনাবিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ হোক, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ভিত্তি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হবে-নির্যাতনকারি-খুনিরা শাস্তি পাবে এবং মুক্ত সাংবাদিকতার পথে সকল অন্তরায় দূরীভূত হবে একজন সাংবাদিক হিসেবেতো এতটুকু চাওয়াতে দোষের কিছু নেই। সুদূর প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশ, দেশের মানুষের কল্যাণ কামনা করি। দেশের মানুষ সুখে-শান্তিতে থাকলে, দেশে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক চর্চার উন্নতি ঘটলে বিদেশের মাটিতে বাঙালি হিসেবে আমাদের লজ্জা কিছুটা হলেও কমবে।

বিনায়বনত-

আপনার বিশস্ত

(জাহাঙ্গীর আলম আকাশ)
সম্পাদক
ইউরো বাংলা

Advertisements

ভয়েস অব আমেরিকার জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘হ্যালো ওয়াশিংটন’র কাছে একটি প্রশ্ন?


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ আমি নরওয়ের যে শহরে থাকি এখানে এখন দিন রাত ২৪ ঘন্টাই অন্ধকার বা রাত। সূর্য্যিমামার দেখা মেলে না। উনি এখন অনেক দূরে আমাদের কাছ থেকে। এখানে বাঙালি ভাষাভাষী মানুষও বলতে গেলে নাই। হাতে গোনা দু’একটি পরিবার এখানে আমরা আছি যারা বাংলাদেশ থেকে। এরমধ্যে আমার পরিবার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একটি কী দু’টি পরিবার আছে। ফলে বাংলায় কথা বলারও তেমন সুযোগ নেই নিজ পরিবার ছাড়া। এই অভাবটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত করে পূরণ হয় বাংলা সংবাদপত্র ও রেডিও-টিভির সংবাদ পড়ে বা শুনে।
২০০৯ সালে জার্মানিতে আসার পর থেকেই আমি ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা অনুষ্ঠান শুনছি। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ভয়েস অব আমেরিকার প্রেমে পড়ে গেলাম। ভয়েস অব আমেরিকার অনুষ্ঠানগুলি বেশ সাহসী, সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশনা। যেখানে নতুনত্ব ও মুন্সিয়ানা লক্ষ্য করার মতো। সুদূর প্রবাসে থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কণ্ঠ শুনে মনে হয় যেন বাংলাদেশই আছি। অনেক চেনা মুখ, পরিচিত কণ্ঠ যখন ভেসে আসে তখন আরও বেশি ভালো লাগে।
যাহোক, ভয়েস অব আমেরিকার জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান হ্যালো ওয়াশিংটন। এবারকার হ্যালো ওয়াশিংটনের বিষয় হলো “ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার এবং সম্ভাব্য ফলাফল “। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। এজন্য শ্রোতাদের কাছ থেকে প্রশ্ন আহবান করা হয়েছে ফেসবুকে ভয়েস অব আমেরিকার একাউন্ট থেকে। ভয়েস অব আমেরিকার প্যানেলের কাছে আমার প্রশ্ন আগাম লিখে রাখলাম ফেইসবুকের পাতায়। মিডিয়া জনমত গঠনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যেভাবে আমাদের বাংলার মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশী-বিদেশী বহু মিডিয়া মহান দায়িত্ব পালন করেছিল বিশ্বজনমত গঠনে। সমাজে শান্তি, গণতন্ত্র এবং ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।
আমার বিশ্বাস প্রিয় ভয়েস অব আমেরিকার এই অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয়। আয়োজকদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা রইলো। একই সঙ্গে শ্রদ্ধেয় প্যানেলসহ ভয়েস অব আমেরিকার সববাইকে জানাই শুভ বড়দিন ও ইংরেজী নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
প্রিয় প্যানেলের কাছে আমার প্রশ্ন।কারণে-অকারণে যুদ্ধ, আগ্রাসন, দখল, পাল্টা দখলের কারণেই মূলত: আজ গোটা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে কারণ বা অজুহাতে ইরাকে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় সভ্যতা, নগর ও মানবতাকে ধবংস করা হলো, তা কী প্রমাণিত হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে? যদি না হয়ে থাকে তাহলে বিনা কারণে যুদ্ধ, ধবংসলীলার জন্য যারা দায়ী তাদের কী শাস্তি হবে ইহজনমে? অনেকেই মনে করেন আরব তথা মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকায় যত যুদ্ধ চলেছে বা চলছে তার পেছনে নাকি তেল এবং অন্যান্য আর্থিক স্বার্থই মুখ্য। শ্রদ্ধেয় প্যানেলও কি তাই মনে করেন? এই বিশ্বসমাজ কীভাবে বা কিসের বিনিময়ে যুদ্ধের হাত থেকে মানব সভ্যতা, সম্পদ এবং নগর ও সভ্যতা বাঁচাতে পারেন? ধন্যবাদ বিজ্ঞ প্যানেল ও ভয়েস অব আমেরিকাকে।
আশা করি আমার এই প্রশ্নটি জায়গা পাবে ভয়েস অব আমেরিকার আজকের অনুষ্ঠানে। বিজ্ঞ প্যানেল প্রশ্নের সাদামাটা ও রাজনৈতিক নেতার ন্যায় উত্তর না দিয়ে সমস্যার গভীরে গিয়ে সত্য ও বাস্তবনিষ্ঠ হয়ে উত্তর জানাবেন শ্রোতামন্ডলির কাছে। ছবি-ভয়েস অব আমেরিকার ফেইসবুক একাউন্ট থেকে নেয়া। editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/

“সিপিবি কী জনগণের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে চাইছে?”



জাহাঙ্গীর আলম আকাশ
॥ সিপিবি তৃতীয় শক্তি হতে চায় না, তারা জনগণের বন্ধু হতে চায় না। তাই তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুকে সামনে এনে আবারও আওয়ামী লীগের সাথে গাঁটছড়া বাঁধলো। বাংলাদেশে এই চিহ্নিত ক’জন যুদ্ধাপরাধীই কী সব, আর কোন যুদ্ধাপরাধী নেই সেখানে? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদেরকে কোলে তুলে নেবে, এটা কী অস্বাভাবিক কিছু?
বিপদে পড়লে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির ঐক্য চায়, মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধাপরাধীর নামে কৌশল গ্রহণ করে, সেটা বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর থেকে দেখা যাচ্ছে। সুবিধাবাদীরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করারও সাহস দেখায়নি, বরং ছাত্র ইউনিয়ন সেটা দেখিয়েছিল, নিহত দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহা তার প্রমাণ। আওয়ামী লীগতো নিজেই ঐক্যবদ্ধ নেই। সারাদেশে এক ভয়ানক অস্থিরতা, নিশ্চলতা, নিরবতায় ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন আওয়ামী লীগের লাখ লাখ ত্যাগি নেতাকর্মী, যাঁরা রেহানা, জয় আর হাসিনার বাণিজ্যিক মানসিকতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছেন।
বিগত জাতীয় নির্বাচনে যে মনোনয়ন বাণিজ্য তাঁরা যৌথভাবে করেছেন তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক মহাবিপদ! যার খেসারত আগামিতে আওয়ামী লীগ দেবে, সাথে সাথে দেশের মানুষকেও তা দিতে হবে আওয়ামী লীগের ভুলের কারণে। আওয়ামী লীগ কী সত্যি সত্যিই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়? নাকি তারা বিএনপির ষড়যন্ত্রের নামে নিজেরাই এই কুলাঙ্গারদের বিচার করতে চাইছে না অত্যন্ত কৌশলে!
দেশের সাধারণ মানুষ কিন্তু সকলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চান মন ও হৃদয় থেকেই। তারা বিচারের নামে কোন রাজনৈতিক খেলা দেখতে চায় না। ৩০ লাখ মানুষের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম। এই দুইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা দুষ্টু ও দুর্বৃত্ত রাজনীতির কাছে কোন বিষয় না হতে পারে। কিন্তু দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সাথে কোন বেঈমানি বা বিশ্বাসঘাতকতা বরদাশত্ করবে না।
বাংলাদেশে রাজনীতি ও অর্থনীতির আমূল সংস্কার জরুরি। সেটা বিএনপি বা আওয়ামী লীগকে দিয়ে সম্ভব কি? এই পরিবর্তন করতে চাইলে সাচ্চা দেশপ্রেমিক তৃতীয় শক্তির অভ্যুত্থান চাই। সিপিবি কি সেই জায়গায় যেতে চায় না? নাকি আপদ আর বিপদের মধ্যে থেকেই জনগণের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনতে চাইছে তারা? আমার মতো ক্ষুদ্র জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এটা বুঝে ওঠা বড়ই কঠিন! চলমান রাজনীতি ও অর্থনীতির পরিবর্তন ছাড়া বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায় কী? ছবি-গুগল থেকে নেয়া। editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/

র্নিবাচিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসন!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমার প্রিয় দেশ বাংলাদেশ তার জন্মের ৪০তম বছর পূণর্ করলো মাত্র একদিন আগে। একটি দেশ তার স্বাধীনতার চার দশক অতিক্রান্ত করা কিন্তু কম সময় নয়। যে দেশটি তার স্বাধীনতা অর্জনের জন‍্য ৩০ লাখ মানুষকে এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারিয়েছে সেই দেশটির মানুষ আজও চোখের জল ফেলেন দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমোনোর নিশ্চয়তাটুকু পাবার জন‍্য। হায়রে দুবৃর্ত্তায়নযুক্ত রাজনীতি! যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নেও জাতি বিভক্ত। সর্বগ্রাসী অনৈতিকতা, দুনর্ীতি আর সংঘাতময় রাজনীতির কারণে সমস্ত পেশাজীবী বিভক্ত রাজনৈতিক দুই শিবিরে। মুক্তিযোদ্ধারা রিকশা চালিয়ে সংসার সংগ্রামে রত। আর নিজামী-মুজাহিদদের গাড়িতে শহীদের রক্তে রাঙানো পতাকা উড়ে! ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা পায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। সরকার দলীয় মন্ত্রি-সংসদ সদস‍্যরা রাষ্ট্রীয় সফরের নামে সফরকে দলীয় ও পারিবারিক সফরে পরিণত করে কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের পরিশ্রমের টাকার লোপাট করে চলেছে!
১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত‍্যা দিবস। বাংলাদেশ দিনটিকে শহীদ বুদ্ধিজীবী দবস হিসেবে পালন করে। এর দুইদিন পর ১৬ ডিসেম্বর দেশটি পূণর্ করলো স্বাধীনতার ৪০ বছর। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশর বিজয় দিবস। স্বাধীনতার চার দশক অতিক্রান্ত। কিন্তু স্বাধীনতার যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং চেতনা তা পূরণ হয়নি আজও। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামী লীগ এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের লালনকারী বিএনপি উভয় দলই প্রমাণ করেছে তারা একটি পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ব্যর্থ। কালোটা ও ব্যবসানির্ভর সংসদ, সর্বগ্রাসী দুর্নীতির সরব উপস্থিতি আর সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবেই দেশের ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষ আজ চরম বৈষম্য ও অবিচারের যাতাকলে পিষ্ট। এই দুই দলকে দিয়ে দেশে আগামি ১০০ বছরে বড় ধরণের কোন ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করার মতো শত-সহস্র কারণ আছে। এই প্রজন্মের আমরা কী আশার আলো দেখতে পারবো কোনদিন? আশাবাদিতার ভানকারি অথবা অন্ধ রাজনৈতিক কমর্ী হয়ত বলবেন বাংলাদেশ এগুচ্ছে! কিন্তু তার প্রকাশ কিসে তার কোন সৎ জবাব তারা দিতে পারবেন কিনা তা নিয়েও সন্দেহ করা যায় অনায়াসেই।
আমার এক রাজনৈতিক বন্ধু হাসান তারেক বাংলাদেশের একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন সম্প্রতি। তিনি লিখেছেন, ‘৪০ বছর বয়সী বাংলাদেশে বিজয়োৎসব কার জন্য? ১৯৭২ সালে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ছিল ১৯.৫%। আর বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২% এর উপরে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে মাত্র ২২ পরিবার ছিল কোটিপতি। সেখানে ৭ জন ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের। ১৯৭৫ সালে বিভিন্ন ব্যাংকে যাদের হিসাব বা অ্যাকাউন্ট ছিল তাদের মধ্যে কোটিপতি ছিলেন মাত্র ৪৭ জন। আর ২০১১ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যে বলা হচ্ছে, দেশে এখন ২২ হাজার ২৩২ জন কোটিপতি রয়েছে। ওই হিসাবে ধরা পড়েনি এ রকম আরও কয়েক হাজার কালো টাকার মালিক চোরাচালানি ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতি-আমলা-মাস্তান-চাঁদাবাজ। যাদেরকে যোগ করলে এ দেশে কমবেশি ৫০ হাজারের মতো কোটিপতির সৃষ্টি হয়েছে বলা চলে। জাতিসংঘ ঘোষিত দারিদ্র্যসীমা ১.২৫ ডলার অনুযায়ী ২০১১ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট কোটি।’
এদিকে জামর্ানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মসয়ুদ মান্নান বলেছেন সতি‍্যকার অর্থেই ভালো বন্ধুরাষ্ট্র জার্মানি। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার জার্মান সফর এবং জার্মান রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিয়ান ভুলফ’র বাংলাদেশ সফর নিয়ে মান্নান ডয়েচেভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেন। ‎তাঁর এই মন্তব‍্য প্রসঙ্গে আমার মনে একটা প্রতিক্রয়ার জন্ম নিয়েছে। সেটি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। এই বন্ধুত্বকে যদি ব‍্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের পরিবর্তে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে লাগানো যেতো”! মানবাধিকারের উন্নয়ন এবং গার্মেন্টসসেক্টরের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতেব্রত আমাদের মা-বোন, ভাই-বাবাদের ন‍্যায‍্য মজুরি প্রদান করার জন‍্য জার্মানি অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে আসছে। সেটাতো বাস্তবায়ন করা হয়নি, এটা পূরণে কারও ইচ্ছে আছে বলেও কোন লক্ষ‍্যণ দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জার্মান-বাংলাদেশের যে সম্পকর্ তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব‍্যক্তি-পরিবার ও দলতন্ত্রের উপরে ওঠে সাচ্চা দেশপ্রেম দেখাতেও পুরোপুরি ব‍্যর্থ। এর দায়ভার মিডিয়া, নাগরিক সমাজ, আমি, আপনি, হাসিনা-খালেদা কেউই এড়াতে পারি কী? আসল কথা হলো বাংলাদেশে নামেই গণতন্ত্র চলছে। বাস্তবে তার কোন লক্ষ‍্যণ নেই। সেখানে মূলতঃ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর থেকে সামরিক স্বৈরতন্ত্র আর নির্বাচিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনই চলছে! এই অশুভ অবস্থা থেকে জনগণের পরিত্রাণের উপায় কী? ছবি ইন্টারনেট থেকে। editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/

প্রসঙ্গ: “দ্য পলিটিক্যাল প্রস্টিটিউট অব বাংলাদেশ”


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ও বিতকর্িত এক রাজনীতিক হলেন মওদুদ আহমদ। পেশায় একজন আইনজীবী এবং ব‍্যারিস্টার ডিগ্রিধারী। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করতেন। শুধু তাই নয় এই মওদুদ আহমদই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র ব‍্যক্তিগত সহকারিও ছিলেন। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান’র আমলে মওদুদ মন্ত্রিত্ব পান। মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার হত‍্যাকান্ডের পর আরেক জেনারেল এইচ এম এরশাদ’র আমলে মওদুদ প্রধানমন্ত্রি এবং ভাইসপ্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। পরে এরশাদের দল ছেড়ে আবার বিএনপিতে ফেরেন। তখনও গুরুত্বপূণর্ আইনমন্ত্রির দায়িত্ব পান জিয়া পত্নী খালেদার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে।
এই বহুরুপী মানুষটির সম্পকর্ে ফেইসবুকে একটা মন্তব‍্য পড়লাম ১ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে। অষ্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাঙালি সাংবাদিক ফজলুল বারী এই মন্তব‍্যটি লিখেছেন। “দ্য পলিটিক্যাল প্রস্টিটিউট অব বাংলাদেশ” এই মন্তব‍্যের ওপর আমি ছোট্র একটা মত লিখেছিলাম ফেইসবুকে।
আমি লিখেছিলাম, “বারী ভাই, যারা শুধু দল বদল, সুবিধা আদায় বা মিথ‍্যা কথা বলেন তারাই কী কেবল রাজনৈতিক “বেশ‍্যা”? যারা টাকার বিনিময়ে কালো টাকার মালিকদের দলীয় মনোনয়ন দেন কিংবা গণতান্ত্রিক পন্থাকে দল ও সরকার পরিচালনায় কাজে না লাগিয়ে ব‍্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে অত‍্যধিক গুরুত্ব দেন/ তারা কী রাজনৈতিক “বেশ‍্যা” নন? এক্ষেত্রে বড় দুই রাজনৈতিক দলের কর্ণধারদের বিষয়ে আপনি কী লিখবেন? মাফ করবেন আমাকে!”
পাল্টা মত জানিয়ে বারী ভাই আরও লিখেছেন, “বড়দের অনেক তকমা আছে, কিন্তু মওদুদের বেশ্যা তকমাটি কেড়ে নেবার অধিকার কারো নেই, আর যারা টাকার বিনিময়ে নমিনেশন দেয় তাদের কথা বলতে গেলে উপরে থু থু ছোঁড়ার মতো তা দেশের মানুষের ওপরও চলে আসবে। কারন জেনেশুনে ওদের ছাড়া আর কাউকে ভোট দেয় না দেশের মানুষ। আইভীর দৃষ্টান্ত যত্রতত্র নেই–”
প্রতিউত্তরে আমি লিখেছি, “সবকিছুর মূলে দুনর্ীতি আর দুবৃর্ত্তায়নযুক্ত রাজনীতি! আপনি মানেন কিনা জানি না। ব‍্যতিক্রম আছে সত‍্য বটে। তবে এই কলুষিত রাজনীতির চৌহদ্দির মাঝে জনতাকে বন্দি করে ফেলা হয়েছে। কাজেই সাধারণ মানুষকে দুষে লাভ কি? আইভিরা ব‍্যতিক্রম, কারণ সেখানকার পরিস্থিতিটা এবার একেবারেই অন‍্যরকম। এবং আপনার কথানুযায়ীই বলা যায়, জনগণ সবসময় সঠিক কাজটিই করেন যদি তাদের কাছে অপশন থাকে। যেমনটি তারা নারায়ণগঞ্জে বীরত্বের সাথে দেখিয়ে দিলেছেন। বড় বড় নেতা-নেত্রী যারা সন্ত্রাসের রাজাদের পছন্দের লোককেই নমিনেশন দিয়েছিল। দেশের রাজনীতি ঠিক ট্রাকে আসলে সবকিছুই আপনাআপনি সঠিকভাবে চলবে বা চলে আসবে। এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই আমার। যাহোক, আপনি অভিজ্ঞ মানুষ, সাংবাদিক, লেখক। আমি একটা নাদান নেহায়তই ছোট একটা মানুষ যার কোন গুণ নেই। তবুও বলবোগোটা সমাজ ব‍্যবস্থাটাকেই পচিয়ে দেয়া হেয়ছে বা হচ্ছে, সেটা গণতন্ত্র রক্ষার নামে কিংবা ব‍্যক্তি ও দলতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে যে নামেই হোক না কেন। রাজনৈতিক আদশর্ কিংবা পছন্দ প্রত‍্যেকটি মানুষেরই থাকবে বা থাকতে পারে, কিন্তু সবকিছুর ভেতরেই ন‍্যায‍্যতার চচর্া হওয়া চাই।” ছবি-ফেইসবুক থেকে নেয়া