Monthly Archives: ফেব্রুয়ারি 2012

সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড ।। সাংবিধানিক ও আইনের শাসনের নমুনা!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। হাসিনার সরকার আদালতের ওপর বন্দুক রেখে হয়ত গণমাধ‍্যমের টুটি চেপে ধরতে চাইছে! আর তারই অংশ হিসেবে হাইকোর্ট একটি রিটের প্রেক্ষিতে সাগর-রুনির হত‍্যামামলা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে বিধিনিষেধ জারি করেছে বলে জনমনে ধারণা জন্মেছে। গোটা দেশের সাংবাদিক সমাজ হাইকোর্টের এই আদেশে ক্ষুব্ধ। প্রবাসী একজন সংবাদসহকর্মী হিসেবে ব‍্যক্তিগতভাবে আমিও চরম ক্ষুব্ধ এই আদেশে। আমরা মনে করি, হাইকোর্টের এই আদেশ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ। আমরা আশা করবো হাইকোর্ট তথা সরকার এই আদেশ প্রত‍্যাহার করে সাগর-রুনিসহ সকল হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার করার ব‍্যবস্থা করবে। আমরা এও আশা করি সরকার দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
দেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক বাংলা দৈনিক ইত্তেফাক এর ১ মার্চ সংখ‍্যার একটি রিপোর্টের শিরোনাম হলো “তদন্তের নামে বাণিজ‍্য”। আমাদের বিচারালয়ের অন্ধত্ব দূর করার প্রত‍্যাশা নিয়ে রিপোর্টটি হুবুহু তুলে দিতে চাই। রিেপার্টে বলা হয়, “সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি খুনের ঘটনা তদন্তের নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বাণিজ্যে নেমেছে। নিহত সাগর-রুনির ব্যবহূত মোবাইল ফোনের কললিষ্টের সূত্র ধরে অনেককে আটক করে নেয়া হচ্ছে ডিবি অফিসে। এরপর তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগ একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া গ্রীল কাটা ডাকাতির ঘটনা সাজানোর জন্য ডিবি পুলিশ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে যে ৪ জনকে আটক করেছে তাদের পরিবারের কাছ থেকেও পুলিশ মোটা অংকের টাকা আদায় করেছে বলে ঐসব পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির জমি ক্রয়ের জন্য বুকিং দেয়। ১০ ফেব্রুয়ারির আগে ঐ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে সাগরের মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। এর সূত্র ধরে ডিবি ঐ কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে কয়েকদিন আটকে রাখে। পরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে থেকে ডাকাতির অভিযোগে মুরাদ, হানিফ, বশির, নূরুল ইসলামকে আটক করা হলেও গতকাল পর্যন্ত পুলিশ এ ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয়েছে-এমন তথ্য দেয়নি। তবে আটককৃতদের আত্মীয়-স্বজন গতকাল বুধবার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকে দিনভর অপেক্ষা করেছেন। তাদের কাছ থেকেও ডিবি টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ।”
ইত্তেফাকের এই রিপোর্ট পড়ার পরও কী আমাদের হাইকোর্ট বলবে যে, “সরকার সাগর-রুনি হত‍্যা মামলার যে তদন্ত চালাচ্ছে তাতে তারা সন্তুষ্ট”। পুলিশ প্রশাসন যে খুনিদের রক্ষায় তদন্তকাজকে নিজেদের মতো করে সাজাচ্ছে তাতে জনমনে কোন সন্দেহ নেই। কারণ পুলিশ হত‍্যাকান্ডের পর থেকেই একেক সময় একেকরকম এবং অসামাঞ্জস‍্যপূর্ণ তথ‍্য জানিয়েছে। তার একটি বড় প্রমাণ হলো সাগর-রুনির ফ্ল‍্যাটের গ্রিলের ছোট্র কাটা অংশ দিয়ে একটি শিশুও ঢুকেত বা বের হতে পারবে না বলে পুলিশ জানিয়েছিল। অথচ কিছুদিন আগে তারা সেই গ্রিল দিয়ে চুরি/ডাকাতির মহড়া দেয়। নিহতদের ঘর, লাশ ও শরীরে আঘাতসহ অন‍্যান‍্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় সাগর-রুনির হগত‍্যাকান্ডকে পরিকল্পিত খুন ছাড়া অন‍্য কিছু ভাবা যায় না। দৈনিক সমকাল এর ১ মার্চের সংখ‍্যায় “পুলিশের মাথায় এখন ডাকাতিতত্ত্ব” শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। রিপোর্টে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় “গ্রিলের কাটা অংশ দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে কারও পক্ষে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পেশাদার অপরাধীদের পক্ষে এটা সম্ভব বলে ব‍্যাপকভাবে যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে”। এথেকে কী প্রমাণ হয় না যে পুলিশ প্রশাসন তথা সরকার সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডকে ধামাচাপা দিতে চায়? পুলিশ আগে মিডিয়ার সামনে যে কথাগুলি বলে ফেলেছে, এখন সেগুলিকে পাল্টানোর চেষ্টা করছে জোড়াতালি দিয়ে। কিন্তু নাটকের মঞ্চায়নটা জনগণের কাছে যে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ‍্য হবে না সেটা পুলিশ বা সরকার ভালোভাবেই জানে। তাই তারা তদন্তকাজকে বিলম্বিত করছে।
সাগর-রুনির ফ্ল‍্যাটে কত ইউরো ছিল তা কেবলমাত্র সাগর-রুনিরই জানার কথা। পরবর্তীতে দেখা গেলো সাগর-রুনির ১১০০ ইউরোও নাকি খোয়া গেছে! কী করে নিশ্চিত হওয়া গেলো যে সাগর-রুনির ঘরে ১১০০ ইউরোই ছিল! যাহোক তারপরে যুক্ত হয় স্বর্ণালংকার। আজ আবার দেখছি ক‍্যামেরাও খোয়া গেছে। হত‍্যামামলার মূল এজাহারের সাথে একটার পর একটা বিষয় নতুন করে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। এসবের কারণে হয়ত মামলা ট্রায়াল চলাকালে খুনিদেরই বেশি সুবিধা হবে। যদিও হত‍্যাকান্ডের পরপরই বলা হয়েছিল যে সাগরের আইপড ও ল‍্যাপটপ ছাড়া মূল‍্যবাণ কিছুই খোয়া যায়নি। পুলিশ আরও দাবি করেছিল যে, খুনিরা সাগর-রুনির ঘনিষ্ঠ ও পূর্ব পরিচিত। ছোট্র শিশু মেঘতো স্পষ্ট করেই বলেছিল যে, “দুই আংকেল ডিমভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছে”। এতকিছুর পরও পটুলিশ প্রশাসন তথা সরকার সাগর-রুনির বর্বর হত‍্যাকান্ড নিয়ে কেন খেলছে, তা বুঝতে আর কারও বাকী নেই! খুনিরা যে সরকারের কোন কোন তরফের সাথে ঘনিষ্ট এবং প্রভাবশালি তা কী আর ভেঙ্গে বলার দরকার লাগে, পারিপার্শ্বিক অবস্থাদিই যথেষ্ট।
এবার হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই দৈনিক মানবজমিনের একটি রিপোর্টের দিকে। “সাগর-রুনি হত্যা তদন্ত যাদের জীবনে অভিশাপ” শিরোনামের একটি রিপোর্ট হুবুহু তুলে দিচ্ছি হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন‍্য। রিপোর্টে বলা হয়, “শ্চিম রাজাবাজারের শাহজালাল রশিদ লজ। এ ভবনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। ভবনের গেটের সামনেই নূরু লন্ড্রি। এ লন্ড্রির মালিক আলাউদ্দিন। খুনের পর পরই তাকে ধরে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হলেও এখন তিনি ভর্তি আছেন হাসপাতালে। কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। সাংবাদিক দম্পতি খুনের তদন্ত এমন অনেকের জীবনেই এসেছে অভিশাপ হিসেবে। অন্তত ২০ জন শিকার হয়েছেন এমন নির্যাতনের। খুনের ক্লু উদ্ধার ও দায় স্বীকার করাতে এদের ধরে এনে চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। অনেককে গ্রেপ্তার না দেখিয়ে আটক রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। অবশ্য এখন পর্যন্ত একজনকেও আটক রাখার কথা স্বীকার করেনি পুলিশ। জীবনে চরম দুর্ভাগ্য নেমে আসা মানুষগুলোর মধ্যে আরও রয়েছেন রশিদ লজের নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল, হুমায়ুন কবির, সিকিউরিটি ম্যানেজার আবু তাহের, মুন্সীগঞ্জের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি আল আমিন, মুরাদ হোসেন, কামরাঙ্গীরচরের গাড়িচালক হানিফ হাওলাদার, তার স্ত্রী রুমা বেগম, ধানমন্ডির গাড়িচালক বশির উদ্দিন, গাজীপুরের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি মিলন, শামীম, সোনারগাঁয়ের মারুফদী গ্রামের আবদুল হালিম ও নুরুল ইসলাম, কলাবাগানের ব্যবসায়ী তানভীর ও উত্তরার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক তৌসিফ। এদের মধ্যে পলাশ রুদ্র পালসহ বাসার ৩ নিরাপত্তারক্ষীকে লাশ উদ্ধারের দিন আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। এরপরও হত্যার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যাওয়ায় আটকের দু’দিন পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। মঙ্গলবার রশিদ লজের এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, এক দফা ছাড়া পাওয়ার পর পলাশকে আবারও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারা নিয়েছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা সঠিকভাবে জানি না। আলাউদ্দিন এখন হাসপাতালে। ঘটনার পর তাকেও ধরে নিয়ে যায় ডিবি। চালানো হয় নির্যাতন। গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। স্বজনদের সহায়তায় তিনি ঢাকা ছেড়েছেন। আলাউদ্দিনের পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছেন, তাকে যেভাবে মারা হয়েছে তাতে তিনি আর কোনদিন স্বাভাবিক হতে পারবেন কিনা সন্দেহ। তিনি জানান, ঢাকায় চিকিৎসা দেয়ার পর পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে তাকে এলাকার একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। ৮ দিন ধরে ডিবি কার্যালয়ে আটক রয়েছে ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক হানিফ হাওলাদার। গত বুধবার তাকে ধানমন্ডির ২ নং রোড থেকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার ডিবি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, হানিফের গাড়িতেই খুনিরা সাগর-রুনির ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। মিশন শেষ করে তারা আবার হানিফের গাড়িতে করেই পালিয়ে যায়। এ বিষয়েই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হানিফ এ অভিযোগ স্বীকার করেছে কিনা জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।’ ৬ দিন ডিবি কার্যালয়ে ঘোরার পর গত রোববার হানিফের স্ত্রী রুমা বেগমকে ধরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। একদিন আটকে রাখার পর মঙ্গলবার তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রুমার দেবর বেলাল হাওলাদার। তবে ছাড়া পাওয়ার পর রুমা কোথায় আছে তা জানা যায়নি। বেলাল বলেন, ভাবীকে অনেক মারধর করা হয়েছে। তিনি এখন অসুস্থ। কিন্তু আমার ভাইকে ছাড়েনি ডিবি। রুমার মোবাইল ফোনটি ডিবি’র লোকেরা নিয়ে গেছে বলে জানান বেলাল।”
আদালতের কাছে প্রশ্ন, দৈনিক ইত্তেফাক ও মানবজমিনের উপরোক্ত রিপোর্টের প্রেক্ষিতে কী নির্যাতনকারিদের বিরুদ্ধে কোন ব‍্যবস্থা নেয়া হবে? কিংবা হাইকোর্ট কী এখন কোন রিল জারি করবে? হাইকোর্টকে স্মরণ করে দেবার জন‍্য বলছি, “এই হলো আমাদের স্বদেশে সাংবিধানিক ও আইনের শাসনের নমুনা (পুলিশ যাকে তাকে ধরে নির্যাতন চালাতে এতটুকুও দ্বিধা করে না)। ছবিটি ফেইসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।

ধৈর্যে‍্যরও সীমা থাকে ।। আদালত অবমাননা এবং সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। লেখার শুরুতেই একটা বিষয় বলে রাখা ভালো। কেউ যাতে রাজনৈতিক রং লাগাতে না পারে তার জন‍্যই এই সতর্কতামূলক ব‍্যবস্থা। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে আমি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছি। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বচান পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছি। প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছি নৌকা প্রতিকে। এরমধে‍্য ২০০১ সালের নির্বাচনে আমার পছন্দের প্রার্থী (যাকে ভোট দিয়েছিলাম) পরাজিত হয়। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমি ভোটকেন্দ্রে যাইনি। কেন যাইনি তার ব‍্যখ‍্যা দেবার জন‍্য আজকের এই লেখা নয়। এমনকি রাজশাহী সিটি করপোরশেনর সর্বশেষ মেযর নির্বাচনেও ভোট দিয়েছি একজন বেঈমানকে, যে আমার দেশান্তরীর জন‍্য দায়ি। আরেক বিষয় বলে রাখা দরকার, তা হলো রাজনৈতিক বিশ্বাস আর পেশাকে আমি কখনও এক করে দেখিনি। আমি মনে করি সত‍্য কখনও বিপদজনক হতে পারে না। এই দর্শন থেকেই সত‍্যপ্রকাশে সর্বদাই সচেষ্ট থাকার চেষ্টা করেছি।
স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত-শিবির আর স্বৈরাচারি শাসক এমনকি জনগণের অর্থ লোপাটকারি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দুনর্ীতিবাজ সবাই আমার কাছে সমান। হয়ত মাত্রাগত বা অপকর্ম অপরাধের ধরণ অনুযায়ী পার্থক‍্য আছে বৈকি! কিন্তু উপরোল্লিখিত সবধরণের শাসকই জনগণ তথা ন‍্যায়বিচার ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না। তাদের সবার লক্ষ‍্য ও উদ্দেশ‍্য এক। আর তা হলো ক্ষমতা আর অর্থ কামানোর ধান্দা! গণতন্ত্রের নামে সুবিধাবাদিতা তথা অগণতান্ত্রিক একনায়করুপী দুই রাজনীতিকের কাছে আজ স্বদেশ জিম্মি। কেউ যুদ্ধাপরাধী আবার কেউ স্বৈরাচারের পক্ষে সাফাই গাইছেন একমাত্র ক্ষমতার স্বার্থে, কোনভাবেই জনগণের কল‍্যাণে নয়। হয়ত আপনারা কেউ এটাও বলতে পারেন যে, স্বৈরাচারের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর যুদ্ধাপরাধীর সাথে বন্ধুত্ব এক কথা নয়। সে যেভাবেই বলি না কেন আমি এসব ভন্ড রাজনীতিকদের মধে‍্য কোন তফাত করতে চাই না। প্রকৃতপক্ষে এরা সকলেই জনগণের শত্রু, বন্ধু নয়।
আজকের লেখাটি পড়ার পর পাঠক আপনারা যাতে কেউ বলতে না পারেন বা প্রশ্ন তুলতে না পারেন যে আমি বিএনপি করি, কিংবা আমার কোন রাজনৈতিক দর্শন নেই। আমার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে। আমি ইতিহাস মানি, সত‍্যকে সত‍্য তথা সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলতে স্বাচ্ছন্দ‍্যবোধ করি। আক হিসেবে আমার কোন দল বা বন্ধু নেই। কারণ পেশাগতভাবে আমি একজন সংবাদকর্মী। আজকের লেখার প্রসঙ্গ আমার বাংলাদেশে দুইজন সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকের নৃশংস হত‍্যাকান্ড ও তৎপরবর্তী হাইকোর্টের একটি রুলজারি।
আমাদের আদালতগুলি এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত কত বেশিমাত্রায় রাজনৈতিক তার প্রমাণ এই রুলনিশি। এই রুলজারির মধ‍্য দিয়ে ফুটে উঠেছে আদালত সবার সঙ্গে সম আচরণ করে না! যদিও সংবিধান অনুযায়ী দেশে প্রতিটি মানুষই সমান, কারও সঙ্গে কোন বৈষম‍্য করা যাবে না। কেউ কোন বৈষম‍্য করলেও তা হবে অবৈধ এমনকি শাস্তিযোগ‍‍্য অপরাধ হিসেবেও গণ‍্য হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রয়োগ নেই। যেখানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতই নিরপেক্ষ নয় সেখানে ন‍্যায়বিচার বলি আর আইনের শাসন বলি তার চর্চাটা কোত্থেকে আসবে তা আমার জানা নেই।
একটি রুট আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ সাগর-রুনির হত‍্যামামলাটি হিমাগারের পথে বলে অনেকে মনে করে। শুধু সাগর-রুনির পরিবারের মধে‍্যই নয় সারাদেশের মানুষের মাঝে এক চরম হতাশা ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। কেন খুনিরা ধরা পড়ছে না কিংবা কেন খুনের মোটিভ উদ্ধার করতে পারছে না পুলিশ প্রশাসন তথা সরকার? সমস‍্যাটা কোথায়, কোথায় গলদ, কে অবহেলা করছে? আদালত নিশ্চয়ই এটা বলবে না যে খুনিরা ধরা পড়ছে না বা খুনের মোটিভ উদ্ধার হচ্ছে না বেগম জিয়ার জন‍্য! নাকি আদালত কয়েকদিনের মধে‍্য আরেকটি রুল জারি করে বলবে যে খালেদা জিয়ার উল্টাপাল্টা বক্তবে‍্যর জন‍্য সাগর-রুনির খুনিদের ধরা যায়নি!
সাহারা ম‍্যাডাম এবার কিছুটা নমনীয় সুরে (যেটা সাধারণত: তিনি করেন না প্রেসের সামনে কথা বলার সময়) ধৈযর্‍্য ধরার আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু মানুষ কতদিন এমন ধৈযর্‍্য ধরে রাখতে পারে তা আমরা জানি না। মানুষের ধৈযের্‍্যরতো একটা সীমা থাকে। সাহারা ম‍্যাডাম আপনিতো একেকসময় একেক বক্তব‍্য দিচ্ছেন। কিন্তু একবারও কী ভাবছেন ছোট্র মেঘের কথা। পিতা-মাতার ভালবাসা, স্নেহ ও মমতার পরশ বঞ্চিত নিষ্পাপ শিশু মেঘ। তাকে কি দিয়ে প্রবোধ দেবেন বা ভুলিয়ে রাখবেন সাগর-রুনির পরিবারের সদস‍্যরা? একবারও কী এই বাস্তবতাটুকুর কথা ভেবে দেখবেন না আপনি? নাকি একের পর এক মিথ‍্যা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধে‍্যই আপনি আপনার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবেন, অনুগ্রহ করে চুপ থাকবেন না। কথা বলুন বাস্তবসম্মত, কোন রাজনৈতিক মিথ‍্যা বচন শুনতে চাই না আমরা সাধারণ জনতা।
দেশের আইনবিদ, সংবিধানবিশেষজ্ঞরা হয়ত ভালো বলতে পাপরবে আদালতের মন্তব‍্য বিষয়ে। যদিও আদালতের কোন আদেশ নিয়ে কথা বলা আইনসম্মত কিনা তাও আমার জানা নেই। আমার মুর্খ মানুষ আমরা বুঝি কেবল সত‍্য আর মিথ‍্যা, কিংবা ভালো মন্দ। আদালত যদি সবার সঙ্গেই সমান আচরণ করে অথবা একইধরণের ঘটনার জন‍্য একই আদেশ দেয় তাহলে আর কোন প্রশ্নই থাকে না। কিন্তু সেটা বাস্তবে দেখা যায় না বলেই আমরা আমাদের মুখ ফসকে অনেক কথাই বলি বা লিখে যাচ্ছি। আদালত যদি কোন বৈষম‍্য করে কিংবা কোন আইনের সমানভাবে প্রয়োগ না করে তা নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবে না এমন কথা কোথায় বলা আছে তাও আমাদের জানা নেই।
দেশের মানুষ জানেন পিলখানা বিডিআর (এখন বিজিবি) সদর দফতরে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছে। কী পৈশাচিক বর্বরতা দেশবাসি দেখেছে! এই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা খালেদা জিয়াই পিলখানার গণহত‍্যাযজ্ঞের জন‍্য দায়ি বলে মন্তব‍্য করেছিলেন। কিন্তু সেই অভিযোগ কী আদালতের আদেশ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে আজও? এইতো সেদিন ডিজিটাল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ কী বক্তব‍্য দিয়েছেন তাও আদালত হয়ত মিডিয়ার কল‍্যাণে পড়েছে বা শুনেছে! শেখ হাসিনাওতো কেয়কদিন ধরেই খালেদাকে পিলখানার ঘটনায় দায়ি করে বক্তব‍্য দিয়ে চলেছেন বিরামহীনভাবে। সাগর-রুনির খুনের জন‍্য সরকারই দায়ি এই বক্তব‍্য দেয়ার জন‍্য যদি খালেদার বক্তব‍্য কান্ডজ্ঞানহীন হয় কিংবা আদালত অবমাননার শামিল হয় তবে একইধরণের বক্তব‍্য ও মন্তবে‍্যর জন‍্য কেন হাসিনা বা হানিফ এর বক্তব‍্য কান্ডজ্ঞানহীন বা আদালত অবমাননার শামিল হবে না? মাননীয় বিচারকবৃন্দ, সামান‍্য প্রাপ্তির (রাজনৈতিক সুবিধা, সেটা প্রধানবিচারপতির পদও হতে পারে সিনিযরিটির রীতি ভেঙ্গে নিয়োগ পাবার) আশা বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে সাংবিধানিক দায়-দায়িত্ব ও মর্যাদাকে খাটো করবেন না। আজ যদি বিচারালয় মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস দেখায় তবে মেরুদন্ডহীন গণতন্ত্র ও গণমাধ‍্যমও সকল অগণতান্ত্রিকতা ও দুবর্ৃত্ত রাজনীতির বিপক্ষে সাহস পাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। ন‍্যায়বিচার, আইনের শাসন ছাড়া কী কোন রাষ্ট্র বা সমাজ ব‍্যবস্থাকে সভ‍্য বলা যায় মাননীয় আদালত? আমরা জনগণ চাই সকলধরণের বৈষম‍্যহীন একটি শান্তিপূর্ণ সভ‍্য সমাজ সেখানে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান, শুধু কাগজ বা সংবিধানে লেখা নয় বাস্তব প্রায়োগিক অর্থেও যার চর্চা থাকবে।
যে দেশে বা সমাজে গণমাধ‍্যম স্বাধীন ও নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারে না সেই সমাজ বা রাষ্ট্রকে কী গণতান্ত্রিক বলা যায় মাননীয় আদালত? আজকের (২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১২) দৈনিক সংবাদ একটি তথ‍্য প্রকাশিত হয়েছে। সূত্রমতে, বিগত ৭ বছরের বিএনপি জোট আমলের তিন বছরে ১৪ জন, আওয়ামী লীগের ৩ বছরে ১৩ জন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১ বছরে ১ জন সাংবাদিক খুনের শিকার হয়েছেন। অথচ শেখ হাসিনা তাঁর আমলে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের তথ‍্যগুলি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে কেবল বিএনপি-জামাত আমলের হত‍্যাকান্ডগুলির কথা দেশবাসির সামনে তুলে ধরছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী কী আংশিক সত‍্য বা মিথ‍্যা তথ‍্য জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেন। শেখ হাসিনা এই মিথ‍্যা ভাষণ মহান সংসদেও তুলে ধরেছিলেন। এই মিথ‍্যা বক্তব‍্য প্রদানের জন‍্য কী তাঁকে আদালত কোন প্রশ্ন করেছে কখনও?
সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন সব আমলেই ঘটছে। কিন্তু বিচার নেই, খুনিরা রাজনৈতিক কারণে হয় খালেদা (খালেদার আমলে) কিংবা হাসিনা (হাসিনার আমলে) কিংবা তাঁদের দলের কোন না কোন পর্যায়ের নেতার হস্তক্ষেপে নিহত সাংবাদিক পরিবারগুলি আজও বিচার পাচ্ছে না বা পাননি। সাংবাদিক মানিক সাহার পিতাহারা দুই কন‍্যা পর্শিয়া ও নাতাশা, কিংবা শামছুর রহমান কেবলের কন‍্যা সেজুঁতি কিংবা দীপংকর চক্রবত্তর্ীর ছেলে অনিরুদ্ধকে কি দিয়ে সান্তনা দেবো আমরা? সাগর-রুনির হৃদয়ের টুকরো ছোট মেঘ যে ন‍্যায়বিচার পাবে তার নিশ্চয়তা কী আদালত দিতে পারবে? সত‍্য কথা বলাতে যদি আদালত অবমাননার প্রশ্ন আসে তবে সেই সত‍্য আমি বারবার উচ্চারণ করতে চাই! সাগর সরোয়ার, মেহেরুন রুনি আর মাহির সরোয়ার মেঘ এর পারিবারিক এই ছবিটি নেয়া হয়েছে ফেইসবুক থেকে।

সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড ও আদালত অবমাননার জুজু!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “দুই সাংবাদিকের (সাগর-রুনি) হত্যার ঘটনায় সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এই তদন্তে কোন ধরনের ভুল বা অবহেলা আমরা দেখিনি। একাধিক তদন্ত সংস্থা এই ঘটনার পুরো সত্য বের করে আনতে কাজ করছে।” বাংলাদেশের স‍র্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট একথা বলেছে। সাগর-রুনিকে সরকারই খুন করেছে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগ বিষয়েও আদালত মন্তব‍্য করেছে। আদালতের মন্তব‍্য, “এধরণের মন্তব‍্য আদালত অবমাননার শামিল। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনের জন্য এটা হুমকিস্বরূপ। যারা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, নিহত সাংবাদিক দম্পতির প্রতি তাদের কোনো সহানুভূতি নেই।”
আমি জানিনা আমার বক্তব‍্যও আদালতের চোখে আদালত অবমাননার শামিল কিনা! আদালত একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে বলে আমার বিশ্বাস। সেটা হলো আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনের কথা। কিন্তু দেশে সাংবিধানিক শাসন বা আইনের শাসন বলতে বাস্তবে কিছু আছে তা কী আদালত হলফ করে বলতে পারবে? দেশের প্রধান বিচারপতি কী রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পায় না। দেশে যদি সাংবিধানিক ও আইনের শাসনই থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই দেশে বিনা বিচারে মানুষ হত‍্যা করছে কেন? আমাদের মনে পড়ে আদালত বিচার বহির্ূভত হত‍্যাকান্ড বন্ধে একটি রুল জারি করেছিল তারতো বাস্তবায়ন আজও হয়নি। কই আদালততো সেব‍্যাপারে নিরব! আজ সুন্দরবন ও বগুড়ায় পাঁচজন মানুষকে বিনাবিচারে হত‍্যা করেছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ যে কোন যুদ্ধই নয় সরাসরি হত‍্যা তা কী আদালত অস্বীকার করতে পারবে? সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয় প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব‍্য কী সংবিধানের বরখেলাপ নয়, মাননীয় আদালত? আপনাদের ভাষা এবং মন্তব‍্য যদি সত‍্য বলে ধরে নেয়া হয় তাহলেতো বিএনপি-জামাত জোট আমলেও আজকের প্রধানমন্ত্রী একইভাবে বহু আদালত অবমাননা করেছেন! তারজন‍্য আপনারা, আদালত কী ব‍্যবস্থা নিয়েছেন তখন। আদালত, বিচারক হিসেবে আপনারা সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, কোন দল বা সরকারের তাবেদারি করার জন‍্য নয়। আজ যদি আপনাদের (বিচারকদের) কারও কন‍্যা ও জামাতা কিংবা ছেলে ও পুত্রবধূ একইভাবে সাগর-রুনির মতো খুন হতো আর দেশের সরকারপ্রধান কারও বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয় বলে নিজের ব‍্যর্থতাকে ঢাকতে চাইতো তখন আপনারা একজন পিতা হিসেবে কী করতেন? এই প্রশ্নের সদৃত্তর আছে কী আপনাদের কাছে?
সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের পরবর্তী ঘটনায় প্রশাসন তথা সরকার কী ধূম্রজাল সৃষ্টি করেনি? সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ বা সরকার কী কোন নাটক করছে না? সরকার যে নাটক করছে তার পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদি কী প্রমাণ করে না, মাননীয় আদালত? আপনাদের চোখ কী অন্ধ না বন্ধ? আপনারা কী দেখতে পাচ্ছেন না যে ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত‍্যা করার উৎসব চলছে? আপনারা কী এই বিচার বহির্ূভত হত‍্যাকান্ডকে দেশে বৈধ হিসেকে মেনে নিয়েছেন? যদি মেনেই নেন তবে দেশে আর কোন বিচারক, আইন, আদালত, সংবিধান, সরকার থাকার দরকারটাই বা কিসের? “আইনের শাসন আর সাংবিধানিক শাসন” বলে চিৎকার চেচামেচি সববাই করতে পারি, কিন্তু সেটাকে রক্ষার মহান দায়িত্ব নেয়ার শপথ নিয়েও যারা তা রক্ষা করি না তার বিচার কে করবে?
আজকাল বাংলাদেশে আদালত অবমাননা জুজুর ভয় দেখিয়ে মানুষের মত, আবেগ ও বাস্তবতাকে হত‍্যা করার একটা প্রবণতা লক্ষ‍্য করা যাচ্ছে! এভাবে হয়ত কোন বিশেষ সরকারের তাবেদারী, তোষামদী করা যায় কিন্তু সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষা করা যায় না! দেশের মানুষ চান শান্তি, আইনের শাসন চান তারা। আজকের দুনিয়ায় কোন মানুষ জংলি, অসভ‍্য, বর্বর ও হত‍্যা-খুনের মধ‍্যযুগীয় বর্বরযুগে ফিরে যেতে চান কী। আর আইনের শাসনহীন একটি সমাজ বা রাষ্ট্রকে কখনো সভ‍্য সমাজ বা রাষ্ট্র বলা যায় না। সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের তদন্ত নিয়ে জনমনে যে সন্দেহ, সংশয় দেখা দিয়েছে তার জন‍্য সরকারই দায়ি। এটা দায়িত্ব নিয়ে আমরা বলতে পারি।
সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড তদন্ত নিয়ে সরকারের পদক্ষেপে আদালত যতই সন্তুষ্ট থাকুক না কেন দেশের সিংহভাগ মানুষ এনিয়ে যে সন্তুষ্ট নয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একথা বিশ্বাস না হলে সরকার বা আদালত দেশে একটি জরিপ চালাতে পারে। মাননীয় আদালত, সাগর-রুনির ছোট্র সন্তান মেঘের দিকে তাকিয়ে দেখুন অথবা মেঘের অবস্থানে নিজের সন্তানকে বসিয়ে দেখুন মনে কোন কষ্ট বা দাগ কাটে কিনা? শুধু সাগর-রুনি নয় সব হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনার রহস‍্য উন্মোচন, ন‍্যাবিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। সেটা কেউ যথাযথভাবে পালন করতে না পারলেতো আমাদের আদালত কোন রুল জারি করে না কোন সরকারের ওপর, কিন্তু কেন? ছবি-গুগল থেকে নেয়া।

সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। ঢাকা থেকে একটি ইংরেজী দৈনিকের এক সাংবাদিক আমার কাছে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়কটি প্রশ্ন করেছিলেন সম্প্রতি। ওই সাংবাদিক বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরগুলি আমার মতো করে লিখে পাঠিয়েছি। কিন্তু তার কোন ফিরতি জবাব মেলেনি। হয়ত সাংবাদিক বন্ধুটি ব‍্যস্ত আছেন পেশাগত কারণেই। যাহোক, সাংবাদিকের করা প্রশ্নগুলি প্রিয় পাঠক আপনাদের কাছে শেয়ার করতে চাই। নিচে হুবহু তুলে দিলাম আমার উত্তরগুলি। যা ঢাকার সেই সাংবাদিক বন্ধুটির কাছে ই-মেইলে পাঠিয়েছিলাম।
প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ এর নিজস্ব বাতর্া পরিবেশক হিসেবে কাজ করতেন খুলনা থেকে। ১৯৯৭ সালে একই সংবাদপত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেই আমি। এরপরই মূলত: মানিক সাহার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং তা থেকে ঘনিষ্ঠতা। যদি আমি স্মৃতিভ্রষ্ট না হয়ে থাকি তাহলে সংবাদ এর তৎকালিন বার্তা সম্পাদক প্রিয় মনজুরুল আহসান বুলবুল কিংবা মফস্বল ডেস্ক ইনচার্জ কার্ত্তিক চ‍্যাটার্জী আমাকে একদিন ফোন করে বলেছিলেন মানিক সাহার একটি কাজ করে দিতে সহায়তা করার জন‍্য। মানিক সাহার একটি শিক্ষাসনদ রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে তোলার প্রয়োজন ছিল। এই সামান‍্য কাজটি করতে গিয়ে মানিক সাহার খুবই কাছাকাছি আসার সৌভাগ‍্য হয় আমার। সম্ভবত এই কারণে তিনি একবার রাজশাহী এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন‍্য। উনাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় ক‍্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলাম। এরপর থেকে প্রায়ই কথা হতো। পেশাগত কারণে অসংখ‍্যবার ঢাকায় আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম। যাহোক ওইসময়গুলোতে ছাত্রশিবিরের অস্ত্র আর সন্ত্রাসের দাপটে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ভয়ংকর অবস্থা ছিল। মানিক সাহা আমাকে ফোন করে বলতেন “আকাশ তুমি বেশি রিস্ক নিও না। ওরা (শিবির) ভয়ংকর, সাবধানে থেকো।” শ্রদ্ধেয় মলয় ভৌমিক রাজশাহী থেকে সংবাদ এর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে, আমি নিজস্ব বার্তা পরিবেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। মানিক সাহা খুলনা থেকে আমি রাজশাহী থেকে কাজ করছি দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনে। তাঁর নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর একাধিকবার আমি খুলনায় গিয়েছি। মানিক সাহা একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের প্রতিকৃতি। খুলনায় নিযর্াতিত, বিচারবঞ্চিত মানুষের ভরসাস্থল ছিলেন মানিক সাহা। সত‍্য প্রকাশে তিনি কখনও কাউকে পরোয়া করেননি। মিতভাষী, বন্ধুবৎসল, মানবতাবাদী এই সাংবাদিক বন্ধুকে কোন মানুষ খুন করতে পারে এটা ভাবাও কষ্টকর! দুবর্ৃত্তদের বোমার আঘাতে মানিক সাহার দেহ থেকে মাথা আলাদা হয়ে যাওয়ার সেই দৃশ‍্য আজও আমাদের কাঁদায়।
প্রকৃতঅর্থে সাংবাদিতা আর দশটি পেশার মতো নয়। এটি একটি চ‍্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। গণতান্ত্রিক ও সভ‍্য সমাজ ব‍্যবস্থায় সাংবাদিকতা অতটা ঝুঁকিপূণর্ নয়। কিন্তু যেখানে গণতন্ত্রের অবস্থাই ভঙ্গুর, আইনের শাসন ও ন‍্যায়বিচার সোনার হরিণ এবং দুর্নীতি, দলীয়করণ আর পরিবারতন্ত্র অতিমাত্রায় তৎপর সেখানে সাংবাদিকতার পথ মসৃণ হতে পারে কী? না কখনও না। খুলনায় বহুরুপী অপরাধ সিন্ডিকেট যারা রাজনৈতিক শক্তির সহায়তা পেয়ে থাকে সবসময়। এটা শুধু খুলনাতেই নয় গোটা স্বদেশ ডুবে আছে একই সমস‍্যার ভেতরে। খুলনা একটা অর্থনৈতিক জোন। রাজনৈতিক হত‍্যা-নির্যাতন ছাড়াও সেখানে চিংড়ি, সুন্দরবনসহ নানান অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ‍্য অপরাধ সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট রাজনৈতিক শক্তির অর্থের একটা বড় উৎসও বটে। এসবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা লেখালেখি করতে গিয়েই মূলত: সন্ত্রাসী বা অপরাধীচক্রের রোষানলে পড়ছেন। যার পরণতি নৃশংস হত‍্যাকান্ডের মতো অমানবিক ঘটনার মধ‍্য দিয়ে শেষ হচ্ছে। একের পর এক সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড ঘটছে সেখানে। শুধু মানিক সাহাই নয় হুমায়ূন কবির বালু, হারুণ রশিদ খোকন, বেলালউদ্দিন শেখ, শ.ম. আলাউদ্দিনসহ বহু সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে খুলনা অঞ্চলে। কিন্তু কোনটারই রহস‍্য উন্মোচিত হয়নি। কারা খুনের পরিকল্পনাকারি তা আজও রহস‍্যাবৃত। কারণ একটাই খুনের ঘটনাগুলির পেছনে কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক মদদ আছে। ফলে মাঠপর্যায়ের কিলাররা কখনও শনাক্ত হলেও মূল হোতারা থাকছে পর্দার আঁড়ালেই। হুমকির মুখে অনেক সাংবাদিক খুলনা থেকে ঢাকায় চলে যেতে বাধ‍্য হয়েছেন।
জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজের ছাত্র। সরকারনিয়ন্ত্রিত দৈনিক বাংলার শিক্ষানবিশ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করি পঞ্চগড় থেকে। যশোর থেকে দৈনিক বাংলার স্টাফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামছুর রহমান কেবল। ঢাকায় দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় অনেকবার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন‍্যতম প্রাণপুরুষ শামছুর রহমান কেবলকে সন্ত্রাস ও রাজনীতি বিষয়ক রিপোর্টিংয়ের তথ‍্যভান্ডার বলা হয়ে থাকে। অকুতোভয় সাহসী এই সাংবাদিক খুনের ঘটনায় সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। প্রথাবিরোধী এই সাংবাদিক কতটা মানবিক ছিলেন তার একটি উদাহরণ দিতে পারি। তখন দৈনিক বাংলায় মফস্বল ডেস্কের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামসুল আলম। একদিন ঘটনাক্রমে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমি পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম নিয়োগপত্র পাবার আশায়। এসময় কেবল ভাই শামসুল আলম সাহেবকে বলেছিলেন, “কেন এই ছেলেটাকে এতো ঘুরাচ্ছেন? ওতো ভালোই লিখে।” জবাবে শামসুল আলম সেদিন বলেছিলেন, “ওর হাতটা এখনও পাকেনি আপনার মতো। ওর (আমি) রিপোর্টিং লেখায় শব্দচয়নে অনেক দূর্বলতা আছে।” এভাবে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে বসিয়েই শামসুল আলম আমাকে দিয়ে রিপোর্ট পুনরায় লিখাতেন।
মূলত: আমাদের স্বদেশের গেটা সমাজ ব‍্যবস্থাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি কোন নীতি নৈতিকতা বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়। এটা মূলত: অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন। সমস্ত পেশাজীবীরাও আজ বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এই বিভক্তির হাত থেকে রেহাই পায়নি। যা দুভর্াগ‍্যজনক। পেশায় অনৈক‍্য, সাংবাদিকতা আর ব‍্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ তথা রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা, মিডিয়ামালিকানার আপন ব‍্যবসায়িক স্বার্থের মতো কারণগুলিও সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের অন‍্যতম কারণতো বটেই। এইতো গতবছর জাতীয় সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অর্ধসত‍্য ভাষণ দিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৪ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্য যেমন সত্য তেমনি বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে ৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন (ওইসময় পর্যন্ত বর্তমানে এই হিসাব ৯ এ ঠেকেছে), এটাও সত্য। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অর্ধাংশ স্বীকার করে অর্ধেকটা অস্বীকার করেছেন পরোক্ষভাবে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন বন্ধ করা হয়েছিল। এটা যেমন সত্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি ও আমার দেশ বন্ধ হলো (আমার দেশ পরে আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হয়) উভয়ই সত্য। আমরা এই অর্ধসত্য রাজনীতির শিকার। কোন সাংবাদিক নেতা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তবে‍্যর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। আজ দেশে সাংবাদিকরা দলীয় পরিচয়ে পরিচিত। কেউ আওয়ামী সাংবাদিক, কেউ বিএনপিপন্থি। এই দলীয় সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের পেশা ও জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি এটা বলছি না যে সবাই দলীয় সাংবাদিকতা করছেন, ব‍্যতিক্রম অবশ‍্যই আছে। কিন্তু ব‍্যতিক্রম উদাহরণ নয়। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলে আওয়ামী তথা মহাজোট সমর্থক সাংবাদিকরা নিরব হয়ে যান। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে যারা সোচ্চার থাকেন রাজপথে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে। অন্যদিকে আবার বিএনপি-জামায়াত আমলে শত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিক সমাজ মুখে কুলুপ আঁটে। যারা মহাজোটের আমলে মহাবিপ্লবী সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের পর দলমতনির্বিশেষে সকল সাংবাদিক ঐক‍্যবদ্ধ হয়েছে বলে আপাতত: মনে হলেও তা কতদিন অটুট থাকবে সেটাই প্রশ্ন। সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনে দলীয় সাংবাদিকতা অন‍্যতম কারণ হলেও একমাত্র এবং প্রধান কারণ নয় বলেই আমার বিশ্বাস। কারণটা রাজনৈতিক ও ব‍্যবসায়িক।
না এখানে মনে করার কিছু নেই প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু। সত‍্য কখনও বিপদজনক হতে পারে না। আমি এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। আমি আরও মনে করি যে সত‍্যান্বেষণই সাংবাদিকতার মহান ব্রত। প্রতিটি সাংবাদিকই মানবাধিকারকমর্ী-এটাও আমি বিশ্বাস করি। একজন মানবাধিকারকর্মী কোন মানবাধিকার লংঘণের ঘটনার তথ‍্যানুসন্ধান করে রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ঠিক একইভাবে একজন সাংবাদিকও ঘটনার পেছনের ঘটনা তথা সত‍্যটাকে খুঁজে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। বিচারবহির্ূভত হত‍্যাকান্ড তথা মানবাধিকার লংঘণ, ধর্মীয় সংখ‍্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার কারণেই আমাকে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়। এটা যে কত দু:খের, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝবেন না এই যন্ত্রণার জায়গাটাকে। শান্তনা এটুকুই যে আজও বেঁচে আছি আমি। আমাকেতো ওরা সেই কালোরাতেই ক্রসফায়ারের নামে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। হয়ত মা-বাবার আশির্বাদ আর বিচারবঞ্চিত-নির্যাতিত আর যাদের কণ্ঠস্বর উপরতলার মানুষের কাছে পৌঁছায়না সেইসব সহজ-সরল মানুষগুলির ভালবাসার কাছে পরাভূত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারি দুবর্ৃত্তের মনোপ্রত‍্যাশা! ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে (অনুমান দেড়টা) আমাকে আমার ভাড়া বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় র‍্যাবের সন্ত্রাসী দল। তখন আমি রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তারা আমার চারমাস বয়সী শিশুপুত্র, স্ত্রী এবংভাড়া বাসার মালিক ও তার ছেলের সামনে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এরপর দু’হাতে হ‍্যান্ডকাফ পরিয়ে গাছা দিয়ে চোখ বাঁধার পর মাথায় কালোকাপড়ের টুপি পরিয়ে নিয়ে যায় র‍্যাবের রাজশাহী-৫ এর নির্যাতন কেন্দ্রে। এরপর তারা আমাকে ঝুলিয়ে রাখে। র‍্যাবের তৎকালিন মহাপরিচালক আজকের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‍্যাব-৫ এর তৎকালিন অধিনায়ক লে.কর্ণেল শাশসুজ্জামান খানের নিদর্েশে র‍্যাব কর্মকর্তা মেজর রাশিদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে লে.কর্ণেল) ও মেজর হুমায়ুন কবির আমাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন চালায়। তারা আমাকে বৈদু‍্যতিক শকও দেয়। তারা আমাকে পঙ্গু করে দেয় শারীরীকভাবে। নির্যাতনকারিদের একজন মেজর রাশীদকে পরবর্তীতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠিয়ে সরকার পুরস্কৃত করে। রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসাধু সাংবাদিক ও ডিজিএফআইয়ের দালালদের সহযোগিতায় আমার নামে চাঁদাবাজির মিথ‍্যা কলংকের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদেরকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির সিরিজ মামলা দায়ের করায়। মামলার বাদি সকলেই আমার অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল বহু বছর আগে। আমাকে বাসা থেকে ধরা হলেও কতিপয় অন্ধ সাংবাদিক র‍্যাবের দেয়া মিথ‍্যা তথ‍্য তোতাপাখির ন‍্যায় সংবাদমাধ‍্যমে প্রকাশ করেছিল। তারা লিখেছিল যে গভীর রাতে রাজশাহী শহরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় আমাকে র‍্যাব গ্রেফতার করে। আমার ওপর কী অমানবিকতা এবং কেন করা হয়েছিল তার বশত বিবরণ পাওয়া যাবে আমার লেখা বই “পেইন” এ। যা আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে (যেমন-এ‍্যামাজন)।
কেন এই নির্যাতন? রাজশাহীতে র‍্যাবের বিচার বহিভর্ূত হত‍্যাকান্ডের শিকার ওয়ার্কাস পার্টির নেতা মজনু শেখ, ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব বাবু, র‍্যাবের বিচারবহিভর্ূত নির্যাতনের শিকার কারারক্ষী সাহেবুল ইসলাম, মোহাম্মদ বেনজির (স্ত্রী ও শিশুকন‍্যার সম্মুখে নিজ শয়নকক্ষে) সহ আরও অনেক ঘটনায় আমি অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আমি তখন একাধারে কাজ করতাম দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ এবং রেডিও জার্মান ডয়েচেভেলেতে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর সন্ত্রাসী হামলা এবং চট্রগ্রামে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মৌলবাদি তৎপরতার বিরুদ্ধে আমি রাজশাহীতে কাফনের কাপড় পরে একক মৌন র‍্যালি করি। আমি মনে করি একজন সাংবাদিক কেবল সাংবাদিকই নন তার নৈতিক ও সামাজিক কতগুলি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই আমি এটা করেছি। ২০০২ সালে রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহিমা ছাত্রদল ও শিবির ক‍্যাডারদের গণধর্ষণ ও তৎপরবর্তীকালে ধর্ষণদৃশে‍্যর নগ্ন ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করায় মহিমা আত্মহনন করেন। এরপর পুঠিয়ায় আরও একটি ধষর্ণ ঘটনা ঘটে। সেই ধর্ষণ ঘটনার নায়ক ছাত্রদল ক‍্যাডার হারুনের পিতা আবদুল জলিল ধর্ষিতার বাবাকে জিলাপির মধে‍্য বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হত‍্যা করে। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলে। পরবর্তীতে আমি ঘটনার অনুসন্ধানী রিপোর্ট করলে প্রশাসন ধর্ষিতার পিতার লাশ কবর থেকে তুলে ভিসেরা করালে হত‍্যাকান্ডের ঘটনাটি ধরা পড়ে। সেই জলিলকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে র‍্যাব চাঁদাবাজির মামলা করায় ২০০৭ সালে এসে। আর ২০০০ সালে একটি সন্ত্রাসবিষয়ক রিপোর্টকে কেন্দ্র করে আজকের রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুল আলম লোটন আমাকে হত‍্যাপ্রচেষ্টা চালায়। ২০০২ সালে জাতীয় নেতার সন্তান ও রাজশাহীর বর্তমান মেযর খায়রুজ্জামান লিটনদের পারিবারিক ওয়াকফ এস্টেট “দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ এস্টেটের অভ‍্যন্তরে দুনর্ীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধানী রিপোর্ট করি দৈনিক সংবাদ এ। একইধরনের একটি রিপোর্ট পরিবেশন করি সিএসবি নিউজ’এ। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী আওয়ামী লীগের অভ‍্যন্তরীন কোন্দল, দ্বন্দ্ব আর পারিবারিকীকরণ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক মৃদুভাষণে। এসবের জের ধরে মেয়র লিটন তার চাচা লোটনকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির একটি ডাহা মিথ‍্যা কাল্পনিক অভিযোগ এনে জিডি করে ২০০৭ সালের জুন মাসে। যে অভিযোগটি তদন্ত করে পুলিশ কোন সত‍্যতা না পাওয়ায় তার অগ্রগামী করেনি। কিন্তু জরুরি অবস্থার সুযোগে লোটন পুনরায় একই অভিযোগ দাখিল করে সেপ্টেম্বর মাস ২০০৭ সালে। এরপর ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে যোগসাজস, র‍্যাব ও মেয়র লিটনের চাপে পুলিশ মামলাটি নিতে বাধ‍্য হয়। আমি হাইকোটর্ থেকে জামিন লাভ করি। পুঠিয়ার বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ বিশ্বাস তাড়ির ভাটি উদ্বোধন করাবিষয়ক একটি রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সংবাদ এর তঃকালিন সম্পাদক বজলুর রহমান ও আমার নামে একটি মামনহানি মামলা করিয়েছিলেন। যে মামলায় আমরা খালাস পাই। কিন্তু জরুরি অবস্থায় ২০০৭ সালে একই ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির মামলা করেন তিনি। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ এ “রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি” শীর্ষক একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল আমার নামে। যে ঘটনায় ভাল মন্দ সব সাংবাদিকই একত্রিত হয়ে আমাকে রাজশাহীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন এবং আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার জন‍্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালবাসা আর রিপোর্টংয়ের সত‍্যতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টির একটা সমাধান হয় ওই সময়ে।
এই তিন শক্তি তথা মেয়র লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসৎ সাংবাদিক যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে ২০০৭ সালে আমাকে “দাগী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ” হিসেবে আখ‍্যা দিয়ে ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। আমাকে শারীরীকভাবে নির্যাতন করার পর জেলহাজতে পাঠানো হয় পুলিশের মাধ‍্যমে। সাধারণত: কোন বিচারক বা ম‍্যাজিষ্ট্রেটের সামনে হাজির না করে কাউকে জেলহাজতে পাঠানোর কোন বিধান নেই, এটা শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ২৪ অক্টোবর ২০০৭ সালের সেই সন্ধ্যায় যখন আমাকে বোয়ালিয়া থানায় হস্তার করে র‍্যাব তখন পুলিশ আমাকে রাজশাহীর আদালতে নিয়ে যায় কিন্তু সেখানে কোন ম‍্যাজিষ্ট্রেট বা বিচারক ছিল না সেদিন। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের অস্বাস্থ‍্যকর পরিবেশে চোর, ডাকাত, খুনি, চাঁদাবাজ, জঙ্গি, রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধ‍্যাপকবৃন্দ, সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, ব‍্যবসায়ী নেতা লুৎফর রহমানসহ বহ ভাল মানুষ (যারা জেল খাটছিলেন নানা কারণে) সবার সাথেই কাটিয়েছি ২৮টি অন্ধকার দিন। এরপর আদালতের নির্দেশে জেল থেকে বেরুতে পারলেও ষড়যন্ত্রকারির দল থেমে ছিল না। এদের কেউ কেউ উৎফুল্ল হয় মহাজোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। ফলে প্রিয় দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে ২০০৯ সালে চলে আসলাম জার্মানিতে। ওরা আমার জীবনটাকেই বদলে দিল, বর্তমানের এই জীবন আমার কাছে প্রত‍্যাশিত ছিল না কোনদিনই।
পুলিশের মধে‍্য দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা আছে সত‍্য। কিন্তু তারমানে এই নয় যে পুলিশের অবহেলার কারণেই সাংবাদিক হত‍্যারহস‍্যগুলি উন্মোচিত হচ্ছে না কিংবা সাংবাদিক হত‍্যা মামলার সাথে জড়িতরা খালাস পাচ্ছে। মূল কারণটা অন‍্যজায়গায়। সেটা হলো অসুস্থ‍্য রাজনীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর দলীয়করণ। আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার আর গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলির যথাযথ তদন্ত, কারণ উৎঘাটন হচ্ছে না। আমরা যে সমাজ ব‍্যবস্থায় বসবাস করি (বাংলাদেশে) সেখানে সিস্টেমগুলি বা প্রতিষ্ঠানগুলি চলতে পারে না স্বাধীনভাবে। সবজায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর চাপ। এসবের কারণেই পুলিশ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে এগুতে পারছে না বলে আমি মনে করি। পুলিশ যদি আজ স্বাধীনভাবে কাজ রতে পারতো তাহলে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পেতাম আজকের বাংলাদেশে। এরপরও আছে নানান বৈষম‍্য। র‍্যাব যে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তা কিন্তু পুলিশ পায় না। সর্বশেষ এবং সাড়াজাগানো জোড়া সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনের ঘটনাটাই ধরুন। পুলিশ বললো তারা সবকিছুই পেয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা ইউটার্ণ গ্রহণ করলো। কিন্তু কেন? পুলিশের কী স্বার্থ এখানে। এখানে হয়ত সরকারের কোন বিশেষ মহল, ব‍্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে সাগর-রুনি হত‍্যাকারি বা হত‍্যাকারিদের! নাহলে সরকারের প্রধান হয়ে কেউ কী এটা বলতে পারে যে, “সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম বা শয়নকক্ষ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়।” দেশের প্রধানমন্ত্রি যখন এই কথা বলেন তখন খুনিরাতো উৎসাহিত হবেই পুলিশও দায়িত্ব পালনে বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে সুযোগ পেয়ে যায়।
যদি আপনার কোন দলীয় পরিচয় থাকে কিংবা স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাতে পারেন, তো নো প্রবলেম। অথবা সাদা হোক আর কালা হোক আপনার অনেক অর্থ থাকলেও আপনি নিরাপদে থাকতে পারেন। আর যদি সততা এবং সত‍্য প্রকাশের যে মহান ব্রত বা পেশাগত দায়িত্ব সেই জায়গাটাতে নির্ভিক ও আপোষহীন তথা মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গেলে সাংবাদিকের বিপদ অবশ‍্যম্ভাবী, তাহলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে-এব‍্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। এইকথাগুলি কিন্তু আমার হতাশার জায়গা নয়, প্রচন্ড ক্ষোভ আর কষ্ট থেকেই এসব কথা বলতে বাধ‍্য হচ্ছি আমি। গণতন্ত্র যদি সতি‍্যকার অর্থে চর্চিত হয় দেশে আইনের শাসন আপনাআপনি কার্যকর হবে। আর একটা গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ‍্যমও তার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গণমাধ‍্যমের ভেতরের যে সংকটগুলি আছে তাও দূরীভূত হবে। কাজেই আমি বলবো কী করলে দেশের রাজনীতি সুস্থ‍্য ধারায় ফিরবে, দুনর্ীতি-দারিদ্রতা হ্রাস পাবে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার তথা গণতন্ত্র কার্যকর হবে সেদিকটাতেই আমাদের সবার একযোগে দেশাত্ববোধ বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নইলে কোন মানুষেরই জীবন ও পেশা নিরাপদ হবে না। বিভাজন আর অসত‍্য থেকে আমাদের সববাইকে সরে আসতে হবে। এই কাজটি খুবই কঠিন, তবুও পরিবর্তনের পথে আমাদের হাঁটতেই হবে।
উল্লেখ‍্য এই লেখাটি যখন আপলোড করছি তখন বাংলাদেশে হাইকোর্ট সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিকদের নসিহত করে একটি রুল জারি করেছে। এবিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানাবো পরবর্তী লেখায়। ছবি-ইন্টারনেট/গুগল থেকে নেয়া। দুবর্ৃত্তদের বোমা হামলায় নিহত দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহার নিথর দেহ পড়ে আছে রাস্তার ওপর। না এটা মানিক সাহার লাশ নয় যেন বাংলাদেশ পড়ে আছে। সেই খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারীরা কী কেউ ধরা পড়েছে আজও, বিচারতো অনেক দূরের কথা। http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de,

সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড ।। পরিকল্পিত খুন হচ্ছে ডাকাতি, আসল খুনিরা বেঁচে যাচ্ছে!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “ডাকাতির ঘটনাটি যাতে বিশ্বাসযোগ‍্য হয় সেজন‍্য পর্যাপ্ত সাক্ষ‍্য-প্রমাণ, আলামত প্রয়োজন। এজন‍্য ডাকাতদের গ্রেফতারের পাশাপাশি লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।” বাংলাদেশের অন‍্যতম জনপ্রিয় জাতীয় বাংলা দৈনিক জনকণ্ঠ ২৮ ফেব্রুয়ারি সংখ‍্যায় এক রিপোর্টে গোয়েন্দা সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত বক্তব‍্যটি প্রকাশ করেছে।
দেশের একটি প্রাচীন প্রগতিশীল বাংলা দৈনিক সংবাদ এর একই দিনের রিপোর্টে বলা হয়, “গ্রেফতারকৃতদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনার দায়-দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টাও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাদের মিডিয়ার সামনে কথা বলার উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে। ঘটনার বর্ণনা কিভাবে দিতে হবে, তাও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শিখিয়ে দেয়া মুখস্থ বুলি মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করবে গ্রেফতারকৃতরা। সংঘবদ্ধ চোরের দল সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকে। তারপর বাসায় চুরি করতে বাধা দেয়ায় খুন করা হয় সাংবাদিক দম্পতিকে। তারপর ওই কাটা অংশ দিয়েই পালিয়ে যায় চোরের দল।”
সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ডের ঘটনার ১৭ দিনের মাথায় সরকারের তরফ থেকে এমন বক্তব‍্য প্রদান করলো গোয়েন্দারা। অথচ হত‍্যাকান্ডের পরপরই সাগর-রুনির ঘরের কাটা জানালা দিয়ে একটি বাচ্চাও বের হবার মতো কোন সম্ভাবনা নেই বলে গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্তারা জানিয়েছিল। একটা অসভ‍্য, জংলি ও বর্বর সমাজ ও রাষ্ট্রেই এমন ডাহা কাল্পনিক সাজানো কল্পকাহিনী ও মিথ‍্যাচার শোভা পায়। আমাদের স্বদেশ কী সেই মধ‍্যযুগীয় বর্বরযুগ অতিক্রম করছে? সবকিছুই ভন্ড আর বেঈমানদের কব্জায় এখন আমাদের স্বদেশ! এটা বোঝার আর বাকি রইলো না যে হাসিনার নির্দেশে পুলিশ ও গোয়েন্দারা এই ‘মহানাটক’ মঞ্চায়নের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে। হাসিনার নিদর্েশে ডাকাতদলের হাতে খুনের মহানাটক মঞ্চায়নের এই সাজানো ঘটনাকে কী দেশের মানুষ মেনে নেবেন? নাকি তারা জেগে ওঠবেন সকল অনৌ‍্যায়-অবিচার আর অমানবিকতার বিরুদ্ধে। সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দেশের মানুষের প্রশ্ন কী এমন সম্পকর্ খুনি বা খুনিদের সঙ্গে এই সরকার তথা সরকারপ্রধানের? যার কারণে খুনিদের রক্ষা করে সাগর-রুনির আত্মাকে কষ্ট দিয়ে এবং শিশুসন্তান নিষ্পাপ মেঘের প্রতি অবিচার করার মতো নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করতেও দ্বিধা করছে না সরকার! কী কারণে হাসিনা ও তার সরকারের বুদ্ধিদাতা, দলীয় বুদ্ধিজীবীরা এখনও চুপচাপ বসে এই অমানবিক অবিচারের পথ রুখতে তৎপর হচ্ছে না, সেটা আমাদের বোধগম‍্য নয়।
সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ডান-বাম, উত্তম-মধ‍্যম সকল শ্রেণীর সাংবাদিক একজোট হয়েছে। সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের খুনিদের গ্রেফতার এবং বিচারের দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথিতযশা প্রবীণ সাংবাদিক এ বিএম মুসা ও নির্মল সেন শারীরীকভাবে অসুস্থ‍্য হবার পরও এই আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের এই আন্দোলন কেবল সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবির সঙ্গেই জড়িত নয় এটা সাংবাদিকদের জীবন ও পেশার মযর্াদা এবং মানুষের স্বাভাবিক মৃতু‍্যর নিশ্চয়তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
অবিচার, মিথ‍্যাচার আর দুবর্ৃত্ত রাজনীতির শৃঙ্খল ভাঙতে না পারলে স্বদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে কী বিশ্বদরবারে? সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা ঐক‍্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ কী পারবে ঘুরে দাঁড়াতে এই দুবর্ৃত্তায়নের আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে? এই নবঐক‍্য কী পারবে জনগণকে ন‍্যায়বিচারের পথ দেখাতে? নাকি আবারও হাসিনা আর খালেদা এই দুইশিবিরে বিভক্ত হয়ে জনগণের ভরসাস্থলটি ভেঙ্গে পড়বে? সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ড যে কোনভাবেই একটা নিছক ডাকাতির ঘটনা ছিল না তা সরকার বুঝলে ভালো, নইলে আখেরে হাসিনাকেই তার মাশুল দিতে হবে! এতে মানুষের কোন প্রশ্ন নেই।
পরিকল্পিত খুন হচ্ছে ডাকাতি। আসল খুনিরা বেঁচে যাচ্ছে। এমন পথের দিশাই হয়ত সরকার জাতির সামনে প্রকাশ করবে শিগগিরই। যে নিরীহ ও অসহায় মানুষগুলিকে ধরে এনে সরকার সাগর-রুনির খুনি বানানোর চেষ্টা করছে তাদের পরিবারগুলির কী অবস্থা হবে? এই অবিচার দেশের ১৬ কোটি মানুষ সহ‍্য করতে পারে, দেশের মিডিয়াগুলি চুপচাপ থাকতে পারে কিন্তু প্রকৃতি এই অবিচার সইবে না! সাগর-রুনির লাশ-ছবি আমার দেশ থেকে নেয়া।

সাগর-রুনির খুনিকে বিদেশে পালাতে সহায়তা করলো হাসিনার মহাজোট সরকার!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বাংলাদেশের দুই জনপ্রিয় টিভি সাংবাদিক সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যার প্রতিবাদে এক প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছে সেখানে বসবাসরত বাঙালিরা। আগামি ৩ মার্চে অনুষ্ঠে‍্যয় এই সমাবেশ অংশ নেয়ার জন‍্য তিন হাজার ৮৬২ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ‍্যম ফেইসবুকে। এই বিপুল আমন্ত্রিত’র মধে‍্য ব‍্যক্তিগতভাবে আমার নামটিও অন্তর্ূভক্ত করে আয়োজকরা। তারই প্রতিক্রয়ায় আজকের এই ছোট্র কলাম।
আজকের লেখার শুরুতেই একটি চাঞ্চল‍্যকর তথ‍্য জানাতে চাই। আর সেই তথ‍্য জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাগর-রুনির খুনিকে পালাতে সহায়তা করলো হাসিনার মহাজোট সরকার! খালেদা এই অভিযোগ এনেছেন। খালেদার অভিযোগ রাজনৈতিক কিনা তা আমরা জানি না। তবে সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেফতার ও খুনের রহস‍্য উন্মোচনে সরকার যে টালবাহানা করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সরকার এখন এই পরিকল্পিত জোড়া হত‍্যাকান্ডকে ডাকাতির ঘটনা বলে সাজানোর পাঁয়তারা চালাচ্ছে!
জার্মানির বাঙালি ভাই-বোনদের উদ্দেশ‍্য বলছি বা লিখছি। সাংবাদিক সাগর-রুনির হত‍্যাকারিদের হাসিনার মহাজোট সরকার গ্রেফতার করবে না! খুনের রহস‍্যও উন্মোচন করবে না। যদি করেও তা হবে আরকে জজমিয়া নাটক, যা খালেদা-নিজামী ও বাবর-তারেকরা করেছিল ২০০৪ সালে হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ওপর হামলার ঘটনায়। আপনাদের ব‍্যাকুলতা-উদ্বিঘ্নতার প্রতি আমিও সহমর্মী। কিন্তু এতদূর থেকেতো আর যাওয়া সম্ভব নয়, মানসিকভাবে নিশ্চয়ই যাবো। তবে শারীরীক উপস্থিতির সামর্থ‍্য নেই আমার। এজন‍্য আমি দু:খিত। আমি এও বিশ্বাস করি যে, “এমন দু’একটি মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ আর প্রতিবাদে হাসিনার মহাজোট সরকারের কিছুই যায় আসেনা। বিশেষ করে একনায়ক ও একগুয়ে হাসিনার মন গলবে বলে মনে হয় না! তাছাড়া তিনিতো বলেই দিয়েছেন যে, সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম বা শয়নকক্ষ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়।”
বিএনপি চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ লালমনিরহাটের এক জনসভায় অভিযোগ করে বলেন, হাসিনা সরকার সাগর-রুনি খুনের সঙ্গে জড়িত। তাই তারা খুনিদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছে। গোটা দেশে আজ সাংবাদিকরা এক ঘন্টার কর্মবিরতি পালন করে।
দেশে কোটি কোটি টাকা দিয়ে পুলিশ, গোয়েন্দা ও এলিটফোর্স র‍্যাপিড একশান ব‍্যাটালিয়ান বা র‍্যাবকে পোষা হচ্ছে। এজন‍্য জনগণের কোটি কোটি টাকা ব‍্যয় হচ্ছে এসব সংস্থা ও বাহিনীকে পুষতে। কিন্তু কাজের কাজ কী হচ্ছে, কিছুই না? সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের অনেকদিন পার হয়ে গেলো। পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দারা খুনিদের আজও ধরতে পারলো না। জনগণ, বাংলার মানুষ ও সাংবাদিক সমাজ সরকার তথা হাসিনার কাছ থেকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা কিংবা হাসি-ঠাট্রার মধ‍্য মতো ছেলেমানুষী বক্তব‍্য শুনতে চাননা। মানুষ চায় জীবনের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক মৃতু‍্যর নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ যে মৃতু‍্যউপত‍্যকা, আগ্নেয়গিরির মুখে নিপতিত, তা থেকে স্বদেশকে বাঁচাতে হবে। সারাবিশ্বের বাঙালিকে দলমতের উদ্ধের্ ওঠে দেশকে বাঁচানোর পথ খুঁজতে হবে। একজন দুর্ভাগা বাঙালি, বাংলাদেশের নাগরিক বা বাংলাদেশি হিসেবে আমার এই আকুল আবেদন। আসুন আমরা খালেদা-হাসিনা নয় দেশটাকে বাঁচানোর পথে এগোই। কার্টুন এই ছবিটি দৈনিক সংবাদ থেকে নেয়া। http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de,

ধিক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী ।। আর কোন জজ মিয়া নাটক নয় আসল খুনিদের ধরো!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। আরেক জজ মিয়া নাটকের মহড়া সম্পন্ন। এখন মঞ্চস্থের অপেক্ষা। না, এই জজ মিয়া সেই জজ মিয়া নন। “লুকিং ফর শত্রুজ” বাবর, বেগম জিয়া কিংবা নিজামীর জজ মিয়া নাটক এখন বাংলার জনগণের কাছে এক ইতিহাস। যে জজ মিয়া নাটক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব‍্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও ঘায়েল করার অস্ত্র হিসেবে ব‍্যবহার করে আসছে হাসিনা সমর্থকরা, সেই জজমিয়ার ফাদেই স্বেচ্ছায় পা রাখতে চাইছে হাসিনার সরকার। বাংলাদেশের অনেকগুলি সংবাদপত্র এমনই আভাস দিয়েছে। হায়রে স্বদেশ! হায়রে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি আর দলীয়করণের রাজনীতি! ধিক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধিক প্রধানমন্ত্রী! তবে সরকার যে ছলনার আশ্রয়ই নিক না কেন বাংলার মানুষ তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেবে। সময় একদিন ঠিকই কথা বলবে। ক্ষমতার মোহে হাসিনা ও তার সরকার অন্ধ!
সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ডের এতোদিন পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী তথা সরকার খুনিদের ধরলো না। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ১৬ দিন পর বলছে, ঘটনার মোটিভ পরিস্কার! অথচ খুনি কারা তা তারা জানেনা। খুনিরা ধরা পড়েনা। যেখানে সেখানে ব্লকরেইড দিয়ে সাধারণ মানুষকে ধরে আনছে। গোয়েন্দা দপ্তরের সামনে নিখোঁজ স্বজনদের ভিড় বাড়ছে। গোয়েন্দারা আটককৃতদের সাগর-রুনি খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি দেয়ার জন‍্য চাপ দিচ্ছে বলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে।
হে প্রকৃতি তুমি তোমার ক্ষমতা দেখাও। তুমিতো সবই বোঝ, কিন্তু কেন তুমি নিরব? প্রকৃতি, তোমার কাছে আমাদের আকুল আবেদন, মিনতি। বাঁচাও আমাদের স্বদেশ, বহু রক্ত দিয়ে কেনা আমাদের বাংলাকে আর বাংলার অসহায় মানুষকে। তুমি বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দাও বাংলার সব দুনর্ীতিবাজ, ভন্ড-মিথু‍্যক, ষড়যন্ত্রকারি, খুনিদের লালন-পালনকারি ও লুটেরা রাজনীতিকদেরকে। ছবি-ফেইসবুক থেকে নেয়া।