সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। ঢাকা থেকে একটি ইংরেজী দৈনিকের এক সাংবাদিক আমার কাছে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়কটি প্রশ্ন করেছিলেন সম্প্রতি। ওই সাংবাদিক বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরগুলি আমার মতো করে লিখে পাঠিয়েছি। কিন্তু তার কোন ফিরতি জবাব মেলেনি। হয়ত সাংবাদিক বন্ধুটি ব‍্যস্ত আছেন পেশাগত কারণেই। যাহোক, সাংবাদিকের করা প্রশ্নগুলি প্রিয় পাঠক আপনাদের কাছে শেয়ার করতে চাই। নিচে হুবহু তুলে দিলাম আমার উত্তরগুলি। যা ঢাকার সেই সাংবাদিক বন্ধুটির কাছে ই-মেইলে পাঠিয়েছিলাম।
প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ এর নিজস্ব বাতর্া পরিবেশক হিসেবে কাজ করতেন খুলনা থেকে। ১৯৯৭ সালে একই সংবাদপত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেই আমি। এরপরই মূলত: মানিক সাহার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং তা থেকে ঘনিষ্ঠতা। যদি আমি স্মৃতিভ্রষ্ট না হয়ে থাকি তাহলে সংবাদ এর তৎকালিন বার্তা সম্পাদক প্রিয় মনজুরুল আহসান বুলবুল কিংবা মফস্বল ডেস্ক ইনচার্জ কার্ত্তিক চ‍্যাটার্জী আমাকে একদিন ফোন করে বলেছিলেন মানিক সাহার একটি কাজ করে দিতে সহায়তা করার জন‍্য। মানিক সাহার একটি শিক্ষাসনদ রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে তোলার প্রয়োজন ছিল। এই সামান‍্য কাজটি করতে গিয়ে মানিক সাহার খুবই কাছাকাছি আসার সৌভাগ‍্য হয় আমার। সম্ভবত এই কারণে তিনি একবার রাজশাহী এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন‍্য। উনাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় ক‍্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলাম। এরপর থেকে প্রায়ই কথা হতো। পেশাগত কারণে অসংখ‍্যবার ঢাকায় আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম। যাহোক ওইসময়গুলোতে ছাত্রশিবিরের অস্ত্র আর সন্ত্রাসের দাপটে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ভয়ংকর অবস্থা ছিল। মানিক সাহা আমাকে ফোন করে বলতেন “আকাশ তুমি বেশি রিস্ক নিও না। ওরা (শিবির) ভয়ংকর, সাবধানে থেকো।” শ্রদ্ধেয় মলয় ভৌমিক রাজশাহী থেকে সংবাদ এর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে, আমি নিজস্ব বার্তা পরিবেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। মানিক সাহা খুলনা থেকে আমি রাজশাহী থেকে কাজ করছি দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনে। তাঁর নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর একাধিকবার আমি খুলনায় গিয়েছি। মানিক সাহা একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের প্রতিকৃতি। খুলনায় নিযর্াতিত, বিচারবঞ্চিত মানুষের ভরসাস্থল ছিলেন মানিক সাহা। সত‍্য প্রকাশে তিনি কখনও কাউকে পরোয়া করেননি। মিতভাষী, বন্ধুবৎসল, মানবতাবাদী এই সাংবাদিক বন্ধুকে কোন মানুষ খুন করতে পারে এটা ভাবাও কষ্টকর! দুবর্ৃত্তদের বোমার আঘাতে মানিক সাহার দেহ থেকে মাথা আলাদা হয়ে যাওয়ার সেই দৃশ‍্য আজও আমাদের কাঁদায়।
প্রকৃতঅর্থে সাংবাদিতা আর দশটি পেশার মতো নয়। এটি একটি চ‍্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। গণতান্ত্রিক ও সভ‍্য সমাজ ব‍্যবস্থায় সাংবাদিকতা অতটা ঝুঁকিপূণর্ নয়। কিন্তু যেখানে গণতন্ত্রের অবস্থাই ভঙ্গুর, আইনের শাসন ও ন‍্যায়বিচার সোনার হরিণ এবং দুর্নীতি, দলীয়করণ আর পরিবারতন্ত্র অতিমাত্রায় তৎপর সেখানে সাংবাদিকতার পথ মসৃণ হতে পারে কী? না কখনও না। খুলনায় বহুরুপী অপরাধ সিন্ডিকেট যারা রাজনৈতিক শক্তির সহায়তা পেয়ে থাকে সবসময়। এটা শুধু খুলনাতেই নয় গোটা স্বদেশ ডুবে আছে একই সমস‍্যার ভেতরে। খুলনা একটা অর্থনৈতিক জোন। রাজনৈতিক হত‍্যা-নির্যাতন ছাড়াও সেখানে চিংড়ি, সুন্দরবনসহ নানান অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ‍্য অপরাধ সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট রাজনৈতিক শক্তির অর্থের একটা বড় উৎসও বটে। এসবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা লেখালেখি করতে গিয়েই মূলত: সন্ত্রাসী বা অপরাধীচক্রের রোষানলে পড়ছেন। যার পরণতি নৃশংস হত‍্যাকান্ডের মতো অমানবিক ঘটনার মধ‍্য দিয়ে শেষ হচ্ছে। একের পর এক সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড ঘটছে সেখানে। শুধু মানিক সাহাই নয় হুমায়ূন কবির বালু, হারুণ রশিদ খোকন, বেলালউদ্দিন শেখ, শ.ম. আলাউদ্দিনসহ বহু সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে খুলনা অঞ্চলে। কিন্তু কোনটারই রহস‍্য উন্মোচিত হয়নি। কারা খুনের পরিকল্পনাকারি তা আজও রহস‍্যাবৃত। কারণ একটাই খুনের ঘটনাগুলির পেছনে কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক মদদ আছে। ফলে মাঠপর্যায়ের কিলাররা কখনও শনাক্ত হলেও মূল হোতারা থাকছে পর্দার আঁড়ালেই। হুমকির মুখে অনেক সাংবাদিক খুলনা থেকে ঢাকায় চলে যেতে বাধ‍্য হয়েছেন।
জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজের ছাত্র। সরকারনিয়ন্ত্রিত দৈনিক বাংলার শিক্ষানবিশ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করি পঞ্চগড় থেকে। যশোর থেকে দৈনিক বাংলার স্টাফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামছুর রহমান কেবল। ঢাকায় দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় অনেকবার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন‍্যতম প্রাণপুরুষ শামছুর রহমান কেবলকে সন্ত্রাস ও রাজনীতি বিষয়ক রিপোর্টিংয়ের তথ‍্যভান্ডার বলা হয়ে থাকে। অকুতোভয় সাহসী এই সাংবাদিক খুনের ঘটনায় সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। প্রথাবিরোধী এই সাংবাদিক কতটা মানবিক ছিলেন তার একটি উদাহরণ দিতে পারি। তখন দৈনিক বাংলায় মফস্বল ডেস্কের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামসুল আলম। একদিন ঘটনাক্রমে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমি পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম নিয়োগপত্র পাবার আশায়। এসময় কেবল ভাই শামসুল আলম সাহেবকে বলেছিলেন, “কেন এই ছেলেটাকে এতো ঘুরাচ্ছেন? ওতো ভালোই লিখে।” জবাবে শামসুল আলম সেদিন বলেছিলেন, “ওর হাতটা এখনও পাকেনি আপনার মতো। ওর (আমি) রিপোর্টিং লেখায় শব্দচয়নে অনেক দূর্বলতা আছে।” এভাবে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে বসিয়েই শামসুল আলম আমাকে দিয়ে রিপোর্ট পুনরায় লিখাতেন।
মূলত: আমাদের স্বদেশের গেটা সমাজ ব‍্যবস্থাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি কোন নীতি নৈতিকতা বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়। এটা মূলত: অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন। সমস্ত পেশাজীবীরাও আজ বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এই বিভক্তির হাত থেকে রেহাই পায়নি। যা দুভর্াগ‍্যজনক। পেশায় অনৈক‍্য, সাংবাদিকতা আর ব‍্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ তথা রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা, মিডিয়ামালিকানার আপন ব‍্যবসায়িক স্বার্থের মতো কারণগুলিও সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের অন‍্যতম কারণতো বটেই। এইতো গতবছর জাতীয় সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অর্ধসত‍্য ভাষণ দিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৪ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্য যেমন সত্য তেমনি বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে ৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন (ওইসময় পর্যন্ত বর্তমানে এই হিসাব ৯ এ ঠেকেছে), এটাও সত্য। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অর্ধাংশ স্বীকার করে অর্ধেকটা অস্বীকার করেছেন পরোক্ষভাবে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন বন্ধ করা হয়েছিল। এটা যেমন সত্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি ও আমার দেশ বন্ধ হলো (আমার দেশ পরে আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হয়) উভয়ই সত্য। আমরা এই অর্ধসত্য রাজনীতির শিকার। কোন সাংবাদিক নেতা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তবে‍্যর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। আজ দেশে সাংবাদিকরা দলীয় পরিচয়ে পরিচিত। কেউ আওয়ামী সাংবাদিক, কেউ বিএনপিপন্থি। এই দলীয় সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের পেশা ও জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি এটা বলছি না যে সবাই দলীয় সাংবাদিকতা করছেন, ব‍্যতিক্রম অবশ‍্যই আছে। কিন্তু ব‍্যতিক্রম উদাহরণ নয়। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলে আওয়ামী তথা মহাজোট সমর্থক সাংবাদিকরা নিরব হয়ে যান। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে যারা সোচ্চার থাকেন রাজপথে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে। অন্যদিকে আবার বিএনপি-জামায়াত আমলে শত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিক সমাজ মুখে কুলুপ আঁটে। যারা মহাজোটের আমলে মহাবিপ্লবী সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের পর দলমতনির্বিশেষে সকল সাংবাদিক ঐক‍্যবদ্ধ হয়েছে বলে আপাতত: মনে হলেও তা কতদিন অটুট থাকবে সেটাই প্রশ্ন। সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনে দলীয় সাংবাদিকতা অন‍্যতম কারণ হলেও একমাত্র এবং প্রধান কারণ নয় বলেই আমার বিশ্বাস। কারণটা রাজনৈতিক ও ব‍্যবসায়িক।
না এখানে মনে করার কিছু নেই প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু। সত‍্য কখনও বিপদজনক হতে পারে না। আমি এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। আমি আরও মনে করি যে সত‍্যান্বেষণই সাংবাদিকতার মহান ব্রত। প্রতিটি সাংবাদিকই মানবাধিকারকমর্ী-এটাও আমি বিশ্বাস করি। একজন মানবাধিকারকর্মী কোন মানবাধিকার লংঘণের ঘটনার তথ‍্যানুসন্ধান করে রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ঠিক একইভাবে একজন সাংবাদিকও ঘটনার পেছনের ঘটনা তথা সত‍্যটাকে খুঁজে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। বিচারবহির্ূভত হত‍্যাকান্ড তথা মানবাধিকার লংঘণ, ধর্মীয় সংখ‍্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার কারণেই আমাকে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়। এটা যে কত দু:খের, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝবেন না এই যন্ত্রণার জায়গাটাকে। শান্তনা এটুকুই যে আজও বেঁচে আছি আমি। আমাকেতো ওরা সেই কালোরাতেই ক্রসফায়ারের নামে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। হয়ত মা-বাবার আশির্বাদ আর বিচারবঞ্চিত-নির্যাতিত আর যাদের কণ্ঠস্বর উপরতলার মানুষের কাছে পৌঁছায়না সেইসব সহজ-সরল মানুষগুলির ভালবাসার কাছে পরাভূত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারি দুবর্ৃত্তের মনোপ্রত‍্যাশা! ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে (অনুমান দেড়টা) আমাকে আমার ভাড়া বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় র‍্যাবের সন্ত্রাসী দল। তখন আমি রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তারা আমার চারমাস বয়সী শিশুপুত্র, স্ত্রী এবংভাড়া বাসার মালিক ও তার ছেলের সামনে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এরপর দু’হাতে হ‍্যান্ডকাফ পরিয়ে গাছা দিয়ে চোখ বাঁধার পর মাথায় কালোকাপড়ের টুপি পরিয়ে নিয়ে যায় র‍্যাবের রাজশাহী-৫ এর নির্যাতন কেন্দ্রে। এরপর তারা আমাকে ঝুলিয়ে রাখে। র‍্যাবের তৎকালিন মহাপরিচালক আজকের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‍্যাব-৫ এর তৎকালিন অধিনায়ক লে.কর্ণেল শাশসুজ্জামান খানের নিদর্েশে র‍্যাব কর্মকর্তা মেজর রাশিদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে লে.কর্ণেল) ও মেজর হুমায়ুন কবির আমাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন চালায়। তারা আমাকে বৈদু‍্যতিক শকও দেয়। তারা আমাকে পঙ্গু করে দেয় শারীরীকভাবে। নির্যাতনকারিদের একজন মেজর রাশীদকে পরবর্তীতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠিয়ে সরকার পুরস্কৃত করে। রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসাধু সাংবাদিক ও ডিজিএফআইয়ের দালালদের সহযোগিতায় আমার নামে চাঁদাবাজির মিথ‍্যা কলংকের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদেরকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির সিরিজ মামলা দায়ের করায়। মামলার বাদি সকলেই আমার অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল বহু বছর আগে। আমাকে বাসা থেকে ধরা হলেও কতিপয় অন্ধ সাংবাদিক র‍্যাবের দেয়া মিথ‍্যা তথ‍্য তোতাপাখির ন‍্যায় সংবাদমাধ‍্যমে প্রকাশ করেছিল। তারা লিখেছিল যে গভীর রাতে রাজশাহী শহরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় আমাকে র‍্যাব গ্রেফতার করে। আমার ওপর কী অমানবিকতা এবং কেন করা হয়েছিল তার বশত বিবরণ পাওয়া যাবে আমার লেখা বই “পেইন” এ। যা আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে (যেমন-এ‍্যামাজন)।
কেন এই নির্যাতন? রাজশাহীতে র‍্যাবের বিচার বহিভর্ূত হত‍্যাকান্ডের শিকার ওয়ার্কাস পার্টির নেতা মজনু শেখ, ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব বাবু, র‍্যাবের বিচারবহিভর্ূত নির্যাতনের শিকার কারারক্ষী সাহেবুল ইসলাম, মোহাম্মদ বেনজির (স্ত্রী ও শিশুকন‍্যার সম্মুখে নিজ শয়নকক্ষে) সহ আরও অনেক ঘটনায় আমি অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আমি তখন একাধারে কাজ করতাম দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ এবং রেডিও জার্মান ডয়েচেভেলেতে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর সন্ত্রাসী হামলা এবং চট্রগ্রামে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মৌলবাদি তৎপরতার বিরুদ্ধে আমি রাজশাহীতে কাফনের কাপড় পরে একক মৌন র‍্যালি করি। আমি মনে করি একজন সাংবাদিক কেবল সাংবাদিকই নন তার নৈতিক ও সামাজিক কতগুলি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই আমি এটা করেছি। ২০০২ সালে রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহিমা ছাত্রদল ও শিবির ক‍্যাডারদের গণধর্ষণ ও তৎপরবর্তীকালে ধর্ষণদৃশে‍্যর নগ্ন ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করায় মহিমা আত্মহনন করেন। এরপর পুঠিয়ায় আরও একটি ধষর্ণ ঘটনা ঘটে। সেই ধর্ষণ ঘটনার নায়ক ছাত্রদল ক‍্যাডার হারুনের পিতা আবদুল জলিল ধর্ষিতার বাবাকে জিলাপির মধে‍্য বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হত‍্যা করে। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলে। পরবর্তীতে আমি ঘটনার অনুসন্ধানী রিপোর্ট করলে প্রশাসন ধর্ষিতার পিতার লাশ কবর থেকে তুলে ভিসেরা করালে হত‍্যাকান্ডের ঘটনাটি ধরা পড়ে। সেই জলিলকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে র‍্যাব চাঁদাবাজির মামলা করায় ২০০৭ সালে এসে। আর ২০০০ সালে একটি সন্ত্রাসবিষয়ক রিপোর্টকে কেন্দ্র করে আজকের রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুল আলম লোটন আমাকে হত‍্যাপ্রচেষ্টা চালায়। ২০০২ সালে জাতীয় নেতার সন্তান ও রাজশাহীর বর্তমান মেযর খায়রুজ্জামান লিটনদের পারিবারিক ওয়াকফ এস্টেট “দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ এস্টেটের অভ‍্যন্তরে দুনর্ীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধানী রিপোর্ট করি দৈনিক সংবাদ এ। একইধরনের একটি রিপোর্ট পরিবেশন করি সিএসবি নিউজ’এ। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী আওয়ামী লীগের অভ‍্যন্তরীন কোন্দল, দ্বন্দ্ব আর পারিবারিকীকরণ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক মৃদুভাষণে। এসবের জের ধরে মেয়র লিটন তার চাচা লোটনকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির একটি ডাহা মিথ‍্যা কাল্পনিক অভিযোগ এনে জিডি করে ২০০৭ সালের জুন মাসে। যে অভিযোগটি তদন্ত করে পুলিশ কোন সত‍্যতা না পাওয়ায় তার অগ্রগামী করেনি। কিন্তু জরুরি অবস্থার সুযোগে লোটন পুনরায় একই অভিযোগ দাখিল করে সেপ্টেম্বর মাস ২০০৭ সালে। এরপর ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে যোগসাজস, র‍্যাব ও মেয়র লিটনের চাপে পুলিশ মামলাটি নিতে বাধ‍্য হয়। আমি হাইকোটর্ থেকে জামিন লাভ করি। পুঠিয়ার বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ বিশ্বাস তাড়ির ভাটি উদ্বোধন করাবিষয়ক একটি রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সংবাদ এর তঃকালিন সম্পাদক বজলুর রহমান ও আমার নামে একটি মামনহানি মামলা করিয়েছিলেন। যে মামলায় আমরা খালাস পাই। কিন্তু জরুরি অবস্থায় ২০০৭ সালে একই ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির মামলা করেন তিনি। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ এ “রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি” শীর্ষক একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল আমার নামে। যে ঘটনায় ভাল মন্দ সব সাংবাদিকই একত্রিত হয়ে আমাকে রাজশাহীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন এবং আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার জন‍্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালবাসা আর রিপোর্টংয়ের সত‍্যতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টির একটা সমাধান হয় ওই সময়ে।
এই তিন শক্তি তথা মেয়র লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসৎ সাংবাদিক যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে ২০০৭ সালে আমাকে “দাগী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ” হিসেবে আখ‍্যা দিয়ে ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। আমাকে শারীরীকভাবে নির্যাতন করার পর জেলহাজতে পাঠানো হয় পুলিশের মাধ‍্যমে। সাধারণত: কোন বিচারক বা ম‍্যাজিষ্ট্রেটের সামনে হাজির না করে কাউকে জেলহাজতে পাঠানোর কোন বিধান নেই, এটা শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ২৪ অক্টোবর ২০০৭ সালের সেই সন্ধ্যায় যখন আমাকে বোয়ালিয়া থানায় হস্তার করে র‍্যাব তখন পুলিশ আমাকে রাজশাহীর আদালতে নিয়ে যায় কিন্তু সেখানে কোন ম‍্যাজিষ্ট্রেট বা বিচারক ছিল না সেদিন। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের অস্বাস্থ‍্যকর পরিবেশে চোর, ডাকাত, খুনি, চাঁদাবাজ, জঙ্গি, রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধ‍্যাপকবৃন্দ, সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, ব‍্যবসায়ী নেতা লুৎফর রহমানসহ বহ ভাল মানুষ (যারা জেল খাটছিলেন নানা কারণে) সবার সাথেই কাটিয়েছি ২৮টি অন্ধকার দিন। এরপর আদালতের নির্দেশে জেল থেকে বেরুতে পারলেও ষড়যন্ত্রকারির দল থেমে ছিল না। এদের কেউ কেউ উৎফুল্ল হয় মহাজোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। ফলে প্রিয় দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে ২০০৯ সালে চলে আসলাম জার্মানিতে। ওরা আমার জীবনটাকেই বদলে দিল, বর্তমানের এই জীবন আমার কাছে প্রত‍্যাশিত ছিল না কোনদিনই।
পুলিশের মধে‍্য দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা আছে সত‍্য। কিন্তু তারমানে এই নয় যে পুলিশের অবহেলার কারণেই সাংবাদিক হত‍্যারহস‍্যগুলি উন্মোচিত হচ্ছে না কিংবা সাংবাদিক হত‍্যা মামলার সাথে জড়িতরা খালাস পাচ্ছে। মূল কারণটা অন‍্যজায়গায়। সেটা হলো অসুস্থ‍্য রাজনীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর দলীয়করণ। আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার আর গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলির যথাযথ তদন্ত, কারণ উৎঘাটন হচ্ছে না। আমরা যে সমাজ ব‍্যবস্থায় বসবাস করি (বাংলাদেশে) সেখানে সিস্টেমগুলি বা প্রতিষ্ঠানগুলি চলতে পারে না স্বাধীনভাবে। সবজায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর চাপ। এসবের কারণেই পুলিশ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে এগুতে পারছে না বলে আমি মনে করি। পুলিশ যদি আজ স্বাধীনভাবে কাজ রতে পারতো তাহলে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পেতাম আজকের বাংলাদেশে। এরপরও আছে নানান বৈষম‍্য। র‍্যাব যে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তা কিন্তু পুলিশ পায় না। সর্বশেষ এবং সাড়াজাগানো জোড়া সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনের ঘটনাটাই ধরুন। পুলিশ বললো তারা সবকিছুই পেয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা ইউটার্ণ গ্রহণ করলো। কিন্তু কেন? পুলিশের কী স্বার্থ এখানে। এখানে হয়ত সরকারের কোন বিশেষ মহল, ব‍্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে সাগর-রুনি হত‍্যাকারি বা হত‍্যাকারিদের! নাহলে সরকারের প্রধান হয়ে কেউ কী এটা বলতে পারে যে, “সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম বা শয়নকক্ষ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়।” দেশের প্রধানমন্ত্রি যখন এই কথা বলেন তখন খুনিরাতো উৎসাহিত হবেই পুলিশও দায়িত্ব পালনে বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে সুযোগ পেয়ে যায়।
যদি আপনার কোন দলীয় পরিচয় থাকে কিংবা স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাতে পারেন, তো নো প্রবলেম। অথবা সাদা হোক আর কালা হোক আপনার অনেক অর্থ থাকলেও আপনি নিরাপদে থাকতে পারেন। আর যদি সততা এবং সত‍্য প্রকাশের যে মহান ব্রত বা পেশাগত দায়িত্ব সেই জায়গাটাতে নির্ভিক ও আপোষহীন তথা মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গেলে সাংবাদিকের বিপদ অবশ‍্যম্ভাবী, তাহলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে-এব‍্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। এইকথাগুলি কিন্তু আমার হতাশার জায়গা নয়, প্রচন্ড ক্ষোভ আর কষ্ট থেকেই এসব কথা বলতে বাধ‍্য হচ্ছি আমি। গণতন্ত্র যদি সতি‍্যকার অর্থে চর্চিত হয় দেশে আইনের শাসন আপনাআপনি কার্যকর হবে। আর একটা গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ‍্যমও তার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গণমাধ‍্যমের ভেতরের যে সংকটগুলি আছে তাও দূরীভূত হবে। কাজেই আমি বলবো কী করলে দেশের রাজনীতি সুস্থ‍্য ধারায় ফিরবে, দুনর্ীতি-দারিদ্রতা হ্রাস পাবে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার তথা গণতন্ত্র কার্যকর হবে সেদিকটাতেই আমাদের সবার একযোগে দেশাত্ববোধ বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নইলে কোন মানুষেরই জীবন ও পেশা নিরাপদ হবে না। বিভাজন আর অসত‍্য থেকে আমাদের সববাইকে সরে আসতে হবে। এই কাজটি খুবই কঠিন, তবুও পরিবর্তনের পথে আমাদের হাঁটতেই হবে।
উল্লেখ‍্য এই লেখাটি যখন আপলোড করছি তখন বাংলাদেশে হাইকোর্ট সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিকদের নসিহত করে একটি রুল জারি করেছে। এবিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানাবো পরবর্তী লেখায়। ছবি-ইন্টারনেট/গুগল থেকে নেয়া। দুবর্ৃত্তদের বোমা হামলায় নিহত দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহার নিথর দেহ পড়ে আছে রাস্তার ওপর। না এটা মানিক সাহার লাশ নয় যেন বাংলাদেশ পড়ে আছে। সেই খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারীরা কী কেউ ধরা পড়েছে আজও, বিচারতো অনেক দূরের কথা। http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de,

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s