ধৈর্যে‍্যরও সীমা থাকে ।। আদালত অবমাননা এবং সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। লেখার শুরুতেই একটা বিষয় বলে রাখা ভালো। কেউ যাতে রাজনৈতিক রং লাগাতে না পারে তার জন‍্যই এই সতর্কতামূলক ব‍্যবস্থা। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে আমি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছি। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বচান পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছি। প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছি নৌকা প্রতিকে। এরমধে‍্য ২০০১ সালের নির্বাচনে আমার পছন্দের প্রার্থী (যাকে ভোট দিয়েছিলাম) পরাজিত হয়। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আমি ভোটকেন্দ্রে যাইনি। কেন যাইনি তার ব‍্যখ‍্যা দেবার জন‍্য আজকের এই লেখা নয়। এমনকি রাজশাহী সিটি করপোরশেনর সর্বশেষ মেযর নির্বাচনেও ভোট দিয়েছি একজন বেঈমানকে, যে আমার দেশান্তরীর জন‍্য দায়ি। আরেক বিষয় বলে রাখা দরকার, তা হলো রাজনৈতিক বিশ্বাস আর পেশাকে আমি কখনও এক করে দেখিনি। আমি মনে করি সত‍্য কখনও বিপদজনক হতে পারে না। এই দর্শন থেকেই সত‍্যপ্রকাশে সর্বদাই সচেষ্ট থাকার চেষ্টা করেছি।
স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত-শিবির আর স্বৈরাচারি শাসক এমনকি জনগণের অর্থ লোপাটকারি তথাকথিত গণতান্ত্রিক দুনর্ীতিবাজ সবাই আমার কাছে সমান। হয়ত মাত্রাগত বা অপকর্ম অপরাধের ধরণ অনুযায়ী পার্থক‍্য আছে বৈকি! কিন্তু উপরোল্লিখিত সবধরণের শাসকই জনগণ তথা ন‍্যায়বিচার ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না। তাদের সবার লক্ষ‍্য ও উদ্দেশ‍্য এক। আর তা হলো ক্ষমতা আর অর্থ কামানোর ধান্দা! গণতন্ত্রের নামে সুবিধাবাদিতা তথা অগণতান্ত্রিক একনায়করুপী দুই রাজনীতিকের কাছে আজ স্বদেশ জিম্মি। কেউ যুদ্ধাপরাধী আবার কেউ স্বৈরাচারের পক্ষে সাফাই গাইছেন একমাত্র ক্ষমতার স্বার্থে, কোনভাবেই জনগণের কল‍্যাণে নয়। হয়ত আপনারা কেউ এটাও বলতে পারেন যে, স্বৈরাচারের সঙ্গে বন্ধুত্ব আর যুদ্ধাপরাধীর সাথে বন্ধুত্ব এক কথা নয়। সে যেভাবেই বলি না কেন আমি এসব ভন্ড রাজনীতিকদের মধে‍্য কোন তফাত করতে চাই না। প্রকৃতপক্ষে এরা সকলেই জনগণের শত্রু, বন্ধু নয়।
আজকের লেখাটি পড়ার পর পাঠক আপনারা যাতে কেউ বলতে না পারেন বা প্রশ্ন তুলতে না পারেন যে আমি বিএনপি করি, কিংবা আমার কোন রাজনৈতিক দর্শন নেই। আমার একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস আছে। আমি ইতিহাস মানি, সত‍্যকে সত‍্য তথা সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো বলতে স্বাচ্ছন্দ‍্যবোধ করি। আক হিসেবে আমার কোন দল বা বন্ধু নেই। কারণ পেশাগতভাবে আমি একজন সংবাদকর্মী। আজকের লেখার প্রসঙ্গ আমার বাংলাদেশে দুইজন সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিকের নৃশংস হত‍্যাকান্ড ও তৎপরবর্তী হাইকোর্টের একটি রুলজারি।
আমাদের আদালতগুলি এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত কত বেশিমাত্রায় রাজনৈতিক তার প্রমাণ এই রুলনিশি। এই রুলজারির মধ‍্য দিয়ে ফুটে উঠেছে আদালত সবার সঙ্গে সম আচরণ করে না! যদিও সংবিধান অনুযায়ী দেশে প্রতিটি মানুষই সমান, কারও সঙ্গে কোন বৈষম‍্য করা যাবে না। কেউ কোন বৈষম‍্য করলেও তা হবে অবৈধ এমনকি শাস্তিযোগ‍‍্য অপরাধ হিসেবেও গণ‍্য হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তার কোন প্রয়োগ নেই। যেখানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতই নিরপেক্ষ নয় সেখানে ন‍্যায়বিচার বলি আর আইনের শাসন বলি তার চর্চাটা কোত্থেকে আসবে তা আমার জানা নেই।
একটি রুট আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ সাগর-রুনির হত‍্যামামলাটি হিমাগারের পথে বলে অনেকে মনে করে। শুধু সাগর-রুনির পরিবারের মধে‍্যই নয় সারাদেশের মানুষের মাঝে এক চরম হতাশা ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। কেন খুনিরা ধরা পড়ছে না কিংবা কেন খুনের মোটিভ উদ্ধার করতে পারছে না পুলিশ প্রশাসন তথা সরকার? সমস‍্যাটা কোথায়, কোথায় গলদ, কে অবহেলা করছে? আদালত নিশ্চয়ই এটা বলবে না যে খুনিরা ধরা পড়ছে না বা খুনের মোটিভ উদ্ধার হচ্ছে না বেগম জিয়ার জন‍্য! নাকি আদালত কয়েকদিনের মধে‍্য আরেকটি রুল জারি করে বলবে যে খালেদা জিয়ার উল্টাপাল্টা বক্তবে‍্যর জন‍্য সাগর-রুনির খুনিদের ধরা যায়নি!
সাহারা ম‍্যাডাম এবার কিছুটা নমনীয় সুরে (যেটা সাধারণত: তিনি করেন না প্রেসের সামনে কথা বলার সময়) ধৈযর্‍্য ধরার আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু মানুষ কতদিন এমন ধৈযর্‍্য ধরে রাখতে পারে তা আমরা জানি না। মানুষের ধৈযের্‍্যরতো একটা সীমা থাকে। সাহারা ম‍্যাডাম আপনিতো একেকসময় একেক বক্তব‍্য দিচ্ছেন। কিন্তু একবারও কী ভাবছেন ছোট্র মেঘের কথা। পিতা-মাতার ভালবাসা, স্নেহ ও মমতার পরশ বঞ্চিত নিষ্পাপ শিশু মেঘ। তাকে কি দিয়ে প্রবোধ দেবেন বা ভুলিয়ে রাখবেন সাগর-রুনির পরিবারের সদস‍্যরা? একবারও কী এই বাস্তবতাটুকুর কথা ভেবে দেখবেন না আপনি? নাকি একের পর এক মিথ‍্যা আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতির মধে‍্যই আপনি আপনার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখবেন, অনুগ্রহ করে চুপ থাকবেন না। কথা বলুন বাস্তবসম্মত, কোন রাজনৈতিক মিথ‍্যা বচন শুনতে চাই না আমরা সাধারণ জনতা।
দেশের আইনবিদ, সংবিধানবিশেষজ্ঞরা হয়ত ভালো বলতে পাপরবে আদালতের মন্তব‍্য বিষয়ে। যদিও আদালতের কোন আদেশ নিয়ে কথা বলা আইনসম্মত কিনা তাও আমার জানা নেই। আমার মুর্খ মানুষ আমরা বুঝি কেবল সত‍্য আর মিথ‍্যা, কিংবা ভালো মন্দ। আদালত যদি সবার সঙ্গেই সমান আচরণ করে অথবা একইধরণের ঘটনার জন‍্য একই আদেশ দেয় তাহলে আর কোন প্রশ্নই থাকে না। কিন্তু সেটা বাস্তবে দেখা যায় না বলেই আমরা আমাদের মুখ ফসকে অনেক কথাই বলি বা লিখে যাচ্ছি। আদালত যদি কোন বৈষম‍্য করে কিংবা কোন আইনের সমানভাবে প্রয়োগ না করে তা নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবে না এমন কথা কোথায় বলা আছে তাও আমাদের জানা নেই।
দেশের মানুষ জানেন পিলখানা বিডিআর (এখন বিজিবি) সদর দফতরে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছে। কী পৈশাচিক বর্বরতা দেশবাসি দেখেছে! এই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা খালেদা জিয়াই পিলখানার গণহত‍্যাযজ্ঞের জন‍্য দায়ি বলে মন্তব‍্য করেছিলেন। কিন্তু সেই অভিযোগ কী আদালতের আদেশ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে আজও? এইতো সেদিন ডিজিটাল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হানিফ কী বক্তব‍্য দিয়েছেন তাও আদালত হয়ত মিডিয়ার কল‍্যাণে পড়েছে বা শুনেছে! শেখ হাসিনাওতো কেয়কদিন ধরেই খালেদাকে পিলখানার ঘটনায় দায়ি করে বক্তব‍্য দিয়ে চলেছেন বিরামহীনভাবে। সাগর-রুনির খুনের জন‍্য সরকারই দায়ি এই বক্তব‍্য দেয়ার জন‍্য যদি খালেদার বক্তব‍্য কান্ডজ্ঞানহীন হয় কিংবা আদালত অবমাননার শামিল হয় তবে একইধরণের বক্তব‍্য ও মন্তবে‍্যর জন‍্য কেন হাসিনা বা হানিফ এর বক্তব‍্য কান্ডজ্ঞানহীন বা আদালত অবমাননার শামিল হবে না? মাননীয় বিচারকবৃন্দ, সামান‍্য প্রাপ্তির (রাজনৈতিক সুবিধা, সেটা প্রধানবিচারপতির পদও হতে পারে সিনিযরিটির রীতি ভেঙ্গে নিয়োগ পাবার) আশা বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে সাংবিধানিক দায়-দায়িত্ব ও মর্যাদাকে খাটো করবেন না। আজ যদি বিচারালয় মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস দেখায় তবে মেরুদন্ডহীন গণতন্ত্র ও গণমাধ‍্যমও সকল অগণতান্ত্রিকতা ও দুবর্ৃত্ত রাজনীতির বিপক্ষে সাহস পাবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। ন‍্যায়বিচার, আইনের শাসন ছাড়া কী কোন রাষ্ট্র বা সমাজ ব‍্যবস্থাকে সভ‍্য বলা যায় মাননীয় আদালত? আমরা জনগণ চাই সকলধরণের বৈষম‍্যহীন একটি শান্তিপূর্ণ সভ‍্য সমাজ সেখানে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান, শুধু কাগজ বা সংবিধানে লেখা নয় বাস্তব প্রায়োগিক অর্থেও যার চর্চা থাকবে।
যে দেশে বা সমাজে গণমাধ‍্যম স্বাধীন ও নিরাপদে দায়িত্ব পালন করতে পারে না সেই সমাজ বা রাষ্ট্রকে কী গণতান্ত্রিক বলা যায় মাননীয় আদালত? আজকের (২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১২) দৈনিক সংবাদ একটি তথ‍্য প্রকাশিত হয়েছে। সূত্রমতে, বিগত ৭ বছরের বিএনপি জোট আমলের তিন বছরে ১৪ জন, আওয়ামী লীগের ৩ বছরে ১৩ জন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১ বছরে ১ জন সাংবাদিক খুনের শিকার হয়েছেন। অথচ শেখ হাসিনা তাঁর আমলে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের তথ‍্যগুলি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে কেবল বিএনপি-জামাত আমলের হত‍্যাকান্ডগুলির কথা দেশবাসির সামনে তুলে ধরছেন। একজন প্রধানমন্ত্রী কী আংশিক সত‍্য বা মিথ‍্যা তথ‍্য জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেন। শেখ হাসিনা এই মিথ‍্যা ভাষণ মহান সংসদেও তুলে ধরেছিলেন। এই মিথ‍্যা বক্তব‍্য প্রদানের জন‍্য কী তাঁকে আদালত কোন প্রশ্ন করেছে কখনও?
সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন সব আমলেই ঘটছে। কিন্তু বিচার নেই, খুনিরা রাজনৈতিক কারণে হয় খালেদা (খালেদার আমলে) কিংবা হাসিনা (হাসিনার আমলে) কিংবা তাঁদের দলের কোন না কোন পর্যায়ের নেতার হস্তক্ষেপে নিহত সাংবাদিক পরিবারগুলি আজও বিচার পাচ্ছে না বা পাননি। সাংবাদিক মানিক সাহার পিতাহারা দুই কন‍্যা পর্শিয়া ও নাতাশা, কিংবা শামছুর রহমান কেবলের কন‍্যা সেজুঁতি কিংবা দীপংকর চক্রবত্তর্ীর ছেলে অনিরুদ্ধকে কি দিয়ে সান্তনা দেবো আমরা? সাগর-রুনির হৃদয়ের টুকরো ছোট মেঘ যে ন‍্যায়বিচার পাবে তার নিশ্চয়তা কী আদালত দিতে পারবে? সত‍্য কথা বলাতে যদি আদালত অবমাননার প্রশ্ন আসে তবে সেই সত‍্য আমি বারবার উচ্চারণ করতে চাই! সাগর সরোয়ার, মেহেরুন রুনি আর মাহির সরোয়ার মেঘ এর পারিবারিক এই ছবিটি নেয়া হয়েছে ফেইসবুক থেকে।

Advertisements

One response to “ধৈর্যে‍্যরও সীমা থাকে ।। আদালত অবমাননা এবং সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড

  1. সাংবাদিকদের কোন স্বাধীনতা নেই। সাংবাদিকরা হলেন সংবাদকর্মী, পত্রিকা বা পত্রিকার মালিকের নীতি অনুযায়ী কর্মীরা কাজ করে থাকেন। আর পত্রিকার মালিক তাঁর পুঁজির স্বার্থে সরকারের নীতির সাথে সমঝোতা করে থাকেন। সাংবাদিকের আন্দোলন হলো রুটি রুজির আন্দোলন। চাকুরীর সুযোগ সুবিধার আন্দোলন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা এক কথা নয়। যুদ্ধে যেমন সৈনিক মারা যায়, তেমনি সংবাদ সংগ্রহের যুদ্ধে সাংবাদিক মারা যায়। বাংলাদেশের সাংবাদিকরা রাজনীতি করেন। রাজনৈতিক দলে বিভক্ত। তাই ইউনিয়ন বিভক্ত। দুই ইউনিয়ন দুই রকম বিবৃতি দেয়।

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s