সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড ।। সাংবিধানিক ও আইনের শাসনের নমুনা!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। হাসিনার সরকার আদালতের ওপর বন্দুক রেখে হয়ত গণমাধ‍্যমের টুটি চেপে ধরতে চাইছে! আর তারই অংশ হিসেবে হাইকোর্ট একটি রিটের প্রেক্ষিতে সাগর-রুনির হত‍্যামামলা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনে বিধিনিষেধ জারি করেছে বলে জনমনে ধারণা জন্মেছে। গোটা দেশের সাংবাদিক সমাজ হাইকোর্টের এই আদেশে ক্ষুব্ধ। প্রবাসী একজন সংবাদসহকর্মী হিসেবে ব‍্যক্তিগতভাবে আমিও চরম ক্ষুব্ধ এই আদেশে। আমরা মনে করি, হাইকোর্টের এই আদেশ সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর একটা প্রাতিষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ। আমরা আশা করবো হাইকোর্ট তথা সরকার এই আদেশ প্রত‍্যাহার করে সাগর-রুনিসহ সকল হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার করার ব‍্যবস্থা করবে। আমরা এও আশা করি সরকার দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
দেশের প্রাচীন ঐতিহাসিক বাংলা দৈনিক ইত্তেফাক এর ১ মার্চ সংখ‍্যার একটি রিপোর্টের শিরোনাম হলো “তদন্তের নামে বাণিজ‍্য”। আমাদের বিচারালয়ের অন্ধত্ব দূর করার প্রত‍্যাশা নিয়ে রিপোর্টটি হুবুহু তুলে দিতে চাই। রিেপার্টে বলা হয়, “সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি খুনের ঘটনা তদন্তের নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বাণিজ্যে নেমেছে। নিহত সাগর-রুনির ব্যবহূত মোবাইল ফোনের কললিষ্টের সূত্র ধরে অনেককে আটক করে নেয়া হচ্ছে ডিবি অফিসে। এরপর তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এমন অভিযোগ একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া গেছে। এছাড়া গ্রীল কাটা ডাকাতির ঘটনা সাজানোর জন্য ডিবি পুলিশ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে যে ৪ জনকে আটক করেছে তাদের পরিবারের কাছ থেকেও পুলিশ মোটা অংকের টাকা আদায় করেছে বলে ঐসব পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতি একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির জমি ক্রয়ের জন্য বুকিং দেয়। ১০ ফেব্রুয়ারির আগে ঐ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তার সঙ্গে সাগরের মোবাইল ফোনে কথা হয়েছিল। এর সূত্র ধরে ডিবি ঐ কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে কয়েকদিন আটকে রাখে। পরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে থেকে ডাকাতির অভিযোগে মুরাদ, হানিফ, বশির, নূরুল ইসলামকে আটক করা হলেও গতকাল পর্যন্ত পুলিশ এ ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয়েছে-এমন তথ্য দেয়নি। তবে আটককৃতদের আত্মীয়-স্বজন গতকাল বুধবার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকে দিনভর অপেক্ষা করেছেন। তাদের কাছ থেকেও ডিবি টাকা নিয়েছে বলে অভিযোগ।”
ইত্তেফাকের এই রিপোর্ট পড়ার পরও কী আমাদের হাইকোর্ট বলবে যে, “সরকার সাগর-রুনি হত‍্যা মামলার যে তদন্ত চালাচ্ছে তাতে তারা সন্তুষ্ট”। পুলিশ প্রশাসন যে খুনিদের রক্ষায় তদন্তকাজকে নিজেদের মতো করে সাজাচ্ছে তাতে জনমনে কোন সন্দেহ নেই। কারণ পুলিশ হত‍্যাকান্ডের পর থেকেই একেক সময় একেকরকম এবং অসামাঞ্জস‍্যপূর্ণ তথ‍্য জানিয়েছে। তার একটি বড় প্রমাণ হলো সাগর-রুনির ফ্ল‍্যাটের গ্রিলের ছোট্র কাটা অংশ দিয়ে একটি শিশুও ঢুকেত বা বের হতে পারবে না বলে পুলিশ জানিয়েছিল। অথচ কিছুদিন আগে তারা সেই গ্রিল দিয়ে চুরি/ডাকাতির মহড়া দেয়। নিহতদের ঘর, লাশ ও শরীরে আঘাতসহ অন‍্যান‍্য পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় সাগর-রুনির হগত‍্যাকান্ডকে পরিকল্পিত খুন ছাড়া অন‍্য কিছু ভাবা যায় না। দৈনিক সমকাল এর ১ মার্চের সংখ‍্যায় “পুলিশের মাথায় এখন ডাকাতিতত্ত্ব” শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। রিপোর্টে পুলিশের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় “গ্রিলের কাটা অংশ দিয়ে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে কারও পক্ষে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। কিন্তু পেশাদার অপরাধীদের পক্ষে এটা সম্ভব বলে ব‍্যাপকভাবে যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে”। এথেকে কী প্রমাণ হয় না যে পুলিশ প্রশাসন তথা সরকার সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডকে ধামাচাপা দিতে চায়? পুলিশ আগে মিডিয়ার সামনে যে কথাগুলি বলে ফেলেছে, এখন সেগুলিকে পাল্টানোর চেষ্টা করছে জোড়াতালি দিয়ে। কিন্তু নাটকের মঞ্চায়নটা জনগণের কাছে যে পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ‍্য হবে না সেটা পুলিশ বা সরকার ভালোভাবেই জানে। তাই তারা তদন্তকাজকে বিলম্বিত করছে।
সাগর-রুনির ফ্ল‍্যাটে কত ইউরো ছিল তা কেবলমাত্র সাগর-রুনিরই জানার কথা। পরবর্তীতে দেখা গেলো সাগর-রুনির ১১০০ ইউরোও নাকি খোয়া গেছে! কী করে নিশ্চিত হওয়া গেলো যে সাগর-রুনির ঘরে ১১০০ ইউরোই ছিল! যাহোক তারপরে যুক্ত হয় স্বর্ণালংকার। আজ আবার দেখছি ক‍্যামেরাও খোয়া গেছে। হত‍্যামামলার মূল এজাহারের সাথে একটার পর একটা বিষয় নতুন করে অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। এসবের কারণে হয়ত মামলা ট্রায়াল চলাকালে খুনিদেরই বেশি সুবিধা হবে। যদিও হত‍্যাকান্ডের পরপরই বলা হয়েছিল যে সাগরের আইপড ও ল‍্যাপটপ ছাড়া মূল‍্যবাণ কিছুই খোয়া যায়নি। পুলিশ আরও দাবি করেছিল যে, খুনিরা সাগর-রুনির ঘনিষ্ঠ ও পূর্ব পরিচিত। ছোট্র শিশু মেঘতো স্পষ্ট করেই বলেছিল যে, “দুই আংকেল ডিমভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছে”। এতকিছুর পরও পটুলিশ প্রশাসন তথা সরকার সাগর-রুনির বর্বর হত‍্যাকান্ড নিয়ে কেন খেলছে, তা বুঝতে আর কারও বাকী নেই! খুনিরা যে সরকারের কোন কোন তরফের সাথে ঘনিষ্ট এবং প্রভাবশালি তা কী আর ভেঙ্গে বলার দরকার লাগে, পারিপার্শ্বিক অবস্থাদিই যথেষ্ট।
এবার হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই দৈনিক মানবজমিনের একটি রিপোর্টের দিকে। “সাগর-রুনি হত্যা তদন্ত যাদের জীবনে অভিশাপ” শিরোনামের একটি রিপোর্ট হুবুহু তুলে দিচ্ছি হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন‍্য। রিপোর্টে বলা হয়, “শ্চিম রাজাবাজারের শাহজালাল রশিদ লজ। এ ভবনের একটি ফ্ল্যাটে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি। ভবনের গেটের সামনেই নূরু লন্ড্রি। এ লন্ড্রির মালিক আলাউদ্দিন। খুনের পর পরই তাকে ধরে নিয়ে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হলেও এখন তিনি ভর্তি আছেন হাসপাতালে। কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়। সাংবাদিক দম্পতি খুনের তদন্ত এমন অনেকের জীবনেই এসেছে অভিশাপ হিসেবে। অন্তত ২০ জন শিকার হয়েছেন এমন নির্যাতনের। খুনের ক্লু উদ্ধার ও দায় স্বীকার করাতে এদের ধরে এনে চালানো হয়েছে অমানুষিক নির্যাতন। অনেককে গ্রেপ্তার না দেখিয়ে আটক রাখা হয়েছে দিনের পর দিন। অবশ্য এখন পর্যন্ত একজনকেও আটক রাখার কথা স্বীকার করেনি পুলিশ। জীবনে চরম দুর্ভাগ্য নেমে আসা মানুষগুলোর মধ্যে আরও রয়েছেন রশিদ লজের নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল, হুমায়ুন কবির, সিকিউরিটি ম্যানেজার আবু তাহের, মুন্সীগঞ্জের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি আল আমিন, মুরাদ হোসেন, কামরাঙ্গীরচরের গাড়িচালক হানিফ হাওলাদার, তার স্ত্রী রুমা বেগম, ধানমন্ডির গাড়িচালক বশির উদ্দিন, গাজীপুরের ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি মিলন, শামীম, সোনারগাঁয়ের মারুফদী গ্রামের আবদুল হালিম ও নুরুল ইসলাম, কলাবাগানের ব্যবসায়ী তানভীর ও উত্তরার ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক তৌসিফ। এদের মধ্যে পলাশ রুদ্র পালসহ বাসার ৩ নিরাপত্তারক্ষীকে লাশ উদ্ধারের দিন আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। এরপরও হত্যার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া না যাওয়ায় আটকের দু’দিন পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। মঙ্গলবার রশিদ লজের এক নিরাপত্তারক্ষী জানান, এক দফা ছাড়া পাওয়ার পর পলাশকে আবারও ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কারা নিয়েছে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা সঠিকভাবে জানি না। আলাউদ্দিন এখন হাসপাতালে। ঘটনার পর তাকেও ধরে নিয়ে যায় ডিবি। চালানো হয় নির্যাতন। গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। স্বজনদের সহায়তায় তিনি ঢাকা ছেড়েছেন। আলাউদ্দিনের পরিবারের এক সদস্য জানিয়েছেন, তাকে যেভাবে মারা হয়েছে তাতে তিনি আর কোনদিন স্বাভাবিক হতে পারবেন কিনা সন্দেহ। তিনি জানান, ঢাকায় চিকিৎসা দেয়ার পর পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচতে তাকে এলাকার একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। ৮ দিন ধরে ডিবি কার্যালয়ে আটক রয়েছে ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত গাড়িচালক হানিফ হাওলাদার। গত বুধবার তাকে ধানমন্ডির ২ নং রোড থেকে আটক করা হয়। মঙ্গলবার ডিবি’র একটি সূত্র জানিয়েছে, হানিফের গাড়িতেই খুনিরা সাগর-রুনির ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। মিশন শেষ করে তারা আবার হানিফের গাড়িতে করেই পালিয়ে যায়। এ বিষয়েই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হানিফ এ অভিযোগ স্বীকার করেছে কিনা জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এর বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না।’ ৬ দিন ডিবি কার্যালয়ে ঘোরার পর গত রোববার হানিফের স্ত্রী রুমা বেগমকে ধরে নিয়ে আটকে রাখা হয়। একদিন আটকে রাখার পর মঙ্গলবার তাকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রুমার দেবর বেলাল হাওলাদার। তবে ছাড়া পাওয়ার পর রুমা কোথায় আছে তা জানা যায়নি। বেলাল বলেন, ভাবীকে অনেক মারধর করা হয়েছে। তিনি এখন অসুস্থ। কিন্তু আমার ভাইকে ছাড়েনি ডিবি। রুমার মোবাইল ফোনটি ডিবি’র লোকেরা নিয়ে গেছে বলে জানান বেলাল।”
আদালতের কাছে প্রশ্ন, দৈনিক ইত্তেফাক ও মানবজমিনের উপরোক্ত রিপোর্টের প্রেক্ষিতে কী নির্যাতনকারিদের বিরুদ্ধে কোন ব‍্যবস্থা নেয়া হবে? কিংবা হাইকোর্ট কী এখন কোন রিল জারি করবে? হাইকোর্টকে স্মরণ করে দেবার জন‍্য বলছি, “এই হলো আমাদের স্বদেশে সাংবিধানিক ও আইনের শাসনের নমুনা (পুলিশ যাকে তাকে ধরে নির্যাতন চালাতে এতটুকুও দ্বিধা করে না)। ছবিটি ফেইসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।

About these ads

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s