সাগর-রুনির খুনিদের ধরার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রির অবস্থান পরিবর্তন: একুশে টিভি বন্ধের পাঁয়তারা!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। একুশে টেলিভিশন (ইটিভি) ফের সরকারের টার্গেটে! এবার বিএনপি-জামায়াত জোটের টার্গেটে পরিণত হয়নি এই জনপ্রিয় বেসরকারি টিভি চ‍্যানেলটি। বঙ্গবন্ধু কন‍্যা হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ইটিভির ওপর নাখোশ হয়েছে! তাই তারা গণমানুষের প্রিয় এই টিভি ষ্টেশনটিকে বন্ধ করে দেবার হুমিক দিয়েছে আকস্মিকভাবে। প্রয়োজনীয় বৈধ নথি না থাকাযর কথিত অভিযোগ এনে ইটিভির সম্প্রচার অবৈধ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক বিটিআরসি। ইটিভি কতর্ৃপক্ষ জানিয়েছে সরকারের এই অভিযোগ কাল্পনিক এবং স্বাধীন গণমাধ‍্যমের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের শামিল। আমরা মনে করি, সরকার জনপ্রিয় এই টিভি চ‍্যানেলটিকে বন্ধের পাঁয়তারা চালাচ্ছে। কারণ বেসরকারি এই টিভি চ‍্যানেলটি জনগণের কথা বলছে, মানুষের জয়গান গাইছে। যা শাসকশ্রেণীর ভীতকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। তাই তারা গণমাধ‍্যমের স্বাধীনতা হরণের পথে এগুচ্ছে। কিন্তু এর পরিণাম যে ভালো হবে না তা কী তারা ভুলে গেছে?
২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল উন্মুক্ত টেরিস্টোরিয়াল টিভি ষ্টেশন হিসেবে সম্প্রচারে এসেছিল একুশে টেলিভিশন। খুব অল্প সময়ের মধে‍্যই এই টিভি চ‍্যানেলটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়। ২০০২ সালের ১৪ আগস্ট বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ইটিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০০৫ সালের ১৪ এপ্রিল চ‍্যানেলটি পুনরায় সম্প্রচারের অনুমতি লাভ করে। বিগত মঈন উ আহমেদ ও ড. ফখরুদ্দীন আহমদ’র নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ স‍্যাটেলাইট টিভি চ‍্যানেল হিসেবে সম্প্রচারে আসে।
ব‍্যক্তিগতভাবে আমার একুশে টিভির সঙ্গে আছে একটা পেশাগত আত্মিক বন্ধন। ইটিভি চালুর পরপরই আমি রাজশাহী থেকে সংবাদ পাঠাতে শুরু করি। বিশিষ্ট সাংবাদিক মিশুক মুনীর (সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত) ছিলেন ইটিভির পরিচালক অপারেশন নিউজ। তিনিই আমাকে রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করেছিলেন। একইসঙ্গে খুলনা থেকে দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহা এবং সিলেট থেকে ইকরামুল কবির বিভাগীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ইটিভিতে। পরবর্তীতে অবশ‍্য দেশের একজন স্বনামধন‍্য সাংবাদিক ইটিভির বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দিলে তিনি তার পছন্দের এক সাংবাদিককে (বগুড়া থেকে) ইটিভির রাজশাহী বিভাগীয় প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন। ফলে আমাকে রাজশাহী প্রতিনিধ হিসেবেই কাজ করতে হয়।
সরকার কেন ইটিভির ওপর নাখোশ হলো? স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি প্রশ্ন এসে যায়। বিগত কয়েকমাস ধরে অনলাইনে ইটিভি সরাসরি দেখা যাচ্ছে। প্রবাসজীবনের বিগত তিনবছরে এমন সুযোগ আমি কখনই পাইনি। কিন্তু দুইমাস আগে একদিন হঠাৎ করেই একুশে টিভির অনলাইনের এই সুযোগটি আমার দৃষ্ট আকর্ষণ করে। আর তখন থেকেই স্বদেশের সবধরণের খবরাখবর টাটকা টাটকাই পাচ্ছি আমরা। একইসাথে বিনোদনের অন‍্যান‍্য সুযোগগুলিও আমরা বিনা পয়সায় দেখার বা উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছি। এটা যে শুধু আমি আমরাই পাচ্ছি তা নয়, সারাবিশ্বের বিভিন্ন দেশে যত বাঙালি বা বাংলাদেশি আছেন যাদের ইন্টারনেট একসেস আছে তারা সববাই একুশে টিভি অনলাইনে দেখতে পান। তাছাড়া “একুশের রাত”, “একুশের চোখ”, “জনদুর্ভোগ”, “দেশের কথা জনতার কথা”, “একুশে বিজনেস”সহ ইটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠান ব‍্যাপক জনপ্রিয়তা ও প্রশংসিত হচ্ছে। অনলাইনে স্বদেশী বেসরকারি টিভি চ‍্যানেলগুলিই মূলত: দেশের খবর, বিনোদন উপভোগের একমাত্র বাহন আমাদের যারা আমরা বিদেশে-প্রবাসে থাকি। আসলে দেশকেতো কোন সাচ্চা নাগরিক কখনই ভুলতে পারে না। তাই বিদেশভূমে থাকলেও শত ব‍্যবস্তার মাঝেও আমরা দেশের খবর, প্রিয় মাতৃভূমির রাজনীতি, অর্থনীতি ও জনগণের খবর সবসময় জানতে ইচ্ছে করে। দেশের প্রতি সেই ভালবাসার জায়গা থেকেই আমরা টিভি চ‍্যানেলগুলির ওপর শতভাগ নির্ভরশীল। নিজের ভাষায় নিজ দেশের খবর, আপন দেশের মানুষের সুখ-দু:খের কথা শুনতে পারার আনন্দই আলাদা।
একুশে টিভির সাহসী অনুসন্ধানী নিউজ প্রতিবদেনগুলিও সরকারের রোষানলে পড়ার কারণ হতে পারে। আসলে আমাদের দেশে যে মিডিয়া সেটা সংবাদপত্রই হোক আর টিভি চ‍্যানেলই হোক জনগণের হয়ে ওঠলেই তার ওপর সরকারি খড়ক নেমে আসে! এটা নতুন কিছু নয়। একুশে টিভি জনগণের জন‍্য লড়ছে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লড়াই চালাচ্ছে। সমাজের কদযর্ অনাচার, দুনর্ীতি ও অনিয়মগুলি দেশপ্রেমিকের মতো তুলে ধরছে জনগণের সামনে। সত‍্য জাতির সামনে তুলে ধরছে আর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস‍্যাগুলি নিয়ে বিশ্লেষণ ও সমাধানের পথ দেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছ ইটিভি। তাই হয়ত নির্বাচিত “গণতান্ত্রিক!” সরকারও “স্বৈরাচারি!” ভূমিকায় অবতীর্ণর্ হয়ে গণমাধ‍্যমের টুটি চেপে ধরার উদ‍্যোগ আয়োজন চালাচ্ছে। আর তারই বহি:প্রকাশ বিটিআরসি কতর্ৃপক্ষের “মিথ‍্যা অভিযোগ” এ ইটিভির কাছে পাঠানো নোটিশ! চট্রগ্রামে সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস‍্য’র দুনর্ীতির ওপর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করায় ইটিভির বিরুদ্ধে একটি মানহানি মামলাও করা হয়েছে। বিটিআরসি কতর্ৃপক্ষ বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ‍্যমে ইটিভি কতর্ৃপক্ষের কাছে নোটিশ পাঠিয়েছে। ইটিভির যদি কোন কাগজপত্রে সমস‍্যা থেকেও থাকে (জনগণের বিশ্বাস কোন সমস‍্যাই নেই) তবে কেন এত তাড়াহুড়া নোটিশ পাঠানোর, এই নোটিশটাতে সাধারণ রেজিষ্ট্র ডাকযোগেও পাঠানো যেতো!
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ১২ মার্চের মহাসমাবেশের খবর সরাসরি সম্প্রচার না করার জন‍্য বেসরকারি টিভি চ‍্যানেলগুলির প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে নিষেধ করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, “মহাসমাবেশ সরাসরি স¤প্রচার করা হবে কীনা তা বিটিআরসি থেকে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে।” তারা আমাদের লাইসেন্স দেয়। তাই যখন তারা এভাবে জিজ্ঞেস করে তখন ধরেই নেওয়া যায়, এটা এক ধরনের শাসানো।” সূত্র বিডিনিউজ২৪
টিভি রিপোর্টার সাগর ও রুনি নিজ ঘরে দুবর্ৃত্তদের হাতে খুন হলেন। আর প্রধানমন্ত্রি বললেন কারও বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। আজ আবার বেশি কথা বলা (আসলে ডযিনি ভালো করে গুছিয়ে কোন কথাও বলতে পারেন না) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি সাংবাদিকদের জানালেন সাগর-রুনি হত‍্যাকারিদের কতদিনে ধরা সম্ভব হবে তা জানানো সম্ভব নয়। অথচ এই মন্ত্রিই আগে জানিয়েছিলেন যে ৪৮ ঘন্টার মধে‍্যই খুনিরা ধরা পড়বে। এত বেহায়া, নির্লজ্জ মিথ‍্যাচার কোন সভ‍্য মানুষ করতে পারেন কিনা তা আমরা জানি না? সরকার খুনি ধরতে পারে না, খুনের রহস‍্য উৎঘাটন করতে পারে না, কিন্তু মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে। দেশে কোন যুদ্ধ নেই, অথচ কেবলমাত্র বিরোধীদলের একটা সমাবেশ ঘিরে গোটা দেশজুড়ে সরকার একটা চরম আতংকাবস্থা সৃষ্টি করেছে। ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সারা দেশ থেকে। রাতে ঢাকায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) নামানো হয়েছে। ফেইসবুকাররা লিখছে ঢাকায় যেন কারফিউ চলছে এখন! আবার একুশে টেলিভিশনের খবরে সাধারণ মানুষ ব‍্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এভাবে, “এই সরকার হরতাল করতে করতে ক্ষমায় এসেছে। অনেকদিন ধরে তারা হরতাল করে না। তাই তারা যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে হরতালের মহড়া দিচ্ছে। সাধারণত যেখানে বিরোধীদল হরতাল ডাকে সেই কাগটি এবার সরকার ও সরকারি দলই কের দিল!”
উপসংহারে টানতে চাই একুশে টেলিভিশন কতর্ৃপক্ষকে ধন‍্যবাদ ও অভিনন্দন জানিয়ে। এই ধন‍্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি তাদের সাহসী ভূমিকার জন‍্য, জনগণের পক্ষে কথা বলার জন‍্য। বিটিআরসি কতর্ৃপক্ষের নোটিশের জবাব দিয়ে ইটিভি একটি রিপোর্টও প্রচার করেছে। এই সাহস ও সততা আর সতে‍্যর সঙ্গে সংগ্রামী জনতাও থাকবে ইটিভির সঙ্গে। এগিয়ে যাও একুশ, মাথানত করো না কোন অন‍্যায়ের কাছে। ছবিটি গুগল থেকে নেয়া।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s