নরসিংদীর রাষ্ট্রীয় গণহত‍্যা ও মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম‍্যানের তদন্ত ইচ্ছা!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ।। “লিমন কৃত্রিম পায়ে ভর দিয়ে হেঁটে এখানে এসেছে, এতে আমরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছি। এটা তার নতুন জীবনের পথে পা বাড়ানোর জন্য একটি নতুন অধ্যায়। চেয়ারম্যান বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারি কোন তদন্তেই লিমন যে সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এ অভিযোগের কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার বিরুদ্ধে যে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও সাজানো দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে আমরা আশা করি নিম্ন আদালত থেকেই লিমন ন্যায়বিচার পাবে। তাকে সাজানো মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে। যদি তা না হয় তাহলে মানবাধিকার কমিশনের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উচ্চ আদালতে লিমনকে সবরকম আইনি সহায়তা দেয়া হবে। আমার বিশ্বাস উচ্চ আদালত থেকে আমরা খালি হাতে ফিরব না। যারা লিমনকে পঙ্গু করেছে অবশ্যই তাদের আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে রাষ্ট্রের উচিত হবে তাদের আইনের মুখোমুখি করে প্রাপ্য শাস্তি দেয়া। তা না হলে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হবে যে অন্যায় করেও পার পাওয়া যায়।”
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম‍্যান অধ‍্যাপক ড. মিজানুর রহমান উপরোল্লিখিত বক্তব‍্য দিয়েছিলেন জাতির সামনে। দৈনিক সংবাদ এ প্রকাশিত অধ‍্যাপক মিজানের বক্তব‍্যটি এখানে হুবুহু তুলে দেয়ার একটা কারণ আছে। কমিশনকে বিশেষত: মিডিয়া ও কমিশন চেয়ারম‍্যানকে স্মরণ করিয়ে দেয়াই আমার উদদেশ‍্য। কমিশন চেয়ারম‍্যানের এই কথাগুলির একটিও বাস্তবায়ন করেনি সরকার এক বছর পার হবার পরও। পাঠক আপনারাই বিবেবচনা ও বিচার করুন আমরা এখন কোন দেশে বাস করি! এখন আজকের বাস্তবতার দিকে একটু নজর দেয়া যাক।
নরসিংদীতে একইসঙ্গে ছয়জনকে হত‍্যা। ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের স্রষ্টা এলিটফোসর্ একেবার একেকরকম বক্তব‍্য দিচ্ছে ঘটনার বিষয়ে। কখনও বলছে ডাকাতির প্রস্তুতি। আবার বলছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। কোনটা সঠিক তা র‍্যাবও বলতে পারবে না। কারণ জন্মের পর থেকেই মিথ‍্যা গল্প সাজাতে সাজাতে সত‍্য-মিথ‍্যা এখন তারা গুলিয়ে ফেলেছে। তাদের কাছে সত‍্য হলো ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার নয়তো বন্দুকযুদ্ধ। ব‍্যস, সব ঘটনার এখানেই শেষ। বিচারালয়, আইনপ্রণেতা, বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া সবাই হজম করছে এই মিথ‍্যাচার। আর ক্ষমতার লিপ্সায় বুদবুদ রাজনৈতিক দলগুলি (সব দল নয়), সরকার ও রাষ্ট্রতো নিজেই এই খুনের হুকুমদাতা। মাঠপর্যায়ে এই অমানবিক কাজটা করে শুধু র‍্যাব আর পুলিশ। নরসিংদীর মানুষ হতভম্ব এই গণহত‍্যায়! সবাই বোঝেন, জানেন সত‍্য। কিন্তু অসহায়, কোন কিছুই করার নেই তাদের। রাষ্ট্র যেখানে খুনি, হত‍্যাকারি সেখানে সাধারণ মানুষেরই কীইবা করার আছে? নরসিংদীতে ভিকটিম পরিবারগুলির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই ছয়হত‍্যা পরিকল্পিত। হত‍্যার কারণ সাজানো গল্প। নিহতদের স্বজনরা প্রশ্ন তুলেছেন যে, মাত্র ৪০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাকে উপলক্ষ করে (তাও অভিযোগ কতটুকু সত‍্য তা নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ ও বিতর্ক আছে) ছয়টি মানুষের জান (প্রাণ) কেড়ে নিতে পারে র‍্যাব, রাষ্ট্র? এ কোন দেশে বাস করছি আমরা? কারা দেশ চালায়, দেশের আইন-কানুন আদালত রাখারই বা দরকার কী তবে?
যাহোক স্বদেশে শত শত কমিশন আছে। যার অধিকাংশই মেরুদন্ডহীন, কাগুজে বাঘ!বাস্তবে কোন কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না বা করতে চায় না এসব কমিশন। কমিশনের কাজ আইন ও সংবিধানকে সমুন্নত রেখে সত‍্যটা দেশজাতির সামনে তুলে ধরা এবং অন‍্যায়-অবিচার যাতে বন্ধ হয় তার সুপারিশ করা। কিন্তু দু:খের বিষয়, কমিশনের সদস‍্যদের অধিকাংশই নিযুক্ত হন রাজনৈতিক মতাদর্শগত যোগ‍্যতার ভিত্তিতে। ফলে যা হবার তাই হয়, দেশ, সমাজ গল্লায় যাক তাতে তাদের কী? বেতন ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও পদ পদবি ঠিক থাকলেই হলো!
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়্যারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান মনে করেছিলেন দেশে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড কমেছে। তাই তিনি আশান্বিত হয়েছিলেন। এখন আবার শংকিত, উদ্বিঘ্ন! তিনি তার স্বভাবজাত ভঙ্গিমায় আবার মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমরা মনে করি এটিকে যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন- এনকাউন্টার, ক্রসফায়ার কিংবা বন্দুকযুদ্ধ- কোনভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রের প্রতি বিরাট হুমকি।” একইভাবে একইরকম বক্তব‍্য দিয়েছিলেন তিনি কলেজছাত্র লিমন হোসেনের পা র‍্যাবের গুলিতে নষ্ট হয়ে যাবার পর। একটি করে ঘটনা ঘটবে আর তিনি একবার করে উদ্বিঘ্ন, চিন্তিত হয়ে মিডিয়ার শিরোনাম হবেন। তারপরই দায়িত্ব শেষ। তিনি এর আগেও অনেক ঘটনার পরপরই তদন্ত করা হবে বলে দেশবাসিকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোন কোন ঘটনায় তদন্ত করে কী ধরণের সত‍্য উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে তার কমিশন তা দেশবাসি এখনও জানতে পারেন নি। দেশের মানুষ এক এক করে সবাই ধারাবাহিক প্রকৃতির নিয়মে কবরে যাবার পরও তার কমিশনের কোন রিপোর্ট আলোতে আসবে বলে মনে হয় না!
অধ‍্যাপক মিজান ‘যদি’ শব্দের ব‍্যবহার করে বলেছেন, “আমরা পূর্ণ কমিশনে নরসিংদীর ঘটনা নিয়ে আলোচনা করবো। আর পূর্ণ কমিশন যদি সিদ্ধান্ত দেয় এবং প্রয়োজন মনে করে তাহলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অবশ্যই ঘটনার তদন্ত করবে।” কী আশ্চর্য‍্য! আমাদের মানবাধিকার কমিশন প্রধানের বক্তব‍্য শুনে আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের গা জ্বলে যায়! কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীন অথর্ব ও মেরুদন্ডহীন হলে আমরা এমন কথা বলতে পারি। তিনি এর আগে সীমান্তে বিএসএফ’র হত‍্যাকান্ডের ঘটনায় জাতিসংঘে যেতে চেয়েছিলেন। অথচ দেশের ভেতরেই প্রায় প্রতিদিনই পশুপাখির মতো মানুষ হত‍্যা করছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী! এসব ঘটনার প্রতিকার চাইতে তিনি কোথায় যাবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়!
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম‍্যানের কাছে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে! মাননীয় চেয়ারম‍্যান আপনি কী তবে হাসপাতালে কী লিমনের শরীরের অবস্থা দেখে মানুষের কাছে মহৎ সাজার জন‍্য, বাহবা পাবার জন‍্যই সেদিন কেঁদেছিলেন? কেন লিমনের ওপর এখনও রাষ্ট্রীয় মিথ‍্যা অভিযোগের মামলাগুলি চলবে? আপনি কী অন্ধ, আপনার কমিশন কী সরকারের ভাবমূর্তি মানবাধিকার লংঘণের চাদরে ঢেকে দেবার কমিশন? দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন‍্য কিছু একটা করে দেখানোর ইচ্ছে কী আপনার ও আপনার কমিশনের জাগে না? সন্ত্রাসী হলেই কী কাউকে মেরে ফেলাটাই আইনের শাসন, মানবাধিকারের শাসন? আর ক’দিনই বা বাঁচবেন। মেরুদন্ডটা একটু সোজা করে দাঁড়ানোর চেষ্টা কী করবেন না আপনারা? দেশটাকে কী রাষ্ট্রীয় খুনি, ডাকাত-চাঁদাবাজদের দেশে পরিণত করার মিশনই আপনাদের কমিশনের মহান ব্রত? প্লিজ ঘুরে দাঁড়ান, কমিশনের যতটুকুই স্বাধিন ক্ষমতা থাকুক না কেন, কমিশনের আপনারা যারা সদস‍্য তাদের সবার সমাজে একটা ভাবমূর্তি আছে সেই ভাবমূর্তিটা অন্ত:ত ধরে রাখার জন‍্যই কিছু একটা করুন। অন্ত:ত একটা দুটা মানবাধিকার লংঘণের ঘটনার সত‍্য রিপোর্ট জাতির সামনে তুলে ধরুন। জাতি আপনাদেরকে মনে রাখবে দীর্র্ঘদিন! ছবিটি দৈনিক সংবাদ এ প্রকাশিত এবং গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s