রেডক্রস বিপদাপন্ন মানুষের আশ্রয়স্থল: যেখানেই বিপদ বিপর্যয় সেখানেই রেডক্রস


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। যেখানেই বিপদ, মানবিক বিপর্যয় সেখানেই রেডক্রস। পরিপূর্ণ নিরপেক্ষ একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন। বিশ্বময় যার কর্মপরিধি। মানবতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং নিরপেক্ষতা সংগঠনটির মূল নীতি। দুর্যোগ মোকাবেলা ও ত্রাণ তৎপরতা পরিচালনাকারি এই সংগঠনটি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। রাজনৈতিক ও ধর্ম থেকে স্বাধীন একটি মানবিক প্রতিষ্ঠান। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী, দেশ, কালের উর্দ্ধে উঠে সব মানুষের প্রতি সমান আচরণই যার প্রধান উদ্দেশ্য। রেডক্রস শুধু মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারই করেনা। বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি কেবল সহানুভূতি, ভালবাসা প্রকাশই করেনা। মানুষ যাতে নিরাপদে, শান্তিতে, সুস্থ্য ও স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে তার জন্যও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

ফি-বছর বহু, শত সহস্র লাখো নারী-পুরুষ ও শিশুকে বিপদের লেলিহান শিখা থেকে উদ্ধার করে আনছে রেডক্রস। এই মহান সংস্থাটি মানুষকে কেবল সাহায্য-সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। সবাইকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। রেডক্রসের মানবিক তৎপরতায় অনেকেই বেঁচে যাচ্ছেন। রেডক্রসের কাছে ধনি, গরিব, সাদা, কালো মুখ্য নয়, বড় কথা হলো মানুষ ও মানবতা। মানুষ ও মানবতার মুক্তিদূত হিসেবেই বিশ্বজুড়ে কাজ করে চলেছে রেডক্রস।

মানুষের জন্য কী দিন, কী রাত সর্বদাই হাত বাড়িয়ে দেয় রেডক্রস। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ঝড়, বৃষ্টি-বাদল, আগুন, সাইক্লোন, সুনামিতে মানুষের অসহায় করুণ বিপর্যয় থেকে বিপন্ন মানুষের মনে আশার আলো জ্বালিয়ে বিপর্যয় থেকে মানুষকে টেনে উপরে তোলার কঠিন সংগ্রামী কাজটিই করে চলেছে এই অরাজনৈতিক সংগঠনটি। নিজের জীবনকে বাজি রেখে রেডক্রসের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায় মানুষের খোঁজে।

একটি নিরাপদ সমাজের প্রত্যাশায় মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়টুকুতে মানবতার প্রতীক এই সংগঠনটির কর্মীরা ছুটে চলেন সারাক্ষণ। কঠিন পরিস্থিতি মানুষকে উদ্ধারের সবচেয়ে কঠিন ও শক্ত কাজটি করে রেযক্রসের স্বেচ্ছাকর্মীর দল। রেডক্রস নিজে কোথাও যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ বাধায়না। কিন্তু যুদ্ধ ও কনফ্লিক্টের মাঠে মানুষের জীবন বাঁচানোর চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান তৈরীতেও সহায়তা করে। ইউরোপ থেকে এশিয়া, আফ্রিকা থেকে আমেরিকা সবখানেই মানবতার গান গেয়ে চলেছে রেডক্রস। মানুষের বিপর্যয় ঠেকানোই অন্যতম মূল কাজ এই মানবিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটির। এই স্বাধীন সংগঠনটি তরুণ প্রজন্মকে নানাধরণের বাস্তবমুখী প্রায়োগিক প্রশিক্ষণ দিয়ে মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলার উপযোগি করে তুলছে।

১৮৬৩ সালে জেনেভায় ইন্টারন্যাশনাল হিমানিটারিয়ান ল’য়ের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস(আইসিআরসি)গঠনের মাধ্যমে হেনরি ডুনান্ট ইন্টারন্যাশনাল রেডক্রস এবং রেডক্রিসেন্ট আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন। যে আন্দোলনে আজ প্রায় ১০০ মিলিয়ন স্বেচ্ছাকর্মী যুক্ত হয়েছেন। যুদ্ধ, বিবাদ, সংঘাত ও সহিংসতাসহ নানাকারণে মানুষ আজ বিপন্ন ও অসহায়। বলা চলে গোটা পৃথিবীজুড়েই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন মানুষ। উপরন্তু আছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, সুনামি, ভূমিকম্পসহ নানান প্রাকৃতিক আক্রমণ। উভয় প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত মানুষদেরকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ছাড়াও অন্যান্য সহায়তা ও নিরাপত্তা দেবার চ্যালেঞ্জিং প্রচেষ্টা কখনও থামায়নি রেডক্রস। রেডক্রসের এই মহান প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আছে নানামুখী বিড়ম্বনা। বিশেষ করে যুদ্ধ ও কনফ্লিক্টজোনে এই চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন এবং কঠিনতর। তবুও থেমে নেই রেডক্রসের মানবিক সহায়তার হাত। বরং উত্তরোত্তর এই হাত প্রসারিতই হচ্ছে বলা যায়।

রেডক্রস নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার আলোচনায় আসতে চাই। সময়টা সম্ভবত গত বছরের অক্টোবর মাস। শহরের হৃদয় বলে পরিচিত সুবিশাল ট্রমসো গ্রন্থাগারে রেডক্রসের একটি লিফলেট পেয়েছিলাম। তারপরে একদিন ভকসনোঅপ্লারিংগা’য় ক্লাশে রেডক্রস ট্রমসোর এক নারী কর্মী গিয়েছিলেন। তিনিই সেখানে ট্রমসো রেডক্রসের বিভিন্ন কর্মকান্ড সম্পর্কে আমাদের বয়স্ক ছাত্রদের জানালেন নানান তথ্য,আমরা যারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছি নরওয়েতে তাদেরকে। রেডক্রসের সঙ্গে ফ্রিভিলিগ কাজ করার ইচ্ছে আমার দীর্ঘদিনের। ভকসনোঅপ্লারিংগার আলোচনার পর রেডক্রসে ফ্রিভিলিগ হিসেবে নিজেকে যুক্ত করার বাসনা বেড়ে গেলো কয়েকগুণ। মনে মনে এটাও ভাবলাম সেখানে ফ্রিভিলিগ হয়ে কাজ করলে নরওয়েজিয়ান ভাষা প্রাকটিসটাও করা যাবে। যাহোক একদিন চলে গেলাম রেডক্রস ট্রমসো কার্যালয়ে। সেখানে প্রথমেই পরিচয় ঘটে ওমজর্গ কোঅর্ডিনেটর নীনা মুয়ে নিলসেন এর সঙ্গে। আধা ইংরেজী আধা নরওয়েজিয়ানে মিলিয়ে সেদিন উনার সঙ্গে কথা বলেছি। আমার ইচ্ছে জানার পর উনি আমাকে একটি ফরম দেন। সেটা পূরণ করে দিয়ে চলে আসি ফিরে। পরের সপ্তাহেই নীনার ই-মেইল বার্তা পাই। সপ্তাহে একদিন শুরু হলো রেডক্রসে ফ্রিভিলিগ কাজ।

রেডক্রসে কাজ করে যে জিনিসটা বোঝা গেলো তা হলো সামআরবাইড ও গণতন্ত্রের বাস্তবিক চর্চা। যেকোন কাজেই সবার মতামতের গুরুত্বটা একেবারেই সমান। সেটা হোক না কেন অফিসের বস বা চিফ কিংবা সাধারণ একজন ফ্রিভিলিগ। সবার মতামতের মূল্যটা সমান। একে একে রেডক্রসের অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হলো। একসাথে বসা, খাওয়া আর কাজ করা সবই যেন একটা সামআরবাইড। কেউ কোনটা না বুঝলে তাকে সেটা না বোঝানো পর্যন্ত যেন সংগ্রাম চলতেই থাকে। ট্রমসো রেডক্রসের ডাগলিগ লিডার টুর ইরিকসন আপাদমস্তক ভদ্র ও মিতভাষী একটা মানুষ। কী সুন্দর ও ধৈর্য্য সহকারে তিনি সবার কথা শোনেন। গরমের দেশ থেকে এসেছি বলে তিনি বারবার জিঞ্জাসা করেন শীতে কোন সমস্যা হচ্ছেনাতো তোমার (আমার)?

ইয়োন, কাই কী পরম মমতায় কম্পিউটারের খুঁটিনাটি জিনিসগুলি শিখিয়ে দেন। নীনা মুয়ে সদাহাস্যোজ্জ্বল বন্ধুবৎসল। অসম্ভব অমায়িক, দিনমান কাজ নিয়েই ব্যস্ত। টিছিটা জিরমা’ও(ফ্লেরকুলটুর কোঅর্ডিনেটর) হেল্পফুল একজন কর্মী। উনিই আমাকে প্রথম কোভালোয়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন সিফারেনে। যা ছিল সিতে আমার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা। রেডক্রসে পরিচয় হয়েছে এমন আরও বহু ভালো মানুষের সঙ্গে যারা সবাই একেকজন যেন আমার অনেকদিনের বন্ধু। একতা, সামআরবাইড আর নিরপেক্ষতা ও সার্বজননীতার প্রায়োগিক বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম ট্রমসো রেডক্রসে যুক্ত হবার পরই।

ট্রমসো রেডক্রসের সঙ্গে যুক্ত হবার আগেই গ্রন্থাগারিক সিগরিড ফোসলান্ডের মাধ্যমে আমার পরিচয় হয় বেয়ারনে জোহানেস কাস্টনেস এর সঙ্গে। মি. বেয়ারনে আমার মাতৃভূমিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে রেডক্রসের কর্মী হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছিলেন। মহান মুক্তযুদ্ধের সময়টা হলো ১৯৭১ সাল। তথনও আমি জন্মগ্রহণ করিনি। তাঁর কাছ থেকেই রেডক্রস আমার দেশে কিভাবে বিপন্ন মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করেছে তার একটা ছোট্র ইতিহাস শুনেছি। এই ঘটনাটির একটি ছোট্র বর্ণনা দিয়েই লেখার উপসংহারে যাবো।
ফিরোজা নামের সেই ছোট্র মেয়েটির বয়স এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ নরওয়ের নাগরিক। কে তার বাবা-মা কোথায় তার বোনেরা? বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই মানুষটি এসবের কিছুই জানেন না। কিন্তু রক্তের বন্ধন কী যায় ছেড়া? ফিরোজা আজও খুঁজে ফেরেন তার প্রিয় ভাই ও বোনদেরকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে পাক শত্রুরা অতর্কিত হামলা করে নিরীহ ঘুমন্ত মানুষগুলির ওপর। এরপর বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। র্দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর শত্রুপক্ষ বুঝতে পারে যে তাদের আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন উপায় নেই। তাইতো বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে তখন পাক শত্রুরা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, আহত হন আর্ও লক্ষ লক্ষ মানুষ। দুই লাখ মা-বোন তাদের মর্যাদা হারান পাক শত্রুদের দ্বারা। বহু শিশু এতিম হয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকালে। তাদেরই একজন ফিরোজা। পাক শত্রুদের সর্বোতভাবে সহায়তা করে ঘাতক রাজাকার বাহিনী জামায়াত।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকালবেলার কথা। আজকের রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন বস্তি এলাকা। রেডক্রসের অ্যাম্বুলেন্স সেখান থেকে বহু গুলিবিদ্ধ মানুষকে তুলে নিয়ে যায় হলিফ্যামিলি হাসপাতালে। আহতদের মধ্যে ফিরোজাও ছিল। ফিরোজার বয়স তখন ৭ বা আট। এর বেশি নয়। ১৯৭২ সালের ২৮ জানুয়ারি বাংলা সংবাদপত্রে দৈনিক বাংলা’য় (সম্ভবত) একটি বক্স রিপোর্ট ছাপা হয়। সেই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর রাতে ফিরোজা গুলিবিদ্ধ হন। তার বাম উরুতে গুলি লাগে। ফিরোজারা ছিল চার বোন এবং এক ভাই।তার আরেক বোনের নাম রোকেয়া। ফিরোজা তার বাবা-মায়ের নাম জানাতে পারেননি সেইসময়। ফিরোজার বাবা-মা কী পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হয়েছেন? ফিরোজার ভাই ও বোনেরা কী আজও বেঁচে আছেন?
১৯৭২ সালের ১২ মার্চ ফিরোজাকে দত্তক নেন নরওয়ের এক মানবতাবাদী মানুষ। পেয়ার ওট্রো ইসভেয়ারকোরুড নরওয়ের রাজধানী ওসলোর অনতিদূরের একটি শহর এলফেরুম শহরে নিয়ে আসেন ফিরোজাকে। মি.পেয়ার রেডক্রসের কর্মী ছিলেন সেইসময়ে। পেয়ার তাঁর পরিবারে নিজের সন্তানের স্নেহে ফিরোজাকে মানুষ করেন। ফিরোজা আজ অনেক বড়। আরেক মানবতাবাদী বেয়ারনে জোহাননেস কাস্টনেসও রেডক্রসের কর্মী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি বাংলাদেশে কর্মরত ছিলেন। তিনিই ফিরোজার সম্পর্কে জানালেন। বেয়ারনে জানান,ফিরোজা তার বাবা-মা ও বোনদের খোঁজে শিগগিরই বাংলাদেশে যাবেন।
যাহোক, ফিরোজারা বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে এতিম হয়েছেন। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না আজও! স্বাধীনতার ৪০ বছর ইতোমধ্যে চলে গেলো।
বিপদাপন্ন মানুষের আশ্রয়স্থলের নাম রেডক্রস। যেখানেই বিপদ বিপর্যয় সেখানেই রেডক্রস। যতদিন এই পৃথিবী থাকবে, রেডক্রসও বেঁচে থাকুক ততদিন যাবৎ মানুষের মানবতার কল্যাণে কাজ করুক। যাদের শক্তি, সামর্থ্য, মানসিকতা এবং ফাঁকা সময় আছে তারা সবাই এই স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে রক্ষা করবে মানবিক বিপর্যয়। এমন প্রত্যাশা করেই লেখার ইতি টানছি। জয় হোক মানুষ, মানবতা আর রেডক্রসের। শান্তি, সাম্য আর ভাতৃত্বের একই সুতোর বন্ধনে আবদ্ধ হোক আমাদের এই পৃথিবী। ছবি গুগল থেকে নেয়া। লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলার সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/), (editor.eurobangla@yahoo.de)

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s