Daily Archives: 09/05/2012

শিল্পচর্চা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং কার্টুনিষ্ট আরিফের মায়ের প্রস্থান!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। কার্টুনিষ্ট আরিফুর রহমান কে কে চেনেন না বাংলাদেশে? শুধু বাংলাদেশেই নয় তিনি আজ সারাবিশ্বের নির্যাতিত কার্টুনিষ্টদের প্রতীক এবং যিনি কেবলমাত্র মতপ্রকাশ ও শিল্পচর্চার কারণে মাতৃভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। অসুস্থ্য মাকে রেখে এসেছিলেন স্বদেশে। সেই মা চলে গেছেন অনেক দূর, বহুদূর যেখানে আমরা সবাই যাবো একদিন এবং যেখানে গেলে কেউ আর ফেরেন না প্রিয় বন্ধু আরিফের মাও আর আসবেন কোনদিনও।
কার্টুনিষ্ট আরিফের মা আয়েশা খানম আলো (৪৪) গত ১২ এপ্রিল (বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টায়) মারা গেছেন। ২০১০ সালে থেকে তিনি কিডনির সমস্যাজনিত রোগে ভুগছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের সংকুলান না করার কারণে তাঁর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়নি। আরিফের বাবা মতিউর রহমান। মৃত্যুকালে মা আলো স্বামী, দুই সন্তান ও অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন রেখে গেছেন।
কার্টুনিষ্ট আরিফের মায়ের মৃত্যুর সংবাদটি আজই জানলাম। কী দুর্ভাগ্য দেখুন বাংলাদেশের কোন মিডিয়াতেই এই খবরটির জায়গা হয়নি। কত নির্মম, বেদনার ও কষ্টের! অথচ মিডিয়াগুলি বিনাবিচারে হত্যাকারিরা যদি এক বোতল ফেনসিডিলও উদ্ধার করে তাও রিপোর্ট করে।
বাংলাদেশের বাংলা দৈনিক প্রথম আলো ও ইংরেজী দৈনিক স্টারের মালিক লতিফুর রহমান মাত্র ক’দিন আগে নরওয়ে থেকে “সৎ ব্যবসায়ী ও একজন সফল ভালো উদ্যোক্তা” হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি সেখানে জানিয়েছেন যে বাংলাদেশে নাকি গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে! ২০০৭ সালে কার্টুনিষ্ট আরিফ একটি কার্টুন এঁকেছিলেন লতিফুর রহমানের মালিকানাধীন প্রথম আলোর সাপ্তাহিক রম্য ম্যাগাজিন ‘আলপিন’ এ। এরপর মৌল্লারা আলপিন, প্রথম আলো ও কার্টুনিষ্ট আরিফের ওপর চড়াও হয়। ধর্মীয় উগ্রবাদী মোল্লাদের কাছে সরকার এক পর্যায়ে নতি স্বীকার করে। সরকারের দোদুল্যমানতার কারণে মোল্লাদের কাছে মতপ্রকাশ ও শিল্পচর্চার স্বাধীনতাও নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়! ২০০৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আরিফকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাঅভ্যন্তরেই আরিফের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ২০০৮ সালের ২০ মার্চ আরিফ মুক্তিলাভ করেন। ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর দেশ থেকে পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন তিনি। বর্তমানে তিনি নরওয়েতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।
লতিফুর রহমানরা পুরস্কার পান। কিন্তু সেই লতিফুর রহমানদের কাগজে শিল্পচর্চা করার জন্য একজন উদীয়মান তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হলেও লতিফুর রহমানরা কোন সাহায্য-সহযোগিতা করেননি আরিফকে। শুধু তাই নয় আরিফকে আলপিনের কার্টুনিষ্ট পদ থেকে বরখাস্ত করেন। কার্টুনিষ্ট আরিফের বিরুদ্ধে এখনও একটি মহল কুৎসা রটাচ্ছে। তার নামে মিথ্যা বদনাম প্রচার করছে। লতিফুর রহমানরা আলপিনের সম্পাদক সুমন্ত আসলামকেও বরখাস্ত করেন ওইসময়ে।
ব্যবসায়ী লতিফুর রহমানের মালিকানাধীন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান প্রায়ই সরকারের প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়ছেন। এমনকি জাতীয় সংসদেও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি তুলছেন সরকার দলীয় কতিপয় এমপি। আদালত অবমাননার খড়কতো আছেই। এইতো কিছুদিন আগে দেশের আরেক নামী সাংবাদিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ারকে হত্যার হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা। ২০১২ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি জনপ্রিয় সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর ও রুনিকে হত্যা করলো দুর্বৃত্তরা।
১৯৮৪ সাল থেকে দেশে এ পর্যন্ত ৩০/৩৫ জন সাংবাদিক, সম্পাদক, লেখক হত্যা হয়েছেন। কোনটারই সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি। যমুনা টিভির পরীক্ষামূলক সম্রপ্রচার বন্ধ করা হলো। এর আগে সিএসবি নিউজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চ্যানেল ওয়ান বন্ধ করলো সরকার। দৈনিক আমার দেশের প্রকাশনাও হাসিনা সরকার বাতিল করেছিল। একুশে টিভির বিরুদ্ধে এখনও ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। সরকার বেসরকারি টেলিভিশনগুলিকে বাধ্য করেছে সরকারি খবর প্রচার করতে! কিন্তু তারপরও লতিফুর রহমানরা কী করে বলেন যে দেশে গণমাধ্যম পূর্ণ স্বাধীন?
মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে লতিফুর রহমানরা শান্তি পুরস্কার পাক তাতে আমাদের কিছুই যায় আসে না! কিন্তু আরিফরা যে স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা করতে পারে না, সাংবাদিকদের (সাধারণ মানুষের জীবনও সেখানে নিরাপদ নয়) জীবন যে নিরাপদ নয়, সাংবাদিকরা যে সেখানে স্বাধীনভাবে লেখালেখি করতে পারেন না, আসিফ নজরুলদের বিরুদ্ধে যে আদালত অবমাননার ছড়ি ঝুলছে তা কী কেউ অস্বীকার করতে পারেন?
আরিফের মার আত্মা শান্তিতে থাকুক, মিথ্যুক ও সুবিধাবাদিরা পরাভূত হোক, জয় হোক সত্যের- এই প্রত্যাশা করেই লেখার সমাপ্তি টানছি। ছবি কার্টুনিষ্ট কিশোর