সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক স্বপ্ন, কিন্তু…!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। আমার প্রিয় শহর রাজশাহী যেখানে আছে আমার জীবনের সিংহভাগ অংশের নানান স্মৃতি সেই শহর থেকে এক অজানা মানুষের কাছ থেকে একটি ছোট্র মেসেজ পেলাম ফেইসবুকের মেসেজবক্সে। প্রিয় মানুষগুলিও সেখানেই থাকেন। হাসান আজিজুল হক, মলয় ভৌমিক, সনৎ কুমার সাহা, কল্পনা রায়,গোলাম আরিফ টিপু, অরুণ বসাক, এ বিএম হোসেন, ডা. সৈয়দ শাপিকুল আলম, এস এম আবু বকর, মোহাম্মদ নাসের, মাহাবুবা কানিজ কেয়া, চম্পা সমাদ্দার, মাসতুরা খানম, খানম মমতাজ আহমদ, সাঈদউদ্দিন আহমদ, প্রশান্ত সাহা, রেবেকা সরেন, এনামুল হক, আবুল কালাম আজাদ, বরজাহান আলী শাহজাহান, আবেদা রায়হান বুলিসহ আরও কত শতজন। পেশাগত সহকমীর্রাতো আছেনই।
যাহোক অচেনা এই মানুষটি পেশায় একজন সাংবাদিক। প্রশ্ন করে বললেন, “আপনি এত স্পষ্ট করে বলেন ও লিখেন কিন্তু দেশ ছেড়ে এতদূরে কেন? যদিও অনেকের কাছ থেকেই আপনার কথা শুনেছি। দেশে কী ফেরা কোনভাইবেই সম্ভব নয়? আপনার মতো এখানে খুব দরকার।” ফেইসবুকে অনেকেই ছদ্মনাম ব‍্যবহার করেন। তাই কিছুটা সংশয়, কিছুটা দ্বিধা ও সন্দেহ নিয়ে একটা উত্তর দিলাম।
আমি তাকে লিখলাম, “আমি জানিনা আপনি আপনার স্বনামে আছেন নাকি ছদ্মনামে। তবুও আপনাকে ‘—‘ (নারী না পুরুষ বলতে চাই না) বলেই সম্বোধন করি আপনাকে কী বলেন? কেউ কী শখে কোনদিন মায়ের ভূমি ছাড়ে? দুইটি বা বড়জোর তিনটি কারণে দেশ ছাড়ে মানুষ। এক. অথর্নৈতিক, দুই. রাজনৈতিক এবং তিন. শিক্ষা বা চাকুরির সন্ধান। এগুলির কোনটাই আমার সঙ্গে মেলে না। তবে দুবর্ৃত্ত রাজনীতি আর দুনর্ীতিবাজ চক্রই আমার জীবনটাকে বদলে দিয়েছে। আমিতো শুধু চেয়েছিলাম স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা পেশাকে মানুষের কল‍্যাণে কাজে লাগাতে। সেটাই হলো কাল। সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যড়যন্ত্রে নামলো। যারা সবাই আমার লেখালেখির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বহু বছর আগে। তারা জরুরি অবস্থায় সুযোগ নিলো। আমার বিরুদ্ধে মিথ‍্যা অভিযোগ আনলো চাঁদাবাজির। অথচ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আমিই সোচ্চার ছিলাম সবসময়। যাইহোক সেটা ভাগে‍্যর এক নির্মম পরিহাস! আমি বেঁচে আছি, ভালো আছি। অজানা ভিনদেশী সংস্কৃতি, কঠিন ঠান্ডা আবহাওয়া আর ভিন্নভাষার সঙ্গে টিকে থাকার একটা যুদ্ধ বা লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে নিরন্তর। আমিতো একটা পিপড়ার মতো। আমার কোন শক্তি নেই। আমার চেয়েও অনেক ভালো মানুষ, সাংবাদিক যারা অনেক বেশি দেশপ্রেমিক তারাতো আছেনই, লড়ে যাচ্ছেন মানুষের জন‍্য। আমি, আমার মতো একটা অপদাথর্ সেখানে কীই পরবর্তন করতে পারবে? কিছুই না। তবুও যদি সেখানে আত্মমর্যাদা আর জীবনের নিরাপত্তা থাকতো তবে চলে যেতাম। কিন্তু সেটাতো আর ইহজনমে পাওয়া যাবে না! তাই আর কী দূর থেকে যেভাবে মাকে ভালোবাসা যায় সেটুকুই করে যাচ্ছি, আর কী?”
কেউ কী কখনও নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারে, কেউ কী কখনও নিজের ক্ষেত্র যা তার কাছে স্বপ্ন, ভালবাসা, প্রেরণা তা থেকে পালিয়ে যেতে চায়? কখনও না। কিন্তু তারপরও মানুষ কখনও কখনও পালাতে চায়। কিন্তু কেন? আত্মসম্মান, মযর্াদাবোধ রক্ষায় কখনও কখনও মানুষ ভীরুতার আশ্রয় নিতে বাধ‍্য হন। কেউ কেউ হয়ত এটাকে কাপুরুষতা বলেও গালি দিতে চাইবেন। কিন্তু স্রোতের বিপরীতে চলাটা কী অত সহজ? হয়ত নদী বা সমুদ্রে স্রোতের বিপরীতেও কখনও সাঁতরানো যায়, কিন্তু ষড়যন্ত্র আর শয়তানির স্রোতকে অতিক্রম করা বোধহয় কোনদিনও যায় না। বিশেষ করে কোন সমাজ যখন পচে যায়, যে সমাজে ন‍্যায়পরায়নতা, মানবতা, বিচারবুদ্ধি-বিবেক নির্বাসনে চলে যায় সেই সমাজেতো কোনভাবেই সম্ভব না।
কোন পরিস্থিতিতে কী কঠিন বেকায়দায় পড়লে মানুষ জীবন নিয়ে পালিয়ে বাঁচতে চায়? তার অভিজ্ঞতাতো ব‍্যক্তিগতভাবে আমারও আছে। তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পেলাম নবীন এই সাংবাদিক বন্ধুর পাল্টা উত্তরে। তিনি লিখেছেন, “ধন্যবাদ ভাই। আমি এখানে রাজশাহীতে কাজ করি একটা দৈনিকে। জার্নালিজমে প্রথম বর্ষ থেকেই কাজ শুরু করেছিলাম। তারপর হলো প্রমোশন। সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক স্বপ্ন। তাই আগেভাগেই মফস্বলে এই দু:সাহসিকতা দেখাতে এসেছি। এখন মনে হচ্ছে এই সাংবাদিকতা জগৎটাই যেন নোংরামিতে ছেয়ে গেছে। মফস্বলে যেন এটি আরো বেশি। ‘—-‘ সাংবাদিকদের জন্য আরো ভয়ংকর ব্যাপার মনে হচ্ছে। এখন পড়ালেখাটা কমিপ্লট এর আশায় আছি। সম্মান নিয়ে ভাগেত চাই এখান থেকে।”
পাল্টা উত্তরে লিখলাম, “হ‍্যাঁ ওখানে দুবর্ৃত্তরাই ভালো, বিশেষ করে সুশিল সমাজ এবং রাজনীতিক, ব‍্যবসায়ী এই দলভুক্তরা (ব‍্যতিক্রম আছে অবশ‍্যই) যারা নোংরামি করতে পারে, ষগযন্ত্র করতে পারে, প্রশাসনের দালালি করতে জানে বা পারে, যারা চাঁদাবাজি করতে পারে, যাদের আয়ের সঙ্গে ব‍্যয়ের সঙ্গতি নেই, যারা মানুষকে বিপদে ফেলতে পটু তারাই সফল ও নামকরা মানুষ বনে যান। যাহোক নিজেকে নারী ভাবার কোন কারণ নেই। হয়ত সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমাজ নারীকে অবদমিত করে রাখতে চায় বা চাইবে কিন্তু মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা যায়! তবে সমস‍্যা হলো ষড়যন্ত্র যখন প্রশাসনের সঙ্গে হাত মেলায় তখন সংকট ও পরিস্থিতিটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে ওঠে। সেটা নারীই হোন আর পুরুষই হোন। আমি ব‍্যক্তিগতভাবে হাজার লাখো প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেছি বলতে গেলে একাই। কিন্তু যখন প্রশাসন দুবর্ৃত্ত রাজনীতিক/মেযর ও সাংবাদিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলো তখনই মায়ের ভূমিতে বসবাস করা হয়ে উঠলো কঠিন, ও যেন এক কেয়ামত। জীবনের সর্বোচ্চ শক্তির প্রচেষ্টা করেও সেখানে টিকতে পারিনি। যারা চাঁদাবাজি করবে দিনভর তারাই বলবে আপনাকে আপনিই চাঁদাবাজ। আত্মঘাতি ষড়যন্ত্র আর শয়তানিতে সাংবাদিকদের জন‍্য রাজশাহী বাংলাদেশে সবচেয়ে বাজে জায়গা। তারপরে যদি আপনার কোন বিশেষ দল বা রাজনীতি না থাকে তাহলেতো মরেছেন! কোন না কোন রাজনৈতিক দলেভুক্ত হয়ে নিজের পক্ষের লোকেরা সবসময় ভালো (হাজারো অন‍্যায় করলেও) এবং প্রতিপক্ষের সমর্থকেরা খুবই খারাপ (সে যতই ভালো কাজ করুক) এমন সাংবাদিকতা করতে পারলে আপনার কোন সমস‍্যাই হবে না। সাথে পাবেন অনেক বকশিশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গিফট ইত‍্যাদি। সেটা শুধু সাংবাদিকতার নয় এটা দেশে চলমান দুবর্ৃত্ত রাজনীতিরই ফসল। যাহোক আপনার সাফল‍্য প্রত‍্যাশা করি। ভালো থাকুন। রাজশাহীতে শত্রু-মিত্র সকল সাংবাদিক বন্ধুদের শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা। সবচেয়ে বেশি মিস করি আমি সাধারণ মানুষগুলিকে যাঁরা দুবর্ৃত্তদের সঙ্গে কঠিন লড়াই করেও কোনমতে টিকে থাকছেন সেই মৃতু‍্যকূপে, তাঁদেরকে। বিশেষ করে নিযর্াতিত অসহায় মানুষগুলিকে আমার সবসময় মনে পড়ে।”

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s