Daily Archives: 20/05/2012

বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড ও সাংবাদিক হত‍্যা: পুরস্কারপ্রাপ্ত এক ব্লগারের মানসিকতা!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশের কেউ কেউ সীমানা পেরিয়ে আর্ন্তজাতিক পুরস্কার পাচ্ছেন। এতে বাঙালি হিসেবে আনন্দবোধ করি বটে। কিন্তু তাদের অনেকেই সীমানা পেরিয়ে গেলেও মনের সীমাবদ্ধতার সীমানা পেরুতে পারছেন না কেন সেই প্রশ্নটি সামনে আসছে বারবার! একজন ব্লগার, না শুধু ব্লগার বললে ভুল হবে রীতিমতো নামকরা বিখ‍্যাত। হাল আমলে তিনি বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন (সম্ভবত যদি ভুল না হয় হংকং টুরের আগে এবিষয়ে লেখালেখি শুরু করেছেন তিনি)। তাও আবার কোন পুরস্কার পাবার আশায় কিনা সেটা জানা নেই! তিনি যে সংস্থার রিপোর্টার সেই সংবাদ সংস্থার আবার পুরস্কারদাতা জার্মানির গণমাধ‍্যম প্রতিষ্ঠানটির একটা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তি আছে। অর্থাৎ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পকর্। অন‍্যদিকে বাংলাদেশ থেকে যিনি বিচারক ছিলেন তার সঙ্গেও ওই ব্লগারের আছে মধুর সম্পর্কের। তিনি অবশ‍্য বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ডের বিরুদ্ধে কাজ করেন সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই, কোন পুরস্কার পাবার আশায় নয়।
সে যাইহোক লেখার মূল বিষয়ে আসা যাক। সেই ব্লগার কাম সাংবাদিক “Say no to extra judicial killings in Bangladesh” নামের একটি ফেইসবুক গ্রুপে সদস‍্য হবার জন‍্য আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমিও সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গ্রুপে যোগ দিলাম। এরপর থেকেই মাঝে মাঝে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড এবং সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে পোষ্ট করতে থাকি। সর্বশেষ গত ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ‍্যম দিবসে একটা পোষ্ট করি বাংলাদেশে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের বিষয়ে। লেখাটির শিরোনাম ছিল “বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যম দিবস: বাংলাদেশে বেপরোয়া সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন ও দায়মুক্তি”। এরপর আর ঢোকা হয়নি গ্রুপে। আজ মনে মনে একটা সিদ্ধান্ত নিলাম যে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড নিয়ে একটা পোষ্ট দেবো ওই গ্রুপে। সে লক্ষ্যে গ্রুপে প্রবেশ করা। সেখানে গিয়ে আশ্চযর্‍্য ও অবাক হলাম। কারণ আমি আর গ্রুপের সদস‍্য নই। কিন্তু কেন? গ্রুপের পক্ষ থেকে কেউ কোন নোটিশ কিংবা কিছুই জানায়নি আমাকে।
গণতন্ত্রের প্রথম ও প্রধান শর্তগুলির মধে‍্য সহনশীলতা অন‍্যতম। সেই সহনশীলতা ছাড়া যেমন গণতন্ত্র টেকসই হয় না, তেমনি কাউকে কোন কিছু না জানিয়ে তাকে কোন গ্রপ থেকে বাদ দেয়াটাও সভ‍্যতার সাক্ষ‍্য বহন করে না। বিচারবহির্ভূত হত‍্যাকান্ড নিয়ে গ্রুপ করে কিংবা উদ্দেশ‍্যমূলকভাবে লেখালেখি করে কোন পুরস্কার পাবার আশা আমার কোনকালেই ছিল না। আজও নেই। এপ্রসঙ্গে কিছু ব‍্যক্তিগত তথ‍্য জানিয়ে রাখা ভালো। র‍্যাব বা এলিট ফোসর্ গঠনের আগে বিএনপি-জামাত অপারেশন ক্লিনহাটর্ শুরু করে মানুষ হত‍্যা করে। ওই অপারেশনে ৫৮ জন মানুষ নিহত হয়। তখন থেকেই মূলত: আমি বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে শুরু করি। যার ধারাবাহিকতা অব‍্যাহত ছিল র‍্যাপিড একশান ব‍্যাটালিয়ন বা র‍্যাবের হাতে অন‍্যায়ভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতনের ঘটনার আগদিন পর্যন্ত। জেল থেকে বেরিয়ে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড নিয়ে বইও লিখেছি (বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা)। এছাড়া আমার ওপর বর্বর নির্যাতনের বিষয়ে আরেকটি বই লিখি যেটি প্রকাশ করার জন‍্য বাংলাদেশের নামকরা, বিখ‍্যাত প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু কেউ প্রকাশ করেনি। “অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা” নামের বইটি পরবর্তীতে বাধ‍্য হয়ে নিজেই প্রকাশক সেজে ছাপি ডানা প্রিন্টার্স থেকে।
“বিচারবহির্ভূত হত‍্যাকান্ড এবং প্রতিহিংসা”, “জঙ্গি গডফাদার ও অন‍্যান‍্য প্রসঙ্গ”, “অন্ধকারে ১৫ ঘন্টা”, “উদীচী থেকে পিলখানা” বাংলা বইগুলির ইংরেজী ভার্সন “PAIN” (http://www.amazon.ca/Pain-Jahangir-Alam-Akash/dp/1456858025) এ ছাপা হয়েছে। এই বইটি আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড, সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন, আদিবাসি হত‍্যা-নির্যাতন, ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু হত‍্যা-নির্যাতন এবং বাংলাদেশের জন্ম ও ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা দলিল হয়ে রইবে বইটি।
২০০৪ সালে খুলনায় সাংবাদিক মানিক সাহা, হুমায়ুন কবির বালু নিহত হলেন। বগুড়ায় মার্ডার হলেন দীপংকর চক্রবত্তর্ী। সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিছিল-সভা সমাবেশ করার জন‍্য কাউকে কাছে পাওয়া খুব সহজসাধ‍্য ছিল না। বাধ‍্য হয়ে একাই রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছি। ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি আমিই প্রথম দেশে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাই।
ব‍্যক্তিগত প্রসঙ্গ নিয়ে আর লেখার কলেবর বাড়াতে চাই না। একটা কথা বলে রাখা ভালো মুক্ত গণমাধ‍্যম, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে আমার অবস্থান ছিল পরিস্কার। কখনও কোন রাজনৈতিক দলের দালালি করিনি বা কারও কাছ থেকে কোন সুবিধা-উপঢৌকন গ্রহণ করিনি। কোন পুরস্কার পাবার আশায় কিংবা জার্মানি, অষ্ট্রিয়া বা ইউরোপে আসার জন‍্যও সাংবাদিকতা করিনি। যা করেছি একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছিমাত্র। পাশাপাশি একজন নাগরিক হিসেবে সমাজের প্রতি একটা দায় আছে বলে আমি মনে করি। সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে মাঝে মাঝে কিছু একটা করার চেষ্টা করেছি। বহু মানুষ বিশ্রি ও অসভ‍্য ভাষায় গালমন্দ করে এবং ডাহা মিথ‍্যা ও কাল্পনিক বক্তব‍্য লিখে আমার লেখা ও পোষ্টে মন্তব‍্য করছেন, কিন্তু কারও মন্তব‍্য কোনদিন মুছে ফেলিনি। এটাইতো গণতন্ত্র। অন্যের মতামত পছন্দ নাও হতে পারে আমার। কিন্তু তার মতামতের একটা মূল‍্যতো আছেই।
পরিশেষে ওই বিখ‍্যাত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্লগারের কাছে একটা প্রশ্ন রাখলাম কাউকে কোন গ্রুপের সদস‍্য হবার আমন্ত্রণ জানানোর পর আবার তার সদস‍্যপদ বিনা নোটিশেই খারিজ করে দেয়াটার কোন নৈতিকমূল‍্য বা গণতান্ত্রিক মূল‍্য আছে কিনা? ছবিটি ২০০৫ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজশাহীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্ট থেকে তোলা। ছবিতে বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড বন্ধ এবং সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বন্ধ ও সকল সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের বিচারের দাবিতে মাথায় কালোকাপড়ের টুপি পরে এবং হাত বেধে দাঁড়িয়ে আছি আমি নিজেই। র‍্যাব পরে আমাকে আমার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে এভাবেই মাথায় কালো কাপড়ের টুপি পরিয়ে উপরে ১৫ ঘন্টা ধরে ঝুলিয়ে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করে। জরুরি অবস্থার মধে‍্যও র‍্যাবের হত‍্যা-নির্যাতনের বিষয়ে বই লিখেছি।