Daily Archives: 28/05/2012

আর কত রক্ত চায় ওরা!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। সাংবাদিক সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পরও ঝড় উঠেছিল মিডিয়াপাড়ায়। সভা-সমাবেশ, গায়ে আগুন ধরানোর মতো সাংবাদিক নেতাদের বক্তৃতা, প্রতিবাদ, নিন্দা, হতাশা, আতংক, উদ্বেগ প্রকাশের সেই ঝড় থেমে গেছে। এরপর পারভেজ খানের ওপর হলো সন্ত্রাসী হামলা। পারভেজ খান ক্রাইম বিটের সাংবাদিক। নামকরা একজন সংবাদকর্মী। সেই ঘটনায়ও নিন্দা জানালেন সাংবাদিকরা। সম্ভবত এরপর কিংবা আগে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারোয়ারকে হত‍্যার হুমকি। বেশ কিছু সম্পাদক (সবাই নন, কেন তার বর্ণনা করার দরকার আছে বলে মনে করি না) বিবৃতি দিলেন। নিউএইজ সম্পাদক নূরুল কবিরকেও হুমকি দেয়া হয়েছে অসংখ‍্যবার। মিডিয়া ও সাংবাদিকদের ওপর মানহানি আর আদালত অবমাননা মামলার আক্রমণতো হরহামেশাই ঘটছে স্বদেশে। একুশে টিভির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। বহু মিডিয়া বন্ধ হয়েছে, অনেকে জেল, সাংবাদিকদের কারাদন্ড ভোগ করেছেন। এইতো সেদিন ঢাকার রাজপথেই পুলিশ পেটালো দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর আলোকচিত্র সাংবাদিক খালেদ সরকার, জাহিদুল করিম ও সাজিদ হোসেনকে। একটার পর একটা সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে আর আমরা নিনন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েই চুচাপ বসে থাকবো। ফলে পরবর্তী নির্যাতনের ঘটনাটিও ঘটবে অবলীলায়, বাধাহীনভাবে। ফলে সর্বশেষ আজ ঘটলো বিডিনিউজ২৪ এর কার্যালয়ে আক্রমণের ঘটনা। সন্ত্রাসীরা রীতিমতো বিডিনিউজ কার্যালয়ে রক্তের বন‍্যা বইয়ে দিয়েছে! আজ সন্ধ‍্যায় তারা সেখানে হামলা চালায়। ঘটনা ঘটার পর পুলিশ, র‍্যাব গিয়ে সাঁড়াশি অভিযানে নামবে, কিন্তু কোন ফল দিতে পারবে না। কিংবা তারা গিয়ে পাহারা বসাবে। ঠিক যেভাবে র‍্যাব এখন পাহারা বসিয়েছে বিডিনিউজ২৪ এর কার্যালয়ে!
হাসপাতালে আশংকাজনক অবস্থায় ভর্তি হওয়া সাংবাদিক বন্ধু বিডিনিউজ২৪ এর সহসম্পাদক রিফাত নওয়াজ, প্রতিবেদক সালাউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতম এবং অফিস সহকারী রুহুল আমিন এর জন‍্য রক্ত প্রয়োজন বলে ফেইসবুকে একজন স্ট‍্যাটাস দিয়েছেন। আমার গ্রুপ ও পজিটিভ। কিন্তু দু:খিত স্বদেশ থেকে অনেক দূরে আছি। তাই সম্ভব না রক্ত দেয়া। আশা করছি রক্ত ম‍্যানেজ হয়ে যাবে। সাংবাদিক বন্ধুরা সুস্থ‍্য হয়ে ওঠবেন। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে সারাদেশজুড়েই সাংবাদিকরা এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর বিবৃতি দিয়ে সংবাদপত্রের পাতা ভরে দেবেন। সবাই জানাবে আক্রমণকারিদের গ্রেফতারের দাবি। রাজনীতিকরা (কী সরকারি দল কী বিরোধী দল) হাসপাতালে দেখতে যাবেন আহত বা নির্যাতত সাংবাদিকদের দেখতে। কেউ কেউ আবার চিকিৎসার ভার নেয়ার ঘোষণাও দেবেন! এসব লোক দেখানো আর নাম ফুটানো কর্মকান্ডের ফলে খুনি ও নির্যাতনকারিরা আঁড়াল হয়ে যাবে। যেমনটা আমরা দেখছি জীবনভর। আর বিবৃতির ভেতরে হামলাকারি ঢাকা পড়বে, হারিয়ে যাবে কিংবা মিলিয়ে যাবে। র‍্যাব-পুলিশের সাঁড়াশি বলেন আর চিরুনি অভিযান বলেন কোন অভিযানই খুনি ও সন্ত্রাসী বা নির্যাতনকারিদের থামাতে পারবে না, পারেনি, পারছে না!
কিন্তু এভাবে আর কতকাল সাংবাদিকরা হত‍্যা-নির্যাতনের শিকার হবেন। সাংবাদিক সমাজের বিবেক খুলবে কবে, কবে উনারা এক কাতারে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন মানুষকে মুক্ত দিন, নিরাপত্তাবিঘ্নকারিদের ধরুন, আইন ও সংবিধানের শাসন কায়েম করুন? কবে এই সাংবাদিক সমাজ দলমতের উদ্ধর্ে উঠে পেশাগত ঐক‍্য, দৃঢ় ঐক‍্য গড়ে তুলতে সমর্থ হবেন? এটা না করলে যে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন চলতেই থাকবে, এই বোধটুকু কবে জাগবে আমাদের সংবাদকর্মীদের? সাংবাদিকদের শরীর থেকে আর কত রক্ত বেরুলে আমরা একটা ঐক‍্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ পাবো? আর কত রক্তের বিনিময়ে রাষ্ট্র মুক্ত গণমাধ‍্যম ও সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের জন‍্য একটা নিরাপদ সমাজ ব‍্যবস্থা উপহার দিতে পারবে? আর কত রক্ত চায় আমাদের দুবর্ৃত্ত রাজনীতি?
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি মুখ খুলুন, কিছু একটা বলুন ২৪ ঘন্টা না হয় ২৪ মাস, কিছুতো একটা বলতেই হবে আপনাকে! আর আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের যিনি নহর বইয়ে দিচ্ছেন দেশে সেই প্রধানমন্ত্রি আপনি কেন চুপ করে আছেন এখনও? আপনিও বলুন যে আপনারা সন্ত্রাসমুক্ত একটি দেশ উপহার দিয়েছেন বাঙালি জাতিকে এবং আরও বলুন যে আপনি এবং আপনার মহাজোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলিই সবচেয়ে ভালো চালাচ্ছে দেশ! আর যাই বলুন জনগণ কিন্তু কথা নয় কাজ দেখতে চান। মানুষ চান শান্তি, নিরাপদে নিশ্চিন্তমনে ঘুমুতে। সেই রকম কোন উপহার কী জনগণকে দিতে পেরেছেন আজ অবধি? ছবি ফেইসবুক থেকে নেয়া।

প্রসঙ্গ: সাংবাদিক সাগর-রুনি নিয়ে লেখালেখি ।। একটি বামবুর্জোয়া উপদেশ


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশের বামবুর্জোয়া একটি রাজনৈতিক দলের এক তরুণ নেতা আমাকে একটি উপদেশবার্তা পাঠিয়েছেন! উপদেশের সারমর্ম হলো আমার লেখাগুলি অন‍্য কোন গ্রুপে দেয়া যাবে না। “সাংবাদিক সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ড নিয়ে আমার সর্বশেষ লেখায় কেউ লাইক দেননি এমনকি মন্তব‍্যও করেননি” এমন মন্তব‍্যও করেছেন বামপন্থি (বর্তমানে হাসিনাপন্থি বলাই শ্রেয়) এই রাজনৈতিক বন্ধুটি। আমি জানি না বন্ধুটির উপদেশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে কিনা? প্রিয় পাঠক আপনারাই তা বিবেচনা করুন।
কারও লেখার প্রতি কারও দ্বিমত থাকতেই পারে, খুবই স্বাভাবিক ব‍্যাপার! তবে কারও লেখার লাইক, ডিসলাইক বা মন্তব‍্য এসবের ওপর ভালমন্দ নির্ভর করে না! তারপরও আপনার উপদেশের জন‍্য আপনাকে ধন‍্যবাদ। আমি যা লিখি তারজন‍্য কোন বাহবা বা পুরস্কার কিংবা পছন্দ অপছন্দ ও মন্তব‍্য পাবার আশায় লিখি না। মনের মধে‍্য যে চিন্দাগুলি ঘুরপাক খায়, যেসকল প্রশ্ন জাগে সেগুলি কেবল তুলে ধরার চেষ্টা করিমাত্র। কিন্তু আপনি যেভাবে বললেন সেভাবে কোন এডমিন আমাকে আজ পর্যন্ত জানায়নি। আর আমি নিজে উদে‍্যাগী হয়ে কোন গ্রুপের সদস‍্য হতে যাইনি কখনও। আমি একজন অতি নগন‍্য ও সামান‍্য একটা প্রাণী, মানুষ হবার সংগ্রাম করি। হালুয়া/রুটি নিয়ে কখনও ভাবিনি, ভাবতেও চাই না। রাজনৈতিক পছন্দ অপছন্দকে কখনও আমি আমার পেশার বা লেখালেখির মধে‍্য এক করে দেখিনি, দেখতেও চাই না। তারমানে এই নয় যে জামাতিরা, যুদ্ধাপরাধীরা আমার বন্ধু! জীবনের তিন ভাগের দুই ভাগই নষ্ট করেছি এসব শয়তানদের বিরুদ্ধে পেশাগত ও রাজনৈতিক লড়াই করার পেছনে।
আরেকটি কথা কেউ বা কোন গ্রুপ যদি মনে করে আমি তাদের জন‍্য বিব্রতকর তাহলে তিনি বা তারা আমাকে তাদের গ্রুপ থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারেন আমার কোন আপত্তি থাকবে না। যেমনটি করেছে বাংলাদেশের একজন নামকরা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্লগার কাম সাংবাদিক! আর সব লেখা সবাইকে ভালো লাগবে এমনটাও নয়। প্রতিটি লেখকেরই আছে নিজস্বতা, একটি স্বতন্ত্র স্টাইল।
আসলে রাজনৈতিক এই বন্ধুটির উপদেশের একটা অন্তনর্িহিত অর্থ বা তাৎপর্য‍্য আছে! আর তা হলো দেশে যে রাষ্ট্রীয় অরাজকতা চলছে, আইনের শাসন ও সংবিধানের লংঘণ চলছে, মানবাধিকার লংঘণ চলছে, সাংবাদিক হত‍্যা-নির্াতন চলছে এসব নিয়ে যাতে লেখালেখি না করি তারই একটা প্রচ্ছন্ন হুমকি আছে উপদেশের ভেতরে। একসময়ের বিপ্লবী এবং বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখানোর রাজনৈতিক দলটির এই নেতার রাজনৈতিক দলটি মহাজোট সরকারের অংশিদার। বিচার ব‍্যবস্থাকে দলীয়করণ, সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনকারিদের গ্রেফতার না করাসহ নানান বিষয় নিয়ে লেখালেখি করলে কী আর সরকারপন্থি কারও ভালো লাগে বলুন? তারপর যদি পরমত সহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক মন-মানসিকতা কিংবা আইনের শাসন ও মানবাধিকারে বিশ্বাস না থাকে তাহলে কী আর কোন সমালোচনা কারও পছন্দ হয়?
এই রাজনৈতিক বন্ধুটির সবচেয়ে প্রিয় সরকার এখন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি মন্টু ঘোষকে পেটায়, রাজনৈতিক নেতাদের গুম করে, বিচারক ও বিচারালয়কে নিজের মতো করে ব‍্যবহার করে, ক্ষমতাগ্রহণের সাড়ে তিন বছর পরও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করতে পারে না, ব‍্যবসায়িদের আড্ডাস্থলে পরিণত করেছে মহান সংসদকে, সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনিদের আঁড়াল করে, ঢাকার রাজপথে সাংবাদিক-ফটো সাংবাদিকদের পিটিয়ে পঙ্গু (প্রতিবন্ধি) করে দেয়, জাতীয় সম্পদ তেল-গ‍্যাস সাম্রাজ‍্যবাদিদের হাতে তুলে দেবার চিন্তা করে, মানবাধিকার লংঘণ করে। আর এসব নিয়ে লেখালেখি করলে কী আর এই বন্ধুটির সহ‍্য হয়, বলুন? পাদটীকা: ঠিক লেখাটি যখন শেষ করবো তখন ফেইসবুকে গিয়ে দেখলাম একটা ভয়ানক খবর। সন্ত্রাসীরা বিডিনিউজ২৪ এর কার্যালয়ে গিয়ে সাংবাদিকদের এলোপাতাড়ি পিটিয়েছে। সংবাদকমর্ীদের লাল রক্তে রঞ্জিত হয়েছে বিডিনিউজ এর কাযর্ালয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর এর সহ সম্পাদক রিফাত নেওয়াজ এবং প্রতিবেদক সালাহউদ্দিন ওয়াহিদ প্রীতমের পায়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে সন্ত্রাসীরা। গুরুতর অবস্থায় তাদের দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এরপরও কী এই রাজনৈতিক বন্ধুটি বলবেন যে হাসিনা এবং তাঁর মহাজোট সরকার দেশ ভালো চালাচ্ছেন? ছবি বিডিনিউজ থেকে নেয়া