সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড।। ঢাকায় সাংবাদিক সমাবেশে হামলা, মুন্নি-মামুন ও এটিএন বাংলার কী পরিকল্পনা?

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। আমার ভীষণ লজ্জা হচ্ছে এই জন‍্য যে আমিও দীর্ঘ দুই দশক ধরে সাংবাদিকতা করেছি বাংলাদেশে! আমার বন্ধু শওকত মিল্টন যিনি বরিশাল থেকে আর আমি রাজশাহী থেকে কাজ করতাম। পরে এই বন্ধুটি ঢাকায় চলে গেলেন। আমি কোনদিনও রাজশাহী ছেড়ে যেতে চাইনি। আর এজন‍্যই হয়ত আজ আমি মাতর্ৃভূমি ছাড়া। কিংবা আমি হয়ত স্রোতের বিপক্ষে সাতরাতেই পছন্দ করতাম বেশি। তাই রাজশাহীর প্রতি বাড়তি প্রেম ও ভালোবাসার টানেই হয়তো সেখানেই পড়ে থাকতে চেয়েছিলাম। আমার ভেতরে জনপ্রিয় বা বিখ‍্যাত হবার কোন আকাঙ্খাই কাজ করেনি কখনও। যাহোক প্রসঙ্গ সেটা নয়। আজ দু’একটি কথা লিখতে চাই সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের বিচার দাবিতে সাংবাদিকদের চলমান আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনের সর্বশেষ পরিণতি কোন দিকে যেতে চাইছে তা নিয়ে।
১৯৮৪ সাল থেকে দেশে এ পর্যন্ত ৪২ জন সাংবাদিক ও একজন জনপ্রিয় লেখক নিহত হয়েছেন। বলতে গেলে কোন ঘটনারই কার্যকর ও সঠিক তদন্ত হয়নি আজও। প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়েনি। আর কোনদিন পড়বেও না। তাই আমার সাফ কথা সাংবাদিক হত‍্যার বিচার চাই না চাই আইনের শাসন ও প্রকৃত গণতন্ত চর্চা।
একটা দেশের গণতন্ত্র কোন পর্যায়ে কার্যকর আছে তা অনেকটা নির্ভর করে সেই দেশ ও সমাজে বসবাসরত মানুষ বিশেষ করে সুবিধাভোগী ও অর্থ বিবেচনায় উন্নত শ্রেণীর মানুষদের ভেতরে সহনশীলতার মাত্রা কী পরিমাণ ক্রিয়াশীল তার ওপর। সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর যখন সংখ‍্যাগরিষ্ট সাংবাদিক সমাজ একত্রিত হয়ে খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানাচ্ছেন ঠিক তখনই এটিএন বাংলার চেয়ারম‍্যান তথাকথিত ডক্টর মাহফুজুর রহমান লন্ডনে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক মেহেরুন রুনির চরিত্র হননের খেলায় মেতে ওঠলেন। অথচ তারই (মাহফুজের) প্রতিষ্ঠানে রুনির ঘাম ঝরানো কষ্ট ও আনন্দ বেদনার বহু স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাসী তারা হয়ত মাহফুজের বিরুদ্ধে পাল্টা বক্তব‍্য দিতে পারেন, কিন্তু মাহফুজকে বা তার ওপর কিন্তু কোন আক্রমণ করতে পারে না। সেটা কেউ করেওনি। নিয়মতান্ত্রিকপন্থায় সাংবাদিক সমাজ মাহফুজুর রহমানকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। মাহফুজ রহমানও তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে শিল্পী ও সুহৃদদেরকে মাহফুজের পক্ষে মাঠে নামানোর প্রচেষ্টা নেন। বাংলা সমাজের তথাকথিত অগ্রসর অংশের সুবিধাভোগী ও তোষামদকারি-চাটুকাররা সবসময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। নাটক প্রচার, সঙ্গীত পরিবেশন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং খবরের নায়ক হবার মতো লোভ ক’টা মানুষ (তথাকথিত ওপরতলার মানুষেরা, সবাই নন) সামলাতে পারে, বলুন?
রাজধানী ঢাকায় আজকের ঘটনার একটা ছোট্র বিবরণ দেয়া দরকার। বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, ১১ ফেব্রুয়ারি নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনি ও সাগর সরওয়ারের হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও বিচার দাবিতে আজ ২৪ জুন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এতে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের নেতারা অংশ নেন। মানববন্ধন শুরুর পর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির মৃত্যুর জন্য এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমানকে দায়ী করে তার কার্যালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি ঘোষণার দাবি জানান। তিনি বলেন, “সাংবাদিক সাগর-রুনির মৃত্যুর জন্য এটিএন বাংলার চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান দায়ী। তার কার্যালয় ঘেরাও করার কর্মসূচি ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছি।” তার বক্তব্য শেষ করার পর এটিএন বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি শওকত মিল্টন তেড়ে গিয়ে বলেন, “কর্মসূচি ঘোষণা করার আপনি কে?” এ সময় মিল্টন ও এটিএন বাংলার অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে জাহাঙ্গীর আলমের হাতাহাতি হয়। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর দৌঁড়ে প্রেসক্লাবের ভেতরে চলে যেতে চাইলে ধাওয়া করে তার ওপর চড়াও হন মিল্টন, জ ই মামুন, এসএম বাবু, রাহাত মিনহাজসহ এটিএন বাংলার অন্য সাংবাদিকরা। জাহাঙ্গীর পরে প্রেসক্লাবের ভেতরে গিয়ে অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে এটিএন বাংলার কর্মীদের পাল্টা ধাওয়া করেন। এরপর ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরীর নেতৃত্বে সাংবাদিক নেতাদের চেষ্টায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। সাংবাদিকদের চারটি সংগঠনের আয়োজিত মানববন্ধন কর্মসূচিতে ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, “আমরা সাগর রুনিসহ সব সাংবাদিকদের হত্যা নির্যাতনের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। কিন্তু আজকের এ ঘটনা সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করেছে। একটি কুচক্রি মহল বিভেদ তৈরিতে কাজ করছে।”
এবিষয়ে আর কিছু বলার বা লেখার কিছু আছে বলে মনে করি না। সচেতন ও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন যেকোন মানুষই লজ্জা পাবেন এই ভেবে যে কী করলেন “জাতির বিবেক” রা? একপক্ষ হামলা করলেন, অন‍্যপক্ষের তর সইলো না তারাও পাল্টা আক্রমণ করলেন! আপনি মারবেন আম কেন চুপ থাকবো? আমিও আমার ক্ষমতা দেখাবো-এটাই স্বাভাবিক। শান্তি, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের দেশ নরওয়েতে যখন একের পর এক গুলি করে মেধাবি তরুণদের হত‍্যা করছিল তখনও নরওয়ের পুলিশ, প্রশাসন কিংবা নাগরিকদের মধে‍্য কেউ বলেননি যে ব্রেইভিককেও গুলি করো বা মারো! আর আমার স্বদেশে কেউ কারও ওপর ইট মারলে তাকে পাটকেলটিও খেতে হয়! নরওয়ে আর বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সমাজ ব‍্যবস্থা এবং মানুষের মানসিকতার পার্থক‍্যটা এখানেই।
মাহফুজুর রহমান গ্রেট বৃটেনে যখন সাগর-রুনির চরিত্র হনন করলেন তখন জ ই মামুন মাহফুজকে কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার মানুষ বলে মন্তব‍্য করেন। এবং কতিপয় “হুজুগে বাঙালি” তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে সোশ‍্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ঝড় তুলে দিলেন। আর এখন সেই জ.ই মামুনই তেড়ে মারতে গেলেন আরেক সহকর্মীকে। এটাইতো আমাদের সহনশীলতা ও সংস্কৃতি! এর থেকে যে কবে বেরিয়ে আসতে পারবো আমরা তা বোধহয় সৃষ্টিকর্তাও বলতে পারবেন না? এটিএন বাংলার আরেক সাংবাদিক কর্ণধার যিনি সাগর ও রুনির আত্মাতুল‍্য প্রিয় সন্তান শিশু মেঘের সাক্ষাৎকার নিয়ে বাহবা কুড়িয়েছেন বলে কেউ কেউ হাততালি মারছেন কিংবা মাহফুজ আজ হাতে তুড়ুপের তাস পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে পড়েছেন সেই মুন্নি সাহা নাকি জার্মানিতে আসছেন। তিনি নাকি একটা বড় বাজেট ও মিশন নিয়ে ডয়েচেভেলে গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামের সম্মেলনে কোন আমন্ত্রণ পানিন। তারপরও নাকি নিজ খরচে সেই সম্মেলনে অংশ নিতে নিবন্ধন করেছেন। জার্মানি থেকে একজন ব্লগার জানালেন, মুন্নি সাহা নাকি আসছেন অনুসন্ধান করতে যে কারা এটিএন বাংলা ও মাহফুজ সম্পর্কে লেখালেখি করছে তাদের একটা তালিকা তৈরী করতে! এবং সেই অনুযায়ী তাদের (যারা লিখছেন তাদের) বাংলাদেশে বসবাসকারি আত্মীয় স্বজনদেরকে র‍্যাব বা প্রশাসনকে দিয়ে শায়েস্তা করার একটা কু-পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নাকি মুন্নি সাহা জার্মানির পথে?
বাংলাদেশের চলমান সমস‍্যা দারিদ্রতা, দুর্নীতি, হত‍্যা-খুন, সন্ত্রাস, গুম, বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ডসহ অন‍্যান‍্য সমস‍্যার মূলে যে সমস‍্যাটি সবচেয়ে বড় তা হলো গণতন্ত্র চর্চার অভাব। কী রাজনৈতিক দল, কী সরকার, কী বিরোধী দল, কী পেশাজীবী সংগঠন কোথাও কী গণতন্ত্র চর্চার পরিপূর্ণ রুপ লক্ষ‍্য করা যায় সেখানে? গণতন্ত্রহীনতাই আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষা, গণমাধ‍্যমের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতার পথের একমাত্র বাধা। কাজেই গণতন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নিতে না পারলে দুর্নীতিও থাকবে, দুবর্ৃত্তায়নও চলবে, মানুষ হত‍্যা, সাংবাদি পেটানো এবং দলাদলি, হাতাহাতি, সংঘাত, সংঘষর্ কোনটারই যবনিকাপাত হবে না।
উপসংহারে বলবো, আমরা কেউই জানি না যে মুন্নি-মামুন ও এটিএন বাংলার কী পরিকল্পনা কিংবা উনারা কি চাইছেন? সাংবাদিক সাগর-রুনি যেকারণেই নিহত হোক না কেন সেই কারণটাতো দেশবাসি জানতে চান। সাংবাদিক সমাজ ও দেশের মানুষ চান না যে খুনিরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকুক। খুনিদের যেকোন মূলে‍্য গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করাইতো সমাজ, সরকার ও সাংবাদিক সকলেরই মহান দায়িত্ব হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ‍্য যে হত‍্যাকান্ডের চার মাসেও সরকার খুনিদের গ্রেফতার করতে পারেনি বা গ্রেফতার করেনি। সাংবাদিক সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ড নিয়ে যত গল্পই সাজানো হোক না কেন সাগর ও রুনি যে নিজেরাই পরস্পরকে খুন করেননি সেটা পৃথিবীর কোন মানুষের কাছেই বিশ্বাসযোগ‍্য হবে না কোনদিনও। তাই সবপক্ষ সব মহলকেই আহবান জানাবো প্লিজ খুনিদের পক্ষ নেবেন না। আর এই আত্মঘাতি পথে পা বাড়ালে গণমাধ‍্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র উভয়কেই বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া হয়। এই সত‍্যটা ঢাকঢোল বাজিয়ে জানানোর কিছু নেই। যারা আজ পরস্পরের বিপক্ষে হাতাহাতি ও নিহত সহকর্মীদের চরিত্র হননের মিশন নিয়ে মাঠে আছি তারা কিন্তু কেউই কচি খোকা নই। মাঝে মাঝে মনে হয় এটা কী সাংবাদিকতা নাকি সন্ত্রাসবাদ? প্রিয় পাঠক আপনারাই বলুন সাংবাদিক কী কখনও সন্ত্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে? কেউ কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে যুক্ত হলে তাকে কী সাংবাদিক বলা যায় নাকি সন্ত্রাসী? পরিশেষে বলবো জাতির বিবেক বলে যারা নিজেদেরকে আমরা জাহির করি তাদের অসহিষ্ণু হলে সাগর-রুনির খুনিরাই উপকৃত হবে! ছবি বাংলানিউজ, ফেইসবুক থেকে নেয়া।

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s