হুমায়ূন-গুলতেকিন নিয়ে ‘গাজী’র গল্প ‘হাজী’র গল্পও হয়ত আসছে!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। র‍্যাবের জন্ম খালেদা-নিজামীর ঘরে! ওরা পালন হচ্ছে এখন হাসিনা-ইনু ও মেননদের কোলে। হায়রে দেশ! বিরোধীদলে থাকলে র‍্যাব খারাপ, ক্ষমতার স্বাদ পেলে র‍্যাব ভালো। এই দ্বৈত নীতি বাংলার রাজনীতি থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত স্বদেশের মানুষের শান্তি নেই। আর আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সেতো সোনার হরিণ! চট্রগ্রামে চাঁদা দাবি করায় র‍্যাবের এক সোর্স গণপিটুনির শিকার হয়েছে। রাজধানী ঢাকার মিরপুরে র‍্যাবের গুলিতে এক যুবক নিহত হলো। সূত্র বিডিনিউজ২৪।
যিনি এই রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা জনগণের সেবকদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাবেন তিনি হয় :সন্ত্রাসী” নতুবা “ছিনতাইকারি” কিংবা “দুধর্ষ খুনি-চাঁদাবাজ”। নিহতের নামে ডজন ডজন মামলার ফর্দ ধরিয়ে দেবে সংশ্লিষ্টরা। আর জাতির বিবেক বলে খ‍্যাত মিডিয়াকর্মীরা সেই তথ‍্যকেই “কোরান-বাইবেল” ধরে নিয়ে কোনরকমের তথ‍্য যাচাই-বাছাই কিংবা ক্রসচেক ছাড়াই হুবহু মিডিয়ায় তুলে ধরবে! অনেকদিন এই ক্রসফায়ার নামক আপদটির নাম শোনা যাচ্ছিল না। বিনিময়ে গুম নামক আরেক ভয়ংকর বিপদ বাংলার বুকে চেপে বসলো। এখন দেখা যাচ্ছে আপদ-বিপদ দুই চলছে, চলবে! স্বয়ং দেশটির প্রধানমন্ত্রিইতো গুম, বিচারবহির্ভূত হত‍্যাকান্ডকে সমর্থন করে চলেছেন। সুদূর লন্ডনে সংবাদকর্মীদের কাছে প্রধানমন্ত্রি যে বক্তব‍্য দিয়েছেন তা প্রিয় পাঠক আপনাদের সুবিধার্থে তুলে ধরতে চাই।
“গুম নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ আর সমালোচনার মধ্যেই একে কটাক্ষ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বিএনপির লোকেরাই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতা জামালউদ্দিনকে হত্যা ও গুম করেছিল। বিএনপি চালু করে দিয়ে গেছে। এখন রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, যেভাবে উত্থান সেভাবেই পতন। লন্ডন সফরে প্রথম দিনে বুধবার সন্ধ্যায় সেন্ট্রাল লন্ডনে একটি হোটেলে বিলেতের বাংলা মিডিয়ার সঙ্গে ইফতার শেষে মতবিনিময় সভায় এক প্রশ্নের উত্তরে এ মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। গুমের কালচার থেকে আমরা মুক্তি পাব কি না—যুগান্তরের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি গোলাম মোস্তফার এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক জনমতের সম্পাদক নবাব উদ্দীন তখন জানতে চান, আপনি ইলিয়াস আলী সম্পর্কে এসব কথা বলছেন কি না। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি কারও নাম বলতে চাই না। আপনি বুঝে নেন কার সম্পর্কে বলছি। যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত ছিল, যারা যে কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সে কাজেই পতন হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে কত হত্যা ও গুমের ঘটনা ঘটেছিল, তা খুঁজে বের করার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় মানবাধিকারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।” সূত্র-আমার দেশ।
শ্রদ্ধেয় পাঠক, এই হলো আমাদের প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার বক্তব‍্য। একজন দায়িত্বপূর্ণ ব‍্যক্তির মুখে এমন কথা শোভা পায় কী? আমরা যাবো কোথায়? দেশের মানুষের অসহায় হয়ে বসে থাকা, সবকিছুকে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প আছে কী? এই প্রধানমন্ত্রিই যখন বিরোধী দলীয় নেত্রী তখন কিন্তু ঠিক উল্টো কথা বলেছিলেন। দাবি জানিয়েছিলেন র‍্যাবের হত‍্যা-নির্যাতন বন্ধ করার। তিনি খুবই মুখারু ছিলেন র‍্যাবের বিরুদ্ধে। আজ ঠিক তার উল্টো। তখন ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রি আজকের বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া র‍্যাবের জন‍্য জান কুরবান করে দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। কারণ উনাদের হাতেই তো র‍্যাবের জন্ম। খালেদা আজ বিরোধী শিবিরে, এখন বলছেন র‍্যাব ভাল না!
প্রধানমন্ত্রি আরেকটি বোমা ফাটানোর মতো বক্তব‍্য দিয়েছেন লন্ডনে। তাঁর মতে, “বিশ্বব‍্যাংক কমিশন খায় আর সৈয়দ আবুল হোসেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক”। এই আবুলৈর বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট বিশ্বব‍্যাংকের অভিযোগ উত্থাপনের প্রায় বছর খানেক পর প্রধানমন্ত্রি এমন মন্তব‍্য করলেন। একজন প্রধানমন্ত্রি যাঁর রাজনৈতিক কারিশমার ফলেই একটা দেশ ভালভাবে চলতে পারে। অথচ সেই নেতার মুখে কূটনৈতিক কৌশল বা বুদ্ধি-সুদ্ধির কোন চিহ্নই পাওয়া যায় না! এজন‍্য অবশ‍্য অনেকে তাঁকে “বাচাল” বলৈন ইদানিংকালে। অবশ‍্য তোষামদকারি, চাটুকার আর দালালদের মুখে এমন সত‍্য উচ্চারণ কখনও শোনা যায় না। একদিকে হুংকার আরেকদিকে মাথানত-এমন দ্বৈত পন্থা অবলম্বনে আর যাইহোক চমক সৃষ্টি করানো যেতে পারে কিন্তু দেশের মঙ্গল আনা যায় কী? এইতো ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রি কটাক্ষ করে বলেছিলেন যে, আমিনুল ইসলাম যে শ্রমিক নেতা ছিলেন সেটা আগে প্রমাণ হোক। সারা দুনিয়ায় শ্রমিক নেতা আমিনুল হত‍্যাকান্ডের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠলো, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি আমিনুলের নৃশংস হত‍্যাকান্ডের বিচার ও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি জানালো। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেটা নিয়েও রসিকতা করলেন! কার্যকর তদন্ততো দূরের কথা। শ্রমিক নেতা আমিনুল পোশাকশিল্প শ্রমিকদের জীবন-মান উন্নয়নের জন‍্য সংগ্রাম করছিলেন। এটা করতে গিয়ে তাকে নৃশংসভাকবে খুন হতে হয়।
ঢাকা মেডিক‍্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক নামধারী দুবর্ৃত্তদের হামলায় অসংখ‍্য সাংবাদিক আহত হয়েছেন, অনেকর ক‍্যামেরা ভেঙ্গেছে। নাটোরের আরিফুল রিপনের ওপর অমানবিক নিষ্ঠুরতার ঘটনাকে আঁড়াল করতেই মেডিক‍্যালের গুন্ডারা মিডিয়াকর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। হাসপাতালের পরিচালক সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হবার সুবাদে হামলাকারীর দল হয়ত ভাবছে যে দেশে সেনা শাসন চলছে! তাই যা খুশি তাই করা যায়। সাংবাদিকরাও মাঠে নামলেন। কিন্তু যা হবার তাহ হলো। শেষপর্যন্ত নাজিল হলো মধ‍্যস্থতাকারি। এবারের মিডিয়েটরের ভূমিকায় মাঠে এলেন প্রথানমন্ত্রির বিশেষ সহকারি আওয়ামী লীগের যুম্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। যখনই কোন ঘটনা ঘটে তখনই এমননিভাবেই দুবর্ৃত্তদের রক্ষা করার লক্ষ‍্য নিয়ে কেউ না কেউ নাজিল হয়ে যান। সংবাদ সম্মেলন করেন। গঠন করেন তদন্ত কমিটি। খুব জোরগলায় বলতে থাকেন, তদন্তরিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের ব‍্যবস্থা নেয়া হবে। হানিফও একই কথা বললেন। আমরা জানি এই বলা কোনদিনও ইহজনমে আর কার্যকর হবে না। তদন্ত কমিটির রিপোর্টও আলোর মুখ দেখবে না। এমনটা দেশবাসি দেখছেন বিগত চার দশক ধরে। মধ‍্যস্থতা বা সমঝোতার নামে সন্ত্রাসী-মস্তান বা দুবর্ৃত্তরা আঁড়াল হয়ে যাবে। সময় ও দিন যতই অতিবাহিত হতে থাকবে ঘটনা ততই বিস্মৃত হবে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টও ধীরে ধীরে কবরস্থ হবে! হামলাকারিরা উৎসাহিত হবে। ফলে পরের হামলাটা চালাতে আর কোন বাধাই রবে না তাদের সামনে। আর আমাদের সাংবাদিক নেতারাও এমন সমঝোতার ফাঁদে বারবার পা দিচ্ছেন কেন, তা আমার বোধগম‍্য নয়।
একুশে টিভির একটি রিপোর্টে দেখা গেলো পুরান ঢাকায় পুলিশের চাঁদাবাজি ও নির্মমতার চিত্র। এক ক্ষুদ্র ফল দোকানদার চাঁদা না দেয়ায় পুলিশের এক কর্মী ফলের দোকানটি গুঁড়িয়ে দেয়। ঘটনার প্রতিবাদ করায় এক যুবককে বেধড়ক পেটাচ্ছে সেই পুলিশ। প্রকাশ‍্য দিবালোকে অস্ত্র উঁচিয়ে একজন নিরীহ মানুষকে এভাবে মারধোর করছে জনগণেরই এ সেবক। এই দুবর্ৃত্তরা জনগণের রক্ষক হয়েই ভক্ষকের ভূমিকায় নাজিল হয়েছে। একটা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী যখন হত‍্যা-গুম, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে আইনের শাসন বলতে আর কিছু থাকে না। আজকের বাংলাদেশ কী সেই পর্যায়ে এসে পৌঁছেনি?
দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করছেন। তাদের দু’বেলা দু’মুঠো ভাত জোটে না। অথচ সেই দেশের প্রধানবিচারপতির জন‍্য ১২ কোটি ৫৯ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কেনা হচ্ছে। এই চাঞ্চল‍্যকর খবরটি দিয়েছে দৈনিক যুগান্তর। যে দেশের সিংগভাগ মানুষের নুন আনতে পানতা ফুরায় সেই দেশের প্রধানমন্ত্রি অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনি অনুষ্ঠানে ৫৫ জনের এক বিরাট বহর নিয়ে গেছেন দগরীব জনগণের টাকা ব‍্যয় করে। দৈনিক আমার দেশ লিখেছে, এবারের অলিম্পিকে বাংলাদেশের মাত্র পাঁচজন ক্রীড়াবিদ অংশ নিচ্ছেন। সেই খেলোয়াড়দের সঙ্গে আবার অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের ২২ জন কর্মকর্তাও নাকি আছেন। “জনগণের মাল (টাকা) দরিয়া মে ঢাল” এই যেখানে বাস্তবতা সেখানে আবার দেশপ্রেমের বড়াই!
দৈনিক আমাদের সময়ে এক “গাজীর গল্প” পড়লাম! গল্পটা হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিন খানকে নিয়ে। গল্পটা যে শাওন ও তাঁর মাকে খুশি করার জন‍্যই তৈরী করা হয়েছে তাতে সন্দেহ করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে। যাইহোক গাজীর গল্প পড়লাম আজ। কাল যে হাজীর গল্প পড়ানো হবে না তার কী কোন নিশ্চয়তা আছে? একই পত্রিকার আরেকটি শিরোনামে দৃষ্টি ড়েলো। শিরোনামটি হলো, “ধর্মপরায়ণ ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ”। এখনই দাবি উঠেছে নুহাশপল্লীতে নুহাশ মসজিদ স্থাপনের! জীবদ্দশায় হুমায়ূন নিজেও চাননি যেটা হয়ত অদূর ভবিষ‍্যতে নুহাশপল্লীতে সেটাই হবে! তবে আশা করবো হূমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের নুহাশপল্লী যে সতি‍্য সতি‍্য কবরস্থান বা মাজার হয়ে না ওঠে। নুহাশপল্লী হোক গবেষণার স্থান সেখান থেকে তৈরী হোক হাজারো-লাখো হুমায়ূন।
প্রাচীন বাংলা দৈনিক “সংবাদ” এর একটি রিপোর্টের শিরোনাম দিয়ে লেখাটির উপসংহার টানবো। দৈনিক সংবাদ’র ২৭ জুলাই সংখ‍্যার ওই শিরোনামটি এমন, “এমপি হোস্টেলে তরুণীর লাশ : তিন মাসেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ”। চলতি বছরের ৩ মে সুরক্ষিত নিরাপদ সংসদ ভবনে অজ্ঞাত পরিচয়ের এই নারীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। আজ পর্যন্ত খুনি শনাক্ত হলো না। সন্ত্রাস নির্মুলের নামে দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর বিরামহীন ক্রসফায়ার, বিচারবহিভর্ূত হত‍্যাকান্ড, গুম সত্ত্বেও দেশে হত‍্যা-নির্যাতন, খুন, চাঁদাবাজিসহ সবধরণের অপরাধ, অপকর্ম চলছেই। টিভি সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির খুনিদেরও ধরা হলো না সাড়ে পাঁচ মাসেও। এই হলো বাংলাদেশের আইনের শাসন! ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s