নারীবাদ কিংবা পুরুষতন্ত্র নয়, চাই মানবতাবাদ!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “হুমায়ূন আহমেদ, শাওন এবং পরচর্চা…” এই শিরোনামে একটি লেখা বাংলাদেশের একটি অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। লেখাটির লেখক সীনা আক্তার, একজন গবেষক। এই লেখাটার সূত্র ধরেই একটা প্রতিক্রিয়া দেয়ার চেষ্টা করবো।
আসলে এখানে নারী কিংবা পুরুষ এমন জটিল বিতর্কে যাওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা প্রাজ্ঞজনেরাই বিবচার বিবেচনা করতে পারবেন। তবে হুয়ায়ূন আহমেদ এর মৃতু‍্যর পর বহু জ্ঞানী-গুণির লেখাই পড়লাম, পড়ছি হয়ত আরও অনেক পড়তে হবে। কিন্তু সবাইকেইতো পক্ষ নিয়েই লিখতে দেখছি। কেউ গুলতেকিনের ভালবাসা বা ত‍্যাগের কথা বলছেন। আবার কেউ শাওনের অভিনয়ের দিকগুলি নিয়ে লিখছেন। উভয়ই হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী।স্বামী হিসেবে তিনি কার প্রতি কতটা দায়িত্ব পালন করেছেন সেই বিচার করার আমি কেউ নই। ওটা নিতান্তই ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার এবং উনাদের এটা নিজস্ব। হুমায়ূন আহমেদের মৃতু‍্যর পর লেখালেখির মাত্রা কখনও কখনও যে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে যায় নি তাও বলা যাবে না। তবে আমি মনে করি, মতামত প্রকাশ কারও না কারও পক্ষে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত‍্য-মিথ‍্যা বলে একটা ব‍্যাপারকেতো মাথায় রাখা প্রতে‍্যক লেখকেরই দায় হওয়া উচিৎ নয় কী?
আর সমাজ বলেতো একটা বিষয় আছে নাকি? আমাদের সমাজের একটা রীতি-নীতি, প্রথা আছে। সেই বিষয়গুলি চাইলেইতো আর ঝেড়ে ফেলা যায় না। বাংলায় বসে তো আর ইউরোপ আমেরিকার সংস্কৃতি অনুসরণ করা যায় কী? আমাদের সমাজ ‘সমকাম’ এখনও মেনে নেয়নি। আমাদের সমাজ এখনও অতটা উদার হয়ে ওঠতে পারেনি যে ৫০ বছরের নারীর সাথে কুড়ি বা ১৮ বছরের যুবকের বিয়ে কিংবা ৫৫ বছরের পুরুষের সঙ্গে কুড়ি বছরের নারীর বিয়েতে সমাজ নড়াচড়া করবে না। তারপরে যদি আবার হুমায়ূন ফরিদি, সুবর্ণা মুস্তাফা কিংবা শাওন-হুমায়ূন আহমেদদের মতো সেলিব্রেটিরা এমন কান্ড ঘটান তাহলেতো কথাই নেই। আপনি বা আমি এসব মানি বা না মানি-প্রসঙ্গ তা নয়। দু’একজনের মানা না মানাতে সমাজের কিছুই যায় আসে না। মানুষতো আর জন্তু বা জানোয়ার নয়। বিবেক বিচার বুদ্ধি এমনকি ষড়ঋপু নামে যারা আছে তাদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতা বা শক্তিও আছে মানুষ মাত্রই। কিন্তু কতজন এই ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি সেটাই একটা বড় প্রশ্ন! আর এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া কী কেউ কখনও নির্বাণ লাভ অন‍্যকথায় মহান হয়ে ওঠতে পারেন? নিশ্চয়ই না!
এটা মানি যে আমাদের দেশ বা সমাজে নারীকে দোষারোপ করার একটা বড় প্রবণতা ক্রিয়াশীল আছে, থাকে সবসময়। কিন্তু কোন ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণে যদি দেখা যায়, বোঝা যায় বা জানা যায় কারও কোন অনৈতিকতা, স্বার্থপরতা, লোভের বিষয়গুলি কে, তখন কী কেউ কোন সমালোচনা করলেই তাকে কী নারীবিদ্বেষ বলা সংগত হবে? আমেরিকা থেকে বিমানের টিকিট এবং দাফনস্থান পর্যন্ত যে ঘটনাপ্রবাহ তা নিয়ে লেখক কিছুই বললেন না, লিখলেন না। অথচ একজনের পক্ষাবলম্বন স্পষ্ট করলেন পুরো লেখায়, এটা কী সমীচীন?
পুরুষতন্ত্র কিংবা নারীবাদ এভাবে বিভক্ত না হয়ে কিংবা বিভক্ত না করে নারী-পুরুষ নিবর্িশেষে সববাইকে মানুষ হিসেবে মানবিকতার পরিসরটাকে বাড়ানোর কাজটাকে এগিয়ে নিতে পারেন লেখকরা, মিডিয়া এবং প্রাগ্রসর জনগোষ্ঠী। ব‍্যক্তিগতভাবে আমি নারীবাদ বা পুরুষতন্ত্র কোনপক্ষেই নেই বা এই দুই পক্ষের মধে‍্য কোন দলভুক্ত হতে চাই না। মানুষ ও মানবতাবাদই আমার পক্ষ। তসলিমা নাসরিনের লেখা নিয়েও আমাদের সমাজে একদল মানুষ নারীবাদ ও পুরুষতন্ত্রকে সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু তারা মানুষের ব‍্যক্তি অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, চিন্তা করার বা বাক স্বাধীনতা ও অধিকার ইত‍্যাদিকে সামনে আনতে চায় না। তসলিমার লেখা ভালো লাগুক আর নাই লাগুক, তাতে কী? তিনি লিখছেন, লিখেছেন সেটাই বড় কথা। সবার লেখাই হাসান আজিজুল হক কিংবা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো হতে হবে বা হতে পারে এমনটা ভাবা কতটা বাস্তবসম্মত? সমাজ, রাষ্কট্র নিয়ে কঠিন জ্ঞানগর্ভ যেখানে কোন চটুলতা, তথাকথিত জনপ্রিয় ও সস্তা সাহিতে‍্যর বালাই নেই সেরকম সৃষ্টি কী সবার কলমে হয়? শেষে বলবো, একটা সমাজে যদি সবগুলি প্রতিষ্ঠান ঠিক ঠিক মতো চলে, বৈষম‍্য, দলবাজি ও দুনর্ীতির উদ্ধর্ে উঠে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে সেই প্রতিষ্ঠানগুলি যেখানে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার থাকবে তাহলে পুরুষতন্ত্র আর নারীবাদ নিয়ে চিৎকার করতে হবে না। একটা ভারসাম‍্যপূর্ণ মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সহজ হবে।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s