Monthly Archives: অক্টোবর 2012

সাগর-রুনির খুনিদের ‘রক্ষা’র বিপক্ষে জেগে ওঠার সময়!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। শেষ পর্যন্ত “একটা গোজামিল” গ্রেফতার নাটকের বাহ‍্য রুপ এলো প্রায় আট মাস পর। ‘চোর-ডাকাতরা’ই সাংবাদিক সাগর-রুনিকে হত‍্যা করেছে এমন একটা ধারণা আগাগোড়াই দেবার চেষ্টা করেছে তদন্তসংম্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তারই সফল পরিণতির দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। বাহ্, শাবাশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি, শাবাশ স্বদেশভূমি! বহু বক্তৃতা, তদন্ত খেলা, প্রতিশ্রুতি আর নাটকীয়তার পর প্রকৃত খুনিদের আঁড়াল করার এক নয়া খেলার হুইসেল বাঁজিয়ে দিলেন সাহারার উত্তরসুরী। চালাকি, ভন্ডামি, নাটক, খেলা, যাকে তাকে ধরে খুনি বানিয়ে বাহবা নেয়ার চিরায়ত অভ‍্যাস পরিহার করে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার পথে হাঁটা শুরু না করলে একদিন অবিচারের কুঠার নিজের পায়েই আঘাত করবে। কাজেই সাধু সাবধান!
এখন সন্দেহ জাগে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ নেতা ডা. নারায়ণ চন্দ্র দত্ত নিতাই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিরাও কী তবে রেহাই পেয়ে গেছে যেভাবে সাগর-রুনির খুনিদের আঁড়াল করার নানান পাঁয়তারা চালানো হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রির বক্তবে‍্য এটা পরিস্কার যে সাংবাদিক সাগর-রুনির হত‍্যা মামলার তদন্ত কাজে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, আমেরিকা এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি যেন খুবই গৌরবান্বিত এই জনে‍্য যে আমেরিকার মতো দেশকেও সাগর-রুনি হত‍্যা মামলার তদন্তে কাজে লাগানো হয়েছে! সবই হাস‍্যকর ব‍্যাপার ছাড়া কিছুই না। আসল খুনি ধরা পড়বে না, ব‍্যস! এটাই হলো সত‍্য।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু সাগর-রুনি শুধু একটিবারের জন‍্য জীবীত হয়ে আসুন এবং কারা কী কারণে আপনাদের হত‍্যা করলো তাদেরকে দেশবাসির কাছে চিহ্নিত করুন! এছাড়া আপনাদের খুনি শনাক্ত ও খুনের রহস‍্য বের হওয়া আগামি সহস‍্য বছরেও সম্ভব নয়।
আর আমার প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু, নেতা, ভাই, বোন, সাংবাদিকতার গুরু থেকে শিক্ষক আপনাদের সবার কাছে আমার বিনম্র নিবেদন অনুগ্রহ করে জেগে ওঠুন অবিচারের বিরুদ্ধে, অন্তত: সাগর-রুনির হত‍্যাকারি, প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করার লক্ষে‍্য। প্লিজ, আসুন আমরা সবাই দলমতের উদ্ধর্ে উঠে দলীয় প্রেম পরিহার করে হাসিনা কিংবা খালেদার জোটভুক্ত না হয়ে সাংবাদিকতা পেশা, সাংবাদিক ও জনগণের জানমাল রক্ষা সর্বোপরি আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার ও গণতন্ত্র (প্রকৃতার্থের কার্যকর গণতন্ত্র) ফিরিয়ে আনার লড়াই করি। সকলরকমের ভন্ডামি, মিথ‍্যাচার, অবিচার, অন‍্যায় ও গাজাখুরি জোড়াতালির তদন্ত ও গ্রেফতার খেলা বন্ধ করতে না পারলে সাংবাদিকতা পেশার স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা কোনটাই রক্ষা করা যাবে না। আমরা যে যেখানে আছি (দেশে কিংবা বিদেশে) আসুন আমাদের সোনার বাংলাকে রক্ষায় একসাথে আওয়াজ তুলি। তবেই ভন্ডামি, মিথ‍্যাচার ও সাজানো নাটক বন্ধ হবে এবং সাংবাদিক সাগর-রুনির প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়বে। ছবি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতি নতজানুতাই কী রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলার কারণ?


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। স্বদেশে এবার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর বর্বর আক্রমণের ঘটনা ঘটলো একটা তথাকথিত প্রগতিশীল সরকারের আমলে। নিকট অতীতে বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর এমন পরিকল্পিত হামলার তথ‍্য আমার জানা নেই। আজকের বাংলাদেশ ৭০০ শতকে বৌদ্ধদের রাজত্ব ছিল। সেই বৌদ্ধরা আজ সেখানে সংখ‍্যাই খুবই কম। অহিংস দর্শনে বিশ্বাসী এই জনগোষ্ঠীর বসবাস চট্রগ্রাম অঞ্চলে। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে সংখ‍্যাগুরু জনগোষ্ঠীভুক্ত কতিপয় দুবর্ৃত্ত। হামলাকারিরা বৌদ্ধমন্দির ভাংচুর করে, বৌদ্ধদের বাড়ি-ঘরে হামলা ও আগুন দেয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধেও বৌদ্ধবিহারে হামলা হয়নি। উল্লেখ‍্য,প্রাচীনতম শিল্প ভিত্তিক আকর্ষণীয় কাঠ দ্বারা নির্মিত বৌদ্ধ বিহার ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্মৃতিস্তম্ভ দেশের একটি অন‍্যতম সৌন্দয‍্যর্ময় আকর্ষণীয় জায়গা। যা পর্যটকদেরও মুগ্ধ করে। রামুর বৌদ্ধবিহারে আক্রমণ একাধারে বৌদ্ধ সম্প্রদায় ও মন্দির এবং সৌন্দয‍্যর্ ও অতীত ঔতিহে‍্যর ওপর আক্রমণ। কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহারে আঘাত মানেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ আর রাখানদের মাঝে যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহামিলন তার ওপরও আঘাত। প্রকল্প আর ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত‍্যশীল কতিপয় সংগঠনগুলিও এমন বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে না। অথচ এমন সংগঠনও আছে যারা দেশে চুন থেকে পান খসলেই ইউরোপ-আমেরিকায় প্রতিবাদের ঝড় তুলতো। তারা আজ আশ্চর্যজনকভাবে নিরব, কারণ দেশে তাদের আনুগত‍্যশীল বা পছন্দনীয় রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়!
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরীর জন‍্য সাম্প্রদায়িক শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীরা সুযোগ খুঁজবে বা খুঁজছে। এমনটা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু দেশে সরকার আছে, সরকারের অন্তর্ভূক্ত রাজনৈতিক দলগুলিও তৎপর আছে। বাংলাদেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলা ও আঘাত আসছে। কিন্তু প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ছে না, শাস্তিও হচ্ছে না তাদের। সরকার সবকিছুকেই “যুদ্ধাপরাধী বা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র” বলে দায় এড়ানোর একটা চালাকী কৌশল অবলম্বন করছে। মহাজোট সরকারের অংশীদারিত্বের সাথে আছে একদা বাম প্রগতিশীল কয়েকটি দল এবং স্বৈরাচারি জেনারেল এরশাদের দলও। আবার বিরোধীদল সরকারের ব‍্যর্থতার অভিযোগ এনে সরকারের পদত‍্যাগ দাবি করছে। কিন্তু দেশে একটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি ফিরে আসুক বা বজায় থাকুক তা তারা চায় কিনা সেব‍্যাপারেও সন্দেহ জাগে। দায়চাপানো কিংবা দায় এড়ানোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগের খেলার তালে হামলাকারি, ষড়যন্ত্রকারি অপশক্তি আঁড়ালেই থাকছে।
বাংলাদেশে মোট জনসংখ‍্যার ১০ শতাংশ সংখ‍্যালঘু। সংখ‍্যাগত বিবেচনায় সবচেয়ে বড় ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ সেখানে অব‍্যাহত আছে। পার্বত‍্য চট্রগ্রামে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি আজও। উত্তরাঞ্চলেও আদিবাসি সাঁওতাল ও অন‍্যান‍্য জাতি-গোষ্ঠীর ওপর নানামুখী অত‍্যাচারও চলছে। আর এবার সাম্প্রদায়িক আঘাত এলো বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে সাম্প্রদায়িক হামলার সর্বশেষ কালোদাগ এঁকে দেয়া হলো রামুতে। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে, চট্রগ্রামের হাটহাজারি, রাঙ্গামাটিসহ কয়েকটি স্থানে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ হয়েছে। মহাজোট সরকার যে পুরো অসাম্প্রদায়িক সরকার নয় তা কেবল এরশাদকে পাশে রাখা থেকে নয় সংবিধান সংশোধন চালাকিতেও সেটা ফুটে উঠেছে। সরকার সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনরায় স্থাপন করেছে বটে। তবে তারা এখনও রাষ্ট্রধর্মপ্রথা বাতিল করেনি। এটা সাম্প্রদায়িকতার কাছে একধরণের নতজানুতারই প্রকাশ। এখনও দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলি নিষিদ্ধ হয়নি। তাই দেশে একের পর এক সাম্প্রদায়িক আক্রমণ চলছে। যার কারণে ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু ও আদিবাসি জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম নিরাপত্তাহীনতার ভীত গড়ে উঠেছে। এমনকি অনেকেই বাধ‍্য হচ্ছেন দেশ ত‍্যাগ করতে। আইনের সমপ্রয়োগ এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রববস্থাসহ সমাজের সর্বস্তরে সমঅধিকার চর্চার অভাবও এসব হামলা-দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতার ডালপালা বিস্তৃতির অন‍্যতম প্রধান কারণ বলে মনে হয়।
সকল ধরণের বৈষম‍্য বিলোপ, ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান বলবৎ, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার ব‍্যাপক প্রসার ও সমাজে আইনের শাসন ও প্রকৃতার্থে গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার বাস্তব অনুশীলন ছাড়া দেশে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা খুব সহজ হবে না। পরিবার ও দলপ্রীতি পরিত‍্যাগ করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয় জনকল‍্যাণকেন্দ্রিক সুস্থ‍্য ধারার রাজনীতির আবহ তৈরী করার মতো একটা আমূল পরিবর্তনের ধারা চালু করতে না পারলে বিশ্বসমাজে আমাদের কদযর্ চোহারা ও অসহিষ্ণুতাই উন্মোচিত হবে। যা বাঙালি কিংবা বাংলাদেশি হিসেবে কারও কারও জন‍্যই সুখকর হবে না। ছবি গুগল থেকে নেয়া।