জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ঠেকাতে নাকি গদি রক্ষার আহবান?

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। স্বদেশের চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের গার্ডার ভেঙে পড়ে চারজনের করুণ মুতু‍্য হয়েছে। নয়জন নিহত হয়েছেন রাজধানী ঢাকার অদূরে সাভারে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় আগুনে পুড়ে। নিহতদের মধে‍্য সাতজন নারী। এসব অমানবিক হত‍্যাকান্ডের ঘটনায় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কোন আহবান এখনও মিডিয়ায় আসেনি। তবে জামায়াত-শিবির ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসির প্রতি ঐকে‍্যর ডাক দেয়া হয়েছে।
শুধু জামায়াত ঠেকাতে নয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা এবং গণতন্ত্রের চর্চা ও দেশ রক্ষার ঐক‍্য জরুরি। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর জামায়াত ঠেকাতে সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও একতার আহবান জানিয়েছেন। অন‍্যদিকে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও আগ্রাসী কর্মকান্ড প্রতিরোধে চোরাগোপ্তা হামলার আহবান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ। ফুলবাড়ি, মানুষ ও পরিবেশ রক্ষার হরতালকে দেশে “অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির” হরতাল বলেও অভিহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। বিডিনিউজ২৪ আরও একটি খবর দিয়েছে। সেটি হলো আওয়ামী আইনজীবীদের মাঝে বিভেদ। হানিফ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি যখন দেশবাসিকে ঐক‍্যবদ্ধ হবার আহবান জানাচ্ছেন তখন নিজেদের ঘরের আইনজীবীরাই দুই শিবিরে বিভক্ত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একদিকে মৌলবাদিদের সন্ত্রাস মোকাবেলায় ঐকে‍্যর আহবান অন‍্যদিকে মানুষ, পরিবেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষার হরতাল তথা গণতান্ত্রিক অধিকারকে অস্থিতিশীল বলে ধামকি দিয়ে স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছে।
প্রশ্ন জাগে, আওয়ামী লীগ জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ঠেকাতে ঐকে‍্যর ডাক দিয়েছে নাকি গদি রক্ষার জন‍্য সরকারের শেষ সময়ে মানুষকে পাশে চাইছে? বলা চলে নব্বইয়ের দশক থেকেই আওয়ামী লীগ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলিকে পাশে নেবার চেষ্টা করেছে যখনই তারা সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী ঘাতক জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও আক্রমণের শিকার হয়েছে। আবার ক্ষমতায় গিয়ে সতার্থ বন্ধুদের ভুলে গেছে! শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও অন‍্যান‍্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সুশিল সমাজের ঐক‍্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়েই সব ইতিহাস পেছনে ফেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়েছিল। অবশ‍্য জাতির জনক ও জাতীয় চার নেতার পৃথিবীর সবচাইতে বর্বরতম নৃশংস হত‍্যাকান্ডের বিচারের সব বাধা দূর করে খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করে।
সরকারি দল একদিকে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস মোকাবেলায় জনগণের সহযোগিতা চাইছে আরেকদিকে জামায়াত নেত্রীর পুত্রকে প্রতিমন্ত্রী বানাচ্ছে! আবার রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকেও বহাল রাখছে। বাহ্ চমৎকার নীতি! এই দলটি নির্বাচিত নেতাকে কোনরকমের কারণ ছাড়াই পদচু‍্যৎ করে জ্বি-হুজুরমার্কা ব‍্যক্তিদের রাতারাতি নেতার পদ দিয়ে পুরস্কৃত করছে। আওয়ামী লীগের কতিপয় মন্ত্রি-মেয়র ও এমপি নাকি টাকার বিনিময়ে জামায়াত-শিবিরের ক‍্যাডারদের পুলিশের চাকরিতেও বসিয়েছে। এধরণের অভিযোগ হরহামেশাই প্রকাশিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ‍্যমগুলিতে। গল্পের এখানেই শেষ নয়, জামায়াত-শিবিরের ক‍্যাডার ও কর্মীরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ও ছাত্রলীগেও ঢুকে পড়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। আবার ছাত্র ইউনিয়ন বা প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন করা সরকারি কর্মকর্তা বা পুলিশ কর্মকর্তাকে ক্ষমতাসীন কারও অনৈতিক কাজে সায় না দেবার কারণে শাস্তিমূলক বদলি এমনকি ওইসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ‍্যা রটনাও ছড়ানোর খবর বেরিয়েছে ফেইসবুকে।
শেখ হাসিনা, তাঁর দল আওয়ামী লীগের কাছে আমার প্রশ্ন-সংসদে ব্রুট মেজরিটি থাকার পরও জামায়াত-শিবির তথা ধমর্ীয়-মৌলবাদি রাজনীতি নিষিদ্ধ করছেন না কেন? কেন দলের ভেতরে (মাঠ পর্যায়ে বা তৃণমূল পর্যায়ে) সংহতি ও ঐক‍্য গড়ে তুলতে পারছেন না? কেন দেশজুড়ে এমপিতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে? কেন ত‍্যাগি ও দীর্ঘদিনের পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে (প্রায় ১৬০ টি আসনে) নব‍্য ও কালো টাকার মালিকদের বিগত নির্বাচনে নমিনেশন দিয়ে দলের ভেতরের সংহতি ও একতাকে বিনষ্ট করা হয়েছে, এবং কে এরজন‍্য দায়ি? আওয়ামী লীগের ভাগ‍্য সুপ্রসন্ন এই জনে‍্য যে দেশে জনগণের কথা ভাবে (তবে ক্ষমতার কথা ভাবে তারা) এমন শক্ত বিরোধীদল নেই! দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সুবিধাবাদি-তোষামদকারিরা কেন বেশি প্রিয় দলীয় ত‍্যাগী নেতা-কর্মীদের চেয়ে?
বাহাত্তরের মূল সংবিধান মতে দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার সুযোগ ছিল না। শেখ হাসিনার দল কেন সেই মূল সংবিধানে ফেরার সাহস করছেন না? এখনও সময় ফুরোয়নি। নিজের ঘর সামলাতে পারলে, সুবিধাবাদী চক্রকে বিতাড়ন, দুর্নীতি ও বিচার বহিভর্ূত হত‍্যাকান্ড বন্ধ করে, দেশে গণতন্ত্রের (প্রকৃতার্থে) চর্চা ও ন‍্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কাজকে সামনে এগিয়ে নিতে পারলেই কেবল সাধারণ মানুষসহ সমমনা সকল রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমর্থন মিলবে পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড মোকাবেলা করা সম্ভব। নইলে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদি শক্তিকে মোকাবেলা করাটা অত সহজ হবে বলে মনে করি না। কাজেই অন‍্যদের ঐকে‍্যর পথে ডাকার আগে নিজের ঘর ঠিক করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে আওয়ামী লীগের জন‍্য! ছবি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s