শ্রমিক বাঁচলে পোশাক কারখানা চলবে

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। চাই আরও দুর্নীতি, অনেক-অগণিত লাশ ও আগুন, হাজার তদন্ত কমিটি, প্রকৃত ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে আসল সত‍্যটাকে ধামাচাপা দেয়ার অঙ্গিকার, দেশি-বিদেশি বিপুল অর্থের লুটপাট সর্বোপরি চাই আরও অনৈতিকতা, অবহেলা, দায়িত্বহীনতা ও গণতন্ত্রহীনতা! তাই পোশাক কারখানার মালিক ভাইয়েরা আপনারা শিল্পকারখানায় দুর্ঘটনা এড়াতে আরও বেশি সাবধান ও সতর্ক থাকুন।
প্রচন্ড মানসিক দহন ও পীড়ার প্রকাশ হিসেবে লেখার শুরুতেই হতাশামূলক কথাগুলি লিখেছি। কারণ সহজ-সরল কোমলমতি সোনার মানুষগুলির ঘামঝড়া শ্রমে যে হীরার ন‍্যায় বিবেচিত বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসেন যে সেক্টরটির মাধ‍্যমে সেই মণিমুক্তার মতো ক্ষেত্রটিকে শুধুমাত্র অবিচারে পূর্ণ দুবর্ৃত্ত শাসন ব‍্যবস্থা ও মুনাফালোভীদের অবহেলা-দায়িত্বহীনতার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই পোড়া মানুষগুলির কল্পিত ছবি মনের আয়নায় আঁকছি আর চোখের জল গড়ছে আমার অজান্তেই। ইন্টারনেটের বদৌলতে টিভিপর্দার মাধ‍্যমে স্বদেশ থেকে স্বজনহারা মা-বোন, ভাই-বাবাদের আহাজারিতে প্রচন্ড শীতের এই দেশটিতে যেখানে থেকে লিখছি তার বাতাসও যেন গরম হয়ে উঠছে। সবকিছুতেই “ষড়যন্ত্র” র ধোয়া তুলে রাষ্ট্রীয় ব‍্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা নতুন কিছু নয় আমার সোনার বাংলায়।
প্রিয় পাঠক উপরের প‍্যারাটির শেষ বাক‍্যটি বাংলাদেশের তথাকথিত গণতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর “গণতান্ত্রিক” প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা পোশাক শিল্প মালিকদের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেছেন। সূত্র> এনটিভির দুপুর ১২টার সংবাদ (২৭ নভেম্বর ২০১২)। এটিএন বাংলার ২৭ নভেম্বরের এক রিপোটর্ মতে, ১৯৯০ সাল থেকে দেশের পোশাক কারখানায় বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকান্ডে সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন অগনিত। প্রতে‍্যকটি ২৮ নভেম্বরের আমাদের সময় লিখেছে, দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার পোশাক কারখানা। হাসিনা এবং তাঁর সরকার ও সরকার সমর্থকদের ভাবখানা এমন যেন পোশাক কারখানায় এইবারই প্রথম আগুন লাগলো, আগে শ্রমিক মারা যায়নি একইভাবে! উনারা যেন অন্ধ, কিছুই দেখেন না, তাদের যেন জ্ঞান-বুদ্ধি কিছুই নেই। আসলে এরা জ্ঞানপাপী, মিথু‍্যক, ক্ষমতালোভী।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ। পোশাক কারখানাগুলিতে ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন। বৃহৎ এই পোশাক খাতই বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। আর এই সেক্টর আজ হুমকির মুখে। পোশাক শ্রমিকদের নেই জীবনের নিরাপত্তা, নেই কোন আর্থিক নিরাপত্তাও। কারখানাগুলিতে (অধিকাংশ) নেই কোন আগুন নেভানোর সুব‍্যবস্থা এমনকি জরুরি প্রয়োজনে নিরাপদ বহির্গমন ব‍্যবস্থাও। ফলে প্রতিবছরই আগুন লাগছে এবং কর্মজীবী মানুষ মারা যাচ্ছেন। মানুষ মারা গেলেই মাথাগুনে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ প্রদানের সেই প্রতিশ্রুতি পূরণও করা হয় না পুরোপুরি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছেন যে, “আমাদের হাতে সব তথ‍্য উপাত্ত আছে কী করে এবং কারা পোশাক কারখানায় আগুন লাগিয়েছে”? উনি দেশে কোন ঘটনা ঘটলেই বিশেষত: আইন-শৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট কোন ঘটনা ঘটামাত্রই এই “মখাআ” প্রায় একই বক্তব‍্য দিয়ে থাকেন মিডিয়ার সামনে। কিন্তু তাঁর বক্তবে‍্যর বাস্তবতা, সত‍্যতা কতটুকু, সাধারণ মানুষই বা কত শতাংশ বিশ্বাস করেন তাঁর বক্তব‍্য তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকারিদের আজও জাতির সামনে তিনি হাজির করতে পারেননি। শ্রমিক নেতা আমিনুল হত‍্যাকান্ডেরও কোন কিনারা করতে পারেননি এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। কিন্তু তারপরও তারা বলে চলেছেন, “সবকিছু বের করা হবে, অপরাধি শাস্তি পাবে, তদন্ত চলছে”। কিন্তু শেষতক খুনিদের নাগাল কখনই পায় না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি ও প্রশাসন!
নিশ্চিন্তপুরের পোশাক কারখানার গণহত‍্যার নায়কদের বাঁচাতে সুমি ও জাকির নামের দু’জনকে বলির পাঠা বানানোর নাটক মঞ্চায়ন ইতোমধে‍্য হয়ে গেছে। একশ্রেণীর মিডিয়া আবার সেটাকে ফলাও করে প্রচারও করছে। হায় সাংবাদিকতা! এই সাধারণ বিচারবুদ্ধি নেই যে সুমি এখানে ব‍্যবহৃত হয়েছে আগুন লাগানোর জন‍্য এবং ১১০ বা ১২৪ জন পোশাক শ্রমিকের গণহত‍্যার নায়কদের বাঁচাতে ও প্রকৃত ধামাচাপা দেবার জন‍্য। চাই অনুসন্ধানী ও এডভোকেসি সাংবাদিকতা মানুষের জন‍্য, সমাজে ন‍্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন‍্য এবং ঘাতকদের মুখোশ উন্মোচনের জন‍্য। সেই সাংবাদিকতা কোথায় পাবো? সব মিডিয়া মালিকও যে খালেদা নয়তো হাসিনা বা তাঁদের জোটভুক্তদের কট্রর সমর্থক কিংবা মিডিয়ামালিকদের আছে নিজ নিজ ব‍্যবসাপাতি ও স্বার্থ এবং কর ফাঁকির চেষ্টা, সাথে আরও আছে রাজনৈতিক দর্শন।
মিথ‍্যাবাদি, দুবৃত্ত শাসক, শোষক রাজনীতিক ও মিডিয়া নিপাত যাক, মানুষ জেগে ওঠুন নিজের মান-মর্যাদা, জীবন ও দেশ বাঁচাতে। দেশের মানুষ একদিন না একদিন জেগে ওঠবেনই, তখন কেউ কোন দিশা পাবে না পালানোর। সেই দিনটি না আসা পর্যন্ত নিশ্চিন্তপুরের মতো গণহত‍্যা ঘটতেই থাকবে! আমরা আমজনতা, হাসিনা-খালেদা বুঝি না। বুঝি দেশের স্বার্থ। শ্রমিক বাঁচলে, পোশাক কারখানা সচল থাকবে, বৈদেশিক মুদ্রা পাবে দেশ, সরকার। আর ঘুরবে অর্থনীতির চাকা। আর যাই হোক হাসিনা-খালেদারা অন্ত:ত এই সত‍্যটা বোঝার মতো বিবেক আছে। আর যদি নাই থাকে তবে দেশ শাসন করারও কোন অধিকার নেই তাঁদের।
কথা নয় কাজ দেখতে চাই আমরা। পোশাক কারখানাগুলিতে কাজের পরিবেশ, আট ঘন্টার বেশি সময়ের জন‍্য ওভারটাইম ভাতা প্রদান শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব‍্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন‍্যায‍্য মজুরি-ভাতা ও ছুটির ব‍্যবস্থাও করতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে শ্রমিক যেন নিরাপদে কারখানার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে তার ব‍্যবস্থা করাও অত‍্যন্ত জরুরি।
কাজেই ক্ষমতা, স্বার্থ ও পরিবারচিন্তা ভুলে মানুষ ও দেশকে বাঁচাতে এই দই নেত্রী সত‍্যচর্চা, গণতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা ও বাস্তবে তার চর্চা এবং দেশে ন‍্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যাবেন সেই প্রত‍্যাশাই করি সুদূর প্রবাস থেকে। জয় হোক মানুষ ও মানবতার, নিপাত যাক ষড়যন্ত্র, মিথ‍্যাচার আর স্বার্থপরতার সংস্কৃতি। ছবি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s