মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, সম্ভ্রমহারা মা-বোনের অশ্রু আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না যদি…!

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশে একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবু‍্যনাল। একাত্তরের কুখ‍্যাত রাজাকার আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার এখন পলাতক। অবশ‍্য এই তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদটিকে বর্তমান মহাজোট সরকারের গোয়েন্দাজালে আটকা ছিল। সেই জাল ছিন্ন করে বাচ্চু রাজাকার ভারতে পালিয়ে যান ২০১২ সালের ৩০ মার্চ। ব‍্যর্থতার এই খবরটি আবার দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীই গণমাধ‍্যমকে জানায়। কারা তাকে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করলো তার সুরাহা এখনও হয়নি। র‍্যাব-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন যুদ্ধাপরাধীর নিরাপদে দেশত‍্যাগ করাটা সহজ কিনা তা নিয়েও রয়েছে নানান আলোচনা। সে যাইহোক এই রাজাকারের একাত্তরে গণহত‍্যা, ধর্ষণ লুটপাটের অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দেয় আদালত আজ ২১ জানুয়ারি। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন ও একাত্তরে ফরিদপুরের আলবদর বাহিনী প্রধান এই ঘাতক এখন কোথায় তা দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ২০০৯ সালের ২৫ মার্চ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আবদুল আলীমসহ আরো ১০ জনের বিচার চলছে বর্তমানে। একাত্তরে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে যুদ্ধাপরাধ করে। জাতি আশা করেছিল গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদদের বিচারের রায় আগে দেয়া হবে, অন্ত:তপক্ষে পলাতক যুদ্ধাপরাধী বাচ্চুর বিচারের আগে। কিন্তু সেটা হয়নি। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ‍্যমগুলিতে নানান আলোচনা ও সমালোচনা চলছে।
এসব সমালোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের একজন সংবাদকর্মী সুলতানা রহমান ফেইসবুকে একটি স্টাটাস লিখেন। সুলতানার মন্তব‍্যটি ছিল এমন, “আমারা এমন এক জাতি যে সব কিছুতে-ই খালি সন্দেহ খুজি। বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় নিয়া কারো কারো ‘কপ-কপানি’ দেখে-শুনে রাগ উঠছে। এখন কয়, ‘হেতানের’ রায় আগে দিলো কেন? কেন গোলাম আযম এর রায় আগে হইলনা!! এর মধ্যে রাজনীতি আছে। সরকার মূলা ঝুলাইছে ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার করছি।‘ ভাইরে ভাই, যার বিচার প্রক্রিয়া আগে শেষ হবে তার রায় তো আগেই হবে। আর যদি বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় দিতে সরকারের সুবিধা হয়, তাতে আসুবিধার কি হইল? দেশে প্রতিদিন কত রায় হয়, তা নিয়ে তো কেউ কথা কয় না! যুদ্ধাপরাধিদের বিচার সঠিক হইল না বেঠিক হইল তা নিয়া যাদের অতিরিক্ত মাথা ব্যাথা তাদের মাথা ফেলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”
উৎসুক হয়ে আমি ছোট্র একটি মত দেই উনার স্টাটাসের মধে‍্য। আমি বলি, “একজন সচেতন নাগরিক বিশেষত: সচেতন নাগরিকটি যখন সংবাদকর্মী বা সাংবাদিক হন তাঁর কাছ থেকে “তাদের মাথা ফেলে দেয়ার ব‍্যবস্থা করা হোক” এমন অমানবিক, নৃশংস মন্তব‍্য আশা করি না। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সবসময় মাথার ওপরে রাখি তাই আপনার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও সমর্থন করি!”
এরপরে তিনি লিখলেন, “যুদ্ধাপরাধ ইসু‍্যতে আমি অমানবিক হতেও রাজি আছি”। পাল্টা জবাব দিতেই হয়। তবে পাল্টা জবাব লিখার আগে একটু পেছনের দিকে নিতে চাই আপনাদের। দেশের ১০১ জন বিশিষ্ট নাগরিক ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি যুক্ত ঘোষণায় সই করেন। ওই ঘোষণার মধ‍্য দিয়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং জামাতসহ সকল ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবিতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপরের ইতিহাস সবার জানান। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্ব দেশে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে। গঠন করা হয় গণআদালত। একই বছরের স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়াদর্ী উদ‍্যানে গণআদালত যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রতীকি রায় ঘোষণা করে। এরই প্রেক্ষিতে তৎকালিন বিএনপি সরকার দেশের খ‍্যাতিমান বুদ্ধিজীবীদের (২৪ জনের নামে) নামে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাও করেছিল। যুদ্ধাপরাধ ও ঘাতকবিরোধী আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেনি।
এবার সুলতানা রহমানের মন্তবে‍্যর জবাবে যা লিখেছিলাম তা এখানে হুবহু তুলে ধরছি।
“মানবতা সবসময় সর্বজনীন, এখানে দলপ্রীতি বা ব‍্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ’র বিচার করলে চলে না! যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না কেবল যুদ্ধাপরাধী-জামায়াত-শিবির আর তাদের ভোটের অংক কষে যারা ক্ষমতায় যেতে চায় তারা। এমনকি বিএনপির তরুণ একটা অংশও যুদ্ধাপরাধী গো. আজম, মইত‍্যা রাজাকার নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী গংদের বিচার চায় (প্রকাশে‍্য না চাক মনে মনে ঠিকই চায়)। কিন্তু যে কুখ‍্যাত লোকটি (যারা তাকে তথাকথিত ইসলামী চিন্তাবিদ নামধারণের সুযোগ করে দিয়েছিল সেইসব মিডিয়া মালিকদের অনেকেই সরকারের কাছের মানুষও বটে) গোয়েন্দাজালের ভেতরে থাকল সে কী করে র‍্যাব, পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে বিদেশে চলে গেলো— এই প্রশ্নটি করা কী অসমীচিন? আর আগে ধৃত ও আগে শুরু হওয়া মামলাগুলির রায় দেয়ার আগে একজন পলাতকের বিরুদ্ধে বিচারের রায় প্রকাশ করা হলে কেউ যদি তাতে প্রশ্ন তোলে তারজন‍্য তার মাথাটাই কেটে ফেলার দাবি কতটুকু যৌক্তিক। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে বাংলা ভাইদের হত‍্যা-নির্যাতনের সময়কার দুবর্িষহ দিনগুলির কথা, রাজশাহী ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ‍্যালয়ে জামায়াত-শিবিরের ভয়ানক সব তান্ডবলীলা ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস। আজ অনেকে যারা সুবর্ণ সময়ের সুযোগ নিয়ে হালুয়া-রুটি ও চাওয়া পাওয়ার হিসাব-নিকেশ কষে যুদ্ধাপরাধবিরোধী জিহাদী মনোভাব দেখাচ্ছে তাদের টিকিটিও দেখা যায়নি সেই দু:সময়গুলিতে। তখন রাস্তায় দেখিনি অনেককে যাদের মুখে এখন যুদ্ধাপরাধীবিরোধী কথাবার্তার ফেনা উড়তে দেখছি! ঘটনার এখানেই শেষ নয়, জামাতের এক নেত্রীর ছেলেকে (সদ‍্য আওয়ামী লীগার, ২০০১ সালের মে মাসে যোগদানকারী) প্রতিমন্ত্রী বানানো হয়েছে! জাতির মা, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যে বীর মহান মানুষগুলি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনকে গণ আন্দোলনে রুপ দিলেন সেই আন্দোলনের ফসলও ঘরে তুলেছি আমরা অনেকেই কিন্তু উনাদের সংগ্রামের সাথে বেঈমানি কী করি নি? মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম,ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংস কমিটি, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মুল সমন্বয় কমিটি (বর্তমানের কমিটিসহ), কবি সুফিয়া কামাল, কবি শামসুর রাহমান, কাজী আরেফ আহমেদ, শওকত ওসমান, মাওলানা আবদুল আউয়াল, ব‍্যারিষ্টার শওকত আলী খান, জাতীয় অধ‍্যাপক কবীর চৌধুরী, বিচারপতি কে এম সোবহান, এ‍্যাডভোকেট গাজীউল হক, সৈয়দ হাসান ইমাম, শ‍্যামলী নাসরিন চৌধুরী, অধ‍্যাপক মুনতাসির মামুন, আবদুর রাজ্জাক, প্রখ‍্যাত সাংবাদিক-লেখক শাহরিয়ার কবিরদের (আরও অসংখ‍্য মানুষের নিরলস আন্দোলন) মতো মানুষদের হার না মানা আন্দোলনের ফসলটাকে জাতি পুরোপুরি ঘরে তুলতে চায়। তাই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক যখন একজন পলাতক রাজাকারের বিচার হয় ধৃত গোলাম আজম, নিজামী, সাঈদীদের বিচারের আগেই। এটা দোষের কিছু নয়, কিন্তু প্রশ্ন জাগাটা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে কী? মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, সম্ভ্রমহারা মা-বোনের অশ্রু আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না যদি আমরা এই একাত্তরের সেই ঘাতক, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে ব‍্যর্থ হই।”
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম এর নেতৃত্বে ১২ সদসে‍্যর গণ আদালত গোলাম আজমের মৃতু‍্যদন্ডাদেশ দিয়েছিল। একইসঙ্গে মতিউর রহমান নিজামী, মো. কামারুজ্জামান, আবদুল আলীম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আনোয়ার জাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, আব্বাস আলী খান ও মাওলানা আবদুল মান্নান এর নাম যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ঘোষণা করেছিল গণ আদালত। এইসব বাদ রেখে (যারা মারা গেছে তাদের মরণোত্তর বিচার হতে পারে বা শাস্তি হতে পারে) পলাতক কুখ‍্যাত বাচ্চু রাজাকারকে (তাকে পালাতে কারা সহায়তা করলো সেটাও একটা প্রশ্ন) আগে ফাঁসি দেয়ার ভেতরে কারো তরফে কোন হীন উদ্দেশ‍্য নেইতো? নির্বাচনের আগে নতুন করে কোন মূলা ঝূলবে নাতো? ছবি গুগল থেকে সংগ্রহীত।

Advertisements

One response to “মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, সম্ভ্রমহারা মা-বোনের অশ্রু আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না যদি…!

  1. hallo jahangir alamakash ich hoffe es geht euch sehr gut

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s