কে ভারসাম‍্যহীন: সাংবাদিক এ বি এম মুসা নাকি মাহবুব উল আলম হানিফ?

abmmusa-hasina
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। সাংবাদিক এ বি এম মুসা। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কেউ কেউ হয়ত উনাকে চেনেন না। শুদ্ধ ও স্বচ্ছ চিন্তার প্রগতিশীল এই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিকের ওপর মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বাংলায় সাংবাদিকতার এই প্রাণ পুরুষকে আজ জীবন সায়াহ্নে এসে “স্বাধীনতাবিরোধী”র কু উপাধি দেয়া হচ্ছে। অথচ এই মানুষটির সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছিল ঘনিষ্ট হৃদ‍্যতা। ছি ছি ছি লজ্জায় মাথায় নূ‍্যয়ে পড়ছে এই কারণে যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটির আজ কী অবস্থা!
১৯৯১ কী ১৯৯২ সালের কথা। সালটির কথা এখন আমার পুরো মনে নেই। এ বিএম মুসাকে পেয়েছিলাম সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কোর্সের শিক্ষক হিসেবে। ওই সময়ে আমি পঞ্চগড় থেকে দৈনিক বাংলা ও বাংলার বাণীতে কাজ করি। যাহোক তখন থেকেই উনাকে (এবিএম মুসা) আমি ব‍্যক্তিগতভাবে চিনি। নব্বইয়ের দশকে তিনি (এবিএম মুসা) “নিউজ ডে” নামে একটি ইংরেজী দৈনিকের সম্পাদকও হয়েছিলেন তিনি। সেই পত্রিকায় কিছুদিন পঞ্চগড় সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করি আমি। মেয়র লিটন, কতিপয় সংবাদকর্মীর্ ও র‍্যাবের যৌথ ষড়যন্ত্রের মাধ‍্যমে র‍্যাব ২০০৭ সালে বেআইনিভাবে আমাকে গ্রেফতার করে। প্রায় এক মাস পর নির্যাতন ও কারামুক্তির পর ঢাকায় চলে যাই। তখন এই প্রিয় সাংবাদিক শিক্ষক আমার ওপর নৃশংসতার ঘটনাটি শোনেন এবং খুব বিরক্ত প্রকাশ করেন যে শহীদ জাতীয় নেতা কামারুজ্জামানের ছেলে আমার ওপর অত‍্যাচার করার পেছনে মদদ দেয়ার কারণে। সেসময় উনি আমাকে ভয় না পাবার জন‍্য অনেক সাহস ও অনুপ্রেরণাও দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে এখন একটা নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটির সমালোচনা করলেই মুক্তিযোদ্ধাও তাদের কাছে রাজাকার বনে যায়। সুতরাং আওয়ামী লীগ বা সরকারের বিপক্ষে কোন কথা বলা যাবে না যদিও বা সেইসব কথা সত‍্যও হয় তবুও না, নইলে আপনিও “রাজাকার” উপাধি পাবেন যেমনটি পেয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। অথচ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত‍্যার পর তিনিই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করেছিলেন।
সাংবাদিক এবিএম মুসাকে স্বাধীনতাবিরোধী বলার প্রসঙ্গে আসি এবার। বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৩ সালে এবিএম মুসা আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে জাতীয় সংসদের সদস‍্য নির্বাচিত হন। তিনি সংসদ সদস‍্য হয়েছিলেন ফেনি থেকে। সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভি ষ্টেশন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক পদেও তাঁকে নিযুক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুই। অভিজ্ঞ এই সাংবাদিককে আওয়ামী লীগ সরকারই একুশে পদকে ভূষিত করেছিল।
সাংবাদিক এবিএম মুসার সাম্প্রতিক এক বক্তব‍্যকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর প্রচন্ড নাখোশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগ। আর এই ক্ষুব্ধতার প্রকাশ ঘটেছে সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মুখে। তিনি বলেন, “এবিএম মুসা মানসিক ভারসাম‍্যহীন এবং স্বাধীনতাবিরোধী”। হানিফ মাহেবের বক্তব‍্য প্রমাণ করে যে, এবিএম মুসা নন আওয়ামী লীগই সম্ভবত ভারসাম‍্য হারাচ্ছে! প্রশ্ন হলো, হানিফ কী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যে যাকে তাকে তিনি মানসিক ভারসাম‍্যহীন বলে দেবেন? আসলে এই হানিফমাকর্া আওয়ামী লীগারদের কান্ডজ্ঞানহীন বক্তব‍্য আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিকে পায়ের তলে পিশিয়ে দিচ্ছে!
ব‍্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকারদের সমর্থন করি না! তবে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলাই আমার ধর্ম। শ্রদ্ধেয় এবিএম মুসা কী মন্তব‍্য করেছিলেন তা আমি শুনিনি নিজ কানে। তবে আমার প্রচন্ড তাগিদ হচ্ছে এই জনে‍্য যে উনার পুরো বক্তব‍্যটি পড়া বা শোনা উচিত আমাদের সবার। কোন প্রেক্ষাপটে, কোন বিবেচনায় উনি কী মন্তব‍্য করেছেন? কারও কাছে যদি উনার বক্তব‍্য বা মন্তবে‍্যর কোন অনলাইন লিংক থাকে দয়া করে আমাকে দেবেন। আর দেশে যখন ছলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, জগাই, মঘা সকলেই টিভির লাইসেন্স পাচ্ছেন, মিডিয়ার মালিক বনে যাচ্ছেন সেখানে এবিএম মুসার মতো ব‍্যক্তিকে হাসিনার সরকার কোন যুক্তিতে টিভির লাইসেন্স পেলেন না বা পাবেন না সেটারও একটা পরিচ্ছন্ন ব‍্যাখ‍্যার প্রয়োজন। হানিফরা বঙ্গবন্ধু হত‍্যার পরে কী ধরণের প্রতিবাদ করেছিলেন নাকি মোশতাকদের তোষামদী করেছিলেন তাও আমি জানি না, তবে তোষামদি, জ্বিহুজুর বা জ্বি ম‍্যাডাম (হুজুর বা ম‍্যাডাম যা বলে করে তার সবই ১০০০০ গুণ সত‍্য!) করে যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করা যায় বটে (মনোনীত বা দলীয় প্রধানের পছন্দের তালিকাভুক্ত হিসেবে) কিন্তু গণতান্ত্রিক হওয়া যায় না! তারজন‍্য সহনশীলতা,কান্ডজ্ঞান, ধৈয‍্য আর সততা-স্বচ্ছতারও দরকার পড়ে। হানিফ সাহেবদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে জেলায় জেলায় নেতা বানিয়ে দেবারও অভিযোগ কানে আসে। আর এই হানিফদের তথাকথিত সাংগঠনিক রিপোর্টের কারণেই অনেক জেলায় নির্বাচিত নেতাদেরকেও বাদ দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগেরও চুলচেরা তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার।
বাংলাদেশনিউজ২৪x৭’র রিপোটর্ থেকে সাংবাদিক এবিএম মুসার সেদিনের বক্তব‍্য থেকে বোঝা যাবে আসলে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কী বলেছিলেন? জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ২৪ জানুয়ারি সাবেক ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান দিবসে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের উদ্দেশে এবিএম মূসা বলেন, আপনারা প্রতিবাদ করুন। আপনারা বলুন- ছাত্রলীগের নামটাকে তোমরা কলঙ্কিত করো না। প্রয়োজনে তোমরা একে ‘হাসিনা লীগ’-‘বাম লীগ’ নাম দাও। শেখ মুজিবের সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবিএম মূসা বলেন, ঐতিহাসিক ৬ দফা ছাত্রদের সূচনা। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ কর্তৃক সৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন তৃতীয় শ্রেণীর নেতা ছিলেন। নিজগুণে তিনি এগিয়ে এলেন এবং ছাত্রদের চেষ্টাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীর নেতা হলেন। বঙ্গবন্ধু যতটা না উর্বর মস্তিষ্কের নেতা ছিলেন, তার চেয়েও বড় ছিল তার বিশাল আস্থা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিন ৭ মার্চই হচ্ছে- প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস। সত্যিকারের স্বাধীনতা তিনি সে দিনই ঘোষণা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জনগণের পালস (নাড়িস্পন্দন) বুঝতে পারতেন। পাঠ্যপুস্তক থেকে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম বাদ দেয়ার কঠোর সমালোচনা করে এবিএম মূসা বলেন, ভাসানী আওয়ামী লীগের জন্মদাতা, তাকে বাদ দেয়া মানে জন্মদাতাকে অস্বীকার করা। আর যে জন্মদাতাকে অস্বীকার করে বা যার জন্মদাতা থাকেনা, তাকে আমরা কী বলি? জারজ বলি। ভাসানীকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগ হয় জারজ। সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এখনও এক বছর সময় আছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশুন, তাদের কথা শুনুন।
আওয়ামী লীগ নেতা হানিফ প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীকেও ‘উন্মাদ’ বলে আখ‍্যা দিয়েছেন। হানিফের ভাষায়, নূরে আলম ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনের ফ্লোরে গড়াগড়ি খেয়ে ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। সাংবাদিক মুসাকে ‘স্বঘোষিত বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগপ্রেমী’বলেও অভিহিত করেন হানিফ। সূত্র-বিডিনিউজ২৪।
ঢাকার রাজপথে বিশ্বজিৎকে নৃশংসভাবে হত‍্যা, ময়মনসিংহে শিশু রাব্বীকে গুলি করে হত‍্যাসহ প্রায় দেশজুড়েই ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, নির্যাতন, বন্দুকযুদ্ধে মানুষ অতিষ্ঠ। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্রলীগের তান্ডবে শিক্ষার বারোটা বেজে যাচ্ছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর দলের দ্বারা পরিচালিত সরকারের মঙ্গল চেয়ে যখন সরকারকে খারাপ দিকগুলি থেকে সরে আসার জন‍্য পরামর্শ দেন তখন সেটা হানিফদের মতো তোষামদকারি নেতারাই কেবল সাংবাদিক মুসাকে মানসিক ভারসাম‍্যহীন বা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলমকে উন্মাদ বলতে পারেন!
ডাক্তারি কোন পরীক্ষা, নীরীক্ষা বা সনদপত্র ছাড়াই কাউকে উন্মাদ বা মানসিক ভারসাম‍্যহীন বলাটা একটা ক্রিমিনাল অফেন্সও বটে। এধরণের বক্তব‍্য ব‍্যক্তি মানুষের মর্যাদার ওপর আঘাতও বটে। সেই বিচারে মাহবুব উল হানিফদের বিরুদ্ধে মামলাও হতে পারে। আর এ বিএম মুসাযদি স্বঘোষিত বঙ্গবন্ধুপ্রমিকই হতেন তবে তাঁকে বঙ্গবন্ধুই বা কেন তেহাত্তরের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন? হানিফ সাহেবের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর আছে কী? জনাব হানিফের কথা অনুযায়ী নূরে আলম সিদ্দিকী নাকি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গড়াগড়ি করে ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন! যদি হানিফের কথাই সত‍্য হয় তবে তো বলতেই হয় অগণতান্ত্রিক পন্থায় তোষামদি করে ছাত্রলীগের সভাপতি ও অন‍্যান‍্য পদে নেতা হওয়াটাও খুবই মামুলি ব‍্যাপার। আওয়ামী লীগ প্রধানও কী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের বক্তবে‍্যর সঙ্গে একমত? হানিফের বক্তব‍্যতো কেবল ব‍্যক্তি হানিফের নয়, তাঁর বক্তব‍্য আওয়ামী লীগের, সরকারের এমনকি আওয়ামী লীগ ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনারও।
প্রিয় পাঠক এখন আপনারাই বলুন, কে ভারসাম‍্যহীন? আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ নাকি এই প্রবীন সাংবাদিক এ বি এম মুসা? ছবি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s