শাহবাগ জেগে আছে নিরন্তর, ঘুচে যাবে অন্ধকার!

rajib

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ। ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকেও খুন করলো ওরা। স্বদেশে মানুষ হত্যা এক মামুলি ব্যাপার। ওখানে সরকারি বাহিনী খুন করে অবলীলায়। কখনও কখনও গুম করে দেয়া হচ্ছে রাজনীতিক কিংবা সাধারণ মানুষকে। কিছুদিন আগে ব্লগার আসিফ মহউদ্দীনকেও হত্যাপ্রচেষ্টা চালিয়েছে শয়তানের দল। সেই হত্যাপ্রচেষ্টাকারিদের শনাক্ত করতে পারেনি সরকার। সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির খুনিরা ধরা পড়েনি আজও। কোন হত্যাকান্ডই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সকল হত্যাই নির্মম ও নিষ্ঠুর। হয়ত খুনিদের জিঘাংশার মাত্রা কারও ওপর প্রকাশিত  হয় বেশি।  যেমনটি ঘটেছিল সাগর-রুনির বেলাতেও।  মানুষ কতটা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও নৃশংস হলে কাউকে খুন করা হয় আঘাতের পর আঘাতে। কতটা র্ববর হত্যার পর আবার জবাই করা হয়।

দেশে একের পর এক হত্যাকান্ড ঘটে আর আমাদের সচেতন নাগরিক সমাজ জেগে ওঠে মডিয়া, ব্লগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলিতে। ভাবখানা এমন যেন কাউকে খুন করার পর সবাই বিপ্লবে ঝাপিয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত সবাই নিরব হেয়ে যায়। স্বজন হারানোর বেদনা কেবল সংশ্লিষ্ট পরিবারই য়ে বেড়ায় অনন্তকাল।

প্রতিটি হত্যাকান্ডের পর একই কথা, একই হুংকার, একই বক্তব্য আসে সরকারে যারা থাকে তাদের কাছ থেকে। সহযোদ্ধারাও একেকজন বিপ্লবী হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষমেষ সব চুপচাপের মধ্যে চলে যায়। নিহত বন্ধুটিরে প্রতি লালসালাম জানানোর ধুম পড়ে। পাশাপাশি নিহত বন্ধুটির রক্ত বৃথা যেতে দেবোনা বলে মাতম তোলে অনেকে। কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান আসে না কোনবারই কখনও না।

ঘাতক রাজাকার যুদ্ধাপরাধীর দল গুপ্ত হত্যা চালাতে পারে- এই বিষয়ে সরকারে গোয়েন্দাসংস্থাগুলি কী করে? প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা শোভনের নৃশংস হত্যাকান্ডের পর প্রধানমন্ত্রি বললেন জামাতের রাজনীতি করার অধিকার নেই। কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বা জামাতের রাজনীতি বন্ধ করা হচ্ছে না কেন, বিগত চার বছরের শাসনকালেও এটা করা হলো না কেন তার জবাব কী শেখ হাসিনার কাছে আছে?

ঘাতকগোষ্ঠী ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সকলেই চান। ফাঁসি নাকি যাবজ্জীন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিচার করার জন্যইতো আন্তজার্তিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এবার কিছু বাস্তব প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই আজকের লেখায়। তার আগে একটু পেছন ফিরে দেখা যাক, কিভাবে জামাত-শিবির তথা যুদ্ধাপরাধীরা রাজনীতি-অর্থনীতি ও সমাজে যে শক্ত ভীত গড়ে তুলতে সক্ষম হলো তার জন্য কে দায়ী? শুধু কী সামরিক সেনা ছাউনিতে গড়ে ওঠা দলগুলিই দায়ী নাকি মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারি রাজনৈতিক দলগুলিরও দায় আছে বা ছিল এক্ষেত্রে?

জাতির  পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশে ছিল স্বৈরশাসন। ১৯৯১ সাল থেকে অবসান হলো স্বৈরশাসনের। কিন্তু বিগত দুই দশকের অধিক সময় ধরে দেশের মানুষ কী দেখতে পেয়েছেন গণতন্ত্রের প্রকৃত রুপটিকে বাস্তবে? শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে হড়ে ওঠা গণজাগরণকে কী ১৯৯৬ সালের পরের আওয়ামীলীগ সরকার যথাযথ সম্মান দেখাতে পেরেছিল? ২০০৮ এর জাতীয় নির্বাচনের জাতীয় গণরায় আওয়ামী লীগের মহাজোটকে দিলেন দেশবাসি। কিন্তু কিসের মোহে তারা বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যেতে পারলো না? এজন্যও কী যুদ্ধাপরাধীরাই দায়ী নাকি আমরাও অনেকাংশে দায়ী? বাহাত্তরের মূল সংবিধানে পুরোপুরি ফিরে গেলেইতো ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার কোন সুযোগই থাকে না কারও। সেই পথে হাসিনার মহাজোট সরকার হাটলো না কেন?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়াটা যেমন খুবই জরুরি তেমনিভাবে জরুরি চলমান দুর্নীতি, নিযার্তন, ধর্ষণ, বিচার বহিভূর্ত হত্যাকান্ড, সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধসহ রাজনৈতিক অসুস্থ্যতাকে সারিয়ে তোলা। রাজনীতিতে সহনশীলতার চর্চা এবং সকল মতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছাড়া কী গণতন্ত্রকে সামনের দিকে চালানো যায়? সমাজে দলবাজি ও ব্যক্তির নয়  আইনের শাসন না থাকলে কী ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে?

অনেকে হয়তো মনে করছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটা রায় বা ফাঁসির রায় এবং তা কাযর্কর করা গেলেই দেশে শান্তির সুবাতাস বইবে! সমাজ থেকে বৈষম্য, অনাচার, অবিচার, দুর্নীতি, হত্যা, গুম বন্ধ না হলে যুদ্ধাপরাধীদের হাজারবার ফাঁসি দিলেও মুক্তিযুদ্ধের যে আসল চেতনা, লক্ষ তার কাছে পৌছানো সম্ভব না।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতো একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ যেখানে ক্ষুধা, দুর্নীতি, দারিদ্র, বৈষম্য, অবিচার, নারী অবমাননার কোন চিহ্ন থাকার কথা ছিল না। দেশটা একটা সোনার বাংলাদেশ হবে।স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের সম্ভ্রম হারানোর জন্য কী দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন মহান মুক্তিযোদ্ধারা? মুক্তিযোদ্ধা ভিক্ষা করবেন বা রিকশা চালিয়ে সংসার চালাবেন তার জন্যই কী মুক্তিযুদ্ধ? সাংবাদিক-ব্লগার হত্যা হবেন তার জন্যই ৩০ লাখ মানুষের আত্মদান? মা-বোনেরা রাস্তা-ঘাটে বা নিজ বাড়িতে নিজের সম্ভ্রম হারাবেন তারজন্যই কী ১৯৭১ এর যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন বীর বাঙালি? পোশাক কারখানায় শতশত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করার জন্যই কী বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করেছিলেন?

ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করবার জন্য কিংবা রাজনীতিকে পারিবারিকীকরণ করার জন্যই কী একাত্তরে দুই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন? রাষ্ট্রই বিনাবিচারে মানুষকে হত্যা করবে তারজন্যই কী দেশের মানুষ লড়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে?

সবার শেষে বলতে চাই, প্রজন্ম যে বাংলার বুক থেকে সকল অনাচার, হত্যা-যুদ্ধাপরাধ, সাম্প্রদায়িকতা ও অবিচার বিরোধী জাগরণী গানের সুরের ঝংকার তুলেছেনে সারা বাংলায় তার মুর্ছনায় দেশ, দেশের রাজনীতি ফিরে পাবে এক নতুন পথের দিশা। জয় বাঙলা, জয় প্রজন্ম। যত আসবে আঘাত বিপ্লবী কন্যা লাকিদের ওপর কিংবা মানবতাবাদী রাজীবদের ওপর ততই শাহবাগের চেতনা ছড়িয়ে পড়বে দেশ থেকে দেশান্তরে। শাহবাগ জেগে আছে নিরন্তর, ঘুচে যাবে অন্ধকার, বাংলার আকাশে উদিত হবে শুভ সকাল।  ছবি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s