Monthly Archives: মার্চ 2013

অসহিষ্ণু গণতন্ত্র: সংলাপ ও সামরিক হস্তক্ষেপ ভাবনা!

sangbad-31-7-2009-hrc-politics

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। যেখানে গণতন্ত্র থাকে সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপে তার ক্ষতি হয়। আর যেখানে গণতন্ত্রের নামে ব‍‍্যক্তি, দল বা বিশেষ পরিবারের শাসন চলে সেখানে সামরিক কিংবা সাম্রাজ‍্যবাদি কিংবা জঙ্গি হস্তক্ষেপ তাতে  জনগণের কী আসে যায়? সাধারণ মানুষ খালেদা-নিজামীর গণতন্ত্রের সময়ে যেমন নির্যাতিত ঠিক তেমনিভাবে হাসিনা-ইনু-মেনন-বড়ুয়াদের গণতন্ত্রের আমলেও মার খায়!

 

ফারাকতো একটা আছেই, আর তা হলো খালেদা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে চান, হাসিনা স্বৈরাচারকে সাথে নিয়ে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করেন। সবার উপরে ক্ষমতা সত্য তাহার উপরে নাই! দুর্নীতি, দলীয়করণ, সংখ‍্যালঘু নির্যাতন কার আমলে ছিল না বা নেই? গণতন্ত্রটা কেবল হাসিনা খালেদা এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে তাদের স্তুতি গাওয়া নয়, গণতন্ত্র কিন্তু পরস্পরের প্রতি সহনশীলতা, সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। এই শিক্ষার কী কোন চিহ্ন দেখা যায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রে?

রেডিও র্জামান ডয়েচেভেলের এক রিপের্াটে সামরিক হস্তক্ষেপ বিষয়ে একটি রিপের্াট নিয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছিল ফেইসবুকে। তারই প্রতিক্রিয়ায় উপরোল্লিখিত প্রতিক্রিয়া আমার। আজ আবার তারা লিখেছে যে,  বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংলাপ ছাড়া সমাধান নেই৷ আপনার কি মত?

আমার মত পরিস্কার। আমি বলবো-এই সংলাপ জিনিসটা আসলে কী? বাংলাদেশে কী সংলাপ কোন শান্তি আনে, অতীতে তার কদযর্ রুপটিই বারবার ধরা পড়েছে মানুষের চোখে। ওখানে যতক্ষণ পর্যন্ত ব‍্যক্তি হাসিনা ও খালেদার মনোজগত পরিচ্ছন্ন না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই দুই “মহামানবী”র পক্ষে অথবা বিপক্ষে সুশিল-কুশিল সবাই বিভক্ত হয়ে থাকবে! আর যেখানে অন্ধ দলপ্রীতি, ব‍্যক্তিতন্ত্র সেখানে আর যাই হোক সংলাপে কোন সমাধান মিলবে না। সহনশীলতা ছাড়া সংলাপ সফলতায় আসে না।

Advertisements

সংখ্যালঘু র্নিযাতন ও স্বদেশের চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি: একটি আবেদন ও আমার অবস্থান

 

minority-oppression-sangbad-jaa

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। মানবতা, মানবাধিকার কখনও বিশেষ কোন ব‍্যক্তি, গোষ্ঠী, দলের জন‍্য নয়, এটা সর্বজনীন। স্বদেশ এক ভয়ংকর সংকট অতিক্রান্ত করছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষাক্ত থাবা আর দুই বড় রাজনৈতিক জোট ও দলের  ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থাকবার বাসনার শিকার দেশের সিংহভাগ মানুষ। হত‍্যা, সন্ত্রাস, নির্যাতন, অবিচার মানুষের নিত্যসঙ্গী। ক‍্যান্সারসদৃশ দুর্নীতি আর সর্বগ্রাসী দলীয়করণ ও রাজনীতিতে পারিবারিকীকরণ দেশের সব অর্জন নষ্ট করে দিচ্ছে।

ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন ও হত্যা যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধ, ঠিক তেমনিভাবে বিচার বহিভর্ূত হত্যাকান্ড, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন, ব্লগারদের ওপর আক্রমণ-হত্যা, গুপ্তহত্যা, ধর্মীয় উপাসনালয় ভাংচুর এসবও মানবতাবিরোধী অপরাধ! একটা সমাজে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, গণমাধ‍্যম স্বাধীনভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে না, আইনের শাসন যখন থাকে না, রাষ্ট্র যখন নিজেই সন্ত্রাস দমনের নামে হত্যার পথ বেছে নেয় তখন সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ ধারাবাহিকতা লাভ করে।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই রিকশা চালান, কেউ কেউ ভিক্ষা করেন আর ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন‍্য বড় রাজনৈতিক দলদুইটি যুদ্ধাপরাধীদের ব‍্যবহার করেছে। যার ফলশ্রুতিতে ওদের শেকড় এখন অনেক গভীরে চলে গেছে। যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবির শিক্ষা, ব‍্যবসা, চিকিৎসা, বীমা, ব‍্যাংকসহ বিভিন্ন স্তরে অর্থনৈতিক শক্তির ভীত বেশ মজবুত করে নিয়েছে। তাদের এসব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি কী আপনা আপনি আজকের শক্ত অবস্থানে এসেছে?

আমরা জানি জেনারেল জিয়া, বিএনপি, জিয়াপত্নী খালেদা জিয়া বরাবরই যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। কাজেই বিএনপি ও তাদের জোট জামাত-শিবিরের পক্ষ নেবে এতে আশ্চর্য‍্য হবার কিছু দেখি না। বরং যখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটি জামাতকে ব্যবহার করে, সেটা ইতিবাচকই হোক আর নেতিবাচক অর্থেই হোক না কেন তখন রাজনীতিতে এই ঘৃণিত দলটি পুনর্বাসিত হয়।

বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করার জন‍্য জীবনভর লড়েছেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি সর্বজনীন, সুন্দর সংবিধান দিয়েছিলেন জাতিকে। সেই সংবিধান, তথা  বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিক বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এখন ব্রুট মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায়। কেন তারা বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে গিয়ে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলি নিষিদ্ধ করার ব‍্যবস্থা করছে না? সেদিন কালের কণ্ঠে একটা প্রতিবেদনে বলা হলো একজন জামাত নেত্রীর সন্তান ২০০১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন প্রতিমন্ত্রী। সেই প্রতিমন্ত্রির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এক জামাত নেতার ইন্ধনে ব্যাপক নৈরাজ্য চলছে একটি উপজেলায়।

আজকের লেখার প্রসঙ্গ আসলে এগুলি নয়। লিখতে চাইছি বাংলাদেশের চলমান অশান্তি ও অরাজক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মহাসচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি আবেদন লেখা হয়েছে। সেই আবেদনে সই করার জন‍্য আমার এক প্রিয় ব‍্যক্তি ফেইসবুকে আমার টাইমলাইনে আপলোড করেছেন। আমি সেই আবেদনে সই করিনি। এমন আরও অনেক পিটিশন এসেছে আমার কাছে। কিন্তু কোন পিটিশনেই সই করিনি। কিন্তু কেন? তার দায় মেটানোর জন‍্য আজকের লেখার সূত্রপাত।

দেশে মানুষ গুম হচ্ছে, তাদের হদিসও মিলছে না। সাংবাদিকদের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। ব্লগারদের ওপর একের পর এক আক্রমণ চলছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিচার বহিভর্ূতহত্যা চালাচ্ছে। আদিবাসি নেত্রী কল্পনা রায়  বছরের পর বছর  ধরে নিখোঁজ। আদিবাসি নারী ধর্ষণ হত্যা চলছে। পথে ঘাটে এমনকি নিজ ঘরে নারী লাঞ্ছিত হচ্ছেন, ধষর্িত হচ্ছেন, সম্ভ্রম হারিয়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। আর ধর্মীয় সংখ‍্য‍্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ এ আর নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় থেকে হিন্দুদের ওপর শুরু হয়েছে অমানবিকতা। তাদের ঘর-বাড়ি ভাংচুর, মন্দির ভাংচুর, প্রতিমা ভাংচুর, সম্পদ লুণ্ঠন, দেশত‍্যাগে বাধ‍্য করা, হত্যা-নির্যাতনসহ বহুমুখী হামলা- অত্যাচার চলছে।

দেশ যখনই সংকটে পড়ে, যখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে তখনই আক্রমণের লক্ষ‍্যবস্তুতে পরিণত হয় হিন্দুরা। এবারও তার ব‍্যতিক্রম ঘটেনি। এবারও আরেক বাঁশখালী ট্রাজেডি ঘটানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল দুবর্ৃত্তরা। বহু হিন্দু বাড়ি, মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে। অনেকে নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অগণিত মানুষ। মিডিয়ায় ঘর-বাড়ি সম্পদ হারা হিন্দু নারীদের আহাজারি দেখে চোখের জল ধরে রাখা যায় না। মানুষ

চলমান সংঘাতে শুধু  সংখ্যালঘুরাই নয়, পুলিশের ওপরও আক্রমণ চলছে। নিরীহ পুলিশদেরকে নিষ্ঠুর ও বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরের অনেকে (শতাধিক বলে দাবি করা হয়) নিহত হয়েছে গুলিতে। হত্যা হত্যাই সেটা  যেভাবেই হোক যে অজুহাতেই ঘটুক যারাই করুক বা যিনিই নিহত হোন। হত্যার বদলে হত্যা মানেই বিচারহীনতা, আইনের শাসনহীনতা, মানবতাবিরোধী অপরাধ।

জাতি ৪২ বছর ধরে অপেক্ষা করছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখার  জন্য। সেই বিচারযখন শুরু হবে তখন যুদ্ধাপরাধীরা কী বসে বসে আঙুল চুষবে নাকি তারা নানান কায়দা কৌশলে বিচার বানচালের প্রচেষ্টা নেবে? এই নূ্যনতম বোধ বিবেচনা থাকলে সরকার আগে থেকে সচেতন থাকতো, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো। আর পুলিশকে দিয়ে রাজনৈতিক দলের অফিস অবরুদ্ধ করে না রেখে রাস্তায় যারা ভাংচুর ও আগুন লাগাচ্ছে তাদের ধরে আইনের আওতায় নিলেই সব ঠান্ডায় থাকতো। বলপ্রয়োগের ফল কখনই ইতিবাচক হয় না।

দেশের মানুষ ভালো করেই জানেন যে সরকারে যিনি বা যে দল থাকে তিনি বা সেই দলের বক্তব‍্য একইরকমের হয় সেটা আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকুক নতুবা বিএনপিই ক্ষমতায় থাকুক। তেমনিভাবে বিরোধীদলে যারাই যাক তাদের বক্তব্যও এক ও অভিন্ন। সমস‍্যাটা হলো বিচার কেউই মানতে চায় না। আর বিচার মানলেও তালগাছ চাইই চাই!

আমি চাই বাংলাদেশ থেকে সকল ধরণের হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হোক, বন্ধ হোক অমানিক গুমসংস্কৃতি, বিচার হোক সকল হত্যার, দেশে আইনের শাসন থাকবে, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ, আদিবাসি সকলেরই সহাবস্থান ও যৌথ প্রচেষ্টায় দেশ সোনার বাংলায় রুপান্তরিত হোক। এইতো আমার স্বপ্ন। না, এটা শুধু আমার নয় অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থক ছাড়া দেশের সিংহভাগ মানুষই একই স্বপ্ন দেখেন বলেই আমার বিশ্বাস।

গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার বাস্তবিক চর্চা আর সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে স্বপ্নের সোনার বাংলা আর স্বপ্ন নয় বাস্তবেই তার দেখা মিলবে। আর সেই পয়েন্টে যাবার জন‍্য চাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধে‍্য সহনশীলতা, সৎভাব ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সর্বগ্রাসী দুনর্ীতির মুলোৎপাটন করা।

আমি কোন পক্ষের বিশেষ কোন দলের বা মতাদর্শের পক্ষে লিখি না, বলি না। আমার স্পষ্ট অবস্থান মানবতার পক্ষে। আমার পক্ষ সত‍্য, সুন্দর, মানবতা আর ভালবাসা। বিশেষ কোন দল, মত বা আদর্শ আমার পক্ষ নয়।  যুদ্ধাপরাধী আর স্বৈরাচার কোনটাই গণতন্ত্রের জন‍্য শুভ নয়।

একজন সংবাদকর্মী বা লেখক যাই বলি না কেন আমি চাইবো আমার স্বদেশে আর কোন হত্যা, গুপ্তহত্যা, গুম, বিচারবহিভর্ূত হত্যাকান্ড, ধর্ষণ, বোমাবাজি, গুলিবর্ষণ, সন্ত্রাস, রক্তপাত, হানাহানি, সংঘাত, দুর্নীতি চলবে না। এসব বন্ধ করতেই হবে। আর অপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী, যুদ্ধাপরাধী, খুনি, নির্যাতনকারিদের বিচার হওয়া চাইই চাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ভাঙতেই হবে। নইলে সোনার বাংলা একদিন সাম্রাজ‍্যবাদী শক্তির দখলে চলে যাবে, তাতে জঙ্গি, যুদ্ধাপরাধীদেরই জয় হবে, মানুষ, স্বদেশ বা মানবতার নয়!

 

সোনার বাংলায় গৃহযুদ্ধ নয় শান্তি চাই

sb

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। ভাবখানা এমন যেন ওদের আসল রুপটা এবারেই দেখতে পেলেন বাঙালি। ব্লগে, ফেইসবুকে তুফান তুলেছে একদল মানুষ এই বলে যে এক জেনারেলের পত্নী পরোক্ষভাবে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন জানিয়ে সেনা ছাউনির ভেতর গড়ে ওঠা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি তার কদযর্ চেহারাটা দেশবাসির সামনে পরিপূর্ণভাবে দেখিয়ে দিলো! আসলে কী তাই? নাকি পঁচাত্তরে বাংলাদেশের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত‍্যার পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের প্রত‍্যক্ষ, পরোক্ষভাবে নানান কায়দা-কৌশলে পুনর্বাসন করে আসছে দলটি? এই দলটিই ঘাতক-যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধী দলটির নেতাদের মন্ত্রি, প্রধানমন্ত্রি পর্যন্ত বানিয়েছে, এটা দেশের মানুষ সবাই জানেন।

অনেকে জ্ঞানপাপীর মতো বলছে যে সাঈদীর বিচারের রায় প্রদানের কারণে ননাকি দেশের ১৬ কোটি মানুষই দারুণ খুশি! আহাম্মক এবং মুর্খের কথা এগুলি। ১৬ কোটি মানুষের মধে‍্য কিন্তু দেশজুড়ে যে সন্ত্রাস, তান্ডবলীলা, আগুন দেয়া, ভাংচুর, পুলিশ হত‍্যার সঙ্গে জড়িতরাও আছে। কাজেই এটা বলা ভুল যে সাঈদীদের বিচারের আদেশে  ১৬ কোটি মানুষই খুশি? একাত্তরের ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী, ধর্ষক, অগ্নিসংযোগকারি, সন্ত্রাসী, জঙ্গি যারা বাংলাদেশের নাগরিক এখনও আছে তারাও ১৬ কোটির মধে‍্যই আছে। এসব খুনি-জঙ্গি ও ঘাতকের পাশাপাশি গোলাপী বেগম সাহেবও কিন্তু সাঈদীদের বিরুদ্ধে রায় দেয়ায় বেজায় অখুশি। এসব বাস্তব অবস্থাগুলি মাথায় রেখেই খুশি, অখুশির অংকটা কষা বোধহয় বিবেচনাপ্রসূত হবে।

যাহোক আজকের প্রসঙ্গ খুশি অখুশির নয় পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন‍্যতম গণহত‍্যার দোসর ও নায়কদের বিচার হবে না, যারা আমাদের মা-বোনদেরকে ‘গণিমতের মাল’ বলে পাক সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল, যারা ৩০ লাখ মানুষকে হত‍্যা করেছে, যারা বাংলার মেধাবি সন্তানদের হত‍্যার পর চোখ তুলে নিয়ে নৃশংসতা-বর্বরতা দেখিয়েছে তাদের বিচার করা যাবে না? এটা কী মগের মুল্লুগ নাকি বাংলাদেশে বসবাস করে ওরা এখনও পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখছে?

হ‍্যাঁ, দেশে আইনের শাসনের অভাব আছে! তার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড ও খুনিদের গ্রেফতার এবং খুনের রহস‍্য উন্মোচনে টালবাহানা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে নিহত সাংবাদিকদ্বয়ের ব‍্যক্তিগত জীবন নিয়ে রটনা করা আইনের শাসনহীনতারই সাক্ষ‍্য দেয়।

সমাজে ন‍্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। স্বাধীনতার ৪১ বছরেও দেশ কাঙ্খিত লক্ষে‍্য পৌঁছেনি। দেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি আজও। স্বাধীন দেশে বিনা বিচারে মানুষ হত‍্যা করে খোদ রাষ্ট্র। দুর্নীতি এখন একধরণের ক‍্যান্সারে রুপ নিয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী ৪১ বছরের মধে‍্য ১৭ বছরই দেশবাসির কেটেছে স্বৈরশাসকদের কবলে পড়ে।  সহিষ্ণুতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর সংস্কৃতি চালু করতে ব‍্যর্থ হয়েছে সমাজপতিরা। তার মানে এই নয় যে যুদ্ধাপরাধী, ঘাতক জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস, হত‍্যা-নির্যাতনকে দেশের মানুষ পছন্দ করছে, কখনও না!

গণতান্ত্রিক সমাজে মত, পাল্টা মত, আলোচনা, সমালোচনা সবই চলতে পারে। কিন্তু সিদ্ধান্ত মানি না বলে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ মারা, পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে নিরীহ পুলিশ সদস‍্যদের হত‍্যা, দেশজুড়ে তান্ডবলীলা চালানো, বোমাবাজি, পবিত্র স্থান মসজিদ তথা উপাসনালয়ে সন্ত্রাস চালানো এসব সহিংসতা গণতন্ত্রের ভাষা নয়।  আর ধর্ম সেতো শান্তি, ভালবাসা ও মানবতার কথা বলে। কোন ধর্ম মানুষ হত‍্যা সমর্থন করে না।

সমর্থন এবং সৎ সাহস থাকলে জামায়াত-শিবির বা যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থনকারিরা অহিংস পথে মানুষের সমর্থন কতটুকু তার প্রমাণ দিতে পারে! লাখ লাখ লোক যখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাবে অহিংসভাবে তখন পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনীর গুলিতেও কাজ হবে না। জামায়াত-শিবির সহিংসতায় বিশ্বাস না করলে হয়ত তারাও বিকল্প একটি শাহবাগ মঞ্চ তৈরী করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে না কেন? আর জামাত-শিবিরের অহিংস কোন প্রতিবাদের ওপর যদি পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী গুলি চালাতো, তখন তারা বলতে পারতো যে তাদের ওপর সরকার অবিচার করছে।

গুপ্তহত‍্যা, চোরাগোপ্তা হামলা, হাত-পায়ের রগ কাটা, বোমাবাজি, ধমর্ীয় উন্মাদনা সৃষ্টি এসব ওদের পুরনো স্টাইল। রাজশাহী বিশ্বিবদ‍্যালয়, চট্রগ্রাম বিশ্বিবদ‍্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্ত্রাসের কালো চিহ্ন এখনও মুছে যায়নি।  সেই পুরনো স্টাইলে সাঈদীর বিচারের আদেশকে উপলক্ষ করে তারা আবার মাঠে নেমেছে। চালাচ্ছে চোরাগোপ্তা হামলা, দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। বাংলা ভাইয়ের হত‍্যা-নির্যাতন, উদীচীর সম্মেলন, সিপিবির সমাবেশ, ছায়ানটের অনুষ্ঠান এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা-গ্রেনেড হামলা চালিয়ে মানুষ হত‍্যা এবং গাইবান্ধায় ১৮ জন কৃষকে গুলি করে হত‍্যার ঘটনা দেশবাসি ভোলেনি। সাংবাদিক মানিক সাহা, শামছুর রহমান, হুমায়ুন কবির বালু হত‍্যা, অধ‍্যাপক হুমায়ুন আজাদ হত‍্যা, অধ‍্যাপক ইউনুস হত‍্যা, শাহ এসএমএস কিবরিয়া হত‍্যা, আহসানউল‍্যাহ মাষ্টার হত‍্যা, বাঁশখালির ১১ হত‍্যা,  কবি শাহসুর রাহমানকে হত‍্যাপ্রচেষ্টার সঙ্গে কারা জড়িত? তাও দেশবাসির কাছে পরিস্কার।

সাঈদীর বিরুদ্ধে দেয়া আদালতের রায় ‘মানি না’ বলে ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা ও তাদের হত‍্যা করতে হবে কেন?  নোয়াখালি, ফেনী, পার্বত‍্য চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ‍্যালঘুদের ওপর আক্রমণ করেছে জামায়াত-শিবির। আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা করাটা কিংবা অধ‍্যাপক আবদুল খালেকের বাসভভনে বোমা হামলা কী ইসলাম অনুমোদন করে? কেউ আস্তিক হোক আর নাস্তিক হোক সেটা নিতান্তই ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার। তারজন‍্য ব্লগার আহমেদ রাজীব শোভনকে হত‍্যা করে ইসলামের বারোটা বাজানো হচ্ছে না কী?

দেশে যখনই অশান্তি বাড়ে সাংবাদিক আর সংখ‍্যালঘুরা আক্রমণের লক্ষ‍্যবস্তুতে পরিণত হয়। এবারও সেই পথেই আগাচ্ছে ওরা। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু আশংকা প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, গোটা দেশে চলছে চোরাগোপ্তা হামলা। দেশটাকে জামায়াত-শিবির পরিকল্পিতভাবে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আর সেই আগুনকে উস্কে দিলেন বাংলাদেশে  তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের জনকের পত্নী। জামায়াত-শিবির হরতাল ডেকেছে রবি আর সোমবার। আর বেগম সাহেবা আরেকদিন এগিয়ে নিলেন হরতালকে মঙ্গলবার পর্যন্ত। দেশজুড়ে তাদের তান্ডবে পাঁচ পুলিশসহ অর্ধশত মানুষ নিহত এবং দুই শতাধিক আহত হয়েছেন।

একমাত্র মহান সৃষ্টিকতর্াই জানে কী ঘটবে রবি থেকে মঙ্গল এই তিন দিনের হরতালে। আরও কতরকমের নাশকতা, অরাজকতা আর নৃশংসতা অপেক্ষা করছে আমাদের সোনার বাংলায় তা বলা মুশকিল! তবে এই অরাজকতা আর সহিসংতা প্রতিরোধে সরকার কতটুকু সজাগ বা সতকর্ তাও বোঝা কঠিন? কারণ সরকার তো এটুকু জানতো যে সাঈদীর বিরুদ্ধে আদেশ দিলে তার সমর্থক বাহিনী ও দল নিশ্চয়ই ঘরে চুরি পরে বসে থাকবে না, তারা রাস্তায় নামবে।

সরকারের এতগুলি গোয়েন্দা বাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি থাকার পরও জামায়াত-শিবির জেলায় জেলায় পুলিশের ওপর আক্রমণ করলো, আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা করলো, পুলিশকে হত‍্যা করলো, হত‍্যা করলো সংখ‍্যালঘু এবং আক্রমণ করলো সংখ‍্যালঘু বাড়ি-ঘরে। কিন্তু সরকার কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে বা সহিংসতা প্রতিরোধে প্রস্তুত ছিল? তা নিয়েও জনমনে আছে প্রশ্ন।

দেশে-বিদেশে জামায়াত-শিবির কোটি কোটি টাকার মিশন নিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে। নানানরকম প্রচারণা, প্রপাগান্ডা চালিয়েছে, চালাচ্ছে। কিন্তু সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রানালয় তার জবাবে কী করেছে তারও একটা ফিরিস্তি জনগণকে জানানো হোক।

সবশেষে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির প্রতি একটা অনুরোধ করে লেখার সমাপ্তি টানবো। জেনারেল জিয়া মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপির দাবি অনুযায়ী স্বাধীতার ‘ঘোষক’ ও বটে। অবশ‍্য বঙ্গবন্ধু হত‍্যা পরবতীর্কালে জিয়ার শাসনামলে কুখ‍্যাত রাজাকারদের উচ্চাসনে বসানো হয়।

সে যাই হোক বিএনপির যদি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, বীরাঙ্গনা ও সম্ভ্রমহারা মা-বোন এবং শহীদ স্বজনদের প্রতি নূ‍্যনতম শ্রদ্ধা থাকে তবে তারা জামায়াত-শিবিরের পক্ষ ত‍্যাগ করবে। এখানে একটি উদাহরণ দিতে চাই। জামায়ত-শিবির কতটা ভয়ংকর তা বোঝানোর জন‍্য।

আমি    তখন রাজশাহী বিশ্বিবদ‍্যালয়ের ছাত্র এবং দৈনিক সংবাদ এর রিপোর্টার। রাজশাহী বিশ্বিবদ‍্যালয়ে ছাত্রদলই ছাত্রশিবিরকে প্রতিষ্ঠা করেছে। পরে ছাত্রদল নেতা-কর্মীরাও শিবিরের আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পায়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মতি ও আসলাম শিবিরের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন। মৃতু‍্যর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই দুই নেতার মতো শত শত ছাত্রদল নেতা আছে যারা শিবিরের সন্ত্রাসের শিকার বিভিন্ন সময়ে।

কাজেই সাপকে যতই দুধ কলা দিয়ে পোষেন না কেন সাপ ফণা তুলবেই তুলবে! বিষধর সাপ নিয়ে খেলা করা আত্মহত‍্যারই শামিল। আপনাদেরই স্লোগান ব‍্যক্তির চেয়ে দল, দলের চেয়ে দেশ বড়। যদি তাই হয় তবে সবার উপরে দেশ সত‍্য। কাজেই দেশটাই যদি পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো বানানোর কাজকে আপনারা এগিয়ে নেন একাত্তরের ঘাতকদের ও তাদের দলকে সমর্থন করার মাধ‍্যমে তবে রাজনীতি করবেন কার জ‍্যন‍্য? বরং বিএনপি জামায়াত শিবিরের সঙ্গ ত‍্যাগ করলে তাদের জনসমর্থন বাড়বে বৈ কমবে না।  তবে এসব বলে কোন লাভ হবে বলে বিশ্বাস করি না আমি। কারণ আমরা জানি,  ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী!’

শুধু দৃষ্টিভঙ্গী বদলিয়ে কোন ফায়দা হবে না। দুর্নীতি আর দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, পারিবারিকীকরণ, অমানবিবতা, রাষ্ট্রীয় হত‍্য‍্যা, এসবও বন্ধ হওয়া চাই। আরও জরুরি রাজনৈতিক দলগুলিতে (সবদল নয়, তবে অধিকাংশ) প্রকৃতার্থে গণতন্ত্র চর্চা, পরমত সহিষ্ণুতা বাড়ানো। আর যুদ্ধাপরাধী সবার বিচার, ফাঁসি কী যাবজ্জীবন সেটা মুখ‍্য  নয়। আরও জরুরি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করা। বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যেতে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি রাজনৈতিক দলটির এতো ভয় কিসের? তার মানে তারাও ভোটহারানোর ভয়ে সাম্প্রদায়িক! বিএনপি-জামাততো সবার চেনা। দেশের মানুষ ভালো করেই জানেন এরা কী চায়?

আমরা আমাদের সোনার বাংলায় সহিংসতা, তান্ডবলীলা, অরাজকতা, অবিচার চাই না। চাই শুধু শান্তি, শান্তি আর শান্তি।

ছবি-গুগল থেকে সংগৃহীত।