সংখ্যালঘু র্নিযাতন ও স্বদেশের চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি: একটি আবেদন ও আমার অবস্থান

 

minority-oppression-sangbad-jaa

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। মানবতা, মানবাধিকার কখনও বিশেষ কোন ব‍্যক্তি, গোষ্ঠী, দলের জন‍্য নয়, এটা সর্বজনীন। স্বদেশ এক ভয়ংকর সংকট অতিক্রান্ত করছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষাক্ত থাবা আর দুই বড় রাজনৈতিক জোট ও দলের  ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থাকবার বাসনার শিকার দেশের সিংহভাগ মানুষ। হত‍্যা, সন্ত্রাস, নির্যাতন, অবিচার মানুষের নিত্যসঙ্গী। ক‍্যান্সারসদৃশ দুর্নীতি আর সর্বগ্রাসী দলীয়করণ ও রাজনীতিতে পারিবারিকীকরণ দেশের সব অর্জন নষ্ট করে দিচ্ছে।

ধমর্ীয় সংখ‍্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন ও হত্যা যেমন মানবতাবিরোধী অপরাধ, ঠিক তেমনিভাবে বিচার বহিভর্ূত হত্যাকান্ড, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন, ব্লগারদের ওপর আক্রমণ-হত্যা, গুপ্তহত্যা, ধর্মীয় উপাসনালয় ভাংচুর এসবও মানবতাবিরোধী অপরাধ! একটা সমাজে যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না, গণমাধ‍্যম স্বাধীনভাবে ক্রিয়াশীল হতে পারে না, আইনের শাসন যখন থাকে না, রাষ্ট্র যখন নিজেই সন্ত্রাস দমনের নামে হত্যার পথ বেছে নেয় তখন সেই সমাজ ও রাষ্ট্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ ধারাবাহিকতা লাভ করে।

স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই রিকশা চালান, কেউ কেউ ভিক্ষা করেন আর ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন‍্য বড় রাজনৈতিক দলদুইটি যুদ্ধাপরাধীদের ব‍্যবহার করেছে। যার ফলশ্রুতিতে ওদের শেকড় এখন অনেক গভীরে চলে গেছে। যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবির শিক্ষা, ব‍্যবসা, চিকিৎসা, বীমা, ব‍্যাংকসহ বিভিন্ন স্তরে অর্থনৈতিক শক্তির ভীত বেশ মজবুত করে নিয়েছে। তাদের এসব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি কী আপনা আপনি আজকের শক্ত অবস্থানে এসেছে?

আমরা জানি জেনারেল জিয়া, বিএনপি, জিয়াপত্নী খালেদা জিয়া বরাবরই যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন। কাজেই বিএনপি ও তাদের জোট জামাত-শিবিরের পক্ষ নেবে এতে আশ্চর্য‍্য হবার কিছু দেখি না। বরং যখন মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটি জামাতকে ব্যবহার করে, সেটা ইতিবাচকই হোক আর নেতিবাচক অর্থেই হোক না কেন তখন রাজনীতিতে এই ঘৃণিত দলটি পুনর্বাসিত হয়।

বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাধীন করার জন‍্য জীবনভর লড়েছেন এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর একটি সর্বজনীন, সুন্দর সংবিধান দিয়েছিলেন জাতিকে। সেই সংবিধান, তথা  বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ধর্মভিত্তিক বা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করার কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এখন ব্রুট মেজরিটি নিয়ে ক্ষমতায়। কেন তারা বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে গিয়ে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক দলগুলি নিষিদ্ধ করার ব‍্যবস্থা করছে না? সেদিন কালের কণ্ঠে একটা প্রতিবেদনে বলা হলো একজন জামাত নেত্রীর সন্তান ২০০১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এখন প্রতিমন্ত্রী। সেই প্রতিমন্ত্রির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় এক জামাত নেতার ইন্ধনে ব্যাপক নৈরাজ্য চলছে একটি উপজেলায়।

আজকের লেখার প্রসঙ্গ আসলে এগুলি নয়। লিখতে চাইছি বাংলাদেশের চলমান অশান্তি ও অরাজক পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মহাসচিবের হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি আবেদন লেখা হয়েছে। সেই আবেদনে সই করার জন‍্য আমার এক প্রিয় ব‍্যক্তি ফেইসবুকে আমার টাইমলাইনে আপলোড করেছেন। আমি সেই আবেদনে সই করিনি। এমন আরও অনেক পিটিশন এসেছে আমার কাছে। কিন্তু কোন পিটিশনেই সই করিনি। কিন্তু কেন? তার দায় মেটানোর জন‍্য আজকের লেখার সূত্রপাত।

দেশে মানুষ গুম হচ্ছে, তাদের হদিসও মিলছে না। সাংবাদিকদের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। ব্লগারদের ওপর একের পর এক আক্রমণ চলছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী বিচার বহিভর্ূতহত্যা চালাচ্ছে। আদিবাসি নেত্রী কল্পনা রায়  বছরের পর বছর  ধরে নিখোঁজ। আদিবাসি নারী ধর্ষণ হত্যা চলছে। পথে ঘাটে এমনকি নিজ ঘরে নারী লাঞ্ছিত হচ্ছেন, ধষর্িত হচ্ছেন, সম্ভ্রম হারিয়ে অনেক নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। আর ধর্মীয় সংখ‍্য‍্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণ এ আর নতুন কিছু নয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় থেকে হিন্দুদের ওপর শুরু হয়েছে অমানবিকতা। তাদের ঘর-বাড়ি ভাংচুর, মন্দির ভাংচুর, প্রতিমা ভাংচুর, সম্পদ লুণ্ঠন, দেশত‍্যাগে বাধ‍্য করা, হত্যা-নির্যাতনসহ বহুমুখী হামলা- অত্যাচার চলছে।

দেশ যখনই সংকটে পড়ে, যখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে তখনই আক্রমণের লক্ষ‍্যবস্তুতে পরিণত হয় হিন্দুরা। এবারও তার ব‍্যতিক্রম ঘটেনি। এবারও আরেক বাঁশখালী ট্রাজেডি ঘটানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল দুবর্ৃত্তরা। বহু হিন্দু বাড়ি, মন্দির ভাংচুর করা হয়েছে। অনেকে নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অগণিত মানুষ। মিডিয়ায় ঘর-বাড়ি সম্পদ হারা হিন্দু নারীদের আহাজারি দেখে চোখের জল ধরে রাখা যায় না। মানুষ

চলমান সংঘাতে শুধু  সংখ্যালঘুরাই নয়, পুলিশের ওপরও আক্রমণ চলছে। নিরীহ পুলিশদেরকে নিষ্ঠুর ও বর্বরভাবে হত্যা করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী জামাত-শিবিরের অনেকে (শতাধিক বলে দাবি করা হয়) নিহত হয়েছে গুলিতে। হত্যা হত্যাই সেটা  যেভাবেই হোক যে অজুহাতেই ঘটুক যারাই করুক বা যিনিই নিহত হোন। হত্যার বদলে হত্যা মানেই বিচারহীনতা, আইনের শাসনহীনতা, মানবতাবিরোধী অপরাধ।

জাতি ৪২ বছর ধরে অপেক্ষা করছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখার  জন্য। সেই বিচারযখন শুরু হবে তখন যুদ্ধাপরাধীরা কী বসে বসে আঙুল চুষবে নাকি তারা নানান কায়দা কৌশলে বিচার বানচালের প্রচেষ্টা নেবে? এই নূ্যনতম বোধ বিবেচনা থাকলে সরকার আগে থেকে সচেতন থাকতো, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো। আর পুলিশকে দিয়ে রাজনৈতিক দলের অফিস অবরুদ্ধ করে না রেখে রাস্তায় যারা ভাংচুর ও আগুন লাগাচ্ছে তাদের ধরে আইনের আওতায় নিলেই সব ঠান্ডায় থাকতো। বলপ্রয়োগের ফল কখনই ইতিবাচক হয় না।

দেশের মানুষ ভালো করেই জানেন যে সরকারে যিনি বা যে দল থাকে তিনি বা সেই দলের বক্তব‍্য একইরকমের হয় সেটা আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকুক নতুবা বিএনপিই ক্ষমতায় থাকুক। তেমনিভাবে বিরোধীদলে যারাই যাক তাদের বক্তব্যও এক ও অভিন্ন। সমস‍্যাটা হলো বিচার কেউই মানতে চায় না। আর বিচার মানলেও তালগাছ চাইই চাই!

আমি চাই বাংলাদেশ থেকে সকল ধরণের হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হোক, বন্ধ হোক অমানিক গুমসংস্কৃতি, বিচার হোক সকল হত্যার, দেশে আইনের শাসন থাকবে, হিন্দু-মুসলমান, খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ, আদিবাসি সকলেরই সহাবস্থান ও যৌথ প্রচেষ্টায় দেশ সোনার বাংলায় রুপান্তরিত হোক। এইতো আমার স্বপ্ন। না, এটা শুধু আমার নয় অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থক ছাড়া দেশের সিংহভাগ মানুষই একই স্বপ্ন দেখেন বলেই আমার বিশ্বাস।

গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় তার বাস্তবিক চর্চা আর সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে আইনের শাসন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হলে স্বপ্নের সোনার বাংলা আর স্বপ্ন নয় বাস্তবেই তার দেখা মিলবে। আর সেই পয়েন্টে যাবার জন‍্য চাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধে‍্য সহনশীলতা, সৎভাব ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সর্বগ্রাসী দুনর্ীতির মুলোৎপাটন করা।

আমি কোন পক্ষের বিশেষ কোন দলের বা মতাদর্শের পক্ষে লিখি না, বলি না। আমার স্পষ্ট অবস্থান মানবতার পক্ষে। আমার পক্ষ সত‍্য, সুন্দর, মানবতা আর ভালবাসা। বিশেষ কোন দল, মত বা আদর্শ আমার পক্ষ নয়।  যুদ্ধাপরাধী আর স্বৈরাচার কোনটাই গণতন্ত্রের জন‍্য শুভ নয়।

একজন সংবাদকর্মী বা লেখক যাই বলি না কেন আমি চাইবো আমার স্বদেশে আর কোন হত্যা, গুপ্তহত্যা, গুম, বিচারবহিভর্ূত হত্যাকান্ড, ধর্ষণ, বোমাবাজি, গুলিবর্ষণ, সন্ত্রাস, রক্তপাত, হানাহানি, সংঘাত, দুর্নীতি চলবে না। এসব বন্ধ করতেই হবে। আর অপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধী, যুদ্ধাপরাধী, খুনি, নির্যাতনকারিদের বিচার হওয়া চাইই চাই। বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ভাঙতেই হবে। নইলে সোনার বাংলা একদিন সাম্রাজ‍্যবাদী শক্তির দখলে চলে যাবে, তাতে জঙ্গি, যুদ্ধাপরাধীদেরই জয় হবে, মানুষ, স্বদেশ বা মানবতার নয়!

 

Advertisements

One response to “সংখ্যালঘু র্নিযাতন ও স্বদেশের চলমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি: একটি আবেদন ও আমার অবস্থান

  1. Shariful Huda Milon

    Akash Vai lekhata porlam. khub valo laglo. Chinta korbenna akdin amader sopner sonar Bangla sotti sotti sonar Banglai porinoto hobe…

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s