ওরা কেন সকলেই হারলো?

KH

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। সামগ্রিক নির্বাচনি ফলাফলে হতাশ হওয়ার কোন বিকল্প নেই। ব‍্যক্তিগতভাবে চারজনের ভেতরে একজনের কারণে আমি আজ দেশান্তরিত, যেটা কখনই চাইনি, শতকষ্টেও দেশের মাটিতে স্বদেশের মানুষের পক্ষে কিছু করার অনবরত প্রচেষ্টা ছিল আমার। সেটাতো নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। নির্বাচন বিষয়ে আমি জানি না বাস্তবে কী ঘটেছে? কিন্তু একটা বিষয় পরিস্কার আমার কাছে। সেটা হলো আমার দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ সাম্প্রদায়িক নন, যুদ্ধাপরাধী, হেফাজতি বা বিএনপি যতই সেটা প্রচার করার চেষ্টা করুক না কেন তা কাজে লাগবে না। আমাদের আওয়ামী  দলীয় বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া একটা বিষয় স্বীকার করতে চাননা সম্ভবত:। আর তা হলো উনাদের পছন্দের দল বা জোট যা করে তা সবসময় ভালো করে!  উনারা হারলে বলে সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ি তুলেছে ওরা তাই প্রগতিশীল জোট তথা আওয়ামী লীগের প্রাথর্ি হেরেছে! এবারের নির্বাচনে পরাজিত এবং বহু কেলেংকারির হোতা এক মেয়রতো আবার মিডিয়া কু্যয়ের মতো একটা হাস্যকর কৌতুকের জন্ম দিয়েছেন ইতোমধ্যে! কৌতুক বললাম একারণে যে দেশের সিংহভাগ মিডিয়াই এখন বলতে গেলে সরকারের তল্পিবাহক (ব্যতিক্রম দু´চারটি ছাড়া), সেখানে কী করে মিডিয়া কু্য সম্ভব তা জানা নেই। প্রগতিশীল জোট বা মহাজোটের সংগঠনগত অবস্থাটা কোন পর্যায়ে আছে বা সংগঠনের কী দুরবস্থা সাংগঠনিকভাবে সেটার বিশ্লেষণ আমরা কখনই পাইনা প্রগতিশীল জোট বা মহাজোটপন্থি বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে। মহাজোট বিশেষত: আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক হযবরল অবস্থার পেছনের কারণগুলি কী, কেন এমন হলো কারা দায়ি তার চুলচেরা বিচার আমাদের দলঅনুরাগি মিডিয়া বা বুদ্ধিজীবী মহলের কাছ থেকে কোনদিনই পাওয়া যাবে না।

তবে আমার এখন ভীষণভাবে স্বরণে পড়ছে শ্রদ্ধেয় আনু মোস্তফার একটা ছোট্র ফেইসবুক স্টাটাস। উনার সেই স্টাটাসে আজকের পরাজয়ের কারণগুলি বলা আছে। আমি সে প্রসঙ্গে যেতে চাই না, শুধু বলবো আমরা যেন কাকে কান নিয়ে গেছে এই শোরগোল তুলে কাকের পেছনে না দৌঁড়িয়ে কানটার দিকে ভালোভাবে নেড়ে দেখার চেষ্টা করি! নইলে যাকিছু খারাপ তার সবকিছুই ওই বিরোধীরাই করেছে, করছে বলে নিজেদের ভেতরের বাস্তব অবস্থাটাকে আঁড়াল করার চেষ্টার ফল চার সিটি করপোরশনের নির্বাচনি ফলাফলের মতোই নতুন ফলাফলই এনে দেবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেষ করা হবে না, ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে থাকার মানসিকতাও ভুলে যেতে হবে, আর মার খাবেন শুধু মাঠ পর্যায়ের সাচ্ছা লড়াকু মুক্তমনা মানুষগুলি।

দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নারী ধর্ষণ-নির্যাতন, দুর্নীতি, তত্ত্বাবধায়ক ইসু্য এসব বিষয় কী নির্বাচনে কাজ করেনি। নিশ্চয়ই করেছে। সাংবাদিক ও মিডিয়া দলন-পীড়ন এবং সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির খুনিদের ধরতে সরকারি টালবাহানাসহ নানান বিষয় মাথায় রেখেই জনগণ সিটি নির্বাচনে মহাজোটের ওপর থেকে ভালোবাসা তুলে নিয়েছেন। আরেকটা বিষয় এখানে উল্লেখ করতে চাই, সেটা হলো আমাদের কিছু ব্লগার, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়াম্যান আছেন যারা সবসময় জনগণকে “অশিক্ষিত” বলে তাঁদের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আমি এমন গাজাখুরি তত্ত্বে কখনই বিশ্বাস করি না। আমাদের দেশের আমজনতা শিক্ষিত তবে তাঁরা তথাকথিত শাট-প্যান্ট টাই পরা ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, তাঁরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত, তাঁরা কখনও বিবেককে বিকোয় না। তবে তাঁরা বাধ্য হন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজিদেরকে মিলিয়ে নেয়ার জন্য। কার ণ জনগণ জানেন রাজনীতিকদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা ও পাওয়া কোনটাই যাবে না, সব রাজনীতিবিদদের কথা বলছি না ব্যতিক্রমতো আছেই। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদদের অংশটুকুও কোন কিছুই করতে পারে না দুর্বৃত্তপনা রাজনীতির কারণে। দেশের মানুষের হাতে একটাই অস্ত্র আছে সেটা তাঁরা প্রয়োগ করেন যথাসময়ে। দেশের মানুষ নির্ভয়ে নির্বাচনে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারলে আর নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়ম না হলে জনগণের রায়টা সঠিকভাবেই প্রতিফলিত হয়। জনগণ দেখেন তাঁরা শান্তিতে ঘুমোতে পারছেন কিনা, দ্রব্যমূল্যের দাম সহনশীল আছে কিনা, রাজনীতিকরা বিশেষ করে সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রিরা দুর্নীতি করছেন কিনা, তাদের কথাবার্তায় সংযমী ভাবটা আছে কিনা, মানুষের মানবাধিকার রক্ষা হচ্ছে কিনা, যোগ্য ও মেধাবিরা চাকরি পাচ্ছেন কিনা, কেউ চাঁদাবাজি করছে কিনা, দেশে আইনের শাসন চলছে কিনা, বিনা কারণে কেউ র্নিযাতিত  হচ্ছেন কিনা, কেউ গুম হয়ে গেলে তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে সরকার ও সরকারি দলের লোকেরা কোন ফালতু তত্ত্ব ও কথাবার্তা বলছে কিনা, কেউ নিহত হলে খুনিকে ধরার চেয়ে খুনিকে রক্ষার জন্য নানান কায়দা-কৌশলে বহুরুপি তত্ত্ব হাজির করছে কিনা এমন আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনগণ ঠিকই বিবেচনায় রাখেন সবসময়। কাজেই সময় থাকতে কেউ নিজেকে সংশোধন করতে ব্যর্থ হলে জনগণ ঠিকই ভোট নামক শক্ত অস্ত্রের ব্যবহার করতে কখনই ভুল করেন না তাদের বিরুদ্ধে যারা জনগণের অর্থ নিয়ে নিজেদের আরাম-আয়েশের স্বর্গ গড়ে তুলে!!!

কালো টাকার প্রভাব, দলীয় গ্রুপিং ও ষড়যন্ত্রের মুখে দল থেকে বহুদিনের ত্যাগি ও পরীক্ষীত কোন নির্বাচিত নেতাকে বাদ দিয়ে টাকাওয়ালা, ব্যবসায়ী কাউকে দলে এনে কিংবা অনির্বাচিত কাউকে সেই পদে বসানো হচ্ছে কিনা-এসব বিষয়ও জনগণ বিবেচনায় রাখেন যখন কাউকে ভোট দিতে যান । সুতরাং জনগণকে বোকা ভাবা মানেই নিজেই বোকামিটা করা। অহংকার পতনের মূল-এই সর্বজনীন সত্যটা ভুলে গেলে তার মাশুল বা খেসারতও দিতে হবে! সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আঞ্চলিক নির্বাচন হলেও বাস্তবতাটা জাতীয় নির্বাচনের আদলেই ধরা পড়ে, সেটার ব্যতিক্রম এবারও ঘটেনি।

আমরা সবাই জানি বিগত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কাদেরকে নমিনেশন দিয়েছিল, কেন দিয়েছিল? আওয়ামী লীগ জানতো দেশের মানুষও জানতেন যে এবারে আওয়ামী লীগ যাকেই নমিনেশন দেবে সেই বিজয়ী হবে। কারণ বিএনপি-জামাতের দুর্নীতি, দু:শাসন, সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদকে মদদদান এসবের নেগেটিভ প্রভাব পড়বে নির্বাচনে যার প্রমাণ মিলেছে নির্বাচনি ফলাফলে। কাজেই যার কাছেই মোটা বড় অংকের টাকা পেয়েছে তাকেই নমিনেশন দিয়েছে দীর্ঘদিনের দলীয় ত্যাগি নেতাদের বাদ দিয়ে। এমনও ঘটেছে জামাত পরিবারের অনেকেই নমিনেশন পেয়েছে। নবাগত, ব্যবসায়ী তরুণ যারা নমিনেশন পেয়েছিলেন তাদের সঙ্গে মাঠর্পযায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই, তাদের অধিকাংশই নিজস্ব ব্যবসাপাতি ও আখের গোছাতেই ব্যস্ত। ফলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা একেবারেই তথৈবচ অবস্থায় নিপতিত। এসব নিয়ে পরে কোন লেখায়  আলাদা করে তুলে ধরার আশা রইলো। আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া এসব নিয়ে মাথা ঘামায়না। তারা শুধু পদপদবি আর স্বার্থ রক্ষা ও সুবিধা আদায় নিয়েই ব্যস্ত, তাই সত্য বিশ্লেষণ চাপা পড়ে যাচ্ছে। এখন আমাদের বঙ্গবন্ধু কন্যার এবং উনার নীতিনিধর্ারকবৃন্দের ঘুম ভাঙলেই ভালো, দেশের মঙ্গল!

পরিশেষে বলবো, বড় বড় রাঘব-বোয়াল রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের কারো কিছুই হবে না সরকারে আওয়ামী লীগ থাক আর বিএনপি থাক। আমি বলবো ওদের এই বিজয় তাদের নিজের বিজয়, সাম্প্রদায়িকতা বা যুদ্ধাপরাধীদের বিজয় নয়; এই বিজয় প্রগতিশীল শিবির তথা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দূর্বলতার পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি-জামাত জোটের নেগেটিভ বিজয়! এই বাস্তবতাটুকু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড, নীতিনির্ধারকমহল, বুদ্ধিজীবী, সুবিধাবাদি ও চাটুকারের দল বুঝতে পারলেই হয়ত আগামি জাতীয় নির্বাচনে আশা বেঁচে থাকবে, নইলে ফের যুদ্ধাপরাধীরাই বাংলাদেশের স্বাধীন পতাকা উড়াবে তাদের গাড়িতে!!!! ছবিটি গুগল থেকে নেয়া।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s