সাংবাদিকতা, সহনশীলতা ও ক্রসফায়ারের নামে ডাইরেক্ট হত্যা!

Joy and Tarique

জাহাঙ্গীর আকাশ ।। একজন সাংবাদিক গর্ব আর অহংকারের সাথে ফেইসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিলেন “ক্রসফায়ার” র পক্ষাবলম্বন করে। ভাবখানা এমন যেন এই হত্যাকান্ডে উনি চরম খুশি! ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহক এই সাংবাদিকের স্ট্যাটাসে একটা প্রতিক্রিয়া লিখেছি। সেটা এরকম- “একজন সাংবাদিকের মুখে এমন কথা মানায় না, কারণ যিনি সারাদিন, সারাক্ষণ অবিচারের বিপক্ষে কথা বলেন, সুন্দর সুন্দর গালভরা কথা লিখেন ফেইসবুকে, তিনি আবার মানুষ খুনকে সমর্থন করেন। এই হলো আমার স্বদেশ! সমাজে বিচার থাকলে, আইনের শাসন থাকলে, দুর্নীতি না থাকলে, দলবাজি না থাকলে, ক্ষমতার অবৈধ দাপট না থাকলে, আয়ের সাথে খরচের সমন্বয় থাকলে, রাজনীতিতে দুবর্ৃত্তায়ন ও পরিবারতন্ত্র না থাকলে, মিডিয়াগুলি তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে দুর্নীতির আশ্রয় না নিলে-এসব সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী হয়ে উঠতে পারতো কী?” আমার এই প্রতিক্রিয়ার পর আরেক সাংবাদিক লিখলেন যে, ক্ষমতাসীন যুব সংগঠনের এক বড় নেতাকে বাঁচাতে এই ক্রসফায়ার ঘটানো হয়েছে! এরপর আমি আবার একটা ছোট্র প্রতিক্রিয়া লিখলাম সেই স্ট্যাটাসের ওপর। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি ছিল এমন-” হায়দার সাহেব, আপনাদের মতো সাংবাদিকদের কারণেই আজ দেশে আইনের শাসন মার খাচ্ছে। আর আপনি নাহয় এটার কথা বলছেন, কোন ক্রসফায়ারের বিপক্ষে আপনার কলম চলেছে, ফেইসবুকে কিংবা সংবাদপত্রে? শেখ মামুন সাহেবের মতামতের বিশ্লেষণ করুন! আর এটা করতে না পারলে বলবো আপনার মাঝেও গলদ আছে, কিংবা ভাগ পাচ্ছেন (সেটা বিদেশযাত্রার সুযোগ হোক আর আর্থিক কোন সেবা হোক যে নামেই যেভাবেই হোক না কেন)? দালালি ভালো তবে এতো বেশি না! খুনের পরিকল্পনাকারিকে বাঁচাতে যখন কাউকে খুন করে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তাহলে বুঝতে হবে গলদটা কোথায়? আর ওই রিপোটর্টা করার পর মামুন সাহেবও “…” না হয়ে যায়! আরেকটি প্রশ্ন- সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনিদের ওরা ক্রসফায়ার করে না কেন?”
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমাকে সেই “মহান” সাংবাদিক ব্লক করে দিয়েছেন! গতবাক বা অবাক হইনি, ব্লক হবার কারণে আমার মনে কোন দু:খবোধও জন্মেনি। কারণ আমি জানি আমার স্বদেশে সহনশীলতার চাষ হয় না, অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাও প্রদর্শনের কোন শিক্ষা কোথাও পাওয়া যায় না। এই সহনশীলতা বা অপরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকলে কী আর হাসিনা ও খালেদারা পরস্পরের বিপক্ষে সারাবেলা “যুদ্ধ” করতেন? না, উনারা দেশের মানুষের জন্য নয় ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকার জন্যই এমন লড়াই চালাচ্ছেন!
কিছুক্ষণ পর স্বদেশের সংবাদমাধ্যমগুলির ওপর চোখ বুলালাম। দৈনিক মানবজমিনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। যুবলীগের দুই পক্ষের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক ভাগ বাটোয়ারার কারণেই যুবলীগ নেতা মিল্কি খুন হন। এ ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যুবলীগের আরেক নেতা তারেকসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করে। ব্যস, আর যায় কোথায় শুরু হয়ে গেলো পুরনো কাহিনী। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ! হত্যা হলো মিল্কীর সন্দেহভাজন “খুনি” তারেক। অভিযোগ উঠেছে, এলিট ফোর্স আরএবি যুবলীগের কোন বড় নেতাকে বাঁচানোর জন্যই তারেককে ক্রসফায়ারে হত্যা করেছে? এই প্যারামিলিটারি বাহিনীর কিছু লোক চাঁদাবাজি, মাজারের টাকা লুট থেকে শুরু করে ভাড়াটে ও ফরমায়েশি খুনের কাজও করছে বলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলিতে প্রায়শ:ই লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু তারপরও তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ থামছে না স্বদেশে! দেশে এখন চলছে দুই পুত্রের রাজনৈতিক চালবাজিতার লড়াই! যাদের একজন তারেক জিয়া অন্যজন সজীব ওয়াজেদ জয়। দেশবাসি জানেন, তারেকের মা ও নিজামির দল এই এলিট বাহিনীকে জন্ম দিয়েছিলেন। আর জয়ের মা সেই “সন্তান”কে পালন করে যাচ্ছেন। জয় নাকি “উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত”! তিনিও এই বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধ নামীয় বর্বর হত্যাযজ্ঞ বন্ধের ব্যাপারে কোন কথা বলছেন না। তাহলে বুঝুন “অল্পশিক্ষিত” যুবরাজ আর “উচ্চশিক্ষিত” জয়ের মধ্যে ফারাকটা কোথায়? আসলে ক্ষমতার লিপ্সার কাছে উভয়ের মাঝে দৃশ্যত কোন পার্থক্য আছে বলে দেশবাসির চোখে পড়ছেন না! দেশের মানুষের মনে একটা ধারণা ও বিশ্বাস জন্মেছে যে এলিট ফোর্সের বা পুলিশের হাতে যতগুলি বন্দুকযুদ্ধের নাটক বা ক্রসফায়ারের গল্প শোনা গেছে তার সবগুলিই ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ নয় ডাইরেক্ট হত্যাকান্ড! নিহত (তারেকের গুলিতে মিল্কি আর আএবির গুলিতে তারেক) দুই যুবলীগ নেতাই অন্য দল থেকে যুবলীগে আসা। এদের মধ্যে একজন আবার কর্ণেল ফারুক-রশীদের ফ্রিডম পার্টির লোক ছিলেন বলে মানবজমিন লিখেছে।  যাহোক যতই বন্দুকযুদ্ধের নামে “সন্ত্রাসী” কিংবা মানুষ হত্যা করা হোক না কেন স্বদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এবং পরিবারতন্ত্র, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাসও বন্ধ করা যাবে না দেশটাকে সভ্য বলেও আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় পরিচয় দেয়া যাবে না। আর দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রবর্তন করতে চাইলে সহিষ্ণুতা ও পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনের মতো মানসিকতা গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই। আমাকে ব্লক করে দেয়া সাংবাদিক বন্ধুটির মাঝে সহনশীলতা ও পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠতে শুরু করলে নিশ্চয়ই তারেক ও জয়ের মাঝেও তার চর্চা গড়ে উঠেব, তবেই দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, মানুষ হত্যা ও অন্যান্য সন্ত্রাসও বন্ধ হবে বলে আমার বিশ্বাস। ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s