দুর্ভাগা স্বদেশ, কাপুরুষদের ঔদ্ধত্ত আর সংসদে প্লটরাজনীতি!

জাহাঙ্গীর আকাশ ।। প্রতিজ্ঞ করেছিলাম জন্মভূমির রাজনীতি নিয়ে আর কখনও লিখবো না। আমি সাধারণত শপথ ভাঙতে অভ্যস্ত নই। কিন্তু এবার আমি নেহায়তই নিরুপায় হয়ে ওয়াদার বরখেলাপ করতে বাধ্য হচ্ছি। আমি জানি আমার এই লেখা কারও একটি পশমও নাড়াতে পারবে না। তবুও মনকে প্রবোধ দেবার জন্যই লিখছি। আমার মায়ের ভূমিতে একের পর এক নিষ্ঠুর ও র্ববরতম ঘটনাগুলি ঘটেই চলেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু শিক্ষককে দুর্বৃত্তরা কান ধরে ওঠবস ও নির্যাতন করা হলো। অনেক ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে নির্যাতন সইতে হচ্ছে, কাউকে কাউকে প্রাণেও মারা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে র্নিমমভাবে হত্যা করছে ওরা।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে সংঘটিত কয়েকজন বিদেশী হত্যা, লেখক-প্রকাশক ও উন্নয়নকর্মী হত্যা, একের পর এক ব্লগার হত্যাসহ নির্বিচারে ঘটে যাওয়া বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডগুলি নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা, তর্ক চলছে। দেশব্যাপি পুলিশের সাড়াঁশি অভিযানের মধ্যেই খুন-খারাবি, হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার ও বিচারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে ওরা (একাত্তরের ঘাতক শক্তি) বসে থাকবে! ওরা পাল্টা মরণ ছোবল দেয়ার প্রচেষ্টা চালাবে, এটাই স্বাভাবিক নয় কী?

ধর্মীয় পুরোহিত, আউল-বাউল, আদিবাসী কেউ বাদ পড়ছে না, সব শ্রেণীর মানুষই খুন হচ্ছে। বেছে বেছে এমন সব হত্যাকান্ড ঘটানো হচ্ছে, যেগুলি স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠে আন্তর্জাতিকমহলে।  “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” এমন আচরণ কল্যাণ নয়, বরং সর্বনাশ ডেকে আনবে। বরং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অবস্থান পরিস্কার থাকলেই সরকার জনগণের সমর্থন পাবে। কিন্ত সন্ত্রাস দমনের নামে যাকে তাকে ধরে গুলি করে হত্যা, তথাকথিত “বন্দুকযুদ্ধ” এসব ওষুধে সত্যিকারের সন্ত্রাস দমন হবে না। বরং সমালোচনার লাইনটাকেই বর্ধিত করতে সহায়তা করা হবে, যা নিজের পায়ে কুড়াল মারার শামিল।

বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সমালোচনা ইতোমধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান, স্বৈরশাসক, তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেস্টা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলির কাছ থেকে এসেছে। খোদ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানও এসব “আইন বহির্ভূত হত্যাকান্ডের সমালোচনায় মুখর।

সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনিদের ধরা হলো না আজও। খুনিদের ধরার ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক সমাজও আর নড়ে-চড়ে না। আসলে সবইতো হয় ব্যবসা নয় রাজনীতি, কোথায় পেশাদারিত্ব, কোথায় স্বচ্ছতা আর সততা, ঐক্য? রাজনীতির এমন ভয়াবহ দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে যে, স্বার্থের বেলায় সবাই চুপ। মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে যে, প্লট এবং অ্যাপার্টমেন্ট পাবার আশ্বাসের পর সংসদ সদস্যগণ শান্ত হলেন সংসদে। কী দারুণ রাজনীতি আমাদের! দেশের মানুষের মাথায় ছাদ থাকুক আর নাই থাকুক সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট চাই-ই চাই।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি যদি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ থাকে আমাদের রাজনীতিকদের তাহলে তারা নিজের আরাম-আয়েশের কথা নয়, জনগণের নিরাপত্তা এবং সুখ-শান্তির চিন্তাটাকে আগে অগ্রাধিকার দিতো। কী দুর্ভাগা স্বদেশ আমার! আমি মহান সংসদের কাছে জনগণের পক্ষ নিয়ে জোর গলায় বলছি, অনুগ্রহ করে সংসদ সদস্যদেরকে প্লট বা অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ দেবার আগে নিশ্চিত করুন যে, ১৬ কোটি মানুষের প্রত্যেকেই একটি করে প্লট পাবে। নইলে দুনিয়াতেই আপনাদের বিচার হবে একদিন, আর এই বিচার করবে প্রকৃতি!

লজ্জায় আমার মাথা নত হয়ে গেলো এই বিদেশভুমে থেকেও। কেন? বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “তনুর বাবা নজরবন্দি”। আর কত অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, জালিমতা, জাহেলিপনা চলবে আমার স্বদেশে! হে প্রকৃতি, দেখাও তুমি তোমার শক্তি, যাতে ওই ঘাতক, কাপুরুষের দল, খুনি-মদমায়েশ, দুর্বৃত্তদল পরাভূত হয়। সাগর-রুনির খুনের ঘটনায় যে নাটক তার ধারাবাহিকতায় আজ মঞ্চস্থ হচ্ছে আমার বোন তনুর খুনিদের রক্ষার নতুন নাটক। হে প্রকৃতি, ওঠাও তোমার মানবতার, ন্যায়বিচারের “তলোয়ার”, কেটে কুচি কুচি কর ওই জালেমদের শয়তানির প্রাসাদ! নইলে যে আমার স্বদেশ কাঁদবে চিরকাল!
আমি বিখ্যাত কোন মানুষ নই, একজন অতি নগন্য সাধারণ মানুষ। স্বদেশের জন্য মন কাঁদে, হ্রদয়জুড়ে বেদনা আর কষ্ট। তবুও আশা করি, স্বদেশ আমার একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে সব অপরাধ, অপরাধী, দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ আর কলংকটে পায়ের নিচে দলিত করে! আমি জানি এ এক কঠিন লড়াই, তবুও আশা নিয়ে বাঁচি আমি সারাক্ষণ। জয় হবে মানুষেরই।

 

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s