Monthly Archives: ডিসেম্বর 2018

গণতন্ত্র, তুমি কী এখনও বেঁচে আছো?

জাহাঙ্গীর আকাশ ॥ স্বাধীনতার ৪৭ বছরে আমাদের গণতন্ত্র কতটুকু এগিয়েছে? আমাদের নাগরিক সমাজ কতখানি গণতন্ত্রকে এগুতে সহায়তা করতে পেরেছে? গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীন এবং জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য কাজ করছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে চাই না। হাতে গোনা দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ওখানে নাগরিক সমাজ ও মিডিয়া মুখে নিজে নিজেই টেপ মারলেও গণতন্ত্র আর নির্বাচনের কদর্য চেহারাটাকে শত প্রচেষ্টাতেও ঢেকে রাখা যায়নি। এখন সেই কদর্যতার দুর্গন্ধ বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে।

স্বেচ্ছাপ্রণোদিত লজ্জা, ঘৃণায় তাড়িত হওয়ার বাইরে আর কিছু করার আছে বলে কোন বিকল্প পথ আমার জানা নেই। সত্তরের নির্বাচনের কথা মনে হলে গর্ভে বুকটা ফুলে ওঠে। আর আজকের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে কতটা সম্মান অর্জন করলাম তার উত্তর আমি দিতে চাই না।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্ত্বে মহাজোট সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে শেখ হাসিনার আমলেই। জঙ্গিবাদের উত্থানও দমন হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যার হাতেই। তাহলে জনগণের প্রতি বিশ্বাসহারা হবার কী কোন কারণ ছিল?

আমি শুধু আমার ঢাকায় বসবাসকারি এক বন্ধুর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরছি। বন্ধু জানালো যে, “গণতন্ত্র ও নির্বাচনের এই কেলেংকারি না করেও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটি তাদের তাদের “স্বৈরাচারি ও অন্যান্য তথাকথিত বাম সুহৃদ”দের সাথে নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করতো।”

আমার তো মনে হয় যে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, নির্বাচনি প্রচারণায় সমান অধিকার পাওয়া, সংসদে শক্তিশালী বিরোধীদল, নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা (দলবাজি বা আওয়ামীবাজ বা বিএনপিবাজ সাংবাদিকতা নয়), বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং সর্বোপরি নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারার মতো বিষয়গুলি নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, সংসদে শক্তিশালী বিরোধীদল ছাড়া যেমন গণতন্ত্র তার পরিপূর্ণতা পায় না তেমনি কার্যকর গণতন্ত্র ছাড়া আইনের শাসন ও মানবাধিকারের কথা চিন্তাও করা যায় না।

আশা করি আমার লেখার শুরুতেই যেসব প্রশ্নর অবতারণা আমি করেছি সেই প্রশ্নগুলির উত্তর স্বদেশের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

ইংরেজী নতুন বছরের (২০১৯) শুভেচ্ছা জানিয়ে গণতন্ত্র ও শান্তির প্রত্যাশা করছি।

হৃদয় কাঁদে প্রবাসে, মানুষ পুড়ে স্বদেশে

জাহাঙ্গীর আকাশ ॥ মানুষের জীবনের চেয়ে ৫০ হাজার টাকার সাহায্যপ্রদান বড় হয়ে ওঠেছে সংবাদমাধ্যমের কাছে। এটা আমার মায়ের দেশের খবর। বিশ্বাস না হলে, গত সোমবারে (১৭.১২.২০১৮) ঢাকার শ্যামপুরের কদমতলী স্টিল মিলের ভেতরে যে “হত্যাকান্ড” ঘটেছে তার অনুসন্ধান করুন।

এই চুল্লিবিস্ফোরণের মর্মান্তিক ঘটনাকে আমি হত্যাকান্ডই বলবো। কারণ এসব স্টিলমিলে কি পরিবেশে মানুষ কাজ করে, শ্রম আইনগুলি কী যথাযথভাবে কার্যকর হয় এসব কারখানায়? যেসব মানুষ এমন কারখানায় কাজ করে তারা কী তাদের ন্যায্য শ্রমমূল্য পায়? কেন এমন বিস্ফোরণ ঘটছে বারংবার? কারা এসব কারখানার মালিক?

বারবার মানুষ নিহত, আহত হচ্ছে। মালিকের কিছু হয় না কেন?  প্রায় দুই দশক ধরে মানুষের মুক্তির জন্য দেশে সাংবাদিকতা করেছি। বিনিময়ে দেশহারা হয়েছি। তাই একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জা, ঘৃণা আর আত্মযন্ত্রণাবোধ নিয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশ করছি মাত্র। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আমার একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে! যেখানে তিন তিনটা তরতাজা মানুষের জীবন পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।

১৪ জন শ্রমজীবী মানুষ আগুনে পুড়ে দগ্ধ হলো। কেন বিস্ফোরণ ঘটলো, কী পরিবেশে সেখানে মানুষ কাজ করে? শ্রমআইনের কতটুকু কার্যকারিতা আছে? কত পুরনো মেশিনে সেখানে কাজ চলে? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর দেখলাম না বাংলাদেশের কোন মিডিয়ায়! কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চোখে পড়লো না আমার।

কোন মিডিয়ায় দেখলাম না যে, কে এই কারখানার মালিক? কারখানার মালিকের কোন বক্তব্য নেই গণমাধ্যমে! কিন্তু গণমাধ্যমে খবর এলো যে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে সাতজন মানুষের প্রত্যেককে মাত্র ৫০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। মালিকপক্ষ কি করলেন এই হতাহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য তার কোন কিছু উল্লেখ নেই গণমাধ্যমের খবরে!

গনমাধ্যমে এই ৫০ হাজার টাকার সহায়তা খবরের হেডিং হয়ে গেলো! একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে দারুণ অপরাধী মনে হয় গণমাধ্যমের এমন আচরণে। যখন একটি প্রধান জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক দু’জন প্রতথিতযশা সাংবাদিকের (একজন রাজশাহীতে, অন্যজন পঞ্চগড়ে) চাকরি কেড়ে নেন কলমের এক খোঁচায় তথাকথিত অভিযোগের পরিপ্রক্ষিতে, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীন?

সংবাদমাধ্যমগুলিতে কদমতলী স্টিল মিলে নিহত একজন, আফছার হোসেন এর বয়স লেখা হলো ৪০, বছর কেউ কেউ লিখলো ৩৫ বছর, অথচ এই যুবকটির বয়স ২৪ বছর। তাহলে বুঝুন, সাংবাদিকতা কোথায় নেমে গেছে!

ঢাকা থেকে এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, কদমতলী স্টিলমিলের ভেতরে হতাহতদের পরিবারের (সাত জনের পরিবার পেয়েছে এই টাকা) হাতে ৫০ হাজার করে টাকা তুলে দেবার আগে “না-দাবি” লিখে নেয়া হয়েছে। যখন সন্তানহারা মা-বাবা বাধ্য হয়ে কাগজে না-দাবির সই করেছেন তখন নাকি সেখানে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকও ছিল। এসব কথা কিন্তু কোন সংবাদমাধ্যমে আসেনি। কিন্তু কেন? কারণটা বুঝতে কারও বাকি থাকার কথা কী?

বেশ কিছুদিন আগে একজন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন যে, “এখানে (মানে আমার স্বদেশে) আর সাংবাদিকতা নেই। কোন কোন সাংবাদিক নাকি এক কাপ চা পান করার সুযোগ পেলেই নাকি যে কারও পক্ষে লিখে দেয়”!

আমি জানি না, মানুষ, মানুষের জীবন নাকি ৫০ হাজার টাকার সহায়তা গণমাধ্যমের কাছে বড়?