Daily Archives: 21/12/2018

হৃদয় কাঁদে প্রবাসে, মানুষ পুড়ে স্বদেশে

জাহাঙ্গীর আকাশ ॥ মানুষের জীবনের চেয়ে ৫০ হাজার টাকার সাহায্যপ্রদান বড় হয়ে ওঠেছে সংবাদমাধ্যমের কাছে। এটা আমার মায়ের দেশের খবর। বিশ্বাস না হলে, গত সোমবারে (১৭.১২.২০১৮) ঢাকার শ্যামপুরের কদমতলী স্টিল মিলের ভেতরে যে “হত্যাকান্ড” ঘটেছে তার অনুসন্ধান করুন।

এই চুল্লিবিস্ফোরণের মর্মান্তিক ঘটনাকে আমি হত্যাকান্ডই বলবো। কারণ এসব স্টিলমিলে কি পরিবেশে মানুষ কাজ করে, শ্রম আইনগুলি কী যথাযথভাবে কার্যকর হয় এসব কারখানায়? যেসব মানুষ এমন কারখানায় কাজ করে তারা কী তাদের ন্যায্য শ্রমমূল্য পায়? কেন এমন বিস্ফোরণ ঘটছে বারংবার? কারা এসব কারখানার মালিক?

বারবার মানুষ নিহত, আহত হচ্ছে। মালিকের কিছু হয় না কেন?  প্রায় দুই দশক ধরে মানুষের মুক্তির জন্য দেশে সাংবাদিকতা করেছি। বিনিময়ে দেশহারা হয়েছি। তাই একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জা, ঘৃণা আর আত্মযন্ত্রণাবোধ নিয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশ করছি মাত্র। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আমার একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে! যেখানে তিন তিনটা তরতাজা মানুষের জীবন পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।

১৪ জন শ্রমজীবী মানুষ আগুনে পুড়ে দগ্ধ হলো। কেন বিস্ফোরণ ঘটলো, কী পরিবেশে সেখানে মানুষ কাজ করে? শ্রমআইনের কতটুকু কার্যকারিতা আছে? কত পুরনো মেশিনে সেখানে কাজ চলে? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর দেখলাম না বাংলাদেশের কোন মিডিয়ায়! কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা চোখে পড়লো না আমার।

কোন মিডিয়ায় দেখলাম না যে, কে এই কারখানার মালিক? কারখানার মালিকের কোন বক্তব্য নেই গণমাধ্যমে! কিন্তু গণমাধ্যমে খবর এলো যে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিল থেকে সাতজন মানুষের প্রত্যেককে মাত্র ৫০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে। মালিকপক্ষ কি করলেন এই হতাহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য তার কোন কিছু উল্লেখ নেই গণমাধ্যমের খবরে!

গনমাধ্যমে এই ৫০ হাজার টাকার সহায়তা খবরের হেডিং হয়ে গেলো! একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে দারুণ অপরাধী মনে হয় গণমাধ্যমের এমন আচরণে। যখন একটি প্রধান জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক দু’জন প্রতথিতযশা সাংবাদিকের (একজন রাজশাহীতে, অন্যজন পঞ্চগড়ে) চাকরি কেড়ে নেন কলমের এক খোঁচায় তথাকথিত অভিযোগের পরিপ্রক্ষিতে, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা কতটুকু স্বাধীন?

সংবাদমাধ্যমগুলিতে কদমতলী স্টিল মিলে নিহত একজন, আফছার হোসেন এর বয়স লেখা হলো ৪০, বছর কেউ কেউ লিখলো ৩৫ বছর, অথচ এই যুবকটির বয়স ২৪ বছর। তাহলে বুঝুন, সাংবাদিকতা কোথায় নেমে গেছে!

ঢাকা থেকে এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারলাম যে, কদমতলী স্টিলমিলের ভেতরে হতাহতদের পরিবারের (সাত জনের পরিবার পেয়েছে এই টাকা) হাতে ৫০ হাজার করে টাকা তুলে দেবার আগে “না-দাবি” লিখে নেয়া হয়েছে। যখন সন্তানহারা মা-বাবা বাধ্য হয়ে কাগজে না-দাবির সই করেছেন তখন নাকি সেখানে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকও ছিল। এসব কথা কিন্তু কোন সংবাদমাধ্যমে আসেনি। কিন্তু কেন? কারণটা বুঝতে কারও বাকি থাকার কথা কী?

বেশ কিছুদিন আগে একজন সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আমাকে বলেছিলেন যে, “এখানে (মানে আমার স্বদেশে) আর সাংবাদিকতা নেই। কোন কোন সাংবাদিক নাকি এক কাপ চা পান করার সুযোগ পেলেই নাকি যে কারও পক্ষে লিখে দেয়”!

আমি জানি না, মানুষ, মানুষের জীবন নাকি ৫০ হাজার টাকার সহায়তা গণমাধ্যমের কাছে বড়?