Category Archives: Personality

কে ভারসাম‍্যহীন: সাংবাদিক এ বি এম মুসা নাকি মাহবুব উল আলম হানিফ?

abmmusa-hasina
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। সাংবাদিক এ বি এম মুসা। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের কেউ কেউ হয়ত উনাকে চেনেন না। শুদ্ধ ও স্বচ্ছ চিন্তার প্রগতিশীল এই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিকের ওপর মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বাংলায় সাংবাদিকতার এই প্রাণ পুরুষকে আজ জীবন সায়াহ্নে এসে “স্বাধীনতাবিরোধী”র কু উপাধি দেয়া হচ্ছে। অথচ এই মানুষটির সঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ছিল ঘনিষ্ট হৃদ‍্যতা। ছি ছি ছি লজ্জায় মাথায় নূ‍্যয়ে পড়ছে এই কারণে যে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটির আজ কী অবস্থা!
১৯৯১ কী ১৯৯২ সালের কথা। সালটির কথা এখন আমার পুরো মনে নেই। এ বিএম মুসাকে পেয়েছিলাম সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ কোর্সের শিক্ষক হিসেবে। ওই সময়ে আমি পঞ্চগড় থেকে দৈনিক বাংলা ও বাংলার বাণীতে কাজ করি। যাহোক তখন থেকেই উনাকে (এবিএম মুসা) আমি ব‍্যক্তিগতভাবে চিনি। নব্বইয়ের দশকে তিনি (এবিএম মুসা) “নিউজ ডে” নামে একটি ইংরেজী দৈনিকের সম্পাদকও হয়েছিলেন তিনি। সেই পত্রিকায় কিছুদিন পঞ্চগড় সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করি আমি। মেয়র লিটন, কতিপয় সংবাদকর্মীর্ ও র‍্যাবের যৌথ ষড়যন্ত্রের মাধ‍্যমে র‍্যাব ২০০৭ সালে বেআইনিভাবে আমাকে গ্রেফতার করে। প্রায় এক মাস পর নির্যাতন ও কারামুক্তির পর ঢাকায় চলে যাই। তখন এই প্রিয় সাংবাদিক শিক্ষক আমার ওপর নৃশংসতার ঘটনাটি শোনেন এবং খুব বিরক্ত প্রকাশ করেন যে শহীদ জাতীয় নেতা কামারুজ্জামানের ছেলে আমার ওপর অত‍্যাচার করার পেছনে মদদ দেয়ার কারণে। সেসময় উনি আমাকে ভয় না পাবার জন‍্য অনেক সাহস ও অনুপ্রেরণাও দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে এখন একটা নতুন ট্রেন্ড চালু হয়েছে। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দলটির সমালোচনা করলেই মুক্তিযোদ্ধাও তাদের কাছে রাজাকার বনে যায়। সুতরাং আওয়ামী লীগ বা সরকারের বিপক্ষে কোন কথা বলা যাবে না যদিও বা সেইসব কথা সত‍্যও হয় তবুও না, নইলে আপনিও “রাজাকার” উপাধি পাবেন যেমনটি পেয়েছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। অথচ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত‍্যার পর তিনিই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করেছিলেন।
সাংবাদিক এবিএম মুসাকে স্বাধীনতাবিরোধী বলার প্রসঙ্গে আসি এবার। বঙ্গবন্ধুর আমলে ১৯৭৩ সালে এবিএম মুসা আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নে জাতীয় সংসদের সদস‍্য নির্বাচিত হন। তিনি সংসদ সদস‍্য হয়েছিলেন ফেনি থেকে। সরকার নিয়ন্ত্রিত টিভি ষ্টেশন বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক পদেও তাঁকে নিযুক্ত করেছিলেন বঙ্গবন্ধুই। অভিজ্ঞ এই সাংবাদিককে আওয়ামী লীগ সরকারই একুশে পদকে ভূষিত করেছিল।
সাংবাদিক এবিএম মুসার সাম্প্রতিক এক বক্তব‍্যকে কেন্দ্র করে তাঁর ওপর প্রচন্ড নাখোশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে আওয়ামী লীগ। আর এই ক্ষুব্ধতার প্রকাশ ঘটেছে সংগঠনটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের মুখে। তিনি বলেন, “এবিএম মুসা মানসিক ভারসাম‍্যহীন এবং স্বাধীনতাবিরোধী”। হানিফ মাহেবের বক্তব‍্য প্রমাণ করে যে, এবিএম মুসা নন আওয়ামী লীগই সম্ভবত ভারসাম‍্য হারাচ্ছে! প্রশ্ন হলো, হানিফ কী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যে যাকে তাকে তিনি মানসিক ভারসাম‍্যহীন বলে দেবেন? আসলে এই হানিফমাকর্া আওয়ামী লীগারদের কান্ডজ্ঞানহীন বক্তব‍্য আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তিকে পায়ের তলে পিশিয়ে দিচ্ছে!
ব‍্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধী বা রাজাকারদের সমর্থন করি না! তবে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলাই আমার ধর্ম। শ্রদ্ধেয় এবিএম মুসা কী মন্তব‍্য করেছিলেন তা আমি শুনিনি নিজ কানে। তবে আমার প্রচন্ড তাগিদ হচ্ছে এই জনে‍্য যে উনার পুরো বক্তব‍্যটি পড়া বা শোনা উচিত আমাদের সবার। কোন প্রেক্ষাপটে, কোন বিবেচনায় উনি কী মন্তব‍্য করেছেন? কারও কাছে যদি উনার বক্তব‍্য বা মন্তবে‍্যর কোন অনলাইন লিংক থাকে দয়া করে আমাকে দেবেন। আর দেশে যখন ছলিমুদ্দিন, কলিমুদ্দিন, জগাই, মঘা সকলেই টিভির লাইসেন্স পাচ্ছেন, মিডিয়ার মালিক বনে যাচ্ছেন সেখানে এবিএম মুসার মতো ব‍্যক্তিকে হাসিনার সরকার কোন যুক্তিতে টিভির লাইসেন্স পেলেন না বা পাবেন না সেটারও একটা পরিচ্ছন্ন ব‍্যাখ‍্যার প্রয়োজন। হানিফরা বঙ্গবন্ধু হত‍্যার পরে কী ধরণের প্রতিবাদ করেছিলেন নাকি মোশতাকদের তোষামদী করেছিলেন তাও আমি জানি না, তবে তোষামদি, জ্বিহুজুর বা জ্বি ম‍্যাডাম (হুজুর বা ম‍্যাডাম যা বলে করে তার সবই ১০০০০ গুণ সত‍্য!) করে যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করা যায় বটে (মনোনীত বা দলীয় প্রধানের পছন্দের তালিকাভুক্ত হিসেবে) কিন্তু গণতান্ত্রিক হওয়া যায় না! তারজন‍্য সহনশীলতা,কান্ডজ্ঞান, ধৈয‍্য আর সততা-স্বচ্ছতারও দরকার পড়ে। হানিফ সাহেবদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে জেলায় জেলায় নেতা বানিয়ে দেবারও অভিযোগ কানে আসে। আর এই হানিফদের তথাকথিত সাংগঠনিক রিপোর্টের কারণেই অনেক জেলায় নির্বাচিত নেতাদেরকেও বাদ দেয়া হয়েছে। এসব অভিযোগেরও চুলচেরা তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার।
বাংলাদেশনিউজ২৪x৭’র রিপোটর্ থেকে সাংবাদিক এবিএম মুসার সেদিনের বক্তব‍্য থেকে বোঝা যাবে আসলে তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কী বলেছিলেন? জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে ২৪ জানুয়ারি সাবেক ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান দিবসে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের উদ্দেশে এবিএম মূসা বলেন, আপনারা প্রতিবাদ করুন। আপনারা বলুন- ছাত্রলীগের নামটাকে তোমরা কলঙ্কিত করো না। প্রয়োজনে তোমরা একে ‘হাসিনা লীগ’-‘বাম লীগ’ নাম দাও। শেখ মুজিবের সময়ে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবিএম মূসা বলেন, ঐতিহাসিক ৬ দফা ছাত্রদের সূচনা। আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ কর্তৃক সৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন তৃতীয় শ্রেণীর নেতা ছিলেন। নিজগুণে তিনি এগিয়ে এলেন এবং ছাত্রদের চেষ্টাতেই তিনি প্রথম শ্রেণীর নেতা হলেন। বঙ্গবন্ধু যতটা না উর্বর মস্তিষ্কের নেতা ছিলেন, তার চেয়েও বড় ছিল তার বিশাল আস্থা। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের দিন ৭ মার্চই হচ্ছে- প্রকৃত স্বাধীনতা দিবস। সত্যিকারের স্বাধীনতা তিনি সে দিনই ঘোষণা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জনগণের পালস (নাড়িস্পন্দন) বুঝতে পারতেন। পাঠ্যপুস্তক থেকে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম বাদ দেয়ার কঠোর সমালোচনা করে এবিএম মূসা বলেন, ভাসানী আওয়ামী লীগের জন্মদাতা, তাকে বাদ দেয়া মানে জন্মদাতাকে অস্বীকার করা। আর যে জন্মদাতাকে অস্বীকার করে বা যার জন্মদাতা থাকেনা, তাকে আমরা কী বলি? জারজ বলি। ভাসানীকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগ হয় জারজ। সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এখনও এক বছর সময় আছে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশুন, তাদের কথা শুনুন।
আওয়ামী লীগ নেতা হানিফ প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীকেও ‘উন্মাদ’ বলে আখ‍্যা দিয়েছেন। হানিফের ভাষায়, নূরে আলম ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনের ফ্লোরে গড়াগড়ি খেয়ে ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন। সাংবাদিক মুসাকে ‘স্বঘোষিত বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগপ্রেমী’বলেও অভিহিত করেন হানিফ। সূত্র-বিডিনিউজ২৪।
ঢাকার রাজপথে বিশ্বজিৎকে নৃশংসভাবে হত‍্যা, ময়মনসিংহে শিশু রাব্বীকে গুলি করে হত‍্যাসহ প্রায় দেশজুড়েই ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, নির্যাতন, বন্দুকযুদ্ধে মানুষ অতিষ্ঠ। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্রলীগের তান্ডবে শিক্ষার বারোটা বেজে যাচ্ছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধুর দলের দ্বারা পরিচালিত সরকারের মঙ্গল চেয়ে যখন সরকারকে খারাপ দিকগুলি থেকে সরে আসার জন‍্য পরামর্শ দেন তখন সেটা হানিফদের মতো তোষামদকারি নেতারাই কেবল সাংবাদিক মুসাকে মানসিক ভারসাম‍্যহীন বা সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলমকে উন্মাদ বলতে পারেন!
ডাক্তারি কোন পরীক্ষা, নীরীক্ষা বা সনদপত্র ছাড়াই কাউকে উন্মাদ বা মানসিক ভারসাম‍্যহীন বলাটা একটা ক্রিমিনাল অফেন্সও বটে। এধরণের বক্তব‍্য ব‍্যক্তি মানুষের মর্যাদার ওপর আঘাতও বটে। সেই বিচারে মাহবুব উল হানিফদের বিরুদ্ধে মামলাও হতে পারে। আর এ বিএম মুসাযদি স্বঘোষিত বঙ্গবন্ধুপ্রমিকই হতেন তবে তাঁকে বঙ্গবন্ধুই বা কেন তেহাত্তরের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছিলেন? হানিফ সাহেবের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর আছে কী? জনাব হানিফের কথা অনুযায়ী নূরে আলম সিদ্দিকী নাকি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গড়াগড়ি করে ছাত্রলীগের সভাপতির পদটি বাগিয়ে নিয়েছিলেন! যদি হানিফের কথাই সত‍্য হয় তবে তো বলতেই হয় অগণতান্ত্রিক পন্থায় তোষামদি করে ছাত্রলীগের সভাপতি ও অন‍্যান‍্য পদে নেতা হওয়াটাও খুবই মামুলি ব‍্যাপার। আওয়ামী লীগ প্রধানও কী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের বক্তবে‍্যর সঙ্গে একমত? হানিফের বক্তব‍্যতো কেবল ব‍্যক্তি হানিফের নয়, তাঁর বক্তব‍্য আওয়ামী লীগের, সরকারের এমনকি আওয়ামী লীগ ও সরকার প্রধান শেখ হাসিনারও।
প্রিয় পাঠক এখন আপনারাই বলুন, কে ভারসাম‍্যহীন? আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ নাকি এই প্রবীন সাংবাদিক এ বি এম মুসা? ছবি গুগল থেকে নেয়া।

মনে পড়লো মহান মানুষটিকে!

Justice KM Sobhan
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ৩১ ডিসেম্বরের কথা। এই দিনে জন্মেছিলেন এক মহান মানুষ। তাঁর নাম কাজী মেহবুব সোবহান। যিনি কে এম সোবহান নামে সমধিক পরিচিত। স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধাপরাধ ও মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনের এক মহান নেতা। সংগ্রামী, আপোষহীন, স্বাধীন এক মানুষ ছিলেন তিনি। সৎ, সাহসী মহান মানবতাবাদী নেতার নাম বিচারপতি কে এম সোবহান। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন ছিলেন তিনি। সততা ও নীতির কাছে তিনি ছিলেন সর্বদাই বিজয়ী। তাইতো দুর্নীতির শিরোমণি, স্বৈরাচার এরশাদ আমলে তিনি বিচারপতির পদ থেকে অপসারিত হয়েছিলেন। কিন্তু সমাজে, রাষ্ট্রে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই থেকে তিনি পিছপা হননি কখনও।
২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই মানুষটি চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর ট্রমা ভিক্টিমস বা বিআরসিটিতে আমি তখন চিকিৎসারত। র‌্যাবের নির্যাতনের ফলে আমার যে শারীরীরক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছিল তা পুলিয়ে নিতেই এই চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। বিআরসিটি কার্যালয়ে সন্ধ্যায় খবর এলো বিচারপতি সোবহান মারা গেছেন। প্রত্যেহ বিকেলে তিনি রমনা পার্কে হাঁটতে যেতেন। সেদিনও তিনি প্রতিদিনের ন্যায় রমনা পার্কে গিয়েছিলেন হাঁটতে। হঠাৎ তিনি অসুস্থ্যবোধ করেন। এরপরই তাঁকে বারডেম হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেই তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। সংবাদ সম্পাদক বজলুর রহমান, কলামিষ্ট মোনায়েম সরকার, প্রাক্তন স্পীকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দীন সরকারসহ আরও অনেকে বিকেলে হ্টাতেন একইসাথে। হাঁটা শেষে সবাই মিলে জমাতেন মজার আড্ডা। প্রিয় বজলুর রহমানও আজ আর বেঁচে নেই। শ্রদ্ধেয় বজলু ভাইও বিচারপতি সোবহানের পথ ধরে দু’মাস পর ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চলে গেছেন অনন্তকালের জন্য। হয়ত রমনা পার্কের সেই হাঁটা আর আড্ডাও জমে না আগের মতো। বিচারপতি সোবহানের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল ৩১ ডিসেম্বর। তিনি জীবনভর জনগণের পক্ষে, দেশে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ এক অবদান রেখেছেন। স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও যুদ্ধাপরাধীবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম সাহসী সংগঠক ছিলেন তিনি।
বিচারপতি সোবহানের মৃত্যুর পর সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এই মহৎপ্রাণ মানুষটি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫২ সালে ব্যারিস্টার এট ‘ল’ ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন লিনকনস ইন থেকে। ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন ১৯৫৬ সালে। একই কোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন ১৯৭১ সালে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নিরাপদ কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ চার সহযোগি জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনায় তৎকালিন বিচারপতি সায়েম-জেনারেল জিয়া সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই কমিশনের প্রধান করা হয়েছিল বিচারপতি সোবহানকে। যদিও সেই সরকার তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দেয়নি। কারণ সরকার ভালো করেই জানতো যে, বিচারপতি সোনবহানের মতো দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ এবং সৎ মানুষ ঠিকই চার নেতা খুনের আসল রহস্য বের করে আনতেন। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কলামিষ্ট মোনায়েম সরকার লিখেছিলেন, “সরকার জানত, তদন্ত কমিশনকে কাজ করতে দিলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে। বিচারপতি কে এম সোবহান এমন ধাতুতে গড়া যে, সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুও তাকে সত্যের পথ থেকে একচুল নড়াতে পারবে না। কাজেই আনুষ্ঠানিকভাবে কমিশন বাতিল না করে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য এর কার্যকারিতা বাধাগ্রন্ত করে রাখা হয়েছিল। জনাব সোবহান এমন একটি দায়িত্ব পেয়েও সরকারের অসহযোগিতায় কাজ করতে না পারায় সারাজীবন মনোবেদনায় ভুগেছেন এবং এই কষ্টের কথা বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী মহলে বারবার প্রকাশ করে গেছেন।”
বিচারপতি সোবহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা সিটি ল কলেজের খন্ডকালিন শিক্ষক ছিলেন ১৯৫৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত। তিনি সিটি ল কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন একজন। ১৯৮০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি হাইকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন অত্যন্ত নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি প্রাগ ও বার্লিনে ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। ১৯৮২ সালের ১ জুনে তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের দ্বিতীয় জনক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জরুরিভিত্তিতে দেশে ফিরিয়ে আনেন। এবং একই বছরের ১৫ জুন আপিল বিভাগের বিচারপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯০ সালে ইতালীর রোমে স্থায়ী পিপলস ট্রাইব্যুনালের অন্যতম সদস্য হিসেবে ভূপাল গ্যাস মামলার রায় প্রদান করেন। একই ট্রাইব্যুনালের সদস্য হয়ে তিনি বিচার করেন ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে এজেন্ট এবং গ্যাস প্রয়োগের।
বিশিষ্ট মানবাধিকার নেতা অজয় রায় লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতাসীন হন তখন অনেকেই এরশাদ আমলে তাঁর (বিচারপতি সোবহান) ওপর যে অবিচার করা হয়েছে তা তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো এবং তাঁকে পুনর্বহাল করা। কিন্তু বিচারপতি সোবহান সুহৃদদের সেই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।” বিচারপতি সোবহান জীবনে কোন অন্যায়ের কাছে মাথানত কিংবা ব্যক্তিগত কোন আবদার নিয়ে কারও কাছে নিজের আত্মমর্যাদা বিলীন হতে দেননি। শ্রদ্ধেয় অজয় রায়ের লেখা তারই প্রমাণ দেয়। তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ভুটান রিফিউজি সংকট তদন্তে গঠিত আন্তর্জাতিক পিপলস তদন্ত কমিশনের সদস্য, কম্বোডিয়া ও নেপালের সংবিধান প্রণয়ন বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিটিসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য ছিলেন। শ্রীলংকা, নেপাল ও পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষক ছিলেন বিচারপতি সোবহান। কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের অধীনে আইন ও বিচার বিষয়ক কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৯৫-১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। তিনি ১৯৯৭ সালে ভিয়েতনাম আইন ও বিচার বিভাগের স্বল্পকালীন পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।
দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন প্রকল্পের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেছিলেন। বিচারপতি সোবহান ছিলেন মৌলবাদবিরোধী দক্ষিণ এশীয় গণসম্মিলনী পরিষদের সহ-সভাপতি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত গণ আদালতের অন্যতম একজন বিচারক ছিলেন তিনি। সেই আদালত গোলাম আজমসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর বিচারের আদেশ দিয়েছিল। এজন্য বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বরেণ্য ব্যক্তিদের নামে তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনেছিল। বিচারপতি সোবহান ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস বা বিআইএইচআর’র চেয়ারম্যান। বিআইএইচআরের আঞ্চলিক সমন্বয়কারি হিসেবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০১ সালে। ২০০১ এর ১ অক্টোবরের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট গোটা দেশজুড়ে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল। সারাদেশের ন্যায় রাজশাহীতেও সেই হত্যা-নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে থাকে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দলীয় ক্যডারদের হাতে কিশোরী মহিমা গণধর্ষণের কারণে আত্মহননের ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আমি তখন দৈনিক সংবাদ এর রাজশাহীস্থ স্টাফ রিপোর্টার। ঢাকা থেকে সুশিল সমাজের প্রতিনিধিরা ছুটে গিয়েছিলেন মহিমাদের বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়ায়। সেই দলের অন্যতম ছিলেন বিচারপতি সোবহান। বিচারপতি কে এম সোবহান শুধু একজন মানবতাবাদী মানুষই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রসেনানী। যেখানেই নারী নির্যাতন সেখানেই বিচারপতি সোবহান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মশাল জ্বালিয়ে দিতেন। সিরাগঞ্জের পূর্ণিমা শীল, রাজশাহীর মহিমা কিংবা শিউলী, রজুফার ওপর নির্যাতনকারি দুর্বৃত্তদের বিপক্ষে তার দীপ্ত ও দৃঢ় অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে। বাংলাদেশের নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রধান সংগঠন মহিলা পরিষদের আন্দোলন-সংগ্রামের সাহসী সংগ্রামী যোদ্ধা ছিলেন বিচারপতি সোবহান। বয়স তাঁকে কখনও দাবায়ে রাখতে পারেনি। বয়সে স্পষ্ট প্রৌঢ়ত্বের ছাপ পড়েছিল বটে কিন্তু মন-মানসিকতায় তিনি ছিলেন চির সবুজ, চির নবীন। আর এই তারণ্যকে আমৃত্যু কাজে লাগিয়েছেন নারী নির্যাতনবিরোধী কর্মকান্ডে সোচ্চার থেকে। রোদ, বৃষ্টি, শীত উপেক্ষা করে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে পথ থেকে পথে ছুটি বেড়িয়েছেন নারীমুক্তি, নারী স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন রাখার লক্ষ্যে।
২০০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহীর পুঠিয়ায় কিশোরী মহিমাকে গণধর্ষণ করে তৎকালীন জোট সরকারের ক্যাডারবাহিনী। এতে লজ্জা-অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নেয় মহিমা। এরপর ঢাকা থেকে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ছুটে যায় রাজশাহীর প্রত্যন্ত অঞ্চল পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামে। সেই কমিটির অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি সোবহান। রাজশাহীর পুঠিয়াতেই শিউলী নামে আরেক কিশোরী ছাত্রদল ক্যডার হারুনের লালসার শিকার হয়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হিউম্যান রাইটস (বিআইএইচআর) এর চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি কে এম সোবহান শিউলিদের বাড়িতে ছুটে যান তার পরিবারের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন জানান। এটি ২০০২র অক্টোবর মাসের ঘটনা। একই দিনে শিউলিদের বাড়ি থেকে রাজশাহী শহরে ফেরার পথে সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আলম আকাশ বিএনপি সমর্থকদের হামলার শিকার হন। সাংবাদিক আকাশই বিচারপতি সোবহান ও বিআইএইচআরের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব আকরাম হোসেন চৌধুরীকে শিউলিদের বাড়িতে যেতে সহায়তা করেছিলেন।
বিচারপতি সোবহান ছোট-বড় সকলকেই আপনি বলে সম্বোধন করতেন। মানবাধিকারের জন্য অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করায় অন্যায়ভাবে গ্রেফতার ও নির্যাতন করায় বিআইএইচআরের পক্ষ থেকে আমাকে সংবধনা প্রদান করা হয় ২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বর। সেই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিচারপতি কে এম সোবহান। সেদিন তিনি বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মানবাধিকার ব্যক্তিত্বদের ইংরেজীতে বলেছিলেন যে, “অ্যারেস্ট অর বিটেন বাই দ্য র‌্যাব মিনস ইনড অব দ্য হোল থিংকস ইনড অব হোল লাইফ। বিকজ দে আর নট সাবজেক্ট টু দ্য ল ইন দ্য কান্ট্রি, উই হোপ হি উইল কনটিনিউ টু ওয়ার্ক।” এরপর তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, “আপনি একা নন, আমরা আছি আপনার সাথে। আপনার কোন ভয় নাই।” এর ঠিক এক মাস পরেই বিচারপতি সোবহান এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। মাত্র তিন বছরেই আমরা কি বিচারপতি কে এম সোবহানকে ভুলতে বসেছি?
মৌলবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য বিচারপতি সোবহান দেশের মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য লড়ে গেছেন। বাংলাদেশে তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে তাঁর আত্মা শান্তি পাবে। বিচারপতি সোবহানের জীবনদর্শন আমাদের প্রজন্মের কাছে এক অনুকরণীয় আদর্শ। পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিচারপতি সোবহানের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। এই বিরল মানুষটির প্রতি রইল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সহানুভুতি।

ভালো থাকুন মাহাতাব ভাই!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাহাতাব চৌধুরী। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক সোনালী সংবাদ এর প্রধান প্রতিবেদক। আকস্মিকভাবেই শুক্রবার চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রাক্তন নেতা, বন্ধু কমরেড এস এম চন্দনের ফেইসবুক স্টাটাস থেকে কয়েক ঘন্টা আগে জানতে পারলাম এই দু:খজনক খবরটি। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না বিয়োগান্তক খবরটিকে। ফোন করলাম রাজশাহী প্রেসক্লাবের কর্ণধার তথা সাধারণ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক সাইদুর রহমানকে। ফোন পেয়েই সাইদুর ভাই শিশুর মতো কেঁদে ওঠলেন। ঠিক যেন দু’ভাই ছিলেন উনারা উভয়ে! আমারও হৃদয়টা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। সাইদুর ভাইয়ের সবচেয়ে কাছের অত‍্যন্ত‍ স্নেহভাজন ছিলেন মাহাতাব চৌধুরী। অনেক ঝড়, ঝঞ্জা, বিপদ মোকাবেলা করেছেন এই দুই স্বজ্জন ঐক‍্যবদ্ধভাবে। মাহাতাব ভাই যেমন সুন্দর লিখতেন ঠিক তেমনটাই ছিলেন একজন সুবক্তা। সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনবিরোধী সমাবেশগুলিতে তাঁর ভরাট গলার বক্তৃতা শুনতে যেমন ভালো লাগতো আমার তেমনি অনেকেই মুগ্ধ হতেন তাঁর ভাষণ শুনে।
আমি এটা হলফ করের বলতে পারি যে অনেকেই এখন শোকপ্রকাশ করবেন, সমবেদনা প্রকাশের ঢেউ তুলবেন মিডিয়ার পাতায় পাতায়। কত সুন্দর সুন্দর ও মধুর কথামালা গাঁথা হবে মাহাতাব চৌধুরীর নামের সঙ্গে তার হিসাব করাটাই দুস্কর হয়ে পড়বে। মানুষ চলে গেলে তার কদর বাড়ে শোকসভারমঞ্চে! এটাই সেখানে জনপ্রিয় রীতি বা রেওয়াজ। মাহাতাব চৌধুরীর বেলাতেও তার ব‍্যতিক্রম ঘটবে না এমনটাই স্বাভাবিক। “শোকসভা বা শোকাহতমিছিল” আয়োজনের চেয়ে সাংবাদিক মাহাতাব চৌধুরীর শিশুসন্তান ও পরিবার যাতে সামনে চলতে পারেন সুস্থ‍্য ও স্বাভাবিক গতিতে তার ব‍্যবস্থা করাটা জরুরি নয় কী? আশা করি এই বাস্তব অবস্থাটা অনুধাবন ও কার্যকর করতে সক্ষম হবে সেইসব প্রতিষ্মাঠান ও ব‍্যক্তি যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব‍্যক্তির জন‍্য নিরলসভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে গেছেন অকুতোভয় নিষ্ঠাবান মাহাতাব! কোন কোন মহল বা ব‍্যক্তির তরফ থেকে “দূর থেকে বলা সহজ করে দেখাও না কেন” এমন বক্তব‍্য সম্বলিত পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানানো হবে আমার এই লেখার বিরুদ্ধে সেটাও আমি জানি! আমি শোকাহত এমনটা বলতে চাই না। আমি একেবারে বাস্তবাদি। আমি ভাবি বাস্তব অবস্থা ও পরিস্থিতি নিয়ে। আমি কখনও সস্তা বাহবা বা মানুষের কাছ থেকে প্রশংসা পাবার আশায় কোন কিছু করি না বা লিখি না। কাজেই কে কী বললো বা ভাবলো তাতে কিচ্ছু আসে যায় না আমার!
যাহোক মানুষের চলে যাবার সময়টাতে বা কেউ যখন চলে যান আপন ঠিকানায় তখন ভাষার সমাপ্তি ঘটে। আমি নির্বাক! কত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই সৎ ও সাহসী সাংবাদিক বন্ধুটির সঙ্গে। মিছিলে, মিটিংয়ে, সমাবেশে, পেশাগত কর্মসূচী সবখানেই বহুবার অসংখ‍্যবার অনুরোধ করেছি এই গম্ভীর ও বন্ধুবৎসল মানুষটিকে যে, “মাহাতাব ভাই” আপনি করে বলবেন না। কিন্তু তবুও তিনি সম্বোধন করতেন “আকাশ ভাই” বলেই। শিশুসন্তান, স্ত্রী, পিতা-মাতা ও বোনদের দায় থেকে চিরতরে নিজেকে লুকিয়ে নিলেন মাহাতাব ভাই! কিন্তু কেন, কী এমন বয়স হয়েছিল আপনার যে এভাবে চলে যাবেন আপনি? আমার বিশ্বাস শান্তি আপনার সঙ্গেই থাকবে অনন্তকাল কত কাল তা কেউই জানি না আমরা। ভালো থাকুন মাহাতাব ভাই। ছবিটি এসএম চন্দনের ফেইসবুক স্টাটাস থেকে নেয়া।

গুলতেকিনের আত্মসম্মানবোধ, শাওনের জেদ-মিথ‍্যাচার, হুমায়ুনের মৃতু‍্যর জন‍্য কী তবে শাওনই দায়ী!!!???


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “কর্ম বাঁচে মানুষ মরে। কবর হোক যথা তথা ভালোবাসা হোক নিখাদ! ভালোবাসার অত‍্যাচার নয় এ স্বার্থ ও জেদের অত‍্যাচার চলছে! দাফন নিয়ে টানাটানির পর যেন না আসে সম্পদ নিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা ও দ্বন্দ্ব-ফ‍্যাসাদ!” নন্দিত লেখক, নাট‍্যকার, চলচিত্রনির্মাতা হুমায়ুন আহমেদ চলে গেলেন। তাঁর মৃতু‍্য ও তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে মনের মধে‍্য যে এলোমেলো চিন্তাগুলি দানা বেঁধেছে নানা সময়ে নানাভাবে সেগুলির সমষ্টিগত রুপ দেবার প্রচেষ্টা আজকের এই লেখাটি।
মানুষ বাঁচে তাঁর সৃষ্টিশীলতার মধ‍্য দিয়ে। একজন মেধাবি, সৃষ্টিশীল মানুষ যাঁর সাহিত‍্যরস মানুষকে আনন্দিত, আলোড়িত, উদ্দীপ্ত, অনুপ্রাণিত করেছে, করবে অনন্তকাল ধরে সেই মানুষটিকে হারিয়ে বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি মানুষ মাত্রই আজ শোকাতুর। বাংলা ভাষা ও সাহিত‍্য যতদিন বাঁচবে ততদিন থাকবেন হুমায়ুন মানুষের হৃদয়ে। মানুষমাত্রই মরণশীল, কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ’র সৃষ্টকর্ম অমর হয়েই রইবে! যদিও হুমায়ূন আহমেদের লেখালেখিকে অনেকে চটুল, হালকা ও সস্তা বলে অভিহিত করেন। সমালোচক মশিউল আলম লিখেছেন,”মায়ূন আহমেদ যেসব গল্প-উপন্যাস লিখেছেন, সেসবের মধ্যে রাজনৈতিক বা আর্থ-সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টি বা উপাদান খুঁজতে যাওয়া সম্ভবত অর্থহীন হবে। কারণ এই লেখকের তেমন কোনো দৃষ্টি ছিল না।”
সেযাইহোক বহুযুক্তি, নানামত। ফেইসবুক, ব্লগ, সোশ‍্যাল মিডিয়া কোনখানেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সব জায়গা দখল করে নিয়েছে হুমায়ুনের প্রতি ভালোবাসা আর তার প্রেক্ষিতেই চর্চিত আলোচনা। কোথায় চিরনিদ্রায় শায়ত হবেন বাংলা সাহিতে‍্যর কান্ডারি হুমায়ুন আহমেদ? এই নিয়েই শুরু হয়ে গেলো টানাপোড়েন! জাতি এমনটা আশা করেনি। হুমায়ুনও কোনদিনও এমন হবে তা ভাবেননি জীবদ্দশায়। কিন্তু কেন? একপক্ষ বলছেন, কবর হবে নুহাশপল্লীতেই। আরেকপক্ষের না। তাঁদের দাবি হুমায়ুনের নিথর দেহটাকে শোয়ানো হোক ঢাকায় যেখানে সাধারণ মানুষ ভক্ত, অনুরাগিদের আসাযাওয়া সহজ হয়! যে মানুষটি আর কোনপক্ষের হয়েই কোনদিন কথা বলতে পারবেন না, মতপ্রকাশ করার সুযোগ নেই যার তাকে নিয়ে আর অযথাই টানাহেঁচড়া কেন? আমরা আশা করবো, দুইপক্ষের মাঝে কোন জেদাজেদি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। হুমায়ুনের আত্মাকে আর কষ্ট দেবে না কোনপক্ষই এই প্রত‍্যাশাই আমার। হুমায়ুন আজকে যে গগণচুম্বি সফলতা ও জনপ্রিয়তায় এসে পৌঁছেছেন তার পেছনে যে নারীর অবদান অসামান‍্য সেই অভিমানী, আত্মসম্মানসচেতন নারীর কথা আজ আর কেউ বলছি না। এটা কী তাঁর সেই ত‍্যাগের প্রতি অবিচার নয়?
যে গুলতেকিন ছিলেন হুমায়ুনের কঠিন সময়গুলির প্রেরণার অকুস্থল সেই নারী, মহীয়সীকে বাংলার মিডিয়া ভুলে গেল! তিনি কী খুব বড় অপরাধ করেছিলেন? দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা, আনন্দবিচিত্রার পুরনো কপি কারও সংগ্রহে থাকলে গুলতেকিন-হুমায়ুন বিষয়ক অসংখ‍্য লেখা পড়তে পারবেন। সুসময়ের সুযোগে যারা দু:সময়ের বন্ধুকে দূরে সরিয়ে ভালবাসার মাঝে চিড় ধরায় তাকে কী কোন কারণ আছে পুরস্কৃত করার?
শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আহমেদ নিজেকে বুদ্ধিজীবী নয় “গর্তজীবী” বলেই অভিহিত করতেন। তিনি মৃতু‍্যকে ভয় পাননি কোনদিনও। এই প্রথাবিরোধী লেখক ভিক্ষাবৃত্তিকে পছন্দ করতেন না। তিনি জীবনসায়াহ্নে এসে আমেরিকান প‍্যাটার্ণে ভুতের গল্প লিখতে চেয়েছিলেন। তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা এই কথাসাহিতি‍্যক মৌলবাদ ও ধর্মব‍্যবসায়িদের ঘৃণা করতেন সরাসরি। আশাবাদি এই মানুষটি মনে করতেন, “বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকে যাবে না। গণতন্ত্রে মাত্র আমরা সাঁতার কাটা শুরু করেছি। আমাদের প্রচুর রিসোর্স আছে। বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে ‘কিছু একটা করার’ প্রচেষ্টা বাড়ছে। তিনি আমেরিকা ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পাথর্কে‍্যর ব‍্যাপারে বলেন, গণতন্ত্র গণতন্ত্রই এর কোন পাথর্ক‍্য করা যায় না। তবে এর প্রাকটিসের মধে‍্য পাথর্ক‍্য থাকতে পারে।”
“আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি। সববিষয়, সবদিকগুলি খতিয়ে দেখা হবে। এটা আর দশটি মামলার মতো নয়। একজন নয় রীতিমতো দুইজন প্রভাবশালী সাংবাদিককে একইসঙ্গে খুন। কম বড় ব্যাপার না। ৪৮ ঘন্টা, প্রণিধানযোগ্য, সবকিছু পরিস্কার, খুনিদের ধরার বিষয়টা এখন সময়ের ব্যাপার, খুনি যত শক্তিশালীই হোক আমরা তাকে ধরবো, শাস্তি হবেই হবে, আর বেডরুম পাহারা দেয়া”সহ কত কী শোনানো হলো টিভি সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির খুনের পর থেকে। অবশ্য এসব শোনানোর নাটক নতুন কিছু নয়। একই কথা শুনছি আমরা মানিক সাহা কিংবা হুমায়ুন কবির বালু, বা শামছুর রহমান কেবল, নয়তো দীপংকর চক্রবর্ত্তী, বা গৌতম দাশ, অথবা সাইফুল আলম মুকুল নয়তো শ.ম.আলাউদ্দিন, নতুবা হারুন রশীদ খোকন কিংবা সাংবাদিক নিহত হলেই ওসব কথার কথা দেশবাসিকে শুনতেই হবে। নইলে আমাদের রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসনের কর্তা-ব্যক্তিদের পেটের ভাতই হজম হবে না।
হুমায়ুনের প্রতি দেশবাসির গভীর ভালোবাসার ভীড়ে সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যা মামলাটির তদন্তের ভবিষ্যতও অন্ধকার হয়ে না যায় আবার! তাও বাঁচা যে খ্যাতিমান নাট্যকার, লেখক, চলচিত্রনির্মাতা, কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের কবর নিয়ে শাওন নাটকের যবনিকাপাত হয়েছে। কি কান্ডটাই না ঘটতে যাচ্ছিল। প্রকাশ্যে হুমায়ুন যেখানে বারংবার মিডিয়ার সামনে বলে গেছেন যে নুহাশপল্লীকে কবরস্থান বানাতে চাই না, সেখানে রাতের আঁধারে শাওনকে বলে গেলেন ওখানেই কবর দিতে! তবে কী হুমায়ুন নিজের কবর ও নুহাশপল্লী নিয়ে স্ববিরোধিতা জন্ম দিয়ে গেছেন, নাকি শাওন মিথ্যা বলছেন। এর প্রমাণ মিলতো যার কাছে সেইতো একেবারেই অন্যজগতে পাড়ি জমালেন। সুতরাং এই নশ্বর ধরাধামে শাওনবিনে সত্য আর কোথাও মিলবে কি? ত. আলীদের ক্ষমতার বাহাদুরিটাও শেষতক দেখা গেলো কবর নিয়ে প্রধানমন্ত্রির হস্তক্ষেপ করানোর মধ্য দিয়ে! কে জানে হুমায়ুনের দাফন পর্ব শেষ হতে না হতেই তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ, নুহাশপল্লী ও বাড়ি নিয়ে কোন নতুন নাটকের মহড়া ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করছে কিনা?
অবশ‍্য এমন খবরও ইতোমধে‍্য চাউর হয়ে গেছে যে, “শাওন নিউইয়কর্ে বলেছেন মৃতু‍্যর আগে হুমায়ুন আহমেদ কোথায় কবর দেয়া হবে সেব‍্যাপারে কিছুই বলে যাননি।” অথচ দেশের মাটিতে পা রেখেই শাওন রীতিমতো বদলে গেলেন। কিন্তু কেন? শুধুমাত্র হুমায়ুনের পূর্বতন স্ত্রীর সন্তানদের (তারা হুমায়ুনেরও সন্তান) ইচ্ছে আর হুমায়ুনজননীর ইচ্ছেকে হত‍্যা করতেই শাওন কী জেলাসি আর হিংসা থেকেই এমন অনঢ় হয়ে গেলেন নুহাশেই হুমায়ুনকে সমাহিত করার জন‍্য! এমন খবরও ফেইসবুকে উঠেছে যে এই শাওন বিজনেস ক্লাস ছাড়া বিমানে উঠতে চানিন। যারজন‍্যই নাকি হুমায়ুনের নিথর দেহটাকে স্বদেশভুমিতে আনতে বিলম্ব ঘটেছে! আমি জানি না এটা সত‍্য কিনা। কিন্তু যদি সত‍্য হয় তবে তার প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার জানানোরও ভাষা আমার নেই।
কী নাটক, কী গল্প, কী উপন‍্যাস, কী সিনেমা, সাহিতে‍্যর এমন কোন শাখা নেই যেখানে হুমায়ুন আহমেদের বিচরণ ও ছোঁয়া ছিল না। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প ও বাংলা সাহিতে‍্য (সেটা হতে পারে কারও কাছে চটুল বা সস্তা) এক বৈপ্লবিক উদ্দীপনা আর প্রেরণার নাম হুমায়ুন আহমেদ। তরুণ সমাজের মধে‍্য পাঠ‍্যাভাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান‍্য। তাঁর সৃষ্টাকর্মের অন‍্যতম ক্ষেত্র বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। হুমায়ুনের “হিমু” বা “মিসির আলী” নয়তো “বাকের ভাই” চরিত্রগুলি এক একটা দীপ্তিমান সৃষ্টি। সবকিছুই আমাদের তরুণ প্রজন্মকে উজ্জীবীত করেছে, করবে! চিরসবুজ, চিরনবীন, তরুণ এই মানুষটির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালবাসা। তাঁর স্বপ্নগুলিকে যদি এগিয়ে নেয়া যেতো। যাহোক শেষ পর্যন্ত জননী নয় জায়ারই জয় হলো! “না, এটা জননী কিংবা জাতির ইচ্ছে নয়। সন্তানরাও (দুই নাবালক সন্তান ছাড়া) চাইছিলেন না এমনটা হোক। জয় হলো শাওনজেদের। শ্রদ্ধায় মাথা নত হোক গুলতেকিনদের ত‍্যাগের কাছে। সবুজ নুহাশ পল্লীতে শান্তিতে শুয়ে থেকে হুমায়ুন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে উৎসাহ, প্রেম আর প্রেরণা যুগিয়ে যাবেন!
আর কোন দ্বন্দ্ব-ভিন্নতা দেখার ইচ্ছে নেই আমার। হুমায়ুন তুমি রবে বাংলার হ্রদয় মানসপটে। একটি ক‍্যান্সার হাসপাতাল বা ইনষ্টিটিউট কিংবা ক‍্যান্সার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ড়ে তোলার অঙ্গিকার ও বাস্তবায়নই হবে হুমায়ুনের প্রতি প্রকৃতার্থে শ্রদ্ধা নিবদেন। ফুল আর কথামালার গদবাধা ভালোবাসার চেয়েও কোন মহৎপ্রাণ মানুষের স্বপ্নকে সার্থক করে তোলাই হবে সেই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।
হুমায়ূন-শাওন এর প্রেম এবং গুলতেকিনের সঙ্গে বিচ্ছেদের সূত্র ধরে অনেকে অনেক কথা বলছে, লিখছে, সোশ‍্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো যুদ্ধংদেহী অবস্থা এনিয়ে! শাওন আরও হাজারটা বিয়ে করতে পারেন, তাতে কার কী ওটা নিতান্তই উনার ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার। প্রশ্নটা ওখানে নেই। হুমায়ূন আহমেদ মৃতু‍্যর পর যেসব প্রশ্ন ওঠলো যেমন ধরুন বিজনেস ক্লাস ছাড়া বিমানে ওঠবো না, নুহাশপল্লীতে কবর দেয়ার কথা বলে গেছেন (অথচ আমেরিকায় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন শাওনকে তখন তিনি বলেছিলেন না কোথায় কবরস্থ করতে হবে সেব‍্যাপারে কিছু বলে যাননি মৃতু‍্যর আগে, অথচ ঢাকায় পা রেখেই শাওন বদলে গেলো) ইত‍্যাদি নাটকীয়তার কোন প্রয়োজন ছিল কিনা? বয়সের ক্ষেত্রে অসম প্রেম হয়েছেতো কী হলো, কার কী আসে যায় তাতে এটাও উনাদের একান্তই ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার। কিন্তু কথা হলো বাংলার যে সমাজ, সংস্কৃতি, প্রথা, রীতি তার সঙ্গে এটার সামঞ্জস‍্যতা কতটুকুন আছে বা ছিল? হুমায়ুন আহমেদ আর শাওনই যে এমনটা প্রথম করেছেন সেরকমও নয়। হুমায়ূনকে কবরস্থ করা নিয়ে টানাপোড়েনের ঘটনাটা কী ভালো লেগেছে জননন্দিত এই লেখকের আত্মার কাছে, নাকি জাতি ভালোচোখে দেখছে এটাকে? রত্নগভর্া জননী যেখানে বললেন যে ঢাকার কোথাও তাঁকে সমাহিত করা হোক, তারপরও যখন শাওন গো ধরলো, তাছাড়া হুমায়ূন আহমেদের নিজের মুখের কথাও প্রমাণ করে যে তিনি নিজেও নুহাশপল্লীকে কবরস্থান বানানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। তারপরও কেন শাওনকে বোঝানো গেলো না, কেন বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রিকে সম্পৃক্ত করা হলো, কেনইবা গুলতেকিনের সন্তানদেরকে র‍্যাবের ভয় দেখানো হবে?
পরিশেষে একটা প্রশ্ন রেখে লেখার ইতি টানবো। আমেরিকায় সফল অস্ত্রোপচারের পর যে মানুষটি সুস্থ‍্য হয়ে উঠছিলেন হঠাৎ করেই কী এমন ঘটেছিল যে জাতি এই মানুষটিকে হারালো? সেখানে হুমায়ুনের প্রতি অযত্ন, অবহেলাসহ নানান কথাবার্তা এখন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে! কে দায়ি এরজন‍্য? কবর ও দাফনস্থান নিয়ে মা-মেয়ের অনঢ়তা আর রাজনৈতিক ক্ষমতাপ্রদর্শন শেষ পর্যন্ত নাকি হুমায়ুনের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিনের চার সন্তানের জীবনের প্রতিও হুমকি হয়ে উঠেছিল! এসবের অর্থ ও পেছনের কূট কারণ আর ষড়ডন্ত্র জাতির সামনে খোলাসা হওয়া জরুরি! আশা করি মিডিয়া এখানে ছাড় দেবে না! মিডিয়া কোনপক্ষে দাঁড়ায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা নাকি সতে‍্যর পক্ষে? সময়ই বলবে এর উত্তরটা!
আরিফ জেপটিক নামে একজন শাওনের বিজনেস ক্লাশে আসার গোঁ ধরার পক্ষে সাফাই গেয়ে একটা লিখা ছেড়েছেন। তার প্রতিক্রিয়ায় লিখছি। উনার গুণধর ও ক্ষমতাধর মাতাও সঙ্গে ছিলেন। তামাম দুনিয়ার বহু শত সহস্র মানুষ শুধু ১৮ নয় ৩৫-৩৬ ঘন্টা এক নাগারে ভ্রমণ করছেন দু’টি নয় তিন থেকে চারটিও বাচ্চা থাকে সাথে। গাজাখুরি যুক্তির মাধ্যমে সাংবাদিকদের গালমন্দ করতে বেশ ভালো লাগে তাই না? আর এমিরেটস এর বিমানটাতে জড়সড় হয়ে বসতে লাগে না এই অভিজ্ঞতাটাও থাকার লাগে! শাওন যা করলো, দেখালো এটা কোন মহত্বের পরিচয় বহন করে কী? আর উনাকে বহন করার যে খরচ সরকার দিয়েছে সেটাও জনগণেরই পয়সা, কারও বাপের টাকা নয়।
এই লেখাটি যখন শেষ করবো ঠিক সেই মুহুর্তে মানবজমিনের একটি রিপোর্টের দিকে নজর পড়লো। “হুমায়ূনের মৃত্যু অবহেলায়!” শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, সাকসেসফুল অপারেশনের পর হুমায়ুনকে তড়িঘড়ি বাসায় নেয়া হয়। তাও আবার এক নতুন বাসায় ওঠানো হয় সেখানে। এরপর বাসায় পার্টি ও নানাধরণের খাবারের আয়োজন এমনকি পানীয়র আয়োজনও ছিল। সেখানে হুমায়ুন চেয়ার থেকে পড়ে যান। কিন্তু তারপরও তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়নি। এমনকি বেলেভু‍্য হাসপাতালের সেই চিকিৎসক যিনি হুমায়ুন আহমেদের অপারেশন করেছিলেন তাঁর টেলিফোন নম্বরটিও শাওন কিংবা মাজহারের জানা ছিল না। পরদিন যখন হুমায়ুনের ব‍্যথা বেড়ে ডযায় তখন তাঁকে নেয়া হয় অন‍্য একটি হাসপাতালে। সেখান থেকে বেলেভু‍্য হাসপাতালে। এসব থেকে কী এটা প্রমাণ হয় না যে হুমায়ুন আহমেদের মৃতু‍্যর জন‍্য শাওনই দায়ি? ছবিটা ফেইসবুক থেকে নেয়া, তবে ছবির মূল সোসর্ কী তার উল্লেখ না থাকায় সেটা আমি এখানে লিখতে পারলাম না বলে দু:খিত!

গণমানুষের নেতার প্রতিকৃতি কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি। বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক স্বপ্নের রাজার নাম মোহাম্মদ ফরহাদ। কমরেড ফরহাদ নামেই যিনি পরিচিত। মেহনতি মানুষের নেতা। শ্রমজীবী-শোষিত-বঞ্চিত মানুষের হ্রদয়ের রাজা। শোষণহীন একটি সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল যার আজন্ম স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যিনি আজীবন লড়াই করে গেছেন। সমাজতন্ত্রই মানবমুক্তির একমাত্র পথ। এই রাজনৈতিক মতাদশর্ প্রতিষ্ঠায় জীবনভর লড়ে গেছেন তিনি। সমাজটাকে সবমানুষের জন্য সমান করা চাই। বাংলাদেশে সেই সমাজ বদলের রাজনীতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ ফরহাদ। স্বৈরাচার-সাম্প্রদায়িকতা ও শোষনমুক্ত রাজনীতির আদর্শ পুরুষ ফরহাদের জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের সর্বউত্তরের ছোট্র জেলা শহর পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। বিপ্লবী এক গণনায়ক, জননায়কের নাম কমরেড ফরহাদ। সমাজ বদলের সংগ্রাম করতে গিয়ে যিনি জীবনের একটা বড় সময় অতিক্রম করেছেন জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে। কিন্তু শত বঞ্চনা, নির্যাতন ও নিপীড়নেও যিনি সংগ্রামী জীবন ও আদর্শচ্যুত হননি। তিনি শুধু রাজনীতিকই ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।
১৯৩৮ সালের ৫ জুলাই ফরহাদ জন্মেছিলেন। তাঁর পিতা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আহমেদ সাদাকাতেল বারী। ফরহাদ ছিলেন একজন মেধাবি ছাত্র। দিনাজপুর জেলা স্কুলের ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেন। এবং এরমধ্য দিয়েই তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল ততকালিন পূর্ব পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যা আজকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন নামে পরিচিত। ১৯৫২ সালে সংগঠনটির জন্মকালে ফরহাদ দিনাজপুরে ছাত্র ইউনিয়নকে সংগঠিত করেছিলেন। ফরহাদের রাজনৈতিক জ্ঞান আর সাংগঠনিক দক্ষতা দারুণভাবে দৃষ্টি কাড়ে সিনিয়র নেতৃত্বের কাছে। ফলে নিজ যোগ্যতায় ১৯৫৩ সালে দিনাজপুর জেলা ছাত্র ইউনিয়ন সাংগঠনিক কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি জেলা কমিটির সহকারি সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন একই সালে। খুব অল্প সময়েই ফরহাদ জনপ্রিয় ছাত্রনেতায় পরিণত হয়েছিলেন। পাশাপাশি ততকালিন কমিউনিষ্ট নেতাদের নজর কাড়েন কমরেড ফরহাদ। মোহাম্মদ ফরহাদ দিনাজপুর এসএন কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ততকালিন বৃহত্তর দিনাজপুরের কমিউনিষ্ট নেতারা ফরহাদের চৌকস রাজনৈতিক মেধা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় মুগ্ধ হন। এবং ধীরে ধীরে ফরহাদ তাদের সংস্পর্শে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।
গণমনুষের প্রাণপ্রিয় এই নেতা দৈনিক আজাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন একজন শিশু সংগঠকও। মুকুল ফৌজ নামে একটি সংগঠনের সাথেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন আবৃতিকার এবং নাট্যাভিনেতা। ছাত্রাবস্থায় তাঁর এই বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। মোহাম্মদ ফরহাদ দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখান থেকেই তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ততকালিন ছাত্রী আন্দোলনের নেত্রী রাশেদা খানম এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী রিনা খান নামেই সমধিক পরিচিত। ফরহাদ দুই সন্তানের জনক। কমরেড ফরহাদ বহঙ্গবন্ধুর বাকশালের কেন্দ্রীয় সদস্য নির্বাচিত হন। এবং ওই দলের রাজনৈতক প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান।
ছাত্র ও গণমানুষের কাছে কমরেড ফরহাদ যতই জনপ্রিয় হতে থাকেন নিপীড়ক রাষ্ট্রযন্ত্রও ক্রমশ: কমরেড ফরহাদকে শত্রু হিসেবে নেয়। ফলে ফরহাদের রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই নেমে আসে নিপীড়নের স্টিমরোলার। নিরাপত্তা আইনে ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৫৪ সালে। সেইসময় তাঁকে আটক রাখা হয়েছিল বিনাবিচারে। মাত্র সতেরো বছর বয়সে ১৯৫৫ সালে ফরহাদ কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্যপদ পান। পরের বছর ১৯৫৬ সালে তিনি দিনাজপুর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আর ১৯৫৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস‍্য পদ লাভ করেন। কমরেড ফরহাদের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আইয়ুববিরোধী মিছিল বের করা হয়। ১৯৬২ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ এর সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক এবং প্রগতিশীল ধারার। ১৯৬২ সাল থেকে ফরহাদ হুলিয়া মাথায় নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির বিকাশ এবং ছাত্র গণআন্দোলন সংগঠনে অসামান‍্য ভূমিকা রাখেন। এরই মধ‍্যে দেশে মুক্ত সংগ্রাম শুরু হয়। ১৯৭১ সালে ছাত্র ইউনিয়ন, ন‍্যাপ ও কমিউনিষ্ট পার্টির সমন্বয়ে গঠিত যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনের অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন মোহাম্মদ ফরহাদই।
দেশ স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। জিয়ার শাসনামলে ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি-সিপিবিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এবং কমরেড ফরহাদকে কারাবন্দি করে জিয়া সরকার। তবে ১৯৭৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। জিয়ার আমলেই ১৯৮০ সালে পুনরায় ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহের তথাকথিত অভিযোগে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পান। জিয়া সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। এরপর ক্ষমতা নেয় আরেক জেনারেল এরশাদ। ১৯৮২ সালে ফরহাদ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন ১৫ দল গঠনে। এরশাদ আমলে ১৯৮৩ সালে ফরহাদকে ফের গ্রেফতার করা হয়। কমরেড ফরহাদ তিন তিনবার সিপিবির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৫ দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ সালে তিনি পঞ্চগড়-২ আসন তথা বোদা-দেবীগঞ্জ নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস‍্য। কমরেড ফরহাদ ছিলেন অনলবর্ষী তুখোড় বক্তা। জাতীয় সংসদের ইতিহাসে তাঁর দেয়া ভাষণ আজও ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
এই জনদরদী দেশপ্রেমক রাজনীতিক ১৯৮৭ সালের ১০ জানুয়ারি হ্রদরোগে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁকে চিকিতসার জন্য নেয়া হয় রাশিয়ার মস্কোতে। ৯ অক্টোবর এই প্রধাবিরোধী রাজনীতিকের জীবনাবসান ঘটে। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। হেলিকপ্টারযোগে মোহাম্মদ ফরহাদের লাশ আনা হয়েছিল বোদা পাইলট উচ্চ বিদ‍্যালয় মাঠে। লাখো জনতার ঢল নেমেছিল সেদিন প্রিয় এই মানুষটিকে এক নজর দেখার জন্য।
এদিকে পঞ্চগড়ে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে ৯ অক্টোবর, ২০১১ সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের ২৪ তম মৃত্যুবাষির্কী পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে সকালে বোদা উপজেলার বানিয়াপাড়ায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল চত্বরে স্মারক বৃক্ষরোপণ, দিনব্যাপী গাইনী, শিশু, দন্ত ও সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিছাড়াও হাসপাতাল প্রাঙ্গনে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।
বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ি ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ায় কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ কমিউনিটি হাসপাতাল এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। সকালে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহমেদ আল কবীর স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্পের উদ্বোধন করেন। এ সময় অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ -উল -আলম লেনিন, কমরেড ফরহাদের স্ত্রী রাশেদা খানম, বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার, হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান মিটন, চন্দনবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন, কমরেড ফরহাদের অনুসারী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ উপস্থিত ছিলেন। পরে অতিথিরা হাসপাতাল চত্বরে ও স্থানীয় একটি স্কুলে বিভিন্ন বৃক্ষের চারা রোপণ করেন। দিনব্যাপি স্বাস্থ ক্যাম্পে পাঁচ শতাধিক শিশু, নারী ও পুরুষসহ সাধারণ রোগীরা চিকিতসা সেবা গ্রহণ করেন। এই স্বাস্থ্য ক্যাম্পে চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিতসক চিকিতসা সেবা দেন। কমরেড ফরহাদের জীবন ও সংগ্রামের ওপর একটি দেয়ালিকা প্রদর্শন করা হয়। বিকেলে হাসপাতাল চত্বরে “এক জননেতার গল্প শীর্ষক” এক আলোচনা সভায় কমরেড ফরহাদের স্ত্রী রাশেদা খানম সভাপতিত্ব করেন। সভায় কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক নূহ -উল – আলম লেনিন, সাংবাদিক কলামিস্ট বিভুরঞ্জন সরকার, দিনাজপুর জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহবায়ক মির্জা আনোয়ারুল ইসলাম তানু, দিনাজপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু, কুড়িগ্রামের সাবেক কমিউনিস্ট নেতা হারুন -অর রশীদ লাল, সাবেক ছাত্র নেতা অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন, চন্দনবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, সাবেক ইউপি চেয়াম্যান মো. ওয়ালিউল ইসলাম মন্টু ও হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের কান্ট্রি ডিরেক্টর আতাউর রহমান মিটন সহ স্থানীয় ব্যাক্তি বর্গ বক্তব্য দেন। বক্তারা বলেন, মোহাম্মদ ফরহাদ তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের মধ্যে বেঁচে আছেন। আমরা তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামকে সফল করার মধ্য দিয়ে কমরেড ফরহাদকে চিরঞ্জীব করে রাখতে পারি। কমরেড ফরহাদ ছিলেন সাম্যবাদে বিশ্বাসী। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বিশ্ব মানবতার জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। তাঁর মত সত ও আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিকের অভাব আমরা তীব্রভাবে অনুভব করছি।
আজকের বাংলাদেশে ত্যাগী, সত ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিক ক্রমশঃ প্রায় দুর্লভ হয়ে উঠছে। মোহাম্মদ ফরহাদ লড়াই করেছিলেন একটা ব‍্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ‍্যে। সেই কাঙ্খিত স্বপ্নের পরিবর্তন আজও হয়নি দেশে। দেশে বেড়েই চলেছে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান। বাড়ছে শোষণ-বঞ্চনা আর মানুষের মর্যাদাহানি। ফরহাদের মতো রাজনৈতিক নেতা তৈরীর পথ দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। ক্ষমতাকেন্দ্রিক বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলি ভোগবিলাসী ও ব্যবসাকেন্দ্রিক মানসিকতার রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতা তৈরির পথ প্রশস্ত করছে প্রতিনিয়ত। সত, নির্লোভ ও দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতা আজকের রাজনীতিতে অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে সমাজে ভোগবাদী, স্বার্থপর মানসিকতার প্রসার ও বাণিজ্যিকায়ণ ঘটছে। যদিও ঘুনে ধরা পচা সমাজের মধ্য থেকেই আজও ফরহাদের স্বপ্নকে এগিয়ে নেয়ার জন্য একদল অনুসারি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেক স্বার্থপর সুযোগ সন্ধানী শুধু আদর্শচ্যুতই হননি ফরহাদের গড়া পার্টির সম্পদকে দ্বিখন্ডিত করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। মাটি ও মানুষের নেতা “ফরহাদ ভাই” আজ বেঁচে থাকলে লজ্জা পেতেন এমন কীর্ত্তি দেখে।
অসাধারণ মেধা, বুদ্ধি আর প্রজ্ঞার অধিকারি কমরেড ফরহাদ অত্যন্ত সাধারণ ও সাদামাটা জীবন-যাপন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও তিনি কোন লোভনীয় চাকরির পেছনে ছুটে যাননি। অথচ তিনি চাইলে সেটা অনায়াসে পাইতেন। কিন্তু তা না করে মানব মুক্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন সারাটা জীবন। এমন বিরল ত্যাগ আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কেবল স্বপ্ন! চিরঞ্জীব কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ তোমায় লাল সালাম। আমরা তোমায় ভুলবো না। তোমার সততা, আদর্শ আর দেশপ্রেম আমাদের প্রেরণা। তোমার সংগ্রাম বৃথা যাবে না। হয়ত সেই স্বপ্নের কাঙ্খিত সফলতা আসতে সময় লাগবে। কিন্তু সংগ্রাম ও স্বপ্নকে সফল হতেই হবে। সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন একদিন আসবেই। যে পরবর্তনের স্বপ্ন দেখতেন গণমানুষের বন্ধু মোহাম্মদ ফরহাদ। এই মহান মানবতাবাদী মানুষটি আমাদের মনে, মানুষের হ্রদয় মণিকোঠায় চির জাগরুক হয়ে থাকবেন অনন্তকাল ধরে। তঁর আদর্শ হোক আজকের প্রজন্মের প্রেরণা। জয় হোক কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের। লেখকঃ জাহাঙ্গীর আলম আকাশ, শান্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক, editor.eurobangla@yahoo.de, http://www.eurobangla.org/

দায়বদ্ধতার আগুনে জ্বলছি আমি!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ: ২০০৯ সালে যখন দেশ ছাড়ি তখন আবদুল লতীফ সাপির ছিলেন জীবন সায়াহ্নের এক কবি। আমার প্রিয় শিক্ষকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আমাকে স্নেহ করতেন অসম্ভব রকমের! তিনি ছিলেন ভাগ্যবিড়ম্বিত এক পল্লী এলাকায় অনাদর আর অবহেলায় পড়ে থাকা অসাধারণ এক মানুষ। বহু ঘটনা, ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন এই ফোকলোরবিদ। অনেক ফোক সংগ্রহ ছিল যার জ্ঞানভান্ডারে। মায়ের ভাষায় কথা বলার মাসে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন বহু দূরে। যেখানে গেলে কেউ আর ফেরেন না। ২০১১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন।
২০০৩ সালের ১১ আগস্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের সর্বউত্তরের পঞ্চগড় জেলার বোদা থানার মাঝগ্রামে ১৯৪৪ সালে তার জন্ম। ষাটের দশকের শুরু থেকেই সাহিত্য-সাংবাদিকতা এবং রাজনীতিতে ছিল তাঁর তুখোড় পদচারণা।
লতীফ সাপিরের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চর পথ প্রশস্ত করে দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক সংবাদ। জীবন প্রভাতেই সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তাঁকে কীর্তিমান করার পেছনেই ছিল তাঁর আপন ভূবন এ পত্রিকা দু’টো। মেহরাব আলী রচিত ‘দিনাজপুরের লেখক পরিচিতি’ এবং ‘দিনাজপুরে সাংবাদিকতার একশ বছর’ বই দুটিতে তিনি কীর্তিমান কর্মী হিসেবে স্থান লাভ করেন।
ছাত্রাবস্থায়ই লতীফ সাপির বাম রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ঠাকুরগাঁ কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি বোদা থানা ন্যাপ (মো) এর সাধারণ সম্পাদক এবং পঞ্চগড় জেলা ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদক হিসবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় পঞ্চগড় প্রেসক্লাব এবং পঞ্চগড় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন। ছিলেন তিনি বোদা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং বহুব্রীহি থিয়েটার ও ভাষা শহীদ স্মৃতি পাঠাগারের আজীবন উপদেষ্টা। আবদুল লতীফ সাপির ষাটের দশক থেকেই পঞ্চগড়ের লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেন। এ কাজে আমৃত্যু তিনি ব্যাপৃত ছিলেন।
ষাটের দশক থেকে লোক সাহিত্যের উপর তার গবেষণামূলক অসংখ্য প্রবন্ধ আজাদ, কাঞ্চন, করতোয়া, শঙ্খপাণি, আজকের কাগজ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার লোক সাহিত্যের উপর লেখা ‘পঞ্চগড়ের ছড়া’, ‘পঞ্চগড়ের প্রবাদ-প্রবচন’, ‘পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষার শব্দ কোষ’ প্রকাশের অপেক্ষায়। ‘পঞ্চগড়ের প্রবাদ-প্রবচন’ বইটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ আবদুল জলিলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে বলে শুনেছিলাম স্যারের মুখেই। কিন্তু সেটার কী অবস্থা তা আমার জানা নেই।
এতদ্ব্যতীত তাঁর রচিত ‘খান বাহাদুর একিনুদ্দিন’ এবং ‘বোদার ইতিহাস’ দুটি সমৃদ্ধ বই। ষাটের দশকের প্রথমার্ধে রচিত তাঁর ‘এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে’ সনেট কাব্যটি এক দশক আগে প্রকাশিত হয়। এরপর বিশিষ্ট সাংবাদিক নির্মল সেন ২০০১ সালেল ৭ মে দৈনিক জনকণ্ঠে ‘যখন যেখানে যাই’ এবং ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল ব্যক্তিগভাবে তাকে অভিনন্দিত করেন। তাঁর ষাটের দশকে রচিত পাঠক-নন্দিত দুটি সনেট কবিতা এখানে উপস্থাপন করছি-
এক.
এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে
তাই আমি ভালবাসি এই নারী আর এই দেশ
প্রচ্ছন্ন স্বপ্নের মত যে নারীর প্রথম উন্মেষ
আমাকে আকুল করে কোন এক শিল্পীর সন্দেহে।
দেশ সে তো মাতৃভূমি-গরীয়সী জননী আমার
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে ফসলের অফুরান দানে
আমাকে লালন করে কোলে রেখে মাতৃত্বের টানে
এমন কে আছে আর নি.শ্বেষে করে যে উজাড়!
ওমণী সে গৃহলক্ষ্মী-মন যার বাঁধা সারাক্ষণ-
আপন গৃহের মাঝে, স্বামী আর সন্তানের সুখে
নিজেকে উজাড় করে যে রমণী সয় সব দুখে
সে রমণী বড় ভালো-বড় ভালো তার ঋজু মন!
তাই এই দেশ আর এই নারী এত ভালবাসি
এ দু’য়ের ভালেঅবাসা পেতে আমি একান্ত প্রত্যাশী।
(জুলাই, ১৯৬২)
দুই.
নদী ও নারীর কাছে সে আমার অনন্ত প্রত্যাশা
যেই নদী নিরবধি সুচঞ্চলা রজত ধারায়
যে নদী নিঝুম রাতে তার সুরে গান গেয়ে যায়
সে নদীর কাছে আমি পেয়ে যাই কবিতার ভাষা।
সে নদীল কি গভীর বুকভরা ভালবাসা মেখে
মুগ্ধ চাদ সারারাত জেগে থাকে শান্তির শয়নে
উচ্ছলিত জলরাশি ঘিরে তাকে সাগ্রহ বেষ্টনে
দিতে চায় সব তার-অবশেষে হারাতে নিজেকে।
এমনই ভালবাসা ভরা কোন নারীর হৃদয়
যদি পাই কোনদিন-যদি পাইমনে লাগা মন
যদি বা হারাতে পারি তার মাঝে আত্মতৃপ্তি সুখে
আর সে-ও ভালবেসে হাত রাখে আমার চিবুকে
হয়ে যেতে পারি কবি, হতে পারে কবিতা লিখন
তাকে নিয়ে, সেই সাথে থাকে যদি সফল সময়।
(এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে-৪৭)

ষাটের দশকের যৌবনদীপ্ত কবি, আজাদ, সংবাদ, নতুন বাংলা, একতা, শক্তি, উত্তরকণ্ঠ পত্রিকার তিন দশকের নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিক উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সংগ্রামী পরিষদের সংগঠক আবদুল লতীফ সাপির রোগ-শোক-বার্ধক্যে হয়ে পড়েছিলেন জরাজীর্ণ। কিন্তু কেউ তাঁর খোজ রাখেননি। অনেকেই তার কাজকে নিজের কাজ বলে বাহবা পেয়েছে! সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু পর্যন্ত প্রদর্শন করেনি অনেকেই। তাঁরই একটি সনেটে তাঁর অন্তরের প্রতিধ্বনি শুনি-
আমার তো চাল-চুলো ঘর-দোর কিছুই এমন
হলেঅ না জীবনে-যার কথা গর্ব করে বলি
তুমি তার মাঝে এসে পেতে চাও সুখের অঞ্জলী
ভুল ভেঙ্গে গেলে কভু দখবে তা কি যে প্রহসন!
শব্দ ভেঙ্গে শব্দ গড়া এ রকম এক কারিগর
সারাক্ষণ নিয়ে থাকে উঁই-কাটা কেতাব কাগজ
তার মাঝে ঢেলে দিয়ে বিগলিত সমস্ত মগজ
কি করে রাখবে সে চাল-চুলো ঘরের খবর!
বরং কামার হলে সুঁই পিটে বানাতো সে ফাল
নগদ পয়সা পেয়ে শান্তি সুখে চালাতো সংসার
অথবা কৃষক হলে করি শাক-সব্জীর খামার
দু’মুঠো খেয়ে পরে পেতো সেই সুখের নাগাল।
এমন হলো না কিছু, কিছু মানে তুমি যাহা চাও
উপচে-পড়া সমৃদ্ধি এ সংসারে হয়েছে উধাও!
(এ দেশের শ্যামলিমা শ্যামরঙ রমণীর দেহে-৩৬)
আমরা আমাদের প্রাণোচ্ছল জগতে এই কবি-সাংবাদিক ও গবেষককে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হইনি। তাঁর অপ্রকাশিত পান্ডুললিপিগুলি বইয়ের রুপ দিয়ে সেই গুণির প্রতি আমরা আমাদের শ্রদ্ধা জানাতে পারি কিনা তা ভেবে দেখতে বলি সবাইকে (বিশেষ করে এই কীর্ত্তিমানের ছাত্ররা)। স্যারের মৃত্যুর পর এই লেখাটি দৈনিক সংবাদ এ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু ছাপা হয়নি। হয়ত লেখাটি ছাপার অযোগ্য, অন্ত:ত সংবাদ কর্তৃপক্ষ তাই মনে করে!
জীবীত থাকাকালে আমার এই স্যার একটি চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন, “আকাশ মৃত্যুর পরও তোমার প্রতি আমার দাবি থাকলো…”। সেই দায়বদ্ধতার আগুনে জ্বলছি আমি। একজন শিক্ষকের ঋণ কী কখনও শোধ করা যায়? লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র “ইউরো বাংলা”র সম্পাদক (http://www.eurobangla.org/), (https://penakash.wordpress.com/, (editor.eurobangla@yahoo.de)

বঙ্গবন্ধু মানে কী কেবলই বাংলাদেশ?


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। একই সত্তা। একে আলাদা করা যাবে না কখনও। একটি পুরো ইতিহাসের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। মহান নেতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি, ঘোষক। অবিসংবাদিত এক গণনায়ক। জননায়ক ও অনলবর্ষী সুবক্তা। মহান দেশনায়ক, এক বিরল দেশপ্রেমিক। সমুদ্র সমান যাঁর উদারতা, মহানুভবতা। শত-হাজারো গুণে গুনান্বিত। বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ আর বাঙালি। একটা আরেকটার পরিপূরক। বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালি। স্বাধীনতার মূল কারণ বঙ্গবন্ধু, ৬ দফা (পরবর্তীতে ছাত্রদের ১১ দফাসহ), ৭ মার্চের ভাষণ। বিপুল জনপ্রিয় এক নেতা বঙ্গবন্ধু।
বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসের সঙ্গেই মিশে আছেন বঙ্গবন্ধু। এক সংগ্রামী বীর পুরুষের নাম শেখ মুজিবুর রহমান। জীবনভর যিনি সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর এই সংগ্রাম শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার জন্য। সংগ্রাম সফল হলো। কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি দেশবিরোধী শত্রুর দল।
বাংলার মুক্তিসংগ্রাম ছিল দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী। এই সংগ্রামে ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হন। দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটে। বহু ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ জন্ম লাভ করে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশটির বিজয় দিবস। একটি অসাম্প্রদায়িক সুন্দর সোনার বাংলাদেশই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতিকে সবল করার চিন্তা-ভাবনা শুরু হলো।
পাশাপাশি রাষ্ট্রের অবকাঠামো পূনর্নিমাণ ও প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলতে থাকে। কিছুটা দেরী করে হলেও এক সময়ে লক্ষ্য পূরণের জন্য গঠন করা হয় আওয়ামী বাকশাল। অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি বাকশাল গঠন করার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম দু এক বছরের মধ্যেই করতেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের দেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো। কিন্তু স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগেই হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে। নারী-শিশুসহ নির্বিচারে সপরিবারে নিহত হলেন জাতির জনক। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা (আজকের প্রধানমন্ত্রী) ও শেখ রেহানা বেঁচে গেলেন। কারণ ওই সময়ে তাঁরা ছিলেন জার্মানিতে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের সেই নৃশংসতা বাকরুদ্ধ করে দিয়েছিল দেশবাসিকে। বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন সেদিন। ইতিহাসের জঘন্য এই হত্যাকান্ড, বর্বরতা জাতিকে পিছিয়ে দিল অন্ত:ত এক’শ বছর। বাঙালি জাতি সেই ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না আজও। দুই দশকেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত। কিন্ত জাতির পিতার হত্যাকান্ডের সঠিক ও পূর্নাঙ্গ বিচার হয়নি। এক সময়ে বিচারের পথকে বন্ধ করা হয়েছিল দায়মুক্তি অধ্যাদেশের মাধ্যমে। অবশেষে (আংশিক হলেও) জাতির পিতার হত্যার বিচার হয়েছে বাংলার মাটিতেই। কিন্তু খুনিচক্রের ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি।
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবস পালিত হয়েছে। ইচ্ছে ছিল স্বাধীনতার মাস মার্চের শুরুতেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখার। দেখতে দেখতে তাঁর জন্মদিন গত হলো। ব্যক্তিগত নানান ব্যস্ততার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। তবে শেষ পর্যন্ত লেখাটি সম্পন্ন করতে চাই।
জাতির জনককে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। এখনও হচ্ছে। বোধ করি যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিনই তাঁর উপর গবেষণা, তথ্য-বিশ্লেষণ করা হবে। সঠিক মুল্যায়ণে সময় লাগে অনেক।
আমি কোন ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ কিংবা পন্ডিত নই। বয়স আমার তেমন একটা বেশি নয়। বঙ্গবন্ধু যেদিন সপরিবারে নিহত হলেন তখন আমি নিতান্তই শিশু। কাজেই আমার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের আলোচনা করা কিছুটা ধৃষ্টতা বৈ কিছু নয়। কিন্তু তবুও এবারের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিছু কথা বলতে চাই। ইতিহাস, নানা বই-পুস্তক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক নেতা, বিশেষজ্ঞ প্রভৃতি সূত্র থেকে যা জেনেছি বা বুঝেছি, তা নিয়ে আমার নিজস্ব ভাবনা চিন্তার প্রেক্ষিতে একটি বক্তব্য দাঁড়া করাতে চাই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে রাজনীতির মাঠ আজও গরম করার অপচেষ্টা হয়। দেশে বেকারত্ব, দারিদ্র্যতা, শিক্ষাসহ অতিব গুরুত্বপূর্ণ অনেক সমস্যা রয়েছে। কিন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জরুরি ইস্যু মনে হয় না। ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে নাম বদলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধু অবিসংবাদিতভাবে জাতির পিতা। তাঁর নামে আবার নতুন করে কোন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করার প্রয়োজন আছে কি? এটা তাঁকে সম্মান, শ্রদ্ধা জানানো নাকি কোন সুযোগ সন্ধানীর চাটুকারিতা?
স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গে আসা যাক এবার। অগ্নিগর্ভ মার্চের প্রথম সপ্তাহের শেষ দিন ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দশ লাখের অধিক মানুষের সমাবেশে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি। তিনি বলেছিলেন, ”সাত কোটি মানুষকে (একাত্তরে দেশের বা পূর্ব বাংলায় মোট জনসংখ্যা) দাবায়ে রাখতে পারবা না। আজ বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়। বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। তোমাদের যা কিছু তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা…।”
মূলত: এটাই ছিল স্বাধীনতার আদি ও একমাত্র ঘোষণা। এ ধরনের ঘোষণা বার বার করার প্রয়োজন নেই। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের আগে তাজউদ্দিন আহমদ (জাতীয় নেতা এবং জেলে বন্দি অবস্থায় ঘাতকের হাতে নিহত) একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। একাত্তরের ৫ মার্চ তাজউদ্দিন বলেছিলেন, ’বাংলার মানুষ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বাঁচতে চায়।’ যা একটি চিন্তা। কিন্ত কোন ঘোষণা নয়। বঙ্গবন্ধুর সেই জাদুকরি ভাষণ ছিল ১৮ মিনিটের। তাতক্ষণিক সেই ভাষণের কোন খসড়া কিংবা নোট ছিল না বঙ্গবন্ধুর কাছে। গোটা জাতিকে আন্দোলিত করেছিল সেই ভাষণ।
রাজনৈতিক মুক্তি আর বাঙালি সংস্কৃতিকে রক্ষার এই বক্তৃতা মানুষের কাছে ছিল এক মহা পবিত্র আহবান। দেশের মানুষ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাইতো শত্রুর কবল থেকে দেশ স্বাধীন করতে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। বাঙালি জাতিকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না। এমনটা আঁচ করতে পেরেছিল পাক শত্রু। সেজন্যই তারা নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে।
২৭ মার্চ চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন ওই সময়ের মেজর মুক্তিযোদ্ধা পরবর্তীতে জেনারেল, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট এবং যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসনকারি জিয়াউর রহমান। এবং তিনি বলেছিলেন, ’বঙ্গবন্ধুর আদেশে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উদ্দেশ্যে তিনি এই ঘোষণাটি করছেন। আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হান্নানও স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন জিয়ার আগেই। বঙ্গবন্ধু নিজে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হবার আগে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন আনুষ্ঠানিকভাবে। ইতিহাসের পাতায় সত্য জ্বল জ্বল করে আছে। তারপরও ইতিহাস নিয়ে টানাটানি।
জার্মানিতে এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক ইউরোপীয়ান দেশগুলিতে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি দল সঠিক সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে সঠিক সময়ে যথাযথ জায়গায় অবস্থান নেয়। বর্তমানে জার্মানিতে ক্যাথোলিক-খৃষ্টান পরিচালিত অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দূর ও নিকট অতীতে তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর ধর্মযাজক-শিক্ষকদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। এখানে অভিযুক্তদের ব্যাপারে সমস্ত রাজনৈতিক দল একমত। এই সমস্ত দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু শাসনতান্ত্রিকভাবে নয় সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত। ধর্মযাজকদের কুকীর্তিসমূহ তুলে ধরা হচ্ছে মিডিয়ায় ফলাও করে এবং যথার্থভাবে। প্রিয় পাঠক হয়ত ভাবছেন এখানে এই অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা কেন? জাতীয় স্বার্থ যে রাজনৈতিক মতাদর্শের চাইতে অনেক বড়, এটি তার একটি বড় দৃষ্টান্ত। যা আমাদের দেশে এখনও রাজনীতিকরা স্বপ্নেও ভাবেন না।
রাজনীতি বিশারদদের মতে, রাজনীতির দুইটি দিক আছে। জনপ্রিয়তা আর সঠিক বা যথাযথ সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধু জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। অথচ রাজনৈতিক সঠিক সিদ্ধান্তটা সঠিক সময়ে নিতে পারেননি বলে কেউ কেউ মনে করেন। বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তার এই প্রবণতা লক্ষ্যণীয়।
বিশেষজ্ঞ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অনেকেই মনে করেন, ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯৭৪ সালের ১৪ আগষ্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ছিল বিতর্কিত। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-১) পরিবারের কোন কোন সদস্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, ২) জনাব তাজউদ্দিনকে জাতীয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়া, ৩) রাষ্ট্রীয় ভবনে বাস না করা, যা তার নিরাপত্তাকে ক্ষুন্ন করেছিল ৪) বিরোধীপক্ষকে সহ্য করতে না পারা, যা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত ৫) জাসদ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরী ও আওয়ামী লীগের বিভক্তি ৬) বাকশাল গঠনে বিলম্ব করা, ৭) আমেরিকার ইচ্ছাকৃত যথাসময়ে সাহায্য না করার ফলে উদ্ভুত কৃত্রিম খাদ্যসংকট মোকাবেলায় ব্যর্থতা, ৮) আইন শৃংখলার অবনতি এবং ৯) রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সিরাজ শিকদার হত্যাকান্ডে (বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড) প্রকাশ্যে উস্কানি দান ইত্যাদি…।
কিছু রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে, স্বদেশ প্রর্ত্যাবর্তনের পরপরই জাতির পিতার উচিত ছিল বাকশাল তথা একদলীয় শাসন কায়েম করা। আমাদের দেশে কখনও যে বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যকরী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ১৯৯১ থেকে গত ২০০৮ সাল পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, না। কাজেই বাকশালের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু দেশ দ্রুত পুনর্গঠন করতে সক্ষম হতেন বলে মনে করা যায়। কিন্তু বাকশাল সৃষ্টি করতে তাঁর সময় লেগেছিল তিন বছরের অধিক সময়। আর ততদিনে স্বাধীনতাবিরোধীরা একত্রিত হবার সুযোগ পায়। এবং তার জনপ্রিয়তাও হ্রাস পেয়েছিল।
জাতীয় নেতা তাজউদ্দিনের মত মেধাবি, প্রজ্ঞাবান ও সৎ রাজনীতিক, বঙ্গবন্ধুর অবহেলায় তার কাছ থেকে দূরে সরে গেলেন। একই ভুল কী বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসুরী শেখ হাসিনাও করছেন? যাহোক, জাসদ সৃষ্টি হয়ে আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়ে পড়ল। সিরাজ শিকদারের সমর্থকেরা ’সর্বহারা’র নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে খুন-খারাবি চালাতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কতিপয় সদস্যকে তিনি কখনই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি। হয়ত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এসব আলোচনা সর্বাংশে সঠিক নয়। ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনাও আছে। । কিন্তু বিভিন্ন মহলে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এসব প্রশ্ন কিন্তু আজও থেমে যায়নি, সব মিলে একটা রহস্যই হয়ে আছে। বাংলার মানুষের কাছে যেখানে মুজিব মানেই সংগ্রাম, মুজিব মানেই মুক্তি, মুজিব মানেই বাংলাদেশ সেখানে তাঁর নামে একটি ভবন বা সেতুর নাম রাখার জন‍্য অন‍্য উতলা হওয়ার মানেই বঙ্গবন্ধুকে খাটো করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা, বাঙালি জাতির জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। এবং একটি বর্ণনাতীত লজ্জাও। কেউ কেউ এই বর্বর হত্যাকান্ডকে ইতিহাসের দায়ভুক্ত করে বাঙালি হিসেবে নিজের চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দেন। তবে ৭৫ সালে যারা ঘটনার পরম্পরায় নির্বাক হয়ে ছিলেন, তারাও আজ জাতির পিতার অভাব অনুভব করেন। প্রকাশ্যে তার হত্যার পূর্ণ বিচার দাবি করেন। এটাই আশার কথা। মীরজাফররা সব সময়ই সংখ্যায় নগন্য। ব্যক্তিগতভাবে হয়ত বঙ্গবন্ধু অজান্তে তার হত্যার ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করতে হত্যাকারীদের উত্তেজিত করেছিলেন। কিন্ত গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিং এর হত্যাকারীদের মত, তারাও আজ বাংলাদেশের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বহু বছর আগে বলে গেছেন, “দুর্নীতি বাংলার কৃষক করে না, দুর্নীতি মজদুরেরা করে না, দুর্নীতি করে শিক্ষিত সমাজ”। এমন একটা সত‍্য ও বাস্তব কথা তিনি বলে গেছেন, যা আজও স্বদেশে খাঁটি সত‍্য এবং বাস্তব। বাংলায় কোন গবেষণা চালালে অবশ‍্যই প্রমাণিত হবে দুর্নীতি সতি‍্য সতি‍্য শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষেরাই করে। আয়ের সঙ্গে ব‍্যয়ের হিসাবটা মেলানোর কাজটা করতে পারলেই পরিস্কার বোঝা যাবে বঙ্গবন্ধু সত‍্যই বলে গেছেন। সেই দুর্নীতি বন্ধ না হলে কী বাংলাকে সোনার বাংলায় পরিণত করা সম্ভব হবে কোনদিনও?
সুখের কথা হলো, স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হয়েছে। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের (ব্যক্তিগতভাবে আমি মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরোধী) অনেকেই বিদেশে পালিয়ে থাকলেও, বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছে তারা খুনি হিসেবে আইনত: রায়প্রাপ্ত দোষী হিসেবে মৃত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র বলেই মনে হচ্ছে। কারণ সরকার ঘোষণা করেছে, স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এই কাজটি সম্পন্ন করতে সরকার সম্ভব সব রকমের নিরাপত্তা প্রস্তুতি গ্রহণ করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আমাদের প্রত্যাশা দেশ শিগগিরই বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে আসবে। কোনরকমের ভনিতা ও ছলচাতুরির আশ্রয় না নিয়ে শেখ হাসিনা বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যাবার সাহস রাখেন কিনা? সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় জুজুর ভয়ে “ভবিষ্যতে ভোট কমে যাবে” এমন ফালতু চিন্দা-ভাবনা থেকে যদি তিনি সংবিধানকে অসাম্প্রদায়িক অবস্থানে বসাতে না পারেন তবে আখেরে তার দলের বা জোটেরই পায়ে কুঠারাঘাত পড়বে। কাজেই সাধু সাবধান! জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। জয় হোক কৃষক-শ্রমিক আর মেহনতি জনতার; সর্বোপরি বাংলাদেশের। ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত।