Category Archives: Press Freedom

ফের সাংবাদিক নির্যাতন> নেপথ‍্যে দুবর্ৃত্ত রাজনীতি!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। রাজশাহী আমার জন্মস্থান নয়। মানুষ তার জন্মস্থানকে সম্ভবত ভুলতে পারে না। আমার জন্মস্থান পঞ্চগড়। পড়ালেখার জন‍্য আমি আমার জীবনের সেরা সময়টুকু কাটিয়েছি এই রাজশাহীতে।

দীঘর্ বিশ্ববিদ‍্যালয় জীবন এবং সাংবাদিকতা মিলিয়ে পুেরা ১৬ টি বছর কেটেছে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই প্রাচীন বিভাগীয় শহরটিতে। রাজশাহীর অলি-গলি আমার চেনা। কী পেশাজীবী, রাজনীতিক, ব‍্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সবই আমার চেনা-জানা। কেউ কেউ আবার খুবই ঘনিষ্ট। তাই রাজশাহীতে েকান কিছু ঘটলে বিশেষত েকান খারাপ খবর েচাখে পড়লে মনে ব‍্যাথা লাগে। কষ্ট পাই, দারুণভাবে ভেঙ্গে পড়ি রাজশাহীর েকান দু:সংবাদে।

আর যখন আমার সহকমীর্, সতীথর্ সাংবাদিক বন্ধুরা নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপমানিত ও হামলার শিকার হন তখন আর দু:খের শেষ থাকে না। লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে আমার। কারণ আমি আমার সহকমর্ীদের দুদর্িনে কাছে থাকতে পারছি না, সহানুভুতি জানাতে পারি না, পারি না হামলাকারিদের বিচার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে রাজপথের মিছিলে সমবেত হতে। তাই দূর থেকেই কেবল েচাখের জল আর আন্তরিক শুভ প্রত‍্যাশার মাধ‍্যমেই আমার মনের আকুতির প্রকাশ ঘটে।

ডিজিটাল যুগের কল‍্যাণে এখন েকান খবর আর বেশি সময় লাগে না পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে। রাজশাহী মেডিক‍্যাল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ণী চিকিৎসকদের হামলায় ১০ জন সাংবাদিক বন্ধু আহত হয়েছেন। এদের মধ‍্যে একজনের অবস্থা খারাপ, তাকে উনাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। এধরণের হামলা ওখানে নতুন কিছু নয়। আমি যখন রাজশাহীতে সাংবাদিকতা করি তখনও এমন অনেক হামলার ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের তৎকালিন কতর্ৃপক্ষ হাসপাতালে সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। জানি না, সেই ফরমান এখনও বলবৎ আছে কি না।

এমন সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটলে মন্ত্রি, এমপি ও মেয়ররা ঘটনাস্থলে ছুটে যান, প্রশাসন ঘটনা তদন্তের জন‍্য কমিটি গঠন করে, সন্ত্রাসী যেই েহাক তার কঠিন  শাস্তি হবে বলে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্তরা ফাঁপা বুলি আওড়ায়। এবারও তার ব‍্যতিক্রম ঘটেনি। েখাদ হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস‍্য ঘটনাস্থলে গিয়ে দায়িদের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।

আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বড়ই তেঁেতা। কারণ এধরণের বহু ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। হয়নি েকান সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতেনর বিচার। সারাদেশ ঝুড়ে এমন শত শত ঘটনার উদাহরণ দেয়া যাবে। বিশেষ করে রাজশাহীতে সাংবাদিক নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনাগুলির সাথে জড়িতদের সাথে পরবতর্ীতে সমেঝাতার নামে দায়িদের রক্ষা করার বহু নজির রয়েছে।

একটি ঘটনার উদাহরণ দিতে চাই, যদিও এই ঘটনাটি সাংবাদিক নিযর্াতেনর সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। ২০০৭ সালের ১৮ মে রাজশাহীর বনগ্রামে ওয়াকর্াস পার্টির ওয়াডর্ নেতা মজনু শেখকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী পিটিয়ে হত‍্যা করে। তার ওপর অনুসন্ধানীয় রিেপাটর্ এবং মেয়র লিটন, উনার চাচা েলাটনের সন্ত্রাস ও দুনর্ীতির প্রতিবেদন করার মূল‍্য দিতে গিয়ে আমাকেও নিশ্চিত মৃতু‍্যর দুয়ার থেকে ঘুরে আসতে হয়েছে, আর এখন স্বদেশহারা। যােহাক সেই মজনু হত‍্যা মামলাটির ব‍্যাপারে আমাদের সংসদ সদস‍্য বাদশা সাহেব কী উেদ‍্যাগ নিয়েছেন তাও আজ আমার জানা নেই। তবে শুনেছি সদস‍্য বিদায় ক্ষমতাসীন দলের মেয়র নাকি সেই হত‍্যা মামলাটি আেপাষ করতে মজনুর পরিবারের সদস‍্যদের কাছে বারবার ধরণা দিয়েছিলেন। সেই মজনু হত‍্যা মামলার ভাগ‍্যে কী ঘটেছে তার জন‍্য আমাদের সংসদ সদস‍্য বাদশা সাহেব কী েকান ব‍্যবস্থা নিয়েছেন?

আমি এসব সন্ত্রাসী ঘটনা ও হামলার ঘটনার জন‍্য ওই ইন্টাণর্ীদের দায়ি করতে চাই না। কারণ আমি মনে করি স্বদেশে দুবর্ৃত্ত রাজনীতির কারণে এসব গুন্ডাপান্ডারা একটার পর একটা ঘটনা ঘটােনার সাহস পাচ্ছে। আর সমাজে ন‍্যায়বিচার না থাকলে, সবর্ত্র সবর্গ্রাসী দুর্নীতি জিইয়ে থাকলে, দলবাজি বন্ধ না হলে সন্ত্রাস, হামলা, নির্যাতন, অবিচার কী বন্ধ করা যাবে কখনও? না, কখনও সম্ভব নয়।

আমার প্রত‍্যাশা, সাংবাদিক বন্ধুরা দলমত ভুলে একতাবদ্ধ হবেন। সাংবাদিকরা অবিচার আর অন‍্যায়ের সঙ্গে আেপাষ বা সমেঝাতা নয় বরং দুবর্ৃত্তদের বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনির মাধ‍্যমে সমাজের মানুষকে জাগিয়ে তুলবেন এসব সন্ত্রাসী হামলা ও গুন্ডামির বিরুদ্ধে।

আমি আশা করি এবার সাংবাদিক হামলাকারিদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব‍্যবস্থা হবে। এই ঘটনার পেছনে েতা আর রাষ্ট্রীয় এলিট বাহিনীর হাত নেই যে বাদশারা ভয় পাবেন!

পরিশেষে সাংবাদিক বন্ধু যারা পেশাগত কারণে নির্যািতত হলেন তাদের প্রতি সহানুভূতি জানাই। ধিক্কার দিচ্ছি হামলাকারি  সন্ত্রাসীদের। ধন‍্যবাদ জানাচ্ছি রাজশাহীর সংসদ সদস‍্য ফজলে েহাসেন বাদশা, আয়েনউদ্দিন ও মেয়র েমাসাদ্দেক েহাসেন বুলবুলকে যাঁরা সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছেন। আর আরেকদফায় উনাদের ধন‍্যবাদ জানােবা তখন, যেদিন হামলাকারিদের শাস্তি হবে।

 

সাগর-রুনির খুনিদের ‘রক্ষা’র বিপক্ষে জেগে ওঠার সময়!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। শেষ পর্যন্ত “একটা গোজামিল” গ্রেফতার নাটকের বাহ‍্য রুপ এলো প্রায় আট মাস পর। ‘চোর-ডাকাতরা’ই সাংবাদিক সাগর-রুনিকে হত‍্যা করেছে এমন একটা ধারণা আগাগোড়াই দেবার চেষ্টা করেছে তদন্তসংম্লিষ্ট সংস্থাগুলো। তারই সফল পরিণতির দিকে হাঁটতে শুরু করেছেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি। বাহ্, শাবাশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি, শাবাশ স্বদেশভূমি! বহু বক্তৃতা, তদন্ত খেলা, প্রতিশ্রুতি আর নাটকীয়তার পর প্রকৃত খুনিদের আঁড়াল করার এক নয়া খেলার হুইসেল বাঁজিয়ে দিলেন সাহারার উত্তরসুরী। চালাকি, ভন্ডামি, নাটক, খেলা, যাকে তাকে ধরে খুনি বানিয়ে বাহবা নেয়ার চিরায়ত অভ‍্যাস পরিহার করে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার পথে হাঁটা শুরু না করলে একদিন অবিচারের কুঠার নিজের পায়েই আঘাত করবে। কাজেই সাধু সাবধান!
এখন সন্দেহ জাগে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ নেতা ডা. নারায়ণ চন্দ্র দত্ত নিতাই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিরাও কী তবে রেহাই পেয়ে গেছে যেভাবে সাগর-রুনির খুনিদের আঁড়াল করার নানান পাঁয়তারা চালানো হয়েছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রির বক্তবে‍্য এটা পরিস্কার যে সাংবাদিক সাগর-রুনির হত‍্যা মামলার তদন্ত কাজে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, আমেরিকা এবং বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি যেন খুবই গৌরবান্বিত এই জনে‍্য যে আমেরিকার মতো দেশকেও সাগর-রুনি হত‍্যা মামলার তদন্তে কাজে লাগানো হয়েছে! সবই হাস‍্যকর ব‍্যাপার ছাড়া কিছুই না। আসল খুনি ধরা পড়বে না, ব‍্যস! এটাই হলো সত‍্য।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু সাগর-রুনি শুধু একটিবারের জন‍্য জীবীত হয়ে আসুন এবং কারা কী কারণে আপনাদের হত‍্যা করলো তাদেরকে দেশবাসির কাছে চিহ্নিত করুন! এছাড়া আপনাদের খুনি শনাক্ত ও খুনের রহস‍্য বের হওয়া আগামি সহস‍্য বছরেও সম্ভব নয়।
আর আমার প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু, নেতা, ভাই, বোন, সাংবাদিকতার গুরু থেকে শিক্ষক আপনাদের সবার কাছে আমার বিনম্র নিবেদন অনুগ্রহ করে জেগে ওঠুন অবিচারের বিরুদ্ধে, অন্তত: সাগর-রুনির হত‍্যাকারি, প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করার লক্ষে‍্য। প্লিজ, আসুন আমরা সবাই দলমতের উদ্ধর্ে উঠে দলীয় প্রেম পরিহার করে হাসিনা কিংবা খালেদার জোটভুক্ত না হয়ে সাংবাদিকতা পেশা, সাংবাদিক ও জনগণের জানমাল রক্ষা সর্বোপরি আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার ও গণতন্ত্র (প্রকৃতার্থের কার্যকর গণতন্ত্র) ফিরিয়ে আনার লড়াই করি। সকলরকমের ভন্ডামি, মিথ‍্যাচার, অবিচার, অন‍্যায় ও গাজাখুরি জোড়াতালির তদন্ত ও গ্রেফতার খেলা বন্ধ করতে না পারলে সাংবাদিকতা পেশার স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা কোনটাই রক্ষা করা যাবে না। আমরা যে যেখানে আছি (দেশে কিংবা বিদেশে) আসুন আমাদের সোনার বাংলাকে রক্ষায় একসাথে আওয়াজ তুলি। তবেই ভন্ডামি, মিথ‍্যাচার ও সাজানো নাটক বন্ধ হবে এবং সাংবাদিক সাগর-রুনির প্রকৃত খুনিরা ধরা পড়বে। ছবি গুগল থেকে নেয়া।

সাংবাদিক নির্যাতনের মহাউৎসব: সবকিছুই ওই দুবর্ৃত্ত রাজনীতির হাতেই আটকা পড়েছে!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। বাংলাদেশে কী কোন যুদ্ধ চলছে? দেশে কী হচ্ছে? কী হতে যাচ্ছে? কী হবে দেশের ভবিষ‍্যৎ, কী আছে দেশের ভাগে‍্য? একের পর এক সাংবাদিক নির্যাতন ও হত‍্যার ঘটনাগুলির সঙ্গে কী কোন বিশেষ শক্তি জড়িত? সেই শক্তি কী দেশের সরকারের চেয়েও ক্ষমতাধর? যা ঘটছে তা কী পরিকল্পিত কোন ঘটনার পূর্বমহড়া? দেশে কী বড়ধরণের কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? বিরামহীনভাবে চলা সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলি কী অনাগত সেই শক্ত কোন ষড়যন্ত্র বা ঘটনা ঘটানোর আলামত? চারিদিকে একটা আতংকাবস্থা। কেমন জানি একটা ভয়, আতংক, হতাশা, উদ্বেগ, নিরাপত্তাহীনতা ভর করছে দেশের মানুষের মনে। মহাজোট সরকারের ভেতরেই কী মোশতাকরুপী কোন মীরজাফরের আমদানি বা আবির্ভাব ঘটেছে? সরকার কী বুঝতে পারছে না যে সব ঘটনাই সরকারের বিরুদ্ধেই যাচ্ছে? নাকি জ্বি-হুজুর, জ্বি নেত্রী, জ্বি-আপাদের খপ্পড়ে পড়েছে সরকার? সরকারের ভেতরের কোন অংশই কী তবে এসব ঘটনাকে জিইয়ে রেখে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান আন্দোলনকে ভন্ডুল করতে চাইছে? নাকি যুদ্ধাপরাধীদের নানান প্রশ্ন আসছে মাথার মধে‍্য। এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে দেশের পরিস্থিতি যে মোটেও ভালো নেই তা কেউ কী অস্বীকার করবেন?
সাংবাদিকরা বেডরুম, রাজপথ, নিজের অফিস কোথাও কী নিরাপদ আছেন? নাকি সরকার কোন নিরাপত্তা দিতে পারছে সাংবাদিকদের? সাংবাদিক হত‍্যা-নির্হযাতনের ঘটনাগুলির কী কোন কার্যকর তদন্ত করতে পেরেছে সরকার? অতীতের সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের কথা বাদই দিলাম। মহাজোট সরকারের আমলে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের কতগুলি ঘটনা ঘটলো! কোন ঘটনায় সঠিক ও সন্তোষজনক তদন্ত করতে পেরেছে সরকার? বরং তদন্তের নামে সরকার নাটক করছে। অন্ততপক্ষে সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের ঘটনা তারই প্রমাণ দেয়। প্রায় চার মাস অতিবাহিত হলো, কিন্তু সাগর-রুনির খুনিরা ধরা পড়েনি।
হত‍্যার আগে সাংবাদিক সাগর-রুনি বিষ পান করেননি কিংবা তাদেরকে বিষপ্রয়োগ করা হয়নি। ভিসেরা রিপোর্টে একথা বলা হয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল‍্যকর এই হত‍্যাকান্ড ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এরপর নানান নাটকীয়তার পর পুলিশ তদন্ত কাযর্ক্রম বিষয়ে নিজেদের ব‍্যর্থতা স্বীকার করে আদালতে। এরপর আদালত (সর্বোচ্চ আদালত) সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব‍্যবহার করে সাগর-রুনি হত‍্যা মামলা তদন্তের ভার দেয় এলিট ফোর্স র‍্যাবকে। সেই বিশেষ বাহিনীও এখন পর্যন্ত কোন খুনিকে শনাক্ত করতে পারেনি। তদন্ত কার্যক্রম কতদূর এগিয়েছে তাও দেশবাসি জানতে পারেননি আজও। সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে সাংবাদিকদের “লোকদেখানো: আন্দোলন চলছে। সাংবাদিক ঐক‍্য নিয়ে ব‍্যাপক আলোচনা ও সুন্দর সুন্দর বক্তব‍্য দিলেও সাংবাদিক নেতারা আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নকে এক করতে পারেননি। জাতীয় প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি, ফটো সাংবাদিক এসোসিয়েশন, বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নসহ অন‍্যান‍্য সাংবাদিক ও এনজিওসাংবাদিক সংগঠনগুলির ঐক‍্যবদ্ধ কোন স্টিয়ারিং কমিটি বা মোর্চাও গড়ে ওঠেনি।
হালআমলে সাংবাদিক নির্যাতনে পুলিশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশ কেন সহিংস হয়ে উঠলো সাংবাদিকদের ওপর? এনিয়ে হয়ত কোন গবেষণা পরিচালনা করলে চাঞ্চল‍্যকর তথ‍্যও বেরিয়ে আসতে পারে! চলতি মাসে ধানমণ্ডিতে বাসচাপায় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিভাস চন্দ্র সাহা নিহত হন। এরপর বিক্ষুব্ধ সাংবাদিক ও স্থানীয় জনতাকে লাঠিপেটা করে ধানমন্ডি থানা পুলিশ। ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোপালগঞ্জের হওয়ায় তার বিরুদ্ধে আজও কোন ব‍্যবস্থা নেয়া হয়নি। যদিও সাংবাদিকদের “ভাসুরের নাম মুখে আনতে মানা” জাতীয় আন্দোলন কর্মসূচী চলছে! কিন্তু মনিরের খুঁটিতো প্রধানমন্ত্রির কার্যালয় পর্যন্ত পোতা আছে। কে নড়াতে পারে সেই খুঁটি?
আজ (২৯ মে) আবার পুলিশের আক্রমণের লক্পুষ‍্যবস্রাতু হলেন সাংবাদিক। পুরান ঢাকার আদালতপাড়াযর এ ঘটনায় আহত তিন সাংবাদিক হলেন প্রথম আলোর আদালত প্রতিবেদক প্রশান্ত কর্মকার, কালের কণ্ঠের আদালত প্রতিবেদক এম এ জলিল উজ্জ্বল ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের আদালত প্রতিবেদক তুহিন হাওলাদার। এর আগে গত ২৬ মে দায়িত্ব পালনের সময় আগারগাঁওয়ে পুলিশি পিটুনির শিকার হন প্রথম আলোর তিন আলোকচিত্র সাংবাদিক খালেদ সরকার, সাজিদ হোসেন ও জাহিদুল করিম। এই ঘটনায় হাইকোর্ট তিন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ব‍্যাখ‍্যা চেয়ে তলব করেছে। ব‍্যাখ‍্যা চাওয়ার কী আছে? সংবিধানতো স্পষ্ট বলে দিয়েছে কোন অবস্থাতেই কেউ কাউকে নির্যাতন করতে পারবে না। হাইকোর্টে এর আগেও পুলিশ সাগর-রুনির হত‍্যা মামলার তদন্ত বিষয়ে ব‍্যর্থতা স্বীকার করলেও আদালত সেই ব‍্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোন ব‍্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। বিচার বহির্ভূত হত‍্যাকান্ড বিষয়েও কোটর্ অসংখ‍্যবার রুল জারি করেছে, সংশ্লিষ্টদের আদালতে তলব করে ব‍্যাখ‍্যা দাবি করেছে। কিন্তু তাতে কী বিচার বহির্ূভত হত‍্যাকান্ড বন্ধ হয়েছে? বরং গুপ্ত হত‍্যা ও গুম বেড়েছে। যেগুলির সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
২৮ মে বিডিনিউজ২৪ এর কার্যালয়ে ঘটলো সন্ত্রাসী হামলা ও সাংবাদিক-কর্মচারিদের ওপর আক্রমণ। এরপর কোথায় কে আক্রমণের শিকার হবে তা বলা মুশকিল! বিডিনিউজ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছুদিন আগে সাতক্ষীরায় এক সাংবাদিককে একটি রিপোর্টের জন্য মারধর করে হাত পা বেঁধে নদীর পাড়ে ফেলে আসা হয়েছে। দেশে সরকারের টার্গেট বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা! আর পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের আক্রমণের লক্ষ‍্যবস্তু হলেন সাংবাদিকরা। দেশে আইনের শাসন থাকলে, গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায় বাস্তবে তার চর্চা থাকলে আজ দেশের অবস্থা এমনটা হতে পারতো না!
কিছুক্ষণ আগে ফেইসবুকের এক স্ট‍্যাটাস থেকে জানা গেলো যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি রেগে গেছেন! সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করার পরই তিনি নাকি বলেছেন যে, “কথা থাকলে অফিসে আসেন। এখানে একটি অনুষ্ঠানে এসেছি।” আসলে রেগে যাওয়ার বাইরে উনাদের আর কী-ই বা করার আছে বলুন? এই ব‍্যর্থদের কারণেইতো দেশ, দেশের মানুষের এতো কষ্ট। বিএনপি-জামাত আমলে আমরা শুনেছি আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে। আর এখন শুনতে হচ্ছে ২৪ ঘন্টা, শিগগির ইত‍্যাদি।
বিডিনিউজ এর কার্যালয়ে হামলা ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া যুবক জাহেদুল ইসলাম সৌরভ নিজেকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন যুবলীগের কর্মী বলে দাবি করেছে। এই যুবক হামলার দায়ও নাকি স্বীকার করেছে! স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রি শামসুল হক টুকু বলেছেন,”কোথাও সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হলে সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দায়িত্ব পালন করার সময় সংবাদকর্মীরা নিরাপদ দূরত্বে থাকলে অনেক ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া যাবে।” বাহ্ চমৎকার পরামর্শ! শুনেছি এই প্রতিমন্ত্রির এক ছেলে শান্তি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের দেশ নরওয়েতে এসেছিলেন পড়ালেখা করতে। তিনি নাকি এখন সেই দেশেই থাকার প্রচেষ্টা করছেন। টুকু সাহেবকে বলবো প্লিজ আপনরার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করুন নরওয়েতে পুলিশ কী ধরণের ব‍্যবহার করে একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে? ছেলের কাছ থেকে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক চর্চা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সভ‍্য সমাজ সম্পর্কে একটা ধারণা পেলেও যদি আপনাদের মতিভ্রম কাটে! তাতেও দেশের মানুষ লাভবান হবেন-নিশ্চয়ই।
প্রতীকি প্রতিবাদে জীবনেও সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বন্ধ হবে না ওখানে! নিরাশাবাদী ভাইবেন না প্লিজ! মুখের কথা, প্রতীকি প্রতিবাদে, শোক প্রকাশ আর দু’একটি মানববন্ধন, ঘেরাও ও বিবৃতিতে কোন কাজ হবে না। চাই সাংবাদিকদের মাঝে একতা, ঐক‍্যবদ্ধ মহাঐক‍্য। যা কেবল সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন নয় দেশের আমূল পরবর্তনও ঘটাতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস এবং আশা। সেই জায়গাটাতে আমরা কী করে যাবো বা কী করে পাবো? শোক প্রকাশ বা নিন্দা জানানো কিংবা প্রকাশের সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। দরকার সাংবাদিকদের মহাঐক‍্য, পেশাদার সাংবাদিকদের ঐক‍্য, এবং সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের বিপরীতে একটা ঐক‍্যবদ্ধ সাংবাদিক সংগঠনের পতাকাতলে দুর্বার আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ফসল হিসেবে হয়ত দেশের মানুষ মুক্তিও পেতে পারেন দুর্নীতি, দু:শাসন, হত‍্যা, নির্যাতন, মানবাধিকার লংঘণ ও আইনের শাসনহীনতা থেকে!
ফেইসবুকে আমার কাছে একটি প্রশ্ন কতরেছেন একজন প্রিয় মানুষ। এই প্রশ্নের উত্তর দেবার ব‍্যর্থ চেষ্টা করেই লেখার উপসংহারে যাবো। প্রশ্নটি হলো এমন, “ভোর হবার আর কত দেরি (বাংলাদেশে)?
আমাদের স্বদেশের চলমান নিরাশ‍্যজনক অবস্থায় এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় প্রকৃতিও দিতে ভয় পাবে! আমার কাছে কোন জবাব নেই! নিজের জান-মাল, মান-সম্মান, মর্যাদা সবকিছুই ওই দুবর্ৃত্ত রাজনীতির হাতেই আটকা পড়েছে! দুবর্ৃত্ত রাজনীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার বা বার করে আনার উপায়টা দেখাবে কে? সেই উজ্জ্বল সময়ের অপেক্ষায় আমরা সবাই! ছবি বিডিনিউজ২৪ থেকে নেয়া।

সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড ও আদালত অবমাননার জুজু!

জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “দুই সাংবাদিকের (সাগর-রুনি) হত্যার ঘটনায় সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এই তদন্তে কোন ধরনের ভুল বা অবহেলা আমরা দেখিনি। একাধিক তদন্ত সংস্থা এই ঘটনার পুরো সত্য বের করে আনতে কাজ করছে।” বাংলাদেশের স‍র্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট একথা বলেছে। সাগর-রুনিকে সরকারই খুন করেছে বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার এমন অভিযোগ বিষয়েও আদালত মন্তব‍্য করেছে। আদালতের মন্তব‍্য, “এধরণের মন্তব‍্য আদালত অবমাননার শামিল। আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনের জন্য এটা হুমকিস্বরূপ। যারা এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে, নিহত সাংবাদিক দম্পতির প্রতি তাদের কোনো সহানুভূতি নেই।”
আমি জানিনা আমার বক্তব‍্যও আদালতের চোখে আদালত অবমাননার শামিল কিনা! আদালত একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছে বলে আমার বিশ্বাস। সেটা হলো আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসনের কথা। কিন্তু দেশে সাংবিধানিক শাসন বা আইনের শাসন বলতে বাস্তবে কিছু আছে তা কী আদালত হলফ করে বলতে পারবে? দেশের প্রধান বিচারপতি কী রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পায় না। দেশে যদি সাংবিধানিক ও আইনের শাসনই থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই দেশে বিনা বিচারে মানুষ হত‍্যা করছে কেন? আমাদের মনে পড়ে আদালত বিচার বহির্ূভত হত‍্যাকান্ড বন্ধে একটি রুল জারি করেছিল তারতো বাস্তবায়ন আজও হয়নি। কই আদালততো সেব‍্যাপারে নিরব! আজ সুন্দরবন ও বগুড়ায় পাঁচজন মানুষকে বিনাবিচারে হত‍্যা করেছে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধ যে কোন যুদ্ধই নয় সরাসরি হত‍্যা তা কী আদালত অস্বীকার করতে পারবে? সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয় প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব‍্য কী সংবিধানের বরখেলাপ নয়, মাননীয় আদালত? আপনাদের ভাষা এবং মন্তব‍্য যদি সত‍্য বলে ধরে নেয়া হয় তাহলেতো বিএনপি-জামাত জোট আমলেও আজকের প্রধানমন্ত্রী একইভাবে বহু আদালত অবমাননা করেছেন! তারজন‍্য আপনারা, আদালত কী ব‍্যবস্থা নিয়েছেন তখন। আদালত, বিচারক হিসেবে আপনারা সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, কোন দল বা সরকারের তাবেদারি করার জন‍্য নয়। আজ যদি আপনাদের (বিচারকদের) কারও কন‍্যা ও জামাতা কিংবা ছেলে ও পুত্রবধূ একইভাবে সাগর-রুনির মতো খুন হতো আর দেশের সরকারপ্রধান কারও বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয় বলে নিজের ব‍্যর্থতাকে ঢাকতে চাইতো তখন আপনারা একজন পিতা হিসেবে কী করতেন? এই প্রশ্নের সদৃত্তর আছে কী আপনাদের কাছে?
সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের পরবর্তী ঘটনায় প্রশাসন তথা সরকার কী ধূম্রজাল সৃষ্টি করেনি? সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশ বা সরকার কী কোন নাটক করছে না? সরকার যে নাটক করছে তার পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদি কী প্রমাণ করে না, মাননীয় আদালত? আপনাদের চোখ কী অন্ধ না বন্ধ? আপনারা কী দেখতে পাচ্ছেন না যে ২০০৪ সাল থেকে বাংলাদেশে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার বা বন্দুকযুদ্ধের নামে বিনা বিচারে মানুষ হত‍্যা করার উৎসব চলছে? আপনারা কী এই বিচার বহির্ূভত হত‍্যাকান্ডকে দেশে বৈধ হিসেকে মেনে নিয়েছেন? যদি মেনেই নেন তবে দেশে আর কোন বিচারক, আইন, আদালত, সংবিধান, সরকার থাকার দরকারটাই বা কিসের? “আইনের শাসন আর সাংবিধানিক শাসন” বলে চিৎকার চেচামেচি সববাই করতে পারি, কিন্তু সেটাকে রক্ষার মহান দায়িত্ব নেয়ার শপথ নিয়েও যারা তা রক্ষা করি না তার বিচার কে করবে?
আজকাল বাংলাদেশে আদালত অবমাননা জুজুর ভয় দেখিয়ে মানুষের মত, আবেগ ও বাস্তবতাকে হত‍্যা করার একটা প্রবণতা লক্ষ‍্য করা যাচ্ছে! এভাবে হয়ত কোন বিশেষ সরকারের তাবেদারী, তোষামদী করা যায় কিন্তু সংবিধান ও আইনের শাসন রক্ষা করা যায় না! দেশের মানুষ চান শান্তি, আইনের শাসন চান তারা। আজকের দুনিয়ায় কোন মানুষ জংলি, অসভ‍্য, বর্বর ও হত‍্যা-খুনের মধ‍্যযুগীয় বর্বরযুগে ফিরে যেতে চান কী। আর আইনের শাসনহীন একটি সমাজ বা রাষ্ট্রকে কখনো সভ‍্য সমাজ বা রাষ্ট্র বলা যায় না। সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের তদন্ত নিয়ে জনমনে যে সন্দেহ, সংশয় দেখা দিয়েছে তার জন‍্য সরকারই দায়ি। এটা দায়িত্ব নিয়ে আমরা বলতে পারি।
সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড তদন্ত নিয়ে সরকারের পদক্ষেপে আদালত যতই সন্তুষ্ট থাকুক না কেন দেশের সিংহভাগ মানুষ এনিয়ে যে সন্তুষ্ট নয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একথা বিশ্বাস না হলে সরকার বা আদালত দেশে একটি জরিপ চালাতে পারে। মাননীয় আদালত, সাগর-রুনির ছোট্র সন্তান মেঘের দিকে তাকিয়ে দেখুন অথবা মেঘের অবস্থানে নিজের সন্তানকে বসিয়ে দেখুন মনে কোন কষ্ট বা দাগ কাটে কিনা? শুধু সাগর-রুনি নয় সব হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনার রহস‍্য উন্মোচন, ন‍্যাবিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারেরই। সেটা কেউ যথাযথভাবে পালন করতে না পারলেতো আমাদের আদালত কোন রুল জারি করে না কোন সরকারের ওপর, কিন্তু কেন? ছবি-গুগল থেকে নেয়া।

সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। ঢাকা থেকে একটি ইংরেজী দৈনিকের এক সাংবাদিক আমার কাছে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতন বিষয়ে কয়কটি প্রশ্ন করেছিলেন সম্প্রতি। ওই সাংবাদিক বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরগুলি আমার মতো করে লিখে পাঠিয়েছি। কিন্তু তার কোন ফিরতি জবাব মেলেনি। হয়ত সাংবাদিক বন্ধুটি ব‍্যস্ত আছেন পেশাগত কারণেই। যাহোক, সাংবাদিকের করা প্রশ্নগুলি প্রিয় পাঠক আপনাদের কাছে শেয়ার করতে চাই। নিচে হুবহু তুলে দিলাম আমার উত্তরগুলি। যা ঢাকার সেই সাংবাদিক বন্ধুটির কাছে ই-মেইলে পাঠিয়েছিলাম।
প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক মানিক সাহা দৈনিক সংবাদ এর নিজস্ব বাতর্া পরিবেশক হিসেবে কাজ করতেন খুলনা থেকে। ১৯৯৭ সালে একই সংবাদপত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেই আমি। এরপরই মূলত: মানিক সাহার সঙ্গে আমার পরিচয় এবং তা থেকে ঘনিষ্ঠতা। যদি আমি স্মৃতিভ্রষ্ট না হয়ে থাকি তাহলে সংবাদ এর তৎকালিন বার্তা সম্পাদক প্রিয় মনজুরুল আহসান বুলবুল কিংবা মফস্বল ডেস্ক ইনচার্জ কার্ত্তিক চ‍্যাটার্জী আমাকে একদিন ফোন করে বলেছিলেন মানিক সাহার একটি কাজ করে দিতে সহায়তা করার জন‍্য। মানিক সাহার একটি শিক্ষাসনদ রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে তোলার প্রয়োজন ছিল। এই সামান‍্য কাজটি করতে গিয়ে মানিক সাহার খুবই কাছাকাছি আসার সৌভাগ‍্য হয় আমার। সম্ভবত এই কারণে তিনি একবার রাজশাহী এসেছিলেন খুব অল্প সময়ের জন‍্য। উনাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয় ক‍্যাম্পাসটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলাম। এরপর থেকে প্রায়ই কথা হতো। পেশাগত কারণে অসংখ‍্যবার ঢাকায় আমরা একসঙ্গে হয়েছিলাম। যাহোক ওইসময়গুলোতে ছাত্রশিবিরের অস্ত্র আর সন্ত্রাসের দাপটে রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ে ভয়ংকর অবস্থা ছিল। মানিক সাহা আমাকে ফোন করে বলতেন “আকাশ তুমি বেশি রিস্ক নিও না। ওরা (শিবির) ভয়ংকর, সাবধানে থেকো।” শ্রদ্ধেয় মলয় ভৌমিক রাজশাহী থেকে সংবাদ এর দায়িত্ব ছেড়ে দিলে, আমি নিজস্ব বার্তা পরিবেশকের দায়িত্ব গ্রহণ করি। মানিক সাহা খুলনা থেকে আমি রাজশাহী থেকে কাজ করছি দৈনিক সংবাদ ও একুশে টেলিভিশনে। তাঁর নৃশংস হত‍্যাকান্ডের পর একাধিকবার আমি খুলনায় গিয়েছি। মানিক সাহা একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিকের প্রতিকৃতি। খুলনায় নিযর্াতিত, বিচারবঞ্চিত মানুষের ভরসাস্থল ছিলেন মানিক সাহা। সত‍্য প্রকাশে তিনি কখনও কাউকে পরোয়া করেননি। মিতভাষী, বন্ধুবৎসল, মানবতাবাদী এই সাংবাদিক বন্ধুকে কোন মানুষ খুন করতে পারে এটা ভাবাও কষ্টকর! দুবর্ৃত্তদের বোমার আঘাতে মানিক সাহার দেহ থেকে মাথা আলাদা হয়ে যাওয়ার সেই দৃশ‍্য আজও আমাদের কাঁদায়।
প্রকৃতঅর্থে সাংবাদিতা আর দশটি পেশার মতো নয়। এটি একটি চ‍্যালেঞ্জিং এবং ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। গণতান্ত্রিক ও সভ‍্য সমাজ ব‍্যবস্থায় সাংবাদিকতা অতটা ঝুঁকিপূণর্ নয়। কিন্তু যেখানে গণতন্ত্রের অবস্থাই ভঙ্গুর, আইনের শাসন ও ন‍্যায়বিচার সোনার হরিণ এবং দুর্নীতি, দলীয়করণ আর পরিবারতন্ত্র অতিমাত্রায় তৎপর সেখানে সাংবাদিকতার পথ মসৃণ হতে পারে কী? না কখনও না। খুলনায় বহুরুপী অপরাধ সিন্ডিকেট যারা রাজনৈতিক শক্তির সহায়তা পেয়ে থাকে সবসময়। এটা শুধু খুলনাতেই নয় গোটা স্বদেশ ডুবে আছে একই সমস‍্যার ভেতরে। খুলনা একটা অর্থনৈতিক জোন। রাজনৈতিক হত‍্যা-নির্যাতন ছাড়াও সেখানে চিংড়ি, সুন্দরবনসহ নানান অর্থনৈতিক ক্ষেত্র ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ‍্য অপরাধ সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেট রাজনৈতিক শক্তির অর্থের একটা বড় উৎসও বটে। এসবের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা লেখালেখি করতে গিয়েই মূলত: সন্ত্রাসী বা অপরাধীচক্রের রোষানলে পড়ছেন। যার পরণতি নৃশংস হত‍্যাকান্ডের মতো অমানবিক ঘটনার মধ‍্য দিয়ে শেষ হচ্ছে। একের পর এক সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড ঘটছে সেখানে। শুধু মানিক সাহাই নয় হুমায়ূন কবির বালু, হারুণ রশিদ খোকন, বেলালউদ্দিন শেখ, শ.ম. আলাউদ্দিনসহ বহু সাংবাদিক হত‍্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে খুলনা অঞ্চলে। কিন্তু কোনটারই রহস‍্য উন্মোচিত হয়নি। কারা খুনের পরিকল্পনাকারি তা আজও রহস‍্যাবৃত। কারণ একটাই খুনের ঘটনাগুলির পেছনে কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক মদদ আছে। ফলে মাঠপর্যায়ের কিলাররা কখনও শনাক্ত হলেও মূল হোতারা থাকছে পর্দার আঁড়ালেই। হুমকির মুখে অনেক সাংবাদিক খুলনা থেকে ঢাকায় চলে যেতে বাধ‍্য হয়েছেন।
জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজের ছাত্র। সরকারনিয়ন্ত্রিত দৈনিক বাংলার শিক্ষানবিশ সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করি পঞ্চগড় থেকে। যশোর থেকে দৈনিক বাংলার স্টাফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামছুর রহমান কেবল। ঢাকায় দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় অনেকবার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার অন‍্যতম প্রাণপুরুষ শামছুর রহমান কেবলকে সন্ত্রাস ও রাজনীতি বিষয়ক রিপোর্টিংয়ের তথ‍্যভান্ডার বলা হয়ে থাকে। অকুতোভয় সাহসী এই সাংবাদিক খুনের ঘটনায় সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। প্রথাবিরোধী এই সাংবাদিক কতটা মানবিক ছিলেন তার একটি উদাহরণ দিতে পারি। তখন দৈনিক বাংলায় মফস্বল ডেস্কের প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন শামসুল আলম। একদিন ঘটনাক্রমে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে কেবল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। আমি পঞ্চগড় থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম নিয়োগপত্র পাবার আশায়। এসময় কেবল ভাই শামসুল আলম সাহেবকে বলেছিলেন, “কেন এই ছেলেটাকে এতো ঘুরাচ্ছেন? ওতো ভালোই লিখে।” জবাবে শামসুল আলম সেদিন বলেছিলেন, “ওর হাতটা এখনও পাকেনি আপনার মতো। ওর (আমি) রিপোর্টিং লেখায় শব্দচয়নে অনেক দূর্বলতা আছে।” এভাবে দৈনিক বাংলা কাযর্ালয়ে বসিয়েই শামসুল আলম আমাকে দিয়ে রিপোর্ট পুনরায় লিখাতেন।
মূলত: আমাদের স্বদেশের গেটা সমাজ ব‍্যবস্থাই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি কোন নীতি নৈতিকতা বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়। এটা মূলত: অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন। সমস্ত পেশাজীবীরাও আজ বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এই বিভক্তির হাত থেকে রেহাই পায়নি। যা দুভর্াগ‍্যজনক। পেশায় অনৈক‍্য, সাংবাদিকতা আর ব‍্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ তথা রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা, মিডিয়ামালিকানার আপন ব‍্যবসায়িক স্বার্থের মতো কারণগুলিও সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের অন‍্যতম কারণতো বটেই। এইতো গতবছর জাতীয় সংসদে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অর্ধসত‍্য ভাষণ দিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৪ সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেন। এই তথ্য যেমন সত্য তেমনি বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে ৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন (ওইসময় পর্যন্ত বর্তমানে এই হিসাব ৯ এ ঠেকেছে), এটাও সত্য। কিন্তু তিনি (প্রধানমন্ত্রী) অর্ধাংশ স্বীকার করে অর্ধেকটা অস্বীকার করেছেন পরোক্ষভাবে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে জনপ্রিয় একুশে টেলিভিশন বন্ধ করা হয়েছিল। এটা যেমন সত্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে চ্যানেল ওয়ান, যমুনা টিভি ও আমার দেশ বন্ধ হলো (আমার দেশ পরে আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হয়) উভয়ই সত্য। আমরা এই অর্ধসত্য রাজনীতির শিকার। কোন সাংবাদিক নেতা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তবে‍্যর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। আজ দেশে সাংবাদিকরা দলীয় পরিচয়ে পরিচিত। কেউ আওয়ামী সাংবাদিক, কেউ বিএনপিপন্থি। এই দলীয় সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের পেশা ও জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি এটা বলছি না যে সবাই দলীয় সাংবাদিকতা করছেন, ব‍্যতিক্রম অবশ‍্যই আছে। কিন্তু ব‍্যতিক্রম উদাহরণ নয়। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের আমলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলে আওয়ামী তথা মহাজোট সমর্থক সাংবাদিকরা নিরব হয়ে যান। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে যারা সোচ্চার থাকেন রাজপথে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের প্রতিবাদে। অন্যদিকে আবার বিএনপি-জামায়াত আমলে শত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন হলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি সাংবাদিক সমাজ মুখে কুলুপ আঁটে। যারা মহাজোটের আমলে মহাবিপ্লবী সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে। সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের পর দলমতনির্বিশেষে সকল সাংবাদিক ঐক‍্যবদ্ধ হয়েছে বলে আপাতত: মনে হলেও তা কতদিন অটুট থাকবে সেটাই প্রশ্ন। সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনে দলীয় সাংবাদিকতা অন‍্যতম কারণ হলেও একমাত্র এবং প্রধান কারণ নয় বলেই আমার বিশ্বাস। কারণটা রাজনৈতিক ও ব‍্যবসায়িক।
না এখানে মনে করার কিছু নেই প্রিয় সাংবাদিক বন্ধু। সত‍্য কখনও বিপদজনক হতে পারে না। আমি এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। আমি আরও মনে করি যে সত‍্যান্বেষণই সাংবাদিকতার মহান ব্রত। প্রতিটি সাংবাদিকই মানবাধিকারকমর্ী-এটাও আমি বিশ্বাস করি। একজন মানবাধিকারকর্মী কোন মানবাধিকার লংঘণের ঘটনার তথ‍্যানুসন্ধান করে রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ঠিক একইভাবে একজন সাংবাদিকও ঘটনার পেছনের ঘটনা তথা সত‍্যটাকে খুঁজে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরেন। বিচারবহির্ূভত হত‍্যাকান্ড তথা মানবাধিকার লংঘণ, ধর্মীয় সংখ‍্যালঘু-আদিবাসি নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার কারণেই আমাকে মাতৃভূমি ছাড়তে হয়। এটা যে কত দু:খের, ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝবেন না এই যন্ত্রণার জায়গাটাকে। শান্তনা এটুকুই যে আজও বেঁচে আছি আমি। আমাকেতো ওরা সেই কালোরাতেই ক্রসফায়ারের নামে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। হয়ত মা-বাবার আশির্বাদ আর বিচারবঞ্চিত-নির্যাতিত আর যাদের কণ্ঠস্বর উপরতলার মানুষের কাছে পৌঁছায়না সেইসব সহজ-সরল মানুষগুলির ভালবাসার কাছে পরাভূত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারি দুবর্ৃত্তের মনোপ্রত‍্যাশা! ২০০৭ সালের ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে (অনুমান দেড়টা) আমাকে আমার ভাড়া বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় র‍্যাবের সন্ত্রাসী দল। তখন আমি রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তারা আমার চারমাস বয়সী শিশুপুত্র, স্ত্রী এবংভাড়া বাসার মালিক ও তার ছেলের সামনে অমানুষিকভাবে নির্যাতন করে। এরপর দু’হাতে হ‍্যান্ডকাফ পরিয়ে গাছা দিয়ে চোখ বাঁধার পর মাথায় কালোকাপড়ের টুপি পরিয়ে নিয়ে যায় র‍্যাবের রাজশাহী-৫ এর নির্যাতন কেন্দ্রে। এরপর তারা আমাকে ঝুলিয়ে রাখে। র‍্যাবের তৎকালিন মহাপরিচালক আজকের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‍্যাব-৫ এর তৎকালিন অধিনায়ক লে.কর্ণেল শাশসুজ্জামান খানের নিদর্েশে র‍্যাব কর্মকর্তা মেজর রাশিদুল হাসান রাশীদ (বর্তমানে লে.কর্ণেল) ও মেজর হুমায়ুন কবির আমাকে নৃশংসভাবে নির্যাতন চালায়। তারা আমাকে বৈদু‍্যতিক শকও দেয়। তারা আমাকে পঙ্গু করে দেয় শারীরীকভাবে। নির্যাতনকারিদের একজন মেজর রাশীদকে পরবর্তীতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে পাঠিয়ে সরকার পুরস্কৃত করে। রাজশাহীর বর্তমান মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসাধু সাংবাদিক ও ডিজিএফআইয়ের দালালদের সহযোগিতায় আমার নামে চাঁদাবাজির মিথ‍্যা কলংকের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সন্ত্রাসী, খুনি ও চাঁদাবাজদেরকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির সিরিজ মামলা দায়ের করায়। মামলার বাদি সকলেই আমার অনুসন্ধানী রিপোর্টিংয়ের বিষয়বস্তু ছিল বহু বছর আগে। আমাকে বাসা থেকে ধরা হলেও কতিপয় অন্ধ সাংবাদিক র‍্যাবের দেয়া মিথ‍্যা তথ‍্য তোতাপাখির ন‍্যায় সংবাদমাধ‍্যমে প্রকাশ করেছিল। তারা লিখেছিল যে গভীর রাতে রাজশাহী শহরে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় আমাকে র‍্যাব গ্রেফতার করে। আমার ওপর কী অমানবিকতা এবং কেন করা হয়েছিল তার বশত বিবরণ পাওয়া যাবে আমার লেখা বই “পেইন” এ। যা আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে (যেমন-এ‍্যামাজন)।
কেন এই নির্যাতন? রাজশাহীতে র‍্যাবের বিচার বহিভর্ূত হত‍্যাকান্ডের শিকার ওয়ার্কাস পার্টির নেতা মজনু শেখ, ছাত্রলীগ নেতা আহসান হাবিব বাবু, র‍্যাবের বিচারবহিভর্ূত নির্যাতনের শিকার কারারক্ষী সাহেবুল ইসলাম, মোহাম্মদ বেনজির (স্ত্রী ও শিশুকন‍্যার সম্মুখে নিজ শয়নকক্ষে) সহ আরও অনেক ঘটনায় আমি অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আমি তখন একাধারে কাজ করতাম দৈনিক সংবাদ, সিএসবি নিউজ এবং রেডিও জার্মান ডয়েচেভেলেতে। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার ওপর সন্ত্রাসী হামলা এবং চট্রগ্রামে দৈনিক প্রথম আলোর বিরুদ্ধে মৌলবাদি তৎপরতার বিরুদ্ধে আমি রাজশাহীতে কাফনের কাপড় পরে একক মৌন র‍্যালি করি। আমি মনে করি একজন সাংবাদিক কেবল সাংবাদিকই নন তার নৈতিক ও সামাজিক কতগুলি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকেই আমি এটা করেছি। ২০০২ সালে রাজশাহীর পুঠিয়ায় মহিমা ছাত্রদল ও শিবির ক‍্যাডারদের গণধর্ষণ ও তৎপরবর্তীকালে ধর্ষণদৃশে‍্যর নগ্ন ছবি জনসম্মুখে প্রকাশ করায় মহিমা আত্মহনন করেন। এরপর পুঠিয়ায় আরও একটি ধষর্ণ ঘটনা ঘটে। সেই ধর্ষণ ঘটনার নায়ক ছাত্রদল ক‍্যাডার হারুনের পিতা আবদুল জলিল ধর্ষিতার বাবাকে জিলাপির মধে‍্য বিষ মিশিয়ে খাওয়ায়ে হত‍্যা করে। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চলে। পরবর্তীতে আমি ঘটনার অনুসন্ধানী রিপোর্ট করলে প্রশাসন ধর্ষিতার পিতার লাশ কবর থেকে তুলে ভিসেরা করালে হত‍্যাকান্ডের ঘটনাটি ধরা পড়ে। সেই জলিলকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে র‍্যাব চাঁদাবাজির মামলা করায় ২০০৭ সালে এসে। আর ২০০০ সালে একটি সন্ত্রাসবিষয়ক রিপোর্টকে কেন্দ্র করে আজকের রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুল আলম লোটন আমাকে হত‍্যাপ্রচেষ্টা চালায়। ২০০২ সালে জাতীয় নেতার সন্তান ও রাজশাহীর বর্তমান মেযর খায়রুজ্জামান লিটনদের পারিবারিক ওয়াকফ এস্টেট “দেলোয়ার হোসেন ওয়াকফ এস্টেটের অভ‍্যন্তরে দুনর্ীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধানী রিপোর্ট করি দৈনিক সংবাদ এ। একইধরনের একটি রিপোর্ট পরিবেশন করি সিএসবি নিউজ’এ। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী আওয়ামী লীগের অভ‍্যন্তরীন কোন্দল, দ্বন্দ্ব আর পারিবারিকীকরণ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরিবেশন করি দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক মৃদুভাষণে। এসবের জের ধরে মেয়র লিটন তার চাচা লোটনকে দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির একটি ডাহা মিথ‍্যা কাল্পনিক অভিযোগ এনে জিডি করে ২০০৭ সালের জুন মাসে। যে অভিযোগটি তদন্ত করে পুলিশ কোন সত‍্যতা না পাওয়ায় তার অগ্রগামী করেনি। কিন্তু জরুরি অবস্থার সুযোগে লোটন পুনরায় একই অভিযোগ দাখিল করে সেপ্টেম্বর মাস ২০০৭ সালে। এরপর ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে যোগসাজস, র‍্যাব ও মেয়র লিটনের চাপে পুলিশ মামলাটি নিতে বাধ‍্য হয়। আমি হাইকোটর্ থেকে জামিন লাভ করি। পুঠিয়ার বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ বিশ্বাস তাড়ির ভাটি উদ্বোধন করাবিষয়ক একটি রিপোর্টকে কেন্দ্র করে সংবাদ এর তঃকালিন সম্পাদক বজলুর রহমান ও আমার নামে একটি মামনহানি মামলা করিয়েছিলেন। যে মামলায় আমরা খালাস পাই। কিন্তু জরুরি অবস্থায় ২০০৭ সালে একই ঘটনার উদ্ধৃতি দিয়ে আমার নামে চাঁদাবাজির মামলা করেন তিনি। ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদ এ “রাজশাহীতে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি” শীর্ষক একটি সংবাদ ছাপা হয়েছিল আমার নামে। যে ঘটনায় ভাল মন্দ সব সাংবাদিকই একত্রিত হয়ে আমাকে রাজশাহীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিলেন এবং আমাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার জন‍্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভালবাসা আর রিপোর্টংয়ের সত‍্যতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিষয়টির একটা সমাধান হয় ওই সময়ে।
এই তিন শক্তি তথা মেয়র লিটন, র‍্যাব আর কতিপয় অসৎ সাংবাদিক যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে ২০০৭ সালে আমাকে “দাগী সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ” হিসেবে আখ‍্যা দিয়ে ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে হত‍্যা করতে চেয়েছিল। আমাকে শারীরীকভাবে নির্যাতন করার পর জেলহাজতে পাঠানো হয় পুলিশের মাধ‍্যমে। সাধারণত: কোন বিচারক বা ম‍্যাজিষ্ট্রেটের সামনে হাজির না করে কাউকে জেলহাজতে পাঠানোর কোন বিধান নেই, এটা শুধু বাংলাদেশ নয় পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তারপরও আমাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। ২৪ অক্টোবর ২০০৭ সালের সেই সন্ধ্যায় যখন আমাকে বোয়ালিয়া থানায় হস্তার করে র‍্যাব তখন পুলিশ আমাকে রাজশাহীর আদালতে নিয়ে যায় কিন্তু সেখানে কোন ম‍্যাজিষ্ট্রেট বা বিচারক ছিল না সেদিন। রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের অস্বাস্থ‍্যকর পরিবেশে চোর, ডাকাত, খুনি, চাঁদাবাজ, জঙ্গি, রাজশাহী বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধ‍্যাপকবৃন্দ, সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, ব‍্যবসায়ী নেতা লুৎফর রহমানসহ বহ ভাল মানুষ (যারা জেল খাটছিলেন নানা কারণে) সবার সাথেই কাটিয়েছি ২৮টি অন্ধকার দিন। এরপর আদালতের নির্দেশে জেল থেকে বেরুতে পারলেও ষড়যন্ত্রকারির দল থেমে ছিল না। এদের কেউ কেউ উৎফুল্ল হয় মহাজোট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। ফলে প্রিয় দেশ, মাতৃভূমি ছেড়ে ২০০৯ সালে চলে আসলাম জার্মানিতে। ওরা আমার জীবনটাকেই বদলে দিল, বর্তমানের এই জীবন আমার কাছে প্রত‍্যাশিত ছিল না কোনদিনই।
পুলিশের মধে‍্য দুর্নীতি, অদক্ষতা, অবহেলা আছে সত‍্য। কিন্তু তারমানে এই নয় যে পুলিশের অবহেলার কারণেই সাংবাদিক হত‍্যারহস‍্যগুলি উন্মোচিত হচ্ছে না কিংবা সাংবাদিক হত‍্যা মামলার সাথে জড়িতরা খালাস পাচ্ছে। মূল কারণটা অন‍্যজায়গায়। সেটা হলো অসুস্থ‍্য রাজনীতি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর দলীয়করণ। আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার আর গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবে সাংবাদিক হত‍্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলির যথাযথ তদন্ত, কারণ উৎঘাটন হচ্ছে না। আমরা যে সমাজ ব‍্যবস্থায় বসবাস করি (বাংলাদেশে) সেখানে সিস্টেমগুলি বা প্রতিষ্ঠানগুলি চলতে পারে না স্বাধীনভাবে। সবজায়গায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আর চাপ। এসবের কারণেই পুলিশ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে এগুতে পারছে না বলে আমি মনে করি। পুলিশ যদি আজ স্বাধীনভাবে কাজ রতে পারতো তাহলে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখতে পেতাম আজকের বাংলাদেশে। এরপরও আছে নানান বৈষম‍্য। র‍্যাব যে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে তা কিন্তু পুলিশ পায় না। সর্বশেষ এবং সাড়াজাগানো জোড়া সাংবাদিক সাগর-রুনির খুনের ঘটনাটাই ধরুন। পুলিশ বললো তারা সবকিছুই পেয়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা ইউটার্ণ গ্রহণ করলো। কিন্তু কেন? পুলিশের কী স্বার্থ এখানে। এখানে হয়ত সরকারের কোন বিশেষ মহল, ব‍্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে সাগর-রুনি হত‍্যাকারি বা হত‍্যাকারিদের! নাহলে সরকারের প্রধান হয়ে কেউ কী এটা বলতে পারে যে, “সরকারের পক্ষে কারও বেডরুম বা শয়নকক্ষ পাহারা দেয়া সম্ভব নয়।” দেশের প্রধানমন্ত্রি যখন এই কথা বলেন তখন খুনিরাতো উৎসাহিত হবেই পুলিশও দায়িত্ব পালনে বা দুর্নীতির আশ্রয় নিতে সুযোগ পেয়ে যায়।
যদি আপনার কোন দলীয় পরিচয় থাকে কিংবা স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাতে পারেন, তো নো প্রবলেম। অথবা সাদা হোক আর কালা হোক আপনার অনেক অর্থ থাকলেও আপনি নিরাপদে থাকতে পারেন। আর যদি সততা এবং সত‍্য প্রকাশের যে মহান ব্রত বা পেশাগত দায়িত্ব সেই জায়গাটাতে নির্ভিক ও আপোষহীন তথা মেরুদন্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গেলে সাংবাদিকের বিপদ অবশ‍্যম্ভাবী, তাহলে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে-এব‍্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। এইকথাগুলি কিন্তু আমার হতাশার জায়গা নয়, প্রচন্ড ক্ষোভ আর কষ্ট থেকেই এসব কথা বলতে বাধ‍্য হচ্ছি আমি। গণতন্ত্র যদি সতি‍্যকার অর্থে চর্চিত হয় দেশে আইনের শাসন আপনাআপনি কার্যকর হবে। আর একটা গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ‍্যমও তার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গণমাধ‍্যমের ভেতরের যে সংকটগুলি আছে তাও দূরীভূত হবে। কাজেই আমি বলবো কী করলে দেশের রাজনীতি সুস্থ‍্য ধারায় ফিরবে, দুনর্ীতি-দারিদ্রতা হ্রাস পাবে আইনের শাসন, ন‍্যায়বিচার তথা গণতন্ত্র কার্যকর হবে সেদিকটাতেই আমাদের সবার একযোগে দেশাত্ববোধ বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নইলে কোন মানুষেরই জীবন ও পেশা নিরাপদ হবে না। বিভাজন আর অসত‍্য থেকে আমাদের সববাইকে সরে আসতে হবে। এই কাজটি খুবই কঠিন, তবুও পরিবর্তনের পথে আমাদের হাঁটতেই হবে।
উল্লেখ‍্য এই লেখাটি যখন আপলোড করছি তখন বাংলাদেশে হাইকোর্ট সাংবাদিক সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিকদের নসিহত করে একটি রুল জারি করেছে। এবিষয়ে আমার প্রতিক্রিয়া জানাবো পরবর্তী লেখায়। ছবি-ইন্টারনেট/গুগল থেকে নেয়া। দুবর্ৃত্তদের বোমা হামলায় নিহত দেশপ্রেমিক সাংবাদিক মানিক সাহার নিথর দেহ পড়ে আছে রাস্তার ওপর। না এটা মানিক সাহার লাশ নয় যেন বাংলাদেশ পড়ে আছে। সেই খুনি, খুনের পরিকল্পনাকারীরা কী কেউ ধরা পড়েছে আজও, বিচারতো অনেক দূরের কথা। http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de,

সাগর-রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ড ।। পরিকল্পিত খুন হচ্ছে ডাকাতি, আসল খুনিরা বেঁচে যাচ্ছে!


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। “ডাকাতির ঘটনাটি যাতে বিশ্বাসযোগ‍্য হয় সেজন‍্য পর্যাপ্ত সাক্ষ‍্য-প্রমাণ, আলামত প্রয়োজন। এজন‍্য ডাকাতদের গ্রেফতারের পাশাপাশি লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।” বাংলাদেশের অন‍্যতম জনপ্রিয় জাতীয় বাংলা দৈনিক জনকণ্ঠ ২৮ ফেব্রুয়ারি সংখ‍্যায় এক রিপোর্টে গোয়েন্দা সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে উপরোক্ত বক্তব‍্যটি প্রকাশ করেছে।
দেশের একটি প্রাচীন প্রগতিশীল বাংলা দৈনিক সংবাদ এর একই দিনের রিপোর্টে বলা হয়, “গ্রেফতারকৃতদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে ঘটনার দায়-দায়িত্ব চাপানোর চেষ্টাও প্রায় শেষ পর্যায়ে। তাদের মিডিয়ার সামনে কথা বলার উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে। ঘটনার বর্ণনা কিভাবে দিতে হবে, তাও প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। শিখিয়ে দেয়া মুখস্থ বুলি মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করবে গ্রেফতারকৃতরা। সংঘবদ্ধ চোরের দল সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে ভেতরে ঢোকে। তারপর বাসায় চুরি করতে বাধা দেয়ায় খুন করা হয় সাংবাদিক দম্পতিকে। তারপর ওই কাটা অংশ দিয়েই পালিয়ে যায় চোরের দল।”
সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির নৃশংস হত‍্যাকান্ডের ঘটনার ১৭ দিনের মাথায় সরকারের তরফ থেকে এমন বক্তব‍্য প্রদান করলো গোয়েন্দারা। অথচ হত‍্যাকান্ডের পরপরই সাগর-রুনির ঘরের কাটা জানালা দিয়ে একটি বাচ্চাও বের হবার মতো কোন সম্ভাবনা নেই বলে গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্তারা জানিয়েছিল। একটা অসভ‍্য, জংলি ও বর্বর সমাজ ও রাষ্ট্রেই এমন ডাহা কাল্পনিক সাজানো কল্পকাহিনী ও মিথ‍্যাচার শোভা পায়। আমাদের স্বদেশ কী সেই মধ‍্যযুগীয় বর্বরযুগ অতিক্রম করছে? সবকিছুই ভন্ড আর বেঈমানদের কব্জায় এখন আমাদের স্বদেশ! এটা বোঝার আর বাকি রইলো না যে হাসিনার নির্দেশে পুলিশ ও গোয়েন্দারা এই ‘মহানাটক’ মঞ্চায়নের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে। হাসিনার নিদর্েশে ডাকাতদলের হাতে খুনের মহানাটক মঞ্চায়নের এই সাজানো ঘটনাকে কী দেশের মানুষ মেনে নেবেন? নাকি তারা জেগে ওঠবেন সকল অনৌ‍্যায়-অবিচার আর অমানবিকতার বিরুদ্ধে। সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দেশের মানুষের প্রশ্ন কী এমন সম্পকর্ খুনি বা খুনিদের সঙ্গে এই সরকার তথা সরকারপ্রধানের? যার কারণে খুনিদের রক্ষা করে সাগর-রুনির আত্মাকে কষ্ট দিয়ে এবং শিশুসন্তান নিষ্পাপ মেঘের প্রতি অবিচার করার মতো নিষ্ঠুরতা প্রমাণ করতেও দ্বিধা করছে না সরকার! কী কারণে হাসিনা ও তার সরকারের বুদ্ধিদাতা, দলীয় বুদ্ধিজীবীরা এখনও চুপচাপ বসে এই অমানবিক অবিচারের পথ রুখতে তৎপর হচ্ছে না, সেটা আমাদের বোধগম‍্য নয়।
সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ডান-বাম, উত্তম-মধ‍্যম সকল শ্রেণীর সাংবাদিক একজোট হয়েছে। সাগর-রুনি হত‍্যাকান্ডের খুনিদের গ্রেফতার এবং বিচারের দাবিতে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথিতযশা প্রবীণ সাংবাদিক এ বিএম মুসা ও নির্মল সেন শারীরীকভাবে অসুস্থ‍্য হবার পরও এই আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন। সাংবাদিকদের এই আন্দোলন কেবল সাগর-রুনির খুনিদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবির সঙ্গেই জড়িত নয় এটা সাংবাদিকদের জীবন ও পেশার মযর্াদা এবং মানুষের স্বাভাবিক মৃতু‍্যর নিশ্চয়তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।
অবিচার, মিথ‍্যাচার আর দুবর্ৃত্ত রাজনীতির শৃঙ্খল ভাঙতে না পারলে স্বদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে কী বিশ্বদরবারে? সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা ঐক‍্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ কী পারবে ঘুরে দাঁড়াতে এই দুবর্ৃত্তায়নের আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে? এই নবঐক‍্য কী পারবে জনগণকে ন‍্যায়বিচারের পথ দেখাতে? নাকি আবারও হাসিনা আর খালেদা এই দুইশিবিরে বিভক্ত হয়ে জনগণের ভরসাস্থলটি ভেঙ্গে পড়বে? সাগর-রুনির হত‍্যাকান্ড যে কোনভাবেই একটা নিছক ডাকাতির ঘটনা ছিল না তা সরকার বুঝলে ভালো, নইলে আখেরে হাসিনাকেই তার মাশুল দিতে হবে! এতে মানুষের কোন প্রশ্ন নেই।
পরিকল্পিত খুন হচ্ছে ডাকাতি। আসল খুনিরা বেঁচে যাচ্ছে। এমন পথের দিশাই হয়ত সরকার জাতির সামনে প্রকাশ করবে শিগগিরই। যে নিরীহ ও অসহায় মানুষগুলিকে ধরে এনে সরকার সাগর-রুনির খুনি বানানোর চেষ্টা করছে তাদের পরিবারগুলির কী অবস্থা হবে? এই অবিচার দেশের ১৬ কোটি মানুষ সহ‍্য করতে পারে, দেশের মিডিয়াগুলি চুপচাপ থাকতে পারে কিন্তু প্রকৃতি এই অবিচার সইবে না! সাগর-রুনির লাশ-ছবি আমার দেশ থেকে নেয়া।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা


জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ॥ বাঙালি সমাজ ও ইউরোপীয়ান সমাজ-সংস্কৃতির মধ্যে তফাত অনেক। একটা পরিবেশে বেড়ে ওঠার পর আরেকটা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াটা সহজ নয়। ফলে একজন বাঙালির নি:সঙ্গ প্রবাস জীবন খুবই কষ্টের। জার্মানির এক বছরের জীবনে বহু বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়েছে। পরিচয় ঘটেছে অনেকের সঙ্গে। কিন্তু সম্পর্কের দৃঢ়তা বা গভীরতা খুব কম জনের সাথেই হয়েছে। আবার বাঙালি সমাজে বেড়ে ওঠা মানুষ আমরা। আমাদের মধ্যে হিংসা, জেলাসি, পরনিন্দা এসব দ্রুত ডালপালা ছড়ায়। রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর পছন্দ-অপছন্দের ওপর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবার এসব কর্মকান্ডের ওপর পারস্পরিক সম্পর্কে চিড় ধরে। বাঙালিরা সচরাচর কর্মের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণকর দিক নিয়ে কারও মূল্যায়ণ করেন না। কে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত? সেটার ওপরই নির্ভর করে অনেকে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।
বাস্তব জীবনে এটার সত্যতা অনুবাধন করলাম এই প্রবাসে এসে। ব্যতিক্রম যে নেই তা বলতে পারি না। এক্ষেত্রে জীবন্ত উদাহরণ দিতে পারি আবদুল্লাহ-আল হারুনের। যিনি তিন দশক যাবত জার্মানে বসবাস করছেন। তার মত মানুষদেরকে বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! অথচ যিনি বাংলাদেশকে অনেক কিছু দিতে পারতেন। যা থেকে বাঙালি সমাজ বঞ্চিত হলো। তিনি যদি বাংলাদেশে থাকতেন হয়ত আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন কিংবা হুমায়ূন আহমেদকে ছাড়িয়ে যেতেন? কিংবা খ্যাতিমান প্রয়াত নাট্যকার আবদুল্লাহ-আল মামুনের খ্যাতিকেও ছাপিয়ে যেতে পারতেন তার কর্মগুণে? আবদুল্লাহ-আল হারুন অবশ্য তারই অনুজ সহোদর। আবার কেউ যদি রাষ্ট্রীয় বাহিনী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী অংশের অপছন্দের হন। অথবা যিনি ডান পক্ষেও নেই আবার বামপক্ষেরও নন। বাঙালি হিসেবে তার মত অভাগা বোধহয় এজগতে আর কেউ নেই। বাংলাদেশের মত সমাজে রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকলে টিকে থাকা খুবই কঠিন।বছর দুয়েক আগে জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় আমাকে এই সত্যটা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনালের এক সুহৃদ।
যাহোক, আজকের লেখার প্রসঙ্গ এটা নয়। লেখক আবদুল্লাহ-আল হারুন প্রবাস জীবনে আমার একজন বড় বন্ধু, অভিভাবক। তার সাথে আমার বয়সের দিক ধরলে বলতে হবে পিতা-পুত্রের মত সম্পর্ক। তার মাধ্যমেই কানাডা প্রবাসী সাংবাদিক শওগাত আলী সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে আমার। তিনি অনলাইন সংবাদপত্র নতুন দেশ এর প্রকাশক এবং তার স্ত্রী সেরিন ফেরদৌস সম্পাদক। উভয়ই পেশাদার সাংবাদিক। বাংলাদেশে থাকতে কারও সঙ্গেই আমার সরাসরি যোগাযোগ হয়নি কোনদিন। কিন্তু উভয়ের রিপোর্টই আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতো। তাদের রিপোর্টের সঙ্গে ছিল আমার এক ধরণের গভীর সম্পর্ক। বর্তমানে তারা উভয়ে কানাডায় বসবাস করছেন। নতুন দেশে প্রকাশিত আবদুল্লাহ-আল হারুনের একটি লেখা সম্পর্ক ইতিবাচক মন্তব্য করি। এটা করতে গিয়ে শওগাত ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ই-মেইল যোগাযোগের মাধ্যমে। খুব বেশিদিনের কথা নয় এটি। ২০১০ সালের মার্চের ১০ কিংবা ১২ তারিখে প্রথম যোগাযোগ সাগর ভাইয়ের সঙ্গে। নতুন দেশ পত্রিকার প্রথম বর্ষ সংখ্যা ৩৮, ২১ এপ্রিল, ২০১০ সংখ্যায় একটি লেখা ছাপা হয় জনৈক আবুর রহিম মজুমদারের নামে। শিরোনাম ছিল বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন।
ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন সংক্রান্ত যেকোন ধরণের রিপোর্ট বা লেখার প্রতি আমার আগ্রহ একটু বেশি। তাই লেখাটি মনোযোগ আকর্ষণ করে আমার। কিন্তু প্রথম প্যারা পড়ার পরই লেখার সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক মনে হতে লাগলো। এবং লেখাটি পুরো একবার পড়ার পরই বুঝতে পারি এটা আমার লেখা। হুবহু এই লেখাটিই ভিন্ন শিরোনামে ছাপা হয় বাংলাদেশের প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদ এ। আমার লেখাটি ছাপানো হয় অন্য নামে। ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার লেখাটির শিরোনাম ছিল “সাহসী সাংবাদিক শামছুর রহমান হত্যা দিবস এবং বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন”। দ্রুত একটা ই-মেইল পাঠালাম সাগর ভাইকে। তিনি স্বস্তিমূলক একটা উত্তর দিলেন তড়িৎ বেগে। তারপরেই দেখা গেলো লেখাটি ডিলিট করে দেয়া হয়েছে। আমি যদি কারও লেখা হুবহু নকল করে নিজের নামে কোথাও পাঠাই। তবে কোন সম্পাদক-বার্তা সম্পাদক বা প্রকাশকের পক্ষেই তা আঁচ করা সম্ভব নয়। যদি না সংশ্লিষ্ট লেখাটি সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান বা ধারণা না থাকে। নকল বা চুরির বিষয়টি তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষপে নিশ্চিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেটা বাস্তবে করে দেখালেন প্রিয় শওগাত ভাই ও সেরিন আপা। পেশাদারি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটা একটা নজির। ধন্যবাদ নতুন দেশ কর্তৃপক্ষকে। নতুন দেশ পরিবারের সাথে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করি আমি। আশা করি এই সম্পর্কের ধারা বহমান রইবে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল ও প্রিয় পাঠকদের কাছে বাংলাদেশের প্রেসফ্রিডমের একটা চিত্র তুলে ধরতে চাই। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান হয়েছে মাত্র। তখন আমি কলেজে পড়ি। শিক্ষানবিশ রিপোর্টার হিসেবে দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড় থেকে কাজ করি দৈনিক বাংলায়। তখনই দৈনিক বাংলা কার্যালয়ে পরিচয় দু:সাহসী দেশপেমিক সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় শামছুর রহমান কেবলের সঙ্গে। ১৬ জুলাই তাঁর হত্যাবার্ষিকী। ২০০০ সালের এই দিনে দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করে বুলেটের আঘাতে। তখন তিনি দৈনিক জনকণ্ঠে কাজ করেন যশোর থেকে। প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন করার লক্ষ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এরপর দৈনিক বাংলা ছেড়ে যোগ দিই দৈনিক সংবাদে। তখন পরিচয় হয় সাংবাদিক মানিক সাহার সঙ্গে। খুলনা থেকে তিনি সাংবাদিকতা করতেন। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভয়াবহ সন্ত্রাস, তান্ডব দেশবাসিকে ভাবিয়ে তুলতো। এই অপশক্তি আমাকে বারবার হত্যার হুমকি দেয়। মানিক সাহা বলতেন, ”আকাশ বেশি রিস্ক নিও না। সাবধানে থেকো। ওরা (শিবির) খুব ভয়ংকর।” এই অকুতোভয় জনদরদী সাংবাদিক আর নেই আমাদের মাঝে। বোমার আঘাতে এই দেশপ্রেদিকের মাথার খুলি উড়িয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তচক্র। আজও জ্বল জ্বল করে ভেসে ওঠে মানিক সাহার সেই রক্তাক্ত ছবিটা। তার মাথার মগজ সেদিন উড়ে গিয়েছিল বোমার আঘাতে। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়েছিল তার দেহটা। রাস্তার ওপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহ যেন গোটা বাংলাদেশ। পর্শিয়া ও নাতাশাতো আর কোনদিন বাবা ডাকতে পারবে না। মানিক সাহার দুই কন্যা। নন্দা বউদির চোখের জল মুছে গেছে। কিন্তু হৃদয়ের যে ক্ষরণ তা কী কোনদিন বন্ধ হবে?
মুক্ত গণমাধ্যমতো পরের কথা সাংবাদিকদের জীবনেরই কোন নিশ্চয়তা নেই। সন্ত্রাস, রাজনীতি ও সমাজনীতির সব তথ্যের জীবন্ত ভান্ডার ছিলেন কেবল ভাই। বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জীবনে দিন যায়, মাস যায়, বছর ঘুরে নতুন বছর আসে। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের বিচার হয় না। দেশে ”সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক” নামধারী একটা নির্বাচিত সরকার আছে। এটা আবার মহাজোট সরকার নামে বেশি পরিচিত। কিন্তু সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বন্ধ করা যায়নি বিনা বিচারে মানুষ হত্যা। একটি বাংলা প্রবাদের কথা মনে পড়ে গেলো। “নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো”। এই অবস্থা যাদের তাদের কোন গত্যন্তর নেই এই জোট (এরশাদ ছাড়া) এর বিপক্ষ শক্তিকে সমর্থন দেয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী শেখ হাসিনা এটা ভালো করেই জানেন। তাইতো চোখ মুখ বন্ধ করে নাগরিক সমাজ বলে পরিচিত শিক্ষিত সমাজ সব অন্যায়-অবিচার হজম করে চলেছেন। জানিনা, কবে এটা আবার বদহজমে পরিণত হয়? অবস্থাটা সেদিকেই যাচ্ছে। বিবেকবোধ, বুদ্ধি, বিচার সবই যেন ভোতা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ:! রাজনীতি, রাজনৈতিক দল এবং পছন্দের নেতা-নেত্রীর কাছে হারিয়ে যাচ্ছে বিচারবোধ।
মনে হয় আমি ভিন্নপথে চলে যাচ্ছি। এবার গণমাধ্যম এর কলা-কুশীলবরা কেমন আছেন আমাদের মাতৃভূমিতে? তা পরখ করে নেয়া যাক। দেখতে দেখতেই চলে গেলো ফরিদপুরের সাংবাদিক গৌতম দাস, বগুড়ার দীপংকর চক্রবর্ত্তী, খুলনার হারুন রশিদ খোকনসহ বহু সাংবাদিক হত্যা দিবস। আদালতে আত্মসমর্পণকারি একজন অভিযুক্ত খুনি (গৌতম হত্যার) কী করে পালিয়ে যায়? এটা আমাদের জানা নেই। তবে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার আছে বলে মনে হয় না। থাকলে অন্ত:ত সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন বন্ধ হতো। বিচার পেতো নির্যাতিত ও নিহত সাংবাদিক পরিবারগুলো।
গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যম স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না। মানবাধিকারও থাকে না। অসাম্য আর অন্যায্যের পৃথিবীতে সাংবাদিকতা দিন দিন ঝঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত ও অশান্ত দুনিয়ায় সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন নতুন কোন বিষয় নয়। তাইতো বিশ্বময় প্রেসের স্বাধীনতা তথা প্রেস ফ্রিডম বা মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য আওয়াজ তীব্র হচ্ছে ক্রমশ:। এই আওয়াজ গণমাধ্যমের গন্ডি পেরিয়ে নাগরিক সমাজের বৃহৎ অংশকেও টানতে সক্ষম হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র অসহায়। গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র একে অপরের পরিপুরক। বিশ্বে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার ঝুঁকিটা চরমে পৌঁছেছে। আর বাংলাদেশেতো প্রায় প্রতিনিয়ত সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম রাষ্ট্রযন্ত্রের খবরদারি, নিপীড়নের মধ্যেই আছে।
জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে রক্ষা করা গণমাধ্যমের প্রধান কাজ। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। অধিকারহারা শোষিত বঞ্চিত অসহায় মানুষদের পক্ষে গণমাধ্যম সর্বদা সোচ্চার। সমাজপতি, রাষ্ট্রনায়কদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার মহান দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম। সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে সাংবাদিকরা শত প্রতিকুলতার মধ্যেও কাজ করছেন। বাংলাদেশে দুই তিন সরকারের আমলে তিনিটি জনপ্রিয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে। সাবেক সেনানায়ক প্রয়াত জিয়াউর রহমানের পত্নী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ডানপন্থি “মোল্লা জোট” ২০০২ সালে বন্ধ করে একুশে টেলিভিশন। যেই একুশে টেলিভিশন বাংলাদেশে টিভি সাংবাদিকতায় এক বৈপ্লবিক পরির্তনের সুচনা করেছিল। অবশ্য পরবর্তীতে একুশে টিভি নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে টেরিস্টোরিয়াল সুবিধা ছাড়াই। তথাকথিত দুর্নীতিবিরোধী সরকার নামে পরিচিত ফখরুদ্দীন-মঈন উ আহমেদের সেয়া নিয়ন্ত্রিত সরকার বন্ধ করে দেশের প্রথম ২৪ ঘন্টার নিউজ টিভি চ্যানেল সিএসবি নিউজ। নানান ছলছুতোয় গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরার ঘোড়দৌড়ে বর্তমান সরকারও পিছিয়ে নেই। এই সরকারও বন্ধ করে দিলো বিরোধীমতের মালিকানাধীন টিভি চ্যানেল ওয়ানের সম্প্রচার। হাসিনা সরকার সম্প্রচারের আলোর মুখ দেখতে না দেখতেই বন্ধ করলো যমুনা টেলিভিশনের পরীক্ষামূলক সম্প্রচার। এই সরকার অর্তীতের সরকারগুলির তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে আরো বন্ধ করলো বিরোধীমতের সংবাদপত্র দৈনিক আমার দেশের প্রকাশনা। নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার করা হলো এই পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। বিচারালয়ের অভ্যন্তরের দুর্নীতি ও অনিয়মের রিপোর্ট প্রকাশ করার দায়ে এই সম্পাদককে ছয় মাসের কারাদন্ডও দেয় আমাদের অন্ধ ও দুর্নীতিযুক্ত বিচার ব্যবস্থা।
দুর্নীতি, রাজনৈতিক সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্ব ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা লুটপাট নিয়ে খবর বেরুলেই হলো। সাংবাদিক আর যায় কোথায়? সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের খবর হয়ে যাবে। একই কারণে সাংবাদিককে মন্ত্রি-এমপিদের অথবা রাজনৈতিক প্রভাবশালি মহলের খপ্পড়ে পড়তে হবে। গণমাধ্যমকর্মীদের, প্রভাবশালিদের রোষানলে পড়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। হত্যা-নির্যাতন, হয়রাণি, গ্রেফতার, মিথ্যা অভিযোগে মামলা দায়ের স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে বন্ধুর করে তুলেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকদের জন্য জীবন খুব বিপদজনক। কারণ সাংবাদিকরা মানুষের কথা বলেন। মানুষের বিপদ হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে গণমাধ্যম। রাজনৈতিক দূর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি-দু:শাসনের কথা তুলে ধরেন সাংবাদিকরা। ফলে সাংবাদিকদের উপরেই সবচেয়ে বেশি নিগ্রহের কষাঘাত এসে পড়ে। যেসমস্ত সাংবাদিক বা মিডিয়া মানুষের নিগ্রহের বিরুদ্ধে কথা বলতে চেষ্টা করেন। কিংবা যারা মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তাদের উপরেই সবচেয়ে বেশি অত্যাচার নেমে আসে। এখানে আমরা উদাহরণ দিতে পারি একুশে টেলিভিশন (বন্ধ হবার আগেকার একুশে টিভির কথা বলা হচ্ছে) এবং সিএসবি নিউজ এর। একুশে টিভি এবং সিএসবি নিউজ এই দু’টি টিভি চ্যানেল ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন ছল-ছুতোয় সরকার এই বৃহৎ দু’টি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও আদালতের রায়ের মাধ্যমে পরে একুশে টেলিভিশন পুনরায় চালু হয়েছে। বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডম এর খবর হলো আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। সরকার টেলিযোগাযোগ আইন লংঘন’র অভিযোগে চ্যানেল ওয়ান এর সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় ২৭ এপ্রিল, ২০১০ সন্ধ্যায়। (সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ২৮ এপ্রিল, ২০১০)। একই দিনের সংবাদ’ এর দেশ পাতায় আরেকটি খবরের শিরোনাম হলো ”মানিকগঞ্জ সংবাদ প্রতিনিধিকে পৌর মেয়রের প্রাণনাশের হুমকি: থানায় জিডি”। রিপোর্টের ভাষ্য মতে, দুর্নীতি বিষয়ক একটি অভিযোগের বিষয়ে মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা রমজান আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন সাংবাদিক মুহম্মদ আবুল কালাম বিশ্বাস। এসময় মেয়র সাংবাদিককে বলেন, ”তুই যদি আর পত্রিকায় আমার ও আমার পরিবার নিয়ে কোন সংবাদ প্রকাশ করিস তবে তোকে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। আগেও তুই আমার ভাইকে নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করেছিস। আমি তখন আমার লোকজন নিয়ে তোকে খুঁজেছি, কিন্তু তোকে পাইনি। তাই তুই প্রাণে বেঁচে গেছিস। পত্রিকায় আর যদি কোন সংবাদ আমাকে নিয়ে লিখিস, তাহলে আমি তোর ও তোর পরিবারের ক্ষতি করবো।”
বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের শেষ নেই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন যেন এক মামুলি ব্যাপার সেখানে। ময়মনসিংহের গফরগাঁয়ে দৈনিক সমকালের বিপ্ল­বের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হয় জোট সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য সরকার দলীয় একজন সাংসদের প্রত্যক্ষ মদদে এ ঘটনা ঘটেছে বলে সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ। সেই ঘটনার সর্বশেষ কী অবস্থা তা আমরা আজও জানি না। ঢাকার উত্তরায় একজন তরুণ কমিউনিটি বেইসড একটি পত্রিকার তরুণ রিপোর্টার নূরুল ইসলাম রানা খুন হয়েছেন। এটা ২০০৯ সালের ৩ জুলাইয়ের ঘটনা। আর জরুরি অবস্থায় এই লেখক (জাহাঙ্গীর আলম আকাশ) ছাড়াও দ্য ডেইলি স্টারের তাসনীম খলিল নির্যাতিত হন সেনাবাহিনী ও প্যারামিলিটারি ফোর্সের হাতে। জরুরি অবস্থা চলাকালে সিলেট, বান্দরবান, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংবাদিদের বিরুদ্ধে হয়রাণিমূলক মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর সামরিক শাসন দেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। বহু লড়াই-সংগ্রাম আর আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটে। মুক্তি পায় গণতন্ত্রের পায়রা। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পায় স্বাধীনতার পুন:স্বাদ। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্টিত হয় জেনারেল জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি। ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেয়। সরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা, গণমাধ্যম থেকে বিএনপির কাছে ‘অপছন্দনীয়’ সাংবাদিকরা গণছাঁটাইয়ের শিকার হন। কোন রকমের টার্মিনেশন বেনিফিট ছাড়াই বিএনপি সরকার ছাঁটাই করে দৈনিক বাংলার তৎকালীন সম্পাদক তোয়াব খান, তৎকালীন সাপ্তাহিক বিচিত্রার নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার কবিরসহ ১৪ জন সিনিয়র সাংবাদিককে। ২০০২ সালের নভেম্বর মাসের কথা। বিবিসি চ্যানেল ফোরের জন্য একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন বিদেশী সাংবাদিক জাইবা মালিক ও ব্র“নো সরেনটিনো। এই ’অপরাধে’ বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করে। ব্রিটিশ ও ইতালীয় এই দুই সাংবাদিকসহ বাংলাদেশের শাহরিয়ার কবির, সালিম সামাদ ও পিসিলা রাজকে গ্রেফতার করা হয়। ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এর সাথে জড়িত করে গ্রেফতার করা হয় বাসস’র সাংবাদিক এনামুল হক চৌধুরী ও বিশিষ্ট কলামিষ্ট ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুনকে। আটকাবস্থায় বিএনপি সরকার সাংবাদিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল বলে অভিযোগ।
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকের ঘটনা। দৈনিক সংবাদের ধামরাই প্রতিনিধি শামীম পারভেজ খানকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় দুর্বৃত্তরা। এলাকার নিরীহ লোকদের বিভিন্ন মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচতে সহায়তা করার করেন এই সাংবাদিক। এতেই ক্ষুব্ধ হয় স্বার্থান্বেষী মহল। হুমকির বিষয়ে থানায় জিডি হলেও সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার হয়নি। একই মাসের শুরুর দিকে ঘটে আরেক ঘটনা ময়মনসিংহে। গফরগাঁওয়ে দৈনিক সমকাল প্রতিনিধি শামীম আল আমিন বিপ্ল­বের ওপর আক্রমণ করা হয়। সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন গিয়াসউদ্দিন আহমদ এর ক্যাডার বাহিনী বিপ্ল­বের হাত-পা ভেঙ্গে দেয়। ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর বাড়ির ভেতরে বর্বর নির্যাতনের শিকার হন সাংবাদিক এফ এম মাসুম। প্যারামিলিটারি ফোর্স সদস্যরা তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করে। তিনি নিউ এজ পত্রিকার রিপোর্টার। এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়ে রিপোর্ট করেছিলেন। যার কারণে তাকে নির্যাতিত হতে হয়।
২০০৬ সালের ১৬ এপ্রিল মাস। চট্রগ্রামে বাংলাদেশ ও অষ্ট্রেলিয়ার মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ চালায় নির্মমতা। পুলিশ বাহিনী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। পুলিশের তৎকালীন ডিসি আলী আকবরের নেতৃত্বে অন্ত:ত ৩০ জন সাংবাদিক আহত হন। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায় নিযুক্ত প্রবীণ আলহাজ্ব জহিরুল হক। তাকেও সেদিন পুলিশ যেভাবে আক্রমণ করেছিল তা কোন সভ্য সমাজে ভাবাই যায় না। পুলিশ রাইফেলের বাঁট দিয়ে সাংবাদিকদের পিটিয়েছে। সাংবাদিক সমাজের আন্দোলন তুঙ্গে এই ঘটনার প্রতিবাদে। তখন তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ঘটনা তদন্তে বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করেছিল। সেই রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি। হামলাকারী পুলিশ কর্মকর্তাসহ অন্যান্যরা কেউই শাস্তি পাননি আজও। ২০০৬ সালের ২৯ মে। কুষ্টিয়ায় তৎকালীন সরকার দলীয় সেখানকার সংসদ সদস্য সাংবাদিকদের ওপর লেলিয়ে দেয় সন্ত্রাসী। সেই ক্যাডার বাহিনী হামলা করে সাংবাদিকদের সমাবেশে। নির্যাতনবিরোধী ওই সমাবেশে হামলায় গুরুতর আহত হন বিশিষ্ট সাংবাদিক বাংলাদেশ অবজারভার সম্পাদক জনাব ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমাদের স্মৃতিতে আজও সেই রক্তাক্ত ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ছবি ভেসে ওঠে। সন্ত্রাসী ক্যাডারদের কোন শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
সাংবাদিকতাই আমার পেশা এবং নেশা। সার্বক্ষণিক ধ্যাণ, চিন্তা-চেতনার মধ্যেই আছে আমার সাংবাদিকতা। মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা। জনকল্যাণ ভাবনা। মানুষের ওপর যে অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার। এসব নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই হলো আমার জীবনের জন্য কাল। নন পার্টিজানশিপ সাংবাদিকতা করার এবং সর্বদাই ইনভেষ্টিগেটিভ জার্নালিজম করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি কখনই ভাবতে পারি না নির্যাতিত হবো নিজেই। কল্পনাও করিনি কোনদিন এমনটা। অন্যায়-অবিচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে নিজেই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার শিকার হলাম। অন্যায়-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমি রিপোর্ট করেছি। সেইরকম নির্যাতনই আমার জীবনটাকে পাল্টে দেবে? এটা ভাবনায় ছিল না আমার। আজকে আমি একটা কঠিন বাস্তবতা কিংবা সত্যের মুখোমুখি। এক ধরনের একটা অনিশ্চয়তা একটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে আমার জীবনটাকে। আমি জানি না এ অবস্থার অবসান হবে কিনা? কারণ আমরা একটা অসভ্য-বর্বর সমাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছি। একটা অপশক্তি এই সমাজকে সবসময় অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে চায়। যে অপশক্তি দিন দিন সমাজকে আবৃত করে ফেলছে। আমরা জানি, শত হয়রাণি, নির্যাতন ও হুমকিতেও জনজোয়ারের ঢেউ আটকানো যায় না। তেমনি কোন কোন মানুষকে আদর্শচ্যুত করা যায় না। অত্যাচার, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও অপশক্তি কখনই সত্যকে নিভিয়ে দিতে পারে না। তেমনি বাংলাদেশের সত্যান্বেষী কলম সৈনিকদেরর দমানো যাবে না হত্যা-নির্যাতন করে। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের যে বাস্তবতা তাতে আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যেই নির্যাতন জড়িয়ে আছে। অত্যাচার বা নিপীড়ন বিষয়টা শক্তভাবে গ্রোথিত। মানুষ খুব স্বাভাবিকভাবেই (ব্যতিক্রম ছাড়া) নিয়েছে রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্রসফায়ারের মত মানব হত্যার জঘন্য ঘটনাকে। পুলিশ, প্যারামিলিটারি ফোর্স বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হেফাজতে হত্যা-নির্যাতন একটা সাধারণ ব্যাপার। নির্যাতনের প্রেক্ষিতে মৃত্যুর পরও সমাজ কোন উচ্চবাচ্চ করে না। সরকার সবসময় এসব অপকর্মকে বৈধতা দিয়ে আসছে। অন্যকথায় দায়মুক্তি দিচ্ছে। নির্যাতনকারি-খুনির দল হচ্ছে পুরস্কৃত। এখানে মিডিয়ার ভূমিকাও প্রশ্নবোধক। মিডিয়া তোতাপাখির ন্যায় ক্রসফায়ার বা বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের পক্ষ নিচ্ছে। মিডিয়া বাধ্য হয়ে করুক আর স্চ্ছোয় করুক এটা দেখছি আমরা। ক্রসফায়ারকারিদেও প্রেসবিজ্ঞপ্তিটি ছেপে দিতে কার্পণ্য করে না আমাদেও গণমাধ্যম। অবশ্য যারা সাহস নিয়ে দু’একটি রিপোর্ট করেন তারা পড়েন চরম বেকায়দায়। তাদের হয় নির্যাতিত না হয় চাকুরিচ্যুত হতেদ হয়।
জাতির বিবেক, জাতিকে যারা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তারাই হলেন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মী। সেই সাংবাদিকদের উপরে প্যারামিলিটারি ফোর্স’র নির্যাতন চরমে এসে পৌঁছায় জরুরি অবস্থার সময়ে। তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমি নিজেই। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের উদাহরণ অনেক আছে। আমাদেরই সাহসী সাংবাদিক বিশিষ্ট কলামিষ্ট মানবাধিকার ব্যক্তিত্ব শাহরিয়ার কবির স্বয়ং এক বড় উদাহরণ। শাহরিয়ার কবিরের ওপর বর্বর রাষ্টীয় নির্যাতন হয়েছে। আজও তিনি তার শরীরে সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। একই অবস্থা আমার (জাহাঙ্গীর আলম আকাশ) এবং নিউ এজ এর এফ এম মাসুমের। কিন্তু তারপরও আমরা চাই, আর কেউ যেন নির্যাতনের মাধ্যমে কিংবা বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার না হয়। দেশে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কিঞ্চিৎ খতিয়ান তুলে ধরা যাক এবার। মানিক সাহা ছিলেন খ্যাতিমান সাংবাদিক। তিনি দৈনিক সংবাদ, নিউ এজ, বিবিসি ও বন্ধ হয়ে যাওয়া একুশে টেলিভিশন এর প্রতিনিধি ছিলেন। সন্ত্রাসীরা তার পর বর্বর ও নৃশংস বোমা হামলা চালায় ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে। ফলে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন খুলনা প্রেসক্লাবের অনতিদূরে। এমন নৃশংস কায়দায় সাংবাদিক হত্যার নজির নেই আমাদের দেশে। মানিক সাহা হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশ জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই হত্যাকান্ডের প্রকৃত খুনিরা আজও ধরাছোয়ার বাইরে।
২০০৪ সালের ২ মার্চ দি নিউ এজ পত্রিকার খন্ডকালীন সাংবাদিক কেরানীগঞ্জের আবদুল লতিফ নাবিলকে জবাই করে হত্যা করা হয়। স্ত্রী ফারহানা সুলতানা কনকের পরকীয়া প্রেমে বাধা দেয়ার কারণে এই হত্যাকান্ড ঘটে বলে অভিযোগ। স্ত্রীর প্রেমিক নির্জন মোস্তাকিন, মোস্তাকিনের বন্ধু শহিদুল ইসলাম পাপ্পু ও নাবিলের স্ত্রী কনক মিলে নাবিলকে হত্যার পরিকল্পনা করে। পরবর্তীতে মোস্তাকিন, পাপ্পু ও স্ত্রী কনককে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে মামলার কী অবস্থা? এটা আমাদের জানা নেই। দৈনিক জন্মভূমি সম্পাদক ও খুলনা প্রেসক্লাব সভাপতি ছিলেন হুমায়ূন কবির বালু। ২০০৪ সালের ২৭ জুন খুলনায় সন্ত্রাসীরা বোমা মেরে হত্যা করে তাকে। একই সালের ২১ আগস্ট রাতে সন্ত্রাসীরা কামাল হোসেনকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে জবাই করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির আজকের কাগজ প্রতিনিধি ও উপজেলা ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক।
বগুড়ার দূর্জয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক ও বিএফইউজে সহ-সভাপতি দীপংকর চক্রবর্তী (৫৯)। তাকে একই বছরের ২ অক্টোবর হত্যা করা হয়। শেরপুরের সান্যালপাড়ার নিজ বাড়ির পাশেই সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এই সৎ সাংবাদিককে। ঢাকার কাঁটাবনে ২০০৪ সালের ২৪ অক্টোবর নিহত হন আরেক সাংবাদিক। দৈনিক এশিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা অফিসে ঢুকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে শহীদ আনোয়ার অ্যাপোলো (৩৫) কে। অ্যাপোলো ওই পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক বলে তার পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে বলে জানা গেছে। ২০০৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে দৈনিক সংগ্রাম’র খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলালউদ্দিনকে নিহত ও আরও ৪ সাংবাদিক আহত হন।
সবমিলিয়ে আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে বিগত ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৩২ জন সাংবাদিক এবং একজন লেখক নিহত হয়েছেন। ১৯৮৪ সালে স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে বারংবার কারাবরণ ও র্নিযাতনে মারা যান দৈনিক রানারের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম মাজেদ। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হয়েছেন বিবিসি, নিউ এইজ ও দৈনিক সংবাদের খুলনা প্রতিনিধি বিশিষ্ট সাংবাদিক মানিক সাহা (বোমা হামলায়, ১৫ জানুয়ারি ২০০৪), একই শহরে দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালু (বোমা হামলায় ২৭ জুন ২০০৫), খুলনাতেই দৈনিক সংগ্রামের শেখ বেলালউদ্দিন (বোমা হামলায় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৫), দৈনিক অনির্বাণের নহর আলী (২০০১ সালের ২১ এপ্রিল), দৈনিক পূর্বাঞ্চলের হারুন অর রশিদ খোকন (২ মার্চ ২০০২)। তথ্য ভান্ডার বলে পরিচিত খ্যাতিমান সাংবাদিক দৈনিক জনকন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান কেবল (১৬ জুলাই ২০০০) নিজ অফিসে গুলিতে মারা যান। নিহত অন্য সাংবাদিকরা হলেন দৈনিক রানারের সম্পাদক সাইফুল আলম মুকুল (৩০ আগস্ট ১৯৯৮), খুলনার দৈনিক লোকসমাজের রফিকুল ইসলাম, বগুড়ার দৈনিক দুর্জয় বাংলার র্নিবাহী সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী (২ অক্টোবর ২০০৪), দৈনিক সমকালের ফরিদপুর সংবাদদাতা গৌতম দাস (১৭ নভেম্বর ২০০৫), সাতক্ষীরার স.ম. আলাউদ্দিন (১৯ জুন ১৯৯৬), ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের সারওয়ারুল আলম নোমান, যশোরের দৈনিক রানার রিপোর্টার ফারুক হোসেন (১৯৯৪), ঝিনাইদহের দৈনিক বীরদর্পণ পত্রিকার সম্পাদক মীর ইলিয়াস হোসেন দিলীপ (১৫ জানুয়ারি ২০০০), খুলনার দৈনিক অনির্বাণের শুকুর হুসেন (৫ জুলাই ২০০২) এবং ২০০৫ সালের ২৯ মে দিবাগত মধ্য রাতে কুমিল্লায় দৈনিক কুমিল্লা মুক্তকন্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মুহাম্মদ গোলাম মাহফুজ (৩৮) নিহত হন। তাকে জবাই করে হত্যা করে সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা। আরও নিহত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আহসান আলী (২০ জুলাই ২০০১), নীলফামারীর সাপ্তাহিক নীল সাগরের মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬), দৈনিক পূবালীবার্তার মৌলভীবাজার প্রতিনিধি সৈয়দ ফারুক আহম্মদ (৩ আগস্ট ২০০৩), চুয়াডাঙ্গার নিখোঁজ সাংবাদিক বজলুর রহমান, খাগড়াছড়ির আজকের কাগজ প্রতিনিধি কামাল হোসেন (২১ আগস্ট ২০০৪), রাঙামাটির জামালউদ্দীন (৫ মার্চ ২০০৭), নাবিল আবদুল লতিফ, আনোয়ার অ্যাপোলো, ঢাকার উত্তরার কমিউনিটি সাংবাদিক নুরুল ইসলাম রানা (৩ জুলাই ২০০৯), এমএম আহসান বারী (২৬ আগস্ট ২০০৯), ও রেজাউল করিম রেজা, যশোরের আবদুল গফফার চৌধুরী, ডেমরার আবদুল হান্নান, সাপ্তাহিক ২০০০-এর সিলেট প্রতিনিধি ফতেহ ওসমানি ও দৈনিক জনতার যুগ্ম-সম্পাদক ফরহাদ খাঁ (তিনি তার স্ত্রীসহ নিহত হন সন্ত্রাসীদের হাতে)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ ছুরিকাহত হন সন্ত্রাসীদের হাতে। পরবর্তীতে তিনি জার্মানিতে থাকাকালে মারা যান।
সাংবাদিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর নির্যাতনের একটি ঘটনায়ও নির্যাতনকারির শাস্তি হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। জোট আমলে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে বিশিষ্ট কলামিষ্ট অধ্যাপক মুনতাসির মামুন, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, এনামুল হক চৌধুরী সালিম সামাদ রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। জোট আমলে নির্যাতিত হয়েছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, আলহাজ্ব জহিরুল হক। নির্যাতিত হয়েছেন সাংবাদিক প্রবীর শিকদার, টিপু সুলতান।
বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশে প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ডক্টর হুমায়ূন আজাদসহ ২৯ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। ২০০৯ সালের ৩ জুলাই সাংবাদিক নূরুল ইসলাম রানা সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ঢাকার উত্তরায়। তিনি ঢাকার উত্তরা থেকে প্রকাশিত কমিউনিটিবেইসড পাক্ষিক মুক্তমনের রিপোর্টার ছিলেন। বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে আরও দু’জন সাংবাদিক নিহত হন একই বছরে। এরা হলেন আবদুল হান্নান (ডেমরা, ঢাকা) ও এম এম আহসান বারী (গাজীপুর, ঢাকা)। বেসরকারি সংগঠন অধিকারের রিপোর্ট মতে, ২০০৯ সালে দেশে ৩ জন সাংবাদিক নিহত, ৮৪ জন আহত, ৪৫ জন লাঞ্ছিত, ১৬ জন আক্রান্ত, একজন গ্রেফতার, দুইজন অপহরণ, ৭৩ জন হুমকির শিকার, ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৯ জন অন্যান্য ঘটনায় আক্রান্ত হন। ৪১ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে ৩৮ জন সাংবাদিক আহত, ২৬ জন হুমকির শিকার, ১৭ জন লাঞ্ছিত, একটি সংবাদপত্র কার্যালয় ও ৮ জন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালিন আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী সাংবাদিক পিটিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় ওঠে আসেন। বার্তা সংস্থা ইউএনবির তৎকালিন ফেনী প্রতিনিধি টিপু সুলতানের ওপর হাজারীর ক্লাস কমিটির সদস্যরা হামলা করে। তখন তৎকালিন প্রধানমন্ত্রি (যিনি বর্তমানেও প্রধানমন্ত্রি) শেখ হাসিনা পরোক্ষভাবে সাংবাদিক নির্যাতনকারির পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, টিপু সুলতানের কী কোন এক্রিডিটেশন কার্ড আছে? ওটা ছাড়া কী সাংবাদিক হওয়া যায় নাকি? অথচ বাংলাদেশের শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ সাংবাদিকের কোন এক্রিডিটেশন কার্ড নেই। যদিও এই কার্ড দেয়া নিয়েও রয়েছে নানান কথা। সে প্রসঙ্গ থাক আজ।
দেশে আলোচিত সাংবাদিক হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও বহুল আলোচিত হলো মানিক সাহা, শামছুর রহমান কেবল, হুমায়ুন কবির বালু, দীপংকর চক্রবর্তী, গৌতম দাস, হারুনর রশিদ খোকন, সাইফুল আলম মুকুল, শেখ বেলালউদ্দিন। সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন। এরমধ্যে দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক প্রকাশক মুক্তিযোদ্ধা আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, জাহাঙ্গীর আলম আকাশ (এই লেখক), তাসনীম খলিল, কার্টুনিষ্ট আরিফুর রহমান প্রমূখ উল্লেখযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠের তুচ্ছ ঘটনা ঘটে। এরই জের ধরে সেনাবাহিনী দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল প্রগতিশীল শিক্ষক-শিক্ষার্থী মৌন মিছিল করেন। এই অজুহাতে তৎকালিন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নামে রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা চাপিয়ে দেয়।
প্রথাবিরোধী বিশিষ্ট নাট্যকার-অভিনেতা, কলামিষ্ট মলয় ভৌমিক। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। এখন নিয়মিত কলাম লিখেন দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো, যুগান্তরসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে। তার ”উত্তরের উলুখাগড়া” শীর্ষক কলাম দৈনিক সংবাদ এর জনপ্রিয় কলাম ছিল। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বয়সী নাট্য সংগঠন অনুশীলন নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও সঙ্গীত বিভাগের চেয়ারম্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত শায়ত্বশাসিত একটি ক্যাম্পাসে নির্যাতনবিরোধী মৌন মিছিল করার অপরাধে বর্বর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন তিনি। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের সাথে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হয়নি। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনাগুলো নতুন নয়। জরুরি অবস্থার সময় সাংবাদিকদের আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। সাংবাদিকদের যেভাবে পর্যুদস্ত করা হয়েছে তার প্রতিকার সাংবাদিক সমাজ কার্যকরভাবে চাইতে পেরেছে কিনা? সেটাও আজকে একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের সর্বশেষ অবস্থার দিকে নজর দিতে চাই। বর্তমান সরকারের আমলেই নির্যাতিত হয়েছেন সাংবাদিক মানবাধিকারকর্মী এফএমএ রাজ্জাক (খুলনা), দেশ টিভির যুগ্ম বার্তা সম্পাদক গিয়াস আহমেদ (ঢাকা)সহ বহু সাংবাদিক। মানবাধিকারকর্মী-সাংবাদিক উইলিয়াম গোমেজকে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা তুলে নিয়ে গিয়ে দ্বিগম্বর করে নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটা সর্বশেষ খবর।
অন্যদিকে দেশের সর্বউত্তরের জেলা শহর পঞ্চগড়ে সম্প্রতি “বাংলাদেশ প্রেসফ্রিডম ফাউন্ডেশন নামে একট গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছে। নতুন এই সংগঠনটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিগত ১৯৮৪ সাল থেকে অদ্যাবধি ২৯ জন সাংবাদিক (একাধিক সম্পাদক ও একজন লেখকসহ) হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। গত ৩ মে আন্তর্জাতিক প্রেসফ্রিডম ডে’তে শুরু হওয়া এই সংগঠনের যাত্রাকালে আরো জানানো হয়, ২০১০ সালে ৩৪০ জন সাংবাদিক নির্যাতন এবং ২৩৬ জন সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানির শিকার হন।
এই সরকারের আমলে অনেক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে সিনিয়র সাংবাদিক ফরহাদ খা এবং তার স্ত্রী নিহত হন। তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। খোদ রাজধানী ঢাকায় এই ঘটনা ঘটে। বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়েই আরও নিহত হয়েছেন এটিএন বাংলার সিনিয়র ফটোগ্রাফার শফিকুল ইসলাম, সিলেটে সিনিয়র সাংবাদিক ফতেহ ওসমানীসহ অন্ত:ত ৭ জন সাংবাদিক। কোন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের যথাযথ তদন্ত হয়নি কিংবা প্রকৃত খুনি এবং খুনের নেপথ্যের গডফাদাররা ধরা পড়েনি। অথ্চ মহাজোট নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান সংসদে মিথ্যা ভাষণ দিলেন। হাসিনা সংসদে কেবলমাত্র তার প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের সাংবাদিক হত্যাকান্ডের তথ্য তুলে ধরেছেন। যদিও তার হাসিনার সরকারের আমলেও বহু নামকরা সাংবাদিক বর্বরভাবে খুন হয়েছেন নিজ অফিসে কর্মরত অবস্থায়। এই হলো বাংলাদেশের প্রতিহিংসা ও দোষারোপের অর্ধসত্য রাজনীতি। আসলে হাসিনা বলেন আর খালেদা বলেন, এরা কেউই সত্য তথা পুরো সত্য বলার সাহস রাখেন না কিংবা বলেননা। নিজামীরাতো স্বাধীনতাবিরোধী, যারা আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত নিয়েছে, হত্যা করেছে। তাদের কথা আর কী বলো?বাংলাদেশের হাফট্রুথ রাজনীতি কবে যে ফুল ট্রুথ হবে? পুরো সত্যের চচ্যা ছাড়া দেশের গণতন্ত্র বাস্তবিকঅর্থেই কী পরিপুষ্ট হতে পারে?
সাংবাদিকদের বিভাজন, সাংবাদিকতা পেশার রাজনীতিকরণ, সুশাসনের অভাব, কার্যকর গণতন্ত্রহীনতা, সুবিধাবাদিতা, বৈষম্য, ধনিক পুঁজি অভিমুখী গণমাধ্যমসহ নানা কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের কোন প্রতিকার হয়নি আজও। সাংবাদিক কিংবা সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। যেকোন হেফাজতে কোন নাগরিককে নির্যাতন সভ্য সমাজে চলতে পারে না। সাধারণ নাগরিক হোক অথবা রাজনীতিবিদ হোক কিংবা পেশাজীবি হোন বা গণমাধ্যমকর্মী হোন কারও কোন নির্যাতনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে এটা আমাদের দাবি। যদি এই ধরনের কোন ঘটনা ঘটে তার সুষ্ঠু তদন্ত করা প্রয়োজন। যারা এমন নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় আনতে হবে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনার কার্যকর তদন্ত চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায় দোষিদের বিচারের মুখোমুখি আনয়ন অত্যন্ত জরুরি। কেননা, সভ্য সমাজে মানব হত্যা-নির্যাতন কল্পনাও করা যায় না।
বাংলাদেশের সমাজ যদি আদর্শভিত্তিক পরিবর্তিত না হয় তাহলে প্রেসফ্রিডমটা মূলত: সোনার হরিণ ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের মানুষ দেখেছেন, দুর্নীতিবাজরা সব সরকারের আমলেই নিয়ন্ত্রিত। আর এসব দুর্নীতিবাজ কিংবা কালো টাকার মালিকরাই বাংলাদেশে মিডিয়ার ওনারশিপের জায়গাটা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মিডিয়াকে ঘোষণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কালো টাকার মালিক মিডিয়ার ওনারশিপে থাকায় তাদের মধ্যে একেবারেই ব্যতিক্রম ছাড়া কোন ইডিওলজি নেই। ফলে সাংবাদিকরা প্রথমত: সেলফসেন্সরশিপের মুখে পড়ে। সরকারি বিজ্ঞাপনকে ঘিরে দেশে মুড়ি-মুড়কির মত সংবাদপত্র বেরিয়েছে। এর কতগুলো জনগণের কল্যাণে কাজ করছে তাও আজ একটি বড় প্রশ্ন। সরকারের তরফ থেকে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম বড় হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। তাছাড়া পেশাদারিত্বের সংকট বাংলাদেশে প্রেসফ্রিডমের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম বাধা।
দেশে প্রেসফ্রিডমের আরও একটা সমস্যা হলো কনটেম্পট টু কোর্ট এবং মানহানি। এ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা না থাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক-প্রকাশকের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। কোনটা লিখলে আদালত অবমাননা হবে? তার কোন সৃনির্দিষ্ট বর্ণনা নেই কোথাও। এনিয়ে সাংবাদিক, সম্পাদক সকলেই একটা চরম ঝুঁকির মধ্যে। সর্বোপরি বাংলাদেশে কোন জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা নেই। জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব, সাংবাদিদের মধ্যে অনৈক্য, রাজনৈতিক বিভাজন, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন থামছে না। সাংবাদিক খুন বা নির্যাতিত হলে তার প্রতিকার মেলে না, বিচার হয় না। ফলে সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনকারিরা উৎসাহিত হচ্ছে। সাংবাদিক সমাজ আমরা দেশে এযাবৎ সংঘটিত সকল সাংবাদিকসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাই। সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতনসহ সকল হত্যা-নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়া যেতে পারে। যদি সমাজে সত্যিকারের আইনের শাসন, কার্যকর গণতন্ত্র থাকে। অত্যাচার-নির্যাতনের কোন প্রতিকার, বিচার, প্রতিবিধান নেই। এই যে একটা ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়েছে সেটাকে ভাঙা চাই। আর এটা করতে হলে চাই দেশপ্রেমিক জনঐক্য।
রাজনীতি, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের উর্দ্ধে ওঠে গণ জাগরণ গণবিপ্ল­ব দরকার। গণবিপ্লবের মাধ্যমেই কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের ভেতরকার সমস্যাগুলোর সমাধান হতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্রে দায়মুক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির শেকড় বেশ গভীরে। এটার প্রমাণ মেলে যখন আমরা দেখি, মানুষ হত্যাকান্ডের বিচার চান না। সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকান্ডের পর সাংবাদিক সমাজকে বলতে শুনেছি ’বিচার পাই না তাই বিচার চাই না’। এমন স্লোগান লিখে রাজপথে নামতে হয় সাংবাদিকদের। আমরা আশা করবো, এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। আশার কথা হলো বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে কমিউনিটি রেডিও নীতিমালা প্রণয়ন করে গেছে। মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়েছে। বর্তমান সরকার রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট প্রণয়ন করেছে। এর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি ধাপ এগিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। তবে এসব আইন প্রণয়ন করলেইতো আর হবে না। এগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দিতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে।
বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাসমূহ তুলে নেয়া হবে। ভাল কথা। রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা তুলে নেয়াই উচিত। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক হয়রাণিমূলক মামলা রয়েছে। আমি মনে করি একটা বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার। সেটা হলো ধরুণ, একজন সাংবাদিক ’এক্স’। তিনি সত্যি সত্যি চাঁদাবাজি কিংবা অপরাধ করেছেন। তার মামলাও কী তবে তুলে নেয়া হবে? এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের বক্তব্য হলো-না সব মামলা তোলা উচিত হবে না। কেবলমাত্র যেসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, মিথ্যা-হয়রাণিমূলক সেইসব মামলাই তুলে নেয়া হোক। অন্যথায় দেশে আইনের শাসন রক্ষা করা যাবে না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র আবার গণতন্ত্র ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। কোনটাই ভাবা যায় না। সভ্য ও মানবিক কল্যাণমুখী সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটা পূর্বশর্ত। গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একে অপরের পরিপূরক। একটা ছাড়া অন্যটা অচল।
লেখক: মানবাধিকারবিষয়ক অনলাইন সংবাদপত্র ইউরো বাংলা’র সম্পাদক
(http://www.eurobangla.org/), (editor.eurobangla@yahoo.de)