Tag Archives: জাহাঙ্গীর আকাশ

সাংবাদিক রোজিনার মুক্তি, সাগর-রুনির খুন, প্রধানমন্ত্রির জরিমানা এবং গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য ও অসুস্থ্যতা!

ছবিটি তোলা হয় ২৯.০৪.২০০৯, সাংবাদিক জাহাঙ্গীর আকাশ এর লেখা “উদীচী থেকে পিলখানা” বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে।

জাহাঙ্গীর আকাশ।। দুর্নীতির চেইন অব কমান্ড ভাংতে চাইলে আগে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল এবং দলের নেতৃত্বের ভেতরে যে অসুস্থতা আছে সেগুলিকে সারাতে হবে। এজন্য চাই কমিটমেন্ট আর সাহস ও স্বচ্ছতা।

না, আমি আমার মাতৃভূমির কথা বলছি। আমার নতুন দেশের সাংবাদিকরা যে স্বাধীনতা ভোগ করে তাকে স্বর্গে বসে সাংবাদিকতা করার সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে না। আর এটা সম্ভব একারণে যে এখানে সত্যিকারের গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের চর্চা হয়। একটা উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিস্কার হবে।

সম্প্রতি এদেশের প্রধানমন্ত্রী “করোনাআইনের নির্দেশনা ভঙ্গ করে” নিজের জন্মদিনের পারিবারিক উৎসবে যোগদান করায় পুলিশ তাঁকে জরিমানা করেছে। সে আবার কি, ১০ জনের স্থলে ১৪ জন সমবেত হয়েছিল সেই উৎসবে। আর তাতেই হয়ে গেল খবরের শিরোনাম। গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রধানমন্ত্রিও পুলিশের জরিমানাকে মেনে নিলেন। ক্ষমাও চাইলেন দেশের মানুষের কাছে। গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের কী দারুণ সৌন্দর্য্য! কেউ কি কল্পনাও করতে পারে এমন ঘটনা সেখানে (বাংলাদেশে) সম্ভব?

উন্নত বিশ্বেও দুর্নীতি আছে, অনিয়ম হয়, সন্ত্রাস, হত্যা-নির্যাতন সবই চলে। কিন্তু বিচারও হয়। আইন সবার বেলায় সমানভাবেই প্রয়োগ হয়। যেমন ধরুন, এদেশের সাবেক পুলিশ প্রধানের দুর্নীতির দায়ে জেল হয়ে গেছে।

বলার স্বাধীনতা তথা ফ্রিডম অব স্পিস এর যে শক্তি দেশের সংবিধানে দেয়া আছে, তাকে নড়াতে পারে এমন শক্তি কারও নেই। ধরুন, আমি এখানে সরকারি চাকরি করি আবার আমি আমার মতামতও স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারি। আমি কলাম লিখছি এদেশের মিডিয়ায়। তবে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, এদেশে সাংবাদিকতার নীতিমালা আছে এবং এই নীতিমান লংঘন করে কেউ সাংবাদিকতায় টিকতে পারবে না।

একটি মন্ত্রনালয়ের প্রধান যদি, সৎ, স্বচ্ছ, নীতিবান ও ঘুষখোর না হয় তাহলে কি সেই মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারি দুর্নীতি করতে সাহস পায়? সাংবাদিক রোজিনাকে চিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমেই, সে একটি মন্ত্রনালয়ের প্রধান যদি, সৎ, স্বচ্ছ, নীতিবান ও ঘুষখোর না হয় তাহলে কি সেই মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারি দুর্নীতি করতে সাহস পায়? সাংবাদিক রোজিনাকে চিনি সাংবাদিকতার মাধ্যমেই, অনেক আগের কথা। তথ্য জানার অধিকার জনগণেরই অধিকার আর সেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন পেশাদার সাংবাদিকে যখন লাঞ্ছিত হতে হয়, গ্রেফতার ও হাজতে যেতে হয়, তখন কি কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারে যে গণমাধ্যম স্বাধীন?

যখনই সাংবাদিক হত্যা-নির্যাতন ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে রাজনৈতিকভাব দ্বিধাবিভক্ত সাংবাদিক ও নাগরিক (সুশীলসমাজসহ) সমাজ কাঁপিয়ে তোলে রাজপথ, পাশাপাশি ঝড় ওঠে সোশ্যালমিডিয়ায়। আবার সব থেমে যায়, ঠিক একইভাবে থেমে যাবে সব চিৎকার চেঁচামেচি এবারেও, কারণ সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম কারামুক্ত। আবারও ঘটবে একটা নতুন ঘটনা, সবাই জেগে উঠবে তখন, ফের থেমে যাবে সব। এভাবেই তো চলছে পালাক্রমে বারংবার।

এখানে একটি উদাহারণ দিতে চাই। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে মাছরাঙা টিভির বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। হাইকোর্ট এই চাঞ্চল্যকর হত্যামামলার তদন্তভারের দায়িত্ব দেয় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সমস্থাটিকে যাদের হাতে আছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি যেগুলি তারা ব্যবহার করে তদন্তকাজকে সহজতর করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ নয় বছরেও সংস্থাটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে বলে আমার জানা নেই। দেশের সাংবাদিক সমাজ এটাও হয়ত জানে যে এই সাংবাদিক দম্পতি হত্যার পেছনে কোন শক্তির হাত রয়েছে। এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের পেছনেও কি দুর্নীতিবাজচক্র জড়িত নেই?

আরও বলে রাখা ভালো যে, আমাকে যারা খুনি, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করে গ্রেফতার, নির্যাতন ও জেলে পাঠিয়েছিল তাদেরকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি হৃদয় থেকে। কিন্তু আমি তাদেরকে ক্ষমা করতে পারব না যারা মহান সাংবাদিকতা পেশায় থেকেও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে ওই দুর্বৃত্তচক্রের সাথে যোগসাজশের মাধ্যমে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্যের স্বাদ দেশের মানুষও পাবে না, সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতাও মিলবে না। বরং গণতন্ত্রের অসুস্থ্য ও কদর্য চেহারাটাই বেরিয়ে আসবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ- চেতনা আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামও কিন্তু দুর্নীতি, বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠারই সংগ্রাম ছিল জীবনভর।

সেই স্বাধীনতার স্বাদ পাবার ও স্বপ্ন বাস্তবে সবার জীবনে ধরা দেবে এবং সুন্দর হবে প্রতিটি মানুষের জীবন আর ঘরে-ঘরে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ। শুধু একদল লোভী, ক্ষমতাভোগী দুর্নীতিবাজরা টাকার পাহাড় গড়ে তুলবে তার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেনি দেশের মানুষ।