
জাহাঙ্গীর আলম আকাশ ।। প্রশ্ন উঠেছে হরেকরকম! সরকার খুনের রহস্য ও খুনীদের সর্ম্পকে জানাবে না কিছুই। তারা নাকি কৌশল নিয়েছিল! এটা খুনি বা খুনিদের বাঁচানোর একটা কৌশল নয়তো! এতবড় একটা নৃশংসতা, বর্বর হত্যাকান্ডকে নিয়ে হাসিনার মহাজোট সরকার “লুকোচুরি” খেলছে কেন? ঘটনার এতদিন পরও খুনি গ্রেফতারে সম্পূর্ণ ব্যর্থ প্রশাসন ও সরকার। হত্যাকান্ডের মোটিভও রহস্যাবৃত। হত্যাকান্ডের ঘটনায় তদন্ত কাজে নিযুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্তদের নানামুখী বক্তব্যে হত্যাকান্ড রহসে্যর কিনারাতো হচ্ছেই না উল্টো রহস্য আরও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেয়া সময়ে যথন খুনিরা ধরা পড়লো না বা খুনের রহস্য উন্মোচিত করতে পারলো না প্রশাসন তখন সাহারা বললেন ভিন্ন কথা। তিনি নাকি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন! কিন্তু কেন?
সরকার কী খুনিকে বা খুনিদের রক্ষার চেষ্টা করছে? খুনি বা খুনির দল কী বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের সক্রিয় মিডিয়াকর্মী? খুনিরা কী হাসিনার মহাজোট সরকারের চেয়েও ক্ষমতাবান? প্রতিভাবান ও চৌকোস সাংবাদিক দম্পত্তি হত্যাকান্ডে কী কোন বিশেষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি (এক বা একাধিক) জড়িত? যিনি বা যারা হাসিনা কিংবা তাঁর সরকারের কোন তরফের ‘বোয়াল মাছ’? সাংবাদিক সমাজ কী বুঝতে পারছেন না যে সরকার খুনিদের রক্ষার চেষ্টা করছে? তাঁরা কী মনে করেন দু’একটি মানববন্ধন, সভা, সমাবেশ আর বক্তৃতা দিয়ে, টিভিতে টকশো করে আর বাহবা পাওয়া যাবে এমন সুন্দর সুন্দর কলাম লিখলে, ফিচার বা রিপোর্ট করলেই খুনিদের ধরবে সরকার? যদি তাই না হবে তবে কেন তাঁরা চুপচাপ বসে আছেন? তাঁরা কী নিজ পেশার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা আর মর্যাদাকে রক্ষার জন্য এককাতারে শামিল হয়ে রাস্তায় নেমে না এসে পরোক্ষভাবে খুনিদেরই পক্ষাবলম্বন করবেন? অন্যভাবেও স্বদেশ নিয়ে বলা যায় যে, বাংলাদেশে কী কোন সরকার, প্রশাসন আছে? নাকি সেখানে কোন সাংবিধানিক ও আইনের শাসন আছে? প্রতিদিন হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, পুপ্ত হত্যা, বন্দুকযুদ্ধের নামে রাষ্ট্রীয় হত্যাসহ নানান অপরাধ, অপকর্ম ঘটেই চলেছে? তবুও নাকি সেখানে আইন-শৃঙ্খলার নজিরবিহীন সুবাতাস বইছে! যা অতীতে কোন সরকারের আমলেই ছিল না। এমনকি হয়ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আমলেও নয়!
তাহলে বাস্তবে দেশে যা ঘটছে সেগুলি কী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পরিচায়ক? ঢাকার সংবাদপত্রগুলিতে প্রকাশিত তথ্য মতে, ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকায় এক নারী খুন এবং নিহত হালিমার বাসায় দুধর্ষ ডাকাতি, দুই নারীর লাশ উদ্ধার এবং এক ব্যাংক কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। একইদিনে ক্রসফায়ারের নামে চট্রগ্রামে পুলিশ হত্যা করেছে এক যুবককে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে র্যাব ও ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আটক করা হয়েছিল ৪ ফেব্রুয়ারি। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানা যায়নি। এখনো তাদের সন্ধান পায়নি পরিবারের সদস্যরা। হাইকোর্ট এই গুম হওয়া দুই ছাত্রকে সশরীরে আদালতে হাজির করানোর জন্য সরকারের প্রতি রুল জারি করেছে। এর আগেও বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করার ব্যাপারে হাইকোর্ট রুল আদেশ দিয়েছিল। কিন্তু তাতে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি অদ্যাবধি। হাইকোর্টও কেবল রুল জারির মধ্যেই দায়িত্ব সারছে! ফলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বিনাবিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ হচ্ছে না।
সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের ঘটনায় সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বারবার বলা হয় যে, “হত্যাকান্ডের তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুব শিগগিরই খুনি ও খুনের মোটিভ সম্পর্কে জানানো হবে। খুনির হাত যত বড়ই হোক না কেন তাদের ধরা হবে। সম্ভাব্য খুনিরা গোয়েন্দা জালে। র্যাব, ডিবি, সিআইডি ও পুলিশের অনেকগুলি ঝানু টিম মাঠে তৎপর। খুনিদের রক্ষা নেই। ধরা তাদের পড়তেই হবে।” ইত্যাদি কত কথা, বিশেষ করে পুলশ প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তদন্তকারি অন্য আরও দু’একজন কর্মকর্তা এসব কথা বলেছেন, এখনও বলে যাচ্ছেন। কিন্তু কী অগ্রগতি, কারা জড়িত, কেন খুন হলেন সাংবাদিকদ্বয় তার কোন তথ্য প্রশাসন বা সরকার জনগণকে এখনও জানায়নি। তারা কী জানাতে চায় না নাকি তারা খুনিকে/খুনিদের বাঁচাতে চায়, সেটা আমরা জানি না? তবে সরকার এই অমানবিক হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের গ্রেফতার ও হত্যাকান্ডের মোটিভ দেশবাসির কাছে জানানোর ব্যাপারে যে টালবাহানা শুরু করেছে তাতে দেশবাসির কোন সন্দেহ নেই।
গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মনিরুল ইসলাম বলেছেন, “শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করবে না।” আমরাও এর বিপক্ষে নই। এটা সত্য যে খুনের মতো স্পর্শকাতর কোন ঘটনায় সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কাউকে গ্রেফতার করা আইনসম্মত নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো পুলিশ কী এই অনুশীলন অন্যক্ষেত্রে করে? এই কাজটা যদি পুলিশ অন্য সব হত্যাকান্ড বা ঘটনার সময় করতো! সেটাতো তারা করে না। তাহলে সাগর-রুনির মতো সাড়াজাগানো হত্যাকান্ডের বেলায় তারা কেন খুনিকে গ্রেফতার করছে না? দেশবাসি এই সাংবাদিক দম্পত্তির খুনি এবং খুনের কারণ জানতে চায়। জনগণ কোন নাটক দেখতে চান না। কিংবা পুলিশ কোন “জজমিয়া”কে সাগর-রুনি হত্যাকান্ডে আবিস্কার করুক তাও দেশবাসি চাইবেন না কখনও। পুলিশ, প্রশাসন বা সরকার কেন সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিষয়টিতে খুনীদের ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছে তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাহলে কী খুনিদের রক্ষা বা আঁড়াল করতেই সরকার কোন নাটক মঞ্চায়নের পরিকল্পনা আঁটছে? এমন প্রশ্ন ও সন্দেহ জাগানোর ক্ষেত্রটা কিন্তু সাহারা খাতুন, হাসান মাহমুদ খন্দকার আর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরাই তৈরী করে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন! সরকার সমর্থিত একটি জাতীয় দৈনিকে প্রশাসনের কাছে নাকি এই বর্বরতার সবকিছুই পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল, তাহলে কেন তারা এখন নয়া নাটক সাজানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে? এই সরকারের পছন্দের কোন মিডিয়াকর্মীকে (যদি সেই আলোচিত ব্যক্তি সতি্য সতি্যই খুনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকে তারপরও কী তাকে বাঁচাতে হবে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে) বাঁচানোর চেষ্টা নয়তো!
নিহত সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার বাদি নওশের আলমকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক গুরুত্ব দিয়ে খবরটি প্রকাশ করেছে। কারা তাকে হুমকি দিচ্ছে, তাও কী আমাদের ‘তড়িৎকর্মা” (নাকি অকর্মা) পুলিশ ও গোয়েন্দারা বের করতে অক্ষম? অভিজাত রাষ্ট্রীয় “খুনি বাহিনী”র বিশেষ টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি নিয়ে কী ওরা আঙুল চুষছে? হুমকিদাতাকে বের করা কী খুবই কঠিন কাজ? নাকি তারা এই হুমকিদাতাকে অন্ধকারেই রাখতে চায়?
আমার এক সিনিয়র সহকর্মী সাংবাদিক বন্ধু জনপ্রিয় একটি বাংলা দৈনিকে কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি প্রশাসন ও সাংবাদিক বন্ধুদের উদ্দেশে্য বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তাদের চিহ্নিত করুন, গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ করুন এবং সুষ্ঠু বিচারের মুখোমুখি করুন। আর সাংবাদিক বন্ধু-সহকর্মীদের কাছে আবেদন, আপনারা সাংবাদিকতার প্রাথমিক শর্ত সত্যনিষ্ঠ থাকুন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করুন। গুজব ছড়াবেন না। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর এই ঘটনা নিয়েও পুলিশসহ গোয়েন্দা বিভাগ জোর তদন্ত- অনুসন্ধান চালাচ্ছে। আশা করি, খুব শিগগির তারা খুনিদের চিহ্নিত করে দেশবাসীর সামনে হাজির করতেও পারবে। যতক্ষণ পর্যন্ত খুনিরা শনাক্ত না হয়, যতক্ষণ তাদের আইনের আওতায় আনা না যায়, ততক্ষণ আমাদের ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে বলেই আমি মনে করি” বাহ্ কী চমৎকার নির্দেশনা! একবারেই পুলিশ বা প্রশাসনের ডুপ্লিকেট। আমার প্রশ্ন হলো-এটা ধৈয্যর্ ধরার ব্যাপার নয়। মানুষের ধৈযের্্যর বাঁধ ভেঙ্গে গেছে বহু আগেই। আপনাদের মনে নেই মানিক সাহার কথা, শামছুর রহমান কেবলের কথা, দীপংকর চক্রবত্তর্ীর কথা, গৌতম দাশের কথা কিংবা অন্য আরও অনেক সাংবাদিক যাঁরা সন্ত্রাসীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এসব খুনেনর ঘটনার পরও আমাদের বিভন্ন মহল থেকে ধেয্যর্ ধারণ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ফল কী পাওয়া গেছে? তা বোধহয় আর বর্ণনা করার দরকার নেই। কাজেই কোন আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি, নাটক বা সুবচন নয় আমরা খুনিকে গ্রেফতার দেখতে চাই, বিচার চাই, খুনের রহস্য উন্মোচন করার দায়িত্ব প্রশাসন বা সরকারের। কালক্ষেপণ করে ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার নতুন কোন নজির যাতে সরকার সৃষ্টি করতে না পারে তার লক্ষে্য সাংবাদিক বন্ধুদের সববাইকে একতাবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। প্রশাসন বা সরকার আন্তরিক হলে কেবল সাগর ও রুনি হত্যাকান্ডই নয় সকল হত্যাকান্ডেরই কিনারা করা কোন ব্যাপারই না। কিন্তু প্রশাসন বা সরকারে সেই আন্তরিকতা আছে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন! খোদ রাজধানী ঢাকাতেই একের পর এক সাংবাদিক খুন হচ্ছেন নিজ বাড়িতে, তার প্রতিকার মিলছে না। আমি দায়ত্ব নিয়েই বলছি, সরকার ও প্রশাসন হয়ত চাইছে না যে সাগর-রুনি হত্যা রহস্য উন্মোচিত হোক? প্রশাসন যদি মনে করে খুনি শনাক্ত বা খুনের কারণ বের করা খুবই কঠিন বা দুরুহ তাহলে ৭২ ঘন্টার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্ব আমাদের হাতে দিন, খুনি ও খুনের মোটিভ বের করে দেবো আমরা।
আরেকটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, “আস্থা রাখুন, ধৈর্য ধরুন। সহসাই সুসংবাদ মিলবে।” এই সুসংবাদ জনগণের দোড়গোড়ায় আসতে আর কত দেরি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! সাগর-রুনির সন্তান মেঘের দাদি সালেহা মনির বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরও খুনিরা ধরা পড়ছে না। এই হত্যাকাণ্ডের আসামি ধরতে দেরি হলে আসামিরা আড়ালে চলে যাবে।” সাগর-রুনি যে ভবনে বাস করতেন সেই ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তিন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তারা কী তথ্য দিয়েছে ইতোমধে্য তাও জানানো হচ্ছে না। তাদেরকে গ্রেফতারও দেখানো হয়নি? বিনা গ্রেফতার বা বিচার কিংবা আদালতের নির্দেশ ছাড়া কাউকে কতদিন যাবত আটক রাখার বিধান আছে-তা আমার জানা নেই। এক্ষেত্রে আবার যদি কেউ নিরপরাধ হয় তাহলে আইনে কী বলা আছে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাই মত দেবেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশ বা আদেশ ছাড়া কাউকে দিনের পর দিন আটক রাখা যে মানবাধিকারের লংঘণ-তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আরেকটি খবর শোনা যাচ্ছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে বলা হয়েছিল যে সাগর-রুনির ফ্লাটের ঘরের জানালার যে রড কাটা হয় সেই ফাঁক দিয়ে কোন পূর্ণবয়স্ক মানুষ বের হতে পারবে না। এখন নাকি বলা হচ্ছে সেই জায়গা দিয়ে মানুষ বের হওয়া সম্ভব! এথেকে বুঝতে আর বাকি নেই যে প্রশাসন বা সরকারই মূল ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিতে চাইছে! জনমনে যদি এই প্রশ্ন ওঠে তা সরকার কী করে খন্ডন করবে?
ছোট্র, অবুঝ ও নিষ্পাপ ‘মেঘ’ আমার সন্তানের চেয়ে কয়েক মাসের বড়। এই ছোট্র শিশুটির মানসিক অবস্থার কথা কী ভাবছে সরকার, এই ঘুনে ধরা সমাজ? নাকি সববাই সমবেদনা প্রকাশ ও দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা দিয়েই দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে? সরকারের কাছে আমাদের দাবি সত্যটা দ্রুত প্রকাশ করা হোক, তারা অতি আপন কিংবা রাজনৈতিক সুহৃদ হলেও খুনিদের ধরুন এবং বিচার করুন। সমাজ ও রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন। ছবি-গুগল। http://www.eurobangla.org/, editor.eurobangla@yahoo.de,